রাত তখন ১১টা ৪৭ মিনিট।
শিয়ালদহ স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম প্রায় ফাঁকা। সারাদিনের কোলাহল থেমে গিয়ে স্টেশনটাকে অদ্ভুত নিঃসঙ্গ দেখাচ্ছিল। দূরে কোথাও একটা মালগাড়ির ইঞ্জিন থেকে ভেসে আসছিল ভারী শব্দ। চায়ের দোকানগুলো একে একে বন্ধ হয়ে গেছে। শেষ কয়েকজন যাত্রীও যে যার গন্তব্যের দিকে চলে গিয়েছে।
শুধু তিন নম্বর প্ল্যাটফর্মের একটি বেঞ্চে বসে ছিল অরিত্র সেন।
বয়স তিরিশ। পেশায় সাংবাদিক। গত সাত বছর ধরে কলকাতার একটি সংবাদপত্রে অপরাধ ও অনুসন্ধানমূলক খবর নিয়ে কাজ করছে। খুন, নিখোঁজ, প্রতারণা—এমন অসংখ্য ঘটনার খবর সে করেছে। মানুষের ভয়, কান্না আর মিথ্যে কথার আড়ালে লুকিয়ে থাকা সত্য খুঁজে বের করাই তার কাজ।
কিন্তু আজ সে নিজেই এমন একটি ঘটনার সামনে দাঁড়িয়ে, যার কোনো ব্যাখ্যা তার জানা নেই।
তার হাতে একটি পুরোনো চিঠি।
চিঠিটা এসেছে তিন দিন আগে। প্রেরকের নাম নেই। খামের ওপর শুধু তার নাম এবং অফিসের ঠিকানা লেখা ছিল। ভিতরে মাত্র চারটি লাইন।
“অরিত্র,
তোমার বাবা মারা যাননি।
তিনি প্রতি বছর ১৯ অক্টোবর রাত ১১টা ৫৭ মিনিটে শেষ ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করেন।
তুমি যদি সত্যিটা জানতে চাও, তবে আজ রাতে শিয়ালদহ স্টেশনের তিন নম্বর প্ল্যাটফর্মে এসো।
কিন্তু মনে রেখো, ট্রেনে উঠলে ফিরে আসার পথ নাও পেতে পারো।”
চিঠিটি পড়ে প্রথমে অরিত্র হেসেছিল। তার বাবা অরুণাভ সেনের মৃত্যু হয়েছিল পনেরো বছর আগে। তখন অরিত্রর বয়স ছিল পনেরো। উত্তরবঙ্গে একটি সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে তাঁর গাড়ি পাহাড়ি খাদে পড়ে যায়। কয়েক দিন অনুসন্ধানের পর গাড়িটি উদ্ধার হয়েছিল, কিন্তু অরুণাভের দেহ পাওয়া যায়নি।
পুলিশের নথিতে ঘটনাটি দুর্ঘটনা হিসেবে লেখা হয়েছিল। পরিবার তাঁকে মৃত বলেই মেনে নিয়েছিল।
তবে বাবার দেহ কখনও পাওয়া যায়নি—এই সত্যটি অরিত্রর মায়ের মনে সারাজীবন একটি ক্ষত হয়ে ছিল।
তিন বছর আগে মা-ও মারা গেছেন। মৃত্যুর আগে তিনি শুধু একবার বলেছিলেন, “তোর বাবার শেষ যাত্রার কথা কেউ কোনোদিন জানতে চাইলে, তাকে বলিস—সব ট্রেন গন্তব্যে পৌঁছয় না।”
তখন অরিত্র কথাটির অর্থ বুঝতে পারেনি।
আজ সেই কথাই বারবার মনে পড়ছে।
সে মোবাইলের দিকে তাকাল।
রাত ১১টা ৫২ মিনিট।
স্টেশনের ডিজিটাল বোর্ডে কোনো ট্রেনের নাম দেখাচ্ছে না। শেষ লোকাল অনেকক্ষণ আগেই ছেড়ে গেছে। ঘোষণা ব্যবস্থাও নীরব।
অরিত্র উঠে দাঁড়াল।
ঠিক তখনই স্টেশনের পুরোনো মাইক্রোফোনে একটা কর্কশ শব্দ হলো।
তারপর একটি নারীকণ্ঠ ঘোষণা করল—
“যাত্রীদের অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে, শেষ ট্রেনটি তিন নম্বর প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ করতে চলেছে। এই ট্রেনের যাত্রীদের অনুরোধ করা হচ্ছে, তাঁরা যেন নিজেদের পরিচয়পত্র প্রস্তুত রাখেন।”
অরিত্র অবাক হয়ে চারদিকে তাকাল।
শেষ ট্রেন?
কোনো সময়সূচিতে তো এমন ট্রেনের উল্লেখ নেই!
সে দ্রুত স্টেশন মাস্টারের ঘরের দিকে এগিয়ে গেল। দরজা খোলা। ভিতরে একটি টেবিল, পুরোনো রেজিস্টার আর দেওয়ালে ঝোলানো ঘড়ি। ঘড়ির কাঁটা থেমে আছে রাত ১১টা ৫৭ মিনিটে।
টেবিলের সামনে বসে ছিলেন সাদা চুলের এক বৃদ্ধ।
অরিত্র বলল, “মাফ করবেন, এখানে কি কোনো ট্রেন আসার কথা আছে?”
বৃদ্ধ মাথা তুললেন।
তাঁর চোখ দুটো অস্বাভাবিক শান্ত।
“আপনি কি অরিত্র সেন?”
অরিত্রর বুকের ভিতরটা ধক করে উঠল।
“আপনি আমার নাম জানলেন কীভাবে?”
“আপনার আসার কথা ছিল।”
“কোন ট্রেন আসছে?”
বৃদ্ধ উত্তর না দিয়ে টেবিলের ড্রয়ার খুললেন। সেখান থেকে একটি পুরোনো টিকিট বের করে অরিত্রর হাতে দিলেন।
টিকিটে কোনো গন্তব্যের নাম নেই। শুধু লেখা—
যাত্রা: ১৯ অক্টোবর, রাত ১১টা ৫৭ মিনিট।
যাত্রীর নাম: অরিত্র সেন।
অরিত্র টিকিটটা উল্টেপাল্টে দেখল।
“এটা কে তৈরি করেছে?”
বৃদ্ধ ধীরে ধীরে বললেন, “যে মানুষটার জন্য আপনি পনেরো বছর অপেক্ষা করেছেন।”
“আমার বাবা?”
বৃদ্ধ চুপ করে রইলেন।
অরিত্র টেবিলে হাত রেখে ঝুঁকে পড়ল।
“আপনি জানেন আমার বাবার কী হয়েছিল?”
বৃদ্ধ এবার তার চোখের দিকে তাকালেন।
“আমি শুধু জানি, আপনার বাবা এই স্টেশন থেকে একটি ট্রেনে উঠেছিলেন। সেই ট্রেনের যাত্রীরা কেউ আর আগের জীবনে ফিরে আসেননি।”
“কী বলতে চাইছেন?”
“কিছু ট্রেন সময়ের মধ্যে দিয়ে চলে না। চলে মানুষের স্মৃতির মধ্যে দিয়ে। সেই ট্রেনে যে ওঠে, সে নিজের জীবনের এমন একটি মুহূর্তের সামনে দাঁড়ায়, যেটাকে সে সবচেয়ে বেশি বদলাতে চায়।”
অরিত্র তিক্ত হেসে উঠল।
“আপনি আমাকে একটা ভূতের গল্প শোনাচ্ছেন?”
“আপনি সাংবাদিক। বিশ্বাস করা আপনার কাজ নয়। প্রমাণ খুঁজে বের করাই আপনার কাজ। তাই না?”
বৃদ্ধের কথায় অরিত্র থমকে গেল।
লোকটি ঠিকই বলেছে।
“আপনি কে?”
বৃদ্ধ নিজের বুকপকেট থেকে একটি পরিচয়পত্র বের করলেন। পরিচয়পত্রটি এত পুরোনো যে অক্ষরগুলো প্রায় মুছে গেছে। তবু নামটি পড়া গেল—শশাঙ্ক মুখোপাধ্যায়। পদবি—স্টেশন মাস্টার।
অরিত্র ভ্রু কুঁচকে বলল, “কিন্তু বর্তমান স্টেশন মাস্টারের নাম তো অন্য।”
“আমি বর্তমান স্টেশন মাস্টার নই।”
“তাহলে?”
বৃদ্ধ জানালার বাইরে তাকালেন।
“পঁচিশ বছর আগে এই প্ল্যাটফর্মেই আমার মেয়ে নিখোঁজ হয়েছিল। তার বয়স ছিল মাত্র বারো। একদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে সে এই স্টেশনে এসেছিল। তারপর আর কোনোদিন বাড়ি ফেরেনি। পুলিশ খুঁজেছে, সংবাদপত্রে খবর বেরিয়েছে, কিন্তু তার কোনো সন্ধান মেলেনি।”
তিনি একটু থামলেন।
“পাঁচ বছর পরে এক রাতে আমি এই ট্রেনের শব্দ শুনেছিলাম। প্ল্যাটফর্মে এসে দেখলাম, আমার মেয়ে জানালার পাশে বসে আছে। সে আমাকে দেখে বলল, বাবা, তুমি এত দেরি করলে কেন?”
অরিত্রর গলা শুকিয়ে গেল।
“আপনি ট্রেনে ওঠেননি?”
“উঠেছিলাম।”
“তারপর?”
বৃদ্ধের চোখে এবার প্রথমবারের মতো ভয়ের ছায়া দেখা গেল।
“ট্রেনের ভিতরে আমার মেয়েকে পেয়েছিলাম ঠিকই। কিন্তু সে আর শিশু ছিল না। তার বয়স তখনও বারো, অথচ তার চোখে ছিল এমন এক ক্লান্তি, যেন সে শত শত বছর ধরে অপেক্ষা করছে। সে আমার হাত ধরে বলেছিল, ‘বাবা, তুমি আমাকে নিতে এসেছ, নাকি আমাকে আবার একা ফেলে যেতে?’”
অরিত্র নিঃশ্বাস বন্ধ করে শুনছিল।
“আমি তাকে নিয়ে নামতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ট্রেন থামেনি। জানালার বাইরে একই স্টেশন বারবার ফিরে আসছিল। একই আলো, একই সিগন্যাল, একই প্ল্যাটফর্ম। শেষ পর্যন্ত ট্রেন থেকে নেমেছিলাম একা।”
“আপনার মেয়ে?”
বৃদ্ধ মাথা নাড়লেন।
“সেই রাতের পর আর তাকে দেখিনি। কিন্তু প্রতি বছর ১৯ অক্টোবর ট্রেনটি আসে। আর আমি অপেক্ষা করি।”
অরিত্রর মনে হলো, ঘরটা যেন ক্রমশ ছোট হয়ে আসছে।
“আপনি এতদিন এই কথা কাউকে বলেননি কেন?”
“বলেছিলাম। কেউ বিশ্বাস করেনি। তারপর বুঝলাম, এই ট্রেনের কথা সবাইকে জানানো যায় না। যাদের কেউ নিখোঁজ হয়েছে, যাদের মনে কোনো অসমাপ্ত প্রশ্ন আছে, শুধু তারাই এর ডাক শুনতে পায়।”
দূরে একটা শিস শোনা গেল।
অরিত্র জানালার দিকে তাকাল।
স্টেশনের আলো একে একে নিভে যাচ্ছে।
শশাঙ্কবাবু উঠে দাঁড়ালেন।
“সময় হয়ে গেছে।”
রাত ১১টা ৫৭ মিনিট।
তিন নম্বর প্ল্যাটফর্মের অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে ট্রেনটি এসে দাঁড়াল।
কোনো ইঞ্জিনের শব্দ নেই। চাকার ঘর্ষণ নেই। যেন অন্ধকারের বুক চিরে একটি বিশাল কালো ছায়া এসে থেমেছে।
ট্রেনের গায়ে কোনো নাম লেখা নেই। প্রতিটি কামরার জানালায় ঘন কালো পর্দা। দরজার ওপরে ছোট ছোট সাদা অক্ষরে লেখা—
শেষ যাত্রা।
অরিত্রর হাতের টিকিটটি হঠাৎ গরম হয়ে উঠল।
সে নিচে তাকিয়ে দেখল, টিকিটের পিছনে নতুন একটি বাক্য ফুটে উঠেছে।
“যে সত্য জানতে চায়, তাকে প্রথমে নিজের মিথ্যেটির মুখোমুখি হতে হয়।”
অরিত্রর মনে পড়ল, বাবার মৃত্যুর পর সে একদিন মাকে বলেছিল, বাবার মতো মানুষ কখনও পরিবার ছেড়ে পালিয়ে যেতে পারেন না। কিন্তু তার মনে তখন একটি সন্দেহও ছিল—বাবা কি সত্যিই দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছিলেন, নাকি কোনো কারণে পরিবার ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন?
সে কখনও মাকে সেই সন্দেহের কথা বলেনি।
আজ কি সেই মিথ্যেটির মুখোমুখি হতে হবে?
ট্রেনের একটি দরজা নিজে থেকেই খুলে গেল।
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল কালো পোশাক পরা এক টিকিট পরীক্ষক। তার মুখ দেখা যাচ্ছে না। মাথায় পুরোনো দিনের টুপি।
সে হাত বাড়িয়ে বলল, “টিকিট।”
অরিত্র টিকিট এগিয়ে দিল।
লোকটি টিকিটের নাম পড়ল। তারপর ধীরে ধীরে মাথা তুলল।
“অরিত্র সেন। আপনি একা যাচ্ছেন?”
“হ্যাঁ।”
“নিশ্চিত?”
অরিত্র কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “হ্যাঁ।”
টিকিট পরীক্ষক সরে দাঁড়াল।
“তাহলে উঠে পড়ুন। তবে মনে রাখবেন, এই ট্রেন থেকে নামার আগে আপনাকে তিনটি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। প্রথম প্রশ্নের উত্তর আপনি জানেন না। দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর আপনি দিতে চান না। আর তৃতীয় প্রশ্নের উত্তর জানলে আপনি আর আগের মানুষ থাকবেন না।”
অরিত্র বলল, “প্রশ্নগুলো কী?”
টিকিট পরীক্ষক তার দিকে তাকিয়ে বলল, “ট্রেন চলতে শুরু করলে প্রথম প্রশ্নটি নিজেই আপনার সামনে আসবে।”
অরিত্র কামরায় পা রাখল।
দরজা বন্ধ হয়ে গেল।
ভিতরে ঢুকেই সে বুঝতে পারল, এই ট্রেন কোনো সাধারণ ট্রেন নয়।
কামরার ভিতরে পুরোনো কাঠের আসন। ছাদে হলুদ আলো। জানালার কাচে বাইরের কোনো দৃশ্য দেখা যাচ্ছে না। অথচ প্রত্যেকটি আসনে যাত্রী বসে আছে।
কেউ বৃদ্ধ, কেউ যুবক, কেউ শিশু। সবার পরনে আলাদা সময়ের পোশাক। কারও হাতে পুরোনো সুটকেস, কারও কোলে খেলনা, কারও চোখে অদ্ভুত শূন্যতা।
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, প্রত্যেক যাত্রীর সামনে একটি করে সাদা খাম রাখা।
অরিত্র নিজের আসনে বসতেই তার সামনের খামটি খুলে গেল।
ভিতরে একটি ছবি।
ছবিতে তার বাবা অরুণাভ সেন দাঁড়িয়ে আছেন একটি পাহাড়ি স্টেশনের সামনে। পাশে এক অচেনা মহিলা। মহিলার কোলে একটি ছোট্ট শিশু।
ছবির পিছনে লেখা—
“১৯ অক্টোবর, ২০১১। যে রাতে তোমার বাবা হারিয়ে গিয়েছিলেন, সেদিন তিনি একা ছিলেন না।”
অরিত্রর হাত কেঁপে উঠল।
২০১১ সালেই তার বাবার দুর্ঘটনা ঘটেছিল।
সে ছবিটি আরও ভালো করে দেখল। বাবার মুখে হাসি নেই। চোখে এমন এক আতঙ্ক, যা অরিত্র আগে কখনও দেখেনি। পাশে দাঁড়ানো মহিলাটি ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে আছেন, কিন্তু তাঁর চোখের দৃষ্টি যেন অরিত্রর ভিতরটা ভেদ করে যাচ্ছে।
আর শিশুটির মুখ—
শিশুটির মুখ অবিকল অরিত্রর ছোটবেলার মতো।
হঠাৎ ট্রেনটি ঝাঁকুনি দিয়ে চলতে শুরু করল।
কামরার সমস্ত আলো নিভে গেল।
অন্ধকারের মধ্যে একটি শিশুর কান্না শোনা গেল।
তারপর একটি পুরুষকণ্ঠ বলল—
“অরিত্র, তুমি এসেছ?”
এই কণ্ঠস্বর অরিত্র চেনে।
এ কণ্ঠস্বর তার বাবার।
সে উঠে দাঁড়িয়ে চিৎকার করল, “বাবা! আপনি কোথায়?”
অন্ধকারের মধ্যে উত্তর এল—
“আমি ঠিক তোমার সামনেই আছি।”
আলো ফিরে এল।
অরিত্র দেখল, তার বিপরীত আসনে একজন মানুষ বসে আছেন। ধূসর চুল, ক্লান্ত মুখ, চোখের কোণে গভীর রেখা। পরনে পুরোনো নীল শার্ট।
পনেরো বছর আগের ছবিতে যে মানুষটিকে সে দেখেছিল, তাঁর সঙ্গে এই মানুষটির কোনো পার্থক্য নেই।
অরিত্রর ঠোঁট কাঁপতে লাগল।
“বাবা?”
লোকটি মৃদু হাসলেন।
“অনেক বড় হয়ে গেছিস, অরি।”
এই ডাকটি পৃথিবীতে আর কেউ ব্যবহার করত না। শুধু তার বাবা তাকে এই নামে ডাকতেন।
অরিত্র ছুটে গিয়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরতে চাইল। কিন্তু মাঝখানে যেন অদৃশ্য কাচের দেওয়াল। তার হাত বাবার শরীরের কাছে গিয়েও পৌঁছল না।
অরুণাভ ধীরে ধীরে মাথা নাড়লেন।
“এখনও নয়, বাবা। তুই এখনও জানিস না, আমি কেন ফিরে আসিনি।”
“আপনি কোথায় ছিলেন এতদিন? মা প্রতিদিন আপনার জন্য অপেক্ষা করেছেন! মৃত্যুর আগেও আপনার কথা বলেছেন!”
অরুণাভের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
“আমি জানি।”
“তাহলে আপনি ফিরে এলেন না কেন?”
“কারণ আমি ফিরে এলে তোর মায়ের মৃত্যু হতো।”
অরিত্র স্তব্ধ হয়ে গেল।
“কী বলছেন আপনি?”
অরুণাভ উত্তর দেওয়ার আগেই কামরার অন্য প্রান্তে বসে থাকা এক বৃদ্ধা উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর হাতে একটি ছোট্ট পুতুল।
তিনি অরিত্রর দিকে তাকিয়ে বললেন, “তোমার বাবা মিথ্যে বলছেন।”
অরুণাভ চিৎকার করে উঠলেন, “চুপ করুন!”
কিন্তু বৃদ্ধা থামলেন না।
“তোমার বাবাই তোমার মাকে এই ট্রেনে তুলে দিয়েছিলেন। আর সেই রাতে যে দুর্ঘটনার কথা সবাই জানে, সেটি কোনো দুর্ঘটনা ছিল না।”
অরিত্রর মাথার ভিতর যেন বজ্রপাত হলো।
সে বাবার দিকে তাকাল।
“এটা কি সত্যি?”
অরুণাভ চোখ নামিয়ে নিলেন।
কয়েক সেকেন্ডের নীরবতা।
তারপর তিনি বললেন, “হ্যাঁ।”
অরিত্র পিছিয়ে গেল।
“আপনি মাকে এই ট্রেনে তুলেছিলেন?”
“আমি চেষ্টা করেছিলাম তাঁকে বাঁচাতে।”
“কিসের থেকে?”
অরুণাভ ঠোঁট খুললেন। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে ট্রেনের সমস্ত জানালায় একসঙ্গে আলো জ্বলে উঠল।
প্রতিটি জানালার ওপারে দেখা গেল একটি করে বাড়ি।
কোথাও একটি শিশু কাঁদছে। কোথাও একজন নারী দরজা খুলে অপেক্ষা করছেন। কোথাও হাসপাতালের বিছানায় একজন বৃদ্ধ মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন।
আর একটি জানালার ওপারে—
অরিত্র নিজের বাড়ি দেখতে পেল।
সেই বাড়ি, যেখানে তার মা মৃত্যুর আগে শেষ কয়েকটি দিন কাটিয়েছিলেন।
জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন তার মা। হাতে একটি পুরোনো চিঠি। মুখে অদ্ভুত আতঙ্ক।
তিনি সরাসরি অরিত্রর দিকে তাকিয়ে বললেন—
“অরি, ওর কথা বিশ্বাস করিস না। তোর বাবা যে মানুষ, তিনি পনেরো বছর আগেই মারা গেছেন।”
অরিত্রর বুকের ভিতর সবকিছু থেমে গেল।
তার সামনে বসে থাকা অরুণাভের মুখ মুহূর্তে ফ্যাকাশে হয়ে উঠল।
বৃদ্ধা আবার বললেন—
“এই ট্রেনে যে মানুষটি বসে আছে, সে তোর বাবা নয়।”
ট্রেনের আলো আবার নিভে গেল।
অন্ধকারের মধ্যে অরিত্র অনুভব করল, কেউ তার কাঁধে হাত রেখেছে।
একটি পরিচিত কণ্ঠস্বর তার কানের কাছে ফিসফিস করে বলল—
“আমার দিকে তাকাস না, অরি। ওরা তোকে দেখে ফেলেছে।”
তারপরই ট্রেনের ভিতরে সাইরেন বেজে উঠল।
আর লাল আলোয় ভেসে উঠল একটি ঘোষণা—
“প্রথম যাত্রীর পরিচয় ভুল প্রমাণিত হয়েছে। পরবর্তী স্টেশনে একজন যাত্রীকে নামতেই হবে।”
অরিত্র বুঝতে পারল, এই যাত্রা শুরু হওয়ার আগেই তার জীবনের সবচেয়ে বড় সত্যটি মিথ্যে হয়ে গেছে।
কিন্তু সবচেয়ে ভয়ংকর প্রশ্নটি তখনও বাকি—
যদি সামনে বসে থাকা মানুষটি তার বাবা না হন, তাহলে পনেরো বছর ধরে সে কাকে খুঁজছে?
চলবে…