Categories
গল্প বিবিধ

কুয়াশার ভেতর হারিয়ে যাওয়া নাম।।

১. পুরোনো ফলকের রহস্য

শীতের সকাল। চারদিকে ঘন কুয়াশা, মাঠের ঘাসে শিশির, আর দূরের তালগাছগুলোকে মনে হচ্ছে ধূসর আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকটি ছায়ামূর্তি। এমনই এক সকালে নিজের মামাবাড়ি, কাশীপুর গ্রামে এসে পৌঁছল তেইশ বছরের তরুণী ইরা।

ইরা কলকাতায় একটি প্রকাশনা সংস্থায় কাজ করত। ছুটিতে গ্রামে আসার বিশেষ কোনো পরিকল্পনা তার ছিল না। কিন্তু কয়েক মাস আগে মারা যাওয়া তার দিদিমার পুরোনো জিনিসপত্র গোছাতে গিয়ে সে একটি ছোট নোটবই পেয়েছিল। নোটবইটির পাতায় পাতায় গ্রামের মানুষের নাম, কিছু পুরোনো বাড়ির বিবরণ এবং অদ্ভুত কয়েকটি মন্তব্য লেখা ছিল।

একটি পাতায় দিদিমা লিখেছিলেন—

“মানুষের নাম হারিয়ে যায় না, হারিয়ে যায় তাকে মনে রাখার মানুষেরা।”

কথাটির অর্থ ইরা বুঝতে পারেনি। তাই দিদিমার স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা গ্রামটিকে আরেকবার দেখার ইচ্ছা নিয়ে সে কাশীপুরে এসেছে।

বাড়িতে পৌঁছে সে প্রথমেই লক্ষ করল, গ্রামের প্রবেশপথে দাঁড়িয়ে থাকা পুরোনো পাথরের ফলকটির অর্ধেক লেখা মুছে গেছে। ফলকের নিচে কয়েকটি নাম খোদাই করা ছিল, কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেগুলো প্রায় অস্পষ্ট হয়ে পড়েছে।

ইরা কাছ থেকে দেখতে গিয়ে একটি নাম পড়তে পারল—‘হরিপদ দাস’।

নামের পাশে ছোট করে লেখা ছিল, ‘গ্রামের প্রথম চিকিৎসাসহায়ক’।

ইরা অবাক হলো। তার জানা ছিল না, গ্রামে কোনো একসময় এমন কেউ ছিলেন, যিনি চিকিৎসার কাজে মানুষের পাশে দাঁড়াতেন।

সে গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা নির্মলবাবুর কাছে গেল।

“কাকু, এই হরিপদ দাস কে ছিলেন?”

নির্মলবাবু কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “তুমি তাঁর নাম কোথায় পেলে?”

“গ্রামের পুরোনো ফলকে।”

বৃদ্ধ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। “তাঁর নাম তো এখন আর কেউ তেমন মনে রাখে না। অথচ একসময় এই গ্রামের মানুষ তাঁর কাছে ঋণী ছিল।”

সেই মুহূর্তে ইরার মনে হলো, দিদিমার নোটবইটি হয়তো কেবল পুরোনো নামের তালিকা নয়। তার পাতার মধ্যে লুকিয়ে আছে এমন কিছু গল্প, যেগুলো সময়ের কুয়াশায় হারিয়ে যাচ্ছে।

২. একজন সাধারণ মানুষের অসাধারণ কাজ

পরদিন সকালে ইরা নোটবইটি নিয়ে নির্মলবাবুর বাড়িতে গেল। বৃদ্ধ মন দিয়ে পাতাগুলো দেখলেন। তারপর ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলেন হরিপদ দাসের কথা।

প্রায় সত্তর বছর আগে কাশীপুরে চিকিৎসার সুবিধা ছিল খুবই সীমিত। গ্রামের অধিকাংশ মানুষ সামান্য অসুখেও সমস্যায় পড়তেন। তখন হরিপদ ছিলেন একজন সাধারণ কৃষিশ্রমিক। তাঁর নিজের কোনো বড় শিক্ষা ছিল না, কিন্তু মানুষের সেবা করার অদ্ভুত ইচ্ছা ছিল।

একবার তাঁর ছোট ভাই গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। কাছাকাছি চিকিৎসকের কাছে পৌঁছতে অনেকটা পথ পাড়ি দিতে হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতার পর হরিপদ ঠিক করেন, অন্তত প্রাথমিক চিকিৎসা সম্পর্কে যতটা সম্ভব শিখবেন, যাতে জরুরি পরিস্থিতিতে মানুষকে সঠিক সাহায্য পাওয়ার আগ পর্যন্ত সহায়তা করতে পারেন।

তিনি একজন স্বাস্থ্যকর্মীর কাছে প্রাথমিক পরিচর্যার প্রশিক্ষণ নেন। গ্রামের মানুষকে পরিচ্ছন্নতা, নিরাপদ পানীয় জল এবং অসুস্থ হলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার গুরুত্ব বোঝাতেন। কারও জ্বর হলে বা ছোটখাটো আঘাত লাগলে তিনি প্রাথমিক সহায়তা করতেন এবং প্রয়োজনে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করতেন।

কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় কাজ ছিল অন্য কিছু।

হরিপদ বুঝেছিলেন, গ্রামের অনেক অসুস্থ মানুষ চিকিৎসা নিতে দেরি করেন শুধু লজ্জা, ভয় কিংবা টাকার অভাবে। তাই তিনি কয়েকজনের সঙ্গে মিলে একটি ছোট সহায়তা তহবিল গড়ে তুলেছিলেন। গ্রামের যে পরিবার সামর্থ্য অনুযায়ী সাহায্য করতে পারত, তারা কিছু টাকা দিত। সেই টাকা থেকে দরিদ্র পরিবারের জরুরি যাতায়াত বা চিকিৎসার খরচে সাহায্য করা হতো।

নির্মলবাবু বললেন, “তিনি কখনো নিজের নাম প্রচার করতে চাননি। সাহায্য করার সময় বলতেন, মানুষ বিপদে পড়লে পাশে দাঁড়ানোই আসল কথা।”

ইরা মন দিয়ে সব লিখে নিল।

তারপর প্রশ্ন করল, “তাঁর এত কাজের কথা এখন আর কেউ জানে না কেন?”

বৃদ্ধ উত্তর দিলেন, “যাঁরা তাঁকে চিনতেন, তাঁরা একে একে চলে গেছেন। আর নতুন প্রজন্মের কাছে তাঁর গল্প পৌঁছয়নি। ফলকে নাম লিখলেই তো স্মৃতি বেঁচে থাকে না, যদি কেউ সেই নামের অর্থ না জানে।”

৩. নোটবইয়ের পাতায় পাতায়

ইরা এবার দিদিমার নোটবইটি ভালো করে পড়তে শুরু করল। সেখানে শুধু হরিপদের নাম ছিল না। ছিল আরও অনেক মানুষের পরিচয়—সাবিত্রী পাল, যিনি বহু বছর ধরে গ্রামের দরিদ্র শিশুদের পড়াতেন; আবদুল করিম, যিনি বন্যার সময় নিজের নৌকা দিয়ে মানুষকে নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দিতেন; বিনোদিনী দেবী, যিনি গ্রামের নারীদের মধ্যে স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে কাজ করতেন।

তাঁদের কেউ বিখ্যাত ছিলেন না। সংবাদপত্রে তাঁদের ছবি ছাপা হয়নি, কোনো বড় পুরস্কারও পাননি। কিন্তু তাঁদের কাজের প্রভাব ছড়িয়ে ছিল মানুষের প্রতিদিনের জীবনে।

ইরা অবাক হয়ে দেখল, দিদিমা প্রত্যেকের নামের পাশে একটি করে ছোট স্মৃতি লিখেছেন।

সাবিত্রী পালের নামের পাশে লেখা—“নিজে বই কিনতে পারতেন না, তবু অন্যের সন্তানকে পড়তে দিয়েছেন।”

আবদুল করিমের নামের পাশে—“বন্যার রাতে নিজের ঘরের দরজা খোলা রেখেছিলেন।”

আর বিনোদিনী দেবীর পাশে—“মানুষকে বোঝাতে কখনো ক্লান্ত হননি।”

ইরা বুঝতে পারল, এই নোটবইয়ের মধ্যে গ্রামের এক বিস্মৃত ইতিহাস লুকিয়ে আছে। এমন ইতিহাস, যা বড় বড় ঘটনার তালিকায় ধরা পড়ে না, কিন্তু মানুষের জীবনকে গভীরভাবে বদলে দেয়।

সে সিদ্ধান্ত নিল, যতটা সম্ভব তথ্য যাচাই করে এই মানুষগুলোর গল্প সংরক্ষণ করবে।

৪. সত্য যাচাইয়ের কঠিন কাজ

কাজটা যতটা সহজ ভেবেছিল, বাস্তবে ততটা সহজ ছিল না।

কিছু নামের সঙ্গে কোনো তারিখ লেখা ছিল না। কারও সম্পর্কে দুজনের বক্তব্যে পার্থক্য দেখা গেল। একজন বললেন, সাবিত্রী পাল প্রায় চল্লিশ বছর শিশুদের পড়িয়েছেন; অন্যজনের দাবি, তিনি মাত্র পঁচিশ বছর কাজ করেছিলেন।

ইরা বুঝল, আবেগ দিয়ে স্মৃতি লেখা যায়, কিন্তু সত্যনিষ্ঠ ইতিহাস তৈরি করতে হলে তথ্য যাচাই করতে হয়।

সে পুরোনো স্কুলের রেজিস্টার দেখার অনুমতি চাইল। পঞ্চায়েতের নথিতে খুঁজল সহায়তা তহবিলের উল্লেখ। গ্রামের প্রবীণ মানুষদের সঙ্গে আলাদা আলাদা করে কথা বলল। কারও কাছে পুরোনো ছবি ছিল, কারও কাছে হাতে লেখা হিসাবের খাতা।

একদিন এক ব্যক্তি তাকে বললেন, “হরিপদবাবু নাকি নিজের জমি বিক্রি করে তহবিল চালিয়েছিলেন।”

ইরা কথাটি শুনে চমকে গেল। কিন্তু অন্য কারও কাছে তার প্রমাণ পাওয়া গেল না। তাই সে নোটবইয়ে ওই দাবি লিখল না। বরং উল্লেখ করল যে তাঁর ব্যক্তিগত ত্যাগ সম্পর্কে কিছু প্রচলিত কথা থাকলেও সেগুলোর নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

এই সিদ্ধান্তে একজন প্রবীণ বাসিন্দা অসন্তুষ্ট হলেন।

“এত ভালো মানুষ সম্পর্কে লিখছ, একটু বড় করে লিখলে ক্ষতি কী?”

ইরা শান্তভাবে বলল, “ক্ষতি আছে কাকু। যাঁদের সম্মান জানাতে চাই, তাঁদের সম্পর্কে ভুল কথা লিখলে তাঁদের সত্যিকারের কাজটাই আড়াল হয়ে যাবে।”

বৃদ্ধ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। পরে তিনিই ইরাকে একটি পুরোনো হিসাবের খাতার সন্ধান দিলেন।

সেই খাতায় দেখা গেল, হরিপদ ও তাঁর সহযোগীরা বহু বছর ধরে ছোট ছোট অনুদান সংগ্রহ করেছিলেন। কে কত টাকা দিয়েছেন, কোথায় কত খরচ হয়েছে—তার হিসাবও রাখা ছিল।

ইরা যেন অন্ধকার ঘরে একটি জানালা খুলে ফেলল।

৫. গ্রামের মানুষের নতুন উদ্যোগ

প্রায় এক মাস ধরে কাজ করার পর ইরা গ্রামের স্কুলের প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে দেখা করল। সে প্রস্তাব দিল, যাচাই করা তথ্যের ভিত্তিতে গ্রামের বিস্মৃত সমাজসেবীদের নিয়ে একটি ছোট প্রদর্শনী করা যেতে পারে।

প্রধান শিক্ষক প্রথমে দ্বিধা প্রকাশ করলেন।

“এখনকার ছেলেমেয়েরা এসব পড়তে চাইবে কি?”

ইরা বলল, “তাদের শুধু নাম মুখস্থ করতে বলব না। দেখাব, সাধারণ মানুষ কীভাবে ছোট ছোট কাজের মাধ্যমে একটা সমাজকে ভালো রাখতে সাহায্য করেছেন।”

শিক্ষক প্রস্তাবে রাজি হলেন।

স্কুলের কয়েকজন ছাত্রছাত্রীকে নিয়ে ইরা কাজ শুরু করল। কেউ পুরোনো নথি সাজাল, কেউ প্রবীণদের সাক্ষাৎকার লিখে রাখল, কেউ ছবিগুলোর পরিচয় সংগ্রহ করল। তবে প্রত্যেক তথ্য প্রকাশের আগে যাচাই করা হলো, আর জীবিত ব্যক্তিদের বক্তব্য প্রকাশের ক্ষেত্রে তাঁদের সম্মতিও নেওয়া হলো।

প্রদর্শনীর নাম রাখা হলো—‘আমাদের গ্রামের নীরব নির্মাতারা’।

সেখানে হরিপদ দাসের কাজের পাশাপাশি অন্য মানুষদের অবদানও তুলে ধরা হলো। কোথাও তাঁদের কাজের প্রমাণ পাওয়া গেল, কোথাও স্মৃতির সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট করে লেখা হলো। কারও জীবনকে অতিরঞ্জিত করা হলো না, আবার তাঁদের অবদানও অবহেলা করা হলো না।

প্রদর্শনীর দিন স্কুলের উঠোনে প্রচুর মানুষ এলেন। যাঁরা আগে এসব নাম শোনেননি, তাঁরাও গল্পগুলো পড়ে থমকে দাঁড়ালেন।

একজন ছাত্র বলল, “আমরা তো ভাবতাম গ্রামের ইতিহাস মানে শুধু জমিদারবাড়ি আর পুরোনো মন্দির। আজ বুঝলাম, আমাদের পাশের সাধারণ মানুষও ইতিহাস তৈরি করেছেন।”

ইরা কথাটা শুনে হাসল।

তার মনে হলো, দিদিমার নোটবইয়ের আসল উদ্দেশ্য সে বুঝতে পেরেছে।

৬. নামের চেয়ে বড় স্মৃতি

প্রদর্শনীর কয়েক দিন পরে গ্রামসভায় সিদ্ধান্ত হলো, পুরোনো পাথরের ফলকটি মেরামত করা হবে। তবে শুধু ফলক পরিষ্কার করেই কাজ শেষ করা হবে না। তার পাশে একটি নতুন তথ্যফলক বসানো হবে, যেখানে গ্রামের ইতিহাসে অবদান রাখা মানুষদের সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত ও যাচাই করা তথ্য থাকবে।

হরিপদ দাসের নামটি আবার স্পষ্ট করে লেখা হলো। তার নিচে লেখা হলো—

“প্রাথমিক স্বাস্থ্যসচেতনতা ও দরিদ্র মানুষের জরুরি সহায়তায় অগ্রণী ভূমিকা পালনকারী গ্রামবাসী।”

এবার তাঁর নামের পাশে আর শুধু একটি অস্পষ্ট পরিচয় রইল না। তাঁর কাজের কথাও মানুষ জানতে পারল।

ইরা শহরে ফিরে যাওয়ার আগের দিন নির্মলবাবুর বাড়িতে গেল। বৃদ্ধ তাকে বললেন, “তুমি আমাদের পুরোনো মানুষদের আবার ফিরিয়ে আনলে।”

ইরা মাথা নেড়ে বলল, “আমি কাউকে ফিরিয়ে আনতে পারিনি। তাঁদের কাজের কথা শুধু নতুন করে শুনতে শিখেছি।”

নির্মলবাবু মৃদু হেসে বললেন, “সেটাই তো সবচেয়ে বড় কথা। আমরা অনেক সময় মনে করি, বড় মানুষদের গল্পই মনে রাখার মতো। অথচ সাধারণ মানুষের ছোট ছোট কাজেই সমাজের ভিত তৈরি হয়।”

সন্ধ্যায় ইরা গ্রামের প্রবেশপথের কাছে দাঁড়াল। কুয়াশা তখনও পুরোপুরি কাটেনি। পুরোনো ফলকের ওপর আলো পড়ে হরিপদ দাসের নামটি স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল।

ইরা দিদিমার নোটবইটি ব্যাগে রাখল। এবার সে জানত, এই নোটবই কেবল অতীতের স্মৃতি নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি দায়িত্বও।

কারণ মানুষের জীবন একদিন শেষ হয়, কিন্তু তার কাজ অন্য মানুষের মধ্যে বেঁচে থাকতে পারে। আর সেই কাজের কথা যতদিন কেউ সততার সঙ্গে বলে যায়, ততদিন কোনো নাম পুরোপুরি হারিয়ে যায় না।

নৈতিক শিক্ষা: সমাজের প্রকৃত অবদান সব সময় খ্যাতি বা পুরস্কারের মাধ্যমে মাপা যায় না। সাধারণ মানুষের নিঃস্বার্থ কাজও বহু মানুষের জীবনকে বদলে দিতে পারে। অতীতকে সম্মান করার পাশাপাশি তার তথ্য যাচাই করে সংরক্ষণ করা আমাদের দায়িত্ব, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সত্যিকারের অনুপ্রেরণা পায়।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *