Categories
উপন্যাস বিবিধ

শেষ ট্রেনের যাত্রী (তৃতীয় পর্ব: যে মানুষটি নিজের মৃত্যুকে হত্যা করেছিল)।

মহিলাটির কথাটা শুনে অরিত্রর মনে হলো, মেঝেটা যেন তার পায়ের নিচ থেকে সরে যাচ্ছে।

“আমার বাবা কাকে হত্যা করেছিলেন?”

মহিলাটি কোনো উত্তর দিলেন না। তিনি শুধু ঘরের দেওয়ালে ঝোলানো ছবিটির দিকে আঙুল তুললেন।

ছবিতে যে মানুষটি দাঁড়িয়ে আছে, তার মুখ অরিত্রর মতো। একই চোখ, একই নাক, একই কপালের দাগ। শুধু চোখের দৃষ্টিতে এমন এক শীতলতা, যা অরিত্রর নিজের চোখে কখনও ছিল না।

ছবির নিচে লেখা—অরুণাভ সেন। মৃত্যু: ১৯ অক্টোবর, ২০১১।

অরিত্র ছবিটির কাছে এগিয়ে গেল।

“এটা কীভাবে সম্ভব? আমার বাবা তো ওই তারিখেই নিখোঁজ হয়েছিলেন। আর ছবিতে যে মানুষটি রয়েছে, সে আমার মতো দেখতে কেন?”

মহিলাটি ধীরে ধীরে বললেন, “কারণ তোমার বাবা শুধু তোমার বাবা ছিলেন না। তিনি ছিলেন এমন এক মানুষের প্রতিচ্ছবি, যাকে পৃথিবী থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছিল।”

“আপনি কে?”

“আমার নাম মায়া রায়। আমি সেই গবেষণাগারের শেষ জীবিত সাক্ষী।”

অরিত্রর মনে পড়ল, ট্রেনের কামরায় বৃদ্ধা নিজের নাম বলেছিলেন মায়া। কিন্তু তখন তিনি বলেছিলেন, ছবিতে থাকা মহিলাটি তাঁর মেয়ে। এখন এই মহিলা বলছেন, তিনি গবেষণাগারের সাক্ষী।

অরিত্র বুঝতে পারল, এই ট্রেনে কারও কথাই পুরোপুরি বিশ্বাস করা যায় না।

“আপনি কি সেই মহিলা, যাঁকে আমি বাবার সঙ্গে ছবিতে দেখেছিলাম?”

মায়া মাথা নাড়লেন।

“হ্যাঁ। তবে ছবিতে যে শিশুটিকে দেখেছিলে, তার পরিচয় তোমার ধারণার চেয়ে অনেক বেশি জটিল।”

“তাহলে সব খুলে বলুন।”

মায়া ঘরের মাঝখানে রাখা টেবিলের কাছে গিয়ে বসলেন। টেবিলের ওপর একটি মোটা নথি। মলাটে লেখা—প্রকল্প প্রত্যাবর্তন: গোপন প্রতিবেদন, ২০০৯–২০১১।

তিনি নথিটি খুললেন।

“২০০৯ সালে কলকাতার বাইরে একটি গোপন গবেষণাগারে মানুষের স্মৃতি এবং চেতনা নিয়ে পরীক্ষা শুরু হয়েছিল। প্রকল্পটির নেতৃত্বে ছিলেন বিজ্ঞানী ড. দেবব্রত রায়। তাঁর ধারণা ছিল, মানুষের মস্তিষ্কে স্মৃতি শুধু অতীতের রেকর্ড নয়, বরং এমন এক সংকেত, যা সঠিক পরিস্থিতিতে পুনরায় সক্রিয় করা যায়।”

“এই পরীক্ষার সঙ্গে আমার বাবা কীভাবে যুক্ত হলেন?”

“তোমার বাবা ছিলেন একজন অনুসন্ধানী সাংবাদিক। তিনি ওই গবেষণাগারের অর্থের উৎস নিয়ে তদন্ত করছিলেন। একাধিক নিখোঁজ মানুষের ঘটনা তাঁর নজরে এসেছিল। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, নিখোঁজ হওয়া মানুষদের মধ্যে একটি অদ্ভুত মিল রয়েছে—প্রত্যেকেই কোনো না কোনোভাবে গবেষণাগারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।”

“কিন্তু মানুষগুলোকে কেন নিখোঁজ করা হচ্ছিল?”

মায়া নথির একটি পাতা এগিয়ে দিলেন।

সেখানে লেখা ছিল, পরীক্ষার সময় গবেষকেরা এমন কিছু মানুষের স্মৃতি সংগ্রহ করতেন, যাঁরা মৃত্যুর কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলেন। তাঁদের স্মৃতি ও চেতনার সংকেত ব্যবহার করে তৈরি করা হতো একটি কৃত্রিম মানসিক প্রতিরূপ। এই প্রতিরূপ মূল ব্যক্তির অভ্যাস, কথা বলার ধরন, পরিচিত স্মৃতি এবং আবেগের প্রতিক্রিয়া অনুকরণ করতে পারত।

অরিত্র স্তব্ধ হয়ে গেল।

“তাহলে ট্রেনের ওই মানুষটি…”

“সে তোমার বাবার স্মৃতির প্রতিরূপ। তবে সে কীভাবে এই ট্রেনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, তার সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা আমার কাছেও নেই।”

“আর আমার মতো দেখতে মানুষটি?”

মায়া কিছুক্ষণ নীরব থেকে বললেন, “সেই প্রশ্নের উত্তর তোমার মায়ের কাছে ছিল।”

“মা তো মারা গেছেন!”

“তাঁর শরীর মারা গেছে। কিন্তু মৃত্যুর আগে তিনি যে রেকর্ডিং তৈরি করেছিলেন, তার মধ্যে এমন কিছু তথ্য আছে, যা এখনও তুমি শোনোনি।”

অরিত্রর মনে পড়ল, টেপ রেকর্ডারে মায়ের কণ্ঠ হঠাৎ থেমে গিয়েছিল।

সে তাড়াতাড়ি টেবিলের ওপর রাখা রেকর্ডারটি তুলে নিল। যন্ত্রটির পাশে একটি ছোট্ট মেমোরি কার্ড ছিল। সেটি ঢুকিয়ে আবার চালু করল।

কিছুক্ষণ শোঁ শোঁ শব্দের পর মায়ের কণ্ঠ ফিরে এল।

“অরি, তুই যদি এই অংশটা শুনতে পাস, তাহলে বুঝব তুই এমন জায়গায় পৌঁছেছিস, যেখানে সত্যি লুকিয়ে রাখা আর সম্ভব নয়।

তোর বাবা ২০১১ সালে যে দুর্ঘটনায় নিখোঁজ হয়েছিলেন, সেটি আসলে তাঁর শেষ চেষ্টা ছিল। তিনি গবেষণাগার থেকে এমন একটি নথি উদ্ধার করেছিলেন, যাতে প্রমাণ ছিল—প্রকল্পের নামে মানুষের স্মৃতি ও পরিচয় নিয়ে বেআইনি পরীক্ষা চালানো হচ্ছে।

কিন্তু সেই নথিতে আরও একটি তথ্য ছিল।

গবেষণাগারে এমন একজন মানুষের স্মৃতি ব্যবহার করা হয়েছিল, যার মৃত্যু সরকারি নথিতে বহু বছর আগেই লেখা হয়ে গিয়েছিল। সেই মানুষটির স্মৃতি থেকে তৈরি হয়েছিল আরেকটি পরিচয়।

সেই পরিচয়কে জীবিত প্রমাণ করতে গিয়ে গবেষকেরা তৈরি করেছিলেন একাধিক মানসিক প্রতিরূপ। তাদের মধ্যে একজনের মুখ ছিল তোমার মতো।

তুই যখন ছোট ছিলি, তখন একবার গুরুতর অসুস্থ হয়েছিলি। সেই সময় তোর চিকিৎসার জন্য তোর বাবাকে গবেষণাগারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয়েছিল। তারা তোর মস্তিষ্কের কিছু চিকিৎসাসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করেছিল। আমরা জানতাম না, সেই তথ্য একদিন এমন ভয়ংকর পরীক্ষার অংশ হয়ে উঠবে।

আমি তোকে বাঁচাতে চেয়েছিলাম। তোর বাবা সত্যিটা প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন।

কিন্তু আমাদের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল, আমরা বিশ্বাস করেছিলাম—বিজ্ঞানকে নিয়ন্ত্রণ করা যায় শুধু ভালো উদ্দেশ্য দিয়ে।”

রেকর্ডিংয়ে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।

তারপর মায়ের কণ্ঠ আবার শোনা গেল।

“অরি, একটা কথা মনে রাখিস। যে মানুষটি তোর বাবার মতো দেখতে, সে হয়তো তোর বাবার সব স্মৃতি জানে। কিন্তু কোনো মানুষের স্মৃতি আর সেই মানুষটি এক নয়।

আর তুই যে ছবিটা দেখেছিস, তার পিছনে যে সত্যি রয়েছে, তা জানার পর তোর নিজের পরিচয় নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে।

ভয় পাবি না। তুই কীভাবে জন্মেছিস, তা তোর জীবনের সবকিছু নির্ধারণ করে না। তুই কীভাবে বাঁচবি, সেটাই শেষ পর্যন্ত তোর পরিচয়।”

রেকর্ডিং বন্ধ হয়ে গেল।

অরিত্র অনেকক্ষণ নড়ল না।

তার মা কি বলতে চাইছেন, সে কোনো পরীক্ষার ফল? তার শৈশবের অসুস্থতার সময় কি তার স্মৃতি নিয়ে কোনো পরীক্ষা হয়েছিল?

সে নিজেকে সামলে মায়ার দিকে তাকাল।

“আমার বাবা কি সত্যিই কাউকে হত্যা করেছিলেন?”

মায়া এবার চোখ নামিয়ে নিলেন।

“হ্যাঁ। তবে সেটা ছিল এমন এক ঘটনা, যার সাক্ষী শুধু আমি আর তোমার বাবা।”

“কাকে?”

“ড. দেবব্রত রায়কে।”

অরিত্র হতভম্ব হয়ে গেল।

“আমার বাবা একজন বিজ্ঞানীকে খুন করেছিলেন?”

“সেদিনের ঘটনা আমি নিজের চোখে দেখেছি। কিন্তু তোমার বাবা তাঁকে ইচ্ছা করে হত্যা করেছিলেন কি না, তা আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি না।”

“কী হয়েছিল সেদিন?”

মায়া জানালেন, ২০১১ সালের ১৮ অক্টোবর রাতে অরুণাভ গবেষণাগারে প্রবেশ করেছিলেন। তাঁর কাছে ছিল প্রমাণসমেত একটি নথি, যা পরদিন সংবাদপত্রে প্রকাশিত হওয়ার কথা। কিন্তু গবেষণাগারের নিরাপত্তা ব্যবস্থা তাঁকে ধরে ফেলে।

ড. দেবব্রত রায় তাঁকে একটি পরীক্ষাকক্ষে নিয়ে যান। সেখানে একটি যন্ত্রের সাহায্যে অরুণাভের স্মৃতি সংগ্রহ করার প্রস্তুতি চলছিল।

অরুণাভ বাধা দেন।

ধস্তাধস্তির মধ্যে যন্ত্রটির বিদ্যুৎ সংযোগে বিস্ফোরণ ঘটে। ঘর ধোঁয়ায় ভরে যায়। দেবব্রত মেঝেতে পড়ে যান। অরুণাভ তাঁকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি মারা যান।

“তারপর?” অরিত্র জিজ্ঞেস করল।

“তোমার বাবা গবেষণাগার থেকে পালিয়ে যান। তাঁর সঙ্গে ছিল সেই গোপন নথি। কিন্তু তিনি জানতেন, দেবব্রতের সহকারীরা তাঁকে ছাড়বে না। তিনি নথিটি নিয়ে পাহাড়ের দিকে চলে যান। সেখানেই তাঁর গাড়ি খাদে পড়ে যায়।”

“তাহলে দুর্ঘটনাটা সত্যিই ঘটেছিল?”

“গাড়ি খাদে পড়েছিল। কিন্তু তার আগের ঘটনাগুলো কেউ জানত না। আর তোমার বাবা কেন সেই পথে গিয়েছিলেন, তা-ও গোপন রাখা হয়েছিল।”

অরিত্রর চোখে জল এসে গেল।

“মা কেন আমাকে কিছু বলেননি?”

“কারণ তুমি তখন কিশোর। তোমার নিরাপত্তা নিয়ে তিনি ভয় পেতেন। তাছাড়া, গবেষণাগারের লোকেরা তখনও সক্রিয় ছিল।”

“কিন্তু এই ট্রেন? শেষ ট্রেনের সঙ্গে ওই গবেষণাগারের কী সম্পর্ক?”

মায়া জানালার দিকে তাকালেন।

“প্রকল্পের শেষ পর্যায়ে গবেষকেরা স্মৃতির প্রতিরূপগুলোকে একটি বিশেষ পরিবেশে পরীক্ষা করতেন। সেই পরিবেশে মানুষের সময়বোধ ও স্মৃতির ধারাবাহিকতা ভেঙে পড়ত। কেউ ঘণ্টার পর ঘণ্টা সেখানে থাকত, কিন্তু তার মনে হতো কয়েক বছর কেটে গেছে। আবার কেউ কয়েক বছর ধরে একই মুহূর্তের মধ্যে আটকে থাকত।

তোমার বাবার স্মৃতির প্রতিরূপটি সেই পরীক্ষার সময় নিখোঁজ হয়ে যায়। পরে এই ট্রেনের সঙ্গে তার যোগাযোগের কথা জানা যায়।”

“এই ট্রেন কি বাস্তব?”

মায়া দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

“ট্রেনটি বাস্তব কি না, তা আমি বলতে পারব না। তুমি যে প্ল্যাটফর্মে উঠেছিলে, সেই প্ল্যাটফর্মে তোমার শরীর সত্যিই ছিল কি না, সেটাও নিশ্চিত করে বলতে পারি না। কিন্তু তুমি যা দেখেছ, তা তোমার কাছে বাস্তব। আর সেই অভিজ্ঞতার মধ্যে এমন কিছু তথ্য আছে, যা বাস্তব ঘটনার সঙ্গে মিলে যায়।”

অরিত্রর মনে হলো, উত্তরগুলো আরও বেশি প্রশ্ন তৈরি করছে।

সে দরজার দিকে এগিয়ে গেল।

“আমি শেষ স্টেশনে যাব। সেখানে নিশ্চয়ই আমার বাবার মৃত্যুর সত্যিটা আছে।”

মায়া তাকে থামালেন।

“শেষ স্টেশনে যাওয়া সহজ নয়। সেখানে পৌঁছতে হলে তৃতীয় প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।”

“প্রশ্নটা কী?”

“তুমি কি তোমার বাবার সত্যিটা জানতে চাও, যদিও সেই সত্যি তোমার নিজের জীবনের ভিত্তি ভেঙে দিতে পারে?”

অরিত্র কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর বলল, “হ্যাঁ।”

মায়া মাথা নাড়লেন।

“তাহলে তোমাকে এমন একটি স্মৃতির মুখোমুখি হতে হবে, যা তুমি নিজের জীবন থেকে মুছে ফেলেছ।”


দরজাটি খুলতেই অরিত্র একটি হাসপাতালের ঘর দেখতে পেল।

সাদা দেওয়াল। জানালার পাশে অক্সিজেন সিলিন্ডার। বিছানায় শুয়ে আছে আট বছরের একটি ছেলে।

ছেলেটি অরিত্র নিজেই।

তার পাশে বসে আছেন মধুমিতা সেন। চোখ লাল, মুখে গভীর ক্লান্তি।

ঘরের দরজা খুলে অরুণাভ ভিতরে এলেন।

ছোট্ট অরিত্র বাবাকে দেখে হাত বাড়াল।

“বাবা, আমি কি মারা যাব?”

অরুণাভ ছেলের হাত ধরলেন।

“না রে। তুই ভালো হয়ে যাবি।”

“ডাক্তার বলেছে আমার মাথার ভিতরে সমস্যা হয়েছে।”

অরুণাভের চোখে জল চিকচিক করল।

“ডাক্তাররা চেষ্টা করছেন। তুই শুধু সাহস রাখ।”

ছোট্ট অরিত্র ধীরে ধীরে বলল, “বাবা, তুমি আমাকে ছেড়ে যাবে না তো?”

অরুণাভ কোনো উত্তর দিতে পারলেন না। তিনি ছেলের কপালে চুমু খেয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।

দরজার বাইরে মধুমিতা তাঁর হাত ধরে বললেন, “ওকে বাঁচানোর জন্য তুমি যা করতে চাইছ, সেটা কি নিরাপদ?”

অরুণাভ বললেন, “আমি জানি না। কিন্তু প্রচলিত চিকিৎসায় ওর অবস্থার উন্নতি হচ্ছে না। গবেষণাগারের যন্ত্রটি যদি ওর স্মৃতির সংকেত বুঝতে সাহায্য করে, তাহলে হয়তো চিকিৎসার পথ খুলবে।”

“আর যদি উল্টো কিছু ঘটে?”

অরুণাভ স্ত্রীর হাত চেপে ধরলেন।

“আমি ওকে হারাতে পারব না।”

অরিত্রর বুক কেঁপে উঠল।

সে এই ঘটনার কিছুই মনে করতে পারে না। তার স্মৃতিতে আট বছর বয়সে কোনো গুরুতর অসুস্থতার কথা নেই।

দৃশ্য বদলে গেল।

এবার সে দেখল, একটি অন্ধকার ঘরে ছোট্ট অরিত্রকে শুইয়ে রাখা হয়েছে। মাথার চারপাশে কয়েকটি তার। কাচের দেওয়ালের ওপারে দাঁড়িয়ে আছেন ড. দেবব্রত রায়।

তিনি অরুণাভকে বলছেন, “আমরা শিশুটির স্মৃতির একটি প্রতিরূপ তৈরি করতে পারব। তবে তার মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ করা যাবে না।”

অরুণাভ বললেন, “আমার ছেলের কোনো ক্ষতি হওয়া চলবে না।”

“আমরা শুধু স্মৃতির সংকেত পর্যবেক্ষণ করব।”

“আপনি কথা দিচ্ছেন?”

দেবব্রত হাসলেন।

“বিজ্ঞান কোনো প্রতিশ্রুতির ওপর চলে না, মিস্টার সেন। চলে ফলাফলের ওপর।”

তারপর যন্ত্রটি চালু হলো।

ঘর নীল আলোয় ভরে গেল।

একটি শিশুর কান্না শোনা গেল।

আর অরিত্র দেখতে পেল, তার বিছানার পাশে আরেকটি শিশু দাঁড়িয়ে আছে। মুখ অবিকল তার মতো।

কিন্তু সেই শিশুটির চোখ খোলা, অথচ চোখের মণি স্থির।

দৃশ্যটি দেখে অরিত্রর বুকের ভিতর ভয় জমে গেল।

এই কি সেই প্রতিরূপ, যার মুখ তার মতো?

হঠাৎ দৃশ্যের মধ্যে অরুণাভ চিৎকার করে উঠলেন, “যন্ত্রটা বন্ধ করুন!”

কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে।

ঘরের আলো নিভে গেল।

দেবব্রত মেঝেতে পড়ে গেলেন।

অরুণাভ ছোট্ট অরিত্রকে কোলে তুলে নিলেন।

আর সেই দ্বিতীয় শিশুটি ধীরে ধীরে মাথা ঘুরিয়ে ক্যামেরার দিকে তাকাল।

তার ঠোঁটে ফুটে উঠল একটি অদ্ভুত হাসি।

সে বলল—

“আমি একদিন তোমার জীবন নিয়ে নেব।”

দৃশ্যটি ভেঙে গেল।

অরিত্র হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল।

তার মাথায় প্রচণ্ড যন্ত্রণা হচ্ছে। আট বছর বয়সের অস্পষ্ট কিছু স্মৃতি ফিরে আসছে—হাসপাতালের গন্ধ, মায়ের কান্না, বাবার হাত, আর কাচের ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা একটি ছায়া।

সে বুঝতে পারল, তার জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ তার স্মৃতি থেকে মুছে দেওয়া হয়েছিল।

কিন্তু কে মুছে দিয়েছিল?

তার বাবা?

নাকি সেই গবেষণাগারের মানুষগুলো?


ট্রেনের কামরায় ফিরে আসতেই টিকিট পরীক্ষক সামনে এসে দাঁড়াল।

“তৃতীয় প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সময় হয়েছে।”

অরিত্র মাথা তুলল।

“আমার প্রশ্নের উত্তর আগে দিন। আমার মতো দেখতে সেই শিশুটি কে?”

টিকিট পরীক্ষক বলল, “সে তোমার স্মৃতির প্রতিরূপ। তোমার মস্তিষ্ক থেকে সংগ্রহ করা সংকেতের সাহায্যে তাকে তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু পরীক্ষার সময় সে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।”

“সে কি জীবিত?”

“জীবিত শব্দটির অর্থ কী, তা এই ট্রেনে এসে তুমি নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছ।”

অরিত্র রাগে কাঁপতে লাগল।

“আপনারা মানুষের স্মৃতি নিয়ে পরীক্ষা করেছেন, মানুষের পরিচয় নিয়ে খেলেছেন! আমার জীবনকে বিপন্ন করেছেন!”

টিকিট পরীক্ষক শান্ত গলায় বলল, “আমরা নই। এই ট্রেনের নিয়ম আমাদেরও নিয়ন্ত্রণ করে।”

“তাহলে কে নিয়ন্ত্রণ করে এই ট্রেন?”

টিকিট পরীক্ষক প্রথমবারের মতো চোখ নামিয়ে নিল।

“যে মানুষটি প্রথম এই ট্রেনে উঠেছিল।”

“কে সে?”

“তোমার বাবা।”

অরিত্র স্তব্ধ হয়ে গেল।

“কিন্তু আপনি তো বললেন, আমার বাবা মারা গেছেন!”

“তাঁর শরীর মারা গেছে। কিন্তু তাঁর স্মৃতি এই ট্রেনের প্রথম যাত্রী হিসেবে রয়ে গেছে। ট্রেনের নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিটি যাত্রীকে নিজের অসমাপ্ত প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। তোমার বাবার প্রশ্ন ছিল—তিনি কি তাঁর ছেলেকে বাঁচাতে পেরেছিলেন?”

অরিত্র ধীরে ধীরে মাথা তুলল।

“তিনি আমাকে বাঁচিয়েছিলেন?”

“হ্যাঁ। কিন্তু তিনি জানতেন না, সেই পরীক্ষার প্রতিরূপ একদিন তোমার জীবনের সঙ্গে আবার যুক্ত হবে।”

“তাহলে আমি কী করব?”

টিকিট পরীক্ষক তার হাতে একটি সাদা খাম দিল।

“এটি তোমার বাবার শেষ বার্তা। পড়ে নাও। তারপর সিদ্ধান্ত নাও, তুমি ট্রেন থেকে নামবে, নাকি তাঁর সঙ্গে থেকে যাবে।”

অরিত্র খামটি খুলল।

ভিতরে বাবার হাতের লেখা।

“অরি,

যদি এই চিঠি তোর হাতে পৌঁছয়, তাহলে বুঝব তুই সেই দরজার সামনে পৌঁছেছিস, যেটা আমি এত বছর ধরে বন্ধ করতে পারিনি।

তোর ছোটবেলায় যে পরীক্ষাটি হয়েছিল, তার জন্য আমি নিজেকে কোনোদিন ক্ষমা করতে পারিনি। আমি তোকে বাঁচাতে চেয়েছিলাম, কিন্তু সেই চেষ্টায় তোর স্মৃতির একটি প্রতিরূপ তৈরি হয়েছিল। আমি ভেবেছিলাম, পরীক্ষাটি বন্ধ করে দিলে সবকিছু শেষ হবে। কিন্তু আমি ভুল ছিলাম।

দেবব্রত মারা যাওয়ার পর তার সহকারীরা প্রতিরূপটিকে নিয়ে পরীক্ষা চালিয়ে যায়। তারা তাকে এমন একটি ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করে, যার সাহায্যে স্মৃতির জগৎ তৈরি করা সম্ভব। সেই ব্যবস্থারই একটি রূপ হলো এই ট্রেন।

আমি তোকে এখানে আসতে নিষেধ করতে পারতাম। কিন্তু তোর কাছে সত্যিটা চিরকাল লুকিয়ে রাখার অধিকার আমার নেই।

তুই যদি আমাকে ফিরে পেতে চাস, তাহলে এই ট্রেনের সঙ্গে যুক্ত হতে হবে। তুই যদি নিজের জীবন বেছে নিতে চাস, তাহলে ট্রেন থেকে নেমে যেতে হবে।

কিন্তু একটা কথা মনে রাখিস—আমি চাই না তুই আমার জন্য নিজের জীবন নষ্ট করিস।

আমি তোর বাবা। তোর জীবন আমার স্মৃতির চেয়েও বড়।

ভালো থাকিস, অরি।

— বাবা”

চিঠিটি পড়ে অরিত্রর চোখে জল এসে গেল।

সে এতদিন বাবাকে খুঁজেছে। মনে করেছে, বাবাকে ফিরে পেলেই তার জীবনের শূন্যতা পূর্ণ হবে।

কিন্তু এখন সে বুঝতে পারছে, যে মানুষটিকে সে ফিরে পেতে চাইছে, তাঁর শরীর আর নেই। আছে শুধু স্মৃতি, অনুশোচনা আর ভালোবাসার প্রতিধ্বনি।

ট্রেনের দরজা খুলে গেল।

বাইরে দেখা গেল শিয়ালদহ স্টেশনের তিন নম্বর প্ল্যাটফর্ম। রাত ১১টা ৫৭ মিনিট। সেই একই সময়, যেদিন সে ট্রেনে উঠেছিল।

টিকিট পরীক্ষক বলল, “তোমার সিদ্ধান্ত?”

অরিত্র বাবার স্মৃতির প্রতিরূপটির দিকে তাকাল।

লোকটি মৃদু হেসে বললেন, “যা তোর কাছে ঠিক মনে হয়, সেটাই করিস।”

অরিত্রর মনে পড়ল, মা বলেছিলেন—স্মৃতি আর মানুষ এক নয়।

সে জানত, ট্রেনে থেকে গেলে সে হয়তো বাবার আরও অনেক স্মৃতি জানতে পারবে। হয়তো সেই প্রতিরূপের সঙ্গে আরও কিছু সময় কাটাতে পারবে। কিন্তু তার নিজের জীবন ধীরে ধীরে এই ট্রেনের মধ্যে আটকে যাবে।

আর সে যদি নেমে যায়, তাহলে বাবার স্মৃতিকে ছেড়ে যেতে হবে।

অরিত্র চোখ বন্ধ করল।

তারপর বলল, “আমি নেমে যাব।”

লোকটির মুখে এক মুহূর্তের জন্য দুঃখের ছায়া ফুটে উঠল। তারপর তিনি মাথা নাড়লেন।

“তাহলে এবার তুই সত্যিই বড় হয়ে গেছিস, অরি।”

অরিত্র দরজার দিকে এগোল।

ঠিক তখনই ট্রেনের শেষ কামরা থেকে ভয়ংকর চিৎকার শোনা গেল।

একটি পরিচিত কণ্ঠস্বর।

তার নিজের কণ্ঠস্বর।

“অরিত্র! আমাকে ফেলে যাস না! আমি তোরই অংশ!”

অরিত্র ঘুরে তাকাল।

কামরার শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে সেই দ্বিতীয় অরিত্র। তার মুখে রক্তের দাগ, চোখে ক্রোধ।

“তুই চলে গেলে আমি শেষ হয়ে যাব। তুই কি আমাকে মরতে দিবি?”

অরিত্র বুঝতে পারল, এই সেই প্রতিরূপ, যে একদিন তার জীবন নিয়ে নেওয়ার কথা বলেছিল।

প্রতিরূপটি এগিয়ে আসছে।

“তুই আমার কাছ থেকে জীবন কেড়ে নিয়েছিস! তুই পৃথিবীতে বেঁচে আছিস, আর আমাকে এই অন্ধকারে বন্দি করে রেখেছিস!”

অরিত্র পিছিয়ে গেল।

“আমি তোকে বন্দি করিনি।”

“কিন্তু তোর স্মৃতি দিয়ে আমাকে তৈরি করা হয়েছে! তোর নাম, তোর মুখ, তোর শৈশব—সব আমারও!”

“তাহলে তুই আমার মতোই বাঁচতে চাস?”

প্রতিরূপটি চিৎকার করে উঠল, “আমি তোর মতো নয়! আমি তুই!”

তারপর সে ঝাঁপিয়ে পড়ল।

দুজনের মধ্যে ধস্তাধস্তি শুরু হলো। ট্রেনের আলো দ্রুত জ্বলছে-নিভছে। জানালার কাচে শত শত মুখ ভেসে উঠছে। টিকিট পরীক্ষক কিছু করতে পারছে না।

অরিত্র মেঝেতে পড়ে গেল। প্রতিরূপটি তার গলা চেপে ধরল।

“তুই আমার জীবন নিয়ে চলে যেতে পারবি না!”

অরিত্র শ্বাস নিতে পারছিল না। তবু সে কষ্ট করে বলল, “তুই যদি আমার স্মৃতি থেকে তৈরি হয়ে থাকিস, তাহলে তুই নিশ্চয়ই জানিস—আমি কখনও কাউকে ইচ্ছা করে মেরে ফেলতে চাইনি।”

প্রতিরূপটির হাত এক মুহূর্তের জন্য শিথিল হলো।

অরিত্র বলল, “তুই আমার শত্রু নোস। তুই সেই ভয়ের প্রতিচ্ছবি, যেটাকে আমি এত বছর ধরে নিজের ভিতরে লুকিয়ে রেখেছি। তুই বাঁচতে চাস, আমি বুঝি। কিন্তু অন্যের জীবন কেড়ে নিয়ে বেঁচে থাকা যায় না।”

প্রতিরূপটির চোখে জল এসে গেল।

“তাহলে আমার কী হবে?”

অরিত্র ধীরে ধীরে উঠে বসল।

“আমি জানি না। কিন্তু তোর অস্তিত্বের সত্যিটা পৃথিবীর সামনে আনব। তোর মতো মানুষকে আর কেউ গোপন পরীক্ষার অন্ধকারে বন্দি করে রাখতে পারবে না।”

প্রতিরূপটি তার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর ধীরে ধীরে হাত সরিয়ে নিল।

“তুই কি আমাকে মনে রাখবি?”

অরিত্র মাথা নাড়ল।

“হ্যাঁ।”

প্রতিরূপটির মুখে প্রথমবারের মতো শান্তির হাসি ফুটল।

তার শরীর থেকে আলো বেরোতে শুরু করল।

সে বলল, “তাহলে আমি একেবারে হারিয়ে যাব না।”

পরমুহূর্তে তার শরীর আলোর কণায় ভেঙে গেল। কণাগুলো জানালার দিকে উড়ে গিয়ে অন্ধকারে মিশে গেল।

ট্রেনের ভিতরে নীরবতা নেমে এল।

টিকিট পরীক্ষক দরজার পাশে দাঁড়িয়ে বলল, “এবার তোমার যাত্রা শেষ।”

অরিত্র শেষবারের মতো বাবার স্মৃতির দিকে তাকাল।

“আমি কি আপনাকে আর কখনও দেখতে পাব?”

লোকটি মৃদু হাসলেন।

“হয়তো স্বপ্নে। হয়তো কোনো পুরোনো ছবিতে। হয়তো এমন এক মুহূর্তে, যখন তুই কোনো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে আমার কথা মনে করবি।”

অরিত্র চোখ মুছে দরজার বাইরে পা রাখল।

প্ল্যাটফর্মে পা পড়তেই ট্রেনের শিস বেজে উঠল।

সে পিছনে তাকাল।

কামরার জানালায় বাবা দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর মুখে সেই পুরোনো হাসি।

তিনি ঠোঁট নেড়ে বললেন—

“ভালো থাকিস, অরি।”

ট্রেনটি ধীরে ধীরে অন্ধকারের মধ্যে মিলিয়ে গেল।


পরদিন সকালে অরিত্রর জ্ঞান ফিরল শিয়ালদহ স্টেশনের তিন নম্বর প্ল্যাটফর্মের একটি বেঞ্চে।

স্টেশনের কর্মীরা তাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে ছিল। একজন রেলকর্মী জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি এখানে কীভাবে এলেন? রাতভর আপনাকে কেউ দেখেনি।”

অরিত্র উঠে বসে বলল, “গত রাতে একটা ট্রেন এসেছিল।”

রেলকর্মী অবাক হয়ে তাকালেন।

“কোন ট্রেন?”

অরিত্র কোনো উত্তর দিল না।

তার হাতে তখনও একটি পুরোনো টিকিট। কিন্তু টিকিটে লেখা নাম ও সময় মুছে গেছে। শুধু এক কোণে একটি ছোট্ট বাক্য রয়ে গেছে—

“স্মৃতি শেষ হয় না। শুধু তার ঠিকানা বদলে যায়।”

অরিত্র টিকিটটি যত্ন করে পকেটে রাখল।

পরবর্তী কয়েক সপ্তাহ ধরে সে নিজের বাবার পুরোনো কাগজপত্র ঘাঁটতে শুরু করল। মায়ের রেকর্ডিং, গবেষণাগারের নথি এবং বাবার শেষ চিঠির সাহায্যে সে একটি দীর্ঘ অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদন তৈরি করল।

প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হওয়ার পর দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি হলো। পুরোনো গবেষণাগারের সন্ধান পাওয়া গেল। সেখানে বেআইনি পরীক্ষার প্রমাণও মিলল। তবে প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত বহু মানুষ ততদিনে মারা গিয়েছিলেন, আর কিছু নথি চিরতরে হারিয়ে গিয়েছিল।

অরিত্র কখনও প্রমাণ করতে পারেনি যে সে সত্যিই সেই রহস্যময় ট্রেনে উঠেছিল।

কেউ তার অভিজ্ঞতাকে দীর্ঘ মানসিক চাপের ফল বলেছিল। কেউ বলেছিল, সে একটি পুরোনো অপরাধের সত্যি জানতে গিয়ে নিজের স্মৃতির মধ্যে হারিয়ে গিয়েছিল।

অরিত্র কাউকে বোঝানোর চেষ্টা করেনি।

সে শুধু জানত, তার বাবা তাকে ভালোবেসেছিলেন। আর সেই ভালোবাসা কোনো কৃত্রিম স্মৃতি, কোনো যন্ত্র বা কোনো অদ্ভুত ট্রেনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

এক বছর পর, ১৯ অক্টোবর রাতে, অরিত্র আবার শিয়ালদহ স্টেশনের তিন নম্বর প্ল্যাটফর্মে গেল।

রাত ১১টা ৫৭ মিনিট।

কোনো ট্রেন এল না।

কোনো ঘোষণা শোনা গেল না।

শুধু দূরের সিগন্যালের আলো সবুজ থেকে লাল হলো, তারপর আবার সবুজ।

অরিত্র বেঞ্চে বসে আকাশের দিকে তাকাল।

হঠাৎ তার মোবাইলে একটি অজানা নম্বর থেকে বার্তা এল।

“অরি, আজ তুই ঠিক সময়ে বাড়ি ফিরিস। তোর মা অপেক্ষা করছে।”

অরিত্রর বুকের ভিতরটা কেঁপে উঠল।

বার্তাটি পড়ে সে দীর্ঘক্ষণ স্থির বসে রইল। তার মা আর বেঁচে নেই। এই কথাটা সে জানে।

তবু বার্তাটির শেষ বাক্যটি যেন তার হৃদয়ের গভীরে পৌঁছে গেল।

কারণ ছোটবেলায় বাবা ঠিক এই কথাটাই বলতেন—রাতে দেরি হলে বাড়ি ফিরতে বলতেন, আর শেষে যোগ করতেন, “তোর মা অপেক্ষা করছে।”

অরিত্র নম্বরটিতে ফোন করল।

নম্বরটি বন্ধ।

সে আবার বার্তাটির দিকে তাকাল।

তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।

সেদিন বাড়ি ফেরার পথে সে প্রথমবার অনুভব করল, বাবাকে হারানোর শোকের পাশাপাশি তার ভিতরে একটি নতুন শান্তিও জন্ম নিয়েছে।

সব প্রশ্নের উত্তর সে পায়নি। হয়তো কোনোদিন পাবে না।

কিন্তু প্রতিটি রহস্যের দরজা খুলতে হয় না। কিছু দরজা বন্ধ থাকলেও মানুষ নিজের জীবন নিয়ে এগিয়ে যেতে পারে।

বাড়ি পৌঁছে অরিত্র বাবার ছবির সামনে একটি প্রদীপ জ্বালাল।

তারপর মায়ের ছবির পাশে ছবিটি রেখে বলল, “আমি ভালো আছি। তোমরা নিশ্চিন্তে থেকো।”

জানালার বাইরে তখন রাত গভীর হয়েছে।

দূরে রেললাইনের দিক থেকে ভেসে এল একটি ট্রেনের শিস।

অরিত্র জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল।

কোনো ট্রেন দেখা গেল না।

শুধু অন্ধকারের মধ্যে যেন এক মুহূর্তের জন্য একটি কণ্ঠস্বর ভেসে এল—

“ভালো থাকিস, অরি।”

সে মৃদু হাসল।

তারপর জানালাটি বন্ধ করে ঘরের আলো নিভিয়ে দিল।

কারণ এবার সে জানত, শেষ ট্রেনের যাত্রী হওয়ার চেয়ে জীবনের পথে একজন সত্যিকারের মানুষ হয়ে চলা অনেক বেশি জরুরি।

আর তার বাবার জন্য সবচেয়ে বড় ভালোবাসা হবে—নিজের জীবনকে ভালোভাবে বাঁচিয়ে রাখা।

— সমাপ্ত —

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *