ঘরের সমস্ত আলো নিভে যাওয়ার পর কয়েক মুহূর্তের জন্য ঋত্বিক কিছুই দেখতে পেল না। শুধু শুনতে পেল, তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মহিলার শ্বাসের শব্দ। সেই শ্বাসে অদ্ভুত এক পরিচিত গন্ধ—শিউলি ফুল, পুরোনো কাঠের আলমারি আর মায়ের আঁচলের মতো।
কিন্তু তার মা তো তিন দিন আগেই মারা গেছেন।
নিজের চোখে মায়ের নিথর শরীর দেখেছে সে। নিজের হাতে মুখাগ্নি করেছে। তাহলে এই মহিলা কে?
অন্ধকারের মধ্যে মহিলাটি আবার বললেন, “ঋত্বিক, ভয় পাস না। আমি তোকে নিতে এসেছি।”
ঋত্বিক কাঁপা গলায় বলল, “আপনি আমার মা নন। আমার মা মৃণালিনী সেন। তাঁকে আমি নিজের হাতে চিতায় তুলেছি।”
মহিলাটি কিছুক্ষণ নীরব থাকলেন। তারপর ধীরে ধীরে বললেন, “মৃণালিনী তোকে বড় করেছে। তোকে ভালোবেসেছে। তোর জন্য নিজের জীবনটাও দিয়েছে। কিন্তু জন্ম দেওয়া আর জীবন দেওয়া এক জিনিস নয়, বাবা।”
“আপনি কে?”
“আমি তোর জন্মদাত্রী।”
কথাটা শুনে ঋত্বিকের বুকের ভেতর যেন কেউ একটা পাথর ছুড়ে মারল।
ঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা দ্বিতীয় ঋত্বিক চিৎকার করে উঠল, “মিথ্যে! এ বাড়িতে সবাই মিথ্যে বলে। মা বলেছে আমি তার সন্তান। এখন এই মহিলা বলছেন উনি আমার মা। তাহলে আমি কে?”
মহিলাটি তার দিকে তাকালেন। চোখে কোনো ভয় নেই, কোনো বিস্ময়ও নেই। শুধু এমন এক গভীর দুঃখ, যেন বহু বছর ধরে তিনি একই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে চলেছেন।
“তুমিও আমার সন্তান,” তিনি বললেন।
“দুজনেই?”
“হ্যাঁ। দুজনেই।”
দ্বিতীয় ঋত্বিক পিছিয়ে গেল। তার মুখে অবিশ্বাসের ছায়া।
“একই মায়ের দুটো সন্তান, অথচ আমাদের জন্মের সময় আলাদা। একজনের জন্ম ১৯৮৭ সালে, অন্যজনের ১৯৯৯ সালে। এটা কীভাবে সম্ভব?”
মহিলাটি উত্তর দিলেন না। তিনি ঘরের মাঝখানে রাখা পুরোনো টেবিলের দিকে এগিয়ে গেলেন। টেবিলের ওপর তখনও অমিয়েশ চৌধুরীর শেষ চিঠিটি পড়ে ছিল। তিনি চিঠিটি হাতে তুলে নিয়ে এমনভাবে ছুঁলেন, যেন বহুদিন পর প্রিয় কারও হাত স্পর্শ করছেন।
“অমিয়েশ আমাকে কথা দিয়েছিল, একদিন সব সত্যি প্রকাশ করবে। কিন্তু সে পারেনি। কারণ সত্যিটা প্রকাশ করার আগেই সে নিজের তৈরি সময়ের ফাঁদে আটকে পড়েছিল।”
ঋত্বিকের মনে পড়ল, সেই বৃদ্ধ মানুষটির কথা—অমিয়েশের বন্ধু, যিনি বলেছিলেন, দুজনের মধ্যে একজনকে নিজের সবচেয়ে প্রিয় স্মৃতি ত্যাগ করতে হবে।
কিন্তু সেই বৃদ্ধ কোথায়?
ঘরের দরজার পাশে যে মানুষটি দাঁড়িয়ে ছিলেন, তিনি হঠাৎ সামনে এলেন। আশ্চর্যের বিষয়, অন্ধকারের মধ্যেও তাঁর মুখ এখন স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।
ঋত্বিক চমকে উঠল।
“আপনি! আপনি তো বলেছিলেন আপনি অমিয়েশের বন্ধু!”
বৃদ্ধ মৃদু হাসলেন।
“আমি অমিয়েশের বন্ধু ছিলাম। আবার তার তৈরি করা পরীক্ষার শেষ সাক্ষীও। কিন্তু এতক্ষণ তোকে একটা কথা বলিনি।”
“কী কথা?”
“অমিয়েশ এই বাড়িতে একা কোনো পরীক্ষা করেনি। তার সঙ্গে ছিল আরেকজন বিজ্ঞানী। একজন নারী।”
বৃদ্ধ মহিলাটির দিকে তাকালেন।
“এই সেই নারী।”
ঋত্বিকের পা যেন মাটিতে আটকে গেল।
“আপনি বলতে চাইছেন… আমার জন্মদাত্রী একজন বিজ্ঞানী?”
মহিলাটি মাথা নাড়লেন।
“আমার নাম ছিল অনুরাধা রায়। অমিয়েশের সঙ্গে আমি সময়, স্মৃতি আর মানুষের চেতনা নিয়ে গবেষণা করতাম। আমাদের বিশ্বাস ছিল, সময়ের মধ্যে এমন কিছু স্তর রয়েছে, যেখানে হারিয়ে যাওয়া স্মৃতির ছাপ থেকে যায়। যদি সেই ছাপকে সঠিকভাবে জাগিয়ে তোলা যায়, তবে অতীতের কোনো মুহূর্তকে বর্তমানের সামনে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।”
“মানুষকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব?”
“আমরা ভেবেছিলাম সম্ভব।”
অনুরাধা চোখ নামিয়ে নিলেন।
“১৯৮৭ সালের ১৮ অক্টোবর আমার একটি সন্তান জন্মেছিল। তার নাম রেখেছিলাম ঋত্বিক। কিন্তু জন্মের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সে মারা যায়। চিকিৎসকেরা বলেছিলেন, তাকে আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। আমি বিশ্বাস করতে পারিনি। একজন মা কীভাবে মেনে নেবে যে তার সন্তান পৃথিবীতে এসেই চলে গেল?”
ঘরের বাতাস ভারী হয়ে উঠল।
“অমিয়েশ আমাকে থামতে বলেছিল। সে জানত, মৃত মানুষের স্মৃতি ফিরিয়ে আনা আর মৃত মানুষকে ফিরিয়ে আনা এক নয়। কিন্তু আমি তখন শুধু আমার সন্তানকে ফিরে পেতে চেয়েছিলাম।”
“তারপর?” ঋত্বিক ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল।
“তারপর আমরা শিউলিবাড়ির ভূগর্ভস্থ ঘরে পরীক্ষাটি শুরু করি। আমার সন্তানের জন্মের মুহূর্তের সমস্ত স্মৃতি, তার হৃদস্পন্দনের রেকর্ড, তার শরীর থেকে পাওয়া সামান্য জৈব নমুনা—সবকিছু ব্যবহার করা হয়েছিল। অমিয়েশ এমন একটি যন্ত্র তৈরি করেছিল, যা সময়ের দুটি কাছাকাছি অবস্থার মধ্যে সংযোগ তৈরি করতে পারত।”
বৃদ্ধ বললেন, “কিন্তু যন্ত্রটি সময়ের দরজা খুলেছিল ঠিকই, তার ওপার থেকে কী আসবে, তা কেউ জানত না।”
অনুরাধা আবার বলতে শুরু করলেন।
“প্রথম পরীক্ষায় আমরা কিছুই পাইনি। দ্বিতীয় পরীক্ষায় ঘরের সব ঘড়ি একই সময়ে থেমে যায়। তৃতীয় পরীক্ষার রাতে অমিয়েশ দেখল, ঘরের মাঝখানে একটি শিশু শুয়ে আছে। শিশুটি জীবিত। তার শরীরে কোনো ক্ষত নেই। তার হৃদস্পন্দন স্বাভাবিক।”
“সেই শিশুটি কি আমি?” ঋত্বিক প্রশ্ন করল।
অনুরাধা তার দিকে তাকালেন।
“তুই সেই শিশুটিরই এক রূপ। কিন্তু পুরো সত্যিটা আরও ভয়ংকর।”
দ্বিতীয় ঋত্বিক এতক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়েছিল। এবার সে এগিয়ে এল।
“তাহলে আমি কী? আমি কি নকল?”
“না,” অনুরাধা বললেন, “তুমি নকল নও।”
তিনি টেবিলের ওপর রাখা ছবিটি তুলে ধরলেন। ছবিতে দুটি শিশুর ছায়া দেখা যাচ্ছিল, যদিও ছবির তারিখ ছিল ১৮ অক্টোবর, ১৯৮৭।
“পরীক্ষার সময় আমরা ভেবেছিলাম, অতীতের একটি মুহূর্তকে বর্তমানের সঙ্গে যুক্ত করছি। কিন্তু আসলে আমরা দুটি সম্ভাব্য সময়রেখার সংযোগ ঘটিয়েছিলাম। একটিতে আমার সন্তান জন্মের পর মারা গিয়েছিল। অন্যটিতে সে বেঁচে গিয়েছিল। সেই দুটি সময়রেখার মাঝখানে তৈরি হয়েছিল একটি ফাটল।”
“আর সেই ফাটল দিয়ে দুজনেই এখানে চলে এসেছিলাম?” প্রথম ঋত্বিক জিজ্ঞেস করল।
“হ্যাঁ। একজন এসেছিল সেই সময়রেখা থেকে, যেখানে তুই ১৯৮৭ সালে জন্মেছিলি। আর অন্যজন এসেছিল সেই সময়রেখা থেকে, যেখানে তোর জন্মের স্মৃতি বারো বছর পরে আবার নতুন করে গড়ে উঠেছিল।”
ঋত্বিক মাথা চেপে ধরল।
“তাহলে আমার জন্মের নথিতে ১৯৯৯ সাল লেখা কেন?”
অনুরাধা বললেন, “কারণ মৃণালিনী তোকে ১৯৯৯ সালে নিজের সন্তান হিসেবে পৃথিবীর সামনে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। সে জানত, তুই কোথা থেকে এসেছিস। কিন্তু তোর অতীতের সমস্ত স্মৃতি মুছে দেওয়া হয়েছিল। তোর নতুন পরিচয়, নতুন জন্মতারিখ, নতুন পরিবার—সবই তৈরি করা হয়েছিল তোকে স্বাভাবিক জীবন দেওয়ার জন্য।”
“মৃণালিনী কেন আমাকে নিজের সন্তান বলে পরিচয় দিল?”
“কারণ সে আমাকে কথা দিয়েছিল, তোর জীবনে আর কোনো পরীক্ষা হবে না। তুই মানুষ হয়ে বড় হবি। কোনো বিজ্ঞানীর গবেষণার বিষয় হয়ে নয়।”
ঋত্বিকের চোখে জল এসে গেল।
তার মনে পড়ল মৃণালিনীর সেই সমস্ত ছোট ছোট মুহূর্ত—জ্বর হলে সারারাত মাথায় জলপট্টি দেওয়া, পরীক্ষার আগে দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করা, প্রথমবার আদালতে কাজ পেয়ে বাড়ি ফেরার দিন নিজের হাতে পায়েস রান্না করা।
সেই ভালোবাসা কি মিথ্যে ছিল?
অনুরাধা যেন তার মনের কথা বুঝতে পারলেন।
“না, বাবা। মৃণালিনীর ভালোবাসা মিথ্যে ছিল না। সে তোকে জন্ম দেয়নি, কিন্তু তোকে মানুষ করেছে। তোর প্রতিটি অসুখে কেঁদেছে, প্রতিটি সাফল্যে আনন্দ পেয়েছে। তোর জন্য সে যে ত্যাগ করেছে, তা কোনো জন্মদাত্রীও সবসময় করতে পারে না।”
ঋত্বিক আর নিজেকে সামলাতে পারল না।
“তাহলে মা আমাকে সত্যিটা বলল না কেন?”
বৃদ্ধ উত্তর দিলেন, “কারণ সত্যিটা জানলে তুই আবার এই বাড়িতে ফিরে আসতিস। আর শিউলিবাড়ির দরজা একবার খুললে সেটি সহজে বন্ধ হয় না।”
দ্বিতীয় ঋত্বিক হঠাৎ চিৎকার করে উঠল, “কিন্তু আমার কী হবে? আমি তো ১৯৮৭ সালের সেই সময়রেখা থেকে এসেছি। আমার জীবন কে ফিরিয়ে দেবে? আমি কেন অন্ধকার ঘরে আটকে থাকব?”
অনুরাধা তার দিকে এগিয়ে গেলেন।
“তোর জীবন কেউ কেড়ে নেয়নি। তুইও আমার সন্তান। কিন্তু তোর শরীরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে সেই সময়রেখার স্মৃতি, যেটা ইতিমধ্যে ভেঙে পড়েছে। এই বাড়ির বাইরে গেলে তোর অস্তিত্ব ধীরে ধীরে মুছে যাবে।”
“তাহলে আমাকে বাঁচানোর উপায় নেই?”
“আছে,” বৃদ্ধ বললেন। “কিন্তু তার জন্য দরজাটি বন্ধ করতে হবে।”
তিনি ঘরের শেষ প্রান্তের দিকে ইশারা করলেন।
সেখানে এতক্ষণ একটি পুরোনো কাঠের দরজা ছিল। দরজার গায়ে ধীরে ধীরে অক্ষর ফুটে উঠছিল।
অমিয়েশ চৌধুরী।
ঋত্বিকের মনে পড়ল চিঠির কথা—যে নিজের সবচেয়ে প্রিয় স্মৃতি ত্যাগ করতে পারবে, সেই শেষ দরজা খুলতে পারবে।
“স্মৃতির সঙ্গে এই দরজার সম্পর্ক কী?” সে জানতে চাইল।
বৃদ্ধ বললেন, “সময়কে বাঁধা যায় না, কিন্তু স্মৃতির সঙ্গে তার যোগ রয়েছে। অমিয়েশ বুঝেছিল, দুটি সময়রেখাকে আলাদা করতে হলে সেই স্মৃতিকে মুক্ত করতে হবে, যার জন্য পুরো পরীক্ষা শুরু হয়েছিল। অর্থাৎ, অনুরাধার মৃত সন্তানকে ফিরিয়ে আনার আকাঙ্ক্ষা।”
“তাহলে মাকে তাঁর সন্তানকে ভুলে যেতে হবে?”
“শুধু ভুলে যাওয়া নয়। তাঁকে মেনে নিতে হবে যে অতীতকে ফিরিয়ে আনা যায় না। মৃতকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করতে গিয়ে আমরা জীবিতদের জীবন বিপন্ন করেছি।”
অনুরাধা দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন।
“আমি প্রস্তুত।”
কিন্তু দরজাটি খুলল না।
বৃদ্ধ মাথা নাড়লেন।
“এত সহজ নয়। তোমার স্মৃতি এই দরজার সঙ্গে বাঁধা। কিন্তু দরজাটি বন্ধ করতে হলে সেই মানুষটিকে এগিয়ে আসতে হবে, যার বর্তমান জীবন এই পরীক্ষার ফল।”
সব চোখ ঘুরে গেল ঋত্বিকের দিকে।
সে ধীরে ধীরে বলল, “আমাকে কী করতে হবে?”
“তোর সবচেয়ে প্রিয় স্মৃতিটি ত্যাগ করতে হবে।”
ঋত্বিক চোখ বন্ধ করল।
তার সামনে ভেসে উঠল একটি দৃশ্য—বৃষ্টির রাত। ছোট্ট ঋত্বিকের জ্বর। মৃণালিনী তার বিছানার পাশে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। বাইরে বজ্রপাত হচ্ছে। সে ভয়ে মায়ের হাত শক্ত করে ধরে বলছে, “মা, তুমি কোথাও যাবে না তো?”
মৃণালিনী হেসে বলেছিলেন, “আমি কোথাও যাব না, বাবা। তুই ঘুমিয়ে পড়। আমি এখানেই আছি।”
স্মৃতিটি তার জীবনের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়।
ঋত্বিক বুঝতে পারল, এই স্মৃতিটিই যদি হারিয়ে যায়, তবে তার শৈশবের সমস্ত পরিচিত পৃথিবী ভেঙে পড়বে।
“আমি যদি এই স্মৃতিটা ত্যাগ করি, তাহলে কি আমি মাকে ভুলে যাব?”
বৃদ্ধ বললেন, “স্মৃতির ছবিটি মুছে যাবে। কিন্তু ভালোবাসা কোথায় থাকে, তা আমরা কেউ জানি না।”
ঋত্বিক দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
তারপর সে দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
“আমি রাজি।”
দ্বিতীয় ঋত্বিক তার হাত চেপে ধরল।
“না! তুই বুঝতে পারছিস না। তোর এই স্মৃতিটাই তোকে মানুষ করেছে। এটা হারালে তুই আর আগের মতো থাকবি না।”
ঋত্বিক তার দিকে তাকাল।
“আমরা কেউই আর আগের মতো নেই। কিন্তু যদি এই দরজা বন্ধ না হয়, তাহলে আমাদের দুজনের জীবনই এই বাড়ির মধ্যে আটকে থাকবে। আমি অন্তত এমন একটা পৃথিবী চাই, যেখানে আর কাউকে নিজের জন্মের সত্যি জানার জন্য মরতে হবে না।”
সে দরজায় হাত রাখল।
মুহূর্তের মধ্যে ঘরের দেয়াল কেঁপে উঠল। টেবিলের ওপরের কাগজগুলো বাতাসে উড়তে লাগল। পুরোনো ঘড়ির কাঁটা উল্টো দিকে ঘুরতে শুরু করল।
ঋত্বিকের চোখের সামনে বৃষ্টির রাতটি ভেসে উঠল।
মায়ের হাত।
মায়ের কণ্ঠ।
মায়ের প্রতিশ্রুতি।
তারপর সবকিছু ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে গেল।
সে অনুভব করল, বুকের ভেতর থেকে কেউ যেন একটি উষ্ণ আলো তুলে নিচ্ছে। সেই আলোটি দরজার কাঠের গায়ে মিশে গেল।
দরজাটি খুলে গেল।
ওপারে কোনো ঘর ছিল না। ছিল অসীম অন্ধকার, আর সেই অন্ধকারের গভীরে একটিমাত্র আলো।
সেই আলোর মধ্যে দাঁড়িয়ে ছিলেন অমিয়েশ চৌধুরী।
তাঁর মুখে ক্লান্তি, চোখে অনুশোচনা।
“অনুরাধা,” তিনি বললেন, “আমি তোমাকে থামাতে পারিনি। তার জন্য ক্ষমা চাইছি।”
অনুরাধার চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।
“তুমি কি জানতেছিলে, এমন হবে?”
“না। কিন্তু বুঝেছিলাম, একদিন এর মূল্য দিতে হবে।”
অমিয়েশ এবার ঋত্বিকের দিকে তাকালেন।
“তুমি আমার তৈরি করা পরীক্ষার ফল নও, ঋত্বিক। তুমি সেই জীবনের প্রমাণ, যাকে আমরা নিজেদের জ্ঞানের চেয়ে ছোট করে দেখেছিলাম। আমরা ভেবেছিলাম, সময়কে জয় করব। অথচ সময়ের ভেতরে থাকা মানুষের ভালোবাসার গভীরতা বুঝতেই পারিনি।”
ঋত্বিক কিছু বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু ঠিক তখনই দ্বিতীয় ঋত্বিকের শরীর থেকে আলোর কণা বেরোতে শুরু করল।
সে আতঙ্কিত হয়ে পড়ল।
“আমার কী হচ্ছে?”
অনুরাধা তার কাছে ছুটে গেলেন।
“তোর সময়রেখা ভেঙে যাচ্ছে, বাবা। দরজাটি বন্ধ হলে তুই যে পৃথিবী থেকে এসেছিস, সেই পৃথিবীর সঙ্গে তোর সংযোগ শেষ হয়ে যাবে।”
“আমি কি মরে যাব?”
কেউ উত্তর দিল না।
দ্বিতীয় ঋত্বিক অনুরাধার হাত শক্ত করে ধরল।
“মা, আমি তো কখনও তোমার কোলে ঘুমোতে পারিনি। তুমি কি একবার আমাকে জড়িয়ে ধরবে?”
অনুরাধা আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না। তিনি ছেলেটিকে বুকে টেনে নিলেন। বহু বছরের জমে থাকা কান্না তাঁর কণ্ঠ আটকে দিল।
“আমি তোকে ভালোবাসি, বাবা। তোকে আমি কখনও ভুলব না।”
দ্বিতীয় ঋত্বিক মৃদু হাসল।
“তাহলে আমি আর একা নই।”
তারপর সে প্রথম ঋত্বিকের দিকে তাকাল।
“তুই আমার মতো দেখতে। কিন্তু তোর একটা জীবন আছে। সেই জীবনটাকে বাঁচিয়ে রাখিস। মাকে কখনও কষ্ট দিস না।”
ঋত্বিক কাঁদতে কাঁদতে বলল, “তুইও আমার ভাই। তোকে আমি কীভাবে ভুলব?”
দ্বিতীয় ঋত্বিকের মুখে শান্তির হাসি ফুটল।
“আমাদের দুজনের মধ্যে একজনকে তো বেঁচে থাকতে হবে।”
পরমুহূর্তে তার শরীর আলোয় ভেঙে গেল। কোনো চিৎকার নেই, কোনো যন্ত্রণা নেই। শুধু অসংখ্য আলোককণা ঘরের বাতাসে ভেসে উঠল, তারপর একে একে নিভে গেল।
অনুরাধা হাঁটু গেড়ে বসে পড়লেন।
ঋত্বিক এগিয়ে এসে তাঁকে ধরল।
“মা…”
শব্দটি উচ্চারণ করেই সে থমকে গেল।
কোন মা?
মৃণালিনী, যিনি তাকে মানুষ করেছেন?
নাকি অনুরাধা, যিনি তাকে জন্ম দিয়েছেন?
অনুরাধা তার মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলেন।
“তোকে কাউকে বেছে নিতে হবে না, বাবা। মায়ের ভালোবাসা কোনো প্রতিযোগিতা নয়।”
ঠিক তখনই দরজার ওপার থেকে অমিয়েশের কণ্ঠ ভেসে এল।
“সময় শেষ হয়ে এসেছে। দরজাটি বন্ধ করো।”
অনুরাধা উঠে দাঁড়ালেন। তিনি ঋত্বিকের কপালে চুমু খেলেন।
“তুই ফিরে যা। তোর জন্য যে মা সারাজীবন অপেক্ষা করেছে, তার কাছে ফিরে যা।”
“আপনি?”
“আমার কাজ এখনও শেষ হয়নি।”
ঋত্বিক বুঝতে পারল, অনুরাধা এই দরজার ওপারে থেকে যাবেন। তাঁর জীবন, তাঁর গবেষণা, তাঁর হারিয়ে যাওয়া সন্তান—সবকিছু এই বাড়ির সঙ্গে বাঁধা।
“আমি আপনাকে আবার দেখতে পাব?”
অনুরাধা মৃদু হেসে বললেন, “যেদিন তুই ভালোবাসার মধ্যে কাউকে হারানোর ভয় না রেখে বাঁচতে শিখবি, সেদিন হয়তো আমার কথা মনে পড়বে। সেই স্মৃতিই হবে আমার কাছে ফিরে আসা।”
দরজাটি ধীরে ধীরে বন্ধ হতে লাগল।
ঋত্বিক শেষবারের মতো মায়ের মুখের দিকে তাকাল।
“আমি আপনাকে ভালোবাসি।”
অনুরাধা উত্তর দিলেন, “আমিও, বাবা।”
দরজা বন্ধ হয়ে গেল।
এক মুহূর্তের জন্য চারপাশে এমন নীরবতা নেমে এল, যেন পৃথিবী থেকে সমস্ত শব্দ মুছে গেছে।
তারপর—
ঋত্বিক চোখ খুলল।
সে শিউলিবাড়ির সামনের বাগানে পড়ে আছে। ভোরের আলো ফুটছে। শিউলি ফুলে ভরে গেছে উঠোন। বাড়ির জানালাগুলো বন্ধ। কোথাও কোনো আলো নেই।
তার হাতের মুঠোয় একটি কাগজ।
অমিয়েশ চৌধুরীর শেষ চিঠি।
কিন্তু চিঠির লেখা বদলে গেছে।
এবার তাতে লেখা—
“ঋত্বিক,
তুমি যদি এই চিঠি পড়তে পারো, তবে বুঝব দরজাটি বন্ধ হয়েছে। তোমার জীবনে এখন থেকে আর কোনো পরীক্ষার ছায়া থাকবে না। তোমার অতীতের সমস্ত প্রশ্নের উত্তর হয়তো তুমি পাবে না। কিন্তু মনে রেখো, মানুষ তার জন্মের পরিচয়ে বড় হয় না, বড় হয় তার ভালোবাসা আর কাজের মধ্যে দিয়ে।
মৃণালিনী তোমাকে নিজের সন্তান বলে ভালোবেসেছিল। অনুরাধা তোমাকে জন্ম দিয়েছিল। আর তুমি নিজের জীবনে ঠিক করবে, এই দুই ভালোবাসাকে কীভাবে বাঁচিয়ে রাখবে।
আমাদের ভুলের জন্য ক্ষমা কোরো।
— অমিয়েশ চৌধুরী”
ঋত্বিক অনেকক্ষণ চিঠিটির দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর উঠে দাঁড়াল।
শিউলিবাড়ির দরজায় শেষবারের মতো হাত রেখে সে বলল, “বিদায়।”
সেই মুহূর্তে বাড়ির ভেতর থেকে একটি পুরোনো ঘড়ির শব্দ শোনা গেল।
ঢং।
ঢং।
ঢং।
সতেরো বছর ধরে যে ঘড়িটি বন্ধ ছিল, সেটি আবার চলতে শুরু করেছে।
ঋত্বিক আর পিছনে তাকাল না।
কলকাতায় ফিরে আসার পর দিনগুলো স্বাভাবিক ছন্দে ফিরতে শুরু করল। সে আবার আদালতে যেতে লাগল। পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করল। মৃণালিনীর ঘরটি আগের মতোই সাজিয়ে রাখল।
তবে একটি বিষয় তাকে সারাক্ষণ ভাবিয়ে তুলত।
মায়ের সঙ্গে কাটানো কিছু স্মৃতি যেন তার মনে আর স্পষ্ট ছিল না। সে জানত, মৃণালিনী তাকে ভালোবাসতেন। কিন্তু সেই বৃষ্টির রাত, মাথায় হাত বুলিয়ে দেওয়া, “আমি কোথাও যাব না”—এই দৃশ্যগুলো সে আর মনে করতে পারত না।
তবু প্রতিদিন রাতে মায়ের ছবির সামনে দাঁড়ালে তার বুকের ভেতর এক অদ্ভুত উষ্ণতা অনুভব হতো।
একদিন আলমারি গোছাতে গিয়ে সে একটি পুরোনো খাম পেল। খামের ওপর মৃণালিনীর হাতের লেখায় লেখা—
“ঋত্বিকের জন্য। যখন সে সত্যিটা জানতে পারবে।”
খামের ভেতরে ছিল কয়েকটি পাতা।
“বাবা,
তুই যখন এই চিঠি পড়বি, তখন হয়তো আমি আর থাকব না। আমি জানি, আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল তোকে সত্যিটা না বলা। কিন্তু আমার সবচেয়ে বড় সত্যিও তুই।
প্রথম দিন যখন তোকে কোলে নিয়েছিলাম, তখন জানতাম না তোর জন্মের রহস্য কী। শুধু জানতাম, তুই কাঁদছিলি আর আমার বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছিল। মনে হয়েছিল, এই শিশুটিকে আমি হারাতে পারব না।
আমি তোকে জন্ম দিইনি। কিন্তু তোর প্রথম হাঁটা, প্রথম কথা বলা, প্রথম স্কুলে যাওয়া—সবকিছু আমার জীবনের অংশ। তুই অসুস্থ হলে আমারও শরীর খারাপ হতো। তুই হাসলে আমার পৃথিবী আলোয় ভরে যেত।
একদিন যদি জানতে পারিস, তোর জীবনে আরেকজন মা আছেন, তাঁকে ঘৃণা করিস না। তিনি তোকে হারিয়েছিলেন বলেই আমাকে তোকে ভালোবাসার সুযোগ দিয়েছিলেন। আর আমি তোকে ভালোবেসেছিলাম বলেই তোর সত্যিটা এতদিন লুকিয়ে রেখেছিলাম।
আমি জানি না, আমার এই সিদ্ধান্ত ঠিক ছিল কি না। শুধু জানি, তুই আমার ছেলে।
যদি কোনোদিন আমার কথা মনে পড়ে, তবে আমার ছবির সামনে কাঁদিস না। এমন একটা জীবন গড়ে তুলিস, যে জীবন দেখে আমি গর্ব করতে পারি।
তোর মা,
মৃণালিনী।”
চিঠির শেষ লাইনটি পড়ে ঋত্বিক আর চোখের জল আটকে রাখতে পারল না।
সে ছবিটা বুকে চেপে ধরে ফিসফিস করে বলল, “তুমি আমার মা। এ সত্যি কোনোদিন বদলাবে না।”
ছয় মাস পরে।
শীতের এক সকালে ঋত্বিক একটি অনাথ আশ্রমে গেল। আদালতের কাজের বাইরে সে এখন নিয়মিত সেখানে সময় দিত। শিশুদের পড়াশোনার ব্যবস্থা করত, বই কিনে দিত, তাদের সঙ্গে গল্প করত।
সেদিন আশ্রমের বারান্দায় বসে সে একটি ছোট্ট মেয়েকে গল্প শোনাচ্ছিল। মেয়েটির বয়স পাঁচ বছর। তার নাম শিউলি।
গল্প শেষ হলে মেয়েটি জিজ্ঞেস করল, “দাদা, তোমার মা কোথায়?”
ঋত্বিক কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারপর বলল, “আমার দুজন মা ছিল।”
মেয়েটি অবাক হয়ে তাকাল।
“দুজন?”
ঋত্বিক হেসে বলল, “একজন আমাকে পৃথিবীতে এনেছিলেন। আর একজন আমাকে পৃথিবীটা চিনতে শিখিয়েছিলেন।”
“তুমি কাকে বেশি ভালোবাসো?”
ঋত্বিক মেয়েটির মাথায় হাত রাখল।
“ভালোবাসা কি কখনও মেপে দেখা যায়, শিউলি?”
মেয়েটি মাথা নাড়ল।
“না।”
“ঠিক তাই।”
সেদিন বাড়ি ফেরার আগে আশ্রমের ছোট্ট বাগানে দাঁড়িয়ে ঋত্বিক একটি শিউলি গাছের পাশে জল দিল। গাছটির গোড়ায় একটি ছোট্ট পাথরের ফলক বসানো ছিল।
তাতে লেখা—
“মৃণালিনী ও অনুরাধার স্মৃতিতে—যাঁরা শিখিয়েছেন, মায়ের পরিচয় শুধু জন্মে নয়, ভালোবাসায়।”
ঋত্বিক আকাশের দিকে তাকাল।
শীতের নীল আকাশে কোনো মেঘ ছিল না। বাতাসে ভেসে আসছিল শিউলি ফুলের মৃদু গন্ধ।
হঠাৎ তার মনে হলো, কেউ যেন দূর থেকে তাকে ডাকছে।
“ঋত্বিক…”
সে ঘুরে তাকাল।
কেউ নেই।
শুধু বাগানের শেষ প্রান্তে একটি ছোট্ট জানালা। জানালার কাচে এক মুহূর্তের জন্য দুটি মুখ ভেসে উঠল—একজন মৃণালিনী, অন্যজন অনুরাধা।
দুজনেই হাসছেন।
ঋত্বিক চোখের পাতা ফেলতেই মুখ দুটি মিলিয়ে গেল।
সে জানত না, সত্যিই কি তাদের দেখেছে, নাকি তার মনের গভীরে লুকিয়ে থাকা ভালোবাসাই সেই মুখ তৈরি করেছে।
কিন্তু সেদিন তার আর কোনো উত্তর জানার প্রয়োজন ছিল না।
কারণ সে বুঝে গিয়েছিল—মানুষের জীবনে কিছু রহস্যের সমাধান হয় সত্য খুঁজে পেয়ে, আর কিছু রহস্যের সমাধান হয় ভালোবাসাকে গ্রহণ করে।
শিউলিবাড়ির দরজা চিরতরে বন্ধ হয়েছে কি না, সে জানত না। অমিয়েশের পরীক্ষা পৃথিবীর সমস্ত চিহ্ন থেকে মুছে গেছে কি না, তাও জানত না।
শুধু জানত, তার জীবন এখন তার নিজের।
আর সেই জীবনে মায়ের ভালোবাসা কোনো সময়রেখার কাছে পরাজিত হবে না।
সন্ধ্যার আলোয় বাড়ি ফেরার পথে সে পকেট থেকে মৃণালিনীর চিঠিটি বের করল। শেষবারের মতো পড়ল সেই কথাগুলো—
“তুই আমার ছেলে।”
ঋত্বিক চিঠিটি যত্ন করে ভাঁজ করে রাখল।
তারপর হাঁটতে শুরু করল নতুন জীবনের দিকে।
পেছনে পড়ে রইল অতীতের অন্ধকার, বন্ধ দরজা আর মৃত্যুর আগে লেখা শেষ চিঠি।
আর সামনে অপেক্ষা করছিল এমন এক পৃথিবী, যেখানে ভালোবাসার প্রমাণ দিতে সময়ের দরজা খুলতে হয় না।
— সমাপ্ত —