Categories
উপন্যাস বিবিধ

যে বাড়িতে মৃতেরা চিঠি লেখে ((দ্বিতীয় পর্ব: স্মৃতির ভিতরে যে মানুষটি))।

“আমাদের বিয়ের রাতে আমি তোমাকে কী বলেছিলাম?”

মেঘলার প্রশ্নটা অর্কর মাথার ভেতর বারবার প্রতিধ্বনিত হতে লাগল।

তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মহিলাটি তার স্ত্রী। অন্তত দেখতে তাই মনে হচ্ছে। চোখের কোণে সেই পরিচিত তিল, কপালের কাছে চুলের সেই ছোট্ট গোছা, কথা বলার সময় ঠোঁটের কোণে জমে থাকা সেই বিষণ্ণ হাসি।

তবু অর্ক উত্তর দিতে পারল না।

বিয়ের রাতের কথা তার মনে পড়ছে না।

তার মনে পড়ছে না বিয়ের মণ্ডপ, সাতপাক, মেঘলার লাল বেনারসি—কিছুই না। যেন তার জীবনের সেই অধ্যায়টা কেউ ছুরি দিয়ে কেটে বাদ দিয়ে দিয়েছে।

“তুমি উত্তর দিচ্ছ না কেন?” মেঘলা ফিসফিস করে বলল।

অর্ক মাথা চেপে ধরল।

“আমি জানি না। আমার কিছু মনে পড়ছে না।”

মেঘলা ধীরে ধীরে পিছিয়ে গেল।

তার চোখে এবার ভয়ের বদলে হতাশা।

“তাহলে তুমি ও নও।”

“আমি কে নই? আমি অর্ক! তোমার স্বামী!”

“আমার স্বামী মারা গেছে।”

কথাটা বলেই মেঘলা মুখ ঢেকে কেঁদে উঠল।

অর্ক তার কাছে এগিয়ে যেতে চাইল। কিন্তু মেঘলা হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিল।

“আমাকে ছুঁয়ো না। তুমি যদি সত্যিই অর্ক হও, তাহলে তোমার মনে পড়বেই।”

ঠিক তখনই করিডরের শেষ প্রান্তে একটা দরজা খুলে গেল।

সেই দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে আছে আরেকজন অর্ক।

একই মুখ। একই পোশাক। এমনকি বাঁ ভ্রুর ওপর সেই ছোট্ট কাটা দাগটাও একই।

কিন্তু দ্বিতীয় অর্কর চোখে কোনো আতঙ্ক নেই। তার মুখে শান্ত হাসি।

সে মেঘলার দিকে তাকিয়ে বলল, “অবশেষে তুমি আমাকে চিনতে পেরেছ।”

মেঘলা কেঁপে উঠল।

“তুমি এখানে এলে কীভাবে?”

দ্বিতীয় অর্ক উত্তর দিল না। সে প্রথম অর্কর দিকে তাকিয়ে বলল, “ওকে বিশ্বাস কোরো না। ও তোমাকে আটকে রাখতে চাইছে।”

প্রথম অর্ক চিৎকার করে উঠল, “মিথ্যে! ও-ই আমাকে এখানে বন্দি করে রেখেছে!”

দ্বিতীয় অর্ক মৃদু হেসে বলল, “তাহলে একটা সহজ পরীক্ষা হোক। আমাদের দুজনের মধ্যে কে বলতে পারবে, মেঘলার ডান হাতের কবজিতে কী লেখা আছে?”

অর্ক মেঘলার হাতের দিকে তাকাল।

সেখানে একটা ছোট্ট উল্কি।

একটা তারিখ।

১৭-১০-২০২৫।

অর্কর মাথার মধ্যে যেন বাজ পড়ল।

এই তারিখটা সে কোথাও দেখেছে।

হ্যাঁ, ছবির নিচে লেখা ছিল—তার মৃত্যুর তারিখ।

মেঘলা হাতটা লুকিয়ে ফেলল।

“এই তারিখটা কেন?” অর্ক জিজ্ঞেস করল।

মেঘলা উত্তর দিল না।

দ্বিতীয় অর্ক এবার বলল, “কারণ ওই দিনই সব শেষ হয়েছিল। তুমি মারা গিয়েছিলে, মেঘলা বেঁচে ছিল। কিন্তু তুমি ফিরে এসেছিলে এমন একটা জায়গা থেকে, যেখান থেকে কারও ফেরার কথা নয়।”

“আমি কীভাবে ফিরেছিলাম?”

“সেটাই তো তোমাকে মনে করতে হবে।”

দ্বিতীয় অর্ক হাত তুলে পাশের দেওয়ালে স্পর্শ করল।

দেওয়ালটা হঠাৎ কাচের মতো স্বচ্ছ হয়ে গেল।

তার ওপাশে দেখা গেল একটা হাসপাতালের ঘর।

সাদা বিছানায় শুয়ে আছে মেঘলা। তার শরীরে অক্সিজেনের নল। পাশে বসে আছে অর্ক। চোখ লাল, মুখে ক্লান্তি।

একজন চিকিৎসক বলছেন, “আমরা আর কিছু করতে পারছি না। ওর জ্ঞান ফেরার সম্ভাবনা খুব কম।”

অর্ক মেঘলার হাত ধরে কাঁদছে।

“তুমি আমাকে ছেড়ে যেতে পারবে না, মেঘলা। আমি তোমাকে ছাড়া বাঁচব না।”

তারপর সে পকেট থেকে একটা ছোট্ট কালো বাক্স বের করল।

বাক্সের মধ্যে একটা পুরোনো চাবি।

অর্ক সেই চাবিটা মেঘলার হাতের মধ্যে রেখে ফিসফিস করে বলল, “আমি দরজাটা খুলব। তোমাকে ফিরিয়ে আনব।”

দৃশ্যটা মিলিয়ে গেল।

প্রথম অর্ক স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

“এটা কী ছিল?”

দ্বিতীয় অর্ক উত্তর দিল, “তোমার শেষ স্মৃতি। তুমি মেঘলাকে বাঁচাতে চেয়েছিলে। কিন্তু যে দরজাটা খুলেছিলে, তার ওপাশে মেঘলা ছিল না।”

“তাহলে কে ছিল?”

দ্বিতীয় অর্কর হাসি মিলিয়ে গেল।

“তুমি।”


করিডরের শেষ প্রান্তের দরজাটা এবার নিজে থেকেই খুলে গেল।

ভেতরে একটা ছোট্ট ঘর। মাঝখানে কাঠের টেবিল। টেবিলের ওপর পুরোনো টেলিফোন, কয়েকটা চিঠি আর একটা কালো বাক্স।

মেঘলা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে রইল।

“আমি ওই ঘরে যাব না।”

অর্ক তার দিকে তাকাল।

“কেন?”

“ওখানে আমার শেষ স্মৃতিটা আটকে আছে।”

“কী স্মৃতি?”

মেঘলা চোখ নামিয়ে বলল, “যে রাতে আমি মারা গিয়েছিলাম।”

অর্ক ধীরে ধীরে ঘরে ঢুকল।

টেবিলের ওপর রাখা চিঠিগুলোর খাম খুলে দেখতে লাগল। প্রতিটি চিঠিই তার নিজের হাতের লেখায় লেখা।

প্রথম চিঠিতে লেখা—

“মেঘলা, আজ আমি তোমাকে আবার দেখেছি। তুমি আগের মতোই হাসছিলে। তুমি বলেছিলে, আমি যেন আর ফিরে না আসি। কিন্তু আমি পারব না।”

দ্বিতীয় চিঠিতে লেখা—

“আজ তোমার সঙ্গে কথা বলেছি। তুমি বলেছ, আমি জীবিত নই। কিন্তু আমি তো শ্বাস নিতে পারি, হাঁটতে পারি, তোমাকে ছুঁতে পারি। তাহলে আমি মৃত হলাম কীভাবে?”

তৃতীয় চিঠিতে শুধু একটা বাক্য—

“আমি বুঝতে পেরেছি, আমি যে মানুষটাকে খুঁজছি, সে আমার স্ত্রী নয়।”

অর্কর হাত কেঁপে উঠল।

চিঠির তারিখগুলো এক বছরের ব্যবধানে লেখা। কিন্তু সব চিঠির ওপর একই তারিখ—১৭ অক্টোবর।

প্রতিবছর একই দিনে লেখা হয়েছে।

সে কালো বাক্সটা খুলল।

ভেতরে একটা পুরোনো পকেটঘড়ি, কয়েকটা ছবি আর একটা ছোট্ট কাগজ।

কাগজে লেখা—

“যে মানুষ নিজের মৃত্যুকে অস্বীকার করে, সে অন্যের স্মৃতিতে বেঁচে থাকে।”

অর্কর মনে পড়ল, তার বাবার একটা পুরোনো গল্প। ছোটবেলায় বাবা বলতেন, কিছু মানুষ মৃত্যুর পরও নিজের বাড়ি ছেড়ে যেতে পারে না। কারণ তারা মৃত্যুকে মেনে নিতে পারে না। তারা প্রিয়জনদের স্মৃতির মধ্যে আশ্রয় নেয়।

কিন্তু সেই আশ্রয় একসময় কারাগারে পরিণত হয়।

অর্ক ঘড়িটা হাতে তুলতেই ঘরের টেলিফোন বেজে উঠল।

ট্রিং… ট্রিং… ট্রিং…

সে ফোন তুলল।

ওপাশে একটা শিশুর কণ্ঠস্বর।

“বাবা?”

অর্কর বুক কেঁপে উঠল।

“কে?”

“আমি তৃষা।”

অর্কর চোখের সামনে সবকিছু ঝাপসা হয়ে গেল।

তৃষা তার মেয়ে।

যে জন্মের আগেই মারা গিয়েছিল।

অন্তত মেঘলা তাকে তাই বলেছিল।

“তৃষা? তুমি কোথায়?”

“বাবা, তুমি আমাকে দেখতে আসবে না?”

“আমি আসছি, মা। তুমি কোথায়?”

“ছয় নম্বর ঘরে।”

ফোনের ওপাশে কিছু একটা ভাঙার শব্দ হল।

তারপর শিশুটি ফিসফিস করে বলল, “বাবা, তাড়াতাড়ি এসো। মা আমাকে লুকিয়ে রেখেছে।”

লাইন কেটে গেল।

অর্ক ফোনটা নামিয়ে রাখল।

তার চোখে জল।

“আমার একটা মেয়ে ছিল?”

দ্বিতীয় অর্ক দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে।

“হ্যাঁ।”

“মেঘলা আমাকে বলেনি কেন?”

“কারণ তৃষা জন্মানোর আগেই মারা গিয়েছিল। আর তুমি তার মৃত্যুর জন্য নিজেকে দায়ী করেছিলে।”

অর্ক মাথা নাড়ল।

“আমি তো কিছুই মনে করতে পারছি না!”

“তুমি মনে করতে চাওনি। তাই তোমার স্মৃতিগুলো এই বাড়িতে আলাদা আলাদা ঘরে বন্দি হয়ে গেছে।”

দ্বিতীয় অর্ক টেবিলের ওপর রাখা ছবিগুলোর দিকে ইশারা করল।

প্রথম ছবিতে অর্ক আর মেঘলা হাসপাতালের সামনে দাঁড়িয়ে।

দ্বিতীয় ছবিতে তাদের কোলে একটি ছোট্ট মেয়ে।

তৃতীয় ছবিতে মেঘলা একা, হাতে একটা সাদা কাপড়ে মোড়া ছোট্ট পুতুল।

চতুর্থ ছবিতে অর্ক দাঁড়িয়ে আছে একটা বন্ধ দরজার সামনে।

ছবির পেছনে লেখা—

“তৃষার শেষ জন্মদিন।”

অর্ক ছবিটা বুকে চেপে ধরল।

“আমার মেয়ে মারা যাওয়ার পর কী হয়েছিল?”

দ্বিতীয় অর্ক দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

“তুমি আর মেঘলা ভেঙে পড়েছিলে। মেঘলা ধীরে ধীরে নিজেকে সামলে নিয়েছিল। কিন্তু তুমি পারোনি। তুমি বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলে, তৃষা কোথাও বেঁচে আছে। তুমি তাকে ফিরিয়ে আনার উপায় খুঁজতে শুরু করেছিলে।”

“আর সেই চাবি?”

“সেই চাবি দিয়ে তুমি ছয় নম্বর ঘরের দরজা খুলেছিলে।”

অর্কর চোখ পড়ল কালো বাক্সের তলায় রাখা চাবিটার ওপর।

চাবির গায়ে খোদাই করা—

৬।

ঠিক তখনই ঘরের বাইরে মেঘলার চিৎকার শোনা গেল।

“অর্ক! বাক্সটা বন্ধ করো!”

অর্ক ঘুরে দাঁড়াল।

দরজায় মেঘলা দাঁড়িয়ে আছে। তার মুখ ফ্যাকাশে, চোখে আতঙ্ক।

“তুমি বুঝতে পারছ না! ও তোমাকে সব ভুল কথা বলছে!”

দ্বিতীয় অর্ক হেসে বলল, “তাহলে তুমি সত্যিটা বলো, মেঘলা।”

মেঘলা চুপ করে রইল।

“তৃষা কি সত্যিই মারা গিয়েছিল?”

মেঘলা চোখ বন্ধ করল।

তারপর খুব আস্তে বলল, “হ্যাঁ।”

“তাহলে ফোনে কে কথা বলল?”

“এই বাড়ি।”

“বাড়ি আমার মেয়ের কণ্ঠস্বর নকল করছে?”

মেঘলা মাথা নাড়ল।

“এই বাড়ি তোমার স্মৃতি থেকে তৃষাকে তৈরি করেছে। তুমি তাকে যত বেশি মনে করবে, সে তত বেশি বাস্তব হয়ে উঠবে। আর একদিন সে তোমাকে নিজের জায়গায় রেখে বেরিয়ে আসবে।”

অর্ক স্তব্ধ হয়ে গেল।

দ্বিতীয় অর্ক এবার বলল, “এবার বুঝতে পারছ? মেঘলা তোমাকে বাঁচাতে চায় না। সে চায় তুমি এখানেই থাকো।”

“মিথ্যে!” মেঘলা চিৎকার করে উঠল। “আমি চাই ও মুক্তি পাক!”

“তাহলে তোমার কবজিতে আমার মৃত্যুর তারিখ কেন লেখা?”

মেঘলা হাতের উল্কির দিকে তাকাল।

“কারণ ওই দিনই তোমাকে শেষবার দেখেছিলাম।”

“তাহলে আমি কি সত্যিই মারা গিয়েছিলাম?”

মেঘলা এবার আর কোনো উত্তর দিল না।

শুধু তার চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।

অর্ক ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে গেল।

“মেঘলা, আমাদের বিয়ের রাতে তুমি আমাকে কী বলেছিলে?”

মেঘলা কাঁদতে কাঁদতে বলল, “আমি বলেছিলাম, যদি কোনোদিন আমাদের মধ্যে একজন আগে চলে যায়, অন্যজন যেন তাকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা না করে।”

অর্কর মাথার ভেতর যেন বজ্রপাত হল।

হ্যাঁ।

এবার তার মনে পড়ছে।

বিয়ের রাতে মেঘলা তার হাত ধরে বলেছিল, “মৃত্যু যদি কখনও আমাদের আলাদা করে, তুমি আমাকে ভালোবেসে বিদায় দেবে। আমাকে ফিরিয়ে আনতে গিয়ে নিজেকে হারিয়ে ফেলো না।”

অর্ক হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল।

“আমি তোমার কথা শুনিনি।”

মেঘলা তার পাশে বসে পড়ল।

“না। তুমি শোনোনি।”

“আমি কী করেছিলাম?”

মেঘলা তার মুখের দিকে তাকাল।

“তুমি ছয় নম্বর ঘরের দরজা খুলেছিলে। আর সেদিন থেকে এই বাড়ি তোমার স্মৃতিগুলো খেতে শুরু করে।”

হঠাৎ ঘরের দেওয়ালে একটা ফাটল দেখা দিল।

তার ভেতর থেকে শিশুর হাসির শব্দ ভেসে এল।

“বাবা!”

অর্কর মাথা ঘুরে গেল।

দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে আছে ছোট্ট তৃষা।

সাদা জামা, মাথায় লাল ফিতে। হাতে একটা কাগজের নৌকা।

সে হেসে বলল, “বাবা, তুমি আমাকে খুঁজছিলে?”

অর্ক তার দিকে ছুটে যেতে চাইল।

মেঘলা তার হাত ধরে ফেলল।

“না! ও তৃষা নয়!”

কিন্তু তৃষা এবার কাঁদতে শুরু করল।

“বাবা, তুমি কি আমাকে আর ভালোবাসো না?”

অর্কর সমস্ত শক্তি ভেঙে পড়ল।

সে মেঘলার হাত ছাড়িয়ে শিশুটির দিকে এগিয়ে গেল।

“না, মা! আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি!”

তৃষা হাত বাড়াল।

অর্ক তাকে জড়িয়ে ধরল।

সঙ্গে সঙ্গে ঘরের সমস্ত আলো নিভে গেল।

অন্ধকারের মধ্যে শিশুটির কণ্ঠস্বর বদলে গেল।

সেটা আর শিশুর কণ্ঠস্বর নয়।

একটা গভীর, কর্কশ কণ্ঠস্বর তার কানের কাছে ফিসফিস করে বলল—

“এবার তুমি আমার।”

অর্ক বুঝতে পারল, সে ভুল করেছে।

সে মরিয়া হয়ে শিশুটিকে ছাড়ানোর চেষ্টা করল। কিন্তু ছোট্ট হাত দুটো লোহার শিকলের মতো তার শরীর জড়িয়ে ধরেছে।

মেঘলা চিৎকার করে উঠল।

“অর্ক! ওর চোখের দিকে তাকিও না!”

কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে।

তৃষার চোখের দিকে তাকিয়ে অর্ক দেখল, সেখানে কোনো শিশুর চোখ নেই।

সেখানে একটা গভীর কালো গর্ত।

আর সেই গর্তের ভেতরে দাঁড়িয়ে আছে শত শত অর্ক।

কেউ কাঁদছে।

কেউ চিৎকার করছে।

কেউ দরজা ভাঙার চেষ্টা করছে।

সবাই একই কথা বলছে—

“আমাকে বের হতে দাও!”


অর্ক যখন চোখ খুলল, তখন সে একটা হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আছে।

জানলা দিয়ে সকালের আলো ঢুকছে।

পাশে বসে আছে মেঘলা।

তার হাতে একটা কাপড়ের পুতুল।

অর্ক ধীরে ধীরে উঠে বসল।

“আমরা কোথায়?”

মেঘলা মৃদু হাসল।

“বাড়ি ফিরেছি।”

“কোন বাড়ি?”

মেঘলা উত্তর দিল না।

অর্ক ঘরের চারপাশে তাকাল।

এটা তাদের পুরোনো ফ্ল্যাট নয়। কোনো হাসপাতালও নয়। দেওয়ালে কোনো ঘড়ি নেই। জানলার বাইরে শুধু সাদা কুয়াশা।

টেবিলের ওপর রাখা একটা কাগজের দিকে তার চোখ পড়ল।

তাতে লেখা—

“অর্ক সেন। মৃত্যুর তারিখ: ১৭ অক্টোবর ২০২৫।”

অর্ক কাগজটা তুলে ছিঁড়ে ফেলল।

“আমি আর এসব বিশ্বাস করি না!”

মেঘলা তার হাত ধরে বলল, “বিশ্বাস না করলেও সত্যিটা বদলাবে না।”

“তাহলে তুমি কে?”

মেঘলা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “আমি তোমার স্মৃতির শেষ অংশ।”

অর্কর বুকের ভেতরটা শূন্য হয়ে গেল।

“তাহলে আসল মেঘলা কোথায়?”

মেঘলা জানলার বাইরে তাকাল।

“যেখানে তুমি তাকে রেখে এসেছিলে।”

ঠিক তখনই ঘরের দরজায় টোকা পড়ল।

টক।

টক।

টক।

অর্ক দরজার দিকে তাকাল।

দরজার ওপাশ থেকে একটা শিশুকণ্ঠ ভেসে এল—

“বাবা, এবার কি আমি ভেতরে আসতে পারি?”

মেঘলা অর্কর হাত চেপে ধরল।

তার চোখে আতঙ্ক।

“দরজা খুলবে না।”

কিন্তু দরজার নিচ দিয়ে একটা সাদা কাগজ ভেতরে ঢুকে এল।

অর্ক কাগজটা তুলে নিল।

তাতে শিশুর হাতের লেখায় লেখা—

“বাবা, মা তোমাকে মিথ্যে বলছে। আমি কখনও মারা যাইনি।”

অর্ক কাঁপতে কাঁপতে মেঘলার দিকে তাকাল।

মেঘলার মুখ থেকে হাসি মুছে গেছে।

সে ধীরে ধীরে বলল—

“অর্ক, তৃষা যদি বেঁচে থাকে, তাহলে আমরা এতদিন কাকে কবর দিয়েছিলাম?”

ঘরের বাইরে আবার সেই শিশুকণ্ঠ ভেসে এল।

“বাবা, তাড়াতাড়ি করো। ওরা আমাকে আবার মেরে ফেলবে।”

অর্ক দরজার দিকে এগিয়ে গেল।

ঠিক তখনই মেঘলা তার কানে ফিসফিস করে বলল—

“দরজা খোলার আগে একটা কথা মনে রেখো—এই বাড়িতে মৃতেরা চিঠি লেখে, কিন্তু জীবিতেরা কখনও নিজেদের নাম লিখতে পারে না।”

অর্ক কাগজটার দিকে তাকাল।

চিঠির নিচে প্রেরকের নাম লেখা আছে।

তৃষা সেন।

আর তার ঠিক নিচে, অর্কর নিজের হাতের লেখায় একটা বাক্য—

“আমি আমার মেয়েকে হত্যা করেছি।”

চলবে…

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *