Categories
অনুগল্প বিবিধ

মেঘের ভেতর লুকোনো ছবি।

পুরুলিয়ার এক ছোট্ট শহরে থাকত রুদ্র নামের এক কিশোর। তার বাবা ছিলেন বাসচালক, আর মা বাড়িতে বসে কাপড়ে নকশা তোলার কাজ করতেন। সংসারে অভাব ছিল, কিন্তু রুদ্রের কল্পনার কোনও অভাব ছিল না। আকাশে মেঘ দেখলেই সে নানা আকৃতি খুঁজে পেত—কখনও ঘোড়া, কখনও পাহাড়, কখনও আবার ডানা মেলা পাখি।

তবে তার সবচেয়ে বড় শখ ছিল ছবি আঁকা। পুরনো কাগজের উল্টো পিঠে, খাতার শেষ পাতায়, এমনকি বাজারের কাগজের ঠোঙাতেও সে ছবি আঁকত। কিন্তু তার স্কুলে ছবি আঁকার আলাদা শিক্ষক ছিলেন না। ফলে নিজের প্রতিভা নিয়ে সে প্রায়ই দ্বিধায় ভুগত।

একদিন স্কুলে ঘোষণা হলো, জেলার তরফে একটি শিল্প প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে। বিষয়—“আমার দেখা পৃথিবী”। বিজয়ী শিক্ষার্থীদের ছবি শহরের একটি প্রদর্শনীতে দেখানো হবে।

রুদ্র প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। কিন্তু তার কাছে ভালো রং ছিল না, বড় কাগজও ছিল না। সে মায়ের কাছে কিছু টাকা চাইতে গিয়ে থেমে গেল। সেদিন মায়ের হাতে কাজ কম ছিল, আর বাড়ির বাজারের খরচও বাকি।

রুদ্র শেষ পর্যন্ত নিজের পুরনো রংগুলো বের করল। কয়েকটির ঢাকনা হারিয়ে গেছে, কয়েকটি প্রায় শুকিয়ে এসেছে। সে ভাবল, নতুন রং না থাকলেও ছবির ভাবনা তো তার নিজের।

পরদিন স্কুল থেকে ফেরার সময় সে দেখল, রাস্তার ধারে এক বৃদ্ধ মানুষ বসে আছেন। তাঁর সামনে কয়েকটি আঁকা ছবি রাখা, কিন্তু কেউ সেগুলোর দিকে বিশেষ নজর দিচ্ছে না। ছবিগুলোর মধ্যে ছিল গ্রামের মেলা, মাঠে কাজ করা মানুষ, পুকুরের ধারে বসে থাকা মেয়ে আর সন্ধ্যার আকাশ।

রুদ্র থেমে ছবিগুলো দেখতে লাগল। বৃদ্ধের নাম নিবারণ দাস। একসময় তিনি মেলার জন্য দৃশ্যপট আঁকতেন, কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কাজ কমে গেছে।

রুদ্র জিজ্ঞেস করল, “আপনি এত সুন্দর ছবি আঁকেন, তবু এগুলো বিক্রি হচ্ছে না কেন?”

নিবারণবাবু হেসে বললেন, “ছবি সুন্দর হলেই হয় না রে। কখনও মানুষকে ছবির কাছে আসতে হয়, কখনও ছবিকে মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হয়।”

কথাটা রুদ্রের মনে দাগ কাটল। সে নিজের প্রতিযোগিতার কথা জানাল। বৃদ্ধ তার আঁকার খাতা দেখতে চাইলেন। কয়েকটি ছবি দেখে তিনি বললেন, “তোর চোখে কল্পনা আছে। এখন শিখতে হবে, সেই কল্পনাকে কাগজে স্পষ্ট করে কীভাবে প্রকাশ করতে হয়।”

পরবর্তী কয়েক দিন স্কুল ছুটির পরে রুদ্র নিবারণবাবুর কাছে যেতে লাগল। বৃদ্ধ তাকে রং মেশানো, আলো-ছায়া বোঝা এবং ছবির মধ্যে দূরত্বের অনুভূতি তৈরি করার সহজ পদ্ধতি শেখালেন। বিনিময়ে রুদ্র তাঁর ছবিগুলোর পরিষ্কার ছবি তুলে পরিচিতদের দেখাতে সাহায্য করল। নিবারণবাবুর অনুমতি নিয়ে সে কয়েকটি ছবির সঙ্গে শিল্পীর সংক্ষিপ্ত পরিচয়ও লিখে দিল।

প্রতিযোগিতার আগের রাতে রুদ্র তার ছবির বিষয় ঠিক করল। সে আঁকবে মেঘে ঢাকা একটি পাহাড়ি গ্রাম, যেখানে ছোট ছোট বাড়ির জানালা দিয়ে আলো বেরিয়ে আসছে। ছবির এক পাশে থাকবে মাঠে কাজ করা মানুষ, অন্য পাশে থাকবে নদীর ধারে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকটি শিশু। আকাশের মেঘগুলো অন্ধকার হলেও দিগন্তে ফুটে উঠবে সকালের আলো।

ছবিটির নাম দিল—‘আলো আসার আগে’।

প্রতিযোগিতার দিন রুদ্রের হাতে দামি রং ছিল না, কিন্তু প্রতিটি রঙের ব্যবহার সে ভেবেচিন্তে করেছিল। কোথাও হালকা নীলের সঙ্গে সাদা মিশিয়েছে, কোথাও বাদামি রঙের ওপর সামান্য হলুদ দিয়ে আলো ফুটিয়েছে। ছবিটি শেষ করতে করতে তার হাত ব্যথা হয়ে গিয়েছিল, তবু সে থামেনি।

ফল প্রকাশের দিন রুদ্র প্রথম পুরস্কার পেল না। তার ছবি তৃতীয় স্থান অধিকার করল। প্রথম মুহূর্তে মন খারাপ হলেও বিচারকদের একজন তার কাছে এসে বললেন, “তোমার ছবিতে শুধু প্রকৃতি নেই, মানুষের জীবনের কথাও আছে। এই দৃষ্টিটা ধরে রেখো।”

প্রদর্শনীর দিন আরও বড় ঘটনা ঘটল। নিবারণবাবুর কয়েকটি ছবিও স্থানীয় শিল্পীদের উদ্যোগে সেখানে প্রদর্শনের জন্য রাখা হয়েছিল। দর্শকেরা তাঁর ছবির সামনে দাঁড়িয়ে নানা প্রশ্ন করতে লাগলেন। একজন সাংস্কৃতিক সংগঠক তাঁর কাজের কথা শুনে ভবিষ্যতের একটি কর্মশালায় তাঁকে আমন্ত্রণ জানালেন।

সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরার পথে রুদ্র বলল, “আমি ভেবেছিলাম, পুরস্কার না পেলে আমার ছবি আঁকার স্বপ্ন শেষ হয়ে যাবে।”

নিবারণবাবু উত্তর দিলেন, “একটা প্রতিযোগিতা তোমার প্রতিভার শেষ বিচারক নয়। পুরস্কার আনন্দ দেয়, কিন্তু শেখার ইচ্ছা তোমাকে অনেক দূর নিয়ে যায়।”

কয়েক বছর পরে রুদ্র শিল্পকলায় পড়াশোনা শুরু করল। নিবারণবাবুও আবার নিয়মিত ছবি আঁকার কাজ পেলেন। তাঁদের বন্ধুত্বের শুরু হয়েছিল মেঘের আকৃতি দেখতে দেখতে, আর সেই বন্ধুত্ব দুজন মানুষকেই নতুন করে নিজের কাজের প্রতি বিশ্বাস করতে শিখিয়েছিল।

রুদ্র আজও আকাশের মেঘ দেখে ছবি আঁকার বিষয় খুঁজে পায়। তবে সে জানে, মেঘের ভেতর লুকিয়ে থাকা ছবি শুধু কল্পনায় দেখা যায় না; ধৈর্য, অনুশীলন আর সঠিক দিকনির্দেশনা দিয়ে সেই ছবিকে বাস্তবেও ফুটিয়ে তোলা যায়।

শিক্ষা: প্রতিভা বিকশিত করতে দামি উপকরণের চেয়ে বেশি প্রয়োজন কৌতূহল, নিয়মিত অনুশীলন এবং শেখার মানসিকতা। একটি ব্যর্থতা বা প্রত্যাশিত ফল না পাওয়া কখনও স্বপ্নের শেষ নয়; বরং তা আরও ভালোভাবে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *