Categories
অনুগল্প বিবিধ

মঞ্চের আড়ালে শেষ মানুষটি।

কলকাতার এক পুরনো নাট্যদলে দীর্ঘ পঁচিশ বছর ধরে কাজ করতেন শশাঙ্ক পাল। তিনি কখনও মঞ্চে অভিনয় করেননি, কোনও নাটকের পোস্টারে তাঁর নামও ছাপা হয়নি। তাঁর কাজ ছিল মঞ্চের পর্দা তোলা, আলো জ্বালানো, অভিনেতাদের প্রয়োজনীয় জিনিস এগিয়ে দেওয়া এবং অনুষ্ঠান শেষে সবকিছু গুছিয়ে রাখা।

দর্শকেরা হাততালি দিতেন অভিনেতাদের জন্য। সংবাদপত্রে প্রশংসা ছাপা হতো নাট্যকার ও পরিচালকের। অথচ শশাঙ্ক জানতেন, মঞ্চের পেছনে সামান্য একটি ভুলও হলে বহু দিনের পরিশ্রম মুহূর্তে নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

দলে নতুন যোগ দিয়েছিল অনির্বাণ নামের এক তরুণ। নাটকের প্রধান চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পেয়ে সে খুবই আনন্দিত। তার অভিনয় ভালো ছিল, কিন্তু জনপ্রিয়তা পাওয়ার আগেই তার মনে অহংকার বাসা বাঁধতে শুরু করেছিল।

একদিন মহড়ার সময় অনির্বাণ বিরক্ত হয়ে বলল, “এই পুরনো পর্দা আর আলো দিয়ে কি আজকের দর্শককে মুগ্ধ করা যায়? সবকিছু আধুনিক হওয়া দরকার।”

শশাঙ্ক শান্তভাবে উত্তর দিলেন, “আধুনিক ব্যবস্থা অবশ্যই দরকার। তবে মঞ্চের জিনিস পুরনো হলেই খারাপ হয় না। তার যত্ন আর ব্যবহার জানাটাও গুরুত্বপূর্ণ।”

অনির্বাণ কথাটা গুরুত্ব দিল না। বরং অন্যদের সামনে বলে বসল, “মঞ্চের পেছনে যারা কাজ করেন, তাঁরা অভিনয়ের আসল পরিশ্রমটা বুঝবেন কী করে?”

কথাটি শশাঙ্কের কানে গেল। তিনি কোনও উত্তর দিলেন না। শুধু পরদিন থেকে অনির্বাণের প্রতিটি মহড়ার সময় আরও মনোযোগ দিয়ে কাজ করতে লাগলেন।

কয়েক সপ্তাহ পরে দলের সবচেয়ে বড় প্রযোজনার দিন এসে গেল। শহরের নামী সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে নাটকটির উদ্বোধনী প্রদর্শনী হওয়ার কথা। দর্শকাসন প্রায় পূর্ণ। উপস্থিত ছিলেন কয়েকজন বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্বও।

নাটক শুরু হওয়ার ঠিক আগে হঠাৎ মঞ্চের প্রধান আলোকব্যবস্থায় সমস্যা দেখা দিল। কয়েকটি আলো একসঙ্গে নিভে গেল। আধুনিক যন্ত্রের ত্রুটি খুঁজতে গিয়ে প্রযুক্তিবিদেরা বুঝলেন, সমস্যাটি মঞ্চের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার একটি সংযোগে। দ্রুত পরীক্ষা না করে সেটি চালু করা নিরাপদ নয়।

পরিচালক চিন্তায় পড়ে গেলেন। নাটক বন্ধ রাখতে হলে দর্শকদের হতাশ হতে হবে, আর তাড়াহুড়ো করে ব্যবস্থা চালু করলে বিপদ হতে পারে।

শশাঙ্ক এগিয়ে এলেন। তিনি বহু বছর ধরে ওই মঞ্চের পুরনো ও নতুন ব্যবস্থার পরিবর্তন দেখেছেন। প্রযুক্তিবিদদের সঙ্গে কথা বলে তিনি জানালেন, মঞ্চের পাশের একটি স্বাধীন আলোব্যবস্থা ব্যবহার করে আপাতত নাটকের কয়েকটি দৃশ্য সীমিত আলোয় করা যেতে পারে। তবে তার আগে সংশ্লিষ্ট কর্মীদের দিয়ে নিরাপত্তা পরীক্ষা করাতে হবে।

সবাই মিলে দ্রুত বিকল্প পরিকল্পনা তৈরি করল। কোনও ঝুঁকিপূর্ণ তার জোড়া লাগানো হলো না, কোনও ত্রুটিপূর্ণ যন্ত্র জোর করে চালানো হলো না। নিরাপদ আলোব্যবস্থা পরীক্ষা করে নেওয়ার পর পরিচালক নাটক শুরু করার সিদ্ধান্ত নিলেন।

প্রথম দৃশ্যে আলো কিছুটা কম ছিল। কিন্তু অভিনেতাদের সংলাপ, মুখের অভিব্যক্তি আর অভিনয়ের শক্তিতে দর্শকেরা ধীরে ধীরে নাটকের জগতে ডুবে গেলেন। অনির্বাণও নিজের চরিত্রে মন দিল। তার অভিনয় এতটাই আন্তরিক হলো যে শেষ দৃশ্যের পর হলজুড়ে হাততালি উঠল।

পর্দা নামার পরে অনির্বাণ ছুটে মঞ্চের পেছনে এল। শশাঙ্ক তখনও আলো বন্ধ করার ব্যবস্থা পরীক্ষা করছেন এবং কর্মীদের সাহায্যে যন্ত্রপাতি গুছিয়ে রাখছেন।

অনির্বাণ কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে বলল, “আজ আপনি না থাকলে হয়তো আমাদের নাটকটাই বন্ধ হয়ে যেত। আমি আপনার কাজকে ছোট করে দেখেছিলাম। আমাকে ক্ষমা করবেন।”

শশাঙ্ক মৃদু হেসে বললেন, “ক্ষমা চাওয়ার চেয়েও বড় কথা হলো, নিজের ভুলটা বুঝতে পেরেছ। মনে রেখো, মঞ্চে যে মানুষটি আলোয় দাঁড়ায়, তার সাফল্যের পেছনে অনেক মানুষ অন্ধকারে থেকে কাজ করেন।”

সেদিনের পর অনির্বাণের আচরণ বদলে গেল। সে দলের প্রত্যেক কর্মীর সঙ্গে সম্মান দিয়ে কথা বলতে শুরু করল। নাটকের পর্দা নামলে দর্শকদের অভিবাদন গ্রহণ করার পাশাপাশি মঞ্চের পেছনের কর্মীদেরও সামনে ডেকে পরিচয় করিয়ে দিত।

পরের প্রযোজনার অনুষ্ঠানে দলের পরিচালক ঘোষণা করলেন, “আজকের বিশেষ সম্মান সেই মানুষটির জন্য, যিনি বছরের পর বছর আমাদের মঞ্চকে সচল রেখেছেন।”

শশাঙ্ক প্রথমে সামনে আসতে চাননি। কিন্তু দলের সবাই হাততালি দিয়ে তাঁকে মঞ্চে ডেকে নিল। আলো এসে পড়ল তাঁর মুখে। জীবনে প্রথমবার তিনি সেই আলোয় দাঁড়ালেন, যা এত দিন অন্যদের জন্য জ্বালিয়ে রেখেছিলেন।

দর্শকদের হাততালির মধ্যে তাঁর চোখ ভিজে উঠল। তিনি বুঝলেন, সম্মান পেতে সব সময় সামনে থাকতে হয় না। কখনও কখনও নিষ্ঠার সঙ্গে নিজের দায়িত্ব পালন করাই মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয়।

শিক্ষা: কোনও কাজকেই ছোট করে দেখা উচিত নয়। দৃশ্যমান সাফল্যের পেছনে অনেক অদৃশ্য মানুষের শ্রম, দক্ষতা ও দায়িত্ববোধ থাকে। প্রকৃত সম্মান তখনই সম্পূর্ণ হয়, যখন আমরা প্রত্যেকের অবদানকে মর্যাদা দিতে শিখি।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *