Categories
উপন্যাস বিবিধ

যে মেয়েটি প্রতি অমাবস্যায় নিজের মৃত্যুর খবর পড়ত(দ্বিতীয় পর্ব: জন্মের আগের রাত)।

“দাদা, তুমি আমাকে চিনতে পারছ না?”

পাঁচ বছরের মেয়েটি হাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার পরনে হলুদ ফ্রক, চুলে লাল ফিতে। মুখটা অবিকল ঋদ্ধির ছোটবেলার ছবির মতো।

কিন্তু ঋদ্ধির কোনও বোন ছিল না।

অন্তত তার বাবা তাকে সেটাই বলেছিলেন।

“তুমি কে?” ঋদ্ধি ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল।

মেয়েটি মৃদু হাসল।

“আমি তোর ছোট বোন। তুই আমাকে কোনও দিন দেখিসনি। কিন্তু আমি তোকে দেখেছি। অনেকবার।”

“তোমার নাম কী?”

“তুই আমাকে যে নামে ডাকতিস, সেটা কি ভুলে গেছিস?”

ঋদ্ধি মাথা নাড়ল।

মেয়েটি তার দিকে আরও এক পা এগিয়ে এল।

“তুই আমাকে ডাকতিস—পিউ।”

নামটা শোনামাত্র ঋদ্ধির মাথার ভিতর যেন কোনও বন্ধ দরজা খুলে গেল।

তার মনে পড়ল, ছোটবেলায় তাদের বাড়ির একটা ঘর সব সময় তালাবন্ধ থাকত। বাবা বলতেন, সেখানে পুরোনো জিনিস রাখা আছে। ঘরের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় মাঝে মাঝে ঋদ্ধি শিশুর হাসির শব্দ শুনত। একদিন বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিল, ঘরের ভিতরে কে আছে। বাবা এত জোরে ধমক দিয়েছিলেন যে, তারপর থেকে ঋদ্ধি আর কোনও দিন সেই প্রশ্ন করেনি।

আরও একটা স্মৃতি ফিরে এল।

এক রাতে ঘুম ভেঙে সে দেখেছিল, তার বিছানার পাশে একটা ছোট্ট মেয়ে বসে আছে। মেয়েটি তার হাত ধরে বলেছিল, “দাদা, আমাকে ভুলে যাস না।”

সকালে বাবাকে বলতেই তিনি বলেছিলেন, ওটা স্বপ্ন।

তারপর থেকে সেই স্বপ্ন আর কখনও দেখেনি ঋদ্ধি।

“তুমি কি সত্যিই আমার বোন?” সে জিজ্ঞেস করল।

পিউয়ের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।

“তুই যদি আমাকে বিশ্বাস করিস, তাহলে তোর মায়ের মৃত্যুর সত্যিটা জানতে পারবি।”

“আমার মা তো মারা গিয়েছিলেন যখন আমার বয়স পাঁচ বছর।”

“তুই পাঁচ বছরের ছিলি। আমি তখনও জন্মাইনি।”

ঋদ্ধি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

“তাহলে তুমি এখানে কীভাবে?”

পিউ উত্তর দেওয়ার আগেই ঘরের দেওয়ালে একটা দরজা ফুটে উঠল। দরজার ওপরে লেখা—‘১৯৯৮’।

মেয়েটি দরজার হাতল ধরল।

“এই দরজার ওপারে আমাদের বাড়ি। সেই রাত, যেদিন সবকিছু বদলে গিয়েছিল।”

“আমি কি সেখানে যেতে পারব?”

“পারবি। কিন্তু একটা কথা মনে রাখিস—যা দেখবি, তার সবটা সত্যি নয়। আর যা শুনবি, তার সবটা মিথ্যেও নয়।”

দরজা খুলে গেল।

ওপারে ঋদ্ধি দেখল একটা পরিচিত বাড়ি। পুরোনো কাঠের আসবাব, দেওয়ালে পরিবারের ছবি, জানালার পাশে একটা দোলনা। বাইরে বৃষ্টি পড়ছে। ঘরের কোণে দাঁড়িয়ে আছেন তার বাবা, অরুণ মুখার্জি। বয়স তখন তিরিশের কাছাকাছি।

সোফায় বসে আছেন তার মা, মায়া সেন। তাঁর পরনে সাদা শাড়ি। মুখে ক্লান্তি, চোখে গভীর উদ্বেগ।

মায়ার পাশে একটা ছোট্ট ছেলে খেলছে।

ঋদ্ধি নিজের মুখ চিনতে পারল।

সে নিজেই।

কিন্তু ঘরের অন্য প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটিকে দেখে তার বুক কেঁপে উঠল।

সাদা শাড়ি পরা আরেকজন নারী।

চেহারা মায়ার মতোই, কিন্তু চোখ দুটো অস্বাভাবিক কালো।

তিনি জানালার বাইরে তাকিয়ে বলছেন, “আজ রাতেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।”

অরুণ বললেন, “আমি আর কোনও ঝুঁকি নিতে পারব না।”

“তাহলে ছেলেটাকে সব সত্যি বলো।”

“ও এখন ছোট।”

“ও বড় হলেও কি সত্যিটা বদলে যাবে?”

মায়া উঠে দাঁড়ালেন।

“আমাদের মেয়েটা কোথায়, অরুণ?”

ঘরের ভিতর নীরবতা নেমে এল।

অরুণ মুখ নামিয়ে বললেন, “ও আর নেই।”

মায়া মাথা নাড়লেন।

“না। ওকে আমরা হারাইনি। ওকে আমরা লুকিয়ে রেখেছি।”

ঋদ্ধি শিউরে উঠল।

তার মা যে শিশুটির কথা বলছেন, সে কি পিউ?

ঠিক তখনই ঘরের ভিতর থেকে শিশুর কান্না শোনা গেল।

অরুণ দ্রুত একটা বন্ধ দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন। মায়া তাঁকে থামানোর চেষ্টা করলেন।

“দরজাটা খুলো না!”

কিন্তু অরুণ থামলেন না।

দরজা খুলতেই ঘরের আলো নিভে গেল।

কান্নার শব্দ থেমে গেল।

তারপর একটা তীব্র চিৎকার।

ঋদ্ধি চোখ বন্ধ করে ফেলল।

যখন চোখ খুলল, সে আবার নীলকুঠির ঘর নম্বর সতেরোতে দাঁড়িয়ে আছে। পিউ নেই। দরজাটাও অদৃশ্য।

শুধু লাল ডায়েরিটা টেবিলের ওপর খোলা অবস্থায় পড়ে আছে।

তার পাতায় নতুন লেখা—

‘ঋদ্ধি মুখার্জি প্রথম সত্যটি দেখেছে। কিন্তু সে এখনও জানে না, তার মা আসলে কোথায় মারা গিয়েছিলেন।’

ঋদ্ধি ডায়েরি বন্ধ করে দরজার দিকে এগিয়ে গেল।

বাইরে এখনও তার বাবার কণ্ঠস্বর ভেসে আসছে।

“ঋদ্ধি, দরজা খোলো। সময় শেষ হয়ে আসছে।”

এবার ঋদ্ধি হাতল ঘোরাল।

দরজা খুলতেই সে দেখল, বাইরে কোনও করিডর নেই। আছে একটা হাসপাতালের ঘর। সাদা দেওয়াল, লোহার খাট, জানালায় লোহার গরাদ। খাটের ওপর শুয়ে আছেন মায়া সেন।

মায়ার মুখ ফ্যাকাশে। হাতে স্যালাইনের নল। পাশে দাঁড়িয়ে আছেন অরুণ, চোখে জল।

“মা?” ঋদ্ধির গলা কেঁপে উঠল।

মায়া ধীরে চোখ খুললেন।

“ঋদ্ধি?”

সে দৌড়ে মায়ার কাছে গেল। কিন্তু তাঁকে ছোঁয়ার আগেই মায়া হাত তুলে থামালেন।

“আমাকে ছুঁয়ো না। আমি জানি না, তুমি সত্যিই আমার ছেলে কি না।”

ঋদ্ধি হতভম্ব।

“আমি তোমার ছেলে!”

“তাহলে বলো, তোমার জন্মের আগে তোমার নাম কী রাখা হয়েছিল?”

ঋদ্ধি উত্তর দিতে পারল না।

মায়ার চোখে জল এসে গেল।

“তুমি জানো না। কারণ তুমি আমার প্রথম সন্তান নও।”

ঘরের বাতাস যেন ভারী হয়ে উঠল।

“তোমার আগে আমার একটা মেয়ে হয়েছিল,” মায়া বললেন। “তার নাম ছিল পিউ। জন্মের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সে মারা যায় বলে আমাদের জানানো হয়েছিল। কিন্তু আমি তার দেহ কোনও দিন দেখিনি।”

ঋদ্ধি ধীরে ধীরে পিছিয়ে গেল।

“তাহলে পিউ?”

“আমি জানি না, ও বেঁচে ছিল কি না। কিন্তু ওর জন্মের পর থেকে আমাদের বাড়িতে অদ্ভুত ঘটনা ঘটতে শুরু করে। প্রতি অমাবস্যায় আমি একটা সংবাদপত্র পেতাম। তাতে লেখা থাকত, আমার মৃত্যু কীভাবে হবে।”

“আপনার মৃত্যুর খবর?”

মায়া মাথা নাড়লেন।

“প্রথমে ভেবেছিলাম, কেউ আমাকে ভয় দেখাচ্ছে। তারপর একদিন খবরের কাগজে লেখা হল, আমার মৃত্যু হবে নীলকুঠিতে। আমি সেখানে গিয়েছিলাম। কিন্তু ফিরে আসার পর থেকে আমার মনে হতে লাগল, আমার জীবনের কিছু অংশ হারিয়ে যাচ্ছে।”

“আপনি মারা গেলেন কীভাবে?”

মায়া চোখ বন্ধ করলেন।

“আমি মনে করতে পারি না।”

ঠিক তখনই হাসপাতালের দরজায় অরুণ এসে দাঁড়ালেন।

কিন্তু এবার তিনি সেই বয়স্ক মানুষ, যাঁকে ঋদ্ধি ছোটবেলা থেকে চিনত।

“ঋদ্ধি, এখান থেকে বেরিয়ে আয়।”

ঋদ্ধি বাবার দিকে তাকাল।

“আপনি আমাকে এত দিন মিথ্যে বলেছেন কেন? আমার বোনের কথা লুকিয়েছেন কেন? মা কীভাবে মারা গিয়েছিলেন, সেটাও বলেননি!”

অরুণ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “কারণ আমি চেয়েছিলাম, তুই বেঁচে থাকিস।”

“কীসের থেকে বাঁচাতে চেয়েছিলেন?”

“ওই বাড়ির থেকে।”

তিনি মায়ার দিকে তাকালেন।

“তোর মা নীলকুঠিতে মারা যায়নি, ঋদ্ধি। সে মারা গিয়েছিল আমাদের বাড়িতে। কিন্তু তার মৃত্যুর পরও প্রতি অমাবস্যায় সে ফিরে আসত। কখনও চিঠি হয়ে, কখনও খবরের কাগজ হয়ে, কখনও একটা কণ্ঠস্বর হয়ে।”

“তাহলে ফোনে যিনি আমাকে নীলকুঠিতে যেতে বলেছিলেন, তিনি কে?”

অরুণের মুখ সাদা হয়ে গেল।

“তুই মায়ার সঙ্গে কথা বলেছিস?”

“হ্যাঁ।”

“কখন?”

“আজ রাতে।”

অরুণ মাথা নাড়লেন।

“অসম্ভব। মায়া তোকে ফোন করতে পারে না।”

“কেন?”

“কারণ মায়া কখনও সাংবাদিক ছিল না।”

ঋদ্ধি স্তব্ধ হয়ে গেল।

“কিন্তু পুরোনো সংবাদপত্রে তো লেখা আছে—”

“সেই সংবাদপত্রগুলো কে লিখেছিল, জানিস? আমিই।”

অরুণ ধীরে ধীরে এগিয়ে এলেন।

“আমি একজন সাংবাদিক ছিলাম। তোর মা নিখোঁজ হওয়ার পর আমি তার খোঁজে নীলকুঠিতে যাই। সেখানে একটা ঘর পাই, যেখানে ভবিষ্যতের খবর লেখা হত। আমি সেই খবরগুলো ছাপতে শুরু করি, কারণ ভেবেছিলাম, তাতে হয়তো মায়ার মৃত্যু ঠেকাতে পারব।”

“কিন্তু তাতে কী হল?”

“যে খবর ছাপা হয়, সেই খবরের ঘটনাই সত্যি হতে থাকে। আমি যতবার খবর বদলানোর চেষ্টা করেছি, ততবার নতুন একটা মৃত্যু ঘটেছে।”

ঋদ্ধি বুঝতে পারছিল না, বাবার কথাগুলো বিশ্বাস করবে কি না।

অরুণ পকেট থেকে একটা পুরোনো ছবি বের করলেন।

ছবিতে মায়া, অরুণ আর ছোট্ট ঋদ্ধি। তাদের পাশে দাঁড়িয়ে আছে পিউ।

ছবির পেছনে লেখা—

‘আমাদের চারজনের শেষ ছবি। ২৭ অক্টোবর, ২০০৩।’

ঋদ্ধি ছবিটা হাতে নিয়ে দেখল। ছবির পিউয়ের মুখে অদ্ভুত এক দাগ। যেন ছবির কাগজ পুড়ে গিয়েছিল।

“আমার জন্ম ১৯৯৮ সালে,” ঋদ্ধি বলল। “তাহলে ২০০৩ সালে আমার বয়স পাঁচ। কিন্তু পিউ তো আমার থেকে ছোট হওয়ার কথা।”

অরুণ চোখ নামিয়ে বললেন, “পিউ তোর থেকে ছোট ছিল না।”

“তাহলে?”

“পিউ ছিল তোর যমজ বোন।”

ঋদ্ধির পৃথিবী যেন মুহূর্তে থেমে গেল।

“কিন্তু আপনি তো বললেন, ও জন্মের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে মারা গিয়েছিল!”

“আমি মিথ্যে বলেছিলাম। ও বেঁচে ছিল। কিন্তু ওর জন্মের পর থেকেই তোর মা অদ্ভুত সব দৃশ্য দেখতে শুরু করে। প্রতি অমাবস্যায় ও নিজের মৃত্যুর খবর পড়ত। একদিন সে বলল, খবরের কাগজে এবার পিউয়ের নাম এসেছে। সে বিশ্বাস করেছিল, পিউকে বাঁচাতে হলে তাকে নীলকুঠিতে নিয়ে যেতে হবে।”

“তারপর?”

“সেই রাতে তোর মা পিউকে নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। আমি তাদের খুঁজতে বেরিয়েছিলাম। ফিরে এসে শুধু তোকে পেয়েছিলাম। মায়া আর পিউ দুজনেই নিখোঁজ।”

“আপনি পুলিশে খবর দেননি?”

“দিয়েছিলাম। কিন্তু কোনও প্রমাণ পাইনি। পরে একদিন নীলকুঠির সামনে মায়ার মৃতদেহ পাওয়া যায়। পিউকে আর কখনও পাওয়া যায়নি।”

ঋদ্ধির চোখে জল এসে গেল।

“তাহলে পিউ কি মারা গেছে?”

অরুণ উত্তর দিলেন না।

হঠাৎ হাসপাতালের ঘরের সব আলো নিভে গেল।

অন্ধকারের মধ্যে মায়ার কণ্ঠস্বর ভেসে এল—

“অরুণ, তুমি আবার মিথ্যে বলছ।”

অরুণ পিছিয়ে গেলেন।

“মায়া?”

“তুমি জানো, পিউ কোথায়।”

ঘরের দরজা নিজে থেকেই বন্ধ হয়ে গেল। জানালার গরাদগুলো ধীরে ধীরে বাঁকতে শুরু করল।

মায়া খাট থেকে উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর হাতে কোনও স্যালাইনের নল নেই। মুখে আর অসুস্থতার চিহ্নও নেই।

তিনি ঋদ্ধির দিকে তাকালেন।

“তোমার বাবা তোমাকে সব বলেননি। পিউ নিখোঁজ হয়নি। ওকে নীলকুঠিতে আটকে রাখা হয়েছিল।”

“কে আটকে রেখেছিল?”

মায়া অরুণের দিকে তাকালেন।

“তোমার বাবা।”

ঋদ্ধি বাবার দিকে ঘুরে দাঁড়াল।

“এটা কি সত্যি?”

অরুণের ঠোঁট কাঁপছিল।

“আমি ওকে বাঁচাতে চেয়েছিলাম।”

“কী থেকে?”

“মৃত্যু থেকে।”

মায়া তীক্ষ্ণ স্বরে বললেন, “তুমি ওকে বাঁচাওনি। তুমি ওকে সময়ের মধ্যে আটকে রেখেছিলে। সেই জন্যই ও আজও পাঁচ বছরের শিশু।”

ঋদ্ধি আর কিছু বলতে পারল না।

অরুণ হাঁটু গেড়ে বসে পড়লেন।

“আমি ভেবেছিলাম, ওকে নীলকুঠিতে রেখে দিলে খবরের কাগজে লেখা মৃত্যুর তারিখ বদলে দিতে পারব। আমি ভেবেছিলাম, সময়কে থামিয়ে দিলে মৃত্যু আসতে পারবে না।”

“কিন্তু আপনি নিজেই তো বললেন, খবর বদলানো যায় না!”

“আমি জানি। তবু চেষ্টা করেছিলাম।”

মায়া ধীরে ধীরে ঋদ্ধির কাছে এলেন।

“এখন তোমার সামনে দুটো পথ। তুমি যদি নীলকুঠি ছেড়ে চলে যাও, তাহলে তোমার মৃত্যুর খবর আর ছাপা হবে না। কিন্তু পিউ চিরকাল সেখানে আটকে থাকবে। আর তুমি যদি ফিরে যাও, তাহলে তুমি জানতে পারবে, আসলে কে তোমার মৃত্যুর খবর লিখছে।”

ঋদ্ধি মায়ার দিকে তাকাল।

“আপনি কি সত্যিই আমার মা?”

মায়ার চোখে জল এসে গেল।

“আমি তোমার মা। কিন্তু এই মুহূর্তে আমি যে রূপে তোমার সামনে দাঁড়িয়ে আছি, তার সবটাই হয়তো তোমার মায়ের স্মৃতি নয়।”

“তাহলে আমি কী করব?”

মায়া তার হাত ধরলেন।

“যে মানুষ নিজের মৃত্যুর খবর পড়ে, তাকে প্রথমে জানতে হয়—খবরটা কে লিখেছে।”

হঠাৎ ঘরের দেওয়ালে একটা বড় ঘড়ি দেখা গেল।

কাঁটা ঘুরছে।

রাত বারোটা সতেরো।

তারপর ঘড়ির নিচে কালো অক্ষরে ফুটে উঠল—

‘১৭ নভেম্বর, ২০২৬—ঋদ্ধি মুখার্জির দ্বিতীয় মৃত্যু।’

ঋদ্ধি ক্যালেন্ডারের কথা মনে করল।

আজ ২৭ অক্টোবর।

তার দ্বিতীয় মৃত্যু হতে এখনও একুশ দিন বাকি।

কিন্তু ঘড়ির কাঁটা দ্রুত এগোতে শুরু করেছে।

অরুণ চিৎকার করে বললেন, “ঋদ্ধি, এখান থেকে বেরিয়ে যা!”

মায়া মাথা নাড়লেন।

“না। এবার ওকে সত্যিটা জানতে হবে।”

ঘরের মেঝে ফেটে একটা সরু সিঁড়ি বেরিয়ে এল। সিঁড়িটা নেমে গেছে অন্ধকারের গভীরে।

সেখানে থেকে ভেসে আসছে শিশুর হাসি।

পিউয়ের হাসি।

ঋদ্ধি সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল।

প্রথম ধাপে পা রাখতেই তার মোবাইল বেজে উঠল।

স্ক্রিনে একটি অচেনা নম্বর।

সে ফোন তুলল।

ওপাশ থেকে তার নিজের কণ্ঠস্বর ভেসে এল।

“ঋদ্ধি, আমার কথা মন দিয়ে শোনো। তুমি এখন যা দেখছ, তার সবটাই মিথ্যে নয়। কিন্তু তোমার বাবা তোমাকে যে সত্যিটা বলেননি, সেটা হল—”

কথা থেমে গেল।

তারপর একই কণ্ঠস্বর ফিসফিস করে বলল—

“তোমার মা মারা যাওয়ার আগে তোমার নাম বদলে দিয়েছিলেন। তুমি ঋদ্ধি মুখার্জি নও।”

ফোন কেটে গেল।

ঋদ্ধি পকেট থেকে পরিচয়পত্র বের করল।

নামের জায়গায় লেখা—ঋদ্ধি মুখার্জি।

কিন্তু পরিচয়পত্রের ছবির নিচে, যেখানে জন্মতারিখ থাকার কথা, সেখানে নতুন করে ফুটে উঠছে আরেকটি নাম—

পিউ সেন।

ঋদ্ধি চমকে উঠে সিঁড়ির দিকে তাকাল।

অন্ধকারের ভিতর থেকে পাঁচ বছরের মেয়েটি বেরিয়ে এল।

এবার তার মুখে হাসি নেই।

সে বলল, “দাদা, এবার বুঝতে পেরেছিস? এত দিন তুই আমার খোঁজ করছিলি। কিন্তু আসলে আমি তোর খোঁজ করছিলাম।”

ঋদ্ধির হাত থেকে পরিচয়পত্রটা পড়ে গেল।

পিউ তার দিকে হাত বাড়িয়ে দিল।

“চল। আমাদের দুজনের মধ্যে কে আসলে মারা গিয়েছিল, সেটা এবার তোকে দেখাই।”

সিঁড়ির নীচে একটা দরজা খুলে গেল।

দরজার ওপারে একটা ছোট ঘর। দেওয়ালে ঝুলছে পুরোনো সংবাদপত্র। প্রতিটি কাগজের শিরোনামে একই নাম—

পিউ সেন।

প্রতিটি কাগজের তারিখ আলাদা।

কিন্তু সবকটাতেই মৃত্যুর খবর।

আর শেষ সংবাদপত্রের তারিখ—

১৭ নভেম্বর, ২০২৬।

সেই কাগজের নিচে ছোট অক্ষরে লেখা—

‘মৃতার পরিচয় এখনও নিশ্চিত করা যায়নি। তবে তাঁর পাশে পাওয়া দ্বিতীয় দেহটির পরিচয় জানা গিয়েছে।’

ঋদ্ধি কাগজটা তুলে নিল।

দ্বিতীয় দেহটির নামের জায়গায় লেখা—

ঋদ্ধি মুখার্জি।

তার ঠিক নিচে লাল কালিতে লেখা একটা বাক্য—

‘এবার সত্যিকারের মৃত্যু হবে।’

ঋদ্ধি পিছনে তাকাল।

সিঁড়ির মাথায় তার বাবা দাঁড়িয়ে আছেন।

কিন্তু তাঁর মুখে এখন আর কোনও অনুতাপ নেই।

তিনি শান্ত গলায় বললেন—

“আমি তোকে বাঁচাতে চেয়েছিলাম, পিউ। কিন্তু এবার আর পারব না।”

পিউ ঋদ্ধির হাত শক্ত করে ধরল।

“দাদা, বাবাকে বিশ্বাস করিস না। উনিই আমাদের দুজনের মধ্যে একজনকে মেরে ফেলেছিলেন।”

ঘরের সমস্ত সংবাদপত্র একসঙ্গে কাঁপতে শুরু করল।

আর ঠিক তখনই ঋদ্ধি দেখল, প্রতিটি কাগজের ছবিতে তার নিজের মুখ বদলে যাচ্ছে।

কখনও সে ঋদ্ধি।

কখনও পিউ।

কখনও দুজনেই।

শেষ কাগজটার শিরোনাম নিজে থেকেই বদলে গেল।

“একই রাতে দুই যমজের মৃত্যু—কিন্তু কবর দেওয়া হয়েছিল মাত্র একজনকে।”

ঋদ্ধি কাগজটা ফেলে দিল।

তার কানে তখন শুধু একটা শব্দ বাজছে—

‘কবর।’

তার মা কোথায় মারা গিয়েছিলেন, সেটা সে এখনও জানে না।

তার বোন কীভাবে বেঁচে আছে, সেটাও জানে না।

আর সবচেয়ে ভয়ংকর প্রশ্নটা এখনও অন্ধকারে লুকিয়ে আছে—

যদি ঋদ্ধি আসলে পিউ হয়, তাহলে এত বছর ধরে যে মানুষটি ঋদ্ধি মুখার্জি নামে বেঁচে আছে, সে কে?

ঘরের সব আলো একসঙ্গে নিভে গেল।

অন্ধকারের মধ্যে লাল ডায়েরির শেষ পাতায় নতুন একটি লাইন ফুটে উঠল—

‘তৃতীয় সত্যটি জানার আগে, একজনকে নিজের কবর খুঁড়তে হবে।’

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *