“আমি আসল অদিতি। তুই কে?”
কথাটা শোনার পর অদিতির মনে হল, তার পায়ের নিচের মেঝেটা যেন সরে যাচ্ছে।
তেরো নম্বর ঘরের ভেতর থেকে যে কণ্ঠস্বর ভেসে এসেছিল, সেটা অবিকল তার নিজের কণ্ঠস্বর। শুধু তাতে একটা অদ্ভুত ক্লান্তি মিশে ছিল, যেন বহু বছর ধরে অন্ধকারের মধ্যে আটকে থেকে কেউ কথা বলছে।
সামনে দাঁড়িয়ে থাকা পোড়া মুখের মহিলাটি হাত বাড়িয়ে বললেন, “আমার কাছে আয়, মা। ওই ঘরের ভেতরে যা আছে, তা তোর সর্বনাশ করবে।”
অন্যদিকে ইটের দেওয়ালের ফাটল থেকে বেরিয়ে থাকা হাতটা আরও জোরে দরজায় আঘাত করতে লাগল।
“অদিতি! আমার কথা শোন! আমি তোর মা! তুই যদি আজ দরজাটা না খুলিস, কাল আর কাউকে বাঁচাতে পারবি না!”
অদিতি দুই হাত দিয়ে কান চেপে ধরল।
“চুপ করুন! আপনারা দুজনেই চুপ করুন!”
তার চিৎকারে বাড়িটা যেন কয়েক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল।
বৃদ্ধ হরিপদ ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে এলেন। তাঁর হাতে ধরা বন্দুকটা কাঁপছে।
“আপনি আমার সঙ্গে আসুন,” তিনি বললেন। “এই রাত শেষ হওয়ার আগে আপনাকে সব সত্যি জানতে হবে।”
অদিতি তাঁর দিকে তাকাল।
“আপনি জানেন আমার সঙ্গে কী হচ্ছে?”
“জানি। আর এটাও জানি, আপনার বাবা এত বছর ধরে যে সত্যিটা লুকিয়ে রেখেছিলেন, আজ সেই সত্যিটাই আপনাকে খুঁজে বের করতে হবে।”
“আমার বাবা কী লুকিয়েছিলেন?”
হরিপদ উত্তর দিলেন না। শুধু করিডরের শেষ প্রান্তের দিকে তাকালেন।
সেখানে পোড়া মুখের মহিলাটি আর দাঁড়িয়ে নেই।
কিন্তু মেঝের ওপর পড়ে রয়েছে একজোড়া ভেজা পায়ের ছাপ।
পায়ের ছাপগুলো ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে থেমেছে একটা বিশাল আয়নার সামনে।
আয়নাটা অদিতি আগেও দেখেছে। পুরোনো কাঠের কারুকাজ করা ফ্রেম, তার গায়ে কালো দাগ। ছোটবেলায় এই বাড়িতে আসার সময় সে একবার আয়নাটার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের প্রতিবিম্ব দেখেছিল।
কিন্তু আজ আয়নায় তার প্রতিবিম্ব নেই।
আয়নার ওপাশে দাঁড়িয়ে আছে একটা ছোট মেয়ে।
সাদা ফ্রক পরা।
ভেজা চুল কপালে লেগে আছে।
তার হাতে সেই রুপোর নূপুর, যেটা অদিতি কিছুক্ষণ আগে সিঁড়ির কাছে কুড়িয়ে পেয়েছিল।
মেয়েটা ঠোঁটে আঙুল রেখে ইশারা করল।
তারপর আয়নার কাচের ওপর লিখতে শুরু করল—
“তোর জন্ম হয়েছিল এই বাড়িতে।”
অদিতি কাচের কাছে এগিয়ে গেল।
মেয়েটা আবার লিখল—
“তোর মা তোকে জন্ম দিয়ে মারা যায়নি।”
তারপর হঠাৎ আয়নার ওপাশের অন্ধকারে কিছু একটা নড়ে উঠল।
মেয়েটার মুখে আতঙ্ক ফুটে উঠল। সে দ্রুত লিখল—
“ওরা তোকে মিথ্যে বলেছে।”
পরের মুহূর্তে আয়নার ভেতর থেকে একটা কালো হাত বেরিয়ে এসে মেয়েটার গলা চেপে ধরল।
মেয়েটি ছটফট করতে লাগল।
অদিতি চিৎকার করে উঠল, “ওকে ছেড়ে দিন!”
সে আয়নার কাচে হাত রাখতেই একটা বরফশীতল অনুভূতি তার শরীরের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল। মনে হল, কেউ তার হাত ধরে টানছে।
এক মুহূর্তের জন্য আয়নার ওপাশে সে একটা ঘর দেখতে পেল।
ঘরের মাঝখানে কাঠের একটা খাট।
খাটের ওপর শুয়ে আছেন এক তরুণী।
তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে একজন পুরুষ। হাতে কাঁচের শিশি।
আর ঘরের কোণে দাঁড়িয়ে কাঁদছে একটা ছোট মেয়ে।
তরুণীর মুখটা অদিতির মায়ের মতো।
পুরুষটির মুখটা তার বাবার মতো।
তারপর দৃশ্যটা মিলিয়ে গেল।
অদিতি হাত সরিয়ে নিল।
“ওটা কী ছিল?”
হরিপদ এবার মাথা নিচু করলেন।
“আপনার জন্মের রাত।”
“কিন্তু আমার বাবা তো বলেছিলেন, আমার জন্ম হয়েছিল কলকাতার একটা হাসপাতালে!”
“আপনার বাবা অনেক কিছুই বলেছিলেন, মা। কিন্তু সব কথা সত্যি ছিল না।”
“তাহলে সত্যিটা কী?”
বৃদ্ধের চোখ ভিজে উঠল।
“আপনার মা, মৃণালিনী দেবী আর মীরা—এই তিনজনের জীবন জড়িয়ে আছে তেরো নম্বর ঘরের সঙ্গে। আর সেই ঘরের রহস্য না বুঝলে আপনি কোনোদিন জানতে পারবেন না, আপনি আসলে কে।”
অদিতি এবার হরিপদের হাত চেপে ধরল।
“মীরা কে?”
বৃদ্ধ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
“১৯৪৩ সালে এই বাড়িতে মীরা নামে আট বছরের একটা মেয়ে থাকত। সে ছিল বাড়ির পরিচারিকার মেয়ে। এক রাতে সে হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যায়। পরদিন বাড়ির পেছনের কুয়ো থেকে তার দেহ উদ্ধার করা হয়। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, তার মৃত্যুর পর থেকেই বাড়িতে অদ্ভুত ঘটনা ঘটতে শুরু করে।”
“তারপর?”
“বাড়ির লোকেরা বিশ্বাস করত, মীরার আত্মা তেরো নম্বর ঘরে বন্দি হয়ে আছে। তাই ঘরটা ইট দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়।”
“কিন্তু আমার জন্মের সঙ্গে মীরার সম্পর্ক কী?”
হরিপদ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর বললেন, “কারণ আপনার জন্মের রাতে, ঠিক ২টা ১৩ মিনিটে, সেই বন্ধ ঘর থেকে একটা শিশুর কান্না শোনা গিয়েছিল।”
অদিতির বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।
“কোন শিশুর?”
“সেই প্রশ্নের উত্তর আপনার বাবা জানতেন। কিন্তু তিনি মৃত্যুর আগে আমাকে একটা চাবি দিয়ে গিয়েছিলেন। বলেছিলেন, আপনি যদি কখনও এই বাড়িতে ফিরে আসেন, তবে যেন আপনাকে সেটা দিই।”
হরিপদ পকেট থেকে একটা কালো কাপড়ে মোড়া ছোট্ট বস্তু বের করলেন।
কাপড়টা খুলতেই দেখা গেল, একটা পুরোনো পিতলের চাবি।
চাবির গায়ে খোদাই করা—
১৩।
অদিতি চাবিটা হাতে নিতেই করিডরের সমস্ত আলো নিভে গেল।
অন্ধকারের মধ্যে আবার সেই শিশুকণ্ঠ ভেসে এল।
“দিদি, এবার দরজা খোলো।”
এবার কণ্ঠস্বরটা আসছে তেরো নম্বর ঘরের ভেতর থেকে।
অদিতি চাবিটা শক্ত করে ধরল।
হরিপদ তার হাত চেপে ধরলেন।
“একবার দরজা খুললে আর বন্ধ করতে পারবেন না। আপনি কি নিশ্চিত?”
অদিতি চোখ বন্ধ করল।
মায়ের মুখ মনে পড়ল।
বাবার শেষকৃত্যের দিন মনে পড়ল।
আর মনে পড়ল আয়নার ওপাশে বন্দি সেই মেয়েটার আতঙ্কিত চোখ।
সে ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল।
“আমাকে জানতে হবে।”
দুজনেই এগিয়ে গেল তেরো নম্বর ঘরের সামনে।
দেওয়ালের ফাটলটা এখন এতটাই বড় যে তার ভেতর দিয়ে একটা দরজা দেখা যাচ্ছে। দরজার কাঠ কালো হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও নখের আঁচড়ের মতো দাগ।
অদিতি চাবিটা তালায় ঢোকাল।
কিন্তু চাবি ঘোরানোর আগেই ভেতর থেকে একটা গলা শোনা গেল।
“অদিতি, দরজাটা খোলার আগে একটা কথা মনে রাখিস।”
“কী কথা?”
“ঘরের ভেতরে যে প্রথমে তোকে জড়িয়ে ধরবে, সে তোর মা নয়।”
অদিতি থমকে গেল।
“তাহলে আমার মা কোথায়?”
ওপাশ থেকে উত্তর এল না।
শুধু একটা মৃদু হাসি শোনা গেল।
তারপর তালাটা নিজে থেকেই খুলে গেল।
ক্লিক!
দরজাটা ধীরে ধীরে ভেতরের দিকে সরে গেল।
দরজার ওপাশে কোনো ঘর নেই।
আছে একটা লম্বা সিঁড়ি, যেটা নেমে গেছে মাটির গভীরে। সিঁড়ির দুপাশে জ্বলছে ছোট ছোট প্রদীপ। বহু বছর ধরে বন্ধ থাকা ঘর থেকে ভেসে আসছে তাজা ফুলের গন্ধ।
অদিতি প্রথম পা রাখতেই পিছনের দরজাটা সজোরে বন্ধ হয়ে গেল।
ধড়াম!
হরিপদের চিৎকার শোনা গেল।
“অদিতি!”
কিন্তু তাঁর গলা ক্রমশ দূরে সরে যেতে লাগল।
অদিতি বুঝতে পারল, সে একা।
সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে সে দেওয়ালে অসংখ্য ছবি দেখতে পেল। ছবিগুলো সব একই পরিবারের। কোথাও মৃণালিনী দেবী, কোথাও তার বাবা, কোথাও অচেনা মানুষ।
কিন্তু প্রতিটি ছবিতে একটা অদ্ভুত মিল ছিল।
প্রত্যেকের চোখের ওপর কালো দাগ টেনে দেওয়া হয়েছে।
সবশেষে সে একটা ছোট্ট ঘরে পৌঁছল।
ঘরের মাঝখানে একটা কাঠের দোলনা।
দোলনার মধ্যে শুয়ে আছে একটা নবজাতক।
তার পাশে বসে আছেন এক তরুণী। মুখে ক্লান্তির ছাপ, চোখে অদ্ভুত মমতা।
অদিতি তাঁকে দেখেই চিনতে পারল।
তার মা।
ঠিক সেই সময় তরুণী মুখ তুলে তাকালেন।
“এত দেরি করলি কেন, অদিতি?”
অদিতির চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।
“মা…”
সে ছুটে গিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরতে চাইল।
কিন্তু মায়ের শরীরের মধ্য দিয়ে তার হাত চলে গেল।
মহিলাটি কেঁদে উঠলেন।
“তুই আমাকে ছুঁতে পারবি না, মা। কারণ আমি আর এই পৃথিবীতে নেই।”
অদিতি পিছিয়ে এল।
“কিন্তু তুমি তো বললে, আমি দেরি করেছি!”
“আমি তোকে ডাকিনি। যে তোকে ডেকেছে, সে আমার মুখ পরে আছে।”
অদিতির রক্ত হিম হয়ে গেল।
“তাহলে তুমি কে?”
মহিলাটি দোলনার দিকে তাকালেন।
“আমি তোর মা। আর ওই দোলনায় যে শিশুটি শুয়ে আছে, সে তুই নোস।”
অদিতি স্তব্ধ হয়ে গেল।
“তাহলে আমি কে?”
মহিলাটি কাঁপা হাতে ঘরের এক কোণে রাখা একটা পুরোনো বাক্স দেখালেন।
“ওই বাক্সের মধ্যে তোর জন্মের আসল নথি আছে। সেটা খুললেই সব জানতে পারবি।”
অদিতি বাক্সের কাছে এগিয়ে গেল।
বাক্সের ওপর একটা ছবি রাখা।
ছবিতে তার বাবা, মা এবং আরেকজন মহিলা দাঁড়িয়ে আছেন।
মহিলাটির মুখ পোড়া।
ছবির নিচে লেখা—
“অদিতির জন্মের আগের দিন, ১৯৯২।”
অদিতি ছবিটা হাতে নিয়ে উল্টে দেখল।
পেছনে লাল কালিতে লেখা একটা বাক্য।
“একজন মা তার সন্তানকে বাঁচাতে অন্য এক শিশুকে মৃত্যুর হাতে তুলে দিয়েছিল।”
ঠিক তখনই দোলনার শিশুটি চোখ খুলল।
তার চোখ দুটো সম্পূর্ণ কালো।
শিশুটি ধীরে ধীরে উঠে বসে অদিতির দিকে তাকাল।
তারপর একটা পূর্ণবয়স্ক নারীর কণ্ঠে বলল—
“অবশেষে তুই এলি। এবার আমার শরীরটা আমাকে ফিরিয়ে দে।”
অদিতি পিছিয়ে যেতে গিয়েও পারল না।
কারণ তার পায়ের নিচের মেঝে থেকে কালো শিকড়ের মতো কিছু একটা উঠে এসে তার পা জড়িয়ে ধরেছে।
শিশুটি দোলনা থেকে নেমে এল।
তার ছোট্ট পা মেঝেতে পড়তেই ঘরের সব প্রদীপ একসঙ্গে নিভে গেল।
অন্ধকারের মধ্যে অদিতি শুধু শুনতে পেল—
“তুই এত বছর আমার জীবন নিয়ে বেঁচে আছিস, অদিতি। এবার আমার পালা।”
তারপর একটা ঠান্ডা হাত অদিতির কপালে ছুঁয়ে গেল।
আর তার মাথার ভেতর একসঙ্গে ভেসে উঠল শত শত স্মৃতি—যে স্মৃতিগুলো তার নিজের নয়।
একটা কুয়ো।
একটা আগুন।
একটা শিশুর কান্না।
আর তার বাবার কণ্ঠস্বর—
“মীরাকে বাঁচাতে হলে অদিতিকে মরতেই হবে।”
অদিতি চিৎকার করে উঠল।
ঠিক তখনই ঘরের অন্য প্রান্তে একটা দরজা খুলে গেল।
দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে আছে সেই ছোট্ট মেয়েটা, সাদা ফ্রক পরা।
মীরা।
তার হাতে একটা জ্বলন্ত প্রদীপ।
সে অদিতির দিকে তাকিয়ে বলল—
“দৌড়ো! তুই যা ভাবছিস, সত্যিটা তার চেয়েও ভয়ংকর।”
অদিতি মরিয়া হয়ে মীরার দিকে ছুটল।
কিন্তু দরজার কাছে পৌঁছনোর আগেই শিশুটি তার হাত ধরে ফেলল।
আর সেই মুহূর্তে অদিতি দেখল, শিশুটির মুখ বদলে যাচ্ছে।
প্রথমে তার বাবার মুখ।
তারপর মায়ের মুখ।
তারপর নিজের মুখ।
শেষে সেই মুখটা এমন একজনের হয়ে গেল, যাকে অদিতি কোনোদিন দেখেনি।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, সেই মুখটা দেখামাত্র অদিতি বুঝতে পারল—এই মানুষটিই তার জন্মের সত্যিটা জানে।
লোকটি মৃদু হেসে বলল—
“তোর বাবা তোকে এই বাড়ি থেকে বাঁচিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সে ভুলে গিয়েছিল, এই বাড়ি থেকে কেউ একবার বেরিয়ে গেলে তার ছায়াটা এখানেই থেকে যায়।”
অদিতি কাঁপা গলায় প্রশ্ন করল, “তুমি কে?”
লোকটি উত্তর দিল—
“আমি সেই মানুষ, যে ১৯৪৩ সালে মীরাকে কুয়োয় ফেলেছিল।”
তারপর সে আরও কাছে এগিয়ে এল।
“আর আমি তোর জন্মদাতা বাবা।”
অদিতি স্তব্ধ হয়ে গেল।
কারণ এই মানুষটি দেখতে তার মৃত বাবার মতো নয়।
বরং তার নিজের মুখের সঙ্গে অবিকল মিলে যাচ্ছে।
ঠিক তখনই দূরে কোথাও ঘড়ির ঘণ্টা বাজল।
একবার।
দুবার।
তিনবার।
ঘড়িতে তখন ২টা ১৩ মিনিট।
আর অদিতির সামনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটি ফিসফিস করে বলল—
“এবার তোর মনে পড়বে, তুই আসলে কতবার জন্মেছিস।”
চলবে…