ভূমিকা: এক দৌড়, যা বদলে দিয়েছিল ভারতের স্বপ্ন
ক্রীড়াজগতে কিছু মুহূর্ত থাকে, যা শুধু একটি প্রতিযোগিতার ফলাফল হয়ে থাকে না; হয়ে ওঠে গোটা দেশের আত্মবিশ্বাসের প্রতীক। ২০১৮ সালের জুলাই মাসে ফিনল্যান্ডের তাম্পেরেতে বিশ্ব অনূর্ধ্ব-২০ অ্যাথলেটিক্স চ্যাম্পিয়নশিপে ৪০০ মিটার দৌড়ে সোনা জিতে এমনই এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত সৃষ্টি করেছিলেন ভারতের তরুণী অ্যাথলিট হিমা দাস। তিনি এই প্রতিযোগিতায় ট্র্যাক ইভেন্টে বিশ্ব অনূর্ধ্ব-২০ পর্যায়ে সোনা জয়ী প্রথম ভারতীয় অ্যাথলিট হিসেবে ইতিহাস গড়েন।
তাঁর এই সাফল্য ছিল দীর্ঘ অনুশীলন, আত্মবিশ্বাস, কঠোর পরিশ্রম এবং প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াইয়ের ফল। অসমের এক কৃষক পরিবারের মেয়ে থেকে আন্তর্জাতিক অ্যাথলেটিক্সের মঞ্চে পৌঁছনোর যাত্রা তাঁকে দেশের অসংখ্য তরুণ-তরুণীর কাছে অনুপ্রেরণার প্রতীকে পরিণত করে।
হিমা দাসের গল্প আমাদের শেখায়, বড় স্বপ্ন দেখার জন্য বড় শহরে জন্মানো বা প্রথম থেকেই সব সুযোগ পাওয়া জরুরি নয়। প্রয়োজন নিজের প্রতিভাকে চিনতে পারা, সেই প্রতিভাকে গড়ে তোলার সুযোগ খুঁজে নেওয়া এবং লক্ষ্য অর্জনের জন্য ধারাবাহিকভাবে পরিশ্রম করে যাওয়া।
অসমের গ্রাম থেকে উঠে আসা এক প্রতিভা
হিমা দাসের জন্ম ২০০০ সালের ৯ জানুয়ারি, অসমের নগাঁও জেলার কান্দুলিমারি গ্রামে। তাঁর পরিবার কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত ছিল। ছোটবেলা থেকেই তিনি গ্রামীণ পরিবেশে বড় হয়ে ওঠেন। পরিবারের জীবনযাত্রা ছিল সাধারণ, আর খেলাধুলার জন্য আন্তর্জাতিক মানের সুযোগ-সুবিধা পাওয়া সহজ ছিল না।
অসমের প্রাকৃতিক পরিবেশ, গ্রামের খোলা মাঠ এবং সাধারণ জীবনযাত্রার মধ্যেই তাঁর বেড়ে ওঠা। শৈশবে তিনি ফুটবল খেলতেও আগ্রহী ছিলেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দৌড়ের প্রতি তাঁর দক্ষতা ও আগ্রহ স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
গ্রামের মেয়েদের পক্ষে আন্তর্জাতিক ক্রীড়াবিদ হয়ে ওঠার পথ যে কতটা কঠিন, তা সহজেই অনুমান করা যায়। প্রশিক্ষণের উপযুক্ত পরিকাঠামো, উন্নত সরঞ্জাম, অভিজ্ঞ কোচ এবং নিয়মিত প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সুযোগ—এসবই একজন অ্যাথলিটের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ। হিমার ক্ষেত্রেও এই সুযোগগুলি একদিনে তৈরি হয়নি।
তাঁর পরিবারের সমর্থন এবং নিজের পরিশ্রম তাঁকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে। ধীরে ধীরে তাঁর প্রতিভা প্রশিক্ষকদের নজরে আসে এবং শুরু হয় পেশাদার অ্যাথলিট হয়ে ওঠার প্রস্তুতি।
দৌড়ের প্রতি আকর্ষণ ও প্রশিক্ষণের শুরু
হিমা দাসের ক্রীড়াজীবনের গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসে যখন তাঁর দৌড়ের দক্ষতাকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা শুরু হয়। স্কুল ও স্থানীয় পর্যায়ে খেলাধুলার অভিজ্ঞতা তাঁকে নিজের সামর্থ্য সম্পর্কে সচেতন করে তোলে।
পরবর্তী সময়ে তিনি প্রশিক্ষণের সুযোগ পান এবং অ্যাথলেটিক্সের নির্দিষ্ট নিয়ম ও কৌশল শিখতে শুরু করেন। একজন স্প্রিন্টার বা স্বল্প ও মধ্যদূরত্বের দৌড়বিদের জন্য শুধু দ্রুত দৌড়ানোই যথেষ্ট নয়। দৌড়ের শুরু, শরীরের ভারসাম্য, পায়ের গতি, শ্বাসপ্রশ্বাসের নিয়ন্ত্রণ এবং শেষ পর্যায়ে গতি ধরে রাখার দক্ষতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে ৪০০ মিটার দৌড়কে অনেক সময় অ্যাথলেটিক্সের অন্যতম কঠিন ইভেন্ট হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই দৌড়ে গতি ও সহনশীলতার মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হয়। শুরুতে অতিরিক্ত শক্তি খরচ করলে শেষ দিকে গতি কমে যেতে পারে, আবার শুরুতে খুব ধীরে দৌড়ালেও প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে।
হিমাকে এই সূক্ষ্ম বিষয়গুলি আয়ত্ত করতে হয়েছিল। নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে তিনি নিজের দৌড়ের কৌশল উন্নত করেন। তাঁর যাত্রা প্রমাণ করে, প্রতিভা সাফল্যের সম্ভাবনা তৈরি করে, কিন্তু সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রয়োজন সঠিক প্রশিক্ষণ ও অধ্যবসায়।
২০১৮ সালের বিশ্ব অনূর্ধ্ব-২০ চ্যাম্পিয়নশিপ: ঐতিহাসিক সোনা
হিমা দাসের ক্রীড়াজীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্ত আসে ২০১৮ সালে। ফিনল্যান্ডের তাম্পেরেতে অনুষ্ঠিত বিশ্ব অনূর্ধ্ব-২০ অ্যাথলেটিক্স চ্যাম্পিয়নশিপে তিনি মহিলাদের ৪০০ মিটার দৌড়ে অংশ নেন।
১৯ জুলাই ২০১৮-তে অনুষ্ঠিত ফাইনালে হিমা ৫১.৪৬ সেকেন্ড সময় নিয়ে প্রথম স্থান অর্জন করেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি বিশ্ব অনূর্ধ্ব-২০ অ্যাথলেটিক্স চ্যাম্পিয়নশিপের ট্র্যাক ইভেন্টে সোনা জয়ী প্রথম ভারতীয় অ্যাথলিট হন।
এই সাফল্য ভারতীয় অ্যাথলেটিক্সের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ট্র্যাক ইভেন্টে ভারতের সাফল্য নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে যে প্রত্যাশা ও সীমাবদ্ধতা ছিল, হিমার জয় সেই আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করে।
তাঁর সাফল্যের তাৎপর্য শুধু পদকের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। ভারতের বহু তরুণ অ্যাথলিট বুঝতে পারেন, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিযোগিতা করে সাফল্য অর্জন করা সম্ভব। বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে উঠে আসা খেলোয়াড়দের কাছে হিমার জয় ছিল আত্মবিশ্বাসের এক বড় উৎস।
সেই মুহূর্তে তিনি শুধু অসমের প্রতিনিধি ছিলেন না; হয়ে উঠেছিলেন দেশের তরুণ প্রজন্মের আশা ও সম্ভাবনার প্রতীক।
সাফল্যের পরও থেমে না থাকা
বিশ্ব অনূর্ধ্ব-২০ পর্যায়ে সোনা জয়ের পর হিমা দাসের পরিচিতি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। সংবাদমাধ্যম, ক্রীড়াপ্রেমী এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে তাঁকে নিয়ে আগ্রহ বাড়ে। কিন্তু একজন অ্যাথলিটের কাছে একটি বড় সাফল্য মানেই যাত্রার সমাপ্তি নয়; বরং শুরু হয় আরও কঠিন চ্যালেঞ্জ।
যে খেলোয়াড় একবার আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজের দক্ষতা প্রমাণ করেছেন, তাঁর উপর প্রত্যাশাও বেড়ে যায়। পরবর্তী প্রতিযোগিতায় আগের সাফল্য ধরে রাখা, নিজের সময় উন্নত করা এবং শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বীদের মোকাবিলা করা সহজ নয়।
হিমার ক্ষেত্রেও এই বাস্তবতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের পাশাপাশি তাঁকে নিয়মিত প্রশিক্ষণ, শারীরিক সক্ষমতা এবং প্রতিযোগিতার চাপ সামলানোর দিকে মনোযোগ দিতে হয়।
ক্রীড়াজীবনে ধারাবাহিকতা অর্জন করা কঠিন, কারণ প্রতিটি প্রতিযোগিতার পরিবেশ, আবহাওয়া, প্রতিদ্বন্দ্বী এবং শারীরিক অবস্থার মধ্যে পার্থক্য থাকে। একটি নির্দিষ্ট দিনে সেরা পারফরম্যান্স করা এবং বছরের পর বছর সেই মান বজায় রাখা দুটি আলাদা চ্যালেঞ্জ।
হিমার জীবন তাই আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সাফল্যকে সম্মান করার পাশাপাশি একজন খেলোয়াড়ের দীর্ঘমেয়াদি পরিশ্রমকেও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
২০১৮ সালে একাধিক আন্তর্জাতিক সাফল্য
২০১৮ সাল হিমা দাসের জন্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ছিল। বিশ্ব অনূর্ধ্ব-২০ চ্যাম্পিয়নশিপে সোনা জয়ের পর তিনি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নেন এবং নিজের দক্ষতার পরিচয় দেন।
একই বছরের এশিয়ান গেমসে তিনি মহিলাদের ৪০০ মিটার দৌড়ে রুপোর পদক অর্জন করেন। এছাড়া ভারতের মিশ্র ৪×৪০০ মিটার রিলে দলের সদস্য হিসেবেও তিনি রুপোর পদক জেতেন।
এই অর্জনগুলি দেখায়, তাঁর সাফল্য কেবল একটি প্রতিযোগিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। বিভিন্ন ধরনের আন্তর্জাতিক মঞ্চে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তিনি নিজের সামর্থ্য তুলে ধরেন।
রিলে প্রতিযোগিতায় ব্যক্তিগত গতির পাশাপাশি দলগত সমন্বয়ও গুরুত্বপূর্ণ। প্রত্যেক অ্যাথলিটকে নিজের দৌড়ের পাশাপাশি ব্যাটন হস্তান্তরের সময় এবং দলের সামগ্রিক কৌশলের সঙ্গে মানিয়ে চলতে হয়। তাই রিলে পদক দলের সম্মিলিত প্রস্তুতি ও পারফরম্যান্সেরও প্রতিফলন।
হিমার এই সাফল্য ভারতীয় অ্যাথলেটিক্সে তাঁর গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দেয়। তবে তাঁর অর্জনকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে হলে প্রতিযোগিতার ধরন ও স্তরের পার্থক্য মনে রাখা জরুরি। বিশ্ব অনূর্ধ্ব-২০ চ্যাম্পিয়নশিপের সোনা ছিল তাঁর ঐতিহাসিক অর্জন; এশিয়ান গেমসের পদকগুলি ছিল আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সাফল্য।
‘ধিং এক্সপ্রেস’: পরিচয়ের নতুন অধ্যায়
হিমা দাসকে অনেক সময় ‘ধিং এক্সপ্রেস’ নামে উল্লেখ করা হয়। অসমের ধিং অঞ্চলের সঙ্গে তাঁর পরিচিতির সম্পর্ক থেকেই এই নামটি জনপ্রিয়তা পায়।
এই উপাধি তাঁর দ্রুতগতির দৌড়ের সঙ্গে যুক্ত হলেও এর মধ্যে রয়েছে আঞ্চলিক গর্বের অনুভূতিও। অসমের একজন তরুণী আন্তর্জাতিক অ্যাথলেটিক্সে সাফল্য অর্জন করায় রাজ্যের বহু মানুষ তাঁর কৃতিত্বকে নিজেদের গর্বের অংশ হিসেবে দেখেন।
ভারতের ক্রীড়াজগতে বিভিন্ন অ্যাথলিট তাঁদের সাফল্যের মাধ্যমে নির্দিষ্ট অঞ্চল বা সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে অনুপ্রেরণার প্রতীক হয়ে ওঠেন। হিমার ক্ষেত্রেও সেই বিষয়টি স্পষ্ট। তাঁর সাফল্য অসমের ক্রীড়াপ্রেমীদের মধ্যে নতুন উৎসাহ সৃষ্টি করে এবং তরুণ প্রজন্মকে খেলাধুলার দিকে আগ্রহী করে তুলতে সাহায্য করে।
তবে কোনও খেলোয়াড়কে শুধু তাঁর অঞ্চল বা পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। হিমার প্রকৃত পরিচয় তাঁর ক্রীড়া-অর্জন, অধ্যবসায় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করার ক্ষমতার মধ্যেই নিহিত।
সাফল্যের আড়ালে কঠোর পরিশ্রম
দর্শকেরা সাধারণত দৌড়ের শেষ কয়েকটি মুহূর্ত দেখেন—ফিনিশিং লাইন অতিক্রম করা, পদক জয় এবং আনন্দের উদ্যাপন। কিন্তু সেই মুহূর্তের পিছনে থাকে দীর্ঘ প্রস্তুতি।
অ্যাথলেটিক্সে প্রতিদিনের প্রশিক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শরীরের শক্তি বাড়ানো, দৌড়ের গতি উন্নত করা, সহনশীলতা বৃদ্ধি এবং পেশির পুনরুদ্ধারের দিকে নজর দিতে হয়। প্রশিক্ষণের পাশাপাশি পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও পুষ্টিও একজন অ্যাথলিটের পারফরম্যান্সে প্রভাব ফেলে।
একজন খেলোয়াড়কে নিজের শরীরের সীমাবদ্ধতা বুঝতে হয়। অতিরিক্ত অনুশীলন যেমন ক্ষতির কারণ হতে পারে, তেমনই পর্যাপ্ত প্রস্তুতি না থাকলে প্রতিযোগিতায় সেরা ফল পাওয়া কঠিন। তাই প্রশিক্ষক ও ক্রীড়াবিদের মধ্যে সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
হিমা দাসের সাফল্য আমাদের সামনে এই বৃহত্তর বাস্তবতাটি তুলে ধরে। প্রতিভা তাঁকে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ দিয়েছিল, কিন্তু সেই সুযোগকে ঐতিহাসিক অর্জনে রূপান্তরিত করতে তাঁকে নিয়মিত পরিশ্রম করতে হয়েছে।
চ্যালেঞ্জ, প্রত্যাশা ও ক্রীড়াজীবনের বাস্তবতা
একজন ক্রীড়াবিদের জীবন সব সময় সাফল্যের সরল রেখায় এগোয় না। প্রতিযোগিতায় ফল প্রত্যাশামতো না হওয়া, শারীরিক সমস্যা, প্রশিক্ষণের পরিবর্তন এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতার চাপ—এসবই খেলাধুলার স্বাভাবিক অংশ।
হিমা দাসের ক্রীড়াজীবন নিয়েও বিভিন্ন সময়ে তাঁর ফর্ম, শারীরিক প্রস্তুতি এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে কোনও খেলোয়াড়ের মূল্যায়ন করার সময় শুধু সাম্প্রতিক ফলাফল দেখা যথেষ্ট নয়। তাঁর দীর্ঘমেয়াদি অর্জন, প্রতিযোগিতার মান এবং ক্রীড়াজীবনের সামগ্রিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করা উচিত।
ক্রীড়াবিদদের ক্ষেত্রেও মানুষের প্রত্যাশা অনেক সময় অতিরিক্ত হয়ে ওঠে। একটি বড় সাফল্যের পর দর্শকেরা প্রতিটি প্রতিযোগিতায় একই ধরনের ফল আশা করেন। কিন্তু বাস্তবে প্রতিটি প্রতিযোগিতার পরিস্থিতি আলাদা এবং প্রতিটি অ্যাথলিটের পারফরম্যান্সেও ওঠানামা থাকতে পারে।
হিমার যাত্রা থেকে শেখার বিষয় হলো, সাফল্যকে উদ্যাপন করতে হবে, আবার কঠিন সময়েও একজন খেলোয়াড়ের পরিশ্রম ও প্রচেষ্টার প্রতি সম্মান বজায় রাখতে হবে।
নারী ক্রীড়াবিদদের জন্য হিমার অনুপ্রেরণা
ভারতে মেয়েদের খেলাধুলায় অংশগ্রহণের সুযোগ আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। তবু বহু অঞ্চলে প্রশিক্ষণকেন্দ্রের অভাব, আর্থিক সীমাবদ্ধতা, নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এবং সামাজিক প্রত্যাশা মেয়েদের ক্রীড়াজীবনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
হিমা দাসের সাফল্য এই বাধাগুলির গুরুত্বকে সামনে নিয়ে আসে। তাঁর জীবন দেখায়, প্রতিভা কোনও নির্দিষ্ট শহর, পরিবার বা আর্থিক অবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। গ্রামীণ অঞ্চল থেকেও আন্তর্জাতিক মানের অ্যাথলিট উঠে আসতে পারেন।
তবে প্রতিভা খুঁজে পাওয়ার পর তাকে বিকশিত করার দায়িত্বও সমাজের। স্কুলে খেলাধুলার সুযোগ, দক্ষ প্রশিক্ষক, পর্যাপ্ত সরঞ্জাম, পুষ্টি এবং আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে আরও বেশি তরুণ-তরুণী নিজেদের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারবেন।
মেয়েদের ক্রীড়াচর্চাকে শুধু বিনোদন হিসেবে নয়, সম্ভাবনাময় পেশা হিসেবেও দেখতে হবে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সাফল্য অর্জনের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা প্রয়োজন। হিমার অর্জন এই প্রয়োজনীয়তার কথা মনে করিয়ে দেয়।
তরুণ প্রজন্মের জন্য শিক্ষণীয় দিক
হিমা দাসের জীবন থেকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায়।
প্রথমত, নিজের প্রতিভাকে চিনতে হবে। ছোটবেলার আগ্রহ বা সাধারণ কোনও দক্ষতা ভবিষ্যতে বড় সাফল্যের ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।
দ্বিতীয়ত, সুযোগ পেলে তার সদ্ব্যবহার করতে হবে। প্রশিক্ষক, পরিবার কিংবা প্রতিষ্ঠানের সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু নিজের অনুশীলন ও নিষ্ঠা ছাড়া সেই সহায়তা পূর্ণ ফল দেয় না।
তৃতীয়ত, লক্ষ্য অর্জনের পথে ধৈর্য ধরে এগোতে হয়। একটি প্রতিযোগিতায় সাফল্য যেমন ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা নয়, তেমনই একটি ব্যর্থতাও সব সম্ভাবনার সমাপ্তি নয়।
চতুর্থত, নিজের সাফল্যকে অন্যদের অনুপ্রাণিত করার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা যায়। একজন মানুষের অর্জন তখনই বৃহত্তর সামাজিক গুরুত্ব পায়, যখন তা অন্যদেরও স্বপ্ন দেখার সাহস জোগায়।
উপসংহার: যে দৌড়ের অনুপ্রেরণা ফিনিশিং লাইনের পরেও বেঁচে থাকে
হিমা দাসের জীবন এক অসাধারণ ক্রীড়াযাত্রার কাহিনি। অসমের একটি গ্রাম থেকে উঠে এসে বিশ্ব অনূর্ধ্ব-২০ অ্যাথলেটিক্স চ্যাম্পিয়নশিপে সোনা জয় করা তাঁর প্রতিভা, পরিশ্রম এবং আত্মবিশ্বাসের পরিচয় বহন করে।
২০১৮ সালের সেই ঐতিহাসিক জয় ভারতীয় অ্যাথলেটিক্সের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। একই বছর এশিয়ান গেমসে তাঁর পদকজয় আন্তর্জাতিক মঞ্চে তাঁর সাফল্যকে আরও সমৃদ্ধ করে।
তাঁর কাহিনি আমাদের শেখায়, বড় স্বপ্নের শুরু অনেক সময় খুব সাধারণ জায়গা থেকে হয়। সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রয়োজন পরিশ্রম, সঠিক প্রশিক্ষণ, সহায়ক পরিবেশ এবং প্রতিকূলতার সামনে দাঁড়ানোর সাহস।
হিমা দাসের দৌড় তাই শুধু একটি নির্দিষ্ট দূরত্ব অতিক্রম করার গল্প নয়। এটি সম্ভাবনার সীমানা বাড়িয়ে দেওয়ার গল্প, প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রতিভাকে বিশ্বমঞ্চে পৌঁছে দেওয়ার গল্প এবং নতুন প্রজন্মকে নিজের স্বপ্নের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সাহস দেওয়ার গল্প।
ফিনিশিং লাইন পেরিয়ে তাঁর সেই সাফল্য আজও মনে করিয়ে দেয়—জীবনের প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যেতে হলে শুধু দ্রুত দৌড়ালেই হয় না; প্রয়োজন লক্ষ্য স্থির রাখা, নিজের উপর বিশ্বাস রাখা এবং প্রতিটি পদক্ষেপে আরও ভালো হওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া।