Categories
উপন্যাস বিবিধ

মৃত মানুষের শেষ চিঠি ((প্রথম পর্ব: যে চিঠি মৃত্যুর সাত দিন পরে এসেছিল))।

রাত তখন ঠিক ২টা ১৭ মিনিট।

কলকাতার উত্তর শহরতলির একটি পুরোনো বাড়ির দোতলায় বসে জানলার বাইরে তাকিয়ে ছিল ঋত্বিক মুখার্জি। বাইরে বৃষ্টি পড়ছিল একটানা। রাস্তার বাতিগুলো কুয়াশার মতো বৃষ্টির পর্দার আড়ালে ঝাপসা হয়ে গেছে। ঘরের দেওয়ালে ঝুলে থাকা ঘড়িটির টিকটিক শব্দ ছাড়া চারপাশে আর কোনও আওয়াজ ছিল না।

ঠিক তখনই দরজায় তিনবার টোকা পড়ল।

টক। টক। টক।

ঋত্বিক চমকে উঠল।

এত রাতে কে আসবে?

সে দরজার কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করল, “কে?”

বাইরে থেকে কোনও উত্তর এল না।

দ্বিতীয়বার জিজ্ঞাসা করতেই আবার তিনটি টোকা পড়ল।

টক। টক। টক।

ঋত্বিক দরজার পিপহোল দিয়ে বাইরে তাকাল। করিডর ফাঁকা। দূরের সিঁড়ির কাছে একটি হলুদ আলো জ্বলছে। কোথাও কোনও মানুষের ছায়া নেই।

সে দরজা খুলতেই পায়ের কাছে পড়ে থাকা একটি সাদা খাম দেখতে পেল।

খামের ওপর কালো কালিতে লেখা—

ঋত্বিক মুখার্জি, ব্যক্তিগত।

প্রেরকের নাম নেই। ডাকটিকিট নেই। খামের মুখে লাল মোমের সিল।

ঋত্বিক খামটি তুলে দরজা বন্ধ করে দিল। তারপর টেবিলের আলো জ্বেলে সাবধানে সিল ভাঙল।

ভেতরে একটি চিঠি।

হাতের লেখা দেখে তার বুকের মধ্যে যেন বরফ জমে গেল।

এই হাতের লেখা সে চেনে।

খুব ভালো করেই চেনে।

কারণ এই হাতের লেখার মানুষটি সাত দিন আগে মারা গিয়েছে।

মানুষটির নাম অনিরুদ্ধ সেন। ঋত্বিকের শৈশবের বন্ধু। কলেজজীবনের সঙ্গী। আর এমন একজন মানুষ, যার মৃত্যুর পর ঋত্বিক নিজেই তার শেষকৃত্যে উপস্থিত ছিল।

চিঠিতে লেখা—

“ঋত্বিক,

যদি এই চিঠি তোমার হাতে পৌঁছয়, তাহলে বুঝবে, আমি সত্যিই মারা গিয়েছি। কিন্তু আমার মৃত্যুর কারণ তুমি যা জানো, তা নয়।

পুলিশ বলবে, আমি আত্মহত্যা করেছি। আমার পরিবার বলবে, আমি দীর্ঘদিন ধরে মানসিক চাপে ছিলাম। সংবাদপত্রে হয়তো দু-চার লাইন খবরও বেরিয়েছে।

কিন্তু কেউ জানে না, আমার মৃত্যুর ঠিক আগের রাতে আমি এমন একজন মানুষের সঙ্গে দেখা করেছিলাম, যাকে আমি নিজের চোখে মরতে দেখেছি।

আর সবচেয়ে ভয়ংকর সত্যটা হল—সেই মানুষটি এখন তোমার বাড়িতে আছে।

আজ রাতেই নিজের ঘরের আলমারির পেছনে খুঁজবে।

কিন্তু সাবধান, ঋত্বিক।

আলমারির পেছনে যা পাবে, তা দেখার পর তুমি আর আগের মানুষ থাকবে না।

আর যদি রাত ৩টা ১৩ মিনিটে তোমার ফোন বেজে ওঠে, কোনওভাবেই ফোন ধরবে না।

ইতি, অনিরুদ্ধ।”

চিঠির শেষ লাইনটি পড়ে ঋত্বিকের হাত কাঁপতে শুরু করল।

সে সঙ্গে সঙ্গে ফোনে সময় দেখল।

রাত ২টা ২৬ মিনিট।

তার হাতে এখনও সাতচল্লিশ মিনিট আছে।

কিন্তু চিঠির সবচেয়ে অদ্ভুত কথাটি ছিল অন্য জায়গায়।

“সেই মানুষটি এখন তোমার বাড়িতে আছে।”

ঋত্বিক একা থাকে। বাবা-মা দুজনেই বহু বছর আগে মারা গিয়েছেন। বাড়িতে কোনও পরিচারকও নেই। তাহলে অনিরুদ্ধ কাকে বোঝাতে চাইছে?

সে নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করল, হয়তো কেউ তাকে ভয় দেখানোর জন্য এই চিঠি পাঠিয়েছে। অনিরুদ্ধের হাতের লেখা নকল করা অসম্ভব নয়। আর রাতের অন্ধকারে মানুষের কল্পনাও অদ্ভুত সব ছবি তৈরি করে।

তবু আলমারির কথাটা তার মাথা থেকে সরল না।

ঘরের কোণে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল কাঠের আলমারিটি তার দাদুর আমলের। বহু বছর ধরে সেটি সরানো হয়নি। আলমারির পেছনে কী থাকতে পারে, তা সে কোনওদিন ভাবেওনি।

ঋত্বিক প্রথমে আলমারির দরজা খুলে দেখল। পুরোনো জামাকাপড়, কয়েকটি বই, কিছু নথি—সবই আগের মতো।

তারপর সে আলমারির এক পাশ ধরে টান দিল।

ভারী আলমারিটি সামান্য নড়ল। আবার চেষ্টা করতেই মেঝের ওপর ঘষটে কয়েক ইঞ্চি সরে গেল।

পেছনের দেওয়ালে একটি ছোট কাঠের দরজা।

ঋত্বিকের নিঃশ্বাস আটকে এল।

দরজাটি এত নিখুঁতভাবে দেওয়ালের সঙ্গে মিশে ছিল যে, বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই। তার গায়ে মরচে ধরা একটি ছোট তালা ঝুলছে।

সে দৌড়ে টেবিলের ড্রয়ার থেকে পুরোনো চাবির গোছা নিয়ে এল। তিনটি চাবি চেষ্টা করার পর চতুর্থ চাবিটি তালায় ঢুকে গেল।

খটাস করে তালা খুলে গেল।

দরজার ওপারে সরু অন্ধকার পথ। ভেতর থেকে ভেজা মাটির গন্ধ আসছে। ঋত্বিক মোবাইলের টর্চ জ্বালিয়ে ভেতরে আলো ফেলল।

পথটি শেষ হয়েছে ছোট্ট একটি ঘরে।

ঘরের মাঝখানে একটি টেবিল। তার ওপর ধুলো জমা একটি টেপ রেকর্ডার, কয়েকটি ছবি এবং একটি কালো ডায়েরি।

ঋত্বিক প্রথমে ছবিগুলো হাতে নিল।

প্রথম ছবিতে তার বাবা, মা এবং ছোটবেলার ঋত্বিক। ছবিটি তোলা হয়েছিল তার ছয় বছর বয়সে।

দ্বিতীয় ছবিতে কলেজের বন্ধুরা। মাঝখানে ঋত্বিক, পাশে অনিরুদ্ধ।

তৃতীয় ছবিটি দেখে তার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।

ছবিতে অনিরুদ্ধ দাঁড়িয়ে আছে একটি হাসপাতালের সামনে। তার পাশে একজন মধ্যবয়স্ক মানুষ।

মানুষটির মুখে গভীর দাগ। ডান চোখের নিচে একটি কালো তিল।

ঋত্বিক মানুষটিকে চিনতে পারল।

এ অসম্ভব।

কারণ মানুষটি তার বাবা—অমল মুখার্জি।

যিনি মারা গিয়েছিলেন ঋত্বিকের দশ বছর বয়সে।

ছবির পেছনে তারিখ লেখা—১৭ জুলাই ২০০৪।

ঋত্বিকের জন্মসাল অনুযায়ী, তখন তার বয়স ছিল বারো।

কিন্তু তার বাবা মারা গিয়েছিলেন তার দশ বছর বয়সে। মৃত্যুর শংসাপত্র আছে। সংবাদপত্রে শোকবার্তা প্রকাশিত হয়েছিল। এমনকি বাবার শেষকৃত্যের ছবিও রয়েছে।

তাহলে ২০০৪ সালে তাঁর বাবা অনিরুদ্ধের সঙ্গে হাসপাতালের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন কীভাবে?

ঋত্বিক ডায়েরিটি খুলল।

প্রথম পাতায় লেখা—

“যদি আমার ছেলে এই ডায়েরি পড়ে, তাহলে বুঝতে হবে, আমার লুকিয়ে রাখা সত্য আর লুকিয়ে নেই।”

তারপর বাবার হাতের লেখা।

“ঋত্বিক, তোমাকে এত বছর ধরে একটি মিথ্যে বিশ্বাস করিয়ে রাখা হয়েছে। তুমি জানো, তোমার মা দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছিলেন। তুমি জানো, আমি তার তিন বছর পরে অসুস্থ হয়ে মারা যাই। তুমি জানো, তোমার কোনও ভাই বা বোন ছিল না।

এই তিনটি কথার মধ্যে অন্তত দুটি মিথ্যে।

তোমার মা দুর্ঘটনায় মারা যাননি।

আর তোমার একটি ভাই ছিল।

তার নাম ছিল রুদ্র।”

ঋত্বিকের হাত থেকে ডায়েরিটি প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।

তার কোনও ভাই ছিল না। অন্তত সে তাই জানে। ছোটবেলায় কোনওদিন ভাইয়ের কথা শোনেনি। বাড়িতে কোনও ছবি দেখেনি। আত্মীয়স্বজনও কখনও বলেনি।

সে তাড়াতাড়ি পরের পাতা উল্টে দিল।

সেখানে লেখা—

“রুদ্রের মৃত্যুর জন্য আমি দায়ী নই—এই কথাটি আমি বহু বছর নিজেকে বলেছি। কিন্তু সত্যিটা হল, আমি তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করিনি। কারণ সেদিন আমি এমন একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, যার জন্য আমার নিজের ছেলেকেও একদিন মূল্য দিতে হবে।

ঋত্বিক, তোমার জীবনের সবচেয়ে বড় বিপদ কোনও অপরিচিত মানুষ নয়।

সে তোমারই রক্তের সম্পর্কের কেউ।

আর যদি অনিরুদ্ধ তোমার কাছে পৌঁছতে পেরে থাকে, তাহলে বুঝবে, তারা আবার ফিরে এসেছে।”

ঠিক তখনই ঋত্বিকের ফোনের পর্দা জ্বলে উঠল।

সময় রাত ৩টা ১২ মিনিট।

স্ক্রিনে একটি অচেনা নম্বর।

এক সেকেন্ড পর ফোনটি বেজে উঠল।

ঋত্বিকের মনে পড়ল অনিরুদ্ধের চিঠি।

রাত ৩টা ১৩ মিনিটে ফোন ধরবে না।

ফোনের রিংটোন ঘরের নিস্তব্ধতা ভেঙে দিতে লাগল।

৩টা ১২ মিনিট ৩০ সেকেন্ড।

ঋত্বিক ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল।

৩টা ১২ মিনিট ৪৫ সেকেন্ড।

হঠাৎ টেপ রেকর্ডারটি নিজে থেকেই চালু হয়ে গেল।

খসখসে শব্দের পর একটি কণ্ঠ ভেসে এল।

“ঋত্বিক, ফোনটা ধরো না। ওরা তোমাকে খুঁজে পেয়েছে।”

কণ্ঠটি অনিরুদ্ধের।

কিন্তু অনিরুদ্ধ তো সাত দিন আগে মারা গেছে!

৩টা ১৩ মিনিট।

ফোনের রিংটোন থেমে গেল।

তারপরই ঘরের অন্য প্রান্তে থাকা দেওয়ালের ভেতর থেকে তিনবার টোকা পড়ল।

টক। টক। টক।

ঋত্বিক ধীরে ধীরে মাথা তুলল।

সামনের দেওয়ালে একটি ছায়া ফুটে উঠেছে। মানুষের ছায়া। অথচ সেই ঘরে তার ছাড়া আর কেউ নেই।

ছায়াটি এক পা এগিয়ে এল।

তারপর দেওয়ালের ওপার থেকে একটি কণ্ঠ শোনা গেল—

“দাদা, এত বছর পরে অবশেষে তুমি আমাকে খুঁজে পেয়েছ।”

ঋত্বিকের ঠোঁট শুকিয়ে গেল।

“কে?”

উত্তর এল—

“আমি রুদ্র। তোমার ছোট ভাই।”

এক মুহূর্তের জন্য ঘরের সমস্ত আলো নিভে গেল।

অন্ধকারের মধ্যে ঋত্বিক অনুভব করল, কেউ তার কাঁধে হাত রেখেছে।

তার কানের কাছে মুখ এনে সেই অচেনা অথচ পরিচিত কণ্ঠটি ফিসফিস করে বলল—

“কিন্তু একটা কথা মনে রেখো, দাদা। আমি তোমার ভাই নই। আমি সেই মানুষ, যাকে তুমি নিজের হাতে দশ বছর আগে মেরে ফেলেছিলে।”

ঋত্বিক চিৎকার করে উঠল।

আর ঠিক তখনই টেবিলের ওপর রাখা ডায়েরির শেষ পাতাটি নিজে থেকেই খুলে গেল।

সেখানে লাল কালিতে লেখা ছিল মাত্র একটি বাক্য—

“ঋত্বিকের স্মৃতি থেকে সত্য মুছে ফেলা হয়েছে। দ্বিতীয় পর্যায় শুরু করা হোক।”

প্রথম পর্ব সমাপ্ত।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *