Categories
উপন্যাস বিবিধ

মৃত্যুর আগে শেষ ফোন (দ্বিতীয় পর্ব: মৃত মানুষের গোপন ডায়েরি)।

ঘরের সমস্ত আলো নিভে যাওয়ার পর কয়েক সেকেন্ড ঋত্বিক কোনও কিছু দেখতে পেল না।

তার কানে তখনও বাজছে ফোনের ওপাশ থেকে ভেসে আসা শেষ কথাগুলো—

“আগামীকাল সকাল আটটা দশ মিনিটে যে মানুষটি মারা যাবে, সে আর কেউ নয়—তুমি নিজে।”

হঠাৎ জরুরি আলোর ক্ষীণ আলো জ্বলে উঠল।

ঋত্বিক মেঝের দিকে তাকাল।

যেখানে কিছুক্ষণ আগে একটি মৃতদেহ পড়ে ছিল, সেখানে এখন কেউ নেই।

শুধু মেঝেতে পড়ে রয়েছে রক্তমাখা ছুরি আর একটি পুরোনো চশমা।

“মৃতদেহটা কোথায় গেল?”

ঋত্বিকের কণ্ঠ কেঁপে উঠল।

দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশ অফিসার এগিয়ে এলেন।

“কোন মৃতদেহের কথা বলছেন?”

“অমিতাভ রায়! কিছুক্ষণ আগেও তো এখানে পড়ে ছিলেন!”

অফিসার বিস্মিত হয়ে বললেন, “আপনি কি অসুস্থ বোধ করছেন? এই ঘরে কোনও মৃতদেহ ছিল না। আমরা আপনাকে এখানে একা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি।”

ঋত্বিক হতভম্ব হয়ে গেল।

“আপনারা নিজের চোখে দেখেননি? আমি নিজেই তো আপনাদের ফোন করেছিলাম!”

অফিসার এবার সন্দেহের চোখে তাকালেন।

“আপনি আমাদের ফোন করেননি। এই বাড়ির দারোয়ান খবর দিয়েছিল যে দোতলায় একটা ঘর থেকে চিৎকার শোনা যাচ্ছে। আমরা এসে আপনাকে পাই।”

ঋত্বিক নিজের ফোন বের করল।

কলের তালিকায় অচেনা নম্বরটি রয়েছে। কিন্তু সেই কথোপকথনের কোনও রেকর্ড নেই।

সে ঘরের আলমারির দিকে ছুটে গেল। নীচের ড্রয়ার খুলতেই একটি লাল ফাইল দেখতে পেল।

ফাইলের প্রথম পাতায় বড় বড় অক্ষরে লেখা—

অনিরুদ্ধ চৌধুরী: মৃত্যুর প্রকৃত কারণ।

ঋত্বিকের হাত কেঁপে উঠল।

সে ফাইলটি খুলতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই পিছন থেকে একজন মহিলা বললেন, “ওটা খুলবেন না।”

ঋত্বিক ঘুরে তাকাল।

ঘরের কোণে দাঁড়িয়ে থাকা সেই মধ্যবয়সি মহিলা তার দিকে এগিয়ে আসছেন। তাঁর চোখে আর কান্না নেই। মুখে অদ্ভুত এক স্থিরতা।

“আপনি কে?” ঋত্বিক জিজ্ঞাসা করল।

মহিলা উত্তর দিলেন, “আমার নাম নন্দিতা রায়। আমি অমিতাভ রায়ের স্ত্রী।”

“আপনার স্বামী কোথায়?”

নন্দিতা কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বললেন, “আমার স্বামী বারো বছর আগে মারা গিয়েছেন।”

ঋত্বিকের বুকের ভিতরটা ধক করে উঠল।

“কিন্তু আজ সকালে তো—”

“আজ সকালে আপনি যা দেখেছেন, তা পুরোপুরি সত্যি নয়। এই বাড়িতে এমন অনেক ঘটনা ঘটে, যেগুলো বাইরে থেকে একরকম দেখায়, কিন্তু ভিতরের সত্য সম্পূর্ণ আলাদা।”

ঋত্বিক লাল ফাইলটি শক্ত করে ধরে বলল, “আমার বাবার নাম এখানে কেন?”

নন্দিতার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

“আপনার বাবা কি অনিরুদ্ধ চৌধুরী?”

“হ্যাঁ। বারো বছর আগে গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছিলেন।”

নন্দিতা ধীরে ধীরে মাথা নাড়লেন।

“তাহলে অবশেষে সেই দিন এসে গিয়েছে।”

“কোন দিন?”

“যেদিন আপনার বাবার মৃত্যুর সত্য প্রকাশ পাবে।”

তিনি দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন।

“আপনি যদি সত্যিই জানতে চান কী হয়েছিল, তাহলে আজ রাত দশটায় আমার সঙ্গে দেখা করবেন। ঠিকানা এই ফাইলের শেষ পাতায় রয়েছে।”

“এখনই বলুন!”

নন্দিতা থামলেন না।

শুধু যাওয়ার আগে বললেন, “একটা কথা মনে রাখবেন। আজ রাতের আগে কাউকে বিশ্বাস করবেন না। এমনকি নিজের চোখকেও নয়।”

তিনি চলে গেলেন।

ঋত্বিক ফাইলের শেষ পাতা খুলল।

সেখানে একটি ঠিকানা লেখা—

বাগবাজার, ১৪ নম্বর গলি, বাড়ি ৭।

ঠিকানার নীচে আরও একটি বাক্য—

‘মৃত্যুর আগে শেষ ফোন কখনও মৃত মানুষ করে না।’

ঋত্বিক বুঝতে পারছিল, তাকে এমন একটি রহস্যের মধ্যে টেনে আনা হয়েছে, যার প্রতিটি সূত্র তার বাবার মৃত্যুর সঙ্গে যুক্ত।

কিন্তু একটা প্রশ্ন তার মাথায় ঘুরছিল।

যদি অমিতাভ রায় বারো বছর আগেই মারা গিয়ে থাকেন, তাহলে ফোনের ওপাশে নিজেকে অমিতাভ পরিচয় দেওয়া মানুষটি কে?

আর যে মৃতদেহটি সে দেখেছিল, সেটি কার?


১. পুরোনো রেকর্ড রুম

সেদিন বিকেলেই ঋত্বিক কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের পুরোনো রেকর্ড রুমে পৌঁছল।

সেখানে তার সঙ্গে দেখা করলেন হাসপাতালের অবসরপ্রাপ্ত কর্মী প্রদীপ মজুমদার। কয়েক দিন আগে একটি পুরোনো সংবাদ প্রতিবেদন খুঁজতে গিয়ে ঋত্বিক তাঁর নাম পেয়েছিল।

“ডাক্তার সৌম্যদীপ বসুকে আপনি চিনতেন?” ঋত্বিক জিজ্ঞাসা করল।

প্রদীপবাবু চারপাশে তাকিয়ে নিচু গলায় বললেন, “চিনতাম। উনি বারো বছর আগে এখানে কাজ করতেন। তারপর হঠাৎ চাকরি ছেড়ে চলে যান।”

“কেন?”

“একটি অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনার পর।”

ঋত্বিকের বুকের ভিতরটা কেঁপে উঠল।

“কার মৃত্যু?”

“একজন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিকে হাসপাতালে আনা হয়েছিল। তাঁর শরীরে গুরুতর আঘাত ছিল। চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। কিন্তু কয়েক ঘণ্টা পরে মৃতদেহটি হাসপাতাল থেকে উধাও হয়ে যায়।”

“তারপর?”

“তদন্ত হয়েছিল। কিন্তু কোনও ফল পাওয়া যায়নি। ডাক্তার সৌম্যদীপ বলেছিলেন, মৃতদেহটি অন্য কারও নামে নথিভুক্ত করা হয়েছিল।”

ঋত্বিক জিজ্ঞাসা করল, “সেই মৃত ব্যক্তির নাম কী ছিল?”

প্রদীপবাবু পুরোনো রেজিস্টার বের করে পাতা উল্টাতে লাগলেন।

কিছুক্ষণ পরে একটি পাতায় আঙুল রাখলেন।

সেখানে লেখা—

রোগীর নাম: অনিরুদ্ধ চৌধুরী।

মৃত্যুর তারিখ: ১৭ অক্টোবর, ২০১৪।

ঋত্বিকের মাথা ঝিমঝিম করতে লাগল।

“কিন্তু আমার বাবার দুর্ঘটনার খবর তো ১৮ অক্টোবর প্রকাশিত হয়েছিল!”

প্রদীপবাবু বললেন, “কারণ দুর্ঘটনার খবর প্রকাশের আগেই হাসপাতালে অন্য একটি মৃত্যুর রেকর্ড তৈরি হয়েছিল। কেউ চাইছিল, ওই মৃতদেহটিকে আপনার বাবার মৃতদেহ হিসেবে শনাক্ত করা হোক।”

“তাহলে আমার বাবা কি সত্যিই মারা গিয়েছিলেন?”

প্রদীপবাবু উত্তর দিলেন না।

তিনি শুধু একটি ছোট্ট খাম ঋত্বিকের হাতে দিলেন।

“এটা ডাক্তার সৌম্যদীপ আমার কাছে রেখে গিয়েছিলেন। বলেছিলেন, কোনও দিন যদি অনিরুদ্ধ চৌধুরীর ছেলে আসে, তাহলে তাকে যেন দিয়ে দিই।”

খামের ভিতরে ছিল একটি পুরোনো হাসপাতালের ছবি।

ছবিতে পাশাপাশি দুটি স্ট্রেচারে দুজন মানুষ শুয়ে আছেন।

একজনের মুখে অক্সিজেনের মাস্ক। অন্যজনের মুখ ঢাকা সাদা চাদরে।

ছবির নীচে লেখা—

‘একজনকে মৃত ঘোষণা করা হয়েছিল। অন্যজনকে মৃত বলে দেখানো হয়েছিল।’

ঋত্বিক ছবি উল্টে দেখল।

পিছনে দুটি নাম লেখা—

অরিন্দম সেন।

অনিরুদ্ধ চৌধুরী।

কিন্তু এই দুই মানুষের মধ্যে সম্পর্ক কী?

সে ছবিটি পকেটে রাখল।

ঠিক তখনই ফোন বেজে উঠল।

অচেনা নম্বর।

ঋত্বিক ফোন ধরতেই সেই পরিচিত কণ্ঠ শোনা গেল।

“আপনি সঠিক জায়গায় পৌঁছেছেন।”

ঋত্বিক চিৎকার করে বলল, “আপনি কে? আমার বাবার কী হয়েছিল?”

ওপাশের লোকটি বলল, “আজ রাত দশটায় বাগবাজারের বাড়িতে যান। সেখানে আপনি আপনার প্রশ্নের উত্তর পাবেন।”

“আর ডাক্তার সৌম্যদীপ বসু? আপনি বলেছিলেন, আগামীকাল তাঁর খুন হবে!”

“আমি বলিনি যে তিনি মারা যাবেন। বলেছিলাম, তাঁর মৃত্যুর খবর আপনি পাবেন।”

ঋত্বিক স্তব্ধ হয়ে গেল।

“কথার এই খেলাটা কেন?”

“কারণ আপনি এখনও বুঝতে পারেননি, এই গল্পে জীবিত মানুষদের চেয়ে মৃত মানুষের পরিচয় অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।”

ফোন কেটে গেল।

ঋত্বিক দ্রুত হাসপাতালের কর্মীদের কাছে ডাক্তার সৌম্যদীপের বর্তমান ঠিকানা জানতে চাইল।

কিন্তু কেউ তাঁর সম্পর্কে কিছু জানাতে পারল না।

একজন কর্মী শুধু বললেন, “ডাক্তারবাবু গত কয়েক বছর ধরে নিখোঁজ।”

ঋত্বিকের মনে হল, রহস্যটা যত এগোচ্ছে, ততই আরও জটিল হয়ে উঠছে।


২. রাত দশটার সাক্ষাৎ

রাত দশটা পাঁচ।

বাগবাজারের ১৪ নম্বর গলির শেষ বাড়িটির সামনে দাঁড়িয়ে ঋত্বিক দরজায় কড়া নাড়ল।

দরজা খুললেন নন্দিতা রায়।

তিনি দ্রুত তাকে ভিতরে নিয়ে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলেন।

“আপনি দেরি করেছেন।”

“আমি ঠিক দশটাতেই পৌঁছেছি।”

“এই বাড়িতে সময়ের হিসাব অন্যভাবে চলে।”

ঋত্বিক বিরক্ত হয়ে বলল, “দয়া করে আর ধাঁধা দেবেন না। আমি সত্য জানতে চাই।”

নন্দিতা তাকে একটি ঘরে নিয়ে গেলেন। ঘরের মাঝখানে কাঠের টেবিল। তার উপর একটি পুরোনো টেপ রেকর্ডার, কয়েকটি ছবি এবং একটি কালো ডায়েরি।

“আপনার বাবা মৃত্যুর আগে এই ডায়েরিটা লিখেছিলেন,” নন্দিতা বললেন।

ঋত্বিক ডায়েরি খুলল।

প্রথম পাতায় লেখা—

‘১৭ অক্টোবর, ২০১৪।

আজ আমি এমন একটি সত্য জেনেছি, যার জন্য হয়তো আমাকে মরতে হবে। কিন্তু আমার ছেলেকে আমি সব সত্য জানিয়ে যেতে চাই।’

ঋত্বিক পড়তে লাগল।

ডায়েরির পরের পাতায় লেখা ছিল, তার বাবা একটি আর্থিক প্রতারণার ঘটনা তদন্ত করছিলেন। কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি মৃত মানুষের পরিচয় ব্যবহার করে সম্পত্তির মালিকানা বদলাচ্ছিলেন। হাসপাতালের রেকর্ড, মৃত্যুর শংসাপত্র এবং পুলিশের কিছু নথি বদলে দিয়ে তাঁরা কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি দখল করতেন।

এই চক্রের সঙ্গে যুক্ত ছিল একজন চিকিৎসক, একজন আইনজীবী এবং একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মালিক।

ঋত্বিকের চোখ আটকে গেল একটি নামের উপর।

ডাক্তার সৌম্যদীপ বসু।

সে বলল, “তাহলে ডাক্তারবাবু এই চক্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন?”

নন্দিতা মাথা নাড়লেন।

“প্রথমে ছিলেন। পরে তিনি সব বুঝতে পেরে চক্র থেকে বেরিয়ে আসতে চেয়েছিলেন। সেই কারণেই তাঁর জীবন বিপন্ন হয়ে পড়ে।”

“আর অমিতাভ রায়?”

“অমিতাভ ছিলেন আইনজীবী। তিনি ওই চক্রের জন্য নথি তৈরি করতেন। কিন্তু একসময় তিনি নিজের ভুল বুঝতে পেরেছিলেন। আপনার বাবাকে সাহায্য করার সিদ্ধান্ত নেন।”

ঋত্বিক বিস্ময়ে বলল, “কিন্তু আপনি তো বললেন, অমিতাভ বারো বছর আগে মারা গিয়েছেন!”

নন্দিতা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

“হ্যাঁ। কিন্তু তাঁর নাম ব্যবহার করে আরও একজন বহু বছর ধরে বেঁচে ছিল। আসল অমিতাভের মৃত্যু গোপন রাখা হয়েছিল, কারণ তিনি যে নথিগুলো সংগ্রহ করেছিলেন, সেগুলো এখনও চক্রের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় প্রমাণ।”

ঋত্বিক এবার কালো ডায়েরির শেষ পাতাটি খুলল।

সেখানে লেখা—

‘আমার মৃত্যুর পর যদি কেউ এই ডায়েরি পড়ে, তাহলে সে যেন মনে রাখে—আমি আমার ছেলেকে বাঁচানোর জন্য নিজের পরিচয় বদলাতে বাধ্য হয়েছিলাম। আমার ছেলে যদি কোনও দিন সত্যের খোঁজে ফিরে আসে, তাকে বলবে, সে যাকে বাবা বলে জানে, তার পরিচয়ই এই ষড়যন্ত্রের সবচেয়ে বড় অংশ।’

ঋত্বিকের হাত কাঁপতে লাগল।

“আমার বাবা কি নিজের পরিচয় বদলে ফেলেছিলেন?”

নন্দিতা ধীরে ধীরে মাথা নাড়লেন।

“আপনি যাঁকে বাবা বলে জানেন, তিনি হয়তো আপনার জৈবিক বাবা নন।”

ঋত্বিকের পৃথিবী যেন ভেঙে পড়ল।

“আপনি কী বলছেন? আমার মা আমাকে জন্ম দিয়েছেন। আমার বাবার সঙ্গে আমার ছোটবেলার ছবি রয়েছে। তিনি আমাকে বড় করেছেন!”

“আমি জানি। কিন্তু ছবির মানুষ আর আপনার জন্মের সত্য এক জিনিস নয়।”

“তাহলে আমার আসল বাবা কে?”

নন্দিতা উত্তর দেওয়ার আগে টেপ রেকর্ডারটি চালু করলেন।

একটি পুরুষকণ্ঠ শোনা গেল।

“ঋত্বিক, যদি তুই এই রেকর্ডিং শুনিস, তাহলে বুঝবি আমি আর তোর কাছে নেই। তোর জন্মের সত্য আমি এতদিন লুকিয়ে রেখেছিলাম, কারণ তোর জীবন বিপন্ন হয়ে পড়ত। তুই আমার ছেলে—এই কথাটা রক্তের সম্পর্ক দিয়ে বিচার করিস না। আমি তোকে বড় করেছি, ভালোবেসেছি, আর তোর জন্যই সবকিছু ছেড়ে দিয়েছি।”

ঋত্বিকের চোখে জল এসে গেল।

কণ্ঠটি তার বাবার।

রেকর্ডিং আবার চলতে লাগল।

“কিন্তু তোর জন্মের সঙ্গে এমন একজন মানুষের সম্পর্ক রয়েছে, যাকে সবাই মৃত বলে জানে। সেই মানুষটি যদি ফিরে আসে, তাহলে তুই বুঝতে পারবি কেন প্রতি বছর ১৮ অক্টোবর তোর ফোনে একটি অচেনা নম্বর থেকে কল আসে।”

রেকর্ডিং থেমে গেল।

ঋত্বিক নন্দিতার দিকে তাকাল।

“আমার ফোনে তো আজও সেই কল এসেছে।”

নন্দিতা মাথা নাড়লেন।

“কারণ যে মানুষটি আপনাকে ফোন করছে, সে আপনার জন্মের সত্য জানে। আর সে চায়, আপনি আগামীকাল সকাল আটটা দশ মিনিটে তার সঙ্গে দেখা করুন।”

“কোথায়?”

নন্দিতা একটি কাগজ এগিয়ে দিলেন।

সেখানে লেখা—

‘পুরোনো শ্মশানঘাট। গঙ্গার ধারে। সকাল ৮টা ১০ মিনিট।’

ঋত্বিক কাগজটি হাতে নিতেই তার ফোন বেজে উঠল।

একই অচেনা নম্বর।

সে ফোন ধরল।

ওপাশ থেকে কণ্ঠটি বলল—

“ঋত্বিক, কাল সকালে তুমি তোমার বাবাকে দেখতে পাবে।”

ঋত্বিকের চোখ বিস্ফারিত হয়ে গেল।

“কোন বাবাকে?”

ওপাশ থেকে উত্তর এল—

“যিনি তোমাকে জন্ম দিয়েছেন।”

ফোন কেটে গেল।

ঋত্বিক কিছুক্ষণ নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইল।

তারপর নন্দিতা বললেন, “কাল সকালে আপনি একা যাবেন না। কারণ যে মানুষটি আপনার সঙ্গে দেখা করতে আসবে, সে সত্য বলবে কি না, আমি জানি না।”

ঋত্বিক ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল।

“এবার আর পালাব না।”

কিন্তু দরজা খুলে বাইরে বেরোনোর সময় সে খেয়াল করল, ঘরের টেবিলে রাখা ছবিগুলোর মধ্যে একটি ছবিতে লাল কালি দিয়ে গোল দাগ দেওয়া রয়েছে।

ছবিতে দেখা যাচ্ছে, একটি হাসপাতালের সামনে তিনজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছেন।

একজন ডাক্তার সৌম্যদীপ বসু।

একজন অমিতাভ রায়।

আর তৃতীয় ব্যক্তি—

ঋত্বিক নিজে।

কিন্তু ছবিটি তোলা হয়েছিল ২০১৪ সালের ১৭ অক্টোবর।

সেই সময় ঋত্বিকের বয়স ছিল মাত্র আঠারো।

ছবির পিছনে লেখা—

‘তৃতীয় মানুষটি জানে না, সে নিজেই এই মামলার শেষ সাক্ষী।’

ঋত্বিক ছবিটি পকেটে রাখল।

বাইরে তখন বৃষ্টি শুরু হয়েছে।

তার ফোনে আবার একটি বার্তা এল।

‘কাল সকাল ৮টা ১০ মিনিট। সত্য জানার জন্য প্রস্তুত থাকুন। তবে মনে রাখবেন, যাঁকে আপনি বাবা বলে ডাকবেন, তিনি হয়তো আপনাকে চিনবেন না।’

ঋত্বিক আকাশের দিকে তাকাল।

তার মনে হল, বারো বছর আগে তার জীবনে যে অধ্যায় শুরু হয়েছিল, আগামীকাল সেই অধ্যায়ের শেষ হতে চলেছে।

কিন্তু সে জানত না, সত্য জানার পর তার সামনে আরও বড় বিপদ অপেক্ষা করছে।

কারণ রাত বারোটার ঠিক আগে তার বাড়ির দরজার নীচ দিয়ে কেউ একটি খাম ঢুকিয়ে দিল।

খামের ভিতরে একটি ছবি।

ছবিতে দেখা যাচ্ছে, শ্মশানঘাটের পাশে দাঁড়িয়ে একজন মানুষ ঋত্বিকের দিকে তাকিয়ে আছেন।

লোকটির মুখ অবিকল ঋত্বিকের নিজের মতো।

ছবির পিছনে মাত্র একটি বাক্য—

‘আগামীকাল তোমাদের মধ্যে একজনই বেঁচে থাকবে।’

দ্বিতীয় পর্ব সমাপ্ত।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *