অন্ধকারের মধ্যে ঋদ্ধি নিজের নিঃশ্বাসের শব্দ শুনতে পাচ্ছিল।
তার হাতে ধরা পুরোনো সংবাদপত্রটা কখন যে মেঝেতে পড়ে গেছে, সে খেয়াল করেনি। চোখের সামনে শুধু একটা প্রশ্ন ঘুরছিল—
যদি সে ঋদ্ধি মুখার্জি না হয়, তাহলে সে কে?
আর যে মানুষটি এত বছর ধরে তার বাবা হয়ে বেঁচে আছেন, তিনি আসলে কী লুকিয়ে রেখেছেন?
“পিউ, তুমি আমার সঙ্গে এসো।”
পাঁচ বছরের মেয়েটি মাথা নাড়ল।
“আমি যেতে পারব না, দাদা। এই ঘরের বাইরে আমার সময় থেমে আছে। আমি বাইরে গেলেই আবার সেই রাতটা ফিরে আসে।”
“কোন রাত?”
পিউ উত্তর দিল না। সে মেঝের একটা নির্দিষ্ট জায়গায় আঙুল রাখল।
“এখানে খুঁড়তে হবে।”
ঋদ্ধি নিচে তাকাল। মেঝের ওপর একটা কালো দাগ। দাগটা দেখতে অনেকটা পুরোনো কবরের চিহ্নের মতো।
“এখানে কী আছে?”
“তোর পরিচয়।”
ঋদ্ধি হাত দিয়ে মেঝের ধুলো সরাল। তার নিচে একটা লোহার আংটা দেখা গেল। আংটাটা ধরে টানতেই মেঝের একটা অংশ উঠে এল। নিচে সরু সিঁড়ি, স্যাঁতসেঁতে দেওয়াল আর মাটির গন্ধ।
দূরে কোথাও জল পড়ছে।
পিউ বলল, “সাবধানে যাস। নিচে যা দেখবি, সেটা দেখে যেন পালিয়ে না যাস।”
ঋদ্ধি টর্চ জ্বালিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামতে শুরু করল।
সিঁড়ির শেষে একটা ছোট ভূগর্ভস্থ ঘর। ঘরের মাঝখানে কাঠের একটা বাক্স। তার পাশে কয়েকটা পুরোনো সংবাদপত্র, একটা মরচে ধরা কোদাল আর একটি পাথরের ফলক।
ফলকে লেখা—
পিউ সেন
জন্ম: ১৭ নভেম্বর, ১৯৯৮
মৃত্যু: ২৭ অক্টোবর, ২০০৩
ঋদ্ধির হাত থেকে টর্চ প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।
তার জন্ম ১৭ নভেম্বর, ১৯৯৮।
তার জন্মদিনও একই।
আর তার মৃত্যু দেখানো হয়েছে সেই দিনে, যেদিন সে পাঁচ বছরের ছিল।
কিন্তু সে তো বেঁচে আছে!
সে তো এত বছর নিজের জীবন কাটিয়েছে, স্কুলে পড়েছে, কলেজে গিয়েছে, সাংবাদিক হয়েছে।
তাহলে এই ফলক কার?
ঋদ্ধি কাঠের বাক্সটা খুলল।
ভিতরে একটা ছোট্ট শিশুর জামা, রুপোর নূপুর আর হাসপাতালের নথি। নথির প্রথম পাতায় লেখা—
‘যমজ সন্তান। প্রথম শিশু: পিউ সেন। দ্বিতীয় শিশু: ঋদ্ধি সেন।’
নিচে জন্মের সময় লেখা দুটো আলাদা সময়।
পিউ—রাত ১১টা ৫৮ মিনিট।
ঋদ্ধি—রাত ১২টা ০৩ মিনিট।
কিন্তু তারিখের ঘরে দুটো আলাদা দিন।
পিউয়ের জন্ম ১৬ নভেম্বরের রাতে। ঋদ্ধির জন্ম ১৭ নভেম্বরের প্রথম প্রহরে।
ঋদ্ধি কাগজটা হাতে নিয়ে বসে পড়ল।
তাহলে তার জন্মের তারিখ নিয়ে এত বিভ্রান্তি কেন?
নথির পরের পাতায় একটা চিকিৎসকের স্বাক্ষর। তার পাশে লেখা—
‘প্রথম শিশুটি জন্মের পর শ্বাস নিচ্ছিল না বলে ঘোষণা করা হয়েছিল। কয়েক মিনিট পরে দ্বিতীয় শিশুটিকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। পরিবারের অনুরোধে মৃতদেহ হস্তান্তরের নথি সম্পূর্ণ করা হয়নি।’
ঋদ্ধি কাগজটা আবার পড়ল।
প্রথম শিশুটি—পিউ।
দ্বিতীয় শিশুটি—ঋদ্ধি।
অর্থাৎ জন্মের সময় পিউকে মৃত বলে ঘোষণা করা হয়েছিল, আর ঋদ্ধিকেও মৃত বলে মনে করা হয়েছিল।
তাহলে তারা দুজনেই কীভাবে বেঁচে ছিল?
ঠিক তখনই ঘরের বাইরে পায়ের শব্দ শোনা গেল।
অরুণ মুখার্জি সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসছেন।
তাঁর হাতে একটা পুরোনো লণ্ঠন।
“তুই এখানে আসবি, সেটা জানতাম,” তিনি বললেন।
ঋদ্ধি উঠে দাঁড়াল।
“এত দিন আপনি আমাকে কী বলে বড় করেছেন? আমি কে?”
অরুণ দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর বললেন, “তুই আমার ছেলে। তোর নাম ঋদ্ধি। এই কথাটা মিথ্যে নয়।”
“তাহলে এই নথিতে পিউয়ের নাম কেন? আর আমার নামের পাশে কেন মৃত্যুর কথা লেখা?”
অরুণ বাক্সের ভিতরের কাগজগুলোর দিকে তাকালেন।
“কারণ জন্মের রাতে দুটো শিশুর ভাগ্য বদলে গিয়েছিল।”
তিনি ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলেন।
সেই রাতে মায়াকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। প্রসবের সময় জটিলতা দেখা দেয়। চিকিৎসকেরা প্রথমে ভেবেছিলেন, দুই শিশুর কেউই বাঁচবে না। পরে পিউ কেঁদে ওঠে। কিন্তু ঋদ্ধিকে মৃত বলে ঘোষণা করা হয়।
মায়া সেই খবর মেনে নিতে পারেননি। তিনি নিজের মেয়েকে বুকে চেপে ধরে ছেলেকে দেখতে চেয়েছিলেন। সেই সময় হাসপাতালের বিদ্যুৎ চলে যায়। অল্প সময়ের জন্য গোটা ওয়ার্ড অন্ধকারে ডুবে যায়।
আলো ফিরে আসার পর দেখা যায়, পিউ নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছে। আর যে শিশুটিকে মৃত বলে ঘোষণা করা হয়েছিল, সে কাঁদছে।
“চিকিৎসকেরা বলেছিলেন, এটা অসম্ভব,” অরুণ বললেন। “কিন্তু আমি নিজের চোখে দেখেছিলাম, তোর মা দুই শিশুকে কোলে নিয়ে বসে আছে। একজন কাঁদছে, আরেকজন নিথর।”
“তারপর?”
“তোর মা বলেছিল, দুজনের মধ্যে একজনকে পৃথিবীতে থাকতে হবে। কিন্তু সে কাউকে ছেড়ে দিতে পারেনি।”
ঋদ্ধি বাবার দিকে তাকিয়ে রইল।
“এটা কীভাবে সম্ভব?”
অরুণ মাথা নাড়লেন।
“আমি জানি না। শুধু জানি, সেই রাতের পর থেকে আমাদের জীবনে অদ্ভুত ঘটনা ঘটতে শুরু করে। তোর মা প্রতি অমাবস্যায় একটা করে সংবাদপত্র পেত। প্রতিটায় লেখা থাকত, পরিবারের কারও মৃত্যু হবে। আর আশ্চর্যের বিষয়, খবরগুলো সত্যি হতে শুরু করত।”
“আপনি কি বলতে চাইছেন, সংবাদপত্রে লেখা থাকলেই মৃত্যু ঘটত?”
“সব সময় নয়। কখনও খবর সত্যি হত, কখনও বদলে যেত। কিন্তু প্রতিবার একটা জিনিস একই থাকত—মায়া সেই খবর পড়ার পর কাউকে বাঁচানোর চেষ্টা করত। আর প্রতিবারই সে কিছু একটা হারাত।”
ঋদ্ধি টেবিলের ওপর রাখা পুরোনো সংবাদপত্রগুলো দেখল।
প্রতিটি কাগজের তারিখ অমাবস্যার সঙ্গে মিলে যাচ্ছে।
“কিন্তু পিউয়ের মৃত্যু?”
অরুণ চোখ বন্ধ করলেন।
“তোর পাঁচ বছর বয়সে মায়া একটা সংবাদপত্র পেয়েছিল। তাতে লেখা ছিল, ওই রাতেই পিউ মারা যাবে। তোর মা পিউকে নিয়ে নীলকুঠিতে চলে যায়। সে ভেবেছিল, বাড়িটার ভিতরে সময় থামিয়ে দিতে পারলে পিউকে বাঁচানো যাবে।”
“কিন্তু পিউ তো আমার সঙ্গে ছিল না!”
“তুই ওকে দেখতিস। তোর মা ওকে দেখত। কিন্তু অন্যরা ধীরে ধীরে ওকে দেখতে পেত না। ডাক্তার বলেছিলেন, জন্মের পর পিউয়ের মস্তিষ্কে গুরুতর সমস্যা হয়েছিল। ওর শরীর বেঁচে থাকলেও চেতনা কখনও স্বাভাবিকভাবে ফিরে আসেনি। তোর মা সেটা মানতে পারেনি। নীলকুঠির ঘরটা তার কাছে আশ্রয় হয়ে উঠেছিল।”
ঋদ্ধি বুঝতে পারছিল না, এই ব্যাখ্যায় কতটা সত্যি আছে। অরুণ যেন কিছু সত্যি বলছেন, আবার কিছু লুকোচ্ছেন।
“আর আমার মৃত্যু?”
অরুণ এবার সরাসরি তার দিকে তাকালেন।
“তোর মৃত্যু হয়নি, ঋদ্ধি। অন্তত আমি যে ছেলেকে বড় করেছি, তার মৃত্যু হয়নি।”
“তাহলে আমার মৃত্যুর খবর কেন ছাপা হচ্ছে?”
“কারণ তুই এমন একটা প্রশ্নের উত্তর খুঁজছিস, যার উত্তর জানলে তোর নিজের জীবনটাই বদলে যাবে।”
“কোন প্রশ্ন?”
অরুণ লণ্ঠনটা মেঝেতে রাখলেন।
“তুই আসলে কোন শিশুটিকে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছিলি, সেটা।”
ঘরের বাতাস হঠাৎ ঠান্ডা হয়ে গেল।
ঋদ্ধি বাবার হাত ধরল।
“আমাকে পরিষ্কার করে বলুন।”
অরুণের চোখ ভিজে উঠল।
“আমি তোকে যে নামে বড় করেছি, সেই নামটাই তোর পরিচয়। কিন্তু জন্মের সময় কোন শিশুর শরীর বেঁচে ছিল আর কোন শিশুর স্মৃতি কার মধ্যে এসে মিশেছিল, সেটা আমি কোনও দিন বুঝতে পারিনি। তোর মা বিশ্বাস করত, পিউয়ের স্মৃতি তোর মধ্যে বেঁচে আছে। আবার কখনও বলত, তুই পিউকে নিজের মধ্যে লুকিয়ে রেখেছিস। আমি চিকিৎসকের কাছে গিয়েছিলাম, পুরোহিতের কাছে গিয়েছিলাম, অনেকের কাছে গিয়েছিলাম। কেউ কোনও উত্তর দিতে পারেনি।”
ঋদ্ধি ধীরে ধীরে পিছিয়ে গেল।
“তাহলে আমি কি পিউ?”
“তুই ঋদ্ধি।”
“কিন্তু পিউ তো আমার সঙ্গে কথা বলছে!”
অরুণ মাথা নাড়লেন।
“আমি জানি না, ও সত্যিই তোর বোন, নাকি তোর স্মৃতি, নাকি এই বাড়ির তৈরি একটা ছায়া।”
ঠিক তখনই কাঠের বাক্সের ভিতর থেকে একটা শব্দ হল।
টক।
তারপর আরেকটা।
টক।
বাক্সের ঢাকনা নিজে থেকেই খুলে গেল।
ভিতরে একটা লাল ডায়েরি।
ঋদ্ধি ডায়েরিটা তুলে নিল। প্রথম পাতায় মায়ার হাতের লেখা—
‘যদি কোনও দিন আমার ছেলে এই ডায়েরি পড়ে, তবে তাকে বলবে, আমি কাউকে বেছে নিইনি। আমি শুধু চেয়েছিলাম, আমার দুই সন্তানই বেঁচে থাকুক।’
পরের পাতায় লেখা—
‘কিন্তু সময় কাউকে দুবার জীবন দেয় না। এক শিশুর জীবন অন্য শিশুর স্মৃতিতে বেঁচে থাকলে, একদিন সেই স্মৃতিকে নিজের পরিচয় দাবি করতে হবে।’
ঋদ্ধির বুকের ভিতরটা ধক করে উঠল।
ডায়েরির শেষ পাতায় একটা মানচিত্র আঁকা। নীলকুঠির নিচে আরও একটা ঘর চিহ্নিত। তার পাশে লেখা—
‘যেখানে প্রথম মৃত্যু ঘোষণা করা হয়েছিল।’
“এই ঘরটা কোথায়?” ঋদ্ধি জিজ্ঞেস করল।
অরুণ মুখ ফ্যাকাশে করে ফেললেন।
“ওখানে যাওয়া যাবে না।”
“কেন?”
“কারণ ওখানে তোর মা শেষবার গিয়েছিল। আর সেখান থেকে ফিরে আসেনি।”
ঋদ্ধি মানচিত্রটা হাতে নিয়ে সিঁড়ির দিকে এগোল।
অরুণ তার পথ আটকালেন।
“আমি তোকে আর হারাতে চাই না।”
ঋদ্ধি বলল, “আপনি আমাকে বাঁচাতে গিয়ে এত বছর সত্যিটা লুকিয়ে রেখেছেন। কিন্তু মিথ্যে দিয়ে আর কাউকে বাঁচানো যায় না।”
সে বাবাকে পাশ কাটিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে শুরু করল।
পিউ দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছিল।
“তুই সব জেনে গেছিস?” সে জিজ্ঞেস করল।
“না। এখনও অনেক কিছু জানার বাকি।”
পিউয়ের চোখে জল এসে গেল।
“তাহলে আমার একটা প্রশ্নের উত্তর দে। তুই কি আমাকে বাঁচাতে চাস?”
ঋদ্ধি তার দিকে তাকিয়ে বলল, “হ্যাঁ।”
“তাহলে তুই নিজের নামটা ভুলে যা।”
“কেন?”
পিউ ফিসফিস করে বলল, “কারণ এই বাড়িতে যে নিজের নাম মনে রাখে, তার মৃত্যু হয়। আর যে নিজের নাম ভুলে যায়, সে অন্য কারও জীবন নিয়ে বেঁচে থাকে।”
ঋদ্ধি উত্তর দেওয়ার আগেই পিউ অদৃশ্য হয়ে গেল।
ঘরের মাঝখানে একটা পুরোনো আয়না দেখা দিল। আয়নায় ঋদ্ধি নিজের মুখ দেখল।
কিন্তু প্রতিবিম্বের মুখে তার নিজের হাসি নেই।
প্রতিবিম্বের ঠোঁট নড়ল।
“তুমি অনেক দেরি করে ফেলেছ, পিউ।”
ঋদ্ধি পিছিয়ে গেল।
“আমি ঋদ্ধি!”
প্রতিবিম্ব মৃদু হাসল।
“তাহলে তোমার জন্মের শংসাপত্রে প্রথমে পিউ সেন লেখা ছিল কেন?”
আয়নার কাচে ফাটল ধরল।
ফাটলের ভিতর থেকে একটা হাসপাতালের দৃশ্য দেখা গেল। মায়া বিছানায় শুয়ে আছেন। পাশে দুটো শিশু। একজন কাঁদছে, অন্যজন নিশ্চুপ।
একজন নার্স বলছেন, “একজন বেঁচে আছে।”
মায়া কাঁদতে কাঁদতে বলছেন, “দুজনেই বেঁচে আছে।”
তারপর দৃশ্যটা বদলে গেল।
একজন পুরুষ শিশুটিকে কোলে তুলে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছেন। আরেকটি শিশুকে রেখে যাচ্ছেন মায়ার পাশে।
পুরুষটির মুখ স্পষ্ট নয়।
কিন্তু তাঁর ডান হাতের কবজিতে একটা কালো দাগ।
ঋদ্ধি নিজের কবজির দিকে তাকাল।
সেখানেও একই দাগ।
তার মাথা ঘুরে উঠল।
আয়নার ভিতর থেকে মায়ার কণ্ঠস্বর ভেসে এল—
“ঋদ্ধি, মনে রেখো, যে শিশুটিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, সে বেঁচে ছিল। কিন্তু যে শিশুটিকে ঘরে রেখে যাওয়া হয়েছিল, তার মৃত্যু কোনও দিন ঘোষণা করা হয়নি।”
ঋদ্ধি চিৎকার করে উঠল, “মা!”
আয়না ভেঙে গেল।
এক মুহূর্তে সব আলো নিভে গেল।
তারপর দূরে কোথাও একটা সংবাদপত্র ছাপার যন্ত্র চালু হওয়ার শব্দ শোনা গেল।
খটাখট।
খটাখট।
খটাখট।
ঋদ্ধি দৌড়ে মূল ঘরে ফিরে এল। টেবিলের ওপর একটা নতুন সংবাদপত্র পড়ে আছে। কাগজটা এখনও গরম। কালির গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে।
তারিখ—১৭ নভেম্বর, ২০২৬।
শিরোনাম—
“নীলকুঠির ভূগর্ভ থেকে উদ্ধার দুই কঙ্কাল—একটির পরিচয় ঋদ্ধি মুখার্জি, অন্যটির পরিচয় অজ্ঞাত।”
খবরের নিচে ছোট্ট একটা ছবি।
দুটো কবর পাশাপাশি।
একটির ওপর লেখা—ঋদ্ধি মুখার্জি।
অন্যটির ওপর লেখা—পিউ সেন।
আর ছবির পিছনে দাঁড়িয়ে আছে এক নারী।
মায়া সেন।
কিন্তু তাঁর মুখের অর্ধেক অংশ পুড়ে গেছে।
ঋদ্ধি কাগজটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর কাগজের নিচে নতুন একটা লাইন ফুটে উঠল—
‘দুই কঙ্কালের মধ্যে একটির বয়স পাঁচ বছর। অন্যটির বয়স আটাশ বছর।’
ঋদ্ধির বুকের ভিতরটা কেঁপে উঠল।
কবরের ভিতরে যদি তার নিজের দেহ থাকে, তাহলে এত বছর ধরে সে কে হয়ে বেঁচে আছে?
ঠিক তখনই পিছন থেকে অরুণের কণ্ঠস্বর ভেসে এল।
“এবার তুই বুঝতে পারছিস কেন আমি তোকে সত্যিটা বলতে চাইনি?”
ঋদ্ধি ঘুরে দাঁড়াল।
তার বাবা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছেন। চোখে জল, হাতে একটা পুরোনো চাবি।
“ওই ঘরে যা আছে, সেটা দেখলে তুই আর আগের মতো থাকতে পারবি না।”
ঋদ্ধি চাবিটা নিয়ে নিল।
“আমি এত দিন আগের মতো ছিলামই না, বাবা।”
সে দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এল।
নীলকুঠির উঠোনে ভোরের আলো ফুটছে।
কিন্তু উঠোনের মাঝখানে দুটো নতুন কবর তৈরি হয়েছে।
একটা বড়।
একটা ছোট।
আর বড় কবরটার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে আছে এক তরুণী।
তার পরনে সাদা শাড়ি। মুখে অশ্রু। হাতে একটা সংবাদপত্র।
ঋদ্ধি কাছে যেতেই সে মাথা তুলল।
মায়া সেন।
এই প্রথম তাঁর মুখে কোনও রহস্যময় হাসি নেই।
তিনি শুধু বললেন—
“তুমি অবশেষে ফিরে এসেছ, আমার মেয়ে।”
ঋদ্ধির পায়ের নিচের মাটি যেন সরে গেল।
মায়া তার হাত বাড়িয়ে দিলেন।
“এবার তোমাকে তোমার আসল জন্মের কথা বলব। কিন্তু তার আগে তোমাকে একটা সিদ্ধান্ত নিতে হবে।”
“কী সিদ্ধান্ত?”
মায়া বড় কবরটার দিকে তাকালেন।
“তুমি কি জানতে চাও, ওই কবরের ভিতরে আসলে কার দেহ আছে?”
ঋদ্ধি ধীরে মাথা নাড়ল।
মায়া বললেন, “তাহলে কবরটা খুঁড়তে হবে।”
ঋদ্ধি কোদালটা হাতে তুলে নিল।
প্রথম কোপ পড়তেই মাটি সরে গেল।
দ্বিতীয় কোপে দেখা গেল কাঠের বাক্সের একটা অংশ।
তৃতীয় কোপে বাক্সের ঢাকনা ভেঙে গেল।
ভিতরে সাদা কাপড়ে মোড়া একটা কঙ্কাল।
কঙ্কালের গলায় ঝুলছে একটি পরিচয়পত্র।
ঋদ্ধি সেটি তুলে নিল।
পরিচয়পত্রে লেখা—
ঋদ্ধি মুখার্জি।
কিন্তু ছবিটা তার নয়।
ছবিতে দেখা যাচ্ছে পাঁচ বছরের একটা মেয়েকে।
তার চুলে লাল ফিতে।
তার নামের নিচে হাতে লেখা—
‘মৃত্যুর তারিখ: ২৭ অক্টোবর, ২০০৩।’
ঋদ্ধি ধীরে ধীরে মাথা তুলল।
মায়া কাঁদছেন।
“এবার বুঝতে পেরেছ, আমার মেয়ে? এত বছর ধরে তুমি যে জীবনটাকে নিজের বলে জানত, সেটা আসলে অন্য কারও জীবন।”
ঋদ্ধি কঙ্কালটার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর নিজের হাতে থাকা পরিচয়পত্রের দিকে।
এবার সে আর নিজের নাম উচ্চারণ করতে পারল না।
কারণ তার মনে পড়ে গেল—ছোটবেলায় তার বাবা তাকে বলেছিলেন, “তুই আমার ছেলে।”
কিন্তু কখনও বলেননি, সে তাঁর নিজের সন্তান।
আর ঠিক তখনই পেছন থেকে পিউয়ের কণ্ঠস্বর ভেসে এল—
“দাদা, এবার আমার পালা। তুই এত দিন আমার জীবন নিয়ে বেঁচেছিস। এবার আমাকে আমার জীবনটা ফিরিয়ে দে।”
ঋদ্ধি ঘুরে তাকাল।
পিউ দাঁড়িয়ে আছে। তার পাশে আরেকটি শিশু।
একই মুখ।
একই চোখ।
একই লাল ফিতে।
দুজনেই একসঙ্গে বলল—
“আমাদের মধ্যে একজনই পিউ সেন।”
নীলকুঠির ঘড়িতে তখন বাজল বারোটা সতেরো।
আর ঋদ্ধি বুঝল, তার মৃত্যুর খবর এখনও শেষ হয়নি।
সমাপ্ত।