মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা শেষ বীজ
পূর্ব মেদিনীপুরের শালিখা গ্রামে একসময় শীতের সকালে উঠোনে উঠোনে নানা রকম সবজির গন্ধ ভেসে আসত। কারও বাড়িতে লাউয়ের মাচা, কারও উঠোনে শিমগাছ, কোথাও আবার মাটির ছোট্ট জমিতে ছড়িয়ে থাকত দেশি বেগুন, লাল শাক আর নানা রকম ডালশস্য।
কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যে ছবিটা বদলে গেল।
চাষের খরচ বেড়েছে, আবহাওয়ার অনিশ্চয়তা বেড়েছে, আর বাজারে সহজে পাওয়া নতুন জাতের বীজের প্রতি কৃষকদের নির্ভরতা বেড়েছে। পুরোনো দেশি সবজির অনেক জাত ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে শুরু করল। একসময় যেসব বীজ বাড়ির মহিলারা যত্ন করে মাটির পাত্রে রেখে দিতেন, সেগুলোর কথা নতুন প্রজন্মের অনেকেই জানত না।
গ্রামেরই এক কিশোরী, মেঘলা, এই পরিবর্তনের কথা প্রথম বুঝতে পারে তার ঠাকুমার কাছে।
মেঘলার ঠাকুমা সরলা দেবী ছিলেন গ্রামের অভিজ্ঞ মানুষদের একজন। তিনি খুব বেশি পড়াশোনা করেননি, কিন্তু কোন মাটিতে কোন সবজি ভালো হয়, কোন বীজ কত দিন রাখা যায়, কখন বৃষ্টি হলে বীজ বোনা উচিত—এসব বিষয়ে তাঁর অভিজ্ঞতা ছিল অসাধারণ।
একদিন বিকেলে মেঘলা ঠাকুমার ঘর পরিষ্কার করতে গিয়ে কাঠের পুরোনো আলমারির নিচে একটি ছোট্ট মাটির পাত্র খুঁজে পেল।
পাত্রটির মুখ কাপড় দিয়ে বাঁধা। কাপড় খুলতেই দেখা গেল, ভেতরে কিছু শুকনো বীজ।
মেঘলা অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল, “ঠাকুমা, এগুলো কী?”
সরলা দেবী কাছে এসে পাত্রটি হাতে নিলেন। তাঁর চোখে মুহূর্তের জন্য পুরোনো দিনের স্মৃতি ফুটে উঠল।
“এগুলো আমাদের গ্রামের এক পুরোনো জাতের বেগুনের বীজ। আমার মা আমাকে দিয়েছিলেন। একসময় আমাদের বাড়িতে এই বেগুনের চাষ হতো। স্বাদে অন্য রকম ছিল। এখন আর কেউ চাষ করে না বললেই চলে।”
“তাহলে এগুলো দিয়ে আবার চাষ করো না কেন?”
ঠাকুমা মৃদু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
“সব বীজ আর বেঁচে নেই রে। অনেক বছর ধরে রাখা। কতটা ভালো আছে, তা-ও জানি না। আর শুধু বীজ থাকলেই তো হয় না, ভালো মাটি, যত্ন আর সঠিক সময়ও দরকার।”
মেঘলা পাত্রটির দিকে তাকিয়ে রইল। তার মনে হলো, মাটির ভেতরে শুধু বীজ নয়, একটা গোটা সময় ঘুমিয়ে রয়েছে।
পরদিন স্কুলে পরিবেশবিজ্ঞানের ক্লাসে শিক্ষক কৃষিজ বৈচিত্র্য নিয়ে আলোচনা করছিলেন। তিনি বোঝালেন, একই ফসলের নানা জাত থাকা গুরুত্বপূর্ণ। কোনো একটি জাত রোগে আক্রান্ত হলে বা নির্দিষ্ট আবহাওয়ায় ভালো না ফললে অন্য জাত কৃষকদের বিকল্প দিতে পারে। স্থানীয় জাতগুলোর মধ্যে এমন বৈশিষ্ট্যও থাকতে পারে, যা দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় কৃষকেরা চিনে নিয়েছেন।
ক্লাস শেষে মেঘলা শিক্ষকের কাছে গিয়ে বলল, “স্যার, আমাদের বাড়িতে একটা পুরোনো বেগুনের বীজ আছে। সেটা দিয়ে আবার চাষ করা যাবে?”
শিক্ষক আগ্রহী হলেন।
“চেষ্টা করা যেতে পারে। তবে আগে দেখতে হবে বীজগুলো অঙ্কুরোদ্গম করতে পারে কি না। আর একটা কথা মনে রেখো, শুধু গল্প শুনে কোনো জাতের গুণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায় না। চাষ করে পর্যবেক্ষণ করতে হবে।”
মেঘলা বাড়ি ফিরে ঠাকুমাকে সব জানাল।
প্রথমে সরলা দেবী একটু দ্বিধায় পড়েছিলেন। এত বছরের পুরোনো বীজ নষ্ট হয়ে গেলে তাঁর কষ্ট হবে। কিন্তু নাতনির আগ্রহ দেখে তিনি রাজি হলেন।
পরিকল্পনা করা হলো, সব বীজ একসঙ্গে মাটিতে ফেলা হবে না। অল্প কয়েকটি বীজ দিয়ে প্রথমে ছোট পরিসরে পরীক্ষা করা হবে। বাকিগুলো যতটা সম্ভব ভালোভাবে সংরক্ষণ করা হবে।
মেঘলা স্কুলের শিক্ষকের সাহায্যে কয়েকটি ছোট পাত্রে বীজ বুনল। মাটি ভেজা রাখা হলো, কিন্তু অতিরিক্ত জল দেওয়া হলো না। প্রতিদিন সে খাতায় লিখে রাখত—কোন পাত্রে কতটা জল দেওয়া হয়েছে, কত দিন পর অঙ্কুর দেখা যাচ্ছে, আর কোন বীজ থেকে কিছুই বেরোচ্ছে না।
প্রথম চার দিন কিছুই হলো না।
পঞ্চম দিনেও মাটির ওপর কোনো পরিবর্তন দেখা গেল না।
মেঘলার মন খারাপ হয়ে গেল। সে ঠাকুমাকে বলল, “হয়তো বীজগুলো মরে গেছে।”
সরলা দেবী বললেন, “হতে পারে। কিন্তু তাই বলে সব শেষ হয়ে গেছে, সেটা এখনই বলা যায় না। প্রকৃতির কাজে ধৈর্য লাগে।”
সপ্তম সকালে একটি পাত্রের মাটি ফুঁড়ে ছোট্ট সবুজ অঙ্কুর বেরিয়ে এল।
মেঘলা আনন্দে চিৎকার করে উঠল।
“ঠাকুমা! একটা বীজ বেঁচে আছে!”
সরলা দেবী ছুটে এসে অঙ্কুরটির দিকে তাকালেন। তাঁর কাঁপা হাত মেঘলার মাথায় গিয়ে থামল।
“দেখলি? এত বছর পরেও একটা বীজ নতুন করে শুরু করতে পেরেছে।”
তবে আনন্দের সঙ্গে সঙ্গে দায়িত্বও বেড়ে গেল। অঙ্কুরটি খুব নাজুক ছিল। তাকে রোদ, জল আর উপযুক্ত জায়গা দিতে হবে। স্কুলের শিক্ষক পরামর্শ দিলেন, চারাটি কিছুটা বড় হলে পরিচিত চাষির সাহায্যে জমিতে লাগাতে।
গ্রামের কৃষক হরিপদবাবু এই কাজে এগিয়ে এলেন। তিনি বহু বছর ধরে বেগুন চাষ করেন। প্রথমে পুরোনো জাতটির বিষয়ে তিনি খুব একটা আশাবাদী ছিলেন না।
“এখন বাজারে যে জাতের চাহিদা, সেগুলো চাষ করেই লাভ হয় না সব সময়। এত পুরোনো বীজ নিয়ে ঝুঁকি কেন?” তিনি প্রশ্ন করলেন।
মেঘলা বলল, “সব জমিতে নয় কাকু। আপনার জমির এক কোণে একটু চেষ্টা করলে কেমন হয়? ফলন কেমন হচ্ছে, রোগ লাগছে কি না, সব লিখে রাখব। ভালো না হলে আর বাড়াব না।”
হরিপদবাবু মেঘলার যুক্তি শুনে রাজি হলেন। তিনি জমির এক কোণে ছোট্ট একটি অংশ নির্দিষ্ট করলেন। সেখানে চারাটি লাগানো হলো। পাশে লাগানো হলো বর্তমানে প্রচলিত জাতের কয়েকটি বেগুনগাছ, যাতে দুটির বৃদ্ধি পাশাপাশি পর্যবেক্ষণ করা যায়।
প্রথম কয়েক সপ্তাহ সবকিছু ভালোই চলছিল। চারাটি বড় হচ্ছিল, নতুন পাতা বেরোচ্ছিল। কিন্তু একদিন টানা বৃষ্টির পর জমির একাংশে জল জমে গেল। পুরোনো জাতের চারাটির গোড়ার মাটি নরম হয়ে পড়ল।
মেঘলা ভয় পেয়ে গেল।
হরিপদবাবু বললেন, “গোড়ায় জল জমে থাকলে শিকড়ের ক্ষতি হতে পারে। সাবধানে জল বের করার ব্যবস্থা করতে হবে।”
তাঁরা ছোট নালা কেটে জমে থাকা জল সরিয়ে দিলেন। চারাটি কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়লেও বেঁচে গেল।
সেই ঘটনা মেঘলাকে শেখাল, কোনো বীজের ইতিহাস যতই আকর্ষণীয় হোক, চাষের সাফল্য নিশ্চিত নয়। ভালো ফল পেতে হলে অভিজ্ঞতা, পর্যবেক্ষণ এবং সঠিক পরিচর্যা দরকার।
প্রায় দুই মাস পর গাছে ফুল এল। তারপর দেখা দিল ছোট ছোট বেগুন।
ফলগুলো বাজারে প্রচলিত বেগুনের মতো দেখতে ছিল না। কিছুটা গোল, গায়ে হালকা বেগুনি-সবুজ ছোপ। ঠাকুমা ফল দেখে বললেন, “এই তো! আমার ছোটবেলায় এমন বেগুনই দেখতাম।”
প্রথম ফল পাকার পর খুব যত্ন করে তা তোলা হলো। বাড়িতে রান্না করা হলো বেগুন পোড়া। মেঘলা, ঠাকুমা, হরিপদবাবু এবং স্কুলের শিক্ষক সবাই স্বাদ নিলেন।
সরলা দেবীর চোখে জল এসে গেল।
“আমার মায়ের হাতের রান্নার কথা মনে পড়ে গেল,” তিনি বললেন।
শিক্ষক অবশ্য সতর্ক করলেন, “স্বাদ ভালো লাগা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু এই একবারের ফল দেখে পুরো জাতের গুণ বিচার করা যাবে না। আরও কয়েকটি গাছ লাগিয়ে দেখতে হবে। ফলন, রোগ প্রতিরোধ, সংরক্ষণ—সব দিক পরীক্ষা করা দরকার।”
সেই কথাই মেনে নেওয়া হলো।
মেঘলা স্কুলের কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে একটি ছোট্ট প্রকল্প শুরু করল। তারা গ্রামের প্রবীণ কৃষক ও বাড়ির বাগান করা মহিলাদের কাছ থেকে বিভিন্ন দেশি ফসলের নাম সংগ্রহ করতে লাগল। কোথায় কোন জাত আগে চাষ হতো, কীভাবে বীজ রাখা হতো, কোন সমস্যায় সেই চাষ বন্ধ হয়ে গেছে—সব লিখে রাখা হলো।
কিন্তু তারা কোনো বীজ অনুমতি ছাড়া সংগ্রহ করত না। যাঁদের কাছে বীজ ছিল, তাঁদের সঙ্গে কথা বলে তাঁদের সম্মতিতে অল্প কিছু বীজ নেওয়া হতো। প্রতিটি বীজের সঙ্গে তার পরিচয়, সংগ্রহের সময় এবং জানা ইতিহাস লিখে রাখা হতো।
কয়েক মাসের মধ্যে দেখা গেল, গ্রামের বিভিন্ন বাড়িতে এখনও কিছু পুরোনো জাতের লাউ, শিম, ধান ও শাকের বীজ রয়েছে। সব বীজ যে ভালো অবস্থায় ছিল, তা নয়। কিছু বীজ অঙ্কুরিত হলো, কিছু হলো না। কোথাও আবার বীজের সঠিক পরিচয় নিয়ে মতভেদ দেখা দিল।
মেঘলা বুঝল, শুধু বীজ জমিয়ে রাখলেই কাজ শেষ হয় না। সেগুলোর পরিচয় যাচাই করা, সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা এবং উপযুক্ত সময়ে চাষ করে দেখা জরুরি। পাশাপাশি কৃষকেরা যেন নিজেদের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিতে পারেন, সেই ব্যবস্থাও দরকার।
স্কুলের শিক্ষক ও কয়েকজন কৃষকের উদ্যোগে গ্রামের একটি ঘরে ছোট্ট বীজ-সংরক্ষণ কোণ তৈরি হলো। সেখানে সব বীজ রাখা হলো না। বরং বীজের নমুনা, পরিচিতির নথি, সংরক্ষণের নিয়ম এবং চাষের পর্যবেক্ষণ একসঙ্গে রাখা হলো। ভালোভাবে সংরক্ষণ করা সম্ভব নয় এমন বীজের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ কৃষক ও কৃষিবিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেওয়ার ব্যবস্থা করা হলো।
কিছুদিন পরে হরিপদবাবু জানালেন, পুরোনো বেগুনের গাছ থেকে সংগ্রহ করা কয়েকটি বীজ পরের মৌসুমে বোনার উপযুক্ত বলে মনে হচ্ছে। তবে সব বীজ নয়, অল্প কিছু বীজ দিয়ে আবার পরীক্ষা করা হবে।
মেঘলা বুঝতে পারল, একটি বীজের ফিরে আসা মানে শুধু একটি গাছের জন্ম নয়। তার সঙ্গে ফিরে আসে মানুষের স্মৃতি, কৃষকের অভিজ্ঞতা এবং ভবিষ্যতের জন্য একটি বিকল্প তৈরি করার সুযোগ।
শীতের এক বিকেলে সরলা দেবী নাতনিকে পাশে বসিয়ে বললেন, “জানিস, আমি ভেবেছিলাম ওই পাত্রের বীজগুলো শুধু আমার অতীতের স্মৃতি হয়ে থাকবে। তুই সেগুলোকে আবার ভবিষ্যতের সঙ্গে জুড়ে দিলি।”
মেঘলা ঠাকুমার হাত ধরে বলল, “আমি একা কিছু করিনি। তুমি গল্পটা না বললে, স্যার সাহায্য না করলে, হরিপদকাকু জমি না দিলে—কিছুই হতো না।”
ঠাকুমা হাসলেন।
“সেই জন্যই তো বীজের মতো জ্ঞানও ভাগ করে রাখতে হয়। একজনের কাছে যা থাকে, তা অন্যের কাজে লাগলে তবেই তার মূল্য বাড়ে।”
বছর ঘুরে আবার বসন্ত এল। গ্রামের বীজ-সংরক্ষণ কোণে নতুন কয়েকটি বীজের পরিচয় লেখা হলো। পুরোনো বেগুনের জাতটির চাষ এখনও পরীক্ষার পর্যায়েই ছিল। কেউ দাবি করল না যে এটি সব সমস্যার সমাধান করবে। কিন্তু গ্রামের মানুষ বুঝতে শিখল, পুরোনো অভিজ্ঞতাকে অন্ধভাবে আঁকড়ে ধরা যেমন ঠিক নয়, তেমনই নতুনের মোহে পুরোনো সবকিছুকে ফেলে দেওয়াও বুদ্ধিমানের কাজ নয়।
মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা সেই শেষ বীজটি তাই শালিখা গ্রামের কাছে হয়ে উঠল একটি স্মরণীয় শিক্ষা।
কখনও কখনও ভবিষ্যতের জন্য বড় কোনো আবিষ্কারের দরকার হয় না। দরকার হয় হারিয়ে যেতে বসা ছোট্ট একটি সম্ভাবনাকে চিনে নেওয়া, তাকে যত্নে বড় করে তোলা এবং তার ফলাফল থেকে শেখার ধৈর্য।
গল্পের শিক্ষা: অতীতের অভিজ্ঞতা ও ঐতিহ্যকে মূল্য দিতে হলে শুধু আবেগ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন জ্ঞান, পরীক্ষা, ধৈর্য এবং সম্মিলিত উদ্যোগ। একটি ছোট্ট সম্ভাবনাকে যত্ন করে বাঁচিয়ে রাখলে তা ভবিষ্যতের জন্য নতুন পথ খুলে দিতে পারে।