“তোমার জীবনের যে ইতিহাস তুমি এত বছর ধরে জেনে এসেছ, তার প্রতিটি পাতাই হয়তো অন্য কারও লেখা।”
বাবার কণ্ঠ থেমে যাওয়ার পরও কথাগুলো ঋত্বিকের মাথার মধ্যে ঘুরতে লাগল।
গবেষণাগারের সতেরো নম্বর ঘরে দাঁড়িয়ে সে বুঝতে পারছিল না, কোনটা বিশ্বাস করবে। তার শৈশবের স্মৃতি? বাবার ডায়েরি? অনিরুদ্ধের শেষ চিঠি? নাকি সেই ভিডিও, যেখানে আগুনের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা শিশুটির মুখ তার নিজের মতো?
সে কম্পিউটারের সামনে গিয়ে বসল। পর্দায় এখনও লেখা—তৃতীয় পর্যায় শুরু হতে আর ২৪ ঘণ্টা বাকি।
“তৃতীয় পর্যায় বলতে কী বোঝায়?” সে স্পিকারের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল।
কয়েক সেকেন্ড পর বাবার কণ্ঠ ফিরে এল।
“তৃতীয় পর্যায় হল স্মৃতি পুনর্গঠনের শেষ ধাপ। তোমার মস্তিষ্কের চাপা পড়ে থাকা স্মৃতিগুলো ফিরিয়ে আনার জন্য এই ব্যবস্থাটি তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু তোমাকে কিছু বলার আগে একটা বিষয় বুঝতে হবে—এই ব্যবস্থাটি তোমার বাবার সম্পূর্ণ চেতনা নয়। এটি তাঁর সংরক্ষিত স্মৃতি ও সিদ্ধান্তের একটি সীমিত প্রতিলিপি। আমি সব প্রশ্নের উত্তর জানি না।”
“তাহলে তুমি আমাকে সাহায্য করতে পারবে না?”
“পারব। কিন্তু তোমাকে আমার কথাও যাচাই করতে হবে।”
ঋত্বিক কম্পিউটারের ফাইলগুলো পরীক্ষা করতে শুরু করল। একের পর এক নথি খুলে যেতে লাগল। কোথাও মস্তিষ্কের সংকেতের বিশ্লেষণ, কোথাও পরীক্ষার বিবরণ, কোথাও রোগীদের নাম। তারপর একটি ভিডিও ফাইল তার চোখে পড়ল।
নাম—LAST_NIGHT_11012002।
ভিডিও চালু হতেই একটি হাসপাতালের ঘর দেখা গেল।
বিছানায় শুয়ে রয়েছে ছয় বছরের একটি শিশু। তার মাথায় ব্যান্ডেজ, হাতে স্যালাইনের নল। বিছানার পাশে বসে কাঁদছেন এক মহিলা।
ঋত্বিক মহিলাকে চিনতে পারল।
তার মা মাধবী।
বিছানায় শুয়ে থাকা শিশুটিও সে নিজেই।
ভিডিওর তারিখ ১১ জানুয়ারি ২০০২।
ঋত্বিকের জানা ইতিহাস অনুযায়ী, সেদিন তার বাবা মারা গিয়েছিলেন। কিন্তু ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, বাবা ঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলছেন।
চিকিৎসক বলছেন, “শিশুটির স্মৃতিশক্তি ফিরে আসতে পারে। তবে দুর্ঘটনার মানসিক আঘাতের কারণে কিছু ঘটনা সে সম্পূর্ণ ভুলে যেতে পারে।”
বাবা জিজ্ঞাসা করলেন, “যদি সেই স্মৃতিগুলো ফিরিয়ে আনা হয়?”
চিকিৎসক দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
“স্মৃতি ফিরিয়ে আনা আর স্মৃতি বদলে দেওয়া এক জিনিস নয়, মিস্টার মুখার্জি। আপনার ছেলে কী দেখেছে, কী অনুভব করেছে, তা আমরা পুরোপুরি জানি না। কোনও পরীক্ষার মাধ্যমে তার মনে নির্দিষ্ট একটি ইতিহাস বসিয়ে দেওয়ার চেষ্টা বিপজ্জনক।”
ভিডিওতে বাবা চুপ করে গেলেন।
তারপর বললেন, “আমি শুধু চাই, ও যেন বেঁচে থাকতে পারে।”
ভিডিও শেষ।
ঋত্বিক দীর্ঘক্ষণ স্থির হয়ে বসে রইল।
তাহলে ২০০২ সালে সে হাসপাতালে ছিল। তার বাবা তখনও জীবিত। কিন্তু পরে পরিবারের সবাই বলেছে, বাবা মারা গিয়েছিলেন সেই দিনই।
তাহলে বাবার মৃত্যু নিয়ে মিথ্যে বলা হয়েছিল কেন?
সে অন্য একটি ফাইল খুলল।
সেখানে হাসপাতালের মৃত্যুসনদ, একটি সংবাদপত্রের কাটিং এবং বাবার মৃত্যুর নথি রয়েছে। সব কাগজেই একই তারিখ—১১ জানুয়ারি ২০০২।
কিন্তু ভিডিওতে বাবা জীবিত।
হঠাৎ তার মাথায় একটা সম্ভাবনা এল।
বাবা হয়তো সেই দিনই মারা যাননি। তাঁর মৃত্যু সম্পর্কে প্রচলিত ইতিহাস অন্য কোনও কারণে তৈরি করা হয়েছিল।
স্পিকার থেকে আবার কণ্ঠ ভেসে এল।
“ঋত্বিক, তুমি এখন যে নথিগুলো দেখছ, সেগুলোর কিছু সত্য, কিছু অসম্পূর্ণ। দুর্ঘটনার পর তোমার বাবা দীর্ঘদিন গবেষণাগারে কাজ করেছিলেন। তিনি তোমার স্মৃতি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু ২০০৪ সালে একটি পরীক্ষার সময় আগুন লাগে। সেই ঘটনায় গবেষণাগারের কয়েকজন কর্মী মারা যান। তোমার বাবা গুরুতর আহত হন। কিছুদিন পর তাঁর মৃত্যু হয়।”
ঋত্বিক বলল, “তাহলে ২০০২ সালের মৃত্যুসনদ?”
“সেটি তৈরি করা হয়েছিল তোমার পরিচয় ও চিকিৎসার গোপনীয়তা রক্ষা করার জন্য। তোমার বাবা ভুল করেছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন, তোমাকে দুর্ঘটনার সত্য থেকে দূরে রাখলে তুমি স্বাভাবিক জীবন পাবে।”
“আর অনিরুদ্ধ?”
“অনিরুদ্ধ তোমার বাবার গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিল না প্রথম থেকেই। পরে সে পুরোনো নথি খুঁজে পায়। সে জানতে পারে, তোমার শৈশবের স্মৃতির কিছু অংশ ইচ্ছাকৃতভাবে চাপা দেওয়া হয়েছে। সেই কারণেই সে তোমাকে সত্য জানাতে চেয়েছিল।”
ঋত্বিকের চোখে জল এসে গেল।
অনিরুদ্ধ শুধু তার বন্ধু ছিল না। সে এমন একটি সত্যের সন্ধান করছিল, যা ঋত্বিকের নিজের জীবনকে বদলে দিতে পারে।
আর সেই সত্যের জন্যই হয়তো তাকে মরতে হয়েছে।
ঋত্বিক গবেষণাগারের ভেতরে আরও খোঁজ করতে লাগল। একটি লোহার আলমারিতে সে পেল কয়েকটি পুরোনো অডিও ক্যাসেট। প্রতিটি ক্যাসেটের গায়ে তারিখ লেখা। শেষ ক্যাসেটটির গায়ে লেখা—
“রুদ্রের স্মৃতি—সম্পূর্ণ রেকর্ড।”
ঋত্বিক ক্যাসেটটি চালাল।
প্রথমে কিছু অস্পষ্ট শব্দ। তারপর একটি শিশুর কণ্ঠ।
“দাদা, তুমি দরজা খুলছ না কেন?”
ঋত্বিকের শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।
সে কণ্ঠটি চিনতে পেরেছে।
এটি সেই শিশুর কণ্ঠ, যে ভিডিওতে আগুনের ঘরের ভেতরে ছিল।
তারপর আরেকটি কণ্ঠ শোনা গেল। সেটি ঋত্বিকের নিজের শৈশবের কণ্ঠ।
“রুদ্র, ভয় পাস না। আমি বাবাকে ডাকতে যাচ্ছি।”
তারপর দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ।
রুদ্র চিৎকার করছে।
“দাদা! দরজা খুলে দাও! দাদা!”
তারপর কাশির শব্দ, ভাঙা কাচের আওয়াজ, এবং হঠাৎ নিস্তব্ধতা।
ঋত্বিক ক্যাসেট থামিয়ে দিল।
তার চোখের সামনে যেন একটি দৃশ্য তৈরি হতে লাগল।
একটি ছোট ঘর। দেওয়ালের পাশে রাখা রাসায়নিকের বোতল। একটি বৈদ্যুতিক যন্ত্র থেকে ধোঁয়া বেরোচ্ছে। রুদ্র ঘরের ভেতরে আটকে পড়েছে। বাইরে দাঁড়িয়ে আছে সে নিজে।
কিন্তু তার মনে পড়ল না, দরজাটি সে কেন বন্ধ করেছিল।
সে কি ভয়ে পালিয়ে গিয়েছিল? নাকি কাউকে বাঁচাতে দরজা বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছিল?
আরও একটি ফাইল খুলতেই উত্তর পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হল।
ফাইলটির নাম—RUDRA_INCIDENT_REPORT।
প্রতিবেদনে লেখা, আগুন লাগার সময় গবেষণাগারের একটি পরীক্ষামূলক কক্ষের দরজা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে দরজার তালা আটকে যায়। বাইরে থেকে সেটি খোলা সম্ভব হয়নি।
ঘটনার সময় ঋত্বিক সেখানে ছিল। তার স্মৃতিতে কিছু অংশ পরস্পরবিরোধীভাবে রয়ে গিয়েছিল। দুর্ঘটনার পর মানসিক আঘাতের কারণে সে দীর্ঘদিন কথা বলতে চাইত না, রাতে চিৎকার করে উঠত, এবং রুদ্রের কথা বললে আতঙ্কিত হয়ে পড়ত।
বাবা তখন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, ছেলেকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে স্মৃতির চিকিৎসা করবেন। কিন্তু চিকিৎসার সীমা অতিক্রম করে তিনি পরীক্ষামূলক প্রযুক্তি ব্যবহার করেছিলেন। তাতে ঋত্বিকের স্মৃতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
রুদ্রের স্মৃতি, ঋত্বিকের অপরাধবোধ এবং গবেষণার যন্ত্রে সংরক্ষিত তথ্য একে অপরের সঙ্গে মিশে যায়।
সেই মিশ্র তথ্য থেকেই তৈরি হয়েছিল রুদ্রের মতো কথা বলা একটি প্রতিক্রিয়া—যা পরে ঋত্বিকের কাছে নিজের ভাইয়ের অস্তিত্বের প্রমাণ বলে মনে হয়।
তবে একটি প্রশ্ন থেকেই গেল।
ঋত্বিক কি সত্যিই রুদ্রকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছিল?
নাকি সে কোনওভাবে দরজাটি বন্ধ করে দিয়েছিল?
এই প্রশ্নের উত্তর জানতে তাকে শেষ ভিডিওটি দেখতে হবে।
ভিডিওর ফাইলটি লুকানো ছিল একটি পাসওয়ার্ডের আড়ালে। ঋত্বিক অনেক চেষ্টা করেও খুলতে পারল না। শেষে তার চোখ পড়ল ছবির পেছনে লেখা তারিখের দিকে—১৭ জুলাই ২০০৪।
সে তারিখটি পাসওয়ার্ড হিসেবে দিল।
ফাইল খুলে গেল।
ভিডিওতে দেখা গেল, অমল মুখার্জি একটি টেবিলের সামনে বসে আছেন। তাঁর মুখ ক্লান্ত, চোখের নিচে কালি। তিনি ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে বললেন—
“আজ ১৭ জুলাই ২০০৪। আমি জানি না, এই রেকর্ড কখনও কেউ দেখবে কি না। যদি ঋত্বিক দেখে, তাহলে আমার কথা মন দিয়ে শুনিস, বাবা।”
অরিত্রের মতো দেখতে নয়, একেবারে তার নিজের বাবার কণ্ঠ।
“রুদ্রের মৃত্যুর জন্য তুই দায়ী নোস। দুর্ঘটনার সময় তুই দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে সাহায্য চাইছিলি। দরজাটি তুই বন্ধ করিসনি। বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পরে সেটি নিজে থেকেই আটকে গিয়েছিল। তুই বারবার দরজা খোলার চেষ্টা করেছিলি। কিন্তু ছোট্ট হাত দিয়ে পারিসনি।”
ঋত্বিকের চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ল।
বাবা বলতে থাকলেন—
“তোর মনে সেই দৃশ্য বারবার ফিরে আসত। তুই নিজেকে দোষ দিতিস। আমি তোকে বোঝাতে পারিনি, দুর্ঘটনার জন্য তুই দায়ী নোস। তার বদলে আমি তোর স্মৃতি নিয়ে পরীক্ষা করেছি। আমি ভেবেছিলাম, যন্ত্রণার স্মৃতি মুছে দিলে তুই মুক্তি পাবি। কিন্তু আমি বুঝিনি, স্মৃতি মুছে দেওয়া মানে কষ্টের সঙ্গে সঙ্গে সত্যকেও মুছে ফেলা।”
বাবা কিছুক্ষণ থামলেন।
“অনিরুদ্ধ যখন সত্যিটা জানতে পারে, তখন আমি তাকে সাহায্য করতে বলেছিলাম। কিন্তু সে আমার পদ্ধতির বিরোধিতা করেছিল। সে বলেছিল, তোর স্মৃতি তোর নিজের অধিকার। আমি তাকে থামাতে পারিনি। শেষ পর্যন্ত সে তোর কাছে সত্য পৌঁছে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।”
ভিডিওর শেষে বাবা বললেন—
“ঋত্বিক, রুদ্রকে ফিরিয়ে আনার কোনও যন্ত্র নেই। তার কণ্ঠের প্রতিলিপি তৈরি করা যায়, তার স্মৃতির কিছু অংশ সংরক্ষণ করা যায়, কিন্তু সেগুলো রুদ্র নয়। তুই তাকে ভালোবাসতিস। সে তোকে ভালোবাসত। সেই সত্যটুকু কোনও প্রযুক্তি মুছে দিতে পারবে না।
আর একটা কথা—নিজেকে ক্ষমা করিস। তুই তখন শিশু ছিলি। যা করতে পারিসনি, তার জন্য সারাজীবন নিজেকে শাস্তি দিস না।”
ভিডিও শেষ হওয়ার পর ঋত্বিক অনেকক্ষণ কাঁদল।
এত বছর ধরে সে নিজের অজান্তেই এমন একটি অপরাধের বোঝা বহন করছিল, যে অপরাধ সে করেনি।
কিন্তু রহস্যের শেষ তখনও হয়নি।
কম্পিউটারের পর্দায় হঠাৎ একটি নতুন বার্তা ফুটে উঠল।
“তৃতীয় পর্যায় শুরু করার সময় হয়েছে।”
ঋত্বিক দ্রুত উঠে দাঁড়াল।
“এটা কীভাবে চালু হল?”
স্পিকারে বাবার কণ্ঠ শোনা গেল।
“তৃতীয় পর্যায়ের সময় নির্ধারণ করা ছিল। তুমি সব নথি দেখার পর ব্যবস্থাটি তোমাকে একটি শেষ পরীক্ষা দেখাবে। তুমি চাইলে সেটি বন্ধ করতে পারো।”
“পরীক্ষাটা কী?”
“তোমার সামনে রুদ্রের একটি পূর্ণ স্মৃতি-প্রতিলিপি হাজির করা হবে। সেটি তোমার সঙ্গে কথা বলবে, তোমার প্রশ্নের উত্তর দেবে। কিন্তু মনে রেখো, সেটি রুদ্র নয়। সেটি সংরক্ষিত তথ্য থেকে তৈরি একটি প্রতিক্রিয়া।”
ঋত্বিক কাচের বাক্সটির দিকে তাকাল।
তার ভেতরে আলো জ্বলে উঠেছে।
একটি ছোট ছেলের অবয়ব ধীরে ধীরে ফুটে উঠল। ছয় বছরের রুদ্র। তার পরনে নীল জামা, মুখে সেই পরিচিত হাসি।
“দাদা?”
ঋত্বিকের বুকের মধ্যে জমে থাকা সমস্ত যন্ত্রণা যেন এক মুহূর্তে ফিরে এল।
“রুদ্র…”
“তুমি এতদিন কোথায় ছিলে?” শিশুটি জিজ্ঞাসা করল। “আমি তোমাকে খুঁজছিলাম।”
ঋত্বিক চোখ বন্ধ করল। সে জানে, এই কণ্ঠ তার ভাইয়ের প্রকৃত চেতনা নয়। তবু স্মৃতির ভেতর থেকে উঠে আসা সেই পরিচিত স্বর তাকে ভেঙে দিচ্ছিল।
“আমি দুঃখিত, রুদ্র,” সে বলল। “আমি তোকে বাঁচাতে পারিনি।”
শিশুটি মাথা নাড়ল।
“তুমি তো চেষ্টা করেছিলে। বাবা বলেছে।”
ঋত্বিক কেঁদে ফেলল।
“তুই কি আমাকে ক্ষমা করেছিস?”
শিশুটি মৃদু হাসল।
“তুমি নিজেকে ক্ষমা করলেই হবে, দাদা।”
কয়েক সেকেন্ডের জন্য ঘরটি নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
তারপর শিশুটির অবয়ব ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতে শুরু করল।
ঋত্বিক হাত বাড়িয়ে দিল, কিন্তু কাচের বাক্সের ওপারে কিছুই স্পর্শ করতে পারল না।
“রুদ্র, আর একবার বল—তুই আমাকে ক্ষমা করেছিস।”
কোনও উত্তর এল না।
শুধু পর্দায় একটি শেষ বার্তা দেখা গেল—
“স্মৃতি সংরক্ষণ সম্পূর্ণ। তৃতীয় পর্যায় সমাপ্ত।”
ঋত্বিক কম্পিউটারের বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করে দিল। গবেষণাগারের সমস্ত যন্ত্র একে একে নিভে গেল।
সে জানত, এই জায়গায় আর ফিরে আসবে না।
পরদিন ঋত্বিক পুলিশের কাছে গেল। অনিরুদ্ধের মৃত্যুর আগে পাওয়া নথি, গবেষণাগারের ভিডিও এবং বাবার রেকর্ডিং জমা দিল। অনিরুদ্ধের মৃত্যুর তদন্ত নতুন করে শুরু হল। তদন্তকারীরা জানতে পারলেন, সে এমন কিছু তথ্য আবিষ্কার করেছিল, যা কয়েকজন প্রভাবশালী মানুষের কাছে বিপজ্জনক হয়ে উঠেছিল।
ঋত্বিকের বাবার গবেষণার নথিও প্রকাশ্যে এল। সেই গবেষণা থেকে মানুষের স্মৃতি বদলে দেওয়ার যে বিপজ্জনক চেষ্টা হয়েছিল, তা নিয়ে তদন্ত শুরু হল।
তবে রুদ্রকে ফিরিয়ে আনার কোনও অলৌকিক ঘটনা ঘটল না।
রুদ্রের ঘরটি বহু বছর আগেই শূন্য হয়ে গিয়েছিল। তার খেলনাগুলো আর নেই। তার ছোট জামাগুলো নেই। শুধু ঋত্বিকের স্মৃতির ভেতরে রয়ে গেল একটি শিশু, যে তাকে দাদা বলে ডাকত।
কয়েক মাস পর ঋত্বিক বাড়ির পুরোনো আলমারি সরিয়ে সেই গোপন ঘরটি স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দিল। কিন্তু ডায়েরিটি ফেলে দিল না। সে সেটি সংরক্ষণ করল, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এই ভুলের পুনরাবৃত্তি না করে।
অনিরুদ্ধের সমাধিতে একদিন সে একটি চিঠি রেখে এল।
চিঠিতে লিখল—
“তুই সত্যিটা আমাকে জানিয়েছিলি। আমি দেরিতে হলেও তা বুঝেছি। তোর মৃত্যুর জন্য যারা দায়ী, তাদের বিচার হোক। আর তোর বন্ধুত্বের ঋণ আমি কোনওদিন ভুলব না।”
তারপর সে রুদ্রের সমাধির কাছে গেল।
সেখানে কোনও বড় কথা বলল না। শুধু কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে রইল।
বহু বছর পর সেদিন রাতে ঋত্বিক প্রথমবার কোনও দুঃস্বপ্ন ছাড়া ঘুমাল।
রাত ৩টা ১৩ মিনিটে তার ফোন একবার বেজে উঠেছিল।
সে ঘুমের মধ্যেই শব্দটি শুনেছিল কি না, সে জানে না। সকালে ফোনের কললিস্ট পরীক্ষা করে দেখল, কোনও কল আসেনি।
তবে ফোনের পাশে একটি ছোট কাগজ পড়ে ছিল।
সেখানে শিশুর হাতের লেখার মতো অক্ষরে লেখা—
“দাদা, এবার ভালো থেকো।”
ঋত্বিক কাগজটি হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ বসে রইল।
সে জানত না, কাগজটি কখন সেখানে এল। হয়তো বহুদিন আগে লেখা কোনও পুরোনো কাগজ, যা অ্যালবামের ভেতর থেকে বেরিয়ে এসেছে। হয়তো তার নিজের মনের তৈরি একটি শেষ স্মৃতি।
কিন্তু এবার সে আর কোনও ব্যাখ্যা খুঁজল না।
কারণ সব রহস্যের উত্তর পাওয়াই জীবনের উদ্দেশ্য নয়। কখনও কখনও সত্যকে মেনে নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়াই সবচেয়ে বড় সাহস।
ঋত্বিক জানালার পর্দা সরিয়ে দিল।
সকালের আলো ঘরে ঢুকে পড়ল।
অনেক বছর পর তার মনে হল, অতীতের দরজাটি সত্যিই বন্ধ হয়েছে।
আর সেই দরজার ওপারে কেউ তাকে আর ডাকছে না।
সমাপ্ত।