প্রথম পর্ব: বাসরঘরে মৃত স্ত্রীর ছবি
বিয়ের রাতেই অর্ক বুঝতে পারল, সে এমন এক মহিলাকে বিয়ে করেছে, যার অস্তিত্ব পৃথিবীর কাছে বারো বছর আগেই শেষ হয়ে গিয়েছে।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, মেয়েটি তখনও তার পাশেই বসে ছিল।
লাল বেনারসি পরা নববধূ। কপালে সিঁদুর, হাতে শাঁখা-পলা, মুখে হালকা হাসি। জানলার বাইরে তখন ঝমঝম করে বৃষ্টি পড়ছে। দূরে কোথাও বাজ পড়ল। ঘরের আলো একবার দপ করে নিভে আবার জ্বলে উঠতেই অর্কের চোখ পড়ল বিছানার ঠিক উল্টোদিকের দেওয়ালে।
সেখানে একটি পুরোনো সাদা-কালো ছবি টাঙানো।
ছবিতে এক তরুণী বিয়ের সাজে দাঁড়িয়ে আছে। মুখটা অবিকল তার নববধূর মতো। একই চোখ, একই নাক, একই ঠোঁটের কোণে ছোট্ট তিল।
ছবির নীচে কালো কালিতে লেখা—
‘মধুরিমা সেন। মৃত্যু: ১৭ নভেম্বর, ২০১৪।’
অর্কের বুকের ভিতরটা হিম হয়ে গেল।
আজ ১৭ নভেম্বর, ২০২৬।
অর্থাৎ, যে মেয়েটিকে সে কয়েক ঘণ্টা আগে বিয়ে করেছে, ছবির তথ্য সত্যি হলে তার মৃত্যু হয়েছে বারো বছর আগে—ঠিক এই দিনেই।
“ছবিটা কার?” অর্ক কোনও রকমে প্রশ্ন করল।
নববধূ একবার ছবিটির দিকে তাকাল। তার মুখের হাসিটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।
“আমার।”
“তোমার মানে?”
“ছবিতে যে মেয়েটিকে দেখছ, সে-ও আমি।”
অর্ক বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল।
“এটা কেমন মজা? তোমার নাম তো মেঘলা! তুমি তো বলেছিলে, তোমার বাবা-মা কলকাতায় থাকেন। তুমি একটা স্কুলে পড়াও। তোমার সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছে ছ’মাস আগে!”
মেঘলা মাথা নিচু করল।
“সব কথা সত্যি। শুধু একটা কথা তোমাকে বলা হয়নি।”
“কী কথা?”
মেঘলা ধীরে ধীরে ঘোমটা সরিয়ে অর্কের দিকে তাকাল।
“আমি মধুরিমা সেন। আর আমি বারো বছর আগে মারা গিয়েছিলাম।”
অর্কের মনে হল, ঘরের সমস্ত বাতাস কেউ শুষে নিয়েছে।
সে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। কিন্তু দরজার হাতল ঘোরাতেই বুঝল, দরজাটি বাইরে থেকে বন্ধ। সে জোরে ধাক্কা দিল।
“কে আছেন? দরজাটা খুলুন!”
কেউ উত্তর দিল না।
পিছন থেকে মেঘলার শান্ত গলা ভেসে এল।
“চিৎকার করে লাভ নেই, অর্ক। এই বাড়িতে রাত বারোটার পর কেউ তোমার কথা শুনতে পাবে না।”
“তুমি কী চাও আমার কাছে?”
“একটা উত্তর।”
“কিসের উত্তর?”
“বারো বছর আগে আমার মৃত্যু হয়েছিল। কিন্তু আমার মৃতদেহ কখনও পাওয়া যায়নি। পুলিশ বলেছিল, আমি নদীতে ডুবে মারা গিয়েছি। আমার স্বামী বলেছিল, আমি আত্মহত্যা করেছি। অথচ মৃত্যুর আগের রাতে আমি তাকে একটা চিঠি লিখেছিলাম।”
অর্ক থমকে গেল।
“তোমার স্বামী?”
মেঘলা তার দিকে তাকিয়ে বলল, “হ্যাঁ। আমার স্বামীর নামও অর্ক।”
অর্কের মুখ শুকিয়ে গেল।
“এটা অসম্ভব! আমার নাম অর্ক বসু। তোমার সঙ্গে বিয়ের আগে আমার কোনও বিয়েই হয়নি।”
মেঘলা বিছানার পাশের টেবিল থেকে একটি পুরোনো খাম তুলে দিল।
খামের ওপর লেখা—
‘আমার স্বামী অর্কের জন্য।’
অর্ক কাঁপা হাতে চিঠিটি খুলল।
ভিতরে মাত্র তিনটি লাইন।
‘অর্ক, যদি কোনও দিন আমি ফিরে আসি, আমাকে চিনতে পারবে না। কারণ যে মানুষটি আমাকে হত্যা করেছে, সে আমার মুখ নিয়েই তোমার সামনে ফিরে আসবে। —মধুরিমা।’
চিঠিটি পড়ে অর্কের মনে হল, তার মাথার ভিতরে যেন কেউ হাতুড়ি মারছে।
ঠিক তখনই ঘরের কোণে রাখা পুরোনো টেলিফোনটি বেজে উঠল।
এই বাড়িতে ঢোকার পর থেকে সে ফোনটি লক্ষ করেছিল। ধুলোমাখা কালো টেলিফোন। তারে জং ধরেছে, রিসিভারের গায়ে ফাটল। অথচ সেটি অবিরাম বেজে চলেছে।
মেঘলা ফোনটির দিকে তাকিয়ে বলল, “ওটা ধরো না।”
“কেন?”
“ওপাশে যে কথা বলবে, সে জীবিত নয়।”
ফোন থামল না।
অর্ক আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সে রিসিভার তুলে কানে দিল।
ওপাশ থেকে একটি পুরুষকণ্ঠ ভেসে এল।
“অর্ক, তুমি কি বিয়ে করে ফেলেছ?”
“কে বলছেন?”
“আমি তোমার বাবা।”
অর্কের হাত থেকে রিসিভার প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।
তার বাবা মারা গিয়েছেন তিন বছর আগে। হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালেই তাঁর মৃত্যু হয়েছিল। অর্ক নিজে শেষকৃত্য সম্পন্ন করেছিল।
ওপাশের কণ্ঠ আবার বলল, “মেয়েটিকে ঘর থেকে বেরোতে দিও না। ও তোমাকে বিয়ে করতে আসেনি। ও এসেছে নিজের হত্যাকারীকে খুঁজতে।”
অর্ক কাঁপা গলায় বলল, “কিন্তু হত্যাকারী কে?”
কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর উত্তর এল—
“তুমি।”
ফোনের সংযোগ কেটে গেল।
অর্ক ধীরে ধীরে পিছন ফিরে তাকাল।
মেঘলা তখন আর বিছানায় বসে নেই। সে দাঁড়িয়ে আছে দেওয়ালের ছবিটির সামনে। তার লাল বেনারসির আঁচল মেঝে ছুঁয়ে রয়েছে। মাথা সামান্য কাত করে সে ছবির দিকে তাকিয়ে আছে।
“তুমি কি সত্যিই আমাকে খুন করেছিলে?” অর্ক প্রশ্ন করল।
মেঘলা উত্তর দিল না।
বরং দেওয়ালে টাঙানো ছবিটি নামিয়ে বিছানার ওপর রাখল। ছবির পিছনে সাদা কাগজের একটি টুকরো আটকানো ছিল। সেটি খুলে অর্কের হাতে দিল।
কাগজে একটি ঠিকানা লেখা।
‘শান্তিনিকেতন রোড, বাড়ি নম্বর ১৭।’
ঠিকানাটি অর্কের অচেনা নয়।
সেই বাড়িতেই সে বড় হয়েছে। ছোটবেলায় তার বাবা-মায়ের সঙ্গে সেখানেই থাকত। বাবার মৃত্যুর পর বাড়িটি তালাবন্ধ করে কলকাতায় চলে আসে। ছয় মাস আগে মেঘলার সঙ্গে পরিচয়ের পর সে বাড়িটি বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।
“এই ঠিকানা তোমার কাছে কেন?” অর্ক জিজ্ঞেস করল।
মেঘলা বলল, “কারণ আমার মৃত্যুর রাতেও আমি ওই বাড়িতে ছিলাম।”
অর্ক এবার আর কোনও কথা বলতে পারল না।
তার মনে পড়ল, বিয়ের আগে মেঘলা একবার তাকে জিজ্ঞেস করেছিল—ছোটবেলায় সে কোনও মেয়েকে চিনত কি না, যে হঠাৎ উধাও হয়ে গিয়েছিল।
সে তখন হেসে বলেছিল, ছোটবেলায় তার বন্ধু ছিল অনেক, কিন্তু কারও কথা বিশেষ মনে নেই।
মেঘলা সেদিন আর কিছু বলেনি।
এবার সে বলল, “তোমার মনে নেই, কারণ তোমাকে ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছিল।”
“কী ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছিল?”
“তোমার বয়স যখন বারো, তখন তুমি একটি মেয়েকে ভালোবাসতে। সেই মেয়েটি তোমার বাড়িতেই থাকত। এক রাতে সে নিখোঁজ হয়ে যায়। পরদিন তোমার বাবা তোমাকে বলেছিলেন, মেয়েটি পালিয়ে গেছে।”
অর্কের মাথায় হঠাৎ ঝাপসা কিছু দৃশ্য ভেসে উঠল।
একটি পুরোনো বাড়ি।
বৃষ্টিভেজা সিঁড়ি।
একটি মেয়ের হাসি।
আর অন্ধকার ঘরে রক্তের মতো লাল কিছু একটা।
সে দু’হাতে মাথা চেপে ধরল।
“থামো! আমি কিছু মনে করতে পারছি না!”
মেঘলা তার কাছে এগিয়ে এল। তার চোখে এবার আর রাগ নেই, আছে গভীর দুঃখ।
“তোমার বয়স তখন বারো। তুমি কিছু করোনি, অর্ক। কিন্তু তুমি যা দেখেছিলে, সেই সত্যিটা তোমার বাবা সারাজীবন লুকিয়ে রেখেছিলেন।”
“তাহলে তুমি কে? তুমি কি আমার ছোটবেলার সেই মেয়ে?”
মেঘলা ঠোঁট খুলল, কিন্তু কোনও শব্দ বেরোল না।
তার বদলে ঘরের ঘড়িটি হঠাৎ বারোটা বাজিয়ে উঠল।
প্রথম ঘণ্টা।
দ্বিতীয় ঘণ্টা।
তৃতীয় ঘণ্টা।
বারোটি ঘণ্টা শেষ হতেই দরজায় তিনবার টোকা পড়ল।
ঠক। ঠক। ঠক।
বাইরে থেকে একটি বৃদ্ধার গলা শোনা গেল।
“বাবু, দরজা খোলো। তোমার মা এসেছেন।”
অর্কের শরীর অবশ হয়ে গেল।
তার মা এখনও জীবিত। তিনি কলকাতার বাড়িতে রয়েছেন। বিয়ের অনুষ্ঠানে অসুস্থতার কারণে আসতে পারেননি।
“কে?” অর্ক দরজার দিকে তাকিয়ে চিৎকার করল।
বাইরের বৃদ্ধা উত্তর দিলেন, “আমি এই বাড়ির পুরোনো পরিচারিকা, সরলা। তোমার মায়ের সঙ্গে এসেছি। তাড়াতাড়ি দরজা খোলো। মেয়েটাকে ঘরে একা রেখো না।”
অর্ক দরজার দিকে এগোতে যাচ্ছিল, এমন সময় মেঘলা তার হাত চেপে ধরল।
“খুলবে না!”
“কেন?”
মেঘলার চোখে আতঙ্ক।
“সরলা মারা গিয়েছিল ২০১৪ সালের ১৭ নভেম্বর। আমার মৃত্যুর রাতেই।”
দরজার ওপাশে আবার সেই কণ্ঠ ভেসে এল।
“অর্ক, ওর কথা শুনো না। ও তোমাকে সত্যি বলছে না। দরজা খোলো। তোমার মা অপেক্ষা করছেন।”
অর্ক পিছিয়ে এল।
ঠিক তখনই দরজার নীচের ফাঁক দিয়ে একটি সাদা খাম ভিতরে ঢুকে পড়ল।
খামের ওপর অর্কের নাম লেখা।
সে খাম খুলতেই একটি পুরোনো ছবি বেরিয়ে এল।
ছবিতে তিনজন মানুষ—তার বাবা, বারো বছরের অর্ক এবং একটি কিশোরী মেয়ে। মেয়েটির মুখ মেঘলার মতোই।
ছবির পিছনে লেখা—
‘মধুরিমা সেনের সঙ্গে শেষ পারিবারিক ছবি। ১৭ নভেম্বর, ২০১৪।’
অর্ক ছবিটি হাতে নিয়ে কাঁপতে লাগল।
তার বাবা, যে তিন বছর আগে মারা গেছেন বলে সে জানে, ছবিতে তার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। কিন্তু সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার ছবির তারিখ নয়।
ছবিতে বারো বছরের অর্কের হাতে একটি ছুরি।
আর মেয়েটির সাদা পোশাকে রক্তের দাগ।
হঠাৎ তার মাথার ভিতরে একটা স্মৃতি বিস্ফোরণের মতো ফিরে এল।
সেই রাতে সে সত্যিই একটি ঘরে ঢুকেছিল। মেয়েটি মেঝেতে পড়ে ছিল। তার বাবা অর্কের হাত থেকে ছুরিটি কেড়ে নিয়ে বলেছিলেন—
‘তুমি কিছু দেখোনি। তুমি কিছু করোনি। আজ রাতের কথা কোনও দিন মনে করবে না।’
অর্ক হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল।
দরজার ওপাশ থেকে বৃদ্ধার কণ্ঠ এবার ফিসফিস করে বলল—
“মনে পড়েছে, বাবু?”
তারপর দরজার নীচ দিয়ে আরেকটি কাগজ ভিতরে এল।
তাতে লেখা ছিল—
‘তুমি যাকে বিয়ে করেছ, সে মধুরিমা নয়।’
অর্ক মাথা তুলে তাকাল।
মেঘলা তখন ধীরে ধীরে তার মুখের ঘোমটা সরাচ্ছে।
তার মুখে আর মধুরিমার মতো কোনও হাসি নেই। চোখের নীচে কালচে দাগ, ঠোঁট ফ্যাকাশে। কপালের সিঁদুরের রেখা থেকে সরু লাল তরল গড়িয়ে পড়ছে।
সে অর্কের দিকে তাকিয়ে বলল—
“এবার সত্যিটা জানার সময় হয়েছে।”
“কী সত্যি?”
মেঘলা তার কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করল—
“মধুরিমা বারো বছর আগে মারা যায়নি। সে এখনও বেঁচে আছে।”
অর্কের বুকের ভিতরটা ধক করে উঠল।
“তাহলে তুমি কে?”
মেঘলা চোখ বন্ধ করল।
তারপর বলল—
“আমি সেই মেয়ে, যাকে তোমার বাবা সেদিন মেরে ফেলেছিলেন। আর আমি তোমার কাছে এসেছি তোমাকে একটা কথা জানাতে।”
“কী কথা?”
মেঘলা চোখ খুলল।
“তোমার বাবা মারা যাননি, অর্ক। তাঁর মৃত্যুর খবরটাও মিথ্যে।”
ঠিক তখনই ঘরের আলো নিভে গেল।
অন্ধকারে অর্ক অনুভব করল, কেউ তার কানের কাছে নিঃশ্বাস ফেলছে।
একটি পরিচিত পুরুষকণ্ঠ বলল—
“বাবা, তোমার বিয়ে হয়ে গেছে? এবার আমার সঙ্গে বাড়ি চলো।”
সেই কণ্ঠ তার বাবার।
আর পরের মুহূর্তে, অন্ধকারের মধ্যে অর্কের হাত কেউ শক্ত করে চেপে ধরল।
সেই হাতটি বরফের মতো ঠান্ডা।
প্রথম পর্ব শেষ।