Categories
অনুগল্প বিবিধ

অদৃশ্য সেতুর ওপারে।

শীতলপুরের ছোট্ট আদালত ভবনটির সামনে প্রতিদিন সকাল থেকেই মানুষের ভিড় জমত। কেউ জমির বিবাদ নিয়ে আসতেন, কেউ পারিবারিক সমস্যার সমাধান চাইতেন, আবার কেউ দূর গ্রামের পথ পেরিয়ে আসতেন নিজের অধিকার বুঝে নিতে। কিন্তু সেই আদালতে অনেক মানুষের একটি বড় সমস্যা ছিল—তাঁরা নিজেদের কথা ঠিকভাবে বোঝাতে পারতেন না।

কেউ অন্য ভাষায় কথা বলতেন, কেউ আঞ্চলিক উপভাষায়, আবার কেউ ভয়ে কিংবা সংকোচে নিজের বক্তব্য গুছিয়ে বলতে পারতেন না।

সেই আদালতেই কাজ করতেন অনির্বাণ সেন। তিনি ছিলেন একজন ভাষান্তরকারী। তাঁর কাজ ছিল এক ভাষার কথা অন্য ভাষায় অনুবাদ করা। কিন্তু অনির্বাণ মনে করতেন, শব্দের অনুবাদ করলেই মানুষের মনের কথা অনুবাদ করা যায় না।

একদিন আদালতে এলেন পাহাড়ঘেঁষা একটি গ্রামের বৃদ্ধা লাচমি হাঁসদা। তাঁর জমির সীমানা নিয়ে প্রতিবেশীর সঙ্গে বিরোধ চলছিল। গ্রামের ভাষায় তিনি বিচারকের সামনে অনেক কথা বললেন। কিন্তু তাঁর বক্তব্য আদালতের কর্মীরা ঠিকভাবে বুঝতে পারছিলেন না।

একজন কর্মী বিরক্ত হয়ে বললেন, “উনি কী বলতে চাইছেন, একটু সংক্ষেপে বলুন। এত কথা শুনে সময় নষ্ট হচ্ছে।”

লাচমি চুপ করে গেলেন। তাঁর চোখে জল এসে জমল। তিনি বুঝতে পারছিলেন না, নিজের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাগুলো কীভাবে অপরিচিত মানুষের কাছে পৌঁছে দেবেন।

অনির্বাণ তাঁর পাশে গিয়ে বসলেন।

“আপনি ধীরে ধীরে বলুন। আপনার কথা শোনার জন্যই তো আমরা এখানে আছি।”

বৃদ্ধা কিছুক্ষণ তাঁর দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর বলতে শুরু করলেন। তিনি জানালেন, তাঁর স্বামী মারা যাওয়ার আগে জমির সীমানা নিয়ে যে চিহ্ন রেখে গিয়েছিলেন, প্রতিবেশী সেটি সরিয়ে দিয়েছেন। জমিটুকুই তাঁর জীবিকার একমাত্র অবলম্বন।

অনির্বাণ তাঁর বক্তব্য মন দিয়ে শুনলেন। শুধু শব্দের অর্থ নয়, কোথায় বৃদ্ধা থেমে যাচ্ছেন, কোন কথাটি বলতে গিয়ে তাঁর গলা কেঁপে উঠছে, সেসবও লক্ষ করলেন। তারপর আদালতের প্রচলিত ভাষায় তাঁর বক্তব্য যথাযথভাবে তুলে ধরলেন।

বিচারক বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে শুনলেন এবং প্রয়োজনীয় নথি ও জমির সীমানা যাচাই করার নির্দেশ দিলেন।

আদালত থেকে বেরিয়ে লাচমি অনির্বাণের হাত ধরে বললেন, “আজ মনে হলো, আমার কথাগুলোও মানুষের কাছে পৌঁছতে পারে।”

সেদিন কথাটি অনির্বাণের মনে গভীরভাবে দাগ কেটে গেল।

তিনি বুঝলেন, ভাষার অমিল শুধু কথাবার্তার সমস্যা নয়; এর কারণে মানুষ কখনও কখনও নিজের অধিকার থেকেও বঞ্চিত হয়।

পরের কয়েক মাস তিনি নিজের উদ্যোগে একটি ছোট প্রকল্প শুরু করলেন। আশপাশের বিভিন্ন ভাষায় কথা বলতে পারেন, এমন স্বেচ্ছাসেবীদের সঙ্গে যোগাযোগ করলেন। তাঁদের নিয়ে তৈরি করলেন একটি ভাষা-সহায়তা দল। আদালতে আসা মানুষদের জন্য একটি তালিকা তৈরি হলো—কোন ভাষায় সাহায্য দরকার, কোন স্বেচ্ছাসেবী সেই ভাষা জানেন, কীভাবে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা যাবে।

প্রথমদিকে অনেকেই উদ্যোগটিকে গুরুত্ব দেননি।

একজন সহকর্মী বলেছিলেন, “এত ঝামেলা করে কী হবে? আদালতের কাজ আদালতই করবে।”

অনির্বাণ শান্তভাবে উত্তর দিয়েছিলেন, “বিচার পাওয়ার দরজাটা সবার জন্য খোলা থাকলেই হয় না। সেই দরজা দিয়ে ঢোকার পথটাও সবার জানা দরকার।”

ধীরে ধীরে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করল। দূর গ্রামের মানুষ নিজেদের বক্তব্য জানাতে সাহস পেলেন। ভাষার কারণে ভুল বোঝাবুঝি কমল। বিচারপ্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত কর্মীরাও বুঝতে পারলেন, সঠিক ভাষান্তর সময় নষ্ট করে না, বরং ভুল কমায়।

একদিন জেলা প্রশাসনের একটি সভায় অনির্বাণকে তাঁর কাজের অভিজ্ঞতা বলতে আমন্ত্রণ জানানো হলো। তিনি কোনো পুরস্কার বা প্রশংসার কথা বললেন না। শুধু লাচমির ঘটনার কথা তুলে ধরে বললেন, “একজন মানুষের কথা বুঝতে না পারা আর তাঁর কথা শোনার চেষ্টা না করা—দুটি এক জিনিস নয়। ভাষা আলাদা হতে পারে, কিন্তু মানুষের মর্যাদা আলাদা হতে পারে না।”

সভায় উপস্থিত এক তরুণ আধিকারিক তাঁর কথা শুনে নিজের এলাকার স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলিতেও ভাষা-সহায়তার ব্যবস্থা চালু করার প্রস্তাব দিলেন। পরে সেই উদ্যোগ অন্য কয়েকটি সরকারি দপ্তরেও ছড়িয়ে পড়ল।

বছরখানেক পর লাচমি আবার আদালতে এলেন। এবার জমির সীমানা যাচাইয়ের কাজ শেষ হয়েছে। তিনি নিজের বক্তব্য বুঝিয়ে বলতে পেরেছিলেন, প্রয়োজনীয় কাগজপত্রও জমা দিতে পেরেছিলেন।

আদালত ভবনের বাইরে অনির্বাণকে দেখে তিনি হাসলেন।

“বাবা, তুমি আমার জমি ফিরিয়ে দাওনি। তুমি আমাকে নিজের কথা বলার পথটা দেখিয়েছ।”

অনির্বাণ বললেন, “পথটা আপনারই ছিল, লাচমি মাসি। শুধু মাঝখানে একটা সেতুর দরকার ছিল।”

বৃদ্ধা মাথা নাড়লেন। তাঁর চোখে এবার আর অসহায়তার জল ছিল না; ছিল নিজের কণ্ঠস্বর ফিরে পাওয়ার আনন্দ।

সেদিন বাড়ি ফেরার পথে অনির্বাণ ভাবলেন, পৃথিবীতে কত রকম সেতু রয়েছে—কাঠের, লোহার, পাথরের। কিন্তু এমন কিছু সেতুও আছে, যেগুলো চোখে দেখা যায় না। একটি মনোযোগী কান, একটি ধৈর্যশীল মন, কিংবা সঠিক সময়ে বলা কয়েকটি সম্মানজনক কথা দিয়েও সেই সেতু তৈরি করা যায়।

আর সেই সেতুর ওপারেই অপেক্ষা করে থাকে মানুষের অধিকার, আত্মবিশ্বাস এবং সম্মান।

শিক্ষা: মানুষের কথা মন দিয়ে শোনা এবং তাকে নিজের বক্তব্য প্রকাশের সুযোগ দেওয়া শুধু সহানুভূতি নয়, তার মর্যাদা ও অধিকার রক্ষারও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *