Categories
উপন্যাস বিবিধ

যে বাড়িতে মৃতেরা চিঠি লেখে ((তৃতীয় পর্ব: শেষ চিঠির শেষ নাম))।

ঘর নম্বর ছয়ের সামনে দাঁড়িয়ে অর্ক সেন নিজের হাতের লেখার দিকে তাকিয়ে রইল।

“আমি আমার মেয়েকে হত্যা করেছি।”

কথাটা তার নিজের হাতের লেখায় লেখা। অথচ সে মনে করতে পারছে না, কখনও এই বাক্যটি লিখেছে কি না।

দরজার ওপাশ থেকে আবার ভেসে এল ছোট্ট একটা কণ্ঠস্বর।

“বাবা, তুমি কি আমাকে বিশ্বাস করো না?”

অর্ক চোখ বন্ধ করল। কণ্ঠস্বরটা তার পরিচিত। তৃষা ছোটবেলায় তাকে ঠিক এইভাবেই ডাকত—‘বাবা’। কিন্তু তৃষা তো কখনও বড় হয়নি। সে তো জন্মের আগেই পৃথিবী ছেড়ে চলে গিয়েছিল—অন্তত অর্ক এত দিন সেটাই বিশ্বাস করে এসেছে।

পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা মেঘলা ফিসফিস করে বলল, “দরজা খুলবে না, অর্ক। ও তোমার মেয়ে নয়।”

“তাহলে আমার মেয়ে কে?”

মেঘলা চুপ করে রইল।

“আর তুমি?” অর্ক ঘুরে তাকাল। “তুমিও কি আমার মেঘলা নও?”

মেঘলার চোখে জল চিকচিক করল। সেই চোখ, সেই মুখ, ঠোঁটের কোণে পরিচিত বিষণ্ণ হাসি—সবই যেন আগের মতো। অথচ তার পায়ের নিচে কোনও ছায়া পড়ছে না।

“আমি তোমার মেঘলা,” সে বলল, “কিন্তু পুরোটা নই।”

অর্কের বুকের ভিতরটা কেঁপে উঠল।

“পুরো কথাটা বলো।”

মেঘলা ধীরে ধীরে দেয়ালের দিকে তাকাল। সেখানে অসংখ্য চিঠি পেরেক দিয়ে আটকানো। কোনওটায় অর্কের নাম, কোনওটায় মেঘলার, আবার কোনও কোনও চিঠির প্রেরকের নামের জায়গাটা ফাঁকা।

“এই বাড়ি কোনও সাধারণ বাড়ি নয়,” মেঘলা বলল। “এখানে যারা নিজেদের জীবনের কোনও সত্যি মেনে নিতে পারে না, তাদের স্মৃতি আটকে যায়। বাড়িটা সেই স্মৃতি দিয়ে ঘর বানায়, মানুষ বানায়, এমনকী চিঠিও লেখে। যারা চলে গেছে, তাদের কণ্ঠস্বর ধার করে জীবিতদের ফিরিয়ে আনে। আর যারা নিজেদের অপরাধবোধ থেকে পালাতে চায়, তাদের সামনে এমন একটা পৃথিবী তৈরি করে, যেখানে তারা বারবার অতীত বদলানোর সুযোগ পায়।”

“কিন্তু আমি তো মারা গেছি!”

“হ্যাঁ।”

একটি শব্দে যেন গোটা বাড়িটা কেঁপে উঠল।

অর্ক দেয়াল ধরে দাঁড়াল। “কীভাবে?”

মেঘলা তার দিকে এগিয়ে এল। এবার তার মুখের বিষণ্ণতা আরও গভীর।

“সতেরো অক্টোবর, ২০২৫। সেই রাতটার কথা মনে করার চেষ্টা করো।”

অর্ক চোখ বন্ধ করল।

বৃষ্টির শব্দ।

গাড়ির কাচে জলের ধারা।

ফোনের পর্দায় মেঘলার নাম।

একটা রাস্তার বাঁক।

হঠাৎ তীব্র আলো।

তারপর প্রচণ্ড ধাক্কা।

অর্ক হাঁপাতে হাঁপাতে চোখ খুলল।

“আমি গাড়ি চালাচ্ছিলাম?”

“হ্যাঁ। সেদিন তুমি আমার ফোন পেয়ে বাড়ি ফিরছিলে। আমি তোমাকে বারবার বলেছিলাম, বৃষ্টি থামা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে। কিন্তু তুমি তাড়াহুড়ো করেছিলে। তুমি ভেবেছিলে, বাড়িতে পৌঁছে আমাদের সব সমস্যা মিটিয়ে ফেলবে।”

“তারপর?”

“তারপর তোমার গাড়ি দুর্ঘটনায় পড়ে। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার আগেই তোমার মৃত্যু হয়।”

অর্কের মাথার ভিতর যেন হাজারটা ঘণ্টা বেজে উঠল।

“কিন্তু তুমি তো সাত দিন পরে মারা গিয়েছিলে!”

মেঘলা চোখ নামিয়ে বলল, “আমি তখনও জীবিত ছিলাম। তোমার মৃত্যুর খবর পেয়ে আমি হাসপাতালে ছুটে গিয়েছিলাম। তোমাকে শেষবার দেখতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তোমাকে আর ফিরিয়ে আনা যায়নি।”

“তাহলে তোমার মৃত্যু?”

“তোমার মৃত্যুর সাত দিন পরে, চব্বিশে অক্টোবর, আমি বাড়িতে ফিরে এসেছিলাম। তোমার ঘর, তোমার জামাকাপড়, তোমার অসমাপ্ত চিঠি—সবকিছুর মধ্যে তোমাকে খুঁজছিলাম। সেই রাতে আমি ঘর নম্বর ছয়ের অস্তিত্ব জানতে পারি।”

“কীভাবে?”

মেঘলা দেয়ালের একটা পুরোনো চিঠি নামিয়ে আনল।

চিঠিটা হলদে হয়ে গেছে। তাতে লেখা—

‘যে মানুষ মৃতকে ফিরিয়ে আনতে চায়, তাকে প্রথমে নিজের মৃত্যুকে মেনে নিতে হবে।’

নিচে কোনও নাম নেই।

“আমি তোমাকে ফিরিয়ে আনতে চেয়েছিলাম,” মেঘলা বলল। “আমি জানতাম তুমি মারা গেছ। তবু বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। তোমার ফোনে শেষবারের মতো যে কথাগুলো শুনেছিলাম, সেগুলো বারবার মনে পড়ত। তোমাকে বলেছিলাম, ফিরে এসে কথা বলব। কিন্তু সেই কথাটা আর বলা হয়নি।”

“তারপর তুমি ঘর নম্বর ছয়ে ঢুকেছিলে?”

“হ্যাঁ। সেখানে তোমার স্মৃতি ছিল। তোমার কণ্ঠস্বর ছিল। তোমার হাসি ছিল। আমি ভেবেছিলাম, তোমাকে খুঁজে পাব। কিন্তু বাড়িটা আমাকে একটা শর্ত দিয়েছিল—আমি যদি তোমার স্মৃতিকে আঁকড়ে ধরে থাকি, তবে সে তোমাকে আমার সামনে ফিরিয়ে দেবে। বিনিময়ে আমাকে এই বাড়ির অংশ হয়ে থাকতে হবে।”

অর্ক স্তব্ধ হয়ে গেল।

“তুমি রাজি হয়েছিলে?”

“আমি তোমাকে ছাড়া বাঁচতে চাইনি।”

মেঘলা কথাটা শেষ করতেই তার শরীরের চারপাশে হালকা কুয়াশা জমতে শুরু করল।

“কিন্তু আমি বুঝতে পারিনি, বাড়িটা আসলে কী চায়। সে আমাকে তোমার স্মৃতি দিয়েছিল, তোমার কণ্ঠস্বর দিয়েছিল, এমনকী তোমার মতো একটা মানুষও তৈরি করেছিল। কিন্তু সে তুমি ছিলে না। সে ছিল আমার অপরাধবোধের তৈরি একটা ছায়া।”

অর্ক ধীরে ধীরে দরজার দিকে তাকাল।

“তাহলে তৃষা?”

মেঘলা এবার কোনও উত্তর দিল না।

দরজার ওপাশ থেকে কান্নার শব্দ এল।

“বাবা, মা মিথ্যে বলছে! তুমি দরজা খোলো। আমি তোমার মেয়ে!”

অর্কের বুকের ভিতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।

“তৃষা, তুমি কি সত্যিই আমার মেয়ে?”

ওপাশ থেকে উত্তর এল, “হ্যাঁ, বাবা। তুমি আমাকে বাঁচাতে পারতে।”

কথাটা শুনে অর্কের মাথায় হঠাৎ একটা স্মৃতি ফিরে এল।

একটা হাসপাতালের ঘর।

মেঘলা বিছানায় শুয়ে আছে।

তার হাত শক্ত করে ধরে আছে অর্ক।

চিকিৎসক ধীরে ধীরে জানাচ্ছেন, গর্ভের সন্তানকে আর বাঁচানো সম্ভব হয়নি।

মেঘলা কাঁদছে। অর্ক তার পাশে বসে আছে, কিন্তু তার চোখে জল নেই। সে শুধু বলছে, “সব ঠিক হয়ে যাবে।”

তারপর আরেকটা দৃশ্য।

বাড়িতে ফিরে মেঘলা তৃষার ছোট্ট জামাটা বুকে চেপে ধরে বসে আছে। অর্ক তাকে বোঝাচ্ছে, অতীত ভুলে যেতে হবে, আবার নতুন করে জীবন শুরু করতে হবে।

মেঘলা বলছে, “তুমি কি একবারও কাঁদতে পারো না, অর্ক?”

অর্ক উত্তর দিচ্ছে, “কাঁদলে কি তৃষা ফিরে আসবে?”

তারপর নীরবতা।

অর্ক চোখ খুলল।

“তৃষা জন্মের আগেই মারা গিয়েছিল,” সে ফিসফিস করে বলল।

মেঘলা মাথা নাড়ল।

“হ্যাঁ। আমাদের মেয়ে কখনও এই পৃথিবীতে আসেনি। তার কোনও প্রথম কান্না ছিল না, কোনও প্রথম পদক্ষেপ ছিল না। আমরা তার জন্য যে ঘর সাজিয়েছিলাম, সেই ঘরও পরে বন্ধ করে দিয়েছিলাম। কিন্তু তুমি তার মৃত্যুকে কখনও সত্যি বলে মেনে নিতে পারোনি।”

“আমি?”

“তুমি নিজের কষ্টকে রাগে বদলে ফেলেছিলে। তুমি ভেবেছিলে, শক্ত থাকতে হবে। আমার কান্না তোমাকে অসহায় করে দিত। তুমি আমার কাছ থেকে দূরে সরে যেতে শুরু করেছিলে। আর আমি তোমাকে হারানোর ভয়ে আরও বেশি করে তোমাকে আঁকড়ে ধরেছিলাম।”

অর্কের চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।

“তাহলে এই তৃষা?”

“ও আমাদের হারিয়ে যাওয়া মেয়ের স্মৃতি দিয়ে তৈরি। তোমার অপরাধবোধ, আমার শোক আর বাড়িটার অদ্ভুত ক্ষমতা—সব মিলিয়ে ও একটা কণ্ঠস্বর পেয়েছে। ও তোমাকে আঘাত করতে চায় না, অর্ক। কিন্তু ওর অস্তিত্বটাই এমন যে, তোমাকে অতীতের মধ্যে আটকে রাখে।”

“তাহলে ও বলে কেন যে আমি ওকে হত্যা করেছি?”

মেঘলা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

“কারণ তুমি নিজেকে ক্ষমা করতে পারোনি। তুমি মনে মনে ভাবতে, যদি সেদিন আরও আগে হাসপাতালে যেতে, যদি অন্য কোনও চিকিৎসক দেখাতে, যদি আরও কিছু করতে—তাহলে হয়তো তৃষা বেঁচে যেত। কিন্তু সত্যিটা হল, সব মৃত্যু কারও অপরাধের ফল নয়। তুমি ওকে হত্যা করোনি। আমরা ওকে হারিয়েছিলাম। আর সেই শোকের দায় একা তোমার নয়, আমারও নয়।”

দরজার ওপাশে শিশুকণ্ঠস্বর থেমে গেল।

অর্ক প্রথমবার অনুভব করল, এত দিন সে নিজের ভিতরে একটা মিথ্যে বিচারসভা বসিয়ে রেখেছিল। সেখানে সে নিজেই বিচারক, নিজেই অভিযুক্ত, নিজেই শাস্তিদাতা। আর ঘর নম্বর ছয় সেই শাস্তিকে অনন্তকাল ধরে চালিয়ে যাচ্ছিল।

“আমি কীভাবে এখান থেকে বেরোব?”

মেঘলা তার দিকে তাকাল।

“তোমাকে শেষ চিঠিটা লিখতে হবে।”

“কাকে?”

“যাদের তুমি হারিয়েছ, তাদের নয়। নিজেকে।”

দেয়ালের শেষ প্রান্তে একটা ছোট টেবিল দেখা গেল। তার ওপর সাদা কাগজ, কালির দোয়াত আর একটা পুরোনো কলম।

অর্ক টেবিলের কাছে গেল।

কাগজের ওপরে আগে থেকেই একটা বাক্য লেখা—

‘আমি আমার মেয়েকে হত্যা করেছি।’

সে কলম তুলে নিল। অনেকক্ষণ সেই বাক্যের দিকে তাকিয়ে থেকে ধীরে ধীরে সেটার ওপর দাগ টেনে দিল।

তারপর লিখল—

‘আমি আমার মেয়েকে হারিয়েছি। আমি আমার স্ত্রীকে হারিয়েছি। আর তাদের হারানোর যন্ত্রণা থেকে পালাতে গিয়ে আমি নিজেকেও হারিয়েছি। কিন্তু শোক কোনও অপরাধ নয়। ভালোবাসা মানে কাউকে চিরকাল মৃতের ঘরে আটকে রাখা নয়।’

লেখা শেষ করে সে কলম নামিয়ে রাখল।

সঙ্গে সঙ্গে ঘরের দেয়ালে ঝুলে থাকা চিঠিগুলো কাঁপতে শুরু করল। একের পর এক চিঠি পেরেক থেকে খুলে মেঝেতে পড়ে গেল। করিডরের আলো নিভে আবার জ্বলে উঠল। দূরে কোথাও একটা দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ হল।

দরজার ওপাশ থেকে তৃষার কণ্ঠস্বর এল, এবার আর কান্না নেই।

“বাবা, তুমি কি এবার আমাকে যেতে দেবে?”

অর্কের চোখ ভিজে উঠল।

“হ্যাঁ, মা।”

“তুমি কি আমাকে ভুলে যাবে?”

অর্ক মাথা নাড়ল।

“না। তোমাকে ভুলব না। কিন্তু তোমাকে মনে রাখার জন্য তোমার সঙ্গে এই অন্ধকার ঘরে থাকতে হবে না।”

কিছুক্ষণ নীরবতা।

তারপর শিশুকণ্ঠস্বর মৃদু হেসে উঠল।

“তাহলে আমি এবার ঘুমোতে পারি, বাবা?”

“পারো।”

দরজার ওপাশ থেকে আর কোনও শব্দ এল না।

অর্ক দরজার হাতল ছুঁতেই সেটা নিজে থেকেই খুলে গেল।

ঘরের ভিতরে কোনও শিশু নেই। কোনও বিছানা নেই, খেলনা নেই, এমনকী কোনও জানালাও নেই। শুধু ধুলো জমা একটা ছোট্ট কাঠের বাক্স। তার মধ্যে রাখা আছে একটি সাদা শিশুর জামা, একটা রুপোর নূপুর আর একটা হাসপাতালের কাগজ।

অর্ক বাক্সটা হাতে তুলে নিল।

তারপর প্রথমবার সে কাঁদল—নিজের মেয়ের জন্য, মেঘলার জন্য, নিজের হারিয়ে যাওয়া জীবনের জন্য। সেই কান্নায় কোনও প্রশ্ন ছিল না, কোনও অভিযোগ ছিল না। ছিল শুধু এমন এক শোক, যাকে এত দিন সে স্বীকার করতে ভয় পেয়েছিল।

কান্না থামলে সে দেখল, ঘরের অন্য প্রান্তে মেঘলা দাঁড়িয়ে আছে।

কিন্তু এবার তার মুখে আর সেই বিষণ্ণ হাসি নেই। মুখে অদ্ভুত শান্তি।

“তুমি কি এবার চলে যাবে?” অর্ক জিজ্ঞেস করল।

মেঘলা বলল, “আমাকে যেতে দেওয়ার সময় হয়েছে।”

“আমি কি আর কখনও তোমাকে দেখতে পাব না?”

“স্মৃতিতে দেখতে পাবে। স্বপ্নে দেখতে পাবে। কোনও পুরোনো গান শুনে, কোনও পরিচিত গন্ধ পেয়ে, বৃষ্টির রাতে হঠাৎ আমার কথা মনে পড়লে—আমাকে খুঁজে পাবে। কিন্তু সেই স্মৃতিকে সত্যি ভেবে তার পিছনে ছুটবে না। আমি তোমার জীবনের একটা অংশ ছিলাম, অর্ক। তোমার পুরো জীবন নই।”

অর্ক এগিয়ে এসে তার হাত ধরতে চাইল।

কিন্তু হাত ছোঁয়ার আগেই মেঘলা একটু পিছিয়ে গেল।

“আর একটা কথা,” সে বলল। “আমার মৃত্যুর পর যে চিঠিগুলো তুমি পেয়েছিলে, সেগুলোর সবকটা আমি লিখিনি। কিছু চিঠি লিখেছিল আমার স্মৃতি। কিছু লিখেছিল এই বাড়ি। কিন্তু একটা চিঠি সত্যিই আমি লিখেছিলাম।”

“কোনটা?”

মেঘলা তার দিকে তাকাল।

“যেটাতে লিখেছিলাম, তুমি যেন নিজের নামটা মনে রাখো।”

অর্কের মনে পড়ল, বাড়িতে ঢোকার পর থেকে সে নিজের নাম লিখতে পারছিল না। প্রতিটি কাগজে তার হাত থেমে যাচ্ছিল। যেন বাড়িটা তার নামটুকুও কেড়ে নিয়েছে।

“কেন?”

“কারণ তুমি নিজের পরিচয় ভুলে গিয়েছিলে। তুমি শুধু মৃত স্বামী, ব্যর্থ বাবা, অপরাধী মানুষ—এই পরিচয়গুলো আঁকড়ে ধরেছিলে। তুমি ভুলে গিয়েছিলে, তুমি অর্ক সেন। তুমি ভালোবেসেছিলে। ভুল করেছিলে। কষ্ট পেয়েছিলে। কিন্তু তুমি শুধু তোমার হারানোর গল্প নও।”

মেঘলার শরীর ক্রমশ স্বচ্ছ হয়ে উঠছিল।

“বিদায়, অর্ক।”

“বিদায়, মেঘলা।”

এই প্রথম অর্ক তাকে যেতে দিল।

মেঘলা মিলিয়ে যেতেই ঘর নম্বর ছয়ের ছাদে একটা ফাটল দেখা দিল। তারপর দেয়াল ভেঙে পড়ল না, আগুনও লাগল না। বরং ঘরটা ধীরে ধীরে সাধারণ একটা ফাঁকা ঘরে পরিণত হল। কুয়াশা সরে গেল। দেয়ালে কোনও চিঠি রইল না। করিডরের সব দরজা একে একে খুলে গেল।

সবশেষে অর্ক দেখল, সামনের দরজার বাইরে ভোরের আলো।

সে বেরিয়ে এল।

বাড়ির বাইরে কোনও রাস্তার ভিড় নেই, কোনও গাড়ির শব্দ নেই। শুধু কুয়াশায় ঢাকা একটা শান্ত উঠোন। দূরে একটা পুরোনো ঘড়ি দাঁড়িয়ে আছে। ঘড়ির কাঁটা থেমে রয়েছে সতেরো অক্টোবর, ২০২৫-এর রাত এগারোটা সতেরো মিনিটে।

অর্ক ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর বুঝতে পারল, সে এই বাড়ি থেকে কোনও জীবিত মানুষের মতো বেরিয়ে যাচ্ছে না। তার শরীর বহু আগেই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছে। এত দিন সে ছিল নিজের মৃত্যুকে অস্বীকার করা এক স্মৃতি—যে স্মৃতি মেঘলার শোকের সঙ্গে জড়িয়ে ঘর নম্বর ছয়ে আটকে ছিল।

মেঘলা তাকে ফিরিয়ে আনতে চেয়েছিল। বাড়ি সেই ইচ্ছাকে ব্যবহার করেছিল। আর অর্ক নিজের অপরাধবোধ দিয়ে সেই ফাঁদকে আরও শক্ত করেছিল।

এখন সেই ফাঁদ ভেঙেছে।

উঠোনের শেষ প্রান্তে একটা সাদা দরজা খুলে গেল। তার ওপারে কোনও বাড়ি নেই, কোনও করিডর নেই। আছে শুধু নরম আলো।

অর্ক একবার পিছন ফিরে তাকাল।

দোতলার জানালায় একটা ছোট্ট মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সাদা জামা, পায়ে রুপোর নূপুর। তার পাশে মেঘলা।

তৃষা হাত নাড়ল।

মেঘলা হাসল।

অর্কও হাত নাড়ল।

তারপর সে আলোর দিকে এগিয়ে গেল।


সাত দিন পর, চব্বিশে অক্টোবরের সকালে, বাড়িটার পুরোনো মালিক সেখানে এলেন। বহু বছর ধরে ফাঁকা পড়ে থাকা ফ্ল্যাটটা বিক্রি করার আগে তিনি শেষবারের মতো ঘরগুলো দেখতে চেয়েছিলেন।

ভিতরে ঢুকে তিনি অবাক হয়ে দেখলেন, ঘর নম্বর ছয় বলে আর কিছু নেই। সেখানে একটা সাধারণ ছোট ঘর। জানালার পাশে একটা টেবিল, টেবিলের ওপর সাদা কাগজ আর একটা পুরোনো কলম।

কাগজে লেখা—

‘প্রিয় মেঘলা,

আমি জানি না, মৃত্যুর পরে কোথায় যাওয়া যায়। জানি না, আবার দেখা হবে কি না। কিন্তু এবার আমি তোমাকে খুঁজতে কোনও বাড়ির দরজা খুলব না। তোমাকে ফিরিয়ে আনার জন্য কোনও স্মৃতিকে সত্যি বলে মেনে নেব না।

তুমি আমার জীবনের ভালোবাসা ছিলে। তৃষা ছিল আমাদের অপূর্ণ স্বপ্ন। তোমাদের হারানোর কষ্ট আমার সঙ্গে থাকবে, কিন্তু সেই কষ্ট আর আমাকে বন্দি করে রাখবে না।

আমি এবার যেতে পারি।

তোমাদের, অর্ক।’

চিঠির নিচে পরিষ্কার হাতের লেখায় নিজের নাম লিখেছিল অর্ক সেন।

বাড়ির মালিক কাগজটা ভাঁজ করে পকেটে রাখলেন। তিনি জানতেন না, এই চিঠি কে লিখেছে। শুধু লক্ষ করলেন, ঘরের ভিতরে আর কোনও অস্বাভাবিক ঠান্ডা নেই। দেয়ালে কোনও অদ্ভুত ছায়া নেই। আর বহু বছর পর বাড়িটার বন্ধ জানালা দিয়ে প্রথমবার রোদ ঢুকেছে।

সেদিন সন্ধ্যায় তিনি বাড়ির সব দরজা খুলে দিলেন।

তারপর থেকে সেখানে আর কোনও মৃত মানুষের চিঠি পাওয়া যায়নি।

তবে পাড়ার এক বৃদ্ধা পরে বলেছিলেন, বাড়িটা ভেঙে ফেলার আগের রাতে তিনি জানালার কাছে দুটো ছায়া দেখেছিলেন—একজন পুরুষ, একজন নারী। তাদের মাঝখানে দাঁড়িয়েছিল ছোট্ট একটা মেয়ে। তিনজনেই হাসছিল।

বৃদ্ধা জানতেন না, ওরা কারা।

তিনি শুধু দেখেছিলেন, তিনটি ছায়া ধীরে ধীরে আলোয় মিশে গিয়েছিল।

আর বাড়িটার শেষ দেয়ালে, যেখানে একসময় ছয় নম্বর দরজাটা ছিল, সেখানে কেউ যেন অদৃশ্য কালিতে লিখে রেখে গিয়েছিল—

‘মৃতেরা চিঠি লেখে না। যারা বিদায় বলতে পারে না, তারাই লেখে।’

তার ঠিক নিচে ছিল তিনটি নাম।

অর্ক সেন।

মেঘলা সেন।

তৃষা সেন।

এই প্রথম, তিনটি নামই একই কাগজে লেখা ছিল। কোনও নামের পাশে মৃত্যু লেখা ছিল না। কোনও নামের পাশে অপরাধও নয়।

শুধু তিনটি নাম—যারা অবশেষে একে অপরকে যেতে দিয়েছিল।

সমাপ্ত।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *