শালিখা গ্রামের শেষ প্রান্তে ছিল একটা বিস্তীর্ণ নিচু জমি। বর্ষাকালে সেখানে জল জমত, শীতকালে দেখা যেত অসংখ্য ছোট ছোট পাখি, আর গ্রীষ্মের শেষে জমির বেশির ভাগ অংশ শুকিয়ে ফেটে যেত। গ্রামের বয়স্ক মানুষেরা জায়গাটাকে বলতেন ‘বড় বিল’। কিন্তু নতুন প্রজন্মের কাছে সেটি ছিল কেবল আগাছায় ঢাকা একটা পরিত্যক্ত জমি।
সেই গ্রামেরই মেয়ে ঐশী। কলেজে ভূগোল নিয়ে পড়ত সে। ছুটিতে বাড়ি ফিরলে গ্রামের পথঘাট ঘুরে দেখা, মানুষের সঙ্গে কথা বলা আর অচেনা জায়গা সম্পর্কে খোঁজ নেওয়া ছিল তার নেশা।
একদিন দুপুরে ঠাকুমার পুরোনো কাঠের আলমারি পরিষ্কার করতে গিয়ে সে একটা কাপড়ে মোড়া কাগজের পুঁটলি খুঁজে পেল। পুঁটলির ভেতরে ছিল কয়েকটি পুরোনো দলিল, কিছু বিবর্ণ ছবি এবং একটা হাতে আঁকা মানচিত্র।
মানচিত্রের কাগজ হলদে হয়ে গিয়েছিল। কোণগুলো ভাঙা, কয়েকটি জায়গায় কালি ছড়িয়ে গেছে। তবু নদী, পুকুর, খাল, রাস্তা আর বসতবাড়ির চিহ্নগুলো স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল।
ঐশী মানচিত্রটা ঠাকুমার সামনে মেলে ধরল।
“ঠাকুমা, এটা কীসের মানচিত্র?”
ঠাকুমা চোখে চশমা লাগিয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে বললেন, “এটা তোর ঠাকুরদার সংগ্রহে ছিল। অনেক বছর আগে গ্রামের জমিজমা আর জলাশয়ের অবস্থান বোঝাতে আঁকা হয়েছিল বলে শুনেছি। তখন তো এত বাড়িঘর ছিল না।”
ঐশী মানচিত্রের দিকে আরও ভালো করে তাকাল। গ্রামের বর্তমান রাস্তাগুলোর সঙ্গে পুরোনো রেখাগুলো মেলানোর চেষ্টা করতেই তার চোখ আটকে গেল একটা বড় নীল অংশে।
সেটি ঠিক সেই জায়গা, যেটাকে গ্রামের মানুষ এখন বড় বিল বলে।
কিন্তু মানচিত্রে শুধু জলাশয়ের চিহ্নই ছিল না। তার সঙ্গে যুক্ত ছিল সরু জলপথ, যা পাশের খাল পর্যন্ত চলে গেছে। বর্তমান সময়ে সেই জলপথের কোনো স্পষ্ট চিহ্ন দেখা যায় না।
ঐশীর মনে প্রশ্ন জাগল—জলপথটি কি সত্যিই হারিয়ে গেছে, নাকি মাটি, আবর্জনা আর পরিবর্তিত বসতির আড়ালে ঢাকা পড়েছে?
সে মানচিত্রের একটি ছবি তুলে রাখল। তারপর ঠাকুমাকে জিজ্ঞেস করল, “তুমি কি জানো, এই বিলের সঙ্গে আগে কোনো খাল যুক্ত ছিল?”
ঠাকুমা কিছুক্ষণ ভেবে বললেন, “ছোটবেলায় বর্ষার সময় ওই দিকে অনেক জল দেখেছি। গ্রামের লোকেরা বলত, বিলের জল পাশের খালের দিকে যেত। কিন্তু ঠিক কোথা দিয়ে যেত, তা আমি জানি না।”
ঐশীর কৌতূহল আরও বেড়ে গেল।
পরদিন সে মানচিত্রটি নিয়ে গেল তার কলেজের অধ্যাপক মধুমিতা সেনের কাছে। অধ্যাপিকা কাগজটি দেখে বললেন, “এটা গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হতে পারে। তবে একটা পুরোনো মানচিত্র দেখেই ধরে নেওয়া যাবে না যে জলপথটি এখনও মাটির নিচে আছে বা আগের মতো ফিরিয়ে আনা সম্ভব। সময়ের সঙ্গে জমির উচ্চতা, মালিকানা, বসতি—সবই বদলাতে পারে।”
ঐশী বলল, “তাহলে আমি কীভাবে এগোব?”
“প্রথমে মানচিত্রটির সময়কাল ও উৎস সম্পর্কে যতটা সম্ভব জানো। তারপর বর্তমান মানচিত্রের সঙ্গে তুলনা করো। স্থানীয় প্রবীণ মানুষদের স্মৃতিও শুনতে পারো। কিন্তু সব তথ্য আলাদা করে লিখবে—কোনটা নথিতে আছে, কোনটা মানুষের স্মৃতি, আর কোনটা তোমার অনুমান।”
এই পরামর্শ ঐশীকে নতুনভাবে ভাবতে শেখাল।
গ্রামে ফিরে সে কাজ শুরু করল। প্রথমে পুরোনো মানচিত্রের রেখাগুলো কাগজে পরিষ্কার করে আঁকল। তারপর গ্রামের বর্তমান রাস্তা, বাড়ি, পুকুর ও খালের অবস্থান চিহ্নিত করল। কোথায় দুই মানচিত্রের মিল রয়েছে, কোথায় অমিল—সব আলাদা রঙে দেখাল।
এরপর সে কথা বলতে গেল গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা হরিপদ কাকার কাছে।
হরিপদ কাকা একসময় গ্রামের কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ঐশীকে মানচিত্র দেখাতে তিনি অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন।
“এই যে বাঁকটা দেখছিস,” তিনি আঙুল রেখে বললেন, “আমাদের ছোটবেলায় বর্ষার জল এই দিক দিয়ে ছড়িয়ে পড়ত। এখন এখানে বাড়ি হয়েছে। জল ঠিক কোথায় যেত, সেটা নিশ্চিত করে বলতে পারব না। তবে বর্ষার সময় জমিটা যে অনেক বেশি ভিজে থাকত, তা মনে আছে।”
ঐশী তাঁর বক্তব্য খাতায় লিখে নিল। সে জানত, স্মৃতি গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা একা চূড়ান্ত প্রমাণ নয়।
পরবর্তী কয়েক দিনে আরও কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলল সে। কেউ বললেন, আগে বড় বিলে অনেক দেশি মাছ পাওয়া যেত। কেউ জানালেন, শীতকালে সেখানে পাখি নামত। আবার কেউ মনে করতে পারলেন না, কোনো খাল আদৌ ছিল কি না।
তথ্যের মধ্যে মিলও ছিল, অমিলও ছিল।
ঐশী হতাশ না হয়ে সবকিছু সাজিয়ে রাখল। তারপর সে গ্রামের বর্তমান জলাশয়টির অবস্থা দেখতে গেল। সঙ্গে ছিল তার বন্ধু ঋতম, যে পরিবেশবিজ্ঞান নিয়ে পড়ত।
বিলের একাংশে জল ছিল, অন্য অংশে ঘন আগাছা। কোথাও প্লাস্টিকের প্যাকেট পড়ে ছিল, কোথাও মাটি ফেলে জমির উচ্চতা বাড়ানো হয়েছে বলে মনে হচ্ছিল। কিন্তু পুরো জায়গাটি না দেখে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছনো সম্ভব ছিল না।
ঋতম বলল, “জলাভূমি মানে শুধু জল জমে থাকা জমি নয়। এর সঙ্গে পাখি, মাছ, জলজ উদ্ভিদ, মাটির আর্দ্রতা আর আশপাশের জলপ্রবাহ জড়িয়ে থাকে। এই জায়গার পরিবেশগত গুরুত্ব বোঝার জন্য বিশেষজ্ঞদের সমীক্ষা দরকার।”
ঐশী মাথা নাড়ল। সে বুঝতে পারছিল, তার হাতে থাকা মানচিত্রটি কেবল একটি সূত্র, সম্পূর্ণ উত্তর নয়।
কয়েক দিন পর সে গ্রামের পঞ্চায়েত কার্যালয়ে গেল। সঙ্গে নিল পুরোনো মানচিত্রের অনুলিপি, বর্তমান অবস্থানের তুলনামূলক চিত্র এবং প্রবীণ বাসিন্দাদের বক্তব্যের সংক্ষিপ্ত বিবরণ।
পঞ্চায়েতের এক কর্মী কাগজগুলো দেখে বললেন, “এগুলো দিয়ে অন্তত পুরোনো জলাশয় সম্পর্কে একটা প্রাথমিক আলোচনা শুরু করা যায়। তবে জমির বর্তমান রেকর্ড, সরকারি মানচিত্র এবং জলনিকাশি সংক্রান্ত নথি দেখতে হবে। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সাহায্য নিতে হবে।”
ঐশী বলল, “আমি চাই না, যাচাই না করে কেউ কোনো জমিকে জলাভূমি বলে দাবি করুক। শুধু জানতে চাই, পুরোনো মানচিত্রের তথ্যের সঙ্গে বর্তমান অবস্থার কী সম্পর্ক আছে।”
তার এই কথায় কর্মীটি সন্তুষ্ট হলেন। তিনি জানালেন, প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহের জন্য কীভাবে আবেদন করতে হবে।
কিন্তু গ্রামের সবাই বিষয়টাকে ভালোভাবে নিল না।
একদিন চায়ের দোকানে কয়েকজন বললেন, “পুরোনো কাগজ নিয়ে এত মাথা ঘামিয়ে লাভ কী? গ্রাম তো বদলাবেই। সবকিছু আগের মতো রাখা যায় নাকি?”
আরেকজন বললেন, “ঐশী কি তবে কারও জমি নিয়ে প্রশ্ন তুলতে চাইছে?”
কথাগুলো শুনে ঐশীর খারাপ লাগল। সে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ করেনি। তবু তার কাজকে ভুলভাবে বোঝা হচ্ছিল।
বাড়ি ফিরে সে ঠাকুমাকে সব জানাল।
ঠাকুমা বললেন, “মানুষ যখন কোনো কাজের উদ্দেশ্য বোঝে না, তখন সন্দেহ করতে পারে। তুই কাউকে দোষারোপ করিস না। যা জানিস, সেটুকুই বলিস। যা জানিস না, তা জানার চেষ্টা করিস।”
পরদিন ঐশী সিদ্ধান্ত নিল, সে গ্রামের স্কুলে একটি ছোট আলোচনা সভার আয়োজন করবে। সেখানে মানচিত্রটি দেখানো হবে, জলাভূমির গুরুত্ব বোঝানো হবে, আর কোন তথ্য এখনও যাচাই করা বাকি, সেটাও স্পষ্ট করে বলা হবে।
অনিরুদ্ধবাবু ও মধুমিতা সেনকে আমন্ত্রণ জানানো হলো। গ্রামের প্রবীণ মানুষ, কৃষক, ছাত্রছাত্রী এবং পঞ্চায়েতের প্রতিনিধিরাও এলেন।
ঐশী দেয়ালে দুটি মানচিত্র টাঙাল—একটি পুরোনো, অন্যটি বর্তমান অবস্থার ভিত্তিতে তৈরি। মাঝখানে সে লিখল, ‘প্রশ্ন থেকে অনুসন্ধান, অনুসন্ধান থেকে দায়িত্ব।’
সে বোঝাল, জলাভূমি বৃষ্টির জল ধরে রাখতে, জীববৈচিত্র্যকে আশ্রয় দিতে এবং স্থানীয় পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করতে সাহায্য করতে পারে। কিন্তু বড় বিলের পুরোনো সীমানা ও জলপথের সঠিক অবস্থান নিশ্চিত করতে নথি, পরিমাপ এবং বিশেষজ্ঞদের মতামত প্রয়োজন।
তারপর সে বলল, “আমি বলতে আসিনি যে সবকিছু আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতেই হবে। আমি শুধু জানতে চাই, আমাদের গ্রামের জলাভূমির ইতিহাস কী, এখন তার অবস্থা কেমন, আর ভবিষ্যতের জন্য আমরা কী করতে পারি।”
হরিপদ কাকা উঠে দাঁড়ালেন।
“আমরা ছোটবেলায় এখানে পাখি দেখতাম, মাছ ধরতাম। এখন অনেক কিছু বদলে গেছে। ঐশী অন্তত আমাদের সেই পুরোনো কথাগুলো আবার ভাবতে শিখিয়েছে। আগে যাচাই হোক, তারপর সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে।”
সেদিনের আলোচনা কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছল না। কিন্তু গ্রামের মানুষ বুঝতে পারল, পুরোনো মানচিত্রটি নিছক কাগজের টুকরো নয়। সেটি তাদের পরিবেশের অতীত সম্পর্কে অনুসন্ধানের দরজা খুলে দিয়েছে।
পরবর্তী মাসে প্রয়োজনীয় নথি যাচাইয়ের উদ্যোগ নেওয়া হলো। কিছু পুরোনো সরকারি মানচিত্রের সঙ্গে ঐশীর সংগৃহীত তথ্যের মিল পাওয়া গেল, আবার কয়েকটি রেখার অবস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেল। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জলাভূমির বর্তমান অবস্থা পরীক্ষা করার অনুরোধও জানানো হলো।
ঐশী জানত, এই কাজের ফল পেতে সময় লাগবে। তবু সে আনন্দিত ছিল। কারণ, এতদিন যে জমিটিকে সবাই অবহেলায় দেখত, এখন সেটি নিয়ে গ্রামের মানুষ প্রশ্ন করছে, আলোচনা করছে এবং তথ্য যাচাইয়ের প্রয়োজন অনুভব করছে।
শীতের এক সকালে ঐশী আবার বড় বিলের ধারে গেল। কুয়াশার আস্তরণ ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছিল। জলের ওপর দু-একটি পাখি নেমে এল। দূরে এক কৃষক জমির দিকে যাচ্ছিলেন।
ঐশী পুরোনো মানচিত্রটির কথা ভাবল। সেই মানচিত্র তাকে কোনো গুপ্তধনের কাছে নিয়ে যায়নি। বরং তাকে শিখিয়েছে, নিজের চারপাশের পরিচিত জায়গাকেও নতুন চোখে দেখা যায়। ইতিহাস কেবল অতীতের গল্প নয়; কখনও তা বর্তমানের সমস্যা বুঝতে সাহায্য করে, ভবিষ্যতের সিদ্ধান্তকেও আরও দায়িত্বশীল করে তোলে।
বাড়ি ফিরে সে মানচিত্রটি যত্ন করে আবার কাপড়ে মুড়ে রাখল। তবে এবার সেটি আলমারির অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া কাগজ ছিল না। সেটি হয়ে উঠেছিল একটি গ্রামের নিজের পরিবেশকে জানার প্রথম পদক্ষেপ।
নৈতিক শিক্ষা: কোনো পুরোনো তথ্য বা স্মৃতি মূল্যবান সূত্র হতে পারে, কিন্তু যাচাই ছাড়া তাকে চূড়ান্ত সত্য বলে ধরে নেওয়া উচিত নয়। কৌতূহল, নিরপেক্ষ অনুসন্ধান, মানুষের অভিজ্ঞতার প্রতি সম্মান এবং বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি একসঙ্গে থাকলে অতীতকে বুঝে বর্তমানের জন্য ভালো সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব।