শহরের পুরোনো পাড়াটিতে সন্ধ্যা নামলেই একটি অদ্ভুত দৃশ্য দেখা যেত। রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা লোহার খুঁটির মাথায় লাগানো বাতিটি জ্বলে উঠত, আর তার হলুদ আলোয় ফুটপাতের ছোট্ট অংশটুকু যেন আলাদা একটি পৃথিবী হয়ে উঠত।
সেই আলোয় প্রতিদিন বসতেন অবসরপ্রাপ্ত প্রকৌশলী অমরেশবাবু। তাঁর হাতে থাকত একটি ছোট যন্ত্রের বাক্স, পাশে কয়েকটি তার, ব্যাটারি আর নানা রকম সুইচ। পথচারীরা তাঁকে দেখে ভাবত, বৃদ্ধ মানুষটি বুঝি নিজের মনেই কিছু নিয়ে ব্যস্ত থাকেন।
কিন্তু অমরেশবাবুর কাজ ছিল অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি এমন একটি সংকেতবাতি তৈরি করার চেষ্টা করছিলেন, যা আগুন লাগলে কিংবা অন্য কোনো বিপদের সময় শুধু আলো জ্বালিয়ে নয়, স্পর্শের মাধ্যমেও মানুষকে সতর্ক করতে পারবে।
কয়েক বছর আগে একটি বহুতলে আগুন লাগার ঘটনায় তিনি দেখেছিলেন, প্রচণ্ড শব্দের মধ্যে অনেকে সতর্কবার্তা শুনতে পাননি। আবার ধোঁয়ায় ভরে যাওয়া করিডরে সাধারণ আলোও যথেষ্ট সাহায্য করেনি। সেই ঘটনা তাঁর মনে প্রশ্ন তৈরি করেছিল—বিপদের সংকেত কি এমন হতে পারে না, যা চোখে দেখা যায়, কানে শোনা যায় এবং হাতের স্পর্শেও অনুভব করা যায়?
সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই শুরু হয়েছিল তাঁর দীর্ঘ পরীক্ষা।
প্রথম দিকে তাঁর তৈরি যন্ত্র বারবার বিফল হতো। কখনও আলো ঠিকমতো জ্বলত না, কখনও কম্পনের সংকেত এত দুর্বল হতো যে বোঝাই যেত না। একদিন পরীক্ষার সময় ব্যাটারি গরম হয়ে যন্ত্রের একটি অংশ নষ্ট হয়ে গেল।
পাশের বাড়ির কলেজপড়ুয়া মেয়ে ইরা বিষয়টি দেখে বলল, “অমরেশকাকু, এত বয়সে এইসব না করে বিশ্রাম নিলেই তো পারেন! এখন কত আধুনিক যন্ত্র বেরিয়েছে।”
অমরেশবাবু হেসে উত্তর দিলেন, “আধুনিক যন্ত্র অনেক আছে, ইরা। কিন্তু যাদের সত্যিই দরকার, তাদের প্রত্যেকের কাছে কি সেগুলো পৌঁছেছে?”
ইরা আর কথা বাড়াল না।
কয়েক দিন পরে সে আবার এল। এবার তার হাতে কলেজের একটি প্রকল্পের খাতা। সে জানাল, তাদের বিভাগে বৈদ্যুতিক সার্কিট নিয়ে কাজ হচ্ছে। অমরেশবাবুর পরীক্ষায় সে সাহায্য করতে চায়।
দুজন মিলে নতুন করে কাজ শুরু করল।
ইরা যন্ত্রটির বৈদ্যুতিক সংযোগ পরীক্ষা করত, আর অমরেশবাবু বুঝিয়ে দিতেন কীভাবে কম বিদ্যুৎ খরচ করে দীর্ঘক্ষণ সংকেত চালু রাখা যায়। তাঁরা একটি ছোট মডেল তৈরি করলেন। বিপদের সংকেত এলে লাল আলো দ্রুত জ্বলবে, একটি শব্দসংকেত বাজবে এবং হাত দিয়ে ধরা যায় এমন একটি অংশ নির্দিষ্ট ছন্দে কেঁপে উঠবে।
তবে তাঁরা বুঝতে পারলেন, শুধু যন্ত্র বানালেই হবে না। জরুরি অবস্থায় মানুষকে কীভাবে সেটি ব্যবহার করতে হবে, সেটাও সহজভাবে জানাতে হবে।
ইরা কয়েকটি চিত্র আঁকল। অমরেশবাবু নির্দেশনাগুলো এমনভাবে সাজালেন, যাতে বেশি পড়াশোনা না জানা মানুষও ছবির সাহায্যে বুঝতে পারেন। তাঁরা এলাকার একটি কমিউনিটি হলে মডেলটি পরীক্ষা করার অনুমতি চাইলেন।
প্রথম প্রদর্শনীর দিন হলঘরে অনেক মানুষ এসেছিলেন। কেউ কৌতূহল নিয়ে, কেউ সন্দেহ নিয়ে।
অমরেশবাবু বোতাম টিপতেই লাল আলো জ্বলে উঠল। শব্দসংকেতের সঙ্গে হাতলটিও কেঁপে উঠল।
সামনের সারিতে বসা এক তরুণী হাতলটি ছুঁয়ে বললেন, “আমি শব্দ শুনতে পাই না। কিন্তু এই কম্পনটা স্পষ্ট বুঝতে পারছি।”
তাঁর কথায় ঘরটি মুহূর্তের জন্য নীরব হয়ে গেল।
ইরা বুঝতে পারল, এত দিন তারা যে যন্ত্র তৈরি করছিল, তার গুরুত্ব শুধু প্রযুক্তিগত সাফল্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি এমন মানুষের কাছেও সতর্কবার্তা পৌঁছে দিতে পারে, যাদের জন্য সাধারণ ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়।
এরপর তাঁরা স্থানীয় অগ্নিনিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে যোগাযোগ করলেন। বিশেষজ্ঞরা নকশাটি পরীক্ষা করে কিছু পরিবর্তনের পরামর্শ দিলেন। অমরেশবাবু ও ইরা সেই পরামর্শ অনুযায়ী মডেলটি উন্নত করলেন। তাঁরা এটাও নিশ্চিত করলেন যে যন্ত্রটি যেন প্রচলিত অগ্নিসতর্কীকরণ ব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে নয়, বরং অনুমোদিত নিরাপত্তাব্যবস্থার সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
কাজটি সহজ ছিল না। অর্থের অভাব ছিল, অনুমতির প্রয়োজন ছিল, আর পরীক্ষা ছাড়া কোনো যন্ত্রকে মানুষের নিরাপত্তার জন্য ব্যবহার করাও সম্ভব ছিল না। তবু তাঁরা থামলেন না।
কয়েক মাস পরে একটি সামাজিক সংস্থা তাঁদের প্রকল্পে সাহায্য করতে এগিয়ে এল। পরীক্ষিত মডেলটি একটি প্রশিক্ষণকেন্দ্রে প্রদর্শনের সুযোগ পেল। সেখানে মানুষ জরুরি অবস্থায় নিরাপদে বেরিয়ে যাওয়ার অনুশীলন করার সময় বিভিন্ন ধরনের সংকেত সম্পর্কে জানল।
প্রদর্শনী শেষে ইরা অমরেশবাবুকে বলল, “কাকু, আপনি না থাকলে আমি হয়তো ভাবতাম প্রকৌশল মানে শুধু যন্ত্র বানানো।”
অমরেশবাবু তাঁর ছোট্ট বাক্সটি বন্ধ করতে করতে বললেন, “যন্ত্রের সাফল্য তার জটিলতায় নয়, মানুষের কাজে লাগার মধ্যে। তবে মানুষের নিরাপত্তার জন্য বানানো প্রতিটি জিনিসের আগে পরীক্ষা, সতর্কতা আর দায়িত্ব থাকা চাই।”
সেদিন বাড়ি ফেরার সময় মোড়ের পুরোনো বাতিটি জ্বলে উঠেছিল। তার নিচে দাঁড়িয়ে অমরেশবাবু কিছুক্ষণ আলোটির দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তিনি জানতেন, তাঁর তৈরি মডেল পৃথিবীর সব বিপদ দূর করতে পারবে না। তবু এমন একটি ব্যবস্থা তৈরির চেষ্টা করেছেন, যা বিপদের মুহূর্তে আরও কয়েকজন মানুষকে সতর্ক হতে সাহায্য করতে পারে।
আর কখনও কখনও, কয়েক মুহূর্ত আগে সতর্ক হয়ে যাওয়াই জীবন বাঁচানোর জন্য যথেষ্ট।
শিক্ষা: প্রকৃত উদ্ভাবন শুধু নতুন কিছু তৈরি করা নয়; মানুষের বাস্তব সমস্যা বুঝে, নিরাপত্তা ও দায়িত্বকে গুরুত্ব দিয়ে তার সমাধানের চেষ্টা করাই প্রকৃত সাফল্য।