Categories
উপন্যাস বিবিধ

চৌদ্দ নম্বর ঘর (তৃতীয় ও শেষ পর্ব: যে জীবনটি বেছে নেওয়া হয়েছিল)

“এবার তোমাকে এমন একটি সত্য জানাতে হবে, যার জন্য হয়তো তুমি আমাকে কোনওদিন ক্ষমা করতে পারবে না।”

বাবার কথা শেষ হতেই পরিত্যক্ত হাসপাতালের ঘরটায় যেন আরও ঘন হয়ে উঠল অন্ধকার। অরিত্র সেন স্থির চোখে তাকিয়ে রইল অরিন্দমের দিকে। পাশে দাঁড়িয়ে অদিতি। তার মুখেও আতঙ্ক, কিন্তু সে একবারও ভাইয়ের হাত ছাড়ল না।

অরিত্র ধীরে ধীরে বলল, “এত বছর ধরে তুমি আমার কাছে কী লুকিয়ে রেখেছ, বাবা? আমি কে? ঘর চোদ্দোতে যে মানুষটা আছে, সে কে? আর মনিটরে যে আমাকে বলল, আমি বাইরে এলে সে জন্মাবে না—তার মানে কী?”

অরিন্দম টেবিলের ওপর রাখা ছোট্ট ধাতব যন্ত্রটার দিকে তাকালেন। যন্ত্রটির মাঝখানে লাল আলো জ্বলছিল। প্রতিবার আলো জ্বলে উঠলে পাশের মনিটরে অস্পষ্ট কিছু রেখা ফুটে উঠছিল।

“১৯৯৮ সালের ১৬ নভেম্বর,” বাবা বলতে শুরু করলেন, “তোমাদের জন্মের আগের রাত। তোমার মা যমজ সন্তানের জন্ম দিতে চলেছিলেন। চিকিৎসকেরা আশঙ্কা করেছিলেন, একটি শিশুকে বাঁচানো কঠিন হতে পারে। আমি তখন স্মৃতি ও মস্তিষ্কের সংকেত নিয়ে একটি গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। আমাদের উদ্দেশ্য ছিল, মানুষের মস্তিষ্কে জমে থাকা স্মৃতিকে শুধু সংরক্ষণ করা নয়, বরং সংকটের মুহূর্তে মস্তিষ্কের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়াগুলোকেও নথিবদ্ধ করা।”

“কিন্তু একটা শিশুকে বাঁচানোর সঙ্গে স্মৃতি সংরক্ষণের সম্পর্ক কী?” অরিত্র প্রশ্ন করল।

“সরাসরি কোনও সম্পর্ক ছিল না। সম্পর্ক তৈরি করেছিল আমার ভয়। তোমাদের একজনকে হারানোর আশঙ্কা আমি সহ্য করতে পারিনি। আমি গবেষণার যন্ত্র ব্যবহার করে তোমার মায়ের চিকিৎসার সময় তোমার মস্তিষ্কের সম্ভাব্য স্নায়বিক প্রতিক্রিয়ার একটি নথি তৈরি করেছিলাম। আমি ভেবেছিলাম, এতে চিকিৎসকদের সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য হবে।”

বাবা থামলেন। তাঁর কণ্ঠ কেঁপে উঠল।

“কিন্তু পরীক্ষাটি প্রত্যাশামতো কাজ করেনি। যন্ত্রটি শুধু তোমার সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া রেকর্ড করেনি। তোমার জন্মকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া দুটি সম্ভাব্য জীবনপথের স্মৃতি, ভয়, অনুভূতি এবং ভবিষ্যৎ আচরণের একটি অস্বাভাবিক মডেল তৈরি করেছিল। একটি জীবনপথে তুমি বেঁচে ছিলে। অন্যটিতে তুমি জন্মের আগেই হারিয়ে গিয়েছিলে। সেই হারিয়ে যাওয়া জীবনের সমস্ত অসমাপ্ত স্মৃতি যন্ত্রের মধ্যে জমা হতে থাকে।”

অরিত্রের গলা শুকিয়ে গেল।

“তাহলে ঘর চোদ্দোতে যে মানুষটা আছে, সে কি মৃত?”

“আমি জানি না,” অরিন্দম স্বীকার করলেন। “আমি এটুকু জানি, সে তোমার স্মৃতি দিয়ে তৈরি। তোমারই মুখ, তোমারই কণ্ঠ, তোমারই কিছু অনুভূতি। কিন্তু তার কাছে এমন কিছু স্মৃতিও রয়েছে, যা তুমি কখনও অনুভব করোনি। সে এমন এক জীবনের সাক্ষী, যে জীবন বাস্তবে ঘটেনি।”

অদিতি অবিশ্বাসের স্বরে বলল, “তাহলে এত বছর ধরে ওখানে একজন মানুষকে আটকে রাখা হয়েছিল?”

“আমি প্রথমে ভেবেছিলাম, ওটা কেবল একটা রেকর্ড। একটা যন্ত্রের তৈরি প্রতিচ্ছবি। কিন্তু যত দিন গেছে, সেই প্রতিচ্ছবি যেন নিজস্ব আচরণ তৈরি করেছে। সে প্রশ্ন করতে শিখেছে। নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে জানতে চেয়েছে। আর সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার, সে ঘরের বাইরে যাওয়ার চেষ্টা করেছে।”

অরিত্রের মনে পড়ে গেল সেই অচেনা মানুষটির চোখ। সেখানে শুধু ভয় ছিল না। ছিল দীর্ঘদিনের একাকিত্ব, অভিমান আর মুক্তির আকুতি।

“আর অদ্বৈত?” সে জিজ্ঞাসা করল। “ছোটবেলায় যে ছেলেটাকে দেখেছিলাম, যে নিজেকে অদ্বৈত বলেছিল?”

অরিন্দম চোখ নামিয়ে নিলেন।

“অদ্বৈত ছিল তোমার জন্য ভেবে রাখা প্রথম নাম। পরীক্ষার নথিতে সেই নামই লেখা ছিল। পরে তোমার মা তোমার নাম রাখেন অরিত্র। গবেষণার ঘটনা গোপন রাখতে গিয়ে আমি পুরোনো কাগজপত্র বদলে দিয়েছিলাম। কিন্তু ঘর চোদ্দোর স্মৃতিতে অদ্বৈত নামটা রয়ে গিয়েছিল। সেই স্মৃতি থেকেই তুমি শিশুটিকে দেখেছিলে—অথবা তোমার মস্তিষ্ক তাকে দেখেছে বলে মনে করেছে।”

“অর্থাৎ, আমি যা দেখেছি, তার সবটাই মিথ্যে?”

“না,” বাবা বললেন। “অনুভূতিগুলো মিথ্যে নয়। কিন্তু সেগুলোর উৎস সম্পর্কে আমরা নিশ্চিত নই।”

ঠিক সেই সময় ধাতব যন্ত্রটি বিকট শব্দ করে উঠল।

মনিটরে ঘর চোদ্দোর ছবি ফিরে এল। সেখানে দাঁড়িয়ে রয়েছে অরিত্রের মতো দেখতে সেই মানুষটি। তার সামনে আরেকটি অবয়ব। সেই দ্বিতীয় অবয়বটির গলায় রক্তের দাগ, চোখে অদ্ভুত শূন্যতা।

প্রথম মানুষটি ক্যামেরার দিকে এগিয়ে এল।

“অরিত্র, তুমি কি জানতে চাও কেন আমি তোমাকে বাইরে আসতে বারণ করেছিলাম?”

অরিত্র মনিটরের সামনে এগিয়ে গেল।

“কারণ তুমি চাও আমি তোমার জায়গায় থাকি?”

“না,” মানুষটি বলল। “কারণ আমি চাই না, আমার অস্তিত্বের জন্য তোমাকে আবার মরতে হোক।”

কথাটা শুনে অরিত্র থমকে গেল।

মানুষটি বলতে লাগল, “আমি সেই জীবন, যে জীবন তুমি বাঁচতে পারতে না। আমার কাছে তোমার মায়ের মুখ আছে, তোমার বাবার কণ্ঠ আছে, এমনকি অদিতির সঙ্গে তোমার শৈশবের কিছু স্মৃতিও আছে। কিন্তু সেগুলো সব তোমার জীবনের প্রকৃত স্মৃতি নয়। সেগুলো সম্ভাবনার ছায়া। আমি জানি, তুমি বেঁচে আছ। অথচ আমার কাছে এমন এক মৃত্যুর স্মৃতি আছে, যা তোমার জীবনে ঘটেনি।”

“তাহলে তুমি আমাকে ঘর থেকে বেরোতে দিতে চাইছ না কেন?”

“কারণ যন্ত্রটি তোমাকে আর আমাকে একই স্মৃতির উৎস বলে ধরে নিয়েছে। তুমি ঘরে প্রবেশ করার পর থেকে আমাদের স্মৃতিগুলো একে অপরের সঙ্গে মিশছে। যন্ত্রটি যদি পুরোপুরি সক্রিয় হয়, তাহলে তোমার স্মৃতি আমার নথির মধ্যে ঢুকে যাবে। আর আমার অসমাপ্ত স্মৃতিগুলো তোমার মস্তিষ্কের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। তুমি নিজের পরিচয় হারাতে পারো।”

অরিন্দম তাড়াতাড়ি যন্ত্রটির দিকে এগিয়ে গেলেন।

“আমি সেটাই বন্ধ করতে চাইছি!”

কিন্তু যন্ত্রের লাল আলো তখন দ্রুত জ্বলছে। হাসপাতালের দেওয়ালে ঝুলে থাকা পুরোনো ঘড়িগুলো একসঙ্গে চলতে শুরু করল। তাদের কাঁটা ঘুরছে উল্টো দিকে।

মনিটরে ভেসে উঠল একটি তারিখ—

১৭ নভেম্বর ২০৪৪।

অরিত্র ফিসফিস করে বলল, “এই তারিখটাই তো আমার টিকিটে ছিল। আমার বয়স ছেচল্লিশ!”

বাবা মাথা নাড়লেন।

“১৯৯৮ থেকে ছেচল্লিশ বছর। গবেষণার প্রথম নথিতে এই তারিখকে একটি পর্যবেক্ষণ-সীমা হিসেবে রাখা হয়েছিল। যন্ত্রটি সেই সময় পর্যন্ত সম্ভাব্য জীবনপথের পরিবর্তন নথিবদ্ধ করার জন্য তৈরি হয়েছিল। পুরোনো টিকিটটি ছিল পরীক্ষার নথি—কোনও ভবিষ্যৎযাত্রার প্রমাণ নয়। কিন্তু আমার ভুলে যন্ত্রটি সেই তারিখকে একটি অসমাপ্ত চক্রের শেষ সীমা হিসেবে ধরে রেখেছে। আজ সেটি আবার সক্রিয় হয়েছে।”

“আজ?” অদিতি বিস্ময়ে বলল। “কিন্তু আজ তো ২০৪৪ নয়!”

“ঘড়ির সময় আর বাইরের সময় এক নয়,” অরিন্দম বললেন। “এই ঘরটি বাস্তব সময়ের নিয়ম মেনে চলে কি না, আমি নিশ্চিত নই। যন্ত্রটি হয়তো পুরোনো তথ্যের মধ্যে আটকে আছে। আবার এমনও হতে পারে, আমরা যে দৃশ্য দেখছি, তা স্মৃতির পুনর্গঠন।”

মনিটরের মানুষটি এবার কাচের ওপারে হাত রাখল।

“অরিত্র, একটা কথা মনে রেখো। আমি তোমার শত্রু নই। আমি শুধু জানতে চাই, আমার স্মৃতিগুলোর কোনও মূল্য আছে কি না।”

অরিত্রের বুকের মধ্যে অদ্ভুত ব্যথা অনুভূত হল। এতক্ষণ সে মানুষটিকে নিজের পরিচয়ের জন্য বিপদ বলে ভেবেছিল। কিন্তু এখন বুঝতে পারল, লোকটি আসলে তার কাছ থেকে জীবন কেড়ে নিতে চাইছে না। সে নিজের অস্তিত্বের স্বীকৃতি চাইছে।

অরিত্র বাবার দিকে ফিরে বলল, “এই যন্ত্রটা বন্ধ করলে ওর কী হবে?”

অরিন্দম উত্তর দিলেন না।

“বলো, বাবা!”

“যন্ত্রটি বন্ধ হলে রেকর্ডটি মুছে যেতে পারে। আবার সেটি কেবল নিষ্ক্রিয়ও হয়ে যেতে পারে। আমি জানি না। এত বছর ধরে আমি এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছি। কিন্তু সত্যিটা হল, আমি কখনও সাহস করে শেষ পরীক্ষাটা করিনি।”

“তুমি ওকে আটকে রেখেছ, কারণ তুমি নিজেই ভয় পেয়েছিলে।”

বাবা মাথা নিচু করলেন।

“হ্যাঁ। আমি তোমাকে বাঁচাতে চেয়েছিলাম। তারপর তোমাকে হারানোর ভয়ে নিজের অপরাধ লুকিয়েছি। আমি জানতাম না, সেই রেকর্ডের ভেতর কোনও সচেতন সত্তা তৈরি হয়েছে কি না। তবু আমি তাকে মুক্তি দেওয়ার চেষ্টা করিনি। কারণ যদি তোমার কোনও ক্ষতি হতো, আমি নিজেকে ক্ষমা করতে পারতাম না।”

অরিত্র কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, “তুমি আমাকে বাঁচিয়েছ, বাবা। কিন্তু সেই বাঁচানোর গল্পে তুমি আরেকটা জীবনকে অস্বীকার করেছ। সে জীবন সত্যি হোক বা স্মৃতি, তার যন্ত্রণাকে তুমি গুরুত্ব দাওনি।”

অরিন্দমের চোখে জল এসে গেল।

অরিত্র এবার মনিটরের দিকে তাকাল।

“আমি তোমাকে মুছে দিতে চাই না,” সে বলল। “তুমি আমার মতো দেখতে বলে আমার পরিচয় কেড়ে নিতে পারবে না। আবার তোমার অস্তিত্ব অস্বীকার করে আমিও মুক্ত হতে পারব না। তুমি আমার সম্ভাব্য জীবনের স্মৃতি। তুমি আমার ভয়ের একটা অংশ। কিন্তু আমি তোমার বন্দি হয়ে বাঁচব না।”

মনিটরের মানুষটি দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর সে জিজ্ঞাসা করল, “তাহলে তুমি কী করবে?”

“যন্ত্রটা বন্ধ করব। কিন্তু তার আগে তোমার স্মৃতিগুলো সংরক্ষণ করব। তোমাকে নিয়ে মিথ্যে বলব না। তোমাকে সত্যিকারের মানুষ বলে দাবি করব না, আবার অর্থহীন রেকর্ড বলেও ফেলে দেব না। আমরা জানি না তুমি ঠিক কী। সেই অজানাটুকু মেনে নেব।”

অদিতি ভাইয়ের পাশে এসে দাঁড়াল।

“আমরা দু’জনেই তোমার পাশে আছি,” সে বলল। “যে সত্য আমাদের পরিবার এত বছর লুকিয়ে রেখেছে, সেটা আর লুকিয়ে রাখা হবে না।”

অরিন্দম যন্ত্রের পাশের ছোট্ট ঢাকনাটি খুললেন। ভেতরে তিনটি তার—লাল, সাদা ও কালো। পুরোনো নথি অনুযায়ী কালো তারটি বিচ্ছিন্ন করলেই মূল রেকর্ডিং ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু সেই সঙ্গে ঘর চোদ্দোর স্মৃতিগুলিও চিরতরে হারিয়ে যেতে পারে।

“শেষবারের মতো ভাবো,” বাবা বললেন। “তার কেটে দিলে হয়তো আর কোনও উত্তর পাবে না।”

অরিত্র মনিটরের দিকে তাকাল। ওপারের মানুষটি ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল।

“কেটে দাও,” সে বলল। “আমাকে অনন্তকাল ধরে নিজের মৃত্যুর পুনরাবৃত্তি দেখতে দিও না।”

অরিত্র কালো তারটি হাতে নিল।

তারপর কেটে দিল।

এক মুহূর্তের জন্য সমস্ত আলো নিভে গেল।

হাসপাতালের করিডরে কোথাও যেন একটা দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ হল। তারপর একে একে সব ঘড়ির কাঁটা থেমে গেল। মনিটরে শেষবারের মতো সেই মানুষটির মুখ দেখা গেল। তার ঠোঁটে কোনও হাসি ছিল না, কোনও কান্নাও ছিল না। শুধু এক অদ্ভুত স্বস্তি।

সে অরিত্রের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল, “এবার তুমি বেঁচে থাকো।”

স্ক্রিন কালো হয়ে গেল।


পরদিন সকালে অরিত্র, অদিতি ও অরিন্দম শিমুলডাঙার সেনবাড়িতে ফিরে এল।

বাড়ির চোদ্দোটি ঘর তখনও সেখানে। কিন্তু চৌদ্দ নম্বর ঘরের দরজাটি আর আগের মতো ঠান্ডা ছিল না। দরজা খুলতেই দেখা গেল, ভেতরে কোনও অদ্ভুত ঘড়ি নেই, নেই সেই লম্বা করিডর, নেই আয়নার পেছনে লুকিয়ে থাকা অচেনা জগৎ। আছে শুধু একটি ছোট ঘর, ধুলোমাখা টেবিল আর দেওয়ালে কয়েকটি পুরোনো দাগ।

ঘরের কোণে পড়ে ছিল একটি ক্যাসেট।

অরিত্র সেটি তুলে নিল। ক্যাসেটের গায়ে লেখা—“শেষ নথি।”

বাড়িতে ফিরে তারা ক্যাসেটটি চালাল। অরিন্দমের কণ্ঠ ভেসে এল—

“যদি কেউ এই রেকর্ড শুনে থাকে, তবে বুঝতে হবে, আমি অবশেষে আমার ভুল স্বীকার করার সাহস পেয়েছি। আমি জানি না, ঘর চোদ্দোতে সত্যিই কোনও সচেতন সত্তা ছিল কি না। আমি জানি না, যন্ত্রটি স্মৃতি তৈরি করেছিল, নাকি মানুষের মনের এমন কোনও দরজা খুলে দিয়েছিল, যার অস্তিত্ব বিজ্ঞান এখনও বোঝে না। কিন্তু আমি জানি, ভয়ের কারণে সত্যকে আটকে রাখা যায় না। আর কাউকে ভালোবাসার অর্থ তার জন্য সব সিদ্ধান্ত নিজে নিয়ে নেওয়া নয়।”

ক্যাসেট থেমে গেল।

অরিত্র বাবার দিকে তাকাল। “তুমি এই রেকর্ডটা আগে করেছিলে?”

“হ্যাঁ,” অরিন্দম বললেন। “কিন্তু প্রকাশ করার সাহস হয়নি।”

“এবার হবে,” অরিত্র বলল। “গবেষণার সমস্ত নথি প্রকাশ করতে হবে। মানুষ জানুক, কী ঘটেছিল। তবে আমরা যা জানি না, তা নিয়ে কোনও মিথ্যে গল্প বানাব না।”

অদিতি ভাইয়ের কাঁধে হাত রাখল।

“তাহলে সব শেষ?”

অরিত্র জানালার বাইরে তাকাল। দূরে সকালের আলো ছড়িয়ে পড়ছে। সেনবাড়ির পুরোনো গাছের পাতায় বাতাস লাগছে। সবকিছুই স্বাভাবিক মনে হচ্ছে। তবু তার মনে হল, পৃথিবীতে কিছু রহস্যের উত্তর পাওয়া যায় না। শুধু তাদের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের সিদ্ধান্ত নিতে হয়।

“না,” সে শান্ত গলায় বলল। “সব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়নি। কিন্তু আমাদের আর পালিয়ে থাকতে হবে না।”

সেদিন সন্ধ্যায় অরিত্র একা চৌদ্দ নম্বর ঘরের সামনে দাঁড়াল। দরজায় হাত রাখতেই তার মনে হল, ভেতর থেকে কেউ যেন খুব আস্তে বলল—

“ধন্যবাদ।”

সে চমকে পিছনে তাকাল। কেউ নেই।

হয়তো বাতাসের শব্দ। হয়তো বহুদিনের ক্লান্ত মনের কল্পনা। কিংবা এমন এক স্মৃতির শেষ প্রতিধ্বনি, যাকে সে আর কখনও বন্দি করে রাখতে চায় না।

অরিত্র দরজাটি বন্ধ করল।

তারপর ধীরে ধীরে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে এল।

এবার তার সামনে কোনও অচেনা ঘর অপেক্ষা করছিল না। অপেক্ষা করছিল একটি সাধারণ জীবন—যে জীবনে ভুল থাকবে, অনিশ্চয়তা থাকবে, মৃত্যু থাকবে, কিন্তু থাকবে নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারও।

বহু বছর পরে কেউ যদি সেনবাড়ির ইতিহাস জানতে চাইত, অরিত্র তাদের বলত চৌদ্দ নম্বর ঘরের কথা। সে বলত তার বাবার ভুলের কথা, একটি অসমাপ্ত গবেষণার কথা, আর সেই অদ্ভুত মানুষের কথা, যে হয়তো কখনও জন্মায়নি, তবু মুক্তি চেয়েছিল।

কেউ বিশ্বাস করত। কেউ করত না।

অরিত্র কাউকে জোর করে বিশ্বাস করাত না।

কারণ সে বুঝেছিল, মানুষ শুধু তার অতীতের ফল নয়, ভবিষ্যতের সম্ভাবনাও নয়। মানুষ তার বর্তমানের সিদ্ধান্ত দিয়ে নিজেকে গড়ে তোলে।

আর চৌদ্দ নম্বর ঘর?

সেটি আর কখনও খোলা হয়নি।

তবে বাড়ির পুরোনো ঘড়িটি, যেটি ১৯৯৮ সালের ১৭ নভেম্বর রাত বারোটা তেরো মিনিটে থেমে গিয়েছিল, একদিন হঠাৎ আবার চলতে শুরু করেছিল বলে দাবি করেছিলেন সরলা।

কেউ জানে না, সেটি সত্যি কি না।

শুধু ঘড়ির কাচের ভেতরে, বারোটা তেরো মিনিটের ঠিক নিচে, ক্ষীণ আঁচড়ে লেখা ছিল একটি নাম—

অদ্বৈত।

তার পাশে আরও দুটি শব্দ—

“আমি ছিলাম।”

সমাপ্ত।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *