রাত তখন ঠিক বারোটা সতেরো।
বাইরে ঝমঝম করে বৃষ্টি পড়ছে। শহরের প্রায় সব দোকান বন্ধ হয়ে গেছে। রাস্তার আলোয় ভিজে থাকা ডামারের ওপর মাঝে মাঝে গাড়ির হেডলাইট ছুটে যাচ্ছে। দূরে কোথাও একটা কুকুর একটানা ডেকে চলেছে।
নিজস্ব সংবাদপত্রের অফিসে একা বসে ছিল ঋদ্ধি মুখার্জি। বয়স আটাশ। পেশায় সাংবাদিক। গত তিন বছর ধরে সে কলকাতার একটি ছোট বাংলা দৈনিকের অপরাধ ও রহস্য বিভাগের খবর লেখে।
সেদিন রাতেও অন্য দিনের মতোই খবরের কাগজের শেষ পাতা তৈরি করছিল সে। ডেস্কের ওপর অর্ধেক খাওয়া চা, কয়েকটা পুরোনো সংবাদপত্র, একটা ল্যাপটপ আর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা নোটবুক।
ঠিক তখনই অফিসের দরজার নিচ দিয়ে একটা খাম ঢুকে এল।
ঋদ্ধি প্রথমে ভেবেছিল, হয়তো কোনও কর্মী ভুল করে খামটা রেখে গেছে। কিন্তু পরক্ষণেই তার চোখ আটকে গেল খামের ওপর লেখা নামটায়।
প্রাপক: ঋদ্ধি মুখার্জি।
হাতের লেখাটা অদ্ভুত পরিচিত মনে হল।
খামের ওপর কোনও প্রেরকের নাম নেই। ডাকটিকিট নেই। পোস্টমার্ক নেই। এমনকী কোনও ঠিকানাও লেখা নেই।
শুধু সাদা খামের মাঝখানে কালো কালিতে লেখা একটি বাক্য—
‘আজ রাতের খবরটা ছাপতে ভুলবেন না।’
ঋদ্ধির ভ্রু কুঁচকে গেল।
সে খাম খুলল।
ভিতরে একটা সংবাদপত্রের কাটা অংশ। কাগজটা দেখে মনে হল বহু পুরোনো। চারপাশ হলদে হয়ে গেছে, কিছু জায়গায় ছত্রাকের দাগ। কিন্তু তার ওপর ছাপা অক্ষরগুলো আশ্চর্য রকম পরিষ্কার।
শিরোনামটা পড়ে ঋদ্ধির হাত ঠান্ডা হয়ে গেল।
“রহস্যজনকভাবে মৃত্যু তরুণী সাংবাদিকের—দেহ উদ্ধার পরিত্যক্ত বাড়ি থেকে।”
তার নিচে লেখা—
‘গতকাল গভীর রাতে শহরের উপকণ্ঠে একটি পরিত্যক্ত বাড়ি থেকে এক তরুণী সাংবাদিকের মৃতদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। মৃতার নাম ঋদ্ধি মুখার্জি। বয়স আনুমানিক আটাশ বছর। প্রাথমিক তদন্তে মৃত্যুর কারণ জানা যায়নি। মৃতার শরীরে আঘাতের কোনও স্পষ্ট চিহ্ন পাওয়া যায়নি। তবে স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, মৃত্যুর আগে ওই তরুণী একটি রহস্যময় ঘটনার তদন্ত করছিলেন।’
ঋদ্ধি একবার খবরটা পড়ল।
তারপর আবার পড়ল।
তারপর নিজের পরিচয়পত্রের দিকে তাকাল।
নাম—ঋদ্ধি মুখার্জি।
বয়স—আটাশ।
সে হঠাৎ চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। কাগজটা হাতে নিয়ে অফিসের চারদিকে তাকাল। কেউ নেই। দরজা ভিতর থেকে বন্ধ। জানালার কাচে বৃষ্টির ফোঁটা।
নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করল সে।
এটা নিশ্চয়ই কোনও বাজে রসিকতা। হয়তো অফিসের কেউ তার নাম ব্যবহার করে মজা করেছে। কিন্তু একটা প্রশ্ন তার মাথায় ঘুরছিল—এই পুরোনো কাগজে তার মৃত্যুর খবর এল কোথা থেকে?
সে কাগজটা উল্টে দেখল।
পেছনের দিকে ছোট অক্ষরে একটা তারিখ ছাপা।
১৭ নভেম্বর, ২০২৬।
ঋদ্ধি মোবাইল বের করল।
আজ ২৭ অক্টোবর, ২০২৬।
অর্থাৎ এই সংবাদপত্রের তারিখ আসতে এখনও একুশ দিন বাকি।
আরও অদ্ভুত ব্যাপার, কাগজের এক কোণে লেখা ছিল একটি ঠিকানা—
‘নীলকুঠি, শালবন রোড।’
ঋদ্ধি ঠিকানাটা আগে কখনও শোনেনি। কিন্তু খবরের শেষ লাইনে যে বাক্যটা লেখা ছিল, সেটা তার বুকের মধ্যে বরফের মতো জমে গেল।
‘মৃতার মৃত্যুর তদন্তে পুলিশ একটি পুরোনো ডায়েরি উদ্ধার করেছে। ডায়েরির শেষ পাতায় লেখা ছিল—আমি জানি, আমার মৃত্যুর খবর আগে থেকেই ছাপা হয়ে গেছে।’
ঋদ্ধি কাগজটা নামিয়ে রাখল।
তারপরই অফিসের ফোন বেজে উঠল।
এত রাতে অফিসের ল্যান্ডলাইন সাধারণত কেউ ব্যবহার করে না। ঋদ্ধি ফোনটা তুলতেই ওপাশ থেকে একটি মেয়ের কণ্ঠ ভেসে এল।
“আপনি কি ঋদ্ধি মুখার্জি বলছেন?”
“হ্যাঁ। আপনি কে?”
“আমার নাম মায়া। আমার একটা জরুরি কথা বলার আছে।”
“কী কথা?”
মেয়েটি কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকল। তারপর নিচু গলায় বলল, “আপনি কি একটু আগে নিজের মৃত্যুর খবর পেয়েছেন?”
ঋদ্ধির বুকের ভিতরটা ধক করে উঠল।
“আপনি কীভাবে জানলেন?”
“কারণ আমিও পেয়েছিলাম।”
“কী পেয়েছিলেন?”
“নিজের মৃত্যুর খবর।”
ঋদ্ধি ফোনের তার শক্ত করে ধরে রইল।
মেয়েটি আবার বলল, “আপনি যদি বাঁচতে চান, তাহলে আজ রাতেই নীলকুঠিতে যান।”
“কিন্তু আপনি কে? আর নীলকুঠি কোথায়?”
“শালবন রোডের শেষ মাথায়। একটা পুরোনো বাড়ি। সেখানে একটা ঘর আছে, যে ঘরে কেউ ঢুকলে নিজের মৃত্যুর আগের দৃশ্য দেখতে পায়।”
ঋদ্ধি কিছু বলার আগেই মেয়েটি আরও একটি কথা বলল।
“তবে একটা কথা মনে রাখবেন। সেখানে নিজের মৃত্যুর দৃশ্য দেখলেও কাউকে বলবেন না যে আপনি সেটা দেখেছেন।”
“কেন?”
ওপাশ থেকে চাপা কান্নার শব্দ এল।
“কারণ আমি বলেছিলাম। আর তারপর থেকে প্রতি অমাবস্যায় আমার মৃত্যুর খবর নতুন করে ছাপা হয়।”
“আপনার নাম কী?”
“মায়া।”
“মায়া কী?”
“মায়া সেন।”
ফোনের ওপাশে হঠাৎ প্রচণ্ড একটা শব্দ হল। যেন ভারী কিছু মেঝেতে পড়ে গেল।
তারপর মেয়েটির গলা আবার শোনা গেল, এবার অনেক দূর থেকে ভেসে আসছে যেন।
“ঋদ্ধি, আপনি যদি সেখানে যান, একটা জিনিস খুঁজবেন। একটা লাল ডায়েরি। ওটার মধ্যে সব উত্তর আছে।”
“আপনি এখন কোথায়?”
“আমি…”
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই লাইন কেটে গেল।
ঋদ্ধি কয়েকবার ফোন করল। কোনও লাভ হল না।
তারপর সে ল্যাপটপে ‘নীলকুঠি শালবন রোড’ লিখে খুঁজতে শুরু করল। প্রথমে কিছুই পেল না। কয়েকটি পুরোনো নথি, একটা অস্পষ্ট মানচিত্র আর একটি স্থানীয় সংবাদপত্রের অনলাইন আর্কাইভে ২০০৪ সালের একটি খবর।
শিরোনাম—
“পরিত্যক্ত নীলকুঠিতে তরুণীর নিখোঁজ হওয়ার রহস্য।”
খবরের ভিতরে লেখা ছিল, প্রায় বাইশ বছর আগে মায়া সেন নামে এক তরুণী নিখোঁজ হয়েছিলেন। তিনি একটি স্থানীয় সংবাদপত্রে কাজ করতেন। নিখোঁজ হওয়ার আগের রাতে তিনি নীলকুঠিতে গিয়েছিলেন বলে কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী দাবি করেছিলেন। পুলিশ দীর্ঘ তদন্ত করেও তাঁর কোনও খোঁজ পায়নি।
ঋদ্ধি ক্যালকুলেটর খুলে হিসাব করল।
বাইশ বছর আগে মানে ২০০৪ সাল।
মায়ার বয়স তখন আনুমানিক আটাশ হওয়ার কথা।
কিন্তু ফোনের ওপাশের কণ্ঠস্বরটা ছিল এক তরুণীর।
যেন তার বয়সও আটাশ।
ঋদ্ধি চেয়ারে বসে পড়ল।
এবার তার মনে হল, এই রহস্যের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত কোনও যোগ আছে কি না, সেটা জানা দরকার। সে নিজের পরিচিত কয়েকজন সাংবাদিককে ফোন করল। কেউ নীলকুঠির নাম শোনেনি। শেষ পর্যন্ত এক প্রবীণ সাংবাদিক জানালেন, শালবন রোডের ওই বাড়িটা বহু বছর আগে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। সেখানে নাকি একাধিক মানুষ নিখোঁজ হয়েছেন। কিন্তু কোনও ঘটনাই প্রমাণ করা যায়নি।
“ওখানে যাস না,” বৃদ্ধ সাংবাদিক বললেন। “ওই বাড়ির গল্পটা ভালো নয়।”
ঋদ্ধি উত্তর দিল, “আমি সাংবাদিক। গল্পটা ভালো না বলেই তো যেতে হবে।”
ফোন রেখে সে ব্যাগ গুছিয়ে নিল। টর্চ, ক্যামেরা, পাওয়ার ব্যাঙ্ক, নোটবুক আর একটা ছোট রেকর্ডার।
রাত তখন একটা পেরিয়ে গেছে।
বৃষ্টি একটু কমেছে। অফিসের বাইরে বেরিয়ে সে একটা গাড়ি ভাড়া করল। চালককে ঠিকানা বলতেই লোকটা আয়নায় তার মুখের দিকে তাকাল।
“নীলকুঠি যাবেন?”
“হ্যাঁ।”
“এত রাতে?”
“কেন? কোনও সমস্যা আছে?”
চালক কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “আমি ওই রাস্তার কাছে আপনাকে নামিয়ে দেব। বাড়িটার ভিতরে যাব না।”
ঋদ্ধি হেসে বলল, “আপনি কি ভূতে বিশ্বাস করেন?”
চালক হাসল না।
“ভূতে করি কি না জানি না, স্যার। কিন্তু ওই বাড়ির কাছে গেলে আমার গাড়ির ঘড়ি থেমে যায়।”
গাড়ি চলতে শুরু করল।
শহরের আলো পিছনে পড়ে রইল। রাস্তার দুপাশে ঘন গাছপালা। মাঝে মাঝে পুরোনো বাড়ি, বন্ধ চায়ের দোকান আর ভাঙা বাসস্ট্যান্ড চোখে পড়ছিল। যত রাত বাড়ছিল, রাস্তা তত ফাঁকা হয়ে আসছিল।
একসময় চালক বলল, “সামনে শালবন রোড। এর পরে আমি আর যাব না।”
ঋদ্ধি ভাড়া মিটিয়ে নেমে পড়ল।
তার সামনে একটা সরু রাস্তা। দুপাশে গাছের ডাল মাথার ওপর ঝুঁকে আছে। রাস্তার শেষে অন্ধকারের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে একটা বিশাল বাড়ি।
নীলকুঠি।
বাড়িটার দেওয়াল একসময় নীল রঙের ছিল, এখন অধিকাংশ রং উঠে গেছে। জানালার কাঠ পচে কালচে। সামনের লোহার গেটের ওপর মরচে পড়েছে। গেটের পাশে একটা ভাঙা পাথরের ফলকে লেখা—‘সেন পরিবার, ১৯৩১’।
ঋদ্ধি টর্চ জ্বালিয়ে গেট ঠেলে খুলল।
অদ্ভুতভাবে গেটটা একটুও শব্দ করল না।
বাড়ির ভিতরে ঢুকতেই তার মোবাইলের নেটওয়ার্ক চলে গেল। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সে দেখল, রাত একটা বেয়াল্লিশ। কিন্তু কয়েক পা এগোতেই ঘড়ির কাঁটা থেমে গেল।
একই সময়ে তার ক্যামেরা নিজে থেকেই চালু হয়ে গেল।
পর্দায় দেখা গেল বাড়ির সামনের বারান্দা।
কিন্তু সেখানে ঋদ্ধি একা দাঁড়িয়ে নেই।
তার ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে আছে সাদা শাড়ি পরা এক তরুণী।
মেয়েটির মুখ দেখা যাচ্ছে না। লম্বা চুলে মুখ ঢাকা। মাথা সামান্য ঝুঁকে আছে।
ঋদ্ধি দ্রুত পিছনে ঘুরল।
কেউ নেই।
সে আবার ক্যামেরার পর্দার দিকে তাকাল।
সেখানে তরুণীটি এবার মুখ তুলেছে।
ঋদ্ধির গলা শুকিয়ে গেল।
মেয়েটির মুখ তার নিজের পরিচিত কারও মতো নয়। কিন্তু তার চোখে এমন এক আতঙ্ক ছিল, যা ঋদ্ধি এর আগে বহু মৃত মানুষের ছবিতে দেখেছে।
হঠাৎ ক্যামেরার পর্দায় সাদা অক্ষর ফুটে উঠল—
‘তুমি একুশ দিন দেরি করে ফেলেছ।’
ঋদ্ধি ক্যামেরা বন্ধ করে দিল।
তারপর বারান্দা পেরিয়ে বাড়ির ভিতরে ঢুকল।
ভিতরে ধুলো, ভাঙা আসবাব আর স্যাঁতসেঁতে গন্ধ। দেয়ালে কয়েকটি পুরোনো ছবি ঝুলছে। এক ছবিতে এক তরুণী দাঁড়িয়ে আছে। তার পরনে সাদা শাড়ি, গলায় সরু চেন।
ঋদ্ধি ছবিটার সামনে দাঁড়িয়ে গেল।
ছবির নিচে নাম লেখা—
‘মায়া সেন, ২০০৪।’
ঋদ্ধি ছবির মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
ফোনের ওপাশের কণ্ঠস্বরের সঙ্গে ছবির মেয়েটির চোখের মিল অবিশ্বাস্য।
সে ছবি তুলতে গিয়েই লক্ষ করল, ছবির কাচের ভিতরে প্রতিফলিত হচ্ছে একটা দরজা।
তার পিছনে দেওয়াল ছাড়া আর কিছু থাকার কথা নয়।
কিন্তু প্রতিফলনে সত্যিই একটা দরজা দেখা যাচ্ছে। দরজার ওপর সাদা রঙে লেখা—
ঘর নম্বর ১৭।
ঋদ্ধি ঘুরে দাঁড়াল।
দেওয়ালে সত্যিই একটা দরজা।
সে নিশ্চিত ছিল, কয়েক মুহূর্ত আগেও সেখানে দরজা ছিল না।
দরজার হাতলে হাত রাখতেই ভিতর থেকে তিনবার টোকা পড়ল।
টক।
টক।
টক।
তারপর এক নারীকণ্ঠ বলল, “ঋদ্ধি, এত দেরি করলে কেন?”
“মায়া?”
“দরজা খোলো।”
“আপনি ভিতরে আছেন?”
“আমি এখানে বাইশ বছর ধরে অপেক্ষা করছি।”
ঋদ্ধি দরজা খুলল।
ভিতরে একটা ছোট ঘর। মাঝখানে কাঠের টেবিল, তার ওপর লাল রঙের একটা ডায়েরি। জানালার পাশে একটা চেয়ারে বসে আছে মায়া সেন।
ঠিক সেই ছবির মতোই তার মুখ।
একই বয়স। একই চোখ। একই সাদা শাড়ি।
শুধু তার পায়ের নিচে কোনও ছায়া নেই।
মায়া মাথা তুলে তাকাল।
“তুমি এসেছ, ঋদ্ধি।”
“আপনি আমাকে চেনেন?”
“তোমার জন্মের আগেই তোমার নাম জানতাম।”
ঋদ্ধি পিছিয়ে গেল।
“আপনি কে? আমার সঙ্গে আপনার কী সম্পর্ক?”
মায়া টেবিলের ওপর রাখা ডায়েরিটার দিকে ইশারা করল।
“ওটা খোলো। তারপর বুঝবে কেন তোমার মৃত্যুর খবর আগেই ছাপা হয়েছে।”
ঋদ্ধি ডায়েরিটা খুলল।
প্রথম পাতায় লেখা—
‘যে মানুষ নিজের মৃত্যুর খবর পড়ে, সে আসলে ভবিষ্যৎ দেখে না। সে দেখে এমন একটি অতীত, যেখান থেকে সে কোনও দিন বেরিয়ে আসতে পারেনি।’
পরের পাতায় একটা পুরোনো ছবি আটকানো ছিল।
ছবিতে তিনজন মানুষ—একজন পুরুষ, একজন নারী আর একটি ছোট্ট শিশু।
পুরুষটির মুখ দেখে ঋদ্ধির হাত থেকে ডায়েরি প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।
লোকটি দেখতে অবিকল ঋদ্ধির বাবার মতো।
কিন্তু ছবির পেছনে তারিখ লেখা—
১৯৮২।
ঋদ্ধির বাবা জন্মেছিলেন ১৯৭০ সালে। ১৯৮২ সালে তাঁর বয়স ছিল মাত্র বারো।
আরও আশ্চর্য, ছবির শিশুটির মুখ ঋদ্ধির নিজের ছোটবেলার ছবির মতো।
ছবির পেছনে লাল কালিতে লেখা ছিল—
‘প্রথম মৃত্যু: ২৭ অক্টোবর, ২০২৬।’
ঋদ্ধি কাঁপা হাতে পরের পাতা উল্টাল।
সেখানে তার নিজের নামের পাশে একটা তারিখ লেখা—
‘দ্বিতীয় মৃত্যু: ১৭ নভেম্বর, ২০২৬।’
আর ঠিক নিচে আরেকটি নাম—
‘মায়া সেন—প্রথম মৃত্যু: ১৭ নভেম্বর, ২০০৪।’
ঋদ্ধি মাথা তুলে মায়ার দিকে তাকাল।
“আপনি কি মারা গিয়েছিলেন ১৭ নভেম্বর, ২০০৪?”
মায়া ধীরে মাথা নাড়ল।
“হ্যাঁ।”
“তাহলে আজ আমি এখানে কেন?”
মায়া উঠে দাঁড়াল। তার চোখের দৃষ্টি বদলে গেছে।
“কারণ আজ তোমার প্রথম মৃত্যু।”
ঋদ্ধি কিছু বুঝে ওঠার আগেই ঘরের দরজা নিজে থেকেই বন্ধ হয়ে গেল।
দেয়ালের ঘড়িতে কাঁটা ঘুরতে শুরু করল। কিন্তু সময় সামনে এগোচ্ছে না—পিছিয়ে যাচ্ছে।
বারোটা সতেরো।
এগারোটা।
দশটা।
তারপর হঠাৎ ঘরের আলো নিভে গেল।
অন্ধকারের মধ্যে ঋদ্ধি নিজেরই কণ্ঠস্বর শুনতে পেল।
“মায়া, দরজাটা খোলো! আমি জানি, তুমি ভিতরে আছ!”
সে টর্চ জ্বালাল।
ঘর ফাঁকা।
মায়া নেই।
লাল ডায়েরিটা মেঝেতে পড়ে আছে।
ঋদ্ধি সেটা তুলে নিল। শেষ পাতায় নতুন করে লেখা ফুটে উঠছে। যেন অদৃশ্য কেউ তার চোখের সামনেই লিখছে—
‘আজ রাত বারোটা সতেরোয় ঋদ্ধি মুখার্জি ঘর নম্বর সতেরোতে প্রবেশ করেন। পরদিন সকালে তাঁর মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। মৃত্যুর আগে তিনি একটি নাম উচ্চারণ করেছিলেন।’
তারপর অক্ষরগুলো থেমে গেল।
কয়েক সেকেন্ড পরে শেষ লাইনটি ফুটে উঠল—
‘সেই নামটি ছিল তাঁর মায়ের নাম।’
ঋদ্ধি স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
তার মা মারা গিয়েছিলেন যখন তার বয়স মাত্র পাঁচ বছর। মায়ের নাম সে বহু বছর উচ্চারণ করেনি।
কারণ পরিবারে কেউ সেই নাম নিয়ে কথা বলতে চাইত না।
নামটি ছিল—মায়া।
ঠিক তখনই ঘরের বাইরে পায়ের শব্দ শোনা গেল।
ধীরে ধীরে কেউ দরজার কাছে এসে দাঁড়াল।
তারপর দরজার ওপাশ থেকে এক পুরুষকণ্ঠ বলল—
“ঋদ্ধি, দরজা খোলো। আমি তোমার বাবা।”
ঋদ্ধির চোখে জল এসে গেল।
তার বাবা মারা গেছেন দশ বছর আগে।
কণ্ঠস্বরটি আবার বলল—
“বাবা, তোমার মায়ের মৃত্যুর সত্যিটা কি জানতে চাও?”
ঋদ্ধি দরজার দিকে এগিয়ে গেল।
হাতল ছোঁয়ার ঠিক আগে লাল ডায়েরিটা নিজে থেকেই খুলে গেল।
শেষ পাতায় নতুন একটি বাক্য ফুটে উঠল—
‘দরজা খুললেই তুমি তোমার মাকে দেখতে পাবে। কিন্তু মনে রেখো, মৃতেরা সব সময় সত্যি কথা বলে না।’
ঋদ্ধি হাতল ধরে দাঁড়িয়ে রইল।
দরজার ওপাশে তার বাবার কণ্ঠস্বর।
ডায়েরির পাতায় মায়ের নাম।
আর ঘরের অন্ধকারে, তার ঠিক পিছনে, কেউ একজন নিঃশ্বাস ফেলছে।
ঋদ্ধি ধীরে ধীরে পিছনে ঘুরল।
অন্ধকারের মধ্যে একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
তার বয়স পাঁচ বছর।
তার মুখ ঋদ্ধির ছোটবেলার ছবির মতো।
মেয়েটি মৃদু হেসে বলল—
“দাদা, তুমি আমাকে চিনতে পারছ না?”
ঋদ্ধি জমে গেল।
কারণ তার কোনও বোন ছিল না।
অন্তত সে এত দিন তাই জানত।
মেয়েটি হাত বাড়িয়ে দিল।
“চলো। তোমাকে দেখাই, তোমার জন্মের আগের রাতে এই বাড়িতে কী ঘটেছিল।”
ঘরের আলো নিভে গেল।
আর লাল ডায়েরির শেষ পাতায় ধীরে ধীরে ফুটে উঠল নতুন একটি তারিখ—
১৭ নভেম্বর, ২০২৬।
তার ঠিক নিচে লেখা—
‘দ্বিতীয় মৃত্যু এখনও বাকি।’