ঝাড়গ্রামের একটি উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ে গণিত পড়াতেন সুশান্তবাবু। তিনি বিশ্বাস করতেন, অঙ্কের উত্তর ভুল হতে পারে, কিন্তু ভুল উত্তর দেওয়ার ভয়ে প্রশ্ন করা বন্ধ করে দেওয়া সবচেয়ে বড় ভুল। তাঁর ক্লাসে তাই শুধু সঠিক উত্তর দেওয়ার জন্য নম্বর দেওয়া হতো না; কোনও সমস্যার সমাধান কীভাবে ভাবা হচ্ছে, সেটিও ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
এক বছর বিদ্যালয়ে নতুন প্রধান শিক্ষক যোগ দিলেন। তিনি পরীক্ষার ফলাফল ভালো করার জন্য বিশেষ উদ্যোগ নিলেন। প্রতিটি ক্লাসে নির্দিষ্ট সংখ্যক অঙ্ক করানো, নির্দিষ্ট সময়ে সিলেবাস শেষ করা এবং প্রতি সপ্তাহে পরীক্ষা নেওয়া বাধ্যতামূলক হলো।
প্রথমদিকে ফলাফল কিছুটা ভালোও হলো। কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যে সুশান্তবাবু লক্ষ করলেন, ছাত্রছাত্রীরা অঙ্কের উত্তর মুখস্থ করছে। প্রশ্নের সংখ্যা বদলে গেলে কিংবা একই সমস্যাকে অন্যভাবে উপস্থাপন করলে তারা আটকে যাচ্ছে।
নবম শ্রেণির ছাত্রী ঐশী একদিন ক্লাসের পরে তাঁর কাছে এসে বলল, “স্যার, আমি অঙ্কের নিয়ম জানি। কিন্তু প্রশ্নটা একটু অন্য রকম হলেই বুঝতে পারি না, কোন নিয়মটা ব্যবহার করব।”
সুশান্তবাবু তাকে কয়েকটি সহজ প্রশ্ন করলেন। ঐশী প্রতিটিতেই উত্তর দিতে পারল, কিন্তু কেন সেই পদ্ধতি ব্যবহার করছে, তা ব্যাখ্যা করতে পারল না।
তিনি বুঝলেন, সমস্যা শুধু ঐশীর নয়। পুরো ক্লাসের শিক্ষণপদ্ধতিতেই কোথাও একটা ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
পরের দিন তিনি কালো বোর্ডে একটি প্রশ্ন লিখলেন—
‘একটি আয়তাকার জমির দৈর্ঘ্য দ্বিগুণ করা হলো এবং প্রস্থ অর্ধেক করা হলো। জমিটির ক্ষেত্রফল কি বদলাবে?’
ছাত্রছাত্রীরা সঙ্গে সঙ্গে হিসাব করতে শুরু করল। কেউ বলল ক্ষেত্রফল দ্বিগুণ হবে, কেউ বলল অর্ধেক হবে। কয়েকজন আবার বইয়ের সূত্র খুঁজতে লাগল।
সুশান্তবাবু বললেন, “আজ কোনও বই খুলবে না। আগে নিজের যুক্তি বলো।”
একজন ছাত্র বলল, দৈর্ঘ্য বেড়েছে বলে ক্ষেত্রফলও বাড়বে। আরেকজন বলল, প্রস্থ কমেছে বলে ক্ষেত্রফল কমবে। ঐশী কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “দৈর্ঘ্য দ্বিগুণ আর প্রস্থ অর্ধেক হলে দুটো পরিবর্তন একে অন্যকে কাটিয়ে দেবে। তাই ক্ষেত্রফল একই থাকবে।”
তার উত্তর সঠিক ছিল। কিন্তু সুশান্তবাবু আরও একটি প্রশ্ন করলেন, “যদি দৈর্ঘ্য তিনগুণ করা হয় আর প্রস্থ অর্ধেক করা হয়, তখন কী হবে?”
এবার ঐশী আগের উত্তরের মতো মুখস্থ করে বলতে পারল না। সে কাগজে দুটি মাপ লিখল, গুণ করল এবং বুঝল ক্ষেত্রফল দেড় গুণ হবে।
সুশান্তবাবু হাসলেন। “এবার তুমি শুধু উত্তর জানো না, উত্তরটা কেন হচ্ছে, সেটাও বুঝতে শুরু করেছ।”
ক্লাসের কয়েকজন ছাত্র বলল, এভাবে পড়ালে অনেক সময় লাগবে। সামনে পরীক্ষা, এত আলোচনা করার সুযোগ কোথায়?
সুশান্তবাবু তাদের উদ্বেগ বুঝলেন। তিনি তাই প্রতিদিনের পুরো ক্লাস বদলে দিলেন না। বরং নির্দিষ্ট সময়ে পাঠ শেষ করার পাশাপাশি সপ্তাহে একটি ক্লাস রাখলেন, যেখানে বইয়ের সমস্যাকে বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হবে। কখনও জমির মাপ, কখনও বাজারের হিসাব, কখনও দূরত্ব ও সময়ের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা চলল।
তিনি প্রধান শিক্ষকের কাছেও নিজের পর্যবেক্ষণ জানালেন। প্রথমে প্রধান শিক্ষক খুব একটা উৎসাহ দেখালেন না। তাঁর বক্তব্য ছিল, পরীক্ষার ফলাফলই বিদ্যালয়ের সাফল্যের প্রধান মাপকাঠি।
সুশান্তবাবু বললেন, “পরীক্ষার ফল অবশ্যই জরুরি। কিন্তু ছাত্রছাত্রীরা যদি কেবল পরিচিত প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে, তবে নতুন সমস্যার মুখোমুখি হলে কী করবে?”
প্রধান শিক্ষক তাঁকে একটি পরীক্ষামূলক ক্লাস নেওয়ার অনুমতি দিলেন। কয়েক সপ্তাহ পরে সেই ক্লাসের ছাত্রছাত্রীদের এমন কিছু প্রশ্ন দেওয়া হলো, যা আগে হুবহু করানো হয়নি। দেখা গেল, অনেকেই নিজেদের যুক্তি ব্যবহার করে সমস্যার সমাধান করতে পারছে। কেউ ভুল করলেও কোথায় ভুল হয়েছে, তা ব্যাখ্যা করতে পারছে।
প্রধান শিক্ষক ফলাফল দেখে সন্তুষ্ট হলেন। তিনি বিদ্যালয়ের অন্য শিক্ষকদেরও নির্দিষ্ট সময়ে ধারণাভিত্তিক আলোচনা করার সুযোগ দিতে বললেন।
বার্ষিক পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিন ঐশী সর্বোচ্চ নম্বর পেল না। তবে গণিতের একটি জটিল প্রশ্নের উত্তরে সে নিজের সমাধানের প্রতিটি ধাপ ব্যাখ্যা করেছিল। পরীক্ষক তার যুক্তির প্রশংসা করলেন।
ফল জানার পরে ঐশী সুশান্তবাবুকে বলল, “স্যার, আগে অঙ্ক ভুল হলে মনে হতো আমি কিছুই পারি না। এখন বুঝি, ভুলটা কোথায় হয়েছে, সেটা খুঁজে বের করাও শেখার অংশ।”
বছরের শেষ ক্লাসে সুশান্তবাবু বোর্ডে আর কোনও অঙ্ক লিখলেন না। তিনি লিখলেন—
‘আজ এমন একটি প্রশ্ন করো, যার উত্তর তুমি এখনও জানো না।’
প্রথমে ক্লাসে নীরবতা নেমে এল। তারপর একে একে হাত উঠতে শুরু করল। কেউ জানতে চাইল, সবসময় একই পদ্ধতিতে সমস্যা সমাধান করা যায় কি না। কেউ প্রশ্ন করল, গণিতের নিয়ম বাস্তব জীবনে কোথায় কাজে লাগে।
সুশান্তবাবু প্রতিটি প্রশ্ন শুনলেন। ঘণ্টা পড়ার পরও আলোচনা চলতে থাকল।
শেষে তিনি বোর্ডের দিকে তাকিয়ে দেখলেন, চক দিয়ে লেখা প্রশ্নগুলোর মাঝখানে অনেক নতুন প্রশ্ন জমেছে। তাঁর মনে হলো, শিক্ষকের কাজ সব প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দেওয়া নয়; ছাত্রছাত্রীদের এমনভাবে ভাবতে শেখানো, যাতে তারা নিজেরাই উত্তর খুঁজে নেওয়ার সাহস পায়।
শিক্ষা: মুখস্থ বিদ্যা সাময়িক সাফল্য এনে দিতে পারে, কিন্তু প্রকৃত শিক্ষা মানুষকে যুক্তি দিয়ে ভাবতে, ভুল থেকে শিখতে এবং নতুন সমস্যার সমাধান খুঁজতে সাহায্য করে। প্রশ্ন করতে শেখাই জ্ঞান অর্জনের প্রথম ধাপ।