Categories
উপন্যাস বিবিধ

যে ঘরে রাত তিনটেয় আলো জ্বলে ((দ্বিতীয় পর্ব: মৃত মানুষের চিঠি))।

আয়নার ওপাশ থেকে বাড়িয়ে দেওয়া হাতটা দেখে অর্ক পিছিয়ে গেল।

তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি দেখতে হুবহু তার মতো। একই মুখ, একই পোশাক, একই চোখ। শুধু একটা পার্থক্য—আয়নার ভেতরের অর্কের চোখের মণি দুটো সম্পূর্ণ কালো।

“আমাকে বেরোতে দাও,” আয়নার ভেতরের মানুষটি আবার বলল।

অর্ক কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল, “তুমি কে?”

লোকটি মৃদু হেসে বলল, “তুমি কি সত্যিই জানতে চাও? নাকি তুমি সেই উত্তরটাই শুনতে ভয় পাচ্ছ, যেটা এতদিন ধরে নিজের কাছ থেকে লুকিয়ে রেখেছ?”

“আমি তোমার কথা বুঝতে পারছি না।”

“বুঝবে। সব মনে পড়বে। তবে তার আগে তোমাকে সেই ঘরটায় যেতে হবে।”

আয়নার ভেতরের মানুষটি দোতলার দিকে আঙুল তুলল।

ঠিক তখনই অর্কের মোবাইলের আলো নিভে গেল। কয়েক সেকেন্ডের জন্য চারপাশ অন্ধকার হয়ে রইল। আবার আলো জ্বালাতেই সে দেখল, আয়নাটা নেই। তার জায়গায় দাঁড়িয়ে রয়েছে একটি পুরোনো কাঠের দরজা।

দরজার ওপরে খোদাই করা অক্ষরে লেখা—

১৩।

অর্কের বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।

সে জানত, বাড়ির দোতলায় যে ঘরটিতে আলো জ্বলছিল, সেটির দরজায় কোনো নম্বর ছিল না। অথচ এই দরজার সামনে দাঁড়াতেই তার মনে হচ্ছিল, জীবনে বহুবার সে এখানে এসেছে।

দরজার নিচ দিয়ে একটা সাদা কাগজ বেরিয়ে এল।

অর্ক কাগজটা তুলে নিল।

তাতে কাঁপা হাতে লেখা ছিল—

“অর্ক, যদি তুমি এই চিঠিটা পড়তে পারো, তাহলে বুঝবে তুমি এখনও সব ভুলে যাওনি। মনে রেখো, রাত তিনটের আগে ঘর থেকে বেরিয়ে যেয়ো না। আর যদি কোনো মেয়ের গলা শুনতে পাও, তাকে কখনও বলবে না যে তুমি তাকে চিনতে পারছ না।”

চিঠির নিচে একটি নাম।

মেঘলা।

অর্ক নামটা পড়ে অনেকক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

মেঘলা কে?

তার জীবনে এই নামের কেউ ছিল কি?

মাথার ভেতর যেন অসংখ্য বন্ধ দরজা একসঙ্গে খুলতে চাইছিল। অস্পষ্ট একটা ছবি ভেসে উঠল—বৃষ্টিভেজা রাস্তা, একটি ছোট মেয়ে, আর তার নিজের কণ্ঠস্বর।

“মেঘলা, আমার হাতটা শক্ত করে ধরো!”

তারপর একটা বিকট শব্দ।

তারপর অন্ধকার।

অর্ক কপালে হাত রাখল। স্মৃতিটা আবার মিলিয়ে গেল।

সে দরজার হাতল ঘোরাল।

দরজাটা খুলে গেল নিঃশব্দে।


ঘরটার ভেতরে ঢুকে অর্ক প্রথমেই বুঝল, নীলকুঠির অন্য ঘরগুলোর সঙ্গে এর কোনো মিল নেই।

দেওয়ালে নতুন রং করা। মেঝেতে পরিষ্কার কার্পেট। একটা টেবিলের ওপর রাখা আধুনিক ল্যাপটপ, পাশে কাচের গ্লাসে জল। জানলার কাছে দাঁড়িয়ে রয়েছে একটি ছোট মেয়ের পুতুল।

সবকিছু দেখে মনে হচ্ছিল, কেউ এখানে নিয়মিত বসবাস করে।

টেবিলের ওপর একটা মোটা খাতা পড়েছিল।

অর্ক খাতাটা খুলতেই দেখতে পেল, প্রথম পাতায় লেখা—

“নীলকুঠির মৃত্যুর খাতা।”

তার নিচে একের পর এক নাম। প্রতিটি নামের পাশে একটি করে তারিখ।

হেমাঙ্গভূষণ রায়—১৭ অক্টোবর ১৯৮৯।

মৃণালিনী রায়—১৭ অক্টোবর ১৯৮৯।

চারুলতা রায়—১৭ অক্টোবর ১৯৮৯।

বিপ্লব পাল—১৭ অক্টোবর ২০২১।

আর একেবারে শেষের নামটি দেখে অর্কের হাত ঠান্ডা হয়ে গেল।

অর্ক সেন—১৭ অক্টোবর ২০২৬।

তারিখটা আজকের।

নামের পাশে লেখা—

“মৃত্যুর সময়: রাত ৩টা।”

অর্ক ঘড়ির দিকে তাকাল।

৩টা ১২।

“এটা কীভাবে সম্ভব?” সে বিড়বিড় করে বলল।

ঠিক তখনই তার পিছনে দরজা বন্ধ হয়ে গেল।

ঘরের এক কোণে রাখা পুরোনো রেডিওটা নিজে থেকেই চালু হয়ে উঠল। প্রথমে শোঁ শোঁ শব্দ, তারপর একটি নারীকণ্ঠ।

“সতর্কবার্তা। আজ রাত তিনটেয় নীলকুঠিতে আরেকটি মৃত্যু ঘটেছে। মৃত ব্যক্তির পরিচয় এখনও জানা যায়নি।”

কণ্ঠস্বরটা অর্কের পরিচিত মনে হল।

রেডিওতে আবার কথা শুরু হল।

“প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, মৃত ব্যক্তির নাম অর্ক সেন। তবে আশ্চর্যের বিষয়, তাঁর দেহ উদ্ধারের আগেই তাঁকে নীলকুঠির ভেতরে প্রবেশ করতে দেখা গেছে।”

অর্ক চিৎকার করে রেডিওটা বন্ধ করে দিল।

কিন্তু রেডিও বন্ধ হওয়ার পরও নারীকণ্ঠটা তার কানের ভেতর বাজতে থাকল।

“অর্ক, আমার কথা শোনো।”

সে ঘুরে দাঁড়াল।

দরজার পাশে দাঁড়িয়ে আছে একটি মেয়ে।

এবার তার মুখ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। বয়স প্রায় ষোলো। কাঁধ পর্যন্ত চুল। পরনে নীল রঙের ফ্রক। চোখ দুটো অদ্ভুত রকমের শান্ত।

অর্ক ফিসফিস করে বলল, “মেঘলা?”

মেয়েটি মাথা নাড়ল।

“অবশেষে তোমার মনে পড়েছে।”

“তুমি কে? তুমি আমাকে চেনো?”

মেঘলা একটু হাসল।

“তুমি আমাকে চিনতে না পারলেও আমি তোমাকে চিনি। তুমি আমাকে এই বাড়িতে রেখে চলে গিয়েছিলে।”

অর্কের মাথার ভেতর আবার সেই অস্পষ্ট ছবিটা ফিরে এল। বৃষ্টির মধ্যে ছোট একটা হাত তার হাত থেকে পিছলে যাচ্ছে। কেউ কাঁদছে। দূরে গাড়ির হর্ন।

সে মাথা চেপে ধরল।

“আমি কাউকে ফেলে যাইনি!”

মেঘলার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।

“তাহলে আমার মৃত্যুর রাতে তুমি কোথায় ছিলে, অর্ক?”

প্রশ্নটা শুনে অর্কের মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বেরোল না।

মেঘলা ধীরে ধীরে এগিয়ে এল।

“সেদিনও রাত তিনটে বাজছিল। মা আমাকে তোমার কাছে রেখে গিয়েছিল। তুমি বলেছিলে, আমাকে কখনও একা ছেড়ে যাবে না। কিন্তু দরজার ওপাশে যখন আগুন জ্বলছিল, তুমি একবারও ফিরে তাকাওনি।”

“না! আমি—”

“চুপ!”

মেঘলার গলার স্বর বদলে গেল।

ঘরের জানলাগুলো কেঁপে উঠল। টেবিলের ওপর রাখা গ্লাসটা মেঝেতে পড়ে ভেঙে গেল।

“তুমি যদি সত্যিটা জানতে চাও, তাহলে এই চিঠিটা পড়ো।”

মেঘলা টেবিলের ড্রয়ার খুলে একটা হলুদ খাম বের করল। খামের ওপর লেখা—

অর্কের জন্য। যদি সে কখনও ফিরে আসে।

অর্ক কাঁপা হাতে খামটা খুলল।

ভেতরে একটি পুরোনো চিঠি।

“প্রিয় অর্ক,

তুমি যখন এই চিঠি পড়বে, তখন হয়তো আমি আর বেঁচে থাকব না। তোমার মনে অনেক প্রশ্ন আছে। তুমি জানতে চাও, কেন তোমার মনে কিছুই নেই। কেন প্রতি রাতে তিনটেয় এই বাড়িতে আলো জ্বলে। কেন তুমি নিজের মৃতদেহের খবর শুনেও বেঁচে আছ বলে মনে করছ।

এর উত্তর একটাই।

তুমি যে অর্ককে নিজের বলে চিনে এসেছ, সে আসল অর্ক নয়।

আসল অর্ক মারা গিয়েছিল সেদিন রাতে, যখন নীলকুঠির উত্তর দিকের ঘরে আগুন লেগেছিল।

আর যে অর্ক এখন এই বাড়ির ভেতরে হাঁটছে, সে তৈরি হয়েছে তোমার স্মৃতি, অপরাধবোধ আর একটি অসমাপ্ত প্রতিজ্ঞা দিয়ে।

কিন্তু এই প্রতিজ্ঞার পেছনে আরও একটি সত্য আছে।

চারুলতা তোমাকে বাঁচিয়েছিল। আর সেই কারণেই তাকে চিরকাল এই বাড়িতে আটকে থাকতে হয়েছে।

যদি তাকে মুক্ত করতে চাও, তবে রাত তিনটের ঘড়িটা থামিয়ে দিও।

কিন্তু সাবধান—ঘড়ি থামলে শুধু চারুলতাই মুক্ত হবে না।

তোমার আসল মৃত্যুও ফিরে আসবে।”

চিঠির নিচে কোনো নাম ছিল না।

অর্ক কাগজটা নামিয়ে মেঘলার দিকে তাকাল।

“চারুলতা কে? আর তুমি কে?”

মেঘলা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর বলল, “চারুলতা এই বাড়ির মেয়ে। আর আমি…”

সে নিজের হাতের দিকে তাকাল। তার আঙুলগুলো ক্রমশ স্বচ্ছ হয়ে আসছিল।

“আমি সেই মেয়ে, যাকে তুমি বাঁচাতে পারোনি।”

অর্কের চোখে জল এসে গেল। কেন সে কাঁদছে, সে নিজেও বুঝতে পারছিল না।

মেঘলা তার কাছে এসে ফিসফিস করে বলল, “তোমাকে একটা জিনিস দেখাতে হবে।”

সে ঘরের পিছনের দেওয়ালের কাছে গিয়ে একটা পুরোনো ছবি সরাল।

ছবির পিছনে ছিল সরু একটা দরজা।

দরজাটা খুলতেই অর্ক দেখল, তার ওপাশে পাথরের সিঁড়ি নেমে গেছে অন্ধকারের মধ্যে। নিচ থেকে ভেসে আসছে ঘড়ির টিকটিক শব্দ।

“ওই সিঁড়ি কোথায় গেছে?” অর্ক জিজ্ঞেস করল।

“নীলকুঠির নিচে। সেখানে এমন একটা ঘর আছে, যেখানে সময় থেমে আছে আটত্রিশ বছর ধরে।”

“সেখানে কী আছে?”

মেঘলা উত্তর দিল না।

শুধু বলল, “তুমি একা যাবে। আর যা-ই দেখো, কাউকে বিশ্বাস করবে না।”

অর্ক সিঁড়ি দিয়ে নামতে শুরু করল।

সিঁড়ির শেষ ধাপে পৌঁছে সে দেখল, একটা বিশাল গোল ঘর। দেওয়ালে সারি সারি ঘড়ি। কোনো ঘড়িতে তিনটে বেজে বারো মিনিট, কোনো ঘড়িতে তিনটে বেজে তেরো মিনিট, আবার কোনো ঘড়িতে ঠিক তিনটে।

ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে রয়েছে একটি বিশাল পেন্ডুলাম ঘড়ি।

তার কাঁটা থেমে আছে ২টা ৫৯ মিনিটে।

আর ঘড়িটার সামনে দাঁড়িয়ে আছে একজন বৃদ্ধ।

সাদা চুল, কুঁচকে যাওয়া মুখ, হাতে একটি লাঠি।

অর্ক বৃদ্ধকে দেখে চমকে উঠল।

লোকটিকে সে আগে দেখেছে।

অনেক আগে।

হঠাৎ তার মনে পড়ে গেল—বৃদ্ধের নাম হেমাঙ্গভূষণ রায়। নীলকুঠির সেই জমিদার, যিনি আটত্রিশ বছর আগে মারা গিয়েছিলেন।

কিন্তু বৃদ্ধের হাতে যে ছবিটা ছিল, সেটি দেখে অর্কের বুকের ভেতরটা জমে গেল।

ছবিতে অর্ক নিজেই দাঁড়িয়ে আছে।

তার পাশে মেঘলা।

আর ছবির পিছনে লেখা—

“অর্ক সেন ও মেঘলা সেন। ১৭ অক্টোবর ১৯৮৯।”

অর্ক তো ১৯৯৮ সালে জন্মেছে!

এটা কীভাবে সম্ভব?

বৃদ্ধ ধীরে ধীরে মুখ তুললেন।

“অবশেষে তুমি ফিরে এলে।”

অর্ক পিছিয়ে গেল।

“আপনি তো মৃত!”

হেমাঙ্গভূষণ হেসে উঠলেন।

“মৃত? এই বাড়িতে মৃত বলে কেউ নেই, বাবা। এখানে শুধু এমন কিছু মানুষ আছে, যাদের মৃত্যু এখনও ঘটেনি।”

তিনি পেন্ডুলাম ঘড়িটার দিকে তাকালেন।

“আর তোমার মৃত্যুর সময় এসে গেছে।”

ঠিক সেই মুহূর্তে ঘড়ির কাঁটা নড়ল।

২টা ৫৯ থেকে ৩টা।

সমস্ত ঘড়ি একসঙ্গে বেজে উঠল।

আর অন্ধকারের মধ্যে থেকে ভেসে এল চারুলতার কণ্ঠস্বর—

“অর্ক, ঘড়িটা থামিও না!”

কিন্তু বৃদ্ধ ইতিমধ্যেই ঘড়ির দরজা খুলে ফেলেছেন।

তার ভেতরে বসে আছে একটি ছোট মেয়ে।

সাদা পোশাক, কালো চুল।

মেয়েটির মুখ অর্কের দিকে ফিরতেই সে বুঝতে পারল—এ তো সেই চারুলতা।

কিন্তু তার চোখের জায়গায় রয়েছে দুটি ছোট ঘড়ির কাঁটা।

চারুলতা হাসল।

“এবার তোমার মনে পড়বে, অর্ক। কে কাকে মেরেছিল।”

তারপর পেন্ডুলামটা উল্টো দিকে দুলতে শুরু করল।

আর অর্কের চোখের সামনে আটত্রিশ বছরের পুরোনো রাতটি আবার জীবন্ত হয়ে উঠল।

আগুন।

চিৎকার।

একটি বন্ধ দরজা।

আর দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা একজন মানুষ—যার মুখ হুবহু অর্কের মতো।

দ্বিতীয় পর্ব সমাপ্ত।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *