Categories
উপন্যাস বিবিধ রিভিউ

যে ঘরে রাত তিনটেয় আলো জ্বলে ((প্রথম পর্ব: বন্ধ দরজার ওপাশে))।

রাত তখন ঠিক তিনটে।

পুরো গ্রাম ঘুমিয়ে। দূরে কোথাও শেয়ালের ডাক শোনা যাচ্ছে। কুয়াশায় ঢেকে গেছে গ্রামের সরু মাটির রাস্তা, বাঁশবাগানের মাথায় জমে আছে শিশির। চারদিকে এমন নিস্তব্ধতা, যেন পৃথিবী থেকে সমস্ত শব্দ মুছে গেছে।

শুধু একটা বাড়ির দোতলার ঘরে আলো জ্বলছে।

বাড়িটার নাম নীলকুঠি।

প্রায় একশো বছরের পুরোনো সেই বাড়ি গ্রামের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। একসময় সেখানে বসবাস করতেন জমিদার হেমাঙ্গভূষণ রায়, তাঁর স্ত্রী মৃণালিনী এবং তাঁদের একমাত্র মেয়ে চারুলতা। গ্রামের বয়স্ক মানুষেরা বলেন, এই বাড়িতে এক রাতে এমন কিছু ঘটেছিল, যার পর থেকে রায় পরিবারের আর কাউকে দেখা যায়নি।

তারপর থেকে বাড়িটি পরিত্যক্ত।

অন্তত গ্রামের মানুষ তাই জানত।

কিন্তু গত সাত রাত ধরে প্রতিদিন ঠিক তিনটেয় নীলকুঠির দোতলার বাঁদিকের ঘরে আলো জ্বলছে।

প্রথমে কেউ বিষয়টাকে গুরুত্ব দেয়নি। ভেবেছিল, হয়তো চোর ঢুকেছে। কিন্তু অষ্টম রাতে গ্রামের চায়ের দোকানে বসে কথাটা শুনল কলকাতা থেকে আসা তরুণ সাংবাদিক অর্ক সেন।

অর্কের বয়স আটাশ। রহস্যময় ঘটনা নিয়ে লেখালেখি করাই তার পেশা। কয়েক মাস আগে তার লেখা একটি প্রতিবেদন বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল। তারপর থেকেই সে এমন সব ঘটনার খোঁজ করছিল, যেগুলোর ব্যাখ্যা সাধারণ যুক্তিতে দেওয়া কঠিন।

নীলকুঠির কথা শুনে তার চোখ জ্বলে উঠল।

চায়ের কাপটা নামিয়ে সে জিজ্ঞেস করল, “বাড়িটায় কেউ থাকে না, অথচ রোজ রাত তিনটেয় আলো জ্বলে? আপনারা কেউ গিয়ে দেখেননি?”

দোকানের বেঞ্চে বসে থাকা বৃদ্ধ নিবারণ মণ্ডল মাথা নাড়লেন।

“দেখতে গিয়েছিল একজন। আর ফেরেনি।”

অর্ক হেসে বলল, “পুলিশে খবর দেননি?”

“দিয়েছিলাম। পুলিশ গিয়েছিল। বাড়ির সব দরজা বন্ধ, জানলা বন্ধ। ভেতরে কেউ নেই। কিন্তু লোকটা আর ফিরে আসেনি।”

“লোকটার নাম কী?”

“বিপ্লব পাল। বছর পাঁচেক আগে গ্রামের স্কুলে পড়াত। এক রাতে আলো দেখে বাড়ির ভেতরে ঢুকেছিল। তারপর থেকে নিখোঁজ।”

অর্ক এবার আর হাসল না।

“বাড়িটার মালিক কে এখন?”

বৃদ্ধ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “আইন অনুযায়ী, কেউ না। রায় পরিবারের শেষ সদস্যের মৃত্যুর পর সম্পত্তি নিয়ে মামলা হয়েছিল। কিন্তু আশ্চর্যের কথা জানেন? যে উকিল মামলাটা দেখছিলেন, তিনিও একদিন হঠাৎ উধাও হয়ে যান।”

“আর রায় পরিবারের মেয়েটি?”

নিবারণবাবুর চোখে অদ্ভুত একটা ভয় ফুটে উঠল।

“চারুলতা?”

“হ্যাঁ।”

বৃদ্ধ ধীরে ধীরে বললেন, “ওর কথা রাতে মুখে আনবেন না। বিশেষ করে তিনটের পর।”

অর্ক এবার প্রশ্ন করল, “কেন?”

নিবারণবাবু তার দিকে ঝুঁকে ফিসফিস করে বললেন, “কারণ গ্রামের লোকেরা বিশ্বাস করে, চারুলতা এখনও ওই বাড়িতেই আছে। আর প্রতি রাতে সে একজনের নাম ধরে ডাকে।”

“কার নাম?”

বৃদ্ধ উত্তর দিলেন না। শুধু উঠে দাঁড়িয়ে দোকানের ঝাঁপ নামাতে শুরু করলেন।

“আজ রাতটা অন্য কোথাও কাটান, বাবু। নীলকুঠির দিকে যাবেন না।”

কিন্তু অর্কের সিদ্ধান্ত ততক্ষণে হয়ে গেছে।

সেদিন রাতেই সে নীলকুঠিতে যাবে।


রাত আড়াইটে নাগাদ অর্ক বাড়ি থেকে বেরোল। সঙ্গে একটা টর্চ, মোবাইল ফোন, ছোট ক্যামেরা আর একটি নোটবুক। আকাশে চাঁদ নেই। রাস্তার দুপাশে ঘন গাছপালা। হাঁটতে হাঁটতে সে বারবার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছিল।

২:৪৭।

আর মাত্র তেরো মিনিট।

নীলকুঠির সামনে পৌঁছে অর্ক থমকে দাঁড়াল।

বাড়িটা দূর থেকে যতটা ভয়ংকর মনে হয়েছিল, কাছে এসে তার চেয়েও বেশি ভয়ংকর লাগছিল। বিশাল লোহার ফটকে মরচে পড়েছে। দেওয়ালের গায়ে বটগাছের শিকড় নেমে এসেছে। জানলাগুলোর কাচ ভাঙা। অথচ দোতলার বাঁদিকের একটি জানলা থেকে হলুদ আলো বেরিয়ে আসছে।

অর্ক ক্যামেরা চালু করল।

“সময় রাত ২টা ৫৩ মিনিট। আমি এখন নীলকুঠির সামনে দাঁড়িয়ে আছি। গ্রামের মানুষদের দাবি, গত সাত রাত ধরে এই বাড়ির একটি ঘরে ঠিক রাত তিনটেয় আলো জ্বলছে। আজ আমি বাড়ির ভেতরে ঢুকে বিষয়টি পরীক্ষা করব।”

কথাগুলো রেকর্ড করে সে ফটকের কাছে গেল।

আশ্চর্যের বিষয়, ফটকে তালা ছিল না।

অর্ক ধীরে ধীরে ফটক ঠেলে খুলল। একটা দীর্ঘ, কর্কশ শব্দ রাতের নীরবতা ভেঙে দিল।

ভেতরে ঢুকতেই তার নাকে এল স্যাঁতসেঁতে কাঠ আর পুরোনো ফুলের গন্ধ। উঠোনের মাঝখানে শুকিয়ে যাওয়া একটি ফোয়ারা। তার চারপাশে ছড়িয়ে রয়েছে শুকনো পাতা। বাড়ির মূল দরজাটি অল্প ফাঁক হয়ে ছিল।

অর্ক দরজায় হাত রাখতেই সেটা নিজে থেকেই খুলে গেল।

ভেতরে ঘুটঘুটে অন্ধকার।

টর্চ জ্বালিয়ে সে ঢুকল।

দেওয়ালে ঝোলানো পুরোনো ছবিগুলোর মুখ ধুলোয় ঢাকা। মেঝেতে ভাঙা কাচ। একপাশে পড়ে আছে কাঠের চেয়ার। মনে হচ্ছে, কেউ যেন তাড়াহুড়ো করে বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিল।

কিন্তু সবচেয়ে অদ্ভুত ছিল সিঁড়ির কাছে রাখা একটি জিনিস।

একজোড়া ছোট মেয়ের জুতো।

জুতোগুলো একেবারে পরিষ্কার। যেন কেউ কয়েক মিনিট আগেই সেখানে রেখে গেছে।

অর্ক নিচু হয়ে জুতোগুলোর ছবি তুলল।

ঠিক তখনই ওপরতলা থেকে একটা শব্দ এল।

টক।

টক।

টক।

কেউ যেন কাঠের দরজায় তিনবার টোকা দিচ্ছে।

অর্ক সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল। প্রতিটি ধাপে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গে কাঠ কেঁপে উঠছিল। দোতলায় পৌঁছে সে দেখল, করিডরের শেষ ঘরটির দরজা বন্ধ। দরজার নিচ দিয়ে হলুদ আলো বেরিয়ে আসছে।

ঘড়িতে তখন ২:৫৯।

অর্ক দরজার সামনে দাঁড়াল।

ভেতর থেকে ভেসে এল একটি মেয়ের গলা।

“বাবা?”

অর্কের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।

কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।

তারপর আবার সেই কণ্ঠস্বর।

“বাবা, তুমি এসেছ?”

অর্ক শুকনো গলায় বলল, “কে আছেন ভেতরে?”

কোনো উত্তর এল না।

সে দরজার হাতলে হাত রাখল।

হাতলটা বরফের মতো ঠান্ডা।

ঠিক তিনটে বাজতেই ঘরের ভেতরের আলো নিভে গেল।

একই সঙ্গে বাড়ির সমস্ত দরজা-জানলা সজোরে বন্ধ হয়ে গেল। অর্ক পিছনে ফিরে দৌড়তে গিয়েও থেমে গেল, কারণ করিডরের অন্য প্রান্তে দাঁড়িয়ে ছিল একটি ছোট মেয়ে।

সাদা পোশাক। কোমর পর্যন্ত নেমে আসা কালো চুল। পা দুটো মেঝে ছুঁয়ে আছে কি না, বোঝা যাচ্ছে না।

মেয়েটির মুখ দেখা যাচ্ছিল না।

সে ধীরে ধীরে মাথা তুলল।

“তুমি বাবা নও,” মেয়েটি বলল।

অর্ক কোনো কথা বলতে পারল না।

মেয়েটি আবার বলল, “তাহলে তুমি আমার নাম জানো?”

“তোমার নাম কী?”

মেয়েটি এক পা এগিয়ে এল।

“চারুলতা।”

নামটা শুনেই অর্কের মনে পড়ল গ্রামের বৃদ্ধের সতর্কবাণী।

মেয়েটি এবার হাত তুলে করিডরের শেষ ঘরটার দিকে দেখাল।

“ওই ঘরে যেও না।”

অর্ক কাঁপা গলায় প্রশ্ন করল, “কেন?”

মেয়েটি ধীরে ধীরে মুখ ঘুরিয়ে তার দিকে তাকাল।

মুখটা দেখে অর্কের সমস্ত শরীর অবশ হয়ে গেল।

মেয়েটির মুখে চোখ, নাক, ঠোঁট—কিছুই ছিল না। শুধু মসৃণ সাদা চামড়া।

তবু সেই মুখের মাঝখান থেকে স্পষ্ট স্বরে ভেসে এল কথা—

“কারণ ওখানে তুমি নিজেকেই দেখতে পাবে।”

পরমুহূর্তেই করিডরের আলো জ্বলে উঠল।

মেয়েটি নেই।

অর্ক ছুটে সিঁড়ি দিয়ে নেমে এল। কিন্তু নিচে পৌঁছে দেখল, যে দরজা দিয়ে সে ঢুকেছিল, সেটি আর নেই। সেখানে দাঁড়িয়ে আছে একটা বিশাল আয়না।

আয়নার মধ্যে দেখা যাচ্ছে নীলকুঠির উঠোন।

আর উঠোনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে অর্ক নিজেই।

কিন্তু আয়নার ভেতরের অর্কের পোশাক ভেজা, মুখ ফ্যাকাশে, চোখের নিচে কালো দাগ। তার হাতে একটি পুরোনো চিঠি।

আয়নার ভেতরের অর্ক ধীরে ধীরে মাথা তুলল।

তারপর ঠোঁট নাড়ল।

অর্ক স্পষ্ট বুঝতে পারল, সে কী বলছে।

“আজ তুমি এসেছ। এবার আমাকে যেতে দাও।”

অর্ক পিছিয়ে গেল।

তার পকেটে থাকা মোবাইল ফোন হঠাৎ বেজে উঠল। স্ক্রিনে অজানা নম্বর।

সে কাঁপা হাতে কল ধরল।

ওপাশ থেকে ভেসে এল এক বৃদ্ধের গলা।

“অর্কবাবু, আপনি কি নীলকুঠির ভেতরে?”

“কে বলছেন?”

“আমি নিবারণ। তাড়াতাড়ি বেরিয়ে আসুন। আপনি একটা বড় ভুল করেছেন।”

অর্ক চিৎকার করে বলল, “বাড়ির দরজা খুঁজে পাচ্ছি না!”

ওপাশে কয়েক মুহূর্ত নীরবতা।

তারপর নিবারণবাবু এমন একটি কথা বললেন, যা শুনে অর্কের হাত থেকে ফোনটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।

“দরজা খুঁজে পাবেন কী করে, বাবু? নীলকুঠির ভেতরে তো আপনি ঢোকেনইনি।”

অর্ক স্তব্ধ হয়ে গেল।

“মানে?”

“আপনি তো গতকাল বিকেলেই মারা গেছেন। গ্রামের পুকুরের ধারে আপনার মৃতদেহ পাওয়া গেছে। পুলিশ আপনার বাড়িতে খবর দিতে গেছে।”

ঠিক সেই মুহূর্তে আয়নার ভেতরের অর্ক হাসল।

তারপর আয়নার কাচের ওপাশ থেকে হাত বাড়িয়ে দিল।

আর বাড়ির দোতলার ঘরে আবার আলো জ্বলে উঠল।

ঠিক রাত তিনটেয়।

প্রথম পর্ব সমাপ্ত।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *