Categories
উপন্যাস বিবিধ

নীল খামের অভিশাপ (প্রথম পর্ব: যে চিঠি কখনও লেখা হয়নি)।

রাত তখন দুটো বেজে সতেরো মিনিট।

বাইরে প্রবল বৃষ্টি। পুরোনো বাড়িটার টিনের চালের ওপর বৃষ্টির শব্দ এমনভাবে আছড়ে পড়ছিল, যেন কেউ অগণিত ছোট ছোট পাথর ছুড়ে মারছে। মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ চমকে উঠছিল, আর সেই আলোয় এক মুহূর্তের জন্য স্পষ্ট হয়ে উঠছিল বাড়ির সামনের বিশাল কৃষ্ণচূড়া গাছটা। গাছের ডালপালাগুলো বাতাসে এমনভাবে দুলছিল, যেন অন্ধকারের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা কোনো অতিকায় প্রাণী হাত বাড়িয়ে কাউকে ডাকছে।

দোতলার দক্ষিণ দিকের ঘরে একা বসেছিল অনিরুদ্ধ।

বয়স আটাশ। পেশায় সাংবাদিক। শহরের একটি ছোট সংবাদপত্রে কাজ করে। অন্যায়, দুর্নীতি, প্রতারণা—এসব নিয়ে খবর লিখতে তার ভালো লাগে। ভূতপ্রেত কিংবা অলৌকিক ঘটনা নিয়ে তার কোনো আগ্রহ নেই। বরং কেউ এসবের গল্প করলে সে হাসত।

কিন্তু আজ তার সামনে রাখা নীল খামটা দেখে সেই হাসি কোথায় যেন হারিয়ে গিয়েছিল।

খামটি এসেছিল সন্ধ্যায়।

ডাকপিয়ন নয়, কুরিয়ার নয়—বাড়ির দরজার নিচ দিয়ে কে যেন গলিয়ে দিয়ে গিয়েছিল। খামের ওপর অনিরুদ্ধের নাম লেখা ছিল কালো কালিতে।

অনিরুদ্ধ সেন।

ঠিকানা লেখা ছিল তার বর্তমান বাড়ির। অথচ খামের ওপর কোনো ডাকটিকিট ছিল না, প্রেরকের নামও ছিল না।

প্রথমে সে ভেবেছিল, অফিসের কোনো সহকর্মীর মজা। কিন্তু খাম খুলে ভেতরের চিঠিটা পড়ার পর থেকে তার বুকের মধ্যে অস্বস্তিটা ক্রমশ বেড়ে চলেছিল।

চিঠিতে মাত্র কয়েকটি লাইন লেখা ছিল।

“অনিরুদ্ধ,

তুমি যদি সত্যিটা জানতে চাও, তবে আগামী শুক্রবার রাত বারোটায় শালবনের পুরোনো ডাকবাংলোয় এসো।

সঙ্গে কাউকে আনবে না।

সেখানে তোমার জন্য এমন একটি সত্য অপেক্ষা করছে, যা জানার পর তুমি আর কোনোদিন নিজের নামটাকেও বিশ্বাস করতে পারবে না।

আর একটা কথা—তোমার মা যেদিন মারা গিয়েছিলেন, সেদিন তিনি একা ছিলেন না।

— একজন পুরোনো পরিচিত”

চিঠির শেষ লাইনটা পড়ার পর অনিরুদ্ধের হাত ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল।

তার মা মারা গিয়েছিলেন সতেরো বছর আগে। তখন তার বয়স মাত্র এগারো। পরিবারের সবাই বলেছিল, হঠাৎ হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি মারা গিয়েছিলেন। অনিরুদ্ধের বাবা সেই ঘটনার পর থেকে একেবারে ভেঙে পড়েছিলেন। কয়েক বছর পর বাবাও মারা যান।

তারপর থেকে অনিরুদ্ধের জীবনে মা-বাবার স্মৃতি বলতে ছিল কিছু পুরোনো ছবি, কয়েকটি বই আর একটি কাঠের বাক্স।

কিন্তু তার মায়ের মৃত্যুর সঙ্গে কোনো রহস্য জড়িয়ে থাকতে পারে—এ কথা সে কখনও ভাবেনি।

চিঠিটা আবার পড়ল সে।

“তিনি একা ছিলেন না।”

কথাটা যেন মাথার ভেতরে বারবার প্রতিধ্বনিত হতে লাগল।

ঠিক তখনই ঘরের বাইরে করিডরে একটা শব্দ হলো।

টক।

অনিরুদ্ধ মাথা তুলল।

কেউ যেন দরজায় আঙুল দিয়ে টোকা দিয়েছে।

“কে?”

কোনো উত্তর এল না।

সে চেয়ার ছেড়ে উঠে দরজার কাছে গেল। দরজা খুলতেই করিডরটা ফাঁকা দেখতে পেল। বাড়ির বাকি অংশ অন্ধকারে ডুবে আছে। শুধু সিঁড়ির কাছের ছোট বাতিটা জ্বলছে।

অনিরুদ্ধ বাইরে বেরিয়ে দুদিকে তাকাল।

কেউ নেই।

সে যখন দরজা বন্ধ করতে যাবে, তখনই মেঝেতে চোখ পড়ল।

দরজার ঠিক সামনে পড়ে রয়েছে আরেকটি নীল খাম।

অনিরুদ্ধের বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।

সে ধীরে ধীরে খামটা তুলে নিল। প্রথম খামের মতোই একই রঙ, একই কাগজ, একই হাতের লেখা।

কিন্তু এবার খামের ওপর তার নামের নিচে লেখা ছিল—

“প্রথম চিঠিটা পড়ে থাকলে, এবার ঘড়ির দিকে তাকাও।”

অনিরুদ্ধের চোখ চলে গেল দেওয়ালে ঝোলানো ঘড়িটার দিকে।

রাত দুটো বেজে সতেরো মিনিট।

ঘড়ির কাঁটা থেমে আছে।

সে হাতঘড়ি দেখল। সেখানে সময় দুটো বেজে আঠারো মিনিট।

অর্থাৎ দেওয়ালের ঘড়িটা বন্ধ হয়ে গেছে।

অনিরুদ্ধ ঘড়িটার কাছে এগিয়ে গিয়ে কাচের ওপর হাত রাখল। কাঁটাগুলো সত্যিই নড়ছে না। অথচ কিছুক্ষণ আগেও ঘড়িটা চলছিল।

তারপর দ্বিতীয় খামটা খুলল সে।

ভেতরে একটি ছোট্ট সাদা কাগজ।

তাতে লেখা—

“ঘড়িটা থামেনি, অনিরুদ্ধ। থেমে গিয়েছিল সেদিন, যেদিন তোমার মা শেষবারের মতো এই বাড়ির দরজা পেরিয়ে বাইরে গিয়েছিলেন।

তুমি কি জানো, সেদিন তিনি কোথায় গিয়েছিলেন?”

অনিরুদ্ধ এবার আর নিজেকে শান্ত রাখতে পারল না।

সে চিঠিটা মুঠো করে ধরল।

“কে এসব করছে?” অন্ধকার করিডরের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করল সে। “সামনে এসো! লুকিয়ে থেকে এসব নাটক করার মানে কী?”

বাড়ির ভেতর তার কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হলো।

কিন্তু উত্তর এল না।

শুধু নিচতলার বন্ধ ঘর থেকে একবার খুব মৃদু একটা শব্দ ভেসে এল।

টিক।

তারপর আবার—

টিক।

যেন কোনো পুরোনো ঘড়ি হঠাৎ চলতে শুরু করেছে।

অনিরুদ্ধ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

নিচতলার ওই ঘরটা সতেরো বছর ধরে বন্ধ।

ঘরটার নাম ছিল তার মায়ের ঘর।

বাবা বেঁচে থাকতে কখনও কাউকে সেখানে ঢুকতে দিতেন না। বাবার মৃত্যুর পরও অনিরুদ্ধ ঘরটা খোলেনি। দরজার চাবি কোথায়, সেটাও তার জানা ছিল না।

কিন্তু আজ সেই ঘরের ভেতর থেকে ঘড়ির শব্দ আসছে!

সে সিঁড়ি দিয়ে ধীরে ধীরে নিচে নামল।

প্রতিটি ধাপে কাঠের সিঁড়ি কেঁপে উঠছিল। নিচতলার করিডরে পৌঁছে সে থামল। মায়ের ঘরের দরজাটা অন্ধকারের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে। দরজার ওপরের পুরোনো কাঠে ধুলো জমেছে। তালাটাও মরচে পড়ে কালচে হয়ে গেছে।

কিন্তু দরজার নিচ দিয়ে একটা সরু আলোর রেখা বেরিয়ে আসছে।

অনিরুদ্ধের গলা শুকিয়ে গেল।

ভেতরে আলো জ্বলছে!

সে দরজার হাতলে হাত রাখল।

হাতলটা বরফের মতো ঠান্ডা।

তারপর ধীরে ধীরে ঘোরাতেই দরজাটা কড়কড় শব্দ করে খুলে গেল।

ঘরের ভেতরে ঢুকে প্রথমেই তার চোখ পড়ল দেওয়ালে ঝোলানো একটি পুরোনো ঘড়ির দিকে। ঘড়িটা চলছিল। টিকটিক শব্দে ঘরটা ভরে উঠেছে।

কিন্তু এই ঘড়িটা তো তার মনে পড়ে না!

ঘরের মাঝখানে একটি কাঠের টেবিল। তার ওপর ধুলো জমে থাকা কয়েকটি বই, একটি ভাঙা ফুলদানি আর একটি ছোট্ট কাচের শিশি। জানলার পর্দা বাতাসে নড়ছে, যদিও জানলাটা ভেতর থেকে বন্ধ।

আর টেবিলের ওপর রাখা রয়েছে একটি নীল খাম।

অনিরুদ্ধ এগিয়ে গিয়ে খামটা তুলে নিল।

এবার খামের ওপর তার নাম লেখা নেই।

লেখা আছে—

“আমার ছেলে অনিরুদ্ধের জন্য। সে যখন সত্য জানার মতো বড় হবে, তখন এই চিঠি তাকে দিও।”

নিচে তার মায়ের নাম।

মাধবী সেন।

অনিরুদ্ধের চোখ ঝাপসা হয়ে এল।

মায়ের হাতের লেখা সে চিনতে পারল। ছোটবেলায় মা তাকে চিঠি লিখে স্কুলের ব্যাগে রেখে দিতেন। সেই বাঁকানো অক্ষর, শব্দের শেষে ছোট্ট টান—সবকিছু একই।

কিন্তু চিঠিটা এখানে এল কীভাবে?

এটা কি সতেরো বছর আগের?

কাঁপা হাতে খামটা খুলল সে।

ভেতরে চার পাতার একটি চিঠি। প্রথম পাতার ওপর তারিখ লেখা—বারোই জুলাই, সতেরো বছর আগে।

অনিরুদ্ধ পড়তে শুরু করল।

“আমার আদরের অনি,

যদি তুমি এই চিঠিটা পড়ো, তার মানে আমি হয়তো আর তোমার কাছে নেই। আমি জানি না, তোমাকে সত্যিটা বলার সুযোগ আমি কোনোদিন পাব কি না। তোমার বাবা আমাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তিনি তোমাকে সবকিছু জানাবেন। কিন্তু আমি তাঁকে বিশ্বাস করতে পারছি না।

তোমার জন্মের দিনটি আমার জীবনের সবচেয়ে আনন্দের দিন ছিল। কিন্তু সেই দিন থেকেই আমাদের পরিবারে এমন একটি গোপন সত্যের জন্ম হয়েছিল, যা একদিন তোমার জীবনকে বিপদের মুখে ঠেলে দিতে পারে।

তুমি আমার ছেলে। এই কথাটা আমি আমার শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত বিশ্বাস করব।

কিন্তু তুমি যাকে তোমার বাবা বলে জানো, তিনি তোমার জন্মের দিন হাসপাতালের সেই ঘরে ছিলেন না।”

অনিরুদ্ধের হাত থেকে চিঠিটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।

তার বাবা!

যে মানুষটি তাকে কোলে নিয়ে বড় করেছিলেন, স্কুলে পৌঁছে দিতেন, অসুস্থ হলে সারা রাত মাথার পাশে বসে থাকতেন—তিনি কি তার জন্মের সময় সেখানে ছিলেন না?

চিঠির পরের অংশ পড়তে গিয়ে সে বারবার থেমে যাচ্ছিল।

“আমি জানি, একদিন তুমি প্রশ্ন করবে, তোমার প্রকৃত বাবা কে। কিন্তু এখনই সেই উত্তর খুঁজতে যেয়ো না। কিছু মানুষ আছে, যারা চায় তুমি কখনও সত্যটা জানতে না পারো। তারা শুধু আমার শত্রু নয়, তারা তোমারও শত্রু।

যদি কোনোদিন তোমার কাছে নীল খাম আসে, তবে বুঝবে, সময় এসে গেছে।

কিন্তু সাবধান, অনি।

যে মানুষ তোমাকে সত্যের পথ দেখাবে, সে-ই হয়তো তোমাকে সবচেয়ে বড় মিথ্যেটা বলবে।

আর যে মানুষটাকে তুমি সবচেয়ে বেশি ভয় পাবে, তার কাছেই হয়তো তোমার জীবনের একমাত্র উত্তরটি রয়েছে।”

চিঠির শেষ পাতায় আর কিছু লেখা ছিল না। শুধু নিচে একটি নাম—

অরিন্দম।

নামটা পড়ে অনিরুদ্ধের মনে হলো, তার পরিচিত কারও নাম কি অরিন্দম?

হঠাৎ স্মৃতির মধ্যে একটা মুখ ভেসে উঠল।

অরিন্দম কাকু!

বাবার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। ছোটবেলায় প্রায়ই বাড়িতে আসতেন। অনিরুদ্ধ তাঁকে খুব ভালোবাসত। কিন্তু মায়ের মৃত্যুর পর তিনি হঠাৎ একদিন বাড়িতে আসা বন্ধ করে দেন। পরে শুনেছিল, তিনি নাকি অন্য রাজ্যে চলে গেছেন।

কিন্তু তাঁর নাম মায়ের চিঠিতে কেন?

ঠিক সেই সময় তার পেছনে একটা শব্দ হলো।

“চিঠিটা পেয়েছ?”

অনিরুদ্ধ ঘুরে দাঁড়াল।

দরজার কাছে একজন বৃদ্ধ দাঁড়িয়ে আছেন। ভেজা সাদা চুল, কাঁধে কালো চাদর, হাতে একটি পুরোনো ছাতা। তাঁর মুখে গভীর বলিরেখা, চোখ দুটো অস্বাভাবিক স্থির।

অনিরুদ্ধ তাঁকে চিনতে পারল না।

“আপনি কে? এই বাড়িতে ঢুকলেন কীভাবে?”

বৃদ্ধ ঘরের ভেতরে পা রাখলেন।

“আমি এমন একজন, যে তোমার জন্মের দিন থেকেই তোমার অপেক্ষা করছে।”

“আপনি কি অরিন্দম কাকু?”

বৃদ্ধের মুখে এক মুহূর্তের জন্য অদ্ভুত একটা হাসি ফুটে উঠল।

“তোমার মা আমাকে সেই নামে চিনতেন।”

“তার মানে আপনি অরিন্দম নন?”

“নাম দিয়ে মানুষকে চেনা যায় না, অনিরুদ্ধ। কখনও কখনও নামটাই মানুষের সবচেয়ে বড় ছদ্মবেশ।”

অনিরুদ্ধ এক পা পিছিয়ে গেল।

“আপনি আমার মাকে চিনতেন?”

“শুধু চিনতাম না। তাঁর শেষ রাতের ঘটনাও আমি জানি।”

“তাহলে বলুন! কী হয়েছিল সেদিন? আমার মা কীভাবে মারা গিয়েছিলেন?”

বৃদ্ধ জানলার দিকে তাকালেন। বাইরে বৃষ্টি আরও বেড়েছে।

“তোমার মা মারা যাননি, অনিরুদ্ধ।”

কথাটা শুনে অনিরুদ্ধের মনে হলো, ঘরের সব শব্দ এক মুহূর্তে থেমে গেছে।

“কী বললেন?”

“তোমার মা মারা যাননি।”

“কিন্তু আমি তো—আমি তো তাঁর মৃতদেহ দেখেছিলাম!”

“তুমি একটি মৃতদেহ দেখেছিলে। কিন্তু সেটি তোমার মায়ের ছিল কি না, তা তোমাকে কেউ প্রমাণ করে দেখিয়েছিল?”

অনিরুদ্ধের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

তার মনে পড়ল, সেদিন বাড়িতে প্রচুর লোক এসেছিল। তাকে একটি ঘরে আটকে রাখা হয়েছিল। বাবা বলেছিলেন, মা আর নেই। পরে সাদা কাপড়ে ঢাকা একটি দেহ দেখানো হয়েছিল। মুখটা স্পষ্ট মনে নেই। সবাই তাকে কাঁদতে বলেছিল, আর সে কেঁদেছিল।

কিন্তু সেই দেহটি কি সত্যিই তার মায়ের ছিল?

“আপনি মিথ্যে বলছেন!” অনিরুদ্ধ চিৎকার করে উঠল। “আপনি কে? কী চান আমার কাছে?”

বৃদ্ধ পকেট থেকে একটি ছোট্ট ছবি বের করলেন।

ছবিতে তিনজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছেন। একজন অনিরুদ্ধের মা, অন্যজন তার বাবা। মাঝখানে এক যুবক, যার মুখে অদ্ভুত এক পরিচিত হাসি।

অনিরুদ্ধ ছবিটা হাতে নিয়ে তাকিয়ে রইল।

যুবকটির মুখ তার নিজের মুখের সঙ্গে আশ্চর্যরকম মিল।

চোখ, নাক, ঠোঁট—এমনকি বাঁ ভ্রুর ওপর ছোট্ট কাটা দাগটাও একই।

অনিরুদ্ধের বাঁ ভ্রুর ওপর ওই দাগ জন্ম থেকেই আছে।

“এই লোকটা কে?” সে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল।

বৃদ্ধ উত্তর দিলেন না। বরং ছবির পেছনটা দেখতে বললেন।

অনিরুদ্ধ ছবিটা উল্টে দিল।

পেছনে লাল কালিতে লেখা—

“তিনজনের মধ্যে একজন মিথ্যে বলছে। একজন মৃত। আর একজন এখনও বেঁচে আছে।

বারোই জুলাই, ১৯৯৯।”

অনিরুদ্ধ ছবির তারিখের দিকে তাকিয়ে রইল।

তার জন্ম ১৯৯৯ সালের বারোই জুলাই।

আজও তার জন্মদিনের তারিখ।

কিন্তু ছবির যুবকটি কে?

বৃদ্ধ ধীরে ধীরে বললেন, “তুমি কি কখনও ভেবেছ, তোমার জন্মের পর তোমার বাবা কেন তোমার কোনো শিশুকালের ছবি তুলতে চাইতেন না? কেন তোমার জন্মের হাসপাতালের কাগজপত্র বাড়িতে নেই? কেন তোমার মা মারা যাওয়ার পর তোমাকে অন্য শহরে নিয়ে যাওয়ার কথা উঠেছিল?”

অনিরুদ্ধের মাথার ভেতর হাজারটা প্রশ্ন ঘুরতে লাগল।

“আপনি এত কিছু জানেন কীভাবে?”

“কারণ সেদিন হাসপাতালের সেই ঘরে আমিও ছিলাম।”

“আপনি কি আমার প্রকৃত বাবাকে চেনেন?”

বৃদ্ধ এবার সরাসরি তার চোখের দিকে তাকালেন।

“চিনি।”

“তাহলে তাঁর নাম বলুন!”

বৃদ্ধ ঠোঁট খুললেন, কিন্তু কিছু বলার আগেই বাইরে থেকে প্রচণ্ড শব্দ হলো। যেন বাড়ির সামনের দরজায় কেউ ভারী কিছু দিয়ে আঘাত করেছে।

ধড়াম!

দুজনেই চমকে উঠল।

বৃদ্ধ দ্রুত অনিরুদ্ধের হাত চেপে ধরলেন।

“আমাদের হাতে সময় নেই। তারা এসে গেছে।”

“কারা?”

“যারা তোমার মাকে সতেরো বছর ধরে খুঁজছে।”

“কিন্তু আমার মা যদি বেঁচে থাকেন, তাহলে তিনি কোথায়?”

বৃদ্ধ উত্তর দেওয়ার বদলে ঘরের পেছনের দেওয়ালের দিকে এগিয়ে গেলেন। সেখানে একটি বড় কাঠের আলমারি ছিল। তিনি আলমারির নিচের অংশে হাত ঢুকিয়ে কিছু একটা চাপ দিলেন।

সঙ্গে সঙ্গে দেওয়ালের একটা অংশ থেকে মৃদু শব্দ উঠল।

তারপর ধীরে ধীরে খুলে গেল একটি গোপন দরজা।

দরজার ওপারে সরু সিঁড়ি নেমে গেছে অন্ধকারের দিকে।

অনিরুদ্ধ অবিশ্বাসের চোখে তাকিয়ে রইল।

“এই বাড়ির মধ্যে এমন একটা ঘর আছে, আমি জানতামই না!”

বৃদ্ধ বললেন, “এই বাড়ির অনেক কিছুই তুমি জানো না। তোমার মা এই পথটা তৈরি করিয়েছিলেন। তিনি জানতেন, একদিন হয়তো তোমাকে পালাতে হবে।”

“কোথায় পালাব?”

“যেখানে তোমার জন্মের সত্য লুকিয়ে রাখা হয়েছে।”

বাইরে আবার দরজায় আঘাত পড়ল।

এবার সঙ্গে কারও কণ্ঠস্বর শোনা গেল।

“অনিরুদ্ধ! দরজা খোলো! আমরা জানি তুমি ভেতরে আছ!”

কণ্ঠস্বরটা শুনেই অনিরুদ্ধের বুকের ভেতর কেঁপে উঠল।

এটা তার পরিচিত কণ্ঠস্বর।

খুব পরিচিত।

এমন একজনের কণ্ঠস্বর, যাঁকে সে মৃত বলে জানে।

বৃদ্ধ তার মুখের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বললেন, “কণ্ঠস্বরটা চিনতে পেরেছ?”

অনিরুদ্ধ কথা বলতে পারল না।

বাইরে থেকে আবার ডাক এল।

“অনি, দরজা খোলো। আমি এসেছি।”

এই ডাক সে হাজারবার শুনেছে।

ছোটবেলায় স্কুল থেকে ফিরে। রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে। জ্বর হলে মাথায় হাত রেখে।

এটা তার বাবার কণ্ঠস্বর।

কিন্তু তার বাবা তো পাঁচ বছর আগে মারা গেছেন!

অনিরুদ্ধের চোখে আতঙ্ক জমে উঠল।

“এটা কীভাবে সম্ভব?”

বৃদ্ধ তাকে গোপন দরজার দিকে ঠেলে দিলেন।

“এখনই নিচে যাও। পেছনে তাকাবে না।”

“কিন্তু—”

“শোনো, অনিরুদ্ধ! তুমি যদি আজ রাতটা বেঁচে থাকতে চাও, তাহলে আমার কথা শুনবে। তোমার বাবা যদি সত্যিই বাইরে দাঁড়িয়ে থাকেন, তবে তিনি তোমার বাবা নন।”

ঠিক সেই মুহূর্তে মায়ের ঘরের দরজাটা নিজে থেকেই বন্ধ হয়ে গেল।

ঘরের ঘড়ি থেমে গেল।

টিকটিক শব্দ বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাইরের কণ্ঠস্বরও থেমে গেল।

তারপর দরজার ওপার থেকে খুব শান্ত, খুব পরিচিত একটি কণ্ঠ ভেসে এল—

“অনিরুদ্ধ, তুমি কি জানো, তোমার মাকে শেষবার কে দেখেছিল?”

বৃদ্ধের মুখের রং বদলে গেল।

তিনি অনিরুদ্ধকে সিঁড়ির দিকে ঠেলে দিয়ে বললেন, “যাও!”

অনিরুদ্ধ অন্ধকার সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে শুরু করল। তার পেছনে গোপন দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল।

নিচে পৌঁছে সে দেখল, ছোট্ট একটি ঘর। দেওয়ালে অসংখ্য পুরোনো ছবি, মাঝখানে লোহার আলমারি, আর এক কোণে একটি টেবিলের ওপর রাখা টেপ রেকর্ডার।

টেবিলের পাশে আরেকটি নীল খাম।

এবার খামের ওপর লেখা—

“অনিরুদ্ধের জন্মের সত্য—শুধুমাত্র তার নিজের হাতে খোলার জন্য।”

অনিরুদ্ধ খামটা খুলল।

ভেতরে একটি ছোট্ট কাগজ।

তাতে লেখা মাত্র একটি বাক্য—

“তোমার জন্মের দিন হাসপাতালে দুটি শিশু জন্মেছিল। তার মধ্যে একটি শিশু সেই রাতেই মারা যায়। অন্য শিশুটির পরিচয় বদলে দেওয়া হয়েছিল।”

অনিরুদ্ধের হাত কাঁপতে লাগল।

কাগজের নিচে আরও একটি লাইন ছিল।

“এখন প্রশ্ন হলো, তুমি কোন শিশুটি?”

ঠিক তখনই টেবিলের ওপর রাখা টেপ রেকর্ডারটি নিজে থেকেই চালু হয়ে গেল।

কয়েক সেকেন্ড শোঁ শোঁ শব্দের পর একটি নারীকণ্ঠ শোনা গেল।

“অনি, তুমি যদি এই রেকর্ডিং শুনতে পাও, তাহলে বুঝব, আমি তোমার কাছে পৌঁছতে পারিনি। আমি জানি না, তুমি এখন কত বড় হয়েছ। জানি না, তুমি আমাকে মনে রেখেছ কি না।”

কণ্ঠটা শুনে অনিরুদ্ধের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।

এটা তার মায়ের কণ্ঠস্বর।

“তোমাকে একটা কথা বলতে চাই, অনি। তুমি আমার গর্ভে জন্মেছিলে, কিন্তু তোমাকে কোলে নিয়ে প্রথম যে মানুষটি কেঁদেছিল, সে তোমার বাবা ছিল না। আর যেদিন তোমাকে আমার কাছ থেকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, সেদিন আমি প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, একদিন তোমাকে ফিরিয়ে আনব।

কিন্তু আমি দেরি করে ফেলেছি।

তোমার চারপাশে যারা আছে, তাদের কাউকে পুরোপুরি বিশ্বাস কোরো না। এমনকি এই রেকর্ডিংয়ের কথাও নয়।”

রেকর্ডিংয়ে কয়েক মুহূর্ত নীরবতা।

তারপর মায়ের কণ্ঠ আবার শোনা গেল।

“আর যদি কখনও অরিন্দমের সঙ্গে তোমার দেখা হয়, তবে তাকে জিজ্ঞেস কোরো—সেই রাতে দ্বিতীয় শিশুটিকে সে কোথায় নিয়ে গিয়েছিল।”

রেকর্ডিং হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল।

অনিরুদ্ধ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

দ্বিতীয় শিশু!

অরিন্দম!

তারপরই ঘরের এক কোণে রাখা লোহার আলমারির ভেতর থেকে তিনবার শব্দ হলো।

ঠক।

ঠক।

ঠক।

অনিরুদ্ধ ধীরে ধীরে আলমারির কাছে এগিয়ে গেল। দরজায় তালা লাগানো নেই। সে হাতল ধরে টানতেই আলমারির দরজা খুলে গেল।

ভেতরে কোনো জামাকাপড় বা কাগজপত্র নেই।

আছে একটি ছোট্ট কাঠের বাক্স।

বাক্সের ওপর লাল কালিতে লেখা—

“দ্বিতীয় শিশুটি এখনও বেঁচে আছে।”

অনিরুদ্ধ বাক্সটা খুলতে যাবে, ঠিক তখনই পেছনের দেওয়ালে থাকা একটি ছোট্ট স্পিকারে শব্দ হলো।

একটি পুরুষকণ্ঠ বলল—

“অনিরুদ্ধ, বাক্সটা খুলো না।”

সে ঘুরে দাঁড়াল।

কণ্ঠটা বৃদ্ধের নয়।

এটা তার নিজের কণ্ঠস্বর।

অবিকল তার মতো।

স্পিকার থেকে আবার সেই কণ্ঠ শোনা গেল।

“তুমি যদি বাক্সটা খোলো, তাহলে জানতে পারবে তোমার ভাই কোথায় আছে। কিন্তু তার সঙ্গে সঙ্গে এটাও জানতে পারবে, তোমার মা কেন তোমাকে বাঁচাতে গিয়ে নিজের পরিচয় মুছে ফেলেছিলেন।”

অনিরুদ্ধের নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল।

তার কোনো ভাই আছে?

সে কোনোদিন জানত না!

“কে তুমি?” সে স্পিকারের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করল। “আমার কণ্ঠে কথা বলছ কেন?”

উত্তর এল না।

তার বদলে ঘরের দেওয়ালে লাগানো ছোট্ট লাল আলোটা জ্বলে উঠল। তারপর টেবিলের ওপর রাখা একটি পুরোনো প্রিন্টার নিজে থেকেই চালু হয়ে গেল।

কাগজ বেরিয়ে আসতে লাগল।

একটি ছবি।

অনিরুদ্ধ ছবিটা হাতে তুলে নিল।

ছবিতে একটি হাসপাতালের ঘর। বিছানায় শুয়ে আছেন তার মা। পাশে দাঁড়িয়ে আছেন তরুণ বয়সের বাবা। আর বিছানার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একজন নার্সের কোলে দুটি নবজাতক শিশু।

ছবির পেছনে লেখা—

“বারোই জুলাই, ১৯৯৯। রাত ২টা ১৭ মিনিট।”

অনিরুদ্ধের চোখ আটকে গেল সময়টার ওপর।

রাত দুটো বেজে সতেরো মিনিট।

যে সময়ে তার বাড়ির দেওয়ালের ঘড়ি থেমে গিয়েছিল।

ছবির নিচে আরও একটি লাইন—

“একটি শিশুর নাম অনিরুদ্ধ সেন। অন্যটির নাম—”

নামের জায়গাটা ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে।

ঠিক তখনই গোপন ঘরের দরজায় প্রচণ্ড ধাক্কা পড়ল।

বৃদ্ধের কণ্ঠ ভেসে এল, “অনিরুদ্ধ! দরজা খোলো! আমি আর ওদের আটকে রাখতে পারব না!”

অনিরুদ্ধ বাক্সটা হাতে তুলে নিল।

দরজার ওপাশ থেকে আরেকটি কণ্ঠ শোনা গেল।

“অনি, ওর কথা শুনবে না। আমি তোমার বাবা।”

দুটি কণ্ঠ।

দুটি দাবি।

একজন বলছে, সে তোমাকে বাঁচাতে এসেছে।

অন্যজন বলছে, সে তোমার বাবা।

আর তোমার হাতে এমন একটি বাক্স, যার ভেতরে লুকিয়ে আছে তোমার জন্মের সবচেয়ে ভয়ংকর সত্য।

অনিরুদ্ধ বাক্সের ঢাকনায় হাত রাখল।

ঠিক তখনই বাক্সের ভেতর থেকে একটি মোবাইল ফোন বেজে উঠল।

এত পুরোনো বাক্সের ভেতরে মোবাইল ফোন!

সে ঢাকনা খুলে দেখল, একটি কালো ফোন। স্ক্রিনে একটি অচেনা নম্বর ভেসে উঠছে।

ফোনটা ধরতেই ওপাশ থেকে একটি মেয়ের কণ্ঠ শোনা গেল।

“হ্যালো, অনিরুদ্ধদা?”

“কে বলছেন?”

“আমি মেঘলা। আপনার বোন।”

অনিরুদ্ধের সমস্ত শরীর অবশ হয়ে গেল।

মেয়েটি কাঁদতে কাঁদতে বলল, “আমার হাতে আর সময় নেই। আপনি যদি আমাকে বাঁচাতে চান, তাহলে এখনই শালবনের পুরোনো ডাকবাংলোয় আসুন।”

“কিন্তু তুমি কে? তুমি কোথায়?”

মেয়েটি ফিসফিস করে বলল, “আপনি যাকে এতক্ষণ আপনার বাবা ভাবছেন, তিনি আসলে আপনার বাবা নন। আর যে মানুষটি আপনাকে সত্যি জানাতে চাইছেন, তিনি আপনার মাকে খুন করেছিলেন।”

অনিরুদ্ধের হাত থেকে ফোনটা পড়ে যাওয়ার উপক্রম হলো।

“কী বলছ তুমি?”

মেয়েটি শেষবারের মতো বলল—

“আর একটা কথা, দাদা। আমি জানি, আপনি এখন যে ঘরে দাঁড়িয়ে আছেন, সেখানে আপনার সঙ্গে আরেকজন আছে।”

অনিরুদ্ধ ধীরে ধীরে ঘুরে তাকাল।

ঘরের কোণে, অন্ধকারের মধ্যে, কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে।

তার মুখ দেখা যাচ্ছে না।

কিন্তু বিদ্যুতের আলো এক মুহূর্তের জন্য ঘরের ভেতরে এসে পড়তেই অনিরুদ্ধ সেই মুখ দেখতে পেল।

মুখটা তার নিজের।

একই চোখ। একই নাক। একই ঠোঁট। বাঁ ভ্রুর ওপর সেই একই কাটা দাগ।

অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি মৃদু হেসে বলল—

“অবশেষে দেখা হলো, ভাই।”

তারপর ঘরের সমস্ত আলো নিভে গেল।

চলবে…

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *