শহরের এক কোণে ছিল ছোট্ট একটি নাট্যমঞ্চ। নাম ‘রঙ্গশিখা’। একসময় এই মঞ্চে অভিনয় দেখার জন্য সন্ধ্যা নামার আগেই দর্শকের ভিড় জমে যেত। আশপাশের গ্রামের মানুষ দূর থেকে আসতেন। কেউ আসতেন হাসির নাটক দেখতে, কেউ সামাজিক নাটক, আবার কেউ আসতেন শুধুমাত্র মঞ্চের আলোয় পরিচিত মুখগুলিকে নতুন চরিত্রে দেখার আনন্দে।
কিন্তু সময় বদলেছিল।
মোবাইলের পর্দায় বিনোদনের অসংখ্য মাধ্যম এসে যাওয়ায় নাট্যমঞ্চের দর্শক কমতে শুরু করেছিল। নতুন প্রজন্মের অনেকেই জানত না, এই ছোট্ট মঞ্চ একসময় কত মানুষের স্বপ্নের ঠিকানা ছিল। ধীরে ধীরে অনুষ্ঠান কমে গেল, কর্মীদের আনাগোনা বন্ধ হলো, আর মঞ্চের দরজায় ঝুলতে শুরু করল ধুলোমাখা তালা।
সেই নাট্যমঞ্চের নেপথ্যে একসময় কাজ করতেন নিবারণবাবু। বয়স প্রায় সত্তর। তিনি অভিনেতা ছিলেন না, তাঁর নাম কখনও পোস্টারে ছাপা হয়নি, দর্শকের করতালিও তাঁর ভাগ্যে জোটেনি। কিন্তু মঞ্চের পর্দা কখন উঠবে, কোন আলো কখন জ্বলবে, কোন দৃশ্যে কীভাবে সাজসজ্জা বদলাবে—এসব তাঁর নখদর্পণে ছিল।
তিনি বিশ্বাস করতেন, দর্শক মঞ্চে যে জাদু দেখেন, তার অর্ধেক তৈরি হয় নেপথ্যে।
নাট্যমঞ্চ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর নিবারণবাবু প্রায়ই তার সামনে এসে দাঁড়াতেন। তালাবন্ধ দরজার দিকে তাকিয়ে তাঁর মনে হতো, যেন নিজের জীবনের একটা বড় অংশ সেখানে আটকে রয়েছে।
একদিন বিকেলে সেই পথে যাচ্ছিল কলেজপড়ুয়া মেয়ে ঐশী। তার হাতে ছিল কয়েকটি খাতা আর একটি কাপড়ের ব্যাগ। সে লক্ষ করল, একজন বৃদ্ধ প্রতিদিনের মতো বন্ধ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন।
ঐশী এগিয়ে এসে জিজ্ঞাসা করল, “আপনি কি এখানে কাজ করতেন?”
নিবারণবাবু একটু হেসে বললেন, “কাজ করতাম বলতে পারো। তবে আমার কাজটা কেউ দেখতে পেত না।”
“কী কাজ করতেন?”
“মানুষের স্বপ্নগুলো যাতে মঞ্চে ঠিকমতো দেখা যায়, তার ব্যবস্থা করতাম।”
কথাটা শুনে ঐশী অবাক হলো। সে নাটক ভালোবাসত। স্কুলে পড়ার সময় কয়েকটি নাটকে অভিনয়ও করেছিল। কিন্তু এই শহরে নাটক করার কোনও সুযোগ আছে বলে তার জানা ছিল না।
সে বলল, “এখানে আবার নাটক শুরু করা যায় না?”
নিবারণবাবু দরজার দিকে তাকালেন।
“দরজা খোলার চাবি থাকলেই কি সব বন্ধ দরজা খোলা যায়, মা? অনেক দরজা খুলতে মানুষের ইচ্ছেটাও লাগে।”
ঐশী সেদিন আর কিছু বলল না। কিন্তু কথাটা তার মনে গেঁথে রইল।
১. একটি ছোট্ট প্রস্তাব
পরের কয়েক দিন ঐশী তার বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলল। তাদের মধ্যে কেউ কলেজে পড়ে, কেউ চাকরির প্রস্তুতি নিচ্ছে, কেউ আবার ছবি আঁকে। সবাই মোবাইলে ভিডিও দেখে, গান শোনে, সিনেমা দেখে; কিন্তু সামনাসামনি দাঁড়িয়ে অভিনয় করার অভিজ্ঞতা খুব কম জনেরই ছিল।
ঐশী তাদের বলল, “আমরা যদি একটা ছোট নাটক করি? খুব বড় কিছু নয়। পাড়ার মানুষকে নিয়ে, আমাদের নিজেদের গল্প নিয়ে।”
বন্ধু অর্ক হেসে বলল, “দর্শক আসবে? মঞ্চই তো বন্ধ!”
“দর্শক আসবে কি না, সেটা পরে ভাবব। আগে আমাদের ঠিক করতে হবে, আমরা সত্যিই কিছু করতে চাই কি না।”
কথাটা সবার মনে দাগ কাটল।
তারা সিদ্ধান্ত নিল, প্রথমে নাট্যমঞ্চের পরিচালন সমিতির সঙ্গে কথা বলবে। ঐশী ও তার বন্ধুরা কয়েক দিন চেষ্টা করার পর সমিতির সম্পাদককে পেল। তাঁরা জানালেন, মঞ্চটি দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় সেখানে মেরামতের প্রয়োজন আছে। বিদ্যুতের সংযোগ, অগ্নিনিরাপত্তা এবং বসার জায়গার অবস্থা পরীক্ষা না করে কোনও অনুষ্ঠান করা সম্ভব নয়।
ঐশীদের উৎসাহ কিছুটা কমে গেল। তাদের হাতে অর্থ ছিল সামান্য, অভিজ্ঞতাও প্রায় নেই।
কিন্তু ঐশী হাল ছাড়ল না।
সে প্রস্তাব দিল, “আমরা নিজেরা মঞ্চ চালানোর দাবি করছি না। অনুমতি নিয়ে প্রথমে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজে সাহায্য করতে পারি। তারপর খরচের হিসাব বুঝে ছোট্ট একটা অনুষ্ঠান করার চেষ্টা করব।”
সমিতির সদস্যরা তাদের আন্তরিকতা দেখে রাজি হলেন। তবে শর্ত দিলেন, সব কাজ নিয়ম মেনে করতে হবে এবং কোনও নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি নেওয়া চলবে না।
ঐশী প্রথমেই নিবারণবাবুর কাছে গেল।
“আপনি আমাদের সাহায্য করবেন?”
বৃদ্ধের চোখে বহুদিন পর আনন্দের ঝিলিক দেখা গেল।
“আমি তো এত দিন এই ডাকটারই অপেক্ষা করছিলাম।”
২. ধুলো সরানোর দিন
পরের রবিবার সকাল থেকে শুরু হলো কাজ। পরিচালন সমিতির অনুমতি নিয়ে কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবক মঞ্চের বাইরে ও ভেতরের ব্যবহারযোগ্য অংশ পরিষ্কার করল। ক্ষতিগ্রস্ত আসবাব আলাদা করা হলো, পুরোনো কাগজপত্র গুছিয়ে রাখা হলো, আর কোথায় কী মেরামত দরকার, তার তালিকা তৈরি হলো।
নিবারণবাবু সবাইকে কাজ বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন।
“ওই কাঠের বাক্সটা ফেলো না। ওর মধ্যে নাটকের পুরোনো সম্পত্তি আছে।”
অর্ক বাক্স খুলে দেখল, কয়েকটি নকল তলোয়ার, কাগজের মুকুট, রঙিন কাপড় এবং হাতে আঁকা কিছু দৃশ্যপটের নমুনা।
সে হেসে বলল, “এগুলো দিয়ে আবার নাটক হবে?”
নিবারণবাবু শান্ত গলায় উত্তর দিলেন, “সব জিনিসের দাম বাজারে পাওয়া যায় না। কিছু জিনিসের মূল্য থাকে তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা স্মৃতিতে। তবে স্মৃতি বাঁচাতে গিয়ে বিপজ্জনক বা নষ্ট জিনিস ব্যবহার করা যাবে না—সেটাও মনে রেখো।”
ঐশী কথাটা খাতায় লিখে নিল।
পরিষ্কারের কাজ শেষ হলে সবাই মিলে সম্ভাব্য খরচের হিসাব করল। বিদ্যুতের কাজের জন্য পেশাদার কর্মী লাগবে, জরুরি মেরামত করতে হবে, আর অনুষ্ঠান হলে দর্শকের নিরাপত্তার জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা রাখতে হবে।
সব মিলিয়ে খরচ তাদের সামর্থ্যের চেয়ে অনেক বেশি।
সেদিন সন্ধ্যায় বন্ধুরা হতাশ হয়ে বসে ছিল।
অর্ক বলল, “আমরা হয়তো বেশি বড় স্বপ্ন দেখে ফেলেছি।”
ঐশী কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “বড় স্বপ্ন দেখাটা ভুল নয়। ভুল হবে যদি আমরা বাস্তবতা না বুঝে এগোই। চল, আগে ছোট করে শুরু করি। যতটা নিরাপদভাবে করা সম্ভব, ততটাই করব।”
নিবারণবাবু মাথা নাড়লেন।
“মঞ্চের পর্দা একবারে ওঠে না, মা। তার আগে অনেক প্রস্তুতি থাকে।”
৩. নেপথ্যের পাঠশালা
পরিচালন সমিতির অনুমতি নিয়ে তাঁরা একটি বিকল্প পরিকল্পনা তৈরি করল। মঞ্চ মেরামতের কাজ চলবে সমিতির তত্ত্বাবধানে। যত দিন মঞ্চ ব্যবহারযোগ্য না হচ্ছে, তত দিন স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের সঙ্গে কথা বলে তাদের অনুমোদিত বহুমুখী কক্ষে নাট্যচর্চার ব্যবস্থা করা হবে।
ঐশী ও তার বন্ধুরা একটি ছোট কর্মশালার আয়োজন করল। নাম দিল—‘নেপথ্যের পাঠশালা’।
প্রথম দিন মাত্র সাতজন এল। কেউ অভিনয় শিখতে চায়, কেউ সংলাপ বলতে, কেউ আবার পর্দা ও মঞ্চসজ্জা সম্পর্কে জানতে চায়।
নিবারণবাবু সবাইকে নিয়ে বসলেন।
তিনি বললেন, “তোমরা ভাবছ, নাটক মানে সংলাপ মুখস্থ করা আর দর্শকের সামনে দাঁড়ানো। কিন্তু একজন অভিনেতা ভুল করলে অন্য অভিনেতা তাকে সামলে নিতে পারে। আলো ঠিক সময়ে না জ্বললে দৃশ্যের আবহ বদলে যায়। পর্দা আটকে গেলে পুরো অনুষ্ঠান থেমে যেতে পারে। তাই নাটক একার কাজ নয়।”
একটি মেয়ে, নাম তার রূপা, জিজ্ঞাসা করল, “তাহলে নেপথ্যের মানুষ কি অভিনেতার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ?”
নিবারণবাবু হেসে বললেন, “না, কাউকে ছোট বা বড় করে দেখার দরকার নেই। একটা ঘড়ির কাঁটা যেমন সময় দেখায়, তেমনই ভেতরের যন্ত্রগুলো তাকে চালায়। একটির কাজ ছাড়া অন্যটির কাজ সম্পূর্ণ হয় না।”
কথাটা সবাই বুঝতে পারল।
কর্মশালায় অভিনয়ের পাশাপাশি তারা শিখল দলগতভাবে কাজ করা, অন্যের কথা মন দিয়ে শোনা, সময় মেনে চলা এবং ভুল হলে দোষারোপ না করে সমাধান খোঁজা।
কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সাতজনের দল বেড়ে দাঁড়াল বাইশে। আশপাশের আরও কয়েকজন অভিভাবক তাঁদের সন্তানদের নিয়ে এলেন।
নিবারণবাবুর মুখে আবার হাসি ফুটল। বহু বছর পরে তিনি তরুণদের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলছিলেন।
একদিন ঐশী তাঁকে বলল, “আপনি তো আমাদের শিক্ষক হয়ে গেলেন।”
বৃদ্ধ মৃদু হেসে উত্তর দিলেন, “শিক্ষক হতে হলে সব উত্তর জানা দরকার হয় না। কখনও কখনও শুধু নিজের ভুলগুলো থেকে শেখা কথাগুলো অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে নিলেই হয়।”
৪. প্রথম নাটকের সংকট
তিন মাসের মধ্যে দলটি একটি ছোট নাটক তৈরি করল। নাটকের নাম ‘অন্য পাশের আলো’। গল্পটি এমন এক পাড়ার, যেখানে প্রত্যেকে নিজের সমস্যায় ব্যস্ত থাকতে গিয়ে পাশের মানুষের কষ্ট দেখতে পায় না। শেষ পর্যন্ত একটি সাধারণ ঘটনা সবাইকে বুঝিয়ে দেয়, একসঙ্গে দাঁড়ানোর গুরুত্ব কতখানি।
পরিচালন সমিতির সহযোগিতায় প্রয়োজনীয় মেরামত সম্পন্ন হওয়ার পর মঞ্চটি নিরাপত্তা যাচাইয়ের মধ্য দিয়ে গেল। অনুমতি ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিশ্চিত হওয়ার পর ঠিক হলো, একটি সন্ধ্যায় সীমিত দর্শক নিয়ে নাটকটি অভিনীত হবে।
ঐশী প্রথমবারের মতো প্রধান চরিত্রে অভিনয় করবে। অর্ক মঞ্চের কাজ সামলাবে। রূপা সংলাপের পাশাপাশি ছোটদের প্রস্তুতিতে সাহায্য করবে।
কিন্তু অনুষ্ঠানের আগের দিন বড় সমস্যা দেখা দিল। নাটকের গুরুত্বপূর্ণ একটি দৃশ্যের জন্য তৈরি করা পটভূমির কাপড় ছিঁড়ে গেল। নতুন কাপড় কেনার মতো অর্থও আর অবশিষ্ট ছিল না।
অর্ক রেগে বলল, “এত দিন ধরে কাজ করলাম, শেষ মুহূর্তে সব নষ্ট হয়ে যাবে!”
ঐশীর চোখেও জল চলে এসেছিল। তার মনে হচ্ছিল, এত পরিশ্রমের পরও হয়তো তারা ব্যর্থ হবে।
নিবারণবাবু ছেঁড়া কাপড়টি হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ পরীক্ষা করলেন। তারপর বললেন, “এটা মেরামত করা সম্ভব কি না, আগে দেখা যাক। আর যদি না হয়, তাহলে দৃশ্যটাকেই বদলাতে হবে।”
“কিন্তু নাটক তো তৈরি হয়ে গেছে!” ঐশী বলল।
“নাটক তৈরি হয়েছে মানুষের কথা বলার জন্য, কাপড়ের পটভূমি দেখানোর জন্য নয়। পটভূমি বদলালে যদি গল্পের কথা আরও ভালোভাবে বলা যায়, তাতেও ক্ষতি কী?”
দলটি নতুন করে ভাবতে বসল। তারা বুঝল, ছেঁড়া কাপড় আড়াল করার বদলে সেটিকে নাটকের গল্পের অংশ করা যায়। নষ্ট হয়ে যাওয়া একটি ঘরের প্রতীক হিসেবে সেই কাপড়ের অসম্পূর্ণ অংশ ব্যবহার করা হলো। বাকি অংশ সাজানো হলো আলো ও সাধারণ উপকরণের সাহায্যে।
সমস্যাটি আর বাধা হয়ে রইল না। বরং দৃশ্যটি আগের চেয়ে বেশি অর্থবহ হয়ে উঠল।
নিবারণবাবু কাউকে বলেননি যে তাঁর পরামর্শই সমস্যার সমাধান করেছে। তিনি শুধু নেপথ্যের জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখলেন, যেন নির্দিষ্ট সময়ে সবকিছু প্রস্তুত থাকে।
৫. পর্দা উঠল
অবশেষে এল সেই সন্ধ্যা।
দর্শকসংখ্যা সীমিত ছিল, তবু আসনগুলো প্রায় পূর্ণ হয়ে গেল। সামনের সারিতে বসেছিলেন কয়েকজন প্রবীণ মানুষ, যাঁরা একসময় এই মঞ্চের নিয়মিত দর্শক ছিলেন। তাঁদের চোখে ছিল পুরোনো দিনের স্মৃতি ফিরে পাওয়ার আনন্দ।
পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে ঐশীর হাত কাঁপছিল।
সে নিবারণবাবুকে বলল, “আমার খুব ভয় করছে। যদি সংলাপ ভুলে যাই?”
বৃদ্ধ তার দিকে তাকিয়ে বললেন, “ভয় করাটা স্বাভাবিক। মনে রেখো, তুমি একা নও। তোমার পাশে তোমার সহঅভিনেতারা আছে। ভুল হলে গল্প থামিয়ে দেবে না, গল্পের ভেতর থেকেই পথ খুঁজে নেবে।”
অর্ক এসে জানাল, সব প্রস্তুত।
নিবারণবাবু শেষবারের মতো মঞ্চের দিকে তাকালেন। তারপর আলো জ্বালানোর সংকেত দিলেন।
পর্দা উঠল।
প্রথম দৃশ্যের সংলাপের সঙ্গে সঙ্গে দর্শক নীরব হয়ে গেল। কোথাও হাসি উঠল, কোথাও দীর্ঘশ্বাস। নাটকের শেষ দৃশ্যে যখন প্রতিবেশীরা একে অন্যের পাশে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিল, তখন দর্শকদের মধ্যে করতালি ছড়িয়ে পড়ল।
নাটক শেষ হওয়ার পর সবাই যখন মঞ্চে এল, ঐশী প্রথমেই নিবারণবাবুকে খুঁজল।
বৃদ্ধ তখন পর্দার দড়ি গুছিয়ে রাখছিলেন।
ঐশী তাঁর হাত ধরে মঞ্চের সামনে নিয়ে এল।
“আপনাকে সবাই দেখুক,” সে বলল।
নিবারণবাবু অপ্রস্তুত হয়ে পড়লেন। এত বছর ধরে তিনি অন্যদের আলোয় তুলে ধরেছেন, নিজে সামনে আসার কথা কখনও ভাবেননি।
দর্শকদের মধ্যে বসে থাকা এক প্রবীণ ব্যক্তি উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “নিবারণ, তোমাকে আবার এই মঞ্চে দেখে ভালো লাগছে। তোমার হাতেই তো একসময় আমাদের নাটকের সব কাজ হতো!”
আরেকজন বললেন, “আজকের নাটকে তোমার শিক্ষার ছাপ রয়েছে।”
নিবারণবাবুর চোখ ভিজে উঠল। তিনি কিছুক্ষণ কথা বলতে পারলেন না।
তারপর ধীরে ধীরে বললেন, “আমি কোনও বড় কাজ করিনি। শুধু চেয়েছিলাম, এই মঞ্চের আলোটা যেন পুরোপুরি নিভে না যায়।”
ঐশী উত্তর দিল, “আলো আপনি জ্বালিয়ে রেখেছিলেন বলেই আমরা আবার পথটা খুঁজে পেয়েছি।”
৬. শেষ নয়, নতুন শুরু
সেই একটি অনুষ্ঠানেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যায়নি। মঞ্চটির রক্ষণাবেক্ষণ দরকার ছিল, নিয়মিত অর্থের ব্যবস্থা করতে হতো, আর দর্শক ফিরিয়ে আনার জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন ছিল।
কিন্তু এবার কাজগুলো একা কারও কাঁধে ছিল না।
পরিচালন সমিতি নির্দিষ্ট সময় অন্তর মঞ্চ পরিদর্শনের ব্যবস্থা করল। তরুণ দলটি নিয়মিত কর্মশালা শুরু করল। স্থানীয় বিদ্যালয়গুলির সঙ্গে আলোচনা করে শিক্ষামূলক নাটকের পরিকল্পনা করা হলো। দর্শকদের পরামর্শ শোনার জন্য একটি খাতা রাখা হলো, যাতে প্রত্যেকে নিজের মতামত জানাতে পারেন।
নিবারণবাবু আর শুধু পুরোনো মঞ্চের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতেন না। এখন তাঁকে প্রায়ই তরুণদের সঙ্গে দেখা যেত। কখনও তিনি মঞ্চসজ্জার কৌশল শেখাচ্ছেন, কখনও ভুল আলো কীভাবে ঠিক করতে হয় তা বোঝাচ্ছেন, আবার কখনও কোনও নতুন সদস্যকে সাহস দিচ্ছেন।
একদিন ঐশী তাঁকে জিজ্ঞাসা করল, “আপনার কি কখনও আফসোস হয় না যে এত বছর কাজ করেও আপনার নাম কেউ জানত না?”
নিবারণবাবু কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, “আগে ভাবতাম, মানুষ আমাকে মনে রাখল কি না, সেটাই বুঝি আমার কাজের মূল্য। এখন বুঝি, আমার শেখানো একটা কাজ যদি আরেকজন ঠিকমতো করতে পারে, আমার অনুপস্থিতিতেও যদি মঞ্চের আলো জ্বলে, তাহলেই আমার কাজ বেঁচে থাকবে।”
ঐশী মৃদু হেসে বলল, “তাহলে আপনি কখনও সত্যিই নেপথ্যে ছিলেন না। আপনি ছিলেন পুরো মঞ্চটার ভিতরে।”
বৃদ্ধ আকাশের দিকে তাকালেন। সন্ধ্যার আলো তখন ধীরে ধীরে ম্লান হচ্ছে। নাট্যমঞ্চের জানালা দিয়ে ভেতরের আলো বাইরে ছড়িয়ে পড়েছে।
তিনি বললেন, “মনে রেখো, জীবনে সবাইকে সামনে দাঁড়াতে হবে না। কেউ সামনে থেকে পথ দেখায়, কেউ পিছন থেকে পথটা তৈরি করে। কিন্তু কাজটা যদি মানুষের উপকারে আসে, তবে কারও অবদানই ছোট নয়।”
সেদিন বাড়ি ফেরার পথে ঐশীর মনে হলো, সে শুধু নাটক শেখেনি। শিখেছে সম্মান দিতে, ধৈর্য ধরতে, সমস্যার মধ্যে নতুন সম্ভাবনা খুঁজতে এবং নিজের সাফল্যের সঙ্গে অন্যের অবদানকেও জায়গা দিতে।
‘রঙ্গশিখা’ আবার জেগে উঠেছিল। শুধু একটি মঞ্চ হিসেবে নয়, এমন একটি জায়গা হিসেবে, যেখানে মানুষ বুঝতে শিখেছিল—করতালি পাওয়াই সব নয়, অন্যের করতালির পিছনে যে অদৃশ্য পরিশ্রম থাকে, তার মূল্যও সমান।
নৈতিক শিক্ষা: কোনও কাজের গুরুত্ব শুধু তার দৃশ্যমান সাফল্য দিয়ে বিচার করা যায় না। নেপথ্যে থাকা মানুষের নিষ্ঠা, অভিজ্ঞতা ও সহযোগিতাই অনেক সময় একটি বড় সাফল্যের ভিত তৈরি করে। তাই কাউকে ছোট করে দেখা উচিত নয়। নিজের দক্ষতা অন্যকে শেখানো এবং সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এগিয়ে যাওয়াই প্রকৃত সাফল্যের পরিচয়।