Categories
অনুগল্প বিবিধ

অদৃশ্য স্বাক্ষরের শক্তি।

কলকাতার এক সরকারি দপ্তরে কাজ করতেন অনিরুদ্ধ পাল। তাঁর পদ ছিল সাধারণ—নথি যাচাইকারী। প্রতিদিন অসংখ্য আবেদনপত্র, অনুমতিপত্র এবং সরকারি কাগজপত্র তাঁর টেবিলের ওপর জমা হতো। অধিকাংশ মানুষই তাঁকে চিনতেন না। দপ্তরের বড় আধিকারিকদের নাম সংবাদপত্রে ছাপা হতো, তাঁদের ছবি উঠত অনুষ্ঠানে। অথচ অনিরুদ্ধের কাজের গুরুত্ব বোঝার মানুষ ছিল খুব কম।

তিনি কখনও এই নিয়ে অভিযোগ করতেন না। তাঁর বিশ্বাস ছিল, কোনও কাজ ছোট নয়; ছোট হয় কাজের প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি।

একদিন দপ্তরে একটি গুরুত্বপূর্ণ আবেদন এল। শহরের উপকণ্ঠে একটি পুরোনো জলাভূমি ভরাট করে বিশাল বাণিজ্যিক ভবন তৈরির অনুমতি চাওয়া হয়েছে। আবেদনপত্রের সঙ্গে অনেক নথি জমা দেওয়া হয়েছিল। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে এলাকার বহু মানুষের কর্মসংস্থান হবে বলে দাবি করা হয়েছিল।

ফাইলটি দ্রুত অনুমোদনের জন্য ঊর্ধ্বতন দপ্তরে পাঠানোর নির্দেশ এল। অধিকাংশ কর্মীই নথিপত্রের প্রাথমিক পরীক্ষা করে ফাইল এগিয়ে দিলেন। কিন্তু অনিরুদ্ধের চোখ আটকে গেল একটি মানচিত্রে। সেখানে জমিটিকে সাধারণ পতিত জমি হিসেবে দেখানো হয়েছে, অথচ তাঁর মনে পড়ল, কয়েক বছর আগে ওই অঞ্চলের জলনিকাশি ব্যবস্থা নিয়ে একটি সরকারি সমীক্ষার নথি তিনি দেখেছিলেন।

সেই সমীক্ষায় এলাকাটিকে প্রাকৃতিক জলাধার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল।

অনিরুদ্ধ পুরোনো নথি খুঁজতে শুরু করলেন। বহু ফাইল ঘেঁটে তিনি সংশ্লিষ্ট সমীক্ষার প্রতিবেদনটি বের করলেন। তাতে স্পষ্ট লেখা ছিল, বর্ষাকালে আশপাশের কয়েকটি এলাকার অতিরিক্ত জল এই জলাভূমিতে জমা হয়। জলাভূমি ভরাট হলে জলনিকাশি ব্যাহত হতে পারে এবং আশপাশের বসতিতে জল জমার ঝুঁকি বাড়তে পারে।

তিনি বিষয়টি তাঁর ঊর্ধ্বতন আধিকারিককে জানালেন।

আধিকারিক বিরক্ত হয়ে বললেন, “প্রকল্পটি অনেক দূর এগিয়ে গেছে। এত বড় বিনিয়োগের পথে বাধা সৃষ্টি করার আগে নিশ্চিত হওয়া দরকার। তোমার কাজ নথি যাচাই করা, প্রকল্পের বিরোধিতা করা নয়।”

অনিরুদ্ধ শান্তভাবে বললেন, “আমি প্রকল্পের বিরোধিতা করছি না, স্যার। শুধু চাইছি, অনুমোদনের আগে তথ্যগুলো আবার যাচাই করা হোক।”

কিন্তু তাঁর কথা গুরুত্ব পেল না। বরং তাঁকে দ্রুত ফাইল নিষ্পত্তি করার নির্দেশ দেওয়া হলো।

সেদিন বাড়ি ফিরে অনিরুদ্ধ অনেকক্ষণ ভাবলেন। তিনি জানতেন, প্রশ্ন তুললে তাঁর বিরুদ্ধে অসহযোগিতার অভিযোগ উঠতে পারে। পদোন্নতির সুযোগও নষ্ট হতে পারে। অন্যদিকে, চুপচাপ ফাইল এগিয়ে দিলে নিজের দায়িত্ব সম্পর্কে তিনি নিজেই অসৎ হয়ে পড়বেন।

পরদিন তিনি নিয়ম মেনে একটি লিখিত পর্যবেক্ষণ জমা দিলেন। সেখানে কোনও ব্যক্তিকে অভিযুক্ত করা হয়নি। শুধু পুরোনো সমীক্ষা, নতুন মানচিত্রের অসংগতি এবং পুনরায় পরিবেশগত ও জলনিকাশি সংক্রান্ত মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করা হয়েছিল।

প্রথমে তাঁর প্রতিবেদনটি গুরুত্ব পেল না। কিন্তু ফাইলের পরবর্তী পর্যায়ে একজন অভিজ্ঞ প্রকৌশলী বিষয়টি পড়ে আপত্তি তুললেন। তিনি সংশ্লিষ্ট বিভাগকে সরেজমিনে পরিদর্শনের পরামর্শ দিলেন।

পরিদর্শনে দেখা গেল, জলাভূমিটির একটি অংশ ইতিমধ্যেই মাটি ফেলে উঁচু করা হয়েছে। বর্ষার সময় আশপাশের রাস্তায় জল জমার ঘটনাও ঘটেছে। বিশেষজ্ঞদের নতুন মূল্যায়নে জানানো হলো, প্রস্তাবিত নির্মাণের আগে জলনিকাশির পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা এবং প্রয়োজনীয় পরিবেশগত অনুমোদন নিশ্চিত করা জরুরি।

ফলে প্রকল্পের অনুমোদন স্থগিত রাখা হলো। পরে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিকল্প নকশা তৈরি করতে এবং প্রযোজ্য নিয়ম মেনে নতুন করে মূল্যায়ন করাতে বলা হয়।

কয়েক সপ্তাহ পর দপ্তরে একটি বৈঠক ডাকা হলো। সেখানে অনিরুদ্ধের প্রতিবেদনটির উল্লেখ করে বিভাগীয় প্রধান বললেন, “একজন কর্মী নিজের দায়িত্ব সততার সঙ্গে পালন করেছেন বলেই একটি গুরুত্বপূর্ণ ত্রুটি সময়মতো ধরা পড়েছে। পদমর্যাদা দিয়ে কাজের গুরুত্ব মাপা যায় না।”

অনিরুদ্ধ কোনও বিশেষ পুরস্কার পেলেন না। তাঁর নাম সংবাদপত্রেও ছাপা হলো না। কিন্তু সহকর্মীদের আচরণে পরিবর্তন এল। তাঁরা বুঝতে পারলেন, নিয়ম মেনে প্রশ্ন তোলা মানেই কাজে বাধা দেওয়া নয়।

কয়েক মাস পরে নতুন প্রকল্পের নকশা তৈরি হলো। তাতে জলনিকাশির পথ অক্ষত রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছিল এবং প্রয়োজনীয় পর্যালোচনার বিষয়গুলিও অন্তর্ভুক্ত ছিল।

একদিন অনিরুদ্ধ নিজের টেবিলে বসে একটি নতুন ফাইল খুললেন। পাতার নিচে তাঁর স্বাক্ষরের জন্য নির্দিষ্ট জায়গা ছিল। তিনি কলম হাতে নিয়ে মনে মনে বললেন, “স্বাক্ষর হয়তো কয়েকটি কালির রেখা। কিন্তু তার আগে যে বিবেক কাজ করে, তার মূল্য অনেক বেশি।”

বাইরের পৃথিবী হয়তো তাঁর নাম জানল না, কিন্তু তাঁর সতর্কতা বহু মানুষের সম্ভাব্য দুর্ভোগ এড়ানোর প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল।

শিক্ষা: সততা সব সময় প্রশংসা বা পুরস্কার এনে দেয় না। তবু নিজের দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করা এবং ভুল দেখলে যুক্তি ও প্রমাণের ভিত্তিতে প্রশ্ন তোলা—এই সাহসই সমাজকে আরও নিরাপদ ও ন্যায়সংগত করে তোলে।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *