Categories
রিভিউ

আজ ৬ এপ্রিল, ইতিহাসের আজকের এই দিনে যা ঘটেছিল।

আজ ৬ এপ্রিল। ইতিহাস ঘেটে দেখা যায় বছরের প্রতিটি দিনে ঘটেছে অনেক উল্লেখযোগ্য ঘটনা। আসুন আজকের দিনে ঘটে যাওয়া উল্লেখযোগ্য কিছু বিষয় একনজরে দেখে নিই।  ইতিহাসের আজকের এই দিনে কী কী ঘটেছিল, কে কে জন্ম নিয়েছিলেন ও মৃত্যুবরণ করেছিলেন——-

 

দিবস—-

 

(ক) উন্নয়ন ও শান্তির জন্য আন্তর্জাতিক ক্রীড়া দিবস ৷

আজ যাদের জন্মদিন—-

১৯০৪ – জার্মান আইনজীবী, রাজনীতিবিদ ও ৩য় চ্যান্সেলর কার্ট গেয়র্গ কিসিঙ্গের।

১৯১১ – নোবেল পুরস্কার বিজয়ী জার্মান প্রাণরসায়নী ফিওডর ফেলিক্স কনরাড লাইনেন।

১৯২০ – নোবেল পুরস্কার বিজয়ী চীনা বংশোদ্ভূত আমেরিকান প্রাণরসায়নী ও শিক্ষাবিদ এডমন্ড এইচ. ফিসার।

১৯২৮ – জেমস ওয়াটসন, মার্কিন আণবিক জীববিজ্ঞানী।

১৯৩০ – ডেভ সেক্সটন, ইংরেজ ফুটবলার ও ফুটবল ম্যানেজার।

১৯৩১ – সুচিত্রা সেন, ভারতীয় বাঙালি অভিনেত্রী।

১৯৪২ – আমেরিকান অভিনেতা, পরিচালক, প্রযোজক ও চিত্রনাট্যকার ব্যারি লেভিনসন।

১৯৪৯ – নোবেল পুরস্কার বিজয়ী জার্মান পদার্থবিদ হরস্ট লুডউইগ স্টরমের।

১৯৫৬ – সাবেক ভারতীয় ক্রিকেটার ও কোচ দিলীপ বলবন্ত ভেংসরকার।

১৯৫৬ – মুদাসসর নজর, পাকিস্তানি ক্রিকেটার।

১৯৬৩ – ইকুয়েডর রাজনীতিবিদ ও ৫৪ তম প্রেসিডেন্ট রাফায়েল কররেয়া।

১৯৬৯ – আমেরিকান অভিনেতা, প্রযোজক ও চিত্রনাট্যকার পল রুড।

১৯৭8 – রাশিয়ান ফুটবলার ইগর সেমশভ।

১৯৮৩ – জাপানি ফুটবলার মিটসুরু নাকাটা।

১৯৮৫ – লিয়াম প্লাঙ্কেট, ইংরেজ ক্রিকেটার।

১৮১২ – রাশিয়ান দার্শনিক ও লেখক আলেকজান্ডার হারযেন।

১৮২০ – ফরাসি ফটোগ্রাফার, সাংবাদিক ও লেখক নাডার।

১৮২৬ – ফরাসি চিত্রকর ও শিক্ষাবিদ গুস্টাভে মরেয়াউ।

১৮৪৯ – কলকাতা হাইকোর্টের প্রথম মুসলমান বিচারপতি সৈয়দ আমীর আলী।

১৮৮৩ – চার্লি রবার্টস, ইংরেজ ফুটবলার।

১৮৮৬ – নিজাম স্যার মীর উসমান আলি খান হায়দ্রাবাদ ও বেরার রাজ্যের শেষ নিজাম।

১৮৯০ – ডাচ প্রকৌশলী, ব্যবসায়ী ও ফকার বিমান প্রস্তুতকর্তা অ্যান্থনি ফকের।

১৭৭৩ – স্কটিশ ইতিহাসবিদ, অর্থনীতিবিদ ও দার্শনিক জেমস মিল।

১৪৮৩ – রাফায়েল, চিত্রশিল্পের রেনেসাঁস যুগের অন্যতম প্রধান শিল্পী।

 

ইতিহাসের পাতায় আজকের দিনের ঘটনাবলী—-

২০০৮ – এই দিনে দক্ষিণ আফ্রিকা ইনিংস ও ৯০ রানে ভারতের বিপক্ষে জয়ী হয়।

১৯১৭ – প্রথম বিশ্বযুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে।

১৯৩০ – ব্রিটিশ সাম্রাজ্য থেকে ভারতকে মুক্ত করতে মহাত্মা গান্ধী লবণ সত্যাগ্রহ অহিংস আন্দোলন শেষ করেন। সকাল সাড়ে ৬টার সময় গান্ধীজি লবণ আইন ভেঙে প্রথম লবণ প্রস্তুত করেছিলেন।

১৯৪২ – জাপানি বিমান সর্বপ্রথম ভারতে বোমাবর্ষণ করে।

১৯৪৮ – জিন্নাহর ঢাকা ত্যাগের পর রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার আন্দোলন আরো বেগবান হয়ে ওঠে।

১৯৬৬ – গণ দাবির মুখে ইরানের তৎকালীন শাসক রেজা শাহ বন্দি দশা থেকে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের প্রতিষ্ঠাতা ইমাম খোমেনী কে মুক্তি দিতে বাধ্য হন।

১৯৬৮ – জাতিগত সহিংসতায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বড় বড় শহরগুলিতে কয়েক ডজন মার্টিন লুথার রাজা হত্যায় জাতিগত দাঙ্গা তীব্রতাবৃদ্ধি পায়।

১৯৭২ – বাংলাদেশকে স্বাধীন দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয় গ্যাবন।

১৯৮৬ – ঢাকায় প্রথম এশীয় চারুকলা প্রদর্শনীর উদ্বোধন হয়।

১৯৯২ – মুসলিম রাষ্ট্র বসনিয়া স্বাধীনতা লাভ করে।

১৯৯৩ – মস্কোর ১৭০০ মাইল পূর্বে অবস্থিত রাশিয়ার গোপন সামরিক পরমাণু ঘাটিতে মারাত্মক দুঘর্টনা ঘটে।

১৮৭৬ – কলকাতা কর্পোরেশন অনুমোদিত হয়।

১৮৯৬ – এথেন্সে আধুনিক অলিম্পিক ক্রীড়ার সূচনা হয়।

১৭১২ – নিউইয়র্কে নিগ্রো ক্রীতদাসরা শ্বেতাঙ্গ মালিকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে।

১৭৯৩ – ফরাসি বিপ্লবের পর ফ্রান্সের রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য ‘কমিটি অব পাবলিক সেফটি’ গঠিত হয়।

 

এই দিনে মৃত্যুবরণ করেন যারা—-

২০০০ – টিউনিস্ রাজনীতিবিদ ও ১ম প্রেসিডেন্ট হাবিব বউরগুইবা।

২০১৪ – মিকি রুনি, মার্কিন অভিনেতা, কৌতুকাভিনেতা, প্রযোজক ও বেতার ব্যক্তিত্ব।

২০১৯ – টেলি সামাদ, বাংলা চলচ্চিত্রের শক্তিমান কৌতুকাভিনেতা।

১৯৩৭ – আন্তর্জাতিকখ্যাতি সম্পন্ন ভারতীয় কমিউনিস্ট বিপ্লবী বীরেন চট্টোপাধ্যায়।

১৯৬১ – নোবেল পুরস্কার বিজয়ী বেলজিয়ান মাইক্রোবায়োলোজিস্ট জুলস বরডেট।

১৯৬৭ – কবিয়াল রমেশচন্দ্র শীল।

১৯৭১ – ইগর স্ট্রাভিনস্কি, রুশ সুরকার।

১৯৯০ – সাহানা দেবী,রবীন্দ্রনাথের স্নেহধন্যা গায়িকা।

১৯৯১ – বিল পন্সফোর্ড, অস্ট্রেলীয় ক্রিকেটার।

১৯৯২ – আইজাক আসিমভ, রুশ লেখক ও শিক্ষাবিদ।

১৯৯৪ – (ক) প্রখ্যাত ভারতীয় বাঙালি নাট্যকার, পরিচালক ও অভিনেতা শেখর চট্টোপাধ্যায়।

(খ) রুয়ান্ডার ব্যাংকার, রাজনীতিবিদ ও ৩য় প্রেসিডেন্ট জুভেনাল হাব্যারিমানা।

১৮২৯ – নরওয়েজিয়ান গণিতবিদ ও তাত্তিক নিল্স হেনরিক আবেল।

১৮৮৩ – ব্রাজিলিয়ান কবি, শিক্ষাবিদ ও রাজনীতিবিদ হোজে বনিফাসিও দে আন্দ্রাদা।

১৮৯২ – নিল্‌স হেনরিক আবেল, নরওয়েজীয় গণিতবিদ।

১৫২০ – রাফায়েল, চিত্রশিল্পের রেনেসাঁস যুগের অন্যতম প্রধান শিল্পী।

১৫২৮ – আলব্রেখট ড্যুরার, জার্মান চিত্রকর, খোদকার ও গণিতবিদ।

 

।।তথ্য : সংগৃহীত ইন্টারনেট।।

Share This
Categories
কবিতা

অবসর : শীলা পাল।

তুমি যখন আমার অভ্যাস আমি তোমায় ছাড়া কিছু ভাবতে পারি না
কখনও ভেবে দেখি নি তুমি না থাকলে আমার কী হবে
একটা বয়সের পর প্রেম অনেক গভীরে চলে যায় নিত্য দিনের চলার মধ্যে তার সুর টুকু বাজে সারাক্ষণ
বাহির থেকে মনে হয় এই যে পাশাপাশি থাকা
কাছাকাছি থাকা একটুও না ছেড়ে দুজনে
শুধু মুখোমুখি বসে থাকা সব কথা এখনই
যেন হল শুরু
কালের নিয়মে কেউ আগে কেউ পরে ছাড়াছাড়ি হয়েই যায়
যে থেকে যায় তাকে আবার নতুন করে বাঁচতে হয় অথবা বাঁচার অভ্যাস তৈরী করতে হয়
সে বড় কষ্টের তবু জীবন তো থেমে থাকে না
যুদ্ধটা চালিয়ে নিতে শিখতে হয় এ আরেক লড়াই
নিজের সঙ্গে নিজের
ভালোবাসার মানুষটিকে বুকের মধ্যে ধরে রাখি সবসময়ই এটুকুই সুখ এখন।

Share This
Categories
কবিতা

অবশেষে : শীলা পল।

সারাজীবন সবাই কে ভালোবেসে এলাম
এখন দেখছি একতরফা
আমিই বেসে গেছি
আমি তো কিছুই চাই নি
বড় কষ্ট হয় শেষ জীবনে
এসে যখন দেখি আমার ভালোবাসার ঝুলিটি শূন্য
কারুর প্রতি আমার অভিমান নেই আমারই মস্ত বড় একটা ত্রুটি যে ভালোবাসা ছাড়া আর কিছুই জানি না।

Share This
Categories
প্রবন্ধ

“মিলেট” হচ্ছে পুষ্টিকর খাদ্য-শস্য — একটি পর্যালোচনা : দিলীপ রায়।

প্রথমেই আমাদের জানা দরকার “মিলেট” কী ? জোয়ার, বাজরা, রাগি, ইত্যাদি কয়েকটি ক্ষুদ্র দানাশস্যকে একত্রে মিলেট বলে । পৃথিবীর মধ্যে ভারতেই সবচেয়ে বেশী মিলেট উৎপন্ন হয় । সাধারণত দক্ষিণ ও পশ্চিম ভারতের গরীব অধিবাসীরা খাদ্যশস্য হিসেবে এই ফসলগুলি বেশী ব্যবহার করে । মিলেট শস্য বেশী পরিমানে লক্ষ্য করা যায় মহারাষ্ট্র, কর্ণাটক, মধ্যপ্রদেশ রাজ্যে ।
এটা ঘটনা — কৃষি ও সহযোগী ক্ষেত্রগুলি যেমন দুগ্ধ, পশুপালন, মৎস্য, হাঁস-মুরগি, রেশম চাষ, ইত্যাদি ভারতীয় অর্থনীতির স্তম্ভ ! কৃষি যেমন অর্থনীতির স্তম্ভ তেমনি স্বাস্থ্য হলো সমৃদ্ধ সমাজের এক অপরিহার্য অঙ্গ । স্বাস্থ্য সম্বন্ধে মানুষ কম-বেশী ওয়াকিবহাল । তাই স্বাস্থ্য দেখ-ভালের নিরিখে মিলেট খাদ্য-শস্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে । ক্রমবর্ধমান স্বাস্থ্য সচেতনতার প্রেক্ষাপটে মিলেট দানাশস্যকে বলা চলে অধিক পুষ্টিকর ।
সেই কথা মাথায় রেখে ও মিলেট শস্যের উপকারিতার কথা বিবেচনা করে রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ সভা ২০২৩ সালকে “আন্তর্জাতিক মিলেট বর্ষ” হিসেবে ঘোষণা করেছে । সকলের ধারণা, কৃষি ও খাদ্য বৈচিত্র্য বৃদ্ধিতে মিলেট বড় ভূমিকা নিতে পারে । মিলেটের বৈচিত্র্যময় ব্যবহার অতীতে খুব শোনা যায় । মুঘল বাদশাহ জাহাঙ্গীর পছন্দ করতেন “লাজিজা” –এক ধরনের মটর মিশ্রিত মিলেটের খিচুড়ি । শোনা যায় এর প্রচলন ছিল গুজরাটে । কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে নানান ধরনের মিলেট ভেজানো কিংবা সেদ্ধ করে নেওয়ার পর তাদের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের উল্লেখ পাওয়া যায় ।
জীবিকা ও কৃষকদের আয় বৃদ্ধি এমনকি বিশ্বের খাদ্য ও পুষ্টিগত চাহিদা মেটাতে মিলেট একটি গুরুত্বপূর্ণ দানাশস্য । তাই শস্যটির চাহিদা ও উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে ঘোষিত হয়েছে আন্তর্জাতিক মিলেট বর্ষ, ২০২৩ । যার জন্য ভারত সরকার জোয়ার, বাজরা, রাগি ইত্যাদি শস্যের ফলন বাড়াতে ও স্বাস্থ্যে এদের উপকারিতা বিষয়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে উদ্যোগ নিয়েছে । ইতিমধ্যে এই দানাশস্যে পুষ্টির অনুপাত বেশী থাকার জন্য “পুষ্টিকর দানাশস্য” হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে । অন্যদিকে সরকারের মহিলা ও শিশু উন্নয়ন মন্ত্রক অঙ্গনওয়াড়ি পরিষেবার পরিপুরক পুষ্টি কর্মসূচিতে খাবারের পুষ্টিগত মান বাড়াতে জোয়ার, বাজরার কথা উল্লেখ করেছে । শোনা যায় ওড়িশা, তেলেঙ্গানা, চন্ডিগড়, ইত্যাদি রাজ্য ও কেন্দ্রিয় শাসিত অঞ্চলে পরিপুরক পুষ্টিতে জোয়ার-বাজরা ঠাঁই পাচ্ছে ।
মিলেট হলো এক ধরনের দানাশস্য যেগুলির বীজ ছোট এবং যেগুলিকে সহজে চাষ করা যায় । এগুলি চাষের জন্য বাইরে থেকে দামী রাসায়নিক সার, কীটনাশক ইত্যাদি ক্রয় করতে হয় না । মিলেট পুষ্টি উপাদান সমৃদ্ধ এবং এগুলি খাদ্য ও জীবিকার নিরাপত্তা বজায় রাখে । মিলেট চাষের দু-রকমের উপযোগিতা রয়েছে । মিলেট চাষ করলে মানুষের জন্য খাদ্যশস্য এবং সেইসঙ্গে গবাদি পশুর জন্য খড়ও পাওয়া যায় । আবার কিছু অঞ্চলে মিলেটই মানুষের প্রধান খাদ্য । মিলেটের ফসল – বৈচিত্র ও চাষব্যবস্থা সেই ফসলগুলির বাস্তুতন্ত্রের কৃষিবৈচিত্রকে সমৃদ্ধ করে । কেদো মিলেটও অত্যন্ত পুষ্টিকর । এর মধ্যে গ্লুটেন নেই, এটা সহজপাচ্য, সেইসঙ্গে এটি ফাইটোকেমিক্যাল উপাদান, অ্যান্টি-অক্সিড্যান্ট এবং ডায়েটারি ফাইবার সমৃদ্ধ । পোলাও, খিচুড়ি, উপমা, পরোটা, দোসা ও চাপাটি তৈরীতে শস্য হিসাবে মিলেট ব্যবহার করা যায় । মিলেট থেকে বিভিন্ন ধরনের খাদ্যদ্রব্য তৈরী করা যায় যেমন মাল্টিগ্রেন পাস্তা, মাল্টিগ্রেন সুইট মিক্স, মাফিন, পুষ্টিকর মিলেট আটা, রাগি ফ্লেক্স, রাগি পাপড়, পাউরুটি, কুকিজ, রাগি স্নাক্স, ফ্লেকড জোয়ার, মিলেটের আটা, ইত্যাদি ।
( ২ )
এবার আসছি মিলেট শস্য মানুষের কী উপকারে আসতে পারে । প্রথমত এটি একটি বিকল্প প্রধান খাদ্য হয়ে উঠতে পারে । মিলেটে কার্বোহাইড্রেট-ফাইবার অনুপাত কম থাকার কারণে, জীবনযাত্রাগত বিভিন্ন রোগের মোকাবিলায় এটা কাজে আসে । মিলেট হলো “পুষ্টির পরিপূরক” যাতে রয়েছে ফাইটোকেমিক্যাল এবং অ্যান্টি-নিউট্রিয়েন্ট, যা সুস্বাস্থ্য রক্ষায় অপরিহার্য এবং দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতার চিকিৎসায় বিশেষ কার্যকর । গর্ভবতী মহিলাদের স্বাস্থ্য তথা পুষ্টির উপর মিলেটভিত্তিক খাদ্যের একটা ইতিবাচক প্রভাব রয়েছে । গর্ভবতী মহিলাদের খাদ্যতালিকায় পরিপূরক খাদ্য হিসাবে মিলেট-ভিত্তিক খাদ্যকে যাতে অন্তর্ভুক্ত করা যায় সেই দিকে ধ্যান দেওয়া সময়োপযোগী । কারণ গর্ভবতী ও স্তন্যদাত্রী মায়েদের জন্য মিলেটভিত্তিক পরিপূরক খাদ্যদ্রব্যগুলি খুবই পুষ্টিকর । আমরা জানি, খাদ্য-তালিকায় ফাইবার থাকা বিশেষ প্রয়োজন । এই ফাইবার গ্লোকোজ নিয়ন্ত্রণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ । মিলেট, লিউসিনের একটি চমৎকার উৎস, এটা ধীরে ধীরে কার্বোহাড্রেট (এবং খনিজ পদার্থ) হজম করায়, যা পোস্ট-প্রান্ডিয়াল গ্লুকোজের মাত্রার আকস্মিক বৃদ্ধিকে নিয়ন্ত্রণ করে । ফলে এটি ডায়াবেটিসের রোগীদের জন্য একটি পুষ্টিকর খাবার । চাল ও গমের মতো অধিক পরিচিত খাদ্যশস্যের তুলনায় মিলেটে অধিক পুষ্টিকর খাদ্যগুণ রয়েছে । মিলেট ক্যালশিয়াম, আয়রন এবং ফাইবারে ভরপুর যা একটি শিশুর বেড়ে উঠতে সাহায্য করে । আশার কথা, ছোটদের খাবারে মিলেটের ব্যবহারও ক্রমশ বাড়ছে ।
জোয়ার-বাজরা পুষ্টির এক ভাঁড়ার বলে সুবিদিত । দেশে অপুষ্টিকর সমস্যা ঘোচানোর জন্য ইদানীং জোয়ার-বাজরা খাওয়ার প্রচলনের উপর জোর দেওয়া হচ্ছে । এটা ঘটনা, আজকালকার মানুষ বেশি স্বাস্থ্য সচেতন । যার জন্য পুষ্টিকর জোয়ার-বাজরার ব্যবহার ক্রমবর্ধমান । এককালে “গরীব মানুষের খাদ্যশস্য” বলে পরিচিত জোয়ার-বাজরার দাম ছিল খুব কম । তা ছাড়া চাল, ডাল, গম উৎপাদনে অধিক গুরুত্ব আরোপ হওয়ায় দানাশস্যের উৎপাদনও কম ছিল । কিন্তু বর্তমানে দানাশস্যের ব্যবহারও ক্রমশ বাড়ছে । চাহিদাও ঊর্ধ্বমুখি । তামিলনাড়ুতে দানাশস্য ব্যবহার করে তৈরী হচ্ছে দোসা, পোঙ্গল, রাভা দোসা, প্রভূতি । সাধারণত চাল থেকে দোসা তৈরী হয় । তবে দানাশস্য চাল ও গমের চেয়ে অধিক পুষ্টিসম্পন্ন । রুটি পরোটার ক্ষেত্রে আটা বা ময়দার বদলে মিলেটের পরোটা অনেক পুষ্টিকর । মিলেটের খাওয়ায় অনেক উপকার । মিলেটে প্রচুর ফাইবার থাকায় এটা ডায়াবিটিকদের জন্য ভীষণ উপকারী । এতে প্রচুর পরিমানে অ্যান্টিওক্সিডেন্টস রয়েছে । তাই এটাও কিন্তু ক্যানসারের মতো মারণ রোগ প্রতিরোধ করতে পারে ।
( ৩ )
বাংলাদেশেও মিলেটের চাষ দেখা যায় । বাংলাদেশের জীবনধারায় খাদ্য হিসেবে মিলেটের ব্যবহার নাকি খুব প্রাচীন কাল থেকে । সেই দেশের মানুষের খাদ্যাভাস বা নানান প্রথার সঙ্গে এই দানাশস্যের অনুষঙ্গ জড়িয়ে রয়েছে । তবে সেই দেশে ধান, গম ও ভুট্টার পরে চার নম্বরে স্থান দেওয়া হয়েছে মিলেট চাষকে । বাংলাদেশে মিলেটকে জোয়ার, বাজরা ছাড়াও চিনা বা কাউন বলে । মিলেটকে বাংলাদেশে জোয়ার বা সরগাম (Jower or Sorghum) , যব (Oat), চিনা (Proso millet), কাউন (Foxtail millet), ইত্যাদি নামে মানুষে জানে । বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ সরগামের অপর নাম জোয়ার জানে । শুষ্ক এলাকার জন্য মানুষ ও পশুপাখির খাদ্য হিসেবে খুব গুরুত্বপূর্ণ । চিনা সাধারণত গরুর ঘাসের জন্য ব্যবহৃত হয় । যদিও বাংলাদেশের চিনার চাষ প্রাচীন কাল থেকে । বিশেষ করে পাবনা, টাঙাইল, জামালপুর, ফরিদপুর, জেলায় বেশী চাষ হয় । কাউন চাষ তুলনামূলক কম । কাউনের জাউ বা খিচুড়ি খুব জনপ্রিয় । তা ছাড়া গ্রামাঞ্চলে চাউনের ভাতও খেতে দেখা যায় ।
সবশেষে যেটা আমাদের জীবনধারা ও খাদ্যাভাস নিয়ে ভাববার বিষয়, সেটা হচ্ছে প্রয়োজনে জীবনধারা ও খাদ্যাভাস পর্যালোচনা করে তার পরিমার্জন করাটাও স্বাস্থ্যের নিরিখে অত্যন্ত জরুরি, বলা চলে সময়োপযোগী । সেই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কা সামলাতে সক্ষম, পুষ্টিগুণসম্পন্ন, জল সাশ্রয়ী এই ফসলকে আরও উৎপাদনমুখি করে তুলতে উদ্যোগী হওয়া বাঞ্ছনীয় । যাতে মানুষ এই দানাশস্যের পুষ্টির সুফল অধিকমাত্রায় পেতে পারে । আন্তর্জাতিক মিলেট বর্ষকে মাথায় রেখে দেশের সুশীল নাগরিক সমাজ জোয়ার-বাজরা-রাগি ইত্যাদি শস্যের প্রতি নজর দিলে দানাশস্য পুষ্টিকর খাদ্য হিসাবে আবার ঘরে ঘরে মানুষের পাতে ফিরে আসবে । (তথ্যসূত্রঃ সংগৃহীত ও যোজনা-০১/২০২৩)
———০———–
লেখকঃ কথা সাহিত্যিক (ভারত)

Share This
Categories
কবিতা রিভিউ

উপেক্ষিত ভাষাশহীদ : শুভঙ্কর দাস।

২১ শে ফেব্রুয়ারি মাতৃভাষা দিবস।আন্তর্জাতিক ও আন্তরিক আলোর।
এই সূর্যস্মরণীয় দিনটির জন্য এ-ই মানুষটির অবদান অতুলনীয়। অথচ ভাষাদিবসের প্রেক্ষাপটে তাঁর কথা খুবই কম শোনা যায়,কম উচ্চারিত হতে দেখা যায় এবং কোনো সৃজনকর্ম তাঁকে নিয়ে রচিত হয় না!
কেন?
১৯ মার্চ প্রবল শক্তিশালী ও সর্বপ্রধান মহম্মদ আলি জিন্না ঢাকায় এসে চেঁচিয়ে উঠলেন,উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা।তাঁর মুখের ওপর যাঁরা প্রতিবাদ করতে দুঃসাহস দেখিয়েছিলেন,তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন ভাষাসৈনিক ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত।
ধীরেন্দ্রনাথের যুক্তি ছিল,দেশের ছয় কোটি নব্বই লক্ষ নাগরিকের মধ্যে চার কোটি চল্লিশ লক্ষ মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলেন,অতএব বাংলাই হোক রাষ্ট্রভাষা।
কিন্তু মুসলিম লিগ তা খারিজ করে দেয়,তার কারণ সহজেই অনুমেয়।
সেই মহান ভাষাসৈনিককে এর জন্য মারাত্মক মূল্য চোকাতে হয়েছিল।১৯৭১ সালে পাকসেনারা অশীতিপর সমাজকর্মী ধীরেন্দ্রনাথকে কুমিল্লার বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে ময়নামতী ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়।
বাহান্নর ভাষা আন্দোলন শুধু মাতৃভাষার রক্ষা করেনি,একটা দেশের জন্ম দিয়েছল,সেই দেশের জন্মপরতে ধীরেন্দ্রনাথের নাম অবিচ্ছেদ্য।তাঁকে বিস্মৃত হওয়া মানে একটা ভাষাকে,একটা দেশকে অস্বীকার করা।
তাঁকে জানিয়ে অক্ষরের শ্রদ্ধা।

চার কোটি চল্লিশ লক্ষের সিংহাসন

শুভঙ্কর দাস

অক্ষরের কোনো ধর্ম হয়?
মায়ের মুখের ভাষায় কোনো কাঁটা,কোনো উদ্ধত আঙুল,কোনো স্বেচ্ছাচারীর মুর্খামি
কালো কালো রেখায় মাথা তুলতে পারে?

কোনোদিন পারে না,যে মুহূর্তে অর্ধমের অন্ধকার বাংলা বর্ণে মিশিয়ে দেবে,যে মুহূর্তে রক্তচক্ষু মিশিয়ে দেবে আদুরে অক্ষরে,যে মুহূর্তে বন্দুকে বিচার করবে বিবেকের বাণী,সেই মুহূর্তে ধীরেন্দ্রনাথ শুধু উচ্চারণ করবেন,চার কোটি চল্লিশ লক্ষের মুখের ভাষা…

বাংলা,বাংলা এবং শেষ রক্তবিন্দুর সত্য, বাংলা

২১ ফেব্রুয়ারি একটা এমন দেশের নাম,যেখানে মায়ের আঁচলে সত্যিকারের ভুবন আঁকতে নিজের প্রাণ পর্যন্ত তুলে দিতে পারে
তেমন দেশের মাটিতে যদি সিংহাসন গড়ে ওঠে

তাতে হাসিমুখে বসে থাকবেন ধীরেন্দ্রনাথ।

—————-//———————-
২৯ মার্চ,২০২৩

Share This
Categories
কবিতা

অহংকার : রাণু সরকার।

এমন কিছু সম্মানিত ও গুণসম্পন্ন নারী বা পুরুষ আছেন
নামটা উজ্জ্বল বলে তাদের মনে ভীষণ দাম্ভিকতা চলে আসে।

কথাই বলা যায় না তাদের সাথে, বন্ধুত্ব তো দুরস্থ।
আমার ভাগ্যে যখন এমনটা জুটেছে, তখন আমি ভীষণই কষ্ট পেয়েছি-
হয়তো তারা ভাবেন মনে মনে ধুত্ এদের সাথে কী কথা বলবো, আমার মতো তো আর এতো গুণী বা নাম যশ নেই, তাই একটু অবহেলার চোখেই দেখেন।

অনেক বিষয়ের ওপর তাদের নাম যশ থাকতেই পারে, সেটা তাদের ব্যক্তিগত ব্যাপার।
কিন্তু অহংকার কিছুটা শিশুসুলভ মনোভাবের মতো।
অনেক সময় দেখা যায় একটা পরিণত মানুষের মধ্যে অহংকার অসহ্য লাগে।
পতনের মূল কারণ এরা বুঝতে পারেন না বা বুঝতে চান না যে মানুষ্যত্বের অভাব যা জীবনে চলার পথে সমস্যার দিকে পরিচালিত করে সেটাও ভাবনাতে আসে না, নাম যশে ভুলে থাকে।

তবে কেউ যদি আত্মসম্মান বোধে দূরত্ব বজায় রাখে তবে হয়তোবা সে শান্তি অনুভব করলেও করতে পারে।

Share This
Categories
রিভিউ

কবিতার সর্বস্ব ও কবির সর্বনাশ ::: শুভঙ্কর দাস।।।

‘কবিতা’ কথাটি উচ্চারণ করার আগে
অন্তত একটি এমন কবিতা পড়ুন,যাতে আপনার মনে হতে পারে,আয়না শুধু কাচের নয়,অক্ষরেরও হয়!
‘কবিতা’ নিয়ে কণামাত্র মতামত প্রকাশের আগে
অন্তত একজন কবির কথা আত্মজীবনীর মতো জানুন
যাতে আপনার মনে হতে পারে
আত্মীয়স্বজন বলতে শুধু রক্তের সম্বন্ধ বোঝায় না!

এই কবিতার মতো দেখতে সাজানো কথাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্রিয়াপদ ‘পড়ুন’।
অর্থাৎ পড়া।
এই পড়ার লোকের খুবই অভাব।
রক্তাল্পতার মতো পাঠকাল্পতার রোগে ভুগছে বাংলা কাব্য-কবিতা।
কবি জীবনানন্দ দাশ ইংরেজি সাহিত্যের পড়ুয়া শিক্ষক এবং বাংলা কবিতার মনন নক্ষত্রের প্রধান। তিনি যেমন শিরোধার্য রবীন্দ্রনাথের লেখা আত্মস্থ করার চেষ্টা করতেন,তেমনি সমসময়ের বন্ধুবর্গের লেখাও, যেমন দিনেশ দাসের লেখাও পড়তেন এবং পড়ার মতো পড়ে,সেই সব কবিতার মননশীল আলোচনা বা মতামত ব্যক্ত করতেন।
অনেকেই জানেন না,কবি জীবনানন্দ কবিতা চর্চার জীবনে কবি দীনেশ দাসের মুগ্ধ পাঠক এবং আলোচক। দীনেশ দাসকে চেনেন তো?
সেই যে যিনি লেখেন

” বাইরে অদূরে
থান-কাপড়ের মতো একটি পবিত্র দিন শুকায় রোদ্দুরে।”

অথবা

“তোমার পায়ের পাতা সবখানে পাতা
কোনখানে রাখব প্রণাম!”

অথবা

“বাঁকানো চাঁদের সাদা ফালাটি
তুমি বুঝি খুব ভালোবাসতে?
চাঁদের শতক আজ নহে তো
এ যুগের চাঁদ হল কাস্তে!”

যাক! এবার মনে পড়বেই।

একটি জায়গায় জীবনানন্দ কবি দীনেশ দাসের কবিতা সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেছিলেন,এখন বুঝতে পারি,কবিতা শুধু যে শিল্পকুশলতার নয়, আরোও ওপরের জিনিস।
পাঠক ছিলেন রবীন্দ্রনাথ।
শান্তিনিকেতনে কেউ যদি দুটি শব্দ লিখে পোস্টকার্ডও পাঠাতেন,রবীন্দ্রনাথ তাও পড়তেন।
প্রমথ চৌধুরী পড়ার জন্য গ্রন্থকীট বলে উপহাসের পাত্র হয়েছিলেন অথচ সেই পড়ার গুণে তিনি বঙ্গসাহিত্যের একজন শ্রেষ্ঠ গদ্যকার হতে পেরেছিলেন।
স্বামী বিবেকানন্দ মাত্র উনচল্লিশ আয়ুর সময়কালে যা পড়েছেন,তা একজন মানুষ শতায়ু জীবনে পারবে না!
সৈয়দ মুজতবা আলি তো গ্রন্থকেই জীবনের দরজা-জানালা এবং সোপান করেছিলেন।
বুদ্ধদেব বসু তো কবিতার ওপর ভবন ও ভুবন নির্মাণ করেছিলেন!
তারপর সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সবাই লেখার পরিমাণ মাপতে ব্যস্ত,তাঁর সেই সময় বা প্রথম আলো উপন্যাসের সহকারী গ্রন্থসূচি তালিকা নিয়ে দুই ফর্মারই বই হয়ে যেতে পারে!
মোদ্দা কথা, সেই সব পাঠকধন্য সোনালি দিন কোথায় গেল!
কবিতার বইয়ের পাঠক কোথায়?
ক’জন গাঁটের কড়ি খরচ করে কবিতার বই কেনেন?
সর্বনাশ! কেনার কথা বলে ফেললাম, হা হরি! হায় আল্লা!
কোনো কবিতার বই প্রকাশের পর যদি পঞ্চাশজনকে বিতরণ স্টাইলে দেওয়া হয়,তাহলে দেড়জন মাত্র মতামত জানান,যদি সেই কবি অতিব সৌভাগ্যবান হন।
তারপর যদি সরকারি বা বেসরকারি ডাকযোগে কবিতার বই পাঠান,তাহলে তো কথাই নেই,ডাক নিশ্চিতভাবে পৌঁছে যাওয়ার দিন অতিক্রম করে কবি যদি ফোন করে জানতে চান,কবিতার বইটি পেয়েছেন? তাতে ফোনের অপর প্রান্তের উত্তর আসবে,আপনি কী পাঠিয়েছিলেন?আসলে এতো বইপত্র আসে,বুঝতে পারছি না! আচ্ছা, আপনাকে পরে জানাচ্ছি!
ব্যাস ফোনটা কেটে যাবে এবং এই ‘পরে জানাচ্ছি’ আর কোনোদিন ফিরবে না।
এই এতো কথার সার কথা এই,কবিতা পড়ুন এবং কবিতাই আপনাকে অনুভবের সঠিক পথ দেখাবে।
প্রশ্ন উঠবে, কবিতাই কেন?
সহজ উত্তর, কবিতারই মানবমনের সর্বোত্তম নির্যাস।কবিতার চোখ দিয়ে মানুষ এবং তার সম্পর্কের পরম অনুভব ব্যক্ত ও বিস্তার দান করতে পারে।
কবিতা পড়ুন এবং তাকে স্পর্শ করতে পারলে তারপর গদ্য, উপন্যাস, গল্প অথবা গান সবকিছুর অন্তর্নিহিত আলোর কাছে অতি সহজেই পৌঁছাতে পারবেন,শুধু অক্ষর সাধন নয়, আধ্যাত্মিক এবং সংসার সত্যও অনুধাবন করতে পারবেন।
কবিতা পড়ুন এবং পড়ার যোগ্য হয়ে ওঠুন। গভীরভাবে হৃদয়স্থ করতে থাকুন,তারপর ডাক্তারি,ইঞ্জিনিয়ারগিরি,মাস্টারি, ব্যবসায়ী,বিপ্লবী,সাংবাদিক, রাজনীতি,ফুচকা অথবা বেলুন ফাটানো, যা ইচ্ছে করুন।
সবকিছু কবিতার মধ্যে দিয়ে উত্তর এবং উর্বরতা খুঁজে পাবেন।
এটাই সত্য।
ধরুন,আপনি পিতা অথবা মাতা।
কর্মক্ষেত্রের শেষে যখন বাড়ি ফিরে গিয়ে দেখলেন,সন্তানের জ্বর অথবা তার খাওয়া হয়নি, সেই মুহূর্তে আপনার বুকের বাঁদিক যেই ধক্ করে উঠল,তাই অনুভব।
তাই কবিতার পথ এবং কবিতার প্রকাশ।
এটা আনন্দের ক্ষেত্রেও ঘটতে পারে,সেই একই জিনিস।

অনুভবকে রূপ দেয় চূড়ান্ত কবিতা।
আর একথা সর্বজনগ্রাহ্য সত্যি, অনুভবহীন মানুষ মাত্রই বিপজ্জনক, শুধু বিপজ্জনক নয়,বিশ্বধ্বংসাত্মক।
মনুষ্যত্ব নির্মাণ করতে হলে কবিতা পড়তেই হবে।
যা এই দুঃসময়ে প্রচণ্ড অভাব।

এতো বড় বড় কথার কিছু নেই।
এবার অতি সহজ করে সংক্ষিপ্ত সার।
কবিতা পড়তে হবে।নতুনভাবে।নতুন চোখে।
আপনার পাশে বসে সাহিত্যসভায় যে কবিকে দেখছেন,তাকে সত্যিকারের চিনুন কবিতার মধ্য দিয়ে।
আপনি এতদিন কবিকে দেখেছেন,
সে কালো কি ফর্সা,সে মোটা কি রোগা,সে আমিষ না নিরামিষ, সে বিবাহিত নাকি ডিভোর্সী, সে বাসে ঘুমায় নাকি টিকিট কাটে না! খাওয়ার গপগপ করে খায় নাকি কাকের মতো ছড়ায়,সে বিড়ি ফোঁকে নাকি মদ খায়,সে প্রেম করে নাকি পরকীয়া,সে বহুমূত্র রোগী নাকি উচ্চরক্তচাপ, সে স্কুল মাস্টার নাকি কয়লা খনির শ্রমিক, সে লিটল ম্যাগাজিন করে নাকি ঢাউস ম্যাগাজিন,তার সঙ্গে সুবোধ নাকি জয়ের আলাপ আছে,সে নন্দনে চেঁচায় নাকি গন্ধমাদন তোলে, সে অন্তর্বাস পরে নাকি উলঙ্গ থাকে, এসব স্রেফ ছুঁড়ে ফেলুন,
ছুঁড়ে, মুড়ে এবং এমন নিরাপদ দূরত্ব ফেলুন,যাতে আপনাকে প্রকৃত পাঠক হতে বাধা দিতে না পারে!
এবার মন ও মনন বদলে ফলুন।
এবার কবিতা দিয়ে কবিকে দেখুন, চিনুন এবং বোঝার মতো বুঝুন।
দেখবেন আপনার জগৎ বদল হয়ে গেছে এবং সত্যিকারের জগতে আপনি বসবাস করা শুরু করে দিয়েছেন।
কারণ অনুভব বা চিন্তন

কবির পোশাকে
কবির দাঁতে
কবির হাসিতে
কবির বকবকাকিতে
কবির ফতুয়ায়
কবির চুলে
কবির টাকে
কবির টাকায়
কবির বাজারে ব্যাগে
কবির বউ-এ
কবির বোনে
কবির ফেসবুকে
কবির হোয়াটসঅ্যাপে
কবির সেলফিতে
কবির বইদোকানে মাথা চুলকানোতে
কবির মাইক্রোফোন ধরে হাঁপানোয়
কবির বই প্রকাশে
কবির গালিগালাজে
কবির ধূমপানে
কবির প্রেমিকায় নেই।
নেই।নেই।নেই।একদম নেই।
আছে শুধু কবিতায়।একমাত্র কবিতায়। তাই কবিতা পড়ুন।একথা মফস্বল ও মহানগর সবের ক্ষেত্রে সমান সত্য ও চরম চমৎকার।
কবিতা পড়ুন।
কবিতার মাধ্যমে কবিকে প্রতিষ্ঠা করুন অন্তরে এবং আকাশে….
কিন্তু কাকে বলি? কে যে বোঝে!

২১ শে মার্চ,২০২২. শুভঙ্কর দাস।

Share This
Categories
কবিতা রিভিউ

কবিতার পবিত্রতার ছুঁয়ে : শু ভ ঙ্ক র দা স।

বরিশালে জন্ম হলেও বালকটি বড় হওয়া কলকাতায়…
ইস্কুলের গণ্ডী পেরানোর অনেক আগেই কবিতায় নিমজ্জন। সেইভাব জাগ্রত হল,বরিশালে এক জমিদারের বৈঠকখানায় রবি বর্মার রামায়ণ-মহাভারতের ছবি দেখে,ভাবলেন চিত্রচিল্পী হবেন,কিন্তু ছবি আঁকা শুরু করলেন অক্ষরে…
সহসা মা মারা গেলেন।
বালকটি অসহায়,নিঃসঙ্গ এবং উদাস।
লিখলেন প্রথম কবিতা,মাকে নিয়ে,লিখে টাঙিয়ে রাখলেন দরজার পাশেই…
বরিশাল থেকে মাসির হাত ধরে মহানগরের পথে..
প্রচন্ড দারিদ্র্য এবং অসংখ্যবার বাসাবদল।
এর মধ্যে সেই বালক বড় হতে লাগলেন এবং মনেপ্রাণে এই বিশ্বাস প্রোথিত হল,কবিতার জন্য তাঁর জন্মগ্রহণ।
টিউশনির টাকায় পত্রিকা প্রকাশ।
নাম, কবিপত্র।
যেটি পরে সাহিত্যপত্রের ইতিহাস সৃষ্টি করে।
বাষট্টির বছর ধরে প্রকাশ হয়ে আসছিল। এক বিরাট বিস্ময়!
দেখা হল,বিষ্ণু দে,সুভাষ মুখোপাধ্যায়, প্রেমেন্দ্র মিত্র, বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রাম বসু,নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, আলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত এবং সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে..
আলাপ হল,প্রেরণা ও উৎসাহে পেলেন এক নতুন শক্তি।
তারপর মনে হল, কবিতার বই বের করতে হবে।
পান্ডুলিপি তৈরি হল,নাম দিলেন,’দর্পণে অনেক মুখ’।
কিন্তু ছাপতে কে? টাকা কোথায়?
কবির কী অবস্থা!
নিজে ভালো করে কবি খেতেই পান না!অন্য লোকের কাছে আশ্রিত।
অথচ তাঁর ধ্যানজ্ঞান,কবিতার বই বের করবেন।
এক বন্ধু কবিতা পড়ে বলল,আমি টাকা দেবো।
কবিযুবক ছুটলেন সিগনেটের কর্ণধার দিলীপ গুপ্তের কাছে।
প্রচ্ছদ আঁকলেন,পূর্ণেন্দু পত্রী।
সেই শুরু, আবির্ভাব হল এক নতুন কবিপুরুষের…
তিনি পবিত্র মুখোপাধ্যায়।
তিনি তো লিখতে পারেন—

“অনন্তকাল কেউ বেঁচে থাকবে না
খড়কুটোর রহস্য বেরিয়ে পড়বার আগেই
আমি
খুলে ফেললাম আনুগত্যের দস্তানা
হেলমেটের সবুজ ঢালুপথের ওপর দাঁড়িয়ে পড়লো সূর্য
আমি রেকাবে পা রাখলাম রেকাবে রাখলাম পা
রেকাবে”

কী আশ্চর্য!
কবি পবিত্র মুখোপাধ্যায় সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে পা রাখার ভুলে পড়ে যান,তারপর হাসপাতালে..
তারপর অশেষ কবিতার যাত্রায়..

অলংকরণ। ভগীরথ সর্দার।।

Share This
Categories
উপন্যাস গল্প

কঙ্কাবতীর দুঃসাহস (ধারাবাহিক উপন্যাসঃঅন্তিম পর্ব) : দিলীপ রায় (+৯১ ৯৪৩৩৪৬২৮৫৪)।

তানিশা পল্লীদহ গ্রামের চয়ন হালদারকে বিয়ে করলো । গাঁয়ে চয়নের মুদিখানার দোকান । ভীষণ চালু দোকান । চয়নের সাথে তানিশার পরিচয় ছোটবেলা থেকে । কিন্তু মাঝখানে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল । কিন্তু সাগরের সাথে বিয়ে ভেঙ্গে যাওয়ার পর তানিশা নিয়মিত চয়নের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতো, যেটা বাড়িতে কেউ টের পায়নি । তানিশাকে অর্ধাঙ্গিনী হিসাবে পেয়ে খুশীতে বিহ্বল । অন্যদিকে তানিশার বিয়ে হওয়ায় কঙ্কাবতী স্বস্তির নিশ্বাস ফেললো ।
তারপর …………?
তারপর তার মোবাইলে থানা থেকে হঠাৎ ফোন পেয়ে কঙ্কাবতী চমকে উঠলো । নিয়ামতপুর থানা থেকে স্বয়ং বড়বাবুর ফোন । ভয়ে ভীতিতে কঙ্কাবতী আমতা আমতা করে পাল্টা প্রশ্ন করলো, “আমাদের অপরাধ ?”
থানার বড়বাবু উত্তরে বললেন, “আপনি থানায় আসুন ! থানায় দেখা করলে টের পাবেন আপনার অপরাধ কী ?” থানার বড়বাবু আরও নির্দিষ্ট করে বললেন, “পরেরদিন সকাল এগারোটার মধ্যে আপনাকে থানায় আসার অনুরোধ রইল ।“
কঙ্কাবতী তার জামাইদের ডাকলো । সন্ধ্যায় কঙ্কাবতীর বাড়িতে চার মেয়ে ও চার জামাই এবং দুই ছেলে ও বৌমা উপস্থিত । কঙ্কাবতী সবাইকে আলাদাভাবে জিজ্ঞাসা করলো, তারা কোনো গর্হিত কাজ করেছে কিনা ? যার জন্য বড়বাবুর হঠাৎ তলব ! আলোচনায় কঙ্কাবতী বুঝতে পারলো, তার মেয়ে-জামাই এমনকি ছেলে-বৌমারা কেউ কোনো অপরাধমূলক কাজে লিপ্ত নেই । সুতরাং কঙ্কাবতী নিশ্চিন্ত, তাদের পরিবারের কেউ কোনো অপরাধমূলক কাজ করেনি । এমনকি কোনো অপরাধমূলক কাজের ষড়যন্ত্রেও তারা যুক্ত নয় । তাই কঙ্কাবতী ঠিক করলো, পরিবারের সকলে দল বেঁধে থানায় যাবে । বিনা অপরাধে বড়বাবুর কেন তলব ?
পরেরদিন সকালবেলা । রুটি ও কুমড়োর তরকারি রেডি । সবাই রুটি তরকারি খেয়ে চায়ের জন্য অপেক্ষারত ! নতুন বৌ লতা চা বানালো । চায়ের চুমুক দিয়ে ঘোতন সকলের উদ্দেশে বলল, “আর দেরী করা যাবে না । পরের ট্রেনটা মিঁয়া হল্টে ঠিক নটা দশ মিনিটে । ঐ ট্রেন যেভাবে হোক পেতে হবে । নতুবা অনেক দেরী হয়ে যাবে ।“
মিঁয়া থেকে সালার । সালার স্টেশনে নেমে বাসে নিয়ামতপুর থানা ।
বাড়ি থেকে বের হতে যাবে ঠিক সেই সময় চঞ্চল বটব্যাল এসে হাজির । চঞ্চল বটব্যাল পাশের গ্রামে বাস করেন । তিনি পুলিশের বড় অফিসার । এতকাল উত্তরবঙ্গে পোস্টিংয়ে ছিলেন । খুব সম্প্রতি তিনি নিয়ামতপুর থানায় বদলী হয়ে এসেছেন । গাঁয়ে তাঁর অনেক জমি জায়গা । এলাকার মানুষ তাঁকে সমীহ করে চলেন । কঙ্কাবতী শুনেছে, চঞ্চল বটব্যাল নাকি নিয়ামতপুর থানার মেজবাবু । কিন্তু কঙ্কাবতী ঘুণাক্ষরেও ভাবেনি, তাঁর মতো নামজাদা পুলিশ অফিসার তার বাড়িতে আসবে । তাই চঞ্চল বটব্যালকে দেখে কঙ্কাবতী তাঁকে আপ্যয়ন করতে ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠলো ।
কঙ্কাবতীর ব্যতিব্যস্ততা দেখে চঞ্চলবাবু বললেন, “আপনি ব্যস্ত হবেন না । বরং যেখানে যাচ্ছেন সেখানে যাওয়ার প্রতি ধ্যান দিন ।“
“তা হয় নাকি ! আপনি জীবনে প্রথম আমাদের মতো গরীবের বাড়িতে পা রাখলেন । সুতরাং আপনাকে একটিবারের জন্য হলেও বসতে হবে । আপনাকে চা খেয়ে যেতে হবে । দরকার হলে, থানায় একটু পরে যাবো ।“
“উহুঁ ! থানায় যেতে দেরী করবেন না । সেই কথা বলতেই আমার আসা । থানায় আপনাকে আর্জেন্ট দরকার ।“ চঞ্চল বটব্যাল জোর দিয়ে কঙ্কাবতীকে বললেন ।
সাহস পেয়ে কঙ্কাবতী চঞ্চলবাবুকে জিজ্ঞাসা করলো, “থানায় কেন আমার মতো গরীব মানুষের হঠাৎ তলব ? আমার মাথায় কিচ্ছু ঢুকছে না ! বিপদের কথা ভেবে গত রাত্রিতে আমার ঘুম হয়নি । থানায় আমাকে তলব কেন, জানালে আশ্বস্থ হতাম ।“
আমি কিচ্ছু জানি না । আমাকে বড়বাবু আপনার সঙ্গে দেখা করতে নির্দেশ দিয়েছেন এবং আপনাকে থানায় সঠিক সময়ে পৌঁছানোর জন্য বলেছেন ।
কঙ্কাবতী পুনরায় চঞ্চল বটব্যালবাবুকে বলল, “স্যার, আমার বড্ড ভয় করছে ! জীবনে এভাবে থানা থেকে আমাকে কোনোদিন ডাকেনি । এমনকি কোনো প্রশাসনিক দপ্তর থেকেও এভাবে ডাক পাইনি ।“
“আপনি অযথা উতলা হবেন না । থানার বড়বাবু ভীষণ ভদ্র মানুষ । আপনাদের কোনোরকম অসুবিধা হবে না ।“ চঞ্চলবাবু কঙ্কাবতীকে আশ্বস্ত করলেন । তারপর তিনি বাড়ির দিকে রওনা দিলেন ।
আর কালবিলম্ব না করে কঙ্কাবতী তার চার মেয়ে ও চার জামাই এবং দুই ছেলে ও দুই বৌমা এবং স্বামী অনিন্দ্যকে নিয়ে নিয়ামতপুরের দিকে রওনা দিলো । পরিবারের সবাইকে নেওয়ার একটাই উদ্দেশ্য, যদিও বিপদজনক কিছু ঘটে তবে সকলে মিলে থানার বড়বাবুর চেম্বারের বাইরে ধর্ণায় বসবে । নিরপরাধ মানুষকে ডেকে এনে কেন হুজ্জুতি ? কঙ্কাবতীর দূরদৃষ্টি সাংঘাতিক । বিপদে পড়লে নিজের লোকেরাই পাশে দাঁড়াবে । পাড়া প্রতিবেশীরা সমালোচনায় সিদ্ধহস্ত, অথচ বিপদে পড়লে তাঁরা বরং মুখটা ঘুরিয়ে নেয় । বেশী করে কটুকথা শোনায় । তাঁদের ভাবটা এমন, আমরা যতো বিপদে পড়বো ততো তাদের শান্তি !
সালারে পৌঁছে কী বিপদ ! নিয়ামতপুর যাওয়ার কোনো বাস নেই । বাস ধর্মঘট । সকাল ছ’টা থেকে সন্ধ্যা ছ’টা পর্যন্ত । সালার থেকে নিয়ামতপুর যাওয়ার রাস্তা খুব বেশী নয় । খুব বেশী সময় লাগলে, লাগবে আধা ঘন্টা । সকাল দশটা বাজে । কীভাবে পৌঁছাবে সেই চিন্তায় কঙ্কাবতী অস্থির । বাড়িতে এসে থানার মেজবাবু বলে গেছেন, ঠিক সময়ে থানায় পৌঁছাতে । অথচ যাতায়াতের কোনো যানবাহন নেই । সালার থেকে ট্যাক্সি ভাড়া করলে, অনেক টাকা খরচ ! তারা সংখ্যায় অনেক । বড় গাড়ি দরকার ! কঙ্কাবতী ঠাহর করতে পারছে না, তারা এখন কীভাবে পৌঁছাবে ?
ইত্যবসরে বড়বাবুর টেলিফোন, “হ্যালো ! আমি কি কঙ্কাবতী ম্যাডামের সঙ্গে কথা বলছি ?”
মায়ের কাছ থেকে মোবাইল কেড়ে নিয়ে মনীষা পাল্টা জানতে চাইলো, “আপনি কে বলছেন ?”
“আমি নিয়ামতপুর থানার বড়বাবু বলছি ।“
“নমস্কার স্যার । আমি কঙ্কাবতীর মেয়ে বলছি । ট্রেন থেকে নেমে আমরা সালারে আটকে গেছি । বাস ধর্মঘট ! নিয়ামতপুর পৌঁছানোর কোনো যানবাহন নেই । কী করব, ঠিক বুঝতে পারছি না ।“
আপনারা একসঙ্গে কতোজন আছেন ?
আমরা পরিবারের সবাই আছি । সংখ্যায় ১৪জন । বড় বৌদি আবার সন্তান সম্ভাবনা । যার জন্য আরও চিন্তা !
বড়বাবু আবার জিজ্ঞাসা করলেন, “এই মুহূর্তে আপনারা ঠিক কোথায় দাঁড়িয়ে আছেন ?”
আমরা স্টেশন লাগোয়া রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছি ।
“আপনারা সকলে সালার স্টেশনের টিকিট কাউন্টারের কাছে গিয়ে দাঁড়ান । সালার থানা থেকে পুলিশের গাড়িতে আপনাদের নিয়ামতপুরে পৌঁছে দেবে ।“ বড়বাবু তারপর লাইন কেটে দিলেন ।
কঙ্কাবতী আরও শঙ্কিত, কী বিপদ তাদের জন্য অপেক্ষা করছে ! পুলিশ নিজ দায়িত্বে তাদের থানায় নিয়ে যাচ্ছে । অনিন্দ্য যতোবার বোঝাবার চেষ্টা করছে, আমরা সবাই তোমার পাশে আছি। সুতরাং ভয়ের কোনো কারণ নেই । তবুও কঙ্কাবতীর আশঙ্কার ধন্দে কাটছে না । ভয়ে বরং বলা চলে গুটিয়ে রয়েছে । অথচ থানার বড়বাবুর ডাককে উপেক্ষা করতে পারছে না । ঘোতনও মাকে বোঝাচ্ছে, “তুমি অযথা চিন্তা করছো ? নিশ্চয় বড়বাবু কোনো কাজের কথাবার্তার জন্য ডেকে পাঠিয়েছেন !”
ইতিমধ্যে সালার থানা থেকে পুলিশের দুখানি জিপ গাড়ি এসে হাজির ।
জেলার মধ্যে নিয়ামতপুর থানা একটি গুরুত্বপূর্ণ পুরানো থানা । আশেপাশে অনেক লোকজন ও দোকানপাট । এলাকায় হিন্দু-মুসলমান সব শ্রেণীয় মানুষের বসবাস । তবুও মানুষের মধ্যে সম্প্রীতির বন্ধন অটুট । এই ব্যাপারে থানার ভূমিকা অনস্বীকার্য । নিয়ামতপুরে রয়েছে ব্লক অফিস, রেজিস্ট্রি অফিস, হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, আরও অসংখ্য ছোট ছোট অফিস । যার জন্য মহাকুমার মধ্যে নিয়ামতপুরের গুরুত্ব অপরিসীম ।
থানায় নামার সাথে সাথে ভয়ে কঙ্কাবতীর বুক ধড়ফড় !
থানার সামনে নীল-লাল বাতি লাগানো বেশ কয়েকটা গাড়ি । গাড়ি দেখে কঙ্কাবতীর আরও ভয় পেয়ে গেলো । অনিন্দ্যকে বলল, “আমাকে এক গ্লাস জল খাওয়াও ।“
অনিন্দ্য তড়িঘড়ি দোকান থেকে দশ টাকা দিয়ে জলের বোতল এনে কঙ্কাবতীকে খাওয়ালো । তারপর তার তেষ্টা মেটে ।
চঞ্চল বটব্যাল হাসতে হাসতে কঙ্কাবতীর কাছে উপস্থিত । তিনি কঙ্কাবতীকে বললেন, “আমরা আপনার জন্য অপেক্ষা করছি ।“
কঙ্কাবতী তখনও ভয়ে জড়সড় । কঙ্কাবতীর আড়ষ্টতা অবলোকন করে চঞ্চলবাবু আবার বললেন, “ম্যাডাম, ভয়ের ব্যাপার নয় । আপনি আপনার কথা নির্ভয়ে বলবেন । এখন আমার সঙ্গে চলুন ।“
আপনার সঙ্গে কোথায় যাব ?
বড়বাবুর চেম্বারে ।
আমার স্বামী ও পরিবারের লোকজন কখন যাবে ?
আপনি ভিতরে ঢুকে স্যারকে বলবেন, “আপনার পরিবারের লোকজন আপনার সঙ্গে আলোচনায় থাকতে চায় ? তিনি সানন্দে সম্মতি জানাবেন । কিন্তু এই মুহুর্তে আপনি একা আমার সাথে বড়বাবুর চেম্বারে ঢুকুন । কেননা সেখানে জেলার অনেক উচ্চপদস্থ আধিকারিকগণ বসে আছেন । বড়বাবুর অনুমতি ব্যতিরিকে পরিবারের লোকজন চেম্বারে ঢোকাটা শোভনীয় হবে না । আর সময় নষ্ট করবেন না । আমার সঙ্গে চলুন ।“
বড়বাবুর চেম্বারে ঢুকে দুই হাত জড়ো করে কঙ্কাবতী বলল, “নমস্কার স্যার ।“
“বসুন ।“ হাত দিয়ে চেয়ারটা দেখিয়ে দিলেন বড়বাবু । বড়বাবুর নির্দেশ মতো কঙ্কাবতী চেয়ারে বসলো ।
তারপর বড়বাবু আবার বললেন, আপনার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিই । আপনার পাশে রয়েছেন এলাকার বি ডি ও সাহেব এবং একেবারে সামনে রয়েছেন মহাকুমা শাসক এবং বা-পাশে রয়েছেন অতিরিক্ত জেলা শাসক । আপনাকে এখানে ডাকার কারণ এবার খুলে বলি ।
কঙ্কাবতী বড়বাবুর দিকে তাকিয়ে বলল, “স্যার, আলোচনার মধ্যে আমার পরিবারের লোকজন থাকলে ভাল হয় ।“
“অবশ্যই তারা থাকবেন ।“ বড়বাবু তারপর চঞ্চলবাবুকে বললেন, “কঙ্কাবতীর সাথে যারা এসেছেন, সবাইকে ডাকুন ।“
একদিকে জেলা প্রশাসনের মানুষজন বসেছেন এবং ঠিক তার উল্টোদিকে মুখোমুখি কঙ্কাবতীর বাড়ির লোকজন ।
বড়বাবু শুরু করলেন, “আপনার নাম কঙ্কাবতী ?”
হ্যাঁ স্যার ।
আপনার চার মেয়ে ও দুই ছেলে ?
“হ্যাঁ স্যার । কিন্তু স্যার, আমার বাড়ির এত খবর জানলেন কীভাবে ?” কৌতুহলবশত জিজ্ঞাসা করলো কঙ্কাবতী ।
“সেই প্রসঙ্গে পরে আসছি । এবার আপনার সঙ্গে কয়েকটা জরুরি কথা সেরে নিই !” বড়বাবু হাসিমুখে কথাগুলি বলছিলেন । ঠিক তার মাঝখানে কঙ্কাবতী মুখটা ভার করে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “স্যার, আমি জ্ঞানত কোনো অন্যায় করিনি । আবার কী ধরনের বিপদের কথা শোনাবেন, বুঝতে পারছি না ?”
অতিরিক্ত জেলা শাসক চঞ্চলবাবুর দিকে তাকিয়ে জানতে চাইলেন, “আপনারা ম্যাডামকে কিছু জানাননি ?”
চঞ্চলবাবু সঙ্গে সঙ্গে উত্তরে বললেন, “স্যার, আমাদের বড়বাবু স্যারের নির্দেশ ছিল ‘ম্যাডামকে আগেভাগে কিছু না জানাতে’ । সেই মোতাবেক আমরা ম্যাডামকে কিছুই জানাইনি ।“
এবার বড়বাবু অতিরিক্ত জেলা শাসকের দিকে তাকিয়ে বল্লেন, “ম্যাডামকে সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্য খবরটা জানাইনি ।“
তারপর অতিরিক্ত জেলা শাসক কঙ্কাবতীর কাছে গিয়ে বললেন, “আপনি বসুন ম্যাডাম । বড়বাবু একটা ভাল খবর শোনাবেন । যে খবরটার জন্য আমরা জেলার মানুষ গর্বিত ।“
বাড়ির সকলের দৃষ্টি এখন বড়বাবুর দিকে ।
বড়বাবু আবার শুরু করলেন, “ম্যাডাম, আপনি সমস্ত প্রতিকুলতা কাটিয়ে যেভাবে আপনার চার মেয়েকে মানুষ করেছেন এবং তাদের নিজের পায়ে দাঁড়াতে সহযোগিতা করেছেন, তার স্বীকৃতি স্বরূপ কেন্দ্রিয় সরকার আপনাকে “নারীশক্তি” সম্মাননা দিয়ে সম্মান জানাবেন । এটি একটা বিরল সম্মান । আমাদের রাজ্য থেকে একমাত্র আপনি সেটা পাচ্ছেন ।“
খবরটা জানানোর সাথে সাথে সকল প্রশাসনিক কর্তাব্যক্তি উঠে দাঁড়িয়ে হাত তালি দিয়ে কঙ্কাবতীকে সম্মান জানালো । কঙ্কাবতী তখন তার চোখের জল ধরে রাখতে পারলো না । স্পটেই কেদে দিলো । পরিবারের সবাই তখন কঙ্কাবতীকে জড়িয়ে ধরে আবেগে উচ্ছ্বাসে আনন্দাশ্রুতে বিহ্বল ।
————-০—————

Share This
Categories
কবিতা রিভিউ

ঈশ্বরী পাটনির সন্ধানে; দুই : শুভঙ্কর দাস।

ঈশ্বরী পাটনির সন্ধানে। দুই

প্রতিটি পদক্ষেপে ব্যর্থতা।
ছাত্রজীবনে প্রবেশিকা পরীক্ষায় ফেল।
আবার চেষ্টা, আবার ফেল।
ক্রমাগত কয়েকবারের চেষ্টায় উত্তীর্ণ।
বি.এ. পরীক্ষা দেন প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে,কিন্তু পরীক্ষা ভালো দেননি বলে,অনার্স টিকল না।
বিলেত গেলেন আইসিএস হবেন বলে,সেখানেও ব্যর্থ।
নিজের ব্যর্থতা নিয়ে রসিকতা করে বলতেন,I came out first in the unsuccessful list’
বিলেতে গেছিলেন আইসিএস হতে কিন্তু ফিরে এলেন ব্যারিস্টার হয়ে।
কলকাতায় ফিরলেন ১৮৯৩ সালে,আবার ব্যর্থ।পসার জমাতে।
এদিকে মারাত্মক বিপদ।পিতার মৃত্যু। এবং বিপুল ঋণের বোঝা পুত্রের কাঁধে।
আদালত তাঁদের পরিবারকে দেউলিয়া ঘোষণা করলেন।
কী করবেন?
শুরু করলেন পড়াশোনা। নানা ধরণের বই পড়তে লাগলেন।বেশি পড়লেন কবিতা।
লিখে ফেললেন কাব্যগ্রন্থ ‘মালঞ্চ’। পাঠকসমাজ পেল নতুন কবি।
সেই সঙ্গে সম্পাদনা করছেন সাহিত্যের পত্রিকা।
তারপর সহসা অলৌকিকভাবে হাতে আসে আলিপুর বোমার মামলা।জয়লাভ করলেন।রক্ষা করলেন ঋষি অরবিন্দকে।
ব্যাস,সেই শুরু, একজন মহামানবের পথচলা।
তারপর এমন বিখ্যাত ও প্রভাবশালী আইনজীবী ও স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রাণপুরুষ হয়ে উঠলেন,লোকে তাঁর চোখে দেশ দেখতে শুরু করলেন।
শুধু বিরাট পিতৃঋণ শোধ করেননি,দানে-ধ্যানে-চরিত্রে-কর্মে হয়ে ওঠেন প্রবাদপ্রতিম।
মহাত্মা গান্ধি পর্যন্ত তাঁর সঙ্গে লড়াই নেমে চোখের জল ফেলে বলে ওঠেন,হমে হারা দিয়া।
সেই যোদ্ধা, কবি, দানসাগর যখন পরলোকগমণ করলেন সারা দেশ মহাশূন্যতায় ডুবে গেছিল।
ডক্টর বিধানচন্দ্র রায় সেই মহামানবের ছবি নিয়ে ছোটেন রবীন্দ্রনাথের কাছে।
আবেদন, এই ছবির ওপর একটা কবিতা লিখে দিতে।
রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন,ডাক্তার, এ তো প্রেসক্রিপশন করা নয় যে,কাগজ ধরলে আর চটপট লেখা হয়ে গেল।
বিধানচন্দ্র জানালেন,তিনি অপেক্ষা করবেন।
অবশ্য বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়নি।
রবীন্দ্রনাথ লিখে দিলেন,

” এনেছিলে সাথে করে মৃত্যুহীন প্রাণ
মরণে তাহাই তুমি করে গেলে দান।”

আশা করি বুঝতে পারছেন,কার কথা বলছি,দেশবন্ধু।
চিত্তরঞ্জন দাশ।

তাই পড়াশোনা,সত্যিকারের পড়াশোনা, কার জীবন কীভাবে বদলে দেবে,সেটা কেউ জানেন না!
একমাত্র মা সরস্বতী ছাড়া!

শুভঙ্কর দাস। ০৬/০৭/২০২২

Share This