Categories
গল্প বিবিধ

গল্প : শেষ বিকেলের সেই অচেনা চিঠি।।

শহরের এক প্রান্তে ছিল একটি পুরোনো বাড়ি। বাড়িটির সামনে ছোট্ট উঠোন, উঠোনের এক পাশে তুলসীমঞ্চ, আর পিছনে একটি সরু গলি। সেই বাড়িতে একা থাকতেন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক নিবারণবাবু।

একসময় তাঁর বাড়ি ছিল ছাত্রছাত্রীদের আনাগোনায় মুখর। কেউ অঙ্ক বুঝতে আসত, কেউ পরীক্ষার আগে শেষ মুহূর্তের পরামর্শ নিতে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সবাই নিজের নিজের জীবনে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল। স্ত্রী মারা যাওয়ার পর বাড়িটা আরও নিঃশব্দ হয়ে গিয়েছিল।

তবু নিবারণবাবুর প্রতিদিনের একটি অভ্যাস ছিল। বিকেল পাঁচটায় তিনি বাড়ি থেকে বেরিয়ে শহরের পুরোনো পার্কে যেতেন। একটি নির্দিষ্ট বেঞ্চে বসে সূর্য ডোবা দেখতেন। তাঁর হাতে থাকত ছোট্ট একটি ডায়েরি। মাঝে মাঝে তাতে দু-একটি কথা লিখতেন।

কী লিখতেন, তা কেউ জানত না।

একদিন বিকেলে পার্কের সেই বেঞ্চে বসে থাকতে থাকতে তিনি দেখতে পেলেন, বেঞ্চের নিচে একটি খাম পড়ে আছে। খামটি পুরোনো, কিন্তু বেশ যত্ন করে বন্ধ করা। তার ওপরে শুধু লেখা—‘যাঁর কাছে পৌঁছবে, তাঁর জন্য।’

নিবারণবাবু চারদিকে তাকালেন। কাছাকাছি কয়েকজন মানুষ হাঁটছিলেন, কিছু শিশু খেলছিল। কিন্তু কেউ খামটির খোঁজ করছিল না।

তিনি খামটি খুলবেন কি না, তা নিয়ে দ্বিধায় পড়লেন। অন্যের চিঠি পড়া ঠিক নয়। আবার খামের ওপরে প্রাপকের নামও নেই। শেষ পর্যন্ত তিনি খামটি নিজের ব্যাগে রেখে দিলেন, মনে মনে ঠিক করলেন, পরদিন পার্কের কর্মচারীর কাছে জমা দেবেন।

কিন্তু বাড়ি ফিরে ব্যাগ থেকে খামটি বের করতেই তাঁর চোখ আটকে গেল খামের এক কোণে লেখা একটি ছোট্ট বাক্যে।

‘যদি কখনও মনে হয়, আপনার জীবনের আর কোনও প্রয়োজন নেই, তবে এটি পড়বেন।’

নিবারণবাবু দীর্ঘক্ষণ বাক্যটির দিকে তাকিয়ে রইলেন।

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর নিজের মনেও এমন কথা কখনও কখনও এসেছে। একসময় যে মানুষটির কাছে প্রতিদিন কেউ না কেউ সাহায্য চাইত, আজ তাঁর অসুস্থতার খবর নেওয়ার মতো মানুষও হাতে গোনা। তিনি কাউকে দোষ দিতেন না। জানতেন, জীবন সবার জন্যই ব্যস্ত। কিন্তু সন্ধ্যা নামলে নিঃসঙ্গতা কখনও কখনও বুকের মধ্যে পাথরের মতো চেপে বসত।

তিনি খামটি খুললেন।

ভেতরে ছিল একটি হাতে লেখা চিঠি।

‘প্রিয় অচেনা মানুষ,

আপনি কে, আমি জানি না। হয়তো আপনার বয়স আমার চেয়ে বেশি, হয়তো কম। হয়তো আপনার জীবনে অনেক মানুষ আছে, আবার হয়তো আপনি একা।

আমি জানি না, এই চিঠি আপনার হাতে পৌঁছবে কি না। তবু লিখছি, কারণ একসময় আমিও ভেবেছিলাম, আমার থাকা না-থাকায় কারও কিছু এসে যায় না।

আমার নাম অদিতি। কয়েক মাস আগে আমার জীবনে এমন কিছু ঘটনা ঘটেছিল, যার পরে আমি নিজেকে সম্পূর্ণ ব্যর্থ মনে করতাম। যে কাজের জন্য এত পরিশ্রম করেছি, সেখানে সফল হতে পারিনি। কাছের মানুষদের সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝি হয়েছিল। নিজের ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছিলাম।

একদিন এই পার্কের বেঞ্চে বসে কাঁদছিলাম। তখন এক বৃদ্ধ মানুষ আমার পাশে বসেছিলেন। তিনি আমাকে কোনও বড় উপদেশ দেননি। শুধু জিজ্ঞাসা করেছিলেন, “আজ তুমি খেয়েছ?”

প্রশ্নটা খুব সাধারণ ছিল। কিন্তু অনেক দিন পরে কেউ আমার খাওয়ার কথা ভেবেছিল। আমি উত্তর দিতে পারিনি। তিনি আমাকে কাছের দোকান থেকে এক কাপ চা এনে দিয়েছিলেন।

সেদিন বুঝেছিলাম, পৃথিবী সব সময় বড় বড় কথা দিয়ে মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে না। কখনও একটি সাধারণ প্রশ্ন, এক কাপ চা, অথবা কারও নীরবে পাশে বসে থাকাও যথেষ্ট।

সেই মানুষটির নাম আমি জানতে পারিনি। তাঁকে আর কোনও দিন দেখিনি। কিন্তু তাঁর ছোট্ট ব্যবহার আমাকে আবার নিজের জীবন গুছিয়ে নেওয়ার সাহস দিয়েছিল।

আজ আমি ভালো আছি। সব সমস্যা মিটে যায়নি, কিন্তু আমি বুঝেছি, ব্যর্থতা মানেই জীবনের শেষ নয়।

এই চিঠি আমি সেই মানুষটির উদ্দেশে লিখছি। যদি কোনও দিন তাঁর কাছে পৌঁছয়, তিনি যেন জানেন—সেদিন তাঁর সামান্য সাহায্য আমার কাছে কত বড় ছিল।

আর যদি তাঁর কাছে না পৌঁছয়, তবে যাঁর হাতে পড়বে, তিনি যেন মনে রাখেন—আপনার একটি ছোট্ট ভালো কাজও কোনও মানুষের জীবনে অনেক বড় পরিবর্তন আনতে পারে।

আপনি হয়তো নিজেই জানবেন না, কার জীবনে আপনি আলো হয়ে এসেছেন।

ইতি, একজন কৃতজ্ঞ মানুষ।’

চিঠিটি পড়ে নিবারণবাবুর হাত কেঁপে উঠল।

তিনি আবার পড়লেন। তারপর আরও একবার।

এক কাপ চা। কয়েকটি সাধারণ প্রশ্ন। একজন অচেনা মানুষের পাশে বসে থাকা।

হঠাৎ তাঁর মনে পড়ে গেল বহু বছর আগের একটি ঘটনা।

তখন তিনি স্কুলে পড়াতেন। এক শীতের সকালে স্কুলের গেটের বাইরে একটি মেয়ে বসে কাঁদছিল। তার নাম অদিতি। পরীক্ষায় খারাপ ফল করেছিল বলে বাড়িতে বকুনি খেয়ে সে স্কুলে আসতে ভয় পাচ্ছিল। নিবারণবাবু তাকে নিজের ঘরে নিয়ে গিয়ে জল খাইয়েছিলেন, টিফিনের খাবার ভাগ করে দিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন, “একটা পরীক্ষার ফল তোমার পুরো জীবনের পরিচয় হতে পারে না।”

সেই মেয়েটি কি এই অদিতি?

নিবারণবাবু স্মৃতি হাতড়াতে লাগলেন। অদিতির চোখের জল, ছোট্ট দুটি বেণি, আর ভয়ে কুঁকড়ে থাকা মুখটি যেন স্পষ্ট হয়ে উঠল।

পরদিন তিনি চিঠিটি নিয়ে পার্কে গেলেন। পার্কের কর্মচারীকে দেখালেন। কর্মচারী চিঠিটি দেখে বললেন, “এ রকম একটা খাম কয়েক দিন ধরে এখানে পড়ে থাকতে দেখেছি। তবে কে রেখে গেছে, জানি না।”

নিবারণবাবু জানতে চাইলেন, “এখানে কি কোনও অদিতি নামে মেয়ে আসে?”

কর্মচারী একটু ভেবে বললেন, “সন্ধ্যার দিকে এক তরুণী আসে মাঝে মাঝে। সে পার্কের পাশের শিশুদের পাঠকেন্দ্রে কাজ করে। নাম অদিতি কি না, ঠিক জানি না।”

পার্কের পাশেই একটি ছোট্ট পাঠকেন্দ্র ছিল। সেখানে এলাকার শিশুদের বিনা পয়সায় পড়াশোনা করানো হতো। নিবারণবাবু সেদিনই সেখানে গেলেন।

ঘরে ঢুকতেই কয়েকজন শিশু তাঁকে ঘিরে ধরল। কেউ অঙ্কের খাতা দেখাতে লাগল, কেউ বাংলা পড়তে চাইল। অনেক দিন পর শিশুদের এই কোলাহল তাঁর মনে অদ্ভুত আনন্দ জাগাল।

একটু পরে ঘরে এল এক তরুণী। তার মুখে পরিশ্রমের ছাপ, চোখে শান্ত আত্মবিশ্বাস।

নিবারণবাবু জিজ্ঞাসা করলেন, “তোমার নাম কি অদিতি?”

মেয়েটি অবাক হয়ে বলল, “হ্যাঁ। আপনি আমাকে চেনেন?”

তিনি ব্যাগ থেকে চিঠিটি বের করলেন।

অদিতি চিঠি দেখে প্রথমে চুপ করে রইল। তারপর তার চোখ বড় হয়ে গেল।

“এটা আপনি কোথায় পেলেন?”

নিবারণবাবু বললেন, “পার্কের বেঞ্চের নিচে। চিঠির কথা পড়ে মনে হল, হয়তো তোমাকে খুঁজে পাওয়া দরকার।”

অদিতি ধীরে ধীরে বসে পড়ল।

“আমি ভেবেছিলাম, চিঠিটা হয়তো কোনও দিন কারও হাতে পৌঁছবে না। আমি আসলে সেই মানুষটিকে খুঁজছিলাম, যিনি বহু বছর আগে আমাকে সাহায্য করেছিলেন। আমার মনে ছিল, তিনি এই পার্কে বিকেলে বসতেন। কিন্তু নামটা মনে করতে পারিনি। তাই চিঠিটা রেখে দিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, হয়তো তিনি কোনও দিন পড়বেন।”

নিবারণবাবু মৃদু হেসে বললেন, “তুমি কি সেই ছোট্ট মেয়েটি, যে একদিন স্কুলের গেটের বাইরে কাঁদছিল?”

অদিতির চোখ ভিজে উঠল।

“স্যার! আপনি?”

সে উঠে দাঁড়িয়ে তাঁর পায়ে হাত দিতে গেল। নিবারণবাবু তাড়াতাড়ি তাকে থামিয়ে দিলেন।

“এসব করতে হবে না। তুমি এখন কী করছ, বলো।”

অদিতি জানাল, পড়াশোনা শেষ করে সে একটি ছোট প্রতিষ্ঠানে কাজ করত। পরে নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বুঝেছিল, অনেক শিশু পরীক্ষার ফল, পারিবারিক সমস্যা কিংবা অর্থের অভাবে পড়াশোনার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। তাই কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে সে এই পাঠকেন্দ্র শুরু করেছে।

“সব কিছু খুব সহজ নয়, স্যার,” অদিতি বলল। “কখনও বই কেনার টাকা থাকে না, কখনও ঘরভাড়া দিতে সমস্যা হয়। তবু শিশুদের চোখে যখন শেখার আগ্রহ দেখি, তখন মনে হয় কাজটা চালিয়ে যেতে হবে।”

নিবারণবাবু চারদিকে তাকালেন। একটি শিশু বারবার একই অঙ্ক ভুল করছে। অন্য একটি শিশু বাংলা শব্দ জোড়া লাগাতে পারছে না। অথচ তাদের চোখে ছিল শেখার তীব্র ইচ্ছা।

তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, “তোমাদের কি একজন শিক্ষক দরকার?”

অদিতি অবাক হয়ে তাকাল।

“আপনি কি এখানে পড়াবেন?”

নিবারণবাবু হেসে বললেন, “যদি তোমরা আমাকে সুযোগ দাও।”

সেই দিন থেকেই তাঁর বিকেলের রুটিন বদলে গেল।

এখন তিনি আর একা বেঞ্চে বসে সূর্য ডোবা দেখতেন না। সপ্তাহে চার দিন পাঠকেন্দ্রে যেতেন। শিশুদের বাংলা, অঙ্ক, ইতিহাস পড়াতেন। কারও ভুল হলে বকতেন না; বরং বোঝাতেন, ভুলের মধ্য দিয়েই শেখা যায়।

ধীরে ধীরে পাঠকেন্দ্রের শিশুর সংখ্যা বাড়তে লাগল। এলাকার আরও কয়েকজন অবসরপ্রাপ্ত মানুষ সেখানে যোগ দিলেন। কেউ ছবি আঁকা শেখাতেন, কেউ গল্প পড়তেন, কেউ আবার শিশুদের খেলাধুলার ব্যবস্থা করতেন।

একদিন পাঠকেন্দ্রের বার্ষিক অনুষ্ঠানে অদিতি নিবারণবাবুকে একটি ছোট্ট বাক্স উপহার দিল। বাক্সের মধ্যে ছিল অনেকগুলি হাতে লেখা চিঠি। গ্রামের ও শহরের বিভিন্ন মানুষ লিখেছেন—কোনও এক সময়ে কে তাঁদের সাহায্য করেছিলেন, কীভাবে একটি ছোট্ট ভালো কাজ তাঁদের জীবন বদলে দিয়েছিল।

অদিতি বলল, “স্যার, আমরা এই চিঠিগুলো দিয়ে একটি দেয়াল তৈরি করব। নাম দেব ‘ভালো কাজের স্মৃতি’। যাতে শিশুরা বুঝতে পারে, পৃথিবীতে ভালো মানুষ আছেন, আর তারাও চাইলে ভালো কাজ করতে পারে।”

নিবারণবাবু একটি চিঠি হাতে তুলে নিলেন। তাতে লেখা ছিল—‘একদিন এক অচেনা মানুষ আমার কথা শুনেছিলেন। সেই দিন থেকে আমি বুঝেছিলাম, আমার কথারও মূল্য আছে।’

চিঠিটি পড়ে তাঁর চোখ ভিজে উঠল।

অনুষ্ঠান শেষে তিনি আবার সেই পুরোনো পার্কে গেলেন। সূর্য তখন অস্ত যাচ্ছে। বেঞ্চটি আগের মতোই আছে, কিন্তু তাঁর পাশে এখন শূন্যতা নেই। পকেটে রাখা ডায়েরিটি বের করে তিনি লিখলেন—

‘জীবনের শেষ বিকেল বলে কিছু নেই। যত দিন অন্য কারও কাজে লাগার সুযোগ থাকে, তত দিন প্রতিটি সন্ধ্যার পরেও নতুন সকাল অপেক্ষা করে।’

তারপর ডায়েরি বন্ধ করে তিনি ধীরে ধীরে বাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করলেন।

সেদিন তাঁর মনে আর প্রশ্ন জাগেনি—তিনি কারও কাছে প্রয়োজনীয় কি না। কারণ তিনি বুঝেছিলেন, জীবনের মূল্য শুধু কতজন মানুষ আমাদের মনে রাখল, তার ওপর নির্ভর করে না। কখনও আমরা যাকে সামান্য সাহায্য করি, সে-ই একদিন আমাদের জীবনেও নতুন অর্থ ফিরিয়ে দিতে পারে।

আর সেই অচেনা চিঠি?

সেটি পাঠকেন্দ্রের দেয়ালে কাচের ফ্রেমে রাখা হল। নিচে লেখা হল—

‘একটি ছোট্ট ভালো কাজের কোনও মেয়াদ শেষ হয় না। তার ফল কখন, কোথায়, কার জীবনে ফিরে আসবে—তা আমরা জানি না।’

শিক্ষা: মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য সব সময় বড় ক্ষমতা বা অনেক অর্থের প্রয়োজন হয় না। একটু সময়, আন্তরিকতা ও সহানুভূতিও কারও জীবনে নতুন আশার দরজা খুলে দিতে পারে।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *