রাত তখন ঠিক ১২টা ১৭ মিনিট।
নীলকুঠির স্যাঁতসেঁতে ঘরে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে রয়েছে দুটি মেয়ে। দু’জনেরই মুখ এক, চোখ এক, এমনকি কপালের বাঁদিকে ছোট্ট কালো তিলটিও একই জায়গায়। একজনের হাতে পুরোনো সংবাদপত্র, অন্যজনের হাতে রক্তমাখা একটি ডায়েরি।
দু’জনেই ঋদ্ধির দিকে তাকিয়ে বলল, “আমাদের মধ্যে একজনই পিউ সেন।”
ঋদ্ধি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর পকেট থেকে সেই সংবাদপত্রটি বের করল, যে কাগজে তার নিজের মৃত্যুর খবর ছাপা হয়েছিল।
কাগজের তারিখ—১৭ নভেম্বর, ২০২৬।
অথচ আজও সেই তারিখ আসেনি।
খবরের শিরোনামে লেখা ছিল—
‘নীলকুঠিতে উদ্ধার দুই যমজের দেহ, নিখোঁজ সাংবাদিক ঋদ্ধির রহস্যের অবসান।’
ঋদ্ধির হাত কেঁপে উঠল। এত দিন সে ভেবেছিল সংবাদপত্রটি তার মৃত্যুর ভবিষ্যদ্বাণী করছে। কিন্তু এখন তার মনে হল, কাগজটি হয়তো মৃত্যুর খবর জানাচ্ছে না—বরং এমন একটি ঘটনার কথা লিখছে, যা ঘটতে বাধ্য, যদি সে সত্যিটা জানতে না পারে।
“তোমরা দু’জনেই যদি পিউ হও,” ঋদ্ধি বলল, “তাহলে আমার নাম কে রেখেছিল?”
বাঁদিকে দাঁড়ানো মেয়েটি উত্তর দিল, “মা।”
ডানদিকে দাঁড়ানো মেয়েটি বলল, “বাবা।”
একটি উত্তর অন্যটির বিপরীত। অথচ দু’জনের চোখেই একই আতঙ্ক।
ঋদ্ধি ডায়েরিটি খুলল। শেষ পাতায় লেখা ছিল—
‘যে সন্তানকে বাঁচাতে গিয়ে অন্য সন্তানকে মৃত ঘোষণা করা হয়, একদিন সেই মিথ্যে মৃত্যুই ফিরে আসে।’
লেখাটি তার মা মায়া সেনের।
ঋদ্ধির মনে পড়ল, বাবা অরুণ একবার বলেছিলেন, জন্মের পর দুই সন্তানের মধ্যে একজন বাঁচেনি। কিন্তু সেই কথার সঙ্গে পুরোনো হাসপাতালের নথির কোনও মিল ছিল না। নথিতে লেখা ছিল, যমজ দুই কন্যাই জীবিত অবস্থায় জন্মেছিল। তার পরের পাতাটি ছিঁড়ে ফেলা হয়েছিল।
“বাবা আমাদের একজনকে মৃত বলে ঘোষণা করেছিলেন,” ঋদ্ধি ফিসফিস করে বলল। “কিন্তু কেন?”
ঠিক তখনই ঘরের বাইরে পায়ের শব্দ শোনা গেল।
অরুণ সেন দরজায় এসে দাঁড়ালেন। তাঁর হাতে একটি পুরোনো লোহার বাক্স। মুখে সেই ক্লান্তি, যা দীর্ঘদিনের অপরাধবোধ মানুষের মুখে রেখে যায়।
“কারণ আমি কাপুরুষ ছিলাম,” তিনি বললেন।
দুই মেয়ের একজন চিৎকার করে উঠল, “তুমি আমাকে মায়ের কাছ থেকে সরিয়ে নিয়েছিলে!”
অন্যজন বলল, “না, তুমি আমাকে মেরে ফেলেছিলে!”
অরুণ চোখ বন্ধ করলেন।
“তোমাদের কাউকেই আমি মারিনি। কিন্তু তোমাদের দু’জনের জীবনই আমি নষ্ট করেছি।”
তিনি বাক্সটি মেঝেতে রাখলেন। ভিতরে ছিল দুটি জন্মের শংসাপত্র, হাসপাতালের একটি ছবি এবং মায়ার লেখা চিঠি।
ছবিতে মায়া দুই শিশুকে বুকে জড়িয়ে ধরে আছেন। পাশে দাঁড়িয়ে অরুণ। ছবির পিছনে তারিখ—১৯৯৮ সালের ১৭ নভেম্বর।
চিঠিতে লেখা ছিল—
‘অরুণ, তুমি যদি এই চিঠি পড়ো, তবে বুঝব তুমি আবার সত্যিটাকে চাপা দিতে চেয়েছ। আমাদের দুই মেয়ের একজন পিউ, অন্যজন ঋদ্ধি। কিন্তু নামের অদলবদল করে তুমি তাদের ভাগ্য বদলাতে পারবে না। ওদের দু’জনকেই নিজের পরিচয় জানার অধিকার দিতে হবে।’
ঋদ্ধি চিঠিটি পড়ে স্তব্ধ হয়ে গেল।
তারপর অরুণ যা বললেন, তাতে নীলকুঠির অন্ধকার যেন আরও ঘন হয়ে উঠল।
সেদিন হাসপাতালে আগুন লাগেনি, কোনও দুর্ঘটনাও ঘটেনি। কিন্তু সদ্যোজাত দুই শিশুর মধ্যে একজনের শ্বাসপ্রশ্বাস জন্মের কয়েক ঘণ্টা পর বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। চিকিৎসকেরা তাকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। অন্য শিশুটি বেঁচে যায়।
মায়া সেই মৃত্যুকে মেনে নিতে পারেননি। তিনি বিশ্বাস করতেন, হাসপাতালের অবহেলায় তাঁর একটি সন্তান মারা গেছে। অরুণ সত্যিটা জানতেন—শিশুটিকে বাঁচানোর সমস্ত চেষ্টা করা হয়েছিল। তবু মায়া তাঁকে ক্ষমা করতে পারেননি।
কয়েক বছর পর তাঁদের জীবনে আরেকটি বিপর্যয় নেমে আসে। জীবিত মেয়েটি, পিউ, একটি দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়। মায়া মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। সেই সময় থেকেই তিনি মৃত সন্তানের নাম, মুখ আর স্মৃতি জীবিত মেয়ের ওপর চাপিয়ে দিতে শুরু করেন। কখনও পিউকে ঋদ্ধি বলে ডাকতেন, কখনও বলতেন, তাঁর মৃত সন্তান ফিরে এসেছে।
অরুণ মায়াকে চিকিৎসা করানোর বদলে সবকিছু গোপন করেছিলেন। সমাজের প্রশ্ন, হাসপাতালের তদন্ত এবং নিজের অপরাধবোধ থেকে বাঁচতে তিনি নথি বদলান। জীবিত পিউকে অন্য নামে বড় করেন। মায়া সেই প্রতারণার প্রতিবাদ করতে গিয়ে নীলকুঠিতে চলে আসেন—যে বাড়িটি একসময় তাঁদের পরিবারের সম্পত্তি ছিল।
কিন্তু অরুণের গল্পের সঙ্গে ডায়েরির সব কথা মিলছিল না।
“তাহলে এই দু’জন কে?” ঋদ্ধি জিজ্ঞাসা করল।
অরুণ উত্তর দেওয়ার আগেই ডানদিকে দাঁড়ানো মেয়েটি ধীরে ধীরে পিছিয়ে গেল। তার শরীরের চারপাশে কুয়াশার মতো ধোঁয়া জমতে শুরু করেছে।
“আমি সেই মেয়ে,” সে বলল, “যাকে তোমরা কেউ বাঁচাতে পারোনি। আমি কোনও দেহ নই। আমি মায়ের স্মৃতিতে আটকে থাকা পিউ—যে কোনও দিন পৃথিবীতে বড় হতে পারেনি।”
বাঁদিকে দাঁড়ানো মেয়েটির চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।
“আমি বেঁচে ছিলাম। কিন্তু আমাকে এমনভাবে বড় করা হয়েছিল, যেন আমার নিজের কোনও পরিচয় নেই। আমাকে কখনও পিউ, কখনও ঋদ্ধি, কখনও মায়ের মৃত সন্তান বলে ডাকা হয়েছে। আমি নিজের নামটাই ভুলে গিয়েছিলাম।”
ঋদ্ধি বুঝতে পারল, এই দুই মেয়ের একজন বাস্তব—আর অন্যজন মায়ার স্মৃতি, অপরাধবোধ এবং অসমাপ্ত শোক থেকে জন্ম নেওয়া এক ছায়া। নীলকুঠির অদ্ভুত ঘটনাগুলো সেই ছায়াকে আরও শক্তিশালী করেছে। প্রতি অমাবস্যায় পুরোনো সংবাদপত্রে যে মৃত্যুর খবর প্রকাশিত হত, তা আসলে ভবিষ্যতের নিশ্চিত ঘোষণা ছিল না; মায়ার ডায়েরি, পুরোনো নথি এবং অরুণের লুকোনো সত্যের সঙ্গে জড়িয়ে তৈরি হওয়া এক ভয়ংকর পুনরাবৃত্তি ছিল।
কিন্তু একটি প্রশ্নের উত্তর তখনও বাকি।
ঋদ্ধি কে?
সে কি পিউ, নাকি সেই মৃত শিশুর নাম বহন করে বেঁচে থাকা অন্য কেউ?
অরুণ লোহার বাক্স থেকে আরেকটি কাগজ বের করলেন। সেটি ছিল ঋদ্ধির স্কুলে ভর্তির নথি। সেখানে নাম লেখা—ঋদ্ধি সেন। জন্মের শংসাপত্রে নামের জায়গাটি পরে বদলানো হয়েছে। পুরোনো লেখার ছাপ কাগজের নিচে এখনও স্পষ্ট।
সেখানে লেখা ছিল—পিউ সেন।
ঋদ্ধির বুকের ভিতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।
“তাহলে আমার আসল নাম পিউ?”
“হ্যাঁ,” অরুণ বললেন। “তুমি সেই জীবিত সন্তান। তোমাকে অন্য নামে বড় করে আমি ভেবেছিলাম, অতীত মুছে ফেলতে পারব। কিন্তু তোমার মা কখনও তা মেনে নেননি।”
“আর যে মেয়েটি মারা গিয়েছিল?”
অরুণ মাথা নিচু করলেন। “তার নাম আমরা ঠিক করতেই পারিনি। তোমাদের নামের অদলবদল হয়েছিল হাসপাতালেই। পরে আমি সেই ভুলকে ইচ্ছাকৃত মিথ্যে বানিয়ে ফেলি।”
ঋদ্ধি—যে এত দিন নিজেকে ঋদ্ধি বলে চিনেছে—মেঝেতে বসে পড়ল। তার শৈশব, তার পরিচয়, তার মায়ের মুখ, সবকিছু যেন নতুন করে লেখা হচ্ছে।
ঠিক সেই মুহূর্তে ঘড়ির কাঁটা ১২টা ১৮ মিনিটে পৌঁছল।
ঘরের বাতাস কেঁপে উঠল। ডানদিকে দাঁড়ানো ছায়ামেয়েটির মুখে প্রথমবারের মতো শান্তির হাসি ফুটল।
“এবার আমাকে যেতে দাও,” সে বলল। “আমার নাম না থাকলেও আমার মৃত্যু সত্যি ছিল। আমার জন্য কাঁদো, কিন্তু আমাকে আর জীবিতদের জীবন কেড়ে নিতে দিও না।”
ঋদ্ধি তার দিকে হাত বাড়াল। আঙুল ছোঁয়ার আগেই মেয়েটি ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল। মেঝেতে পড়ে রইল শুধু একটি ছোট্ট রুপোর নূপুর।
অরুণ কাঁদতে শুরু করলেন। বহু বছর ধরে যে সত্যিটা তিনি লুকিয়ে রেখেছিলেন, তা অবশেষে তাঁর সামনে দাঁড়িয়েছিল—আর এবার তিনি আর তাকে অস্বীকার করতে পারলেন না।
ভোর হওয়ার আগে ঋদ্ধি নীলকুঠি থেকে বেরিয়ে এল। তার হাতে মায়ার ডায়েরি, পুরোনো জন্মের নথি এবং সেই সংবাদপত্র।
১৭ নভেম্বরের ভবিষ্যৎ-তারিখ লেখা কাগজটি এবার সে উল্টে দেখল।
পিছনের পাতায় নতুন একটি লাইন ফুটে উঠেছে—
‘১৭ নভেম্বর, ২০২৬: নীলকুঠির রহস্যের অবসান। বহু বছর পরে এক মেয়ে নিজের আসল নাম ফিরে পেল।’
তার মৃত্যুর খবর আর কোথাও নেই।
কয়েক দিন পরে ঋদ্ধি সংবাদপত্রে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করল। সেখানে সে নিজের পরিবারের সমস্ত মিথ্যে, হাসপাতালের নথি বদলানোর ঘটনা এবং নীলকুঠিতে ঘটে যাওয়া রহস্যের কথা লিখল। নিজের নামের পাশে সে লিখল—‘পিউ সেন, যিনি এত দিন ঋদ্ধি নামে পরিচিত ছিলেন।’
প্রতিবেদন প্রকাশের পর সে মায়ের কবরের কাছে গেল। কবরের পাশে দাঁড়িয়ে বলল, “মা, আমি তোমার মেয়েকে ফিরিয়ে আনতে পারিনি। কিন্তু তার মৃত্যুকে আর মিথ্যে হতে দেব না।”
হঠাৎ বাতাসে পাতার শব্দ উঠল। কবরের পাশে রাখা ডায়েরির শেষ পাতাটি নিজে থেকেই খুলে গেল।
সেখানে মায়ার হাতের লেখায় শেষ বাক্যটি ফুটে উঠল—
‘সব মৃত্যুর পর মানুষ ফিরে আসে না। কখনও কখনও ফিরে আসে শুধু সত্যি।’
পিউ ডায়েরিটি বন্ধ করল।
সেদিনের পর আর কোনও অমাবস্যায় নিজের মৃত্যুর খবর ছাপা হয়নি। নীলকুঠির ঘড়ি ১২টা ১৭ মিনিটে থেমে থাকেনি। আর কোনও সংবাদপত্র ভবিষ্যতের মৃত্যুর খবর নিয়ে তার দরজায় এসে পড়েনি।
তবু প্রতি বছর ১৭ নভেম্বর পিউ একটি ছোট্ট প্রদীপ জ্বালাত। সেই বোনের জন্য, যার নাম কোনও নথিতে ছিল না, যার জীবন পৃথিবী দেখতে পায়নি, অথচ যার অনুপস্থিতি এত বছর ধরে জীবিতদের জীবন নিয়ন্ত্রণ করেছিল।
পিউ জানত, কিছু রহস্যের উত্তর পাওয়া যায়। কিছু ক্ষত কোনও দিন পুরোপুরি শুকোয় না। কিন্তু সত্যিকে স্বীকার করে নেওয়া গেলে অন্তত মিথ্যের ভিতরে আর বেঁচে থাকতে হয় না।
আর সেই রাতের পর থেকে, অমাবস্যার অন্ধকারে কোনও মেয়ে আর নিজের মৃত্যুর খবর পড়েনি।
সমাপ্ত।