Categories
উপন্যাস বিবিধ

যে স্ত্রীকে আমি বিয়ে করেছিলাম, সে বারো বছর আগেই মারা গিয়েছিল(দ্বিতীয় পর্ব: বন্ধ বাড়ির ভিতরে যে মানুষটি বেঁচে ছিল)।

অন্ধকারে অর্কের হাতটা কেউ শক্ত করে ধরে রেখেছিল।

হাতটা বরফের মতো ঠান্ডা। আঙুলগুলো অস্বাভাবিক লম্বা। অর্ক হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করতেই সেই পরিচিত পুরুষকণ্ঠ আবার ফিসফিস করে উঠল—

“ভয় পাস না, বাবা। আমি তোকে নিতে এসেছি।”

“বাবা?”

অর্কের গলা শুকিয়ে গেল।

“তুমি সত্যিই আমার বাবা?”

অন্ধকারের মধ্যে একটা চাপা হাসি শোনা গেল।

“তুই কি নিজের বাবাকেও চিনতে পারছিস না?”

ঠিক সেই মুহূর্তে জানলার বাইরে বিদ্যুৎ চমকাল। এক মুহূর্তের জন্য ঘরটা আলোকিত হয়ে উঠল।

অর্ক দেখল, তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক বৃদ্ধ।

পরনে সাদা পাঞ্জাবি, চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা, মাথার সামনের চুল প্রায় সাদা হয়ে গেছে। মুখটা অবিকল তার বাবার—অমলেন্দু বসুর।

কিন্তু অর্ক নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিল না।

তিন বছর আগে হাসপাতালের বিছানায় বাবার নিথর শরীর সে নিজে দেখেছে। শ্মশানে বাবার শেষকৃত্যও করেছে। তাহলে এই মানুষটি কে?

“তুমি মারা গিয়েছিলে!” অর্ক চিৎকার করে উঠল।

বৃদ্ধ শান্ত গলায় বললেন, “তুই যা দেখেছিলি, সেটা আমার মৃত্যু ছিল না। একটা নাটক ছিল।”

“কেন?”

“কারণ কিছু সত্যি জীবিত মানুষের চেয়ে মৃত মানুষের কাছেই নিরাপদ থাকে।”

অর্ক উত্তর দেওয়ার আগেই ঘরের আলো জ্বলে উঠল। মেঘলা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে। তার হাতে একটা পুরোনো রিভলভার।

“আর এক পা এগোবেন না, অমলেন্দুবাবু।”

বৃদ্ধের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।

“তুমি এখনও বেঁচে আছ, মধুরিমা?”

মেঘলা ঠান্ডা গলায় বলল, “আপনারা সবাই আমাকে মৃত ভেবেছিলেন। কিন্তু ভুল করেছিলেন।”

অর্ক এবার দু’জনের দিকে তাকিয়ে বলল, “এক মিনিট! তোমরা দু’জনেই নিজেদের পরিচয় দিচ্ছ, কিন্তু কেউ আমাকে সত্যিটা বলছ না। মেঘলা, তুমি বলেছিলে তুমি মধুরিমা নও। আবার বাবা তোমাকে মধুরিমা বলে ডাকছেন। আসলে তুমি কে?”

মেঘলা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর বলল, “আমার নাম মেঘলা নয়। আমার আসল নাম মধুরিমা সেন। বারো বছর আগে তোমার বাড়িতে যে মেয়েটি মারা গিয়েছিল, সে আমার ছোট বোন—মাধবী।”

অর্কের চোখ বিস্ফারিত হয়ে গেল।

“তোমার ছোট বোন?”

“হ্যাঁ। আমরা দুই বোন ছিলাম। আমাদের মুখ এতটাই এক ছিল যে, ছোটবেলায় সবাই আমাদের যমজ বলে ভুল করত। কিন্তু আমরা যমজ ছিলাম না। আমার থেকে মাধবী তিন বছরের ছোট।”

অমলেন্দু হঠাৎ গর্জে উঠলেন, “মিথ্যে বলছ!”

মধুরিমা তাঁর দিকে রিভলভার তাক করল।

“বারো বছর ধরে আপনি মিথ্যে বলেছেন। এবার আমার কথা শুনুন।”

সে অর্কের দিকে ফিরে বলতে শুরু করল।

বারো বছর আগে মধুরিমা অমলেন্দু বসুর বাড়িতে থাকত। তার বাবা-মা একটি দুর্ঘটনায় মারা যাওয়ার পর অমলেন্দু তাদের দু’বোনকে আশ্রয় দিয়েছিলেন। মধুরিমা তখন কলেজে পড়ত, আর মাধবী স্কুলে।

অর্কের বয়স ছিল বারো। মধুরিমা তাকে পড়াত। অর্ক তাকে নিজের দিদির মতো ভালোবাসত। মাধবীর সঙ্গে অর্কের বন্ধুত্ব ছিল আরও গভীর। তারা একসঙ্গে খেলত, গল্পের বই পড়ত, আর ভবিষ্যতে বড় হয়ে কোথায় বেড়াতে যাবে, তার পরিকল্পনা করত।

কিন্তু অমলেন্দুর বাড়িতে এমন কিছু ঘটছিল, যা দুই বোনের কেউই জানত না।

অমলেন্দু গোপনে মানুষের পরিচয় বদলানোর একটি চক্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। মৃত মানুষের নথি ব্যবহার করে অন্য মানুষের নতুন পরিচয় তৈরি করা, সম্পত্তির মালিকানা বদলানো এবং নিখোঁজ মানুষকে কাগজে মৃত দেখানো ছিল সেই চক্রের কাজ।

মধুরিমা ঘটনাচক্রে কিছু নথি খুঁজে পেয়েছিল। সে পুলিশকে জানাতে চেয়েছিল। কিন্তু অমলেন্দু বুঝতে পেরে তাকে আটকানোর চেষ্টা করেন।

২০১৪ সালের ১৭ নভেম্বর রাতে মধুরিমা পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিল। মাধবী তাকে সাহায্য করতে গিয়ে ধরা পড়ে।

সেই রাতে বাড়ির পিছনের ঘরে দু’জনের মধ্যে ধস্তাধস্তি হয়। অমলেন্দু মাধবীকে আঘাত করেন। অর্ক ঘটনাস্থলে পৌঁছে যায়। আতঙ্কে অমলেন্দু তার হাতে একটি ছুরি ধরিয়ে দেন এবং বলেন, মাধবীকে অর্কই আঘাত করেছে।

“কিন্তু আমি তো কিছুই মনে করতে পারছি না,” অর্ক অসহায়ভাবে বলল।

“তোমাকে ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছিল,” মধুরিমা বলল। “তোমার বাবা তোমাকে এমন ওষুধ খাইয়েছিলেন, যাতে সেই রাতের স্মৃতি ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়। পরে তোমাকে বলা হয়েছিল, মাধবী পালিয়ে গেছে।”

“তাহলে তুমি কোথায় ছিলে?”

মধুরিমা উত্তর দেওয়ার আগে অমলেন্দু হেসে উঠলেন।

“তুমি কি ভাবছ, ওর সব কথা সত্যি? ও নিজেকে বাঁচানোর জন্য গল্প বানাচ্ছে!”

মধুরিমা রিভলভারটা আরও শক্ত করে ধরল।

“আপনি বলুন, মাধবীর দেহ কোথায়?”

অমলেন্দু চুপ করে গেলেন।

“আপনি বলুন!” মধুরিমা চিৎকার করল।

বৃদ্ধের মুখের রং বদলে গেল। কয়েক মুহূর্ত পরে তিনি বললেন, “এই বাড়ির ভিতরেই।”

অর্কের পায়ের তলা থেকে যেন মাটি সরে গেল।

“কোথায়?”

অমলেন্দু ধীরে ধীরে দেওয়ালের দিকে তাকালেন।

“যে ঘরে তুই ছোটবেলায় ঘুমাতিস, সেই ঘরের নীচে।”

অর্কের মাথায় আবার সেই পুরোনো স্মৃতিগুলো ফিরে আসতে লাগল। অন্ধকার সিঁড়ি, ভেজা মেঝে, কারও কান্না, আর বাবার গলা—‘কিছু মনে রাখবি না।’

সে দুই হাতে কান চেপে ধরল।

“না! না! আমি কিছু করতে চাইনি!”

মধুরিমা তার কাছে এগিয়ে এল।

“আমি জানি, অর্ক। তুমি শিশু ছিলে। তোমাকে ব্যবহার করা হয়েছিল।”

“তাহলে এত বছর পরে তুমি আমার জীবনে ফিরে এলে কেন?”

মধুরিমা উত্তর দিল না।

অমলেন্দু বললেন, “কারণ ওর আর কোনও উপায় নেই। ও জানে, মাধবীর মৃত্যুর আসল প্রমাণ আমার কাছে আছে। ও সেটা পেতে চায়।”

“প্রমাণটা কোথায়?” অর্ক প্রশ্ন করল।

অমলেন্দু মৃদু হাসলেন।

“এই বাড়িতে নয়।”

তিনি পকেট থেকে একটা ছোট চাবি বের করে অর্কের দিকে ছুড়ে দিলেন।

“কলকাতায় আমার পুরোনো অফিসে একটা লোহার আলমারি আছে। এই চাবি দিয়ে খুলবি। ভিতরে তোর সব প্রশ্নের উত্তর পাবি।”

মধুরিমা বাধা দিল, “ওঁর কথা বিশ্বাস কোরো না!”

কিন্তু অর্ক ইতিমধ্যেই চাবিটা তুলে নিয়েছে।

“আমি আর কারও কথা বিশ্বাস করব না। নিজের চোখে সব দেখব।”


পরদিন সকালে অর্ক আর মধুরিমা কলকাতায় পৌঁছল।

অমলেন্দু কোথায় গেলেন, তা কেউ জানত না। রাতের অন্ধকারে তিনি অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিলেন। বাড়ির দরজা খোলা ছিল, কিন্তু বাইরে কোনও পায়ের ছাপ পাওয়া যায়নি।

কলকাতার পুরোনো অফিসটি ছিল উত্তর শহরের এক সরু গলিতে। বহু বছর ধরে সেখানে কেউ আসেনি। দরজার তালা খুলতেই ধুলো আর স্যাঁতসেঁতে গন্ধে ঘর ভরে গেল।

অর্ক লোহার আলমারিটি খুঁজে পেল টেবিলের পিছনে।

চাবি ঘোরাতেই দরজা খুলে গেল।

ভিতরে ফাইল, পুরোনো ছবি, কয়েকটি পাসপোর্ট এবং একটি কালো ডায়েরি।

ডায়েরির প্রথম পাতায় লেখা—

‘যাদের মৃত্যু কাগজে লেখা হয়, তারা সব সময় পৃথিবী থেকে হারিয়ে যায় না।’

অর্ক পাতা উল্টাতে লাগল। একের পর এক নাম, তারিখ, মৃত্যুর নথি। কিছু নামের পাশে লেখা ‘নতুন পরিচয়’, কিছু নামের পাশে ‘স্থায়ীভাবে সরানো হয়েছে’।

তারপর একটি পাতায় সে নিজের নাম দেখতে পেল।

‘অর্ক বসু। পরিচয় পরিবর্তনের সম্ভাব্য প্রার্থী। স্মৃতি নিয়ন্ত্রণের পরীক্ষা সম্পন্ন।’

অর্কের হাত কেঁপে উঠল।

“আমার নাম এখানে কেন?”

মধুরিমা ডায়েরিটা নিয়ে পড়ল। তারপর তার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

“অর্ক, তোমার বাবা শুধু মানুষের পরিচয় বদলানোর চক্রে যুক্ত ছিলেন না। তিনি তোমার পরিচয়ও বদলানোর পরিকল্পনা করেছিলেন।”

“কিন্তু কেন?”

“কারণ তুমি সেই রাতের একমাত্র জীবিত সাক্ষী ছিলে।”

অর্ক দ্রুত পাতা উল্টে শেষের দিকে গেল। সেখানে একটি পুরোনো ছবি আটকে ছিল। ছবিতে অমলেন্দু, এক অচেনা ডাক্তার এবং একটি ছোট ছেলে।

ছেলেটির মুখ অর্কের মতো।

কিন্তু ছবির পিছনে লেখা—

‘রোগী নম্বর ১৭। নতুন নাম: অর্ক বসু। পুরোনো পরিচয়: অজ্ঞাত।’

অর্ক ছবিটা মেঝেতে ফেলে দিল।

“এটা কীসের ছবি? আমি তো অমলেন্দুর ছেলে!”

মধুরিমা ধীরে ধীরে বলল, “তোমাকে তিনি নিজের ছেলে বলে পরিচয় দিয়েছিলেন। কিন্তু তোমার জন্মের কোনও নথি আমরা কখনও পাইনি।”

অর্ক যেন কথা বলার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলল।

তার সমস্ত জীবন—শৈশব, বাবা-মা, স্কুল, পরিচয়—সবকিছুই কি মিথ্যে?

ঠিক তখনই অফিসের পুরোনো কম্পিউটারটি নিজে থেকেই চালু হয়ে গেল।

পর্দায় একটি ভিডিও ফুটে উঠল।

ভিডিওতে অমলেন্দু বসু বসে আছেন। তাঁর মুখ ক্লান্ত, চোখ লাল। তিনি সরাসরি ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে বলছেন—

“অর্ক, যদি এই ভিডিও দেখিস, তার মানে আমি আর তোকে আটকাতে পারিনি। তোর জীবনের সবচেয়ে বড় সত্যিটা আমি এত বছর লুকিয়ে রেখেছি। তুই আমার ছেলে নোস।”

অর্কের নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে এল।

ভিডিওতে অমলেন্দু আবার বললেন—

“তুই সেই ছেলেটি, যাকে ২০১৪ সালের ১৭ নভেম্বর রাতে আমরা এই বাড়িতে নিয়ে এসেছিলাম। মাধবী মারা যাওয়ার পর তুই সব দেখেছিলি। কিন্তু তুই আসলে কে, তা জানলে তোর নিজের অস্তিত্বই বদলে যাবে।”

তারপর অমলেন্দু একটু থামলেন।

“তোর আসল নাম অর্ক নয়।”

পর্দা অন্ধকার হয়ে গেল।

কয়েক সেকেন্ড পর নতুন একটি লাইন ফুটে উঠল—

‘আসল নাম জানতে চাইলে ১৭ নম্বর ঘরে ফিরে যাও।’

অর্ক আর মধুরিমা পরস্পরের দিকে তাকাল।

“১৭ নম্বর ঘর কোথায়?” অর্ক জিজ্ঞেস করল।

মধুরিমা ফিসফিস করে বলল, “যে বাড়িতে তোমাকে বড় করা হয়েছিল, সেই বাড়ির নীচে একটা গোপন ঘর আছে। বারো বছর ধরে আমি সেটাই খুঁজছি।”

অর্ক ডায়েরি, ছবিটি এবং চাবি তুলে নিল।

তারা আবার সেই পুরোনো বাড়িতে ফিরে গেল।

সন্ধ্যা নামার পর মধুরিমা অর্ককে নিয়ে তার শৈশবের ঘরে ঢুকল। ঘরের মেঝেতে কাঠের পুরোনো পাটাতন। এক কোণে ছোট্ট একটি লোহার আংটা দেখা যাচ্ছে।

অর্ক আংটাটা টেনে তুলতেই মেঝের একটা অংশ সরে গেল।

নীচে নামার সরু সিঁড়ি।

দু’জন মোবাইলের আলো জ্বেলে নীচে নামল।

সিঁড়ির শেষে একটা ছোট ঘর। দেওয়ালে অসংখ্য ছবি টাঙানো। সব ছবিতে একই ছেলের মুখ, কিন্তু আলাদা আলাদা নাম।

কোথাও লেখা ‘অর্ক’।

কোথাও ‘রাহুল’।

কোথাও ‘সায়ন’।

আর একেবারে শেষ ছবিতে লেখা—

‘মাধবী সেন। জন্ম: ২০০১। মৃত্যু: ২০১৪।’

ছবিতে একটি কিশোরী মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

অর্ক ছবিটির দিকে তাকিয়ে পাথরের মতো স্থির হয়ে গেল।

কারণ ছবির মেয়েটির মুখ মধুরিমার মতো নয়।

তার মুখ অবিকল অর্কের।

মধুরিমা পিছিয়ে গেল।

“এটা কী করে সম্ভব?”

ঘরের এক কোণে রাখা পুরোনো টেপ রেকর্ডারটি হঠাৎ চালু হয়ে গেল।

একটি মেয়ের কণ্ঠ শোনা গেল—

“দিদি, যদি কোনও দিন তুমি এই ঘরে ফিরে আসো, তবে জেনে রেখো, অর্ক বলে যে ছেলেটিকে সবাই চেনে, সে আসলে ছেলে নয়।”

মধুরিমার মুখ থেকে রক্ত সরে গেল।

কণ্ঠটি আবার বলল—

“সে মাধবী। তোমার ছোট বোন।”

অর্কের হাতে ধরা টর্চ মেঝেতে পড়ে গেল।

দেওয়ালে টাঙানো সমস্ত ছবির নীচে একই তারিখ লেখা—১৭ নভেম্বর, ২০১৪।

আর ঘরের একেবারে শেষ প্রান্তে, অন্ধকারের ভিতর থেকে কেউ ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছিল।

তার হাতে একটি ছুরি।

মুখটা অর্কের মতো।

কিন্তু তার ঠোঁটে হাসি।

“অবশেষে,” অন্ধকারের মানুষটি বলল, “আমার আসল নামটা সবাই মনে করতে পেরেছে।”

দ্বিতীয় পর্ব শেষ।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *