Categories
গল্প বিবিধ

গল্প : শেষ ঘণ্টার পরেও যে স্কুলে স্বপ্নেরা জেগে থাকত।

শিউলিপুর গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়টির শেষ ঘণ্টা বাজত বিকেল চারটেয়। ঘণ্টার শব্দ শুনলেই ছাত্রছাত্রীরা বইখাতা গুছিয়ে বাড়ির পথে ছুটত। কেউ মাঠে খেলতে যেত, কেউ মায়ের কাজে সাহায্য করত, কেউ আবার ছোট ভাইবোনকে সামলানোর দায়িত্ব নিয়ে বাড়ি ফিরত।

কিন্তু স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র নীলের মনে হতো, চারটের ঘণ্টা যেন প্রতিদিন তার কাছ থেকে কিছু একটা কেড়ে নেয়।

নীল পড়তে ভালোবাসত। বিশেষ করে বিজ্ঞান আর অঙ্কের প্রতি তার ছিল অদ্ভুত আকর্ষণ। কোনো প্রশ্নের উত্তর না জানা পর্যন্ত তার শান্তি হতো না। অথচ বাড়িতে ফিরে পড়াশোনার পরিবেশ পাওয়া তার পক্ষে কঠিন ছিল। বাবা বাজারে সবজি বিক্রি করতেন, মা বাড়িতে বিড়ি বাঁধার কাজ করতেন। ছোট্ট ঘরে পরিবারের সবাইকে একসঙ্গে থাকতে হতো। সন্ধ্যা হলেই কাজের শব্দ, মানুষের কথাবার্তা আর সংসারের ব্যস্ততা পড়ায় মন বসতে দিত না।

নীলের সহপাঠী মিতালির সমস্যাটা ছিল অন্য রকম। তার মা অসুস্থ থাকায় স্কুল থেকে ফিরে তাকে রান্নাবান্না ও ঘরের কাজে সাহায্য করতে হতো। বই খোলার সময় পেত খুব কম।

আর রতনের বাবা ছিলেন রাজমিস্ত্রির জোগাড়ে। রতন মাঝেমধ্যে বাবার সঙ্গে কাজে যেত। সে পড়াশোনায় খারাপ ছিল না, কিন্তু স্কুলের পরে নিয়মিত অনুশীলন করতে না পারায় অঙ্কে বারবার পিছিয়ে পড়ছিল।

তিনজনের সমস্যাই আলাদা, কিন্তু তাদের ইচ্ছেটা ছিল এক—আরও একটু সময় পেলে তারা ভালোভাবে শিখতে পারত।

একদিন ক্লাসে শিক্ষক অরুণেশবাবু একটি প্রশ্ন করলেন।

“তোমরা বড় হয়ে কী হতে চাও?”

কেউ বলল ডাক্তার, কেউ পুলিশ, কেউ শিক্ষক। নীল উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “আমি এমন যন্ত্র বানাতে চাই, যা মানুষের কঠিন কাজ সহজ করে দেবে।”

ক্লাসের কয়েকজন হেসে উঠল।

অরুণেশবাবু কিন্তু হাসলেন না। তিনি নীলের দিকে তাকিয়ে বললেন, “স্বপ্ন দেখতে পারা ভালো। তবে স্বপ্নকে বাস্তব করতে হলে প্রতিদিন একটু একটু করে শিখতে হয়।”

কথাটা নীলের মনে রয়ে গেল।

সেদিন স্কুল ছুটির পরে সে দেখল, অরুণেশবাবু একা শ্রেণিকক্ষে বসে খাতা দেখছেন। জানালা দিয়ে বিকেলের আলো ঢুকছে। নীল দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বলল, “স্যার, স্কুল ছুটির পরে কি কিছুক্ষণ এখানে পড়তে পারি?”

অরুণেশবাবু খাতা থেকে মুখ তুললেন।

“কেন? বাড়িতে পড়তে অসুবিধা হয়?”

নীল মাথা নাড়ল। তারপর নিজের সমস্যার কথা খুলে বলল। শিক্ষক মন দিয়ে শুনলেন। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “তুমি একা পড়তে চাও, সেটা ভালো কথা। কিন্তু স্কুলের ঘর তো শুধু তোমার জন্য খোলা রাখা যাবে না। অন্যদেরও দরকার আছে কি না, সেটা জানতে হবে। আর নিরাপত্তা, শিক্ষকদের দায়িত্ব, স্কুলের নিয়ম—সবকিছুর ব্যবস্থা করতে হবে।”

নীল একটু হতাশ হলেও বুঝতে পারল, তার ইচ্ছেটা পূরণ করতে হলে পরিকল্পনা দরকার।

পরদিন সে মিতালি আর রতনের সঙ্গে কথা বলল। দুজনেই জানাল, স্কুল ছুটির পরে যদি এক ঘণ্টা পড়ার সুযোগ পাওয়া যায়, তাহলে তাদের খুব উপকার হবে।

কিন্তু শুধু তিনজনের ইচ্ছেতে তো স্কুলের নিয়ম বদলানো যায় না।

অরুণেশবাবু প্রধান শিক্ষককে বিষয়টি জানালেন। প্রধান শিক্ষক প্রথমে বললেন, “ভাবনাটা ভালো। কিন্তু স্কুলের সময়ের বাইরে ছাত্রছাত্রীদের রাখলে দায়িত্বের প্রশ্ন আছে। শিক্ষক কে থাকবেন? অভিভাবকদের অনুমতি কীভাবে নেওয়া হবে? বিদ্যুৎ, পানীয় জল আর ঘর বন্ধ করার ব্যবস্থাই বা কী হবে?”

অরুণেশবাবু বললেন, “সব সমস্যার সমাধান না করে শুরু করা ঠিক হবে না। আমরা আগে অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলতে পারি।”

পরের শনিবার স্কুলে একটি ছোট বৈঠক ডাকা হলো। কয়েকজন অভিভাবক এলেন। কেউ আগ্রহ দেখালেন, কেউ আবার চিন্তা প্রকাশ করলেন।

নীলের বাবা বললেন, “ছেলে যদি এক ঘণ্টা বেশি স্কুলে থাকে, তাহলে বাজারে আমাকে সাহায্য করবে কখন?”

মিতালির মা বললেন, “আমার মেয়েকে বাড়িতে ফিরেও অনেক কাজ করতে হয়। সময়টা এমন হলে ভালো হয়, যাতে তার অসুবিধা না হয়।”

প্রধান শিক্ষক প্রত্যেকের কথা শুনলেন। শেষে ঠিক হলো, প্রতিদিন নয়, সপ্তাহে তিন দিন মাত্র চল্লিশ মিনিটের একটি পরীক্ষামূলক পাঠচক্র চালু করা হবে। অংশগ্রহণ সম্পূর্ণ স্বেচ্ছামূলক হবে। অভিভাবকের অনুমতি লাগবে, আর একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষক উপস্থিত থাকবেন। কোনো শিশুর ওপর অতিরিক্ত কাজ চাপানো হবে না।

শর্তগুলো শুনে নীলের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।

প্রথম দিন পাঠচক্রে এসেছিল মাত্র সাতজন। কেউ অঙ্কের সমস্যার সমাধান করল, কেউ বাংলা পড়ে শোনাল, কেউ বিজ্ঞানের বই থেকে প্রশ্ন তুলল। অরুণেশবাবু উত্তর বলে দেওয়ার বদলে তাদের নিজেরাই ভাবতে উৎসাহ দিলেন।

একদিন তিনি একটি ছোট্ট সমস্যা দিলেন।

“একটি গাছের চারদিকে চারটি বেঞ্চ বসাতে হবে, কিন্তু প্রতিটি বেঞ্চে বসা শিশু যেন অন্যদের সঙ্গে কথা বলতে পারে। কীভাবে বসাবে?”

শিশুরা কাগজে নকশা আঁকতে শুরু করল। কেউ গোল করে, কেউ চৌকো করে, কেউ আবার বেঞ্চগুলোকে মুখোমুখি বসানোর পরিকল্পনা করল।

নীল বলল, “স্যার, যদি গোল করে বসাই, তাহলে সবাই একে অন্যকে দেখতে পাবে।”

শিক্ষক বললেন, “ঠিক। কিন্তু শুধু বসার ব্যবস্থা নয়, এমনভাবে ভাবো যাতে কেউ নিজেকে আলাদা মনে না করে।”

সেই দিন থেকেই পাঠচক্রের একটা নিয়ম তৈরি হলো—কেউ কোনো প্রশ্ন করলে তাকে নিয়ে হাসাহাসি করা যাবে না। ভুল উত্তর দিলেও সে আবার চেষ্টা করার সুযোগ পাবে।

ধীরে ধীরে পাঠচক্রে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা বাড়তে লাগল। তবে সবাই প্রতিদিন আসতে পারত না। কারও বাড়িতে কাজ থাকত, কারও যাতায়াতের সমস্যা, আবার কেউ ক্লান্ত হয়ে পড়ত।

নীল বুঝতে পারল, শুধু স্কুল খুলে রাখলেই সবার সমান সুযোগ তৈরি হয় না। প্রত্যেকের জীবনের পরিস্থিতিও বুঝতে হয়।

একদিন সে প্রস্তাব দিল, “যারা আসতে পারে না, তাদের জন্য আমরা কি ছোট ছোট প্রশ্নের কাগজ তৈরি করতে পারি? পরের দিন স্কুলে এসে উত্তর মিলিয়ে নেব।”

অরুণেশবাবু প্রস্তাবটি পছন্দ করলেন। তিনি কয়েকটি খাতা ও কাগজের ব্যবস্থা করলেন। ছাত্রছাত্রীরা পালা করে প্রশ্ন লিখত। কেউ অঙ্কের ধাঁধা, কেউ শব্দের খেলা, কেউ আবার প্রকৃতি নিয়ে ছোট প্রশ্ন তৈরি করত।

মিতালি বাংলা পড়তে ভালোবাসত। সে ছোট ছোট অনুচ্ছেদ লিখে তার নিচে তিনটি প্রশ্ন দিত। রতন অঙ্কের সমস্যা তৈরি করত। নীল পুরোনো বাক্সে কাগজগুলো বিষয় অনুযায়ী সাজিয়ে রাখত।

বাক্সটির নাম দেওয়া হলো ‘প্রশ্নের বাক্স’।

প্রতিটি সপ্তাহের শেষে সবাই মিলে বাক্স থেকে কয়েকটি প্রশ্ন তুলে আলোচনা করত। যে প্রশ্নের উত্তর কেউ জানত না, সেটি পরের সপ্তাহের জন্য রেখে দেওয়া হতো।

কিছুদিনের মধ্যেই দেখা গেল, আগে যারা ক্লাসে চুপ করে থাকত, তারাও প্রশ্ন করতে শুরু করেছে। মিতালি একদিন নিজের লেখা অনুচ্ছেদ পড়ে শোনাল। রতন এমন একটি অঙ্ক সমাধান করল, যা নিয়ে সে আগে বারবার ভুল করত।

কিন্তু সবকিছু সহজে চলছিল না।

এক মাস পরে স্কুলের বিদ্যুতের বিল ও অন্যান্য খরচ নিয়ে আলোচনা উঠল। কয়েকজন অভিভাবক প্রশ্ন করলেন, অতিরিক্ত সময় স্কুল চালানোর জন্য টাকা কোথা থেকে আসবে?

প্রধান শিক্ষক স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, কোনো বাধ্যতামূলক চাঁদা নেওয়া হবে না। স্কুলের অনুমোদিত ব্যবস্থা ও সীমিত সম্পদের মধ্যেই কাজ চালাতে হবে। প্রয়োজন হলে পাঠচক্রের সময় কিছুটা কমানো হবে, কিন্তু অর্থের অভাবে কোনো শিশুকে বাদ দেওয়া হবে না।

অরুণেশবাবু নতুন একটি ব্যবস্থা করলেন। পাঠচক্রের কিছু অংশ খোলা বারান্দায় অনুষ্ঠিত হতে লাগল, যাতে দিনের আলোতেই কাজ শেষ করা যায়। পাঠের জন্য অতিরিক্ত বই কেনার বদলে স্কুলের বিদ্যমান বইগুলো ব্যবহার করা হলো। স্থানীয় কয়েকজন অবসরপ্রাপ্ত মানুষ স্বেচ্ছায় মাসে এক দিন এসে শিশুদের গল্প, অঙ্ক কিংবা প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ নিয়ে কথা বলতে রাজি হলেন।

একদিন গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত ডাককর্মী নির্মলবাবু এলেন। তিনি শিশুদের বললেন, কীভাবে ঠিকানা পড়তে হয়, চিঠিতে পরিষ্কারভাবে কথা লিখতে হয় এবং অপরিচিত তথ্য যাচাই করতে হয়।

আরেক দিন এলেন স্থানীয় উদ্যানকর্মী সরস্বতীদেবী। তিনি স্কুলের ছোট বাগানে গাছের পাতা, শিকড় আর মাটির পার্থক্য দেখালেন।

পাঠচক্রটি আর শুধু বাড়ির কাজ শেষ করার জায়গা রইল না। সেটি হয়ে উঠল প্রশ্ন করার, অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়ার এবং নতুন কিছু শেখার একটি ছোট্ট পরিসর।

বছরের শেষে স্কুলে অভিভাবক সভা বসেছিল। প্রধান শিক্ষক জানালেন, পাঠচক্রে অংশ নেওয়া অনেক ছাত্রছাত্রী নিয়মিত অনুশীলনের সুযোগ পেয়েছে। তবে তিনি এটাও বললেন, শুধু পরীক্ষার নম্বর দিয়ে এই উদ্যোগের সাফল্য মাপা উচিত নয়। যারা আগে প্রশ্ন করতে ভয় পেত, তারা এখন নিজেদের কথা বলতে পারছে। যারা কোনো বিষয় বুঝতে দেরি করত, তারা অন্যের সাহায্য চাইতে শিখেছে।

নীলকে উঠে দাঁড়াতে বলা হলো।

সে একটু লজ্জা পেয়ে বলল, “আগে স্কুল ছুটির ঘণ্টা বাজলে আমার মনে হতো, পড়ার সময় শেষ। এখন বুঝেছি, শেখার অনেক পথ আছে। স্কুল আমাদের সেই পথগুলো খুঁজতে সাহায্য করেছে।”

তার কথা শুনে মিতালি আর রতন হাততালি দিল।

বাড়ি ফেরার সময় নীল স্কুলের দরজার দিকে তাকাল। বিকেলের আলোয় শ্রেণিকক্ষের জানালাগুলো সোনালি হয়ে উঠেছে। ভেতরে কয়েকটি খাতা গুছিয়ে রাখা, দেয়ালে ছাত্রছাত্রীদের আঁকা ছবি, আর এক কোণে সেই পুরোনো প্রশ্নের বাক্স।

নীল জানত, এই ছোট্ট উদ্যোগে গ্রামের সব সমস্যা মিটে যায়নি। কারও বাড়ির দায়িত্ব কমেনি, সবার পড়ার পরিবেশও তৈরি হয়নি। তবু একটি দরজা খুলেছে—এমন একটি দরজা, যেখানে প্রশ্ন করতে লজ্জা নেই, ভুল করতে ভয় নেই, আর শেখার ইচ্ছাকে অবহেলা করা হয় না।

সেদিন বাড়ি ফিরে সে নিজের খাতার প্রথম পাতায় লিখল—

“স্কুলের ঘণ্টা ক্লাস শেষ করে, শেখার ইচ্ছা নয়।”

তারপর সে নতুন একটি প্রশ্ন লিখতে শুরু করল। কারণ পরের সপ্তাহে প্রশ্নের বাক্সে দেওয়ার মতো আরও অনেক কিছু তার মাথায় ঘুরছিল।

নৈতিক শিক্ষা: শিক্ষার সুযোগ তৈরি করতে শুধু ভালো ইচ্ছা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন পরিকল্পনা, নিরাপত্তা, সহযোগিতা এবং প্রত্যেকের পরিস্থিতির প্রতি সম্মান। একটি ছোট উদ্যোগও তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা কাউকে পিছনে ফেলে নয়, বরং যতটা সম্ভব সবাইকে সঙ্গে নিয়ে এগোয়।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *