Categories
নারী কথা

কবিতা পরমেশ্বরী : শুভ্রাশ্রী মাইতি।

দুপুরের ঘুঘুডাকা নির্জনতা। পাতা পড়লেও বোধহয় শব্দ শোনা যাবে পুকুরে–টুপ্। মামার বাড়ির লাইব্রেরির চৌদ্দো হাজার বইয়ের আলমারির পাশে বইপাঠে নিমগ্ন একাকী বালিকা।
অক্ষর, অক্ষর পেরিয়ে শব্দ, ছন্দ, উপমা, যতি, ব্যঞ্জনা, অভিজ্ঞতা, উপলব্ধি আর বোধির এক আশ্চর্য আলোকিত রূপকথা জগত। পা ফেলে মেয়েটি, সন্তপর্ণে। মাকে দেখেছে তো সে ছোট থেকে, এই অজানা জগতটি থেকে ঘুরেফিরে বেরোতে। জাবদা খাতায় মুক্তোর মতন অক্ষর সাজিয়ে লিখে ফেলতে মনের কথা। কেমন যেন আলো আলো হয়ে ওঠে মায়ের মুখটা তখন। মাকে জিজ্ঞেস করে জেনেছে, একে বলে কবিতা। অবাক হয়েছে খুব। কি আশ্চর্য, একেবারে তারই নামটি কেটে বসানো যে। লেখাগুলোকে বড় আপন মনে হয় তার। মায়ের পেটের বোনটি যেন।
সে ও লিখতে শুরু করে খাতায়। ছোট মনের ছোট, ছোট কথা। দুঃখ-ব্যথা। বয়স মোটে ছয় কি সাত। এতটুকু মেয়ে হলে হবে কি, হৃদয় আর বোধ যেন তার কত বড়। শুধু ফুল, পাখি, গাছ, নদী নয়, তাকে টানত জীবন। মানুষের জীবন। চারপাশ থেকে কুড়িয়ে নেওয়া ছোট, বড় অভিজ্ঞতা। কৃত্রিম বা বানানো কোন কিছুতে তার বিশ্বাস নেই মোটে। জীবনে যা নেই, তাকে কলমে এনে কি এমন রাজ্যোদ্ধার হবে—এমনই ছিল ভাবখানি তার।
কৈশোরে কবিতার জগতে নতুন ভুবনের দরজা খুলে দিল তার কাছে বুদ্ধদেব বসুর কবিতা পত্রিকা এবং জীবনানন্দ দাশের কবিতাবলী। মেয়েটি বুঝল, তার অনেক কিছু বলার আছে। আর এই বলার একটা মাধ্যম হল তার লেখালিখি। লেখা হয়ে উঠল তার নিয়তি।
যৌবনে পা দিয়ে সে দেখল মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক, সামাজিক বঞ্চনা, নারী-পুরুষের বৈষম্য, ক্ষমতার রাজনীতি, পুরুষের আধিপত্যবাদী অনুশাসন। অথচ কত শান্ত, নিশ্চুপ সকলে। সমস্ত অসমতার বিরূদ্ধে গর্জে উঠল তার প্রতিবাদী কলম, সহজ, প্রত্যয়ী উচ্চারণে—
‘ না, আমি হবো না মোম
আমাকে জ্বালিয়ে ঘরে তুমি লিখবে না।
…
কবিতা লেখার পর বুকে শুয়ে ঘুমোতে দেব না।’

লোনাজলের ঝাপসা হয়ে যাওয়া নারীর ভেতর এই যে আরেক নারী, তার ক্ষোভ, ক্রোধ, অভিমান নিয়ে যে ‘বাসন্তী অসুখ’ তাকে তিনি চোখের ঝিনুকে নয়, ধরলেন কলমের শাণিত তরবারিতে, জলের অক্ষরে—
‘ কি নেবে দেহের থেকে? মাংস মেদ বসা?
প্রাগৈতিহাসিক অগ্নি? পোড়া মাংসের ঘ্রাণ, রক্ত-পানীয়
নখ দাঁত চুল কিংবা অন্নপাত্র দিব্য করোটি?
অথবা কি নিষ্কাশন করে নেবে প্রতিভা ও মেশিনের মিশ্র কুশলতা?
…
দেহের থেকে চাড় দিয়ে ক্রমাগত খুলে নেবে শিশু।’
পুরুষতান্ত্রিক সমাজের নির্মিত আশ্রয় দাত্রী, রহস্যময়ী, পেলব নারীর সাজানো মিথকে ভেঙে বিশ শতকের আধুনিক নারীসত্তার দৃপ্ত উচ্চারণে নারীকে প্রথম প্রতিষ্ঠা করলেন তিনি কলমের জোরে।
‘কবিতা পরমেশ্বরী’, কবি, সেই কবিতা সিংহকে আজ এই নারীদিবসে জানাই অন্তরের অক্ষরফুলে সশ্রদ্ধ প্রণাম। তাঁর ‘সহজসুন্দরী’- হয়ে যেন বলে উঠতে পারি আমরা একদিন—-
‘ আমি
মৃত্যুর মতন নগ্ন, অশ্বারোহিণী এক
নিজ অশ্বে একা
অহংকার ছুঁড়ে দেওয়া আরো বড় অহংকারে ধনী।'( ‘অহংকার’)

‘আমিই প্রথম বিদ্রোহিণী ‘। ( ঈশ্বরকে ইভ)

Share This
Categories
গল্প প্রবন্ধ

কল্যাণীর সতীমার দোল মেলা ও কর্তাভজা সম্প্রদায় — একটি পর্যালোচনা : দিলীপ রায় (+৯১ ৯৪৩৩৪৬২৮৫৪)।

যতদূর জানা যায়, আনুমানিক দুশো বছর আগে আউলিয়া সম্প্রদায়ের সতীমা অর্থাৎ সরস্বতী দেবী এই মেলার প্রবর্তন করেন । এপার বাংলা- ওপার বাংলায় যথেষ্ট জনপ্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ ঘোষপাড়ার সতীমার দোল মেলা । খ্রিষ্টীয় অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি বাংলার অন্ত্যজ সম্প্রদায়ের মানুষদয়ের নিয়ে গড়ে ওঠে আউলচাঁদ সমাজ । এই সম্প্রদায়ের আদিগুরু ছিলেন আউলচাঁদ । তাঁর মৃত্যুর পর আউল সমাজের কর্তাপদ লাভ করেন রামশরণ পাল । তাঁরই স্ত্রী ছিলেন সরস্বতী দেবী যিনি পরবর্তীকালে সতী মা নামে প্রসিদ্ধি লাভ করেন ।
বাউল, কীর্তন, লোকগীতি, পল্লীগীতির সুরে মেলা জমে ওঠে । আখড়ায় আখড়ায় সারা রাত ধরে বসে গানের আসর । শ্রোতারা অধিকাংশই গ্রাম ও মফঃস্বলের । বিভিন্ন জায়গায় তৈরী হয় লালন মঞ্চ । গানের পাশাপাশি বিশাল উনুন জ্বালিয়ে ক্ষুন্নিবৃত্তির ব্যবস্থা হয় ঐ আখড়াগুলিতে । দূরদূরান্তের যাত্রীদের আশ্র্যস্থল এই আখড়াগুলি ।


এবার আসছি কর্তাভজা সম্প্রদায় প্রসঙ্গে ।
কর্তাভজা সম্প্রদায় আঠারো শতকে বৈষ্ণববাদ ও সুফিবাদ থেকে বিকশিত একটি ক্ষুদ্র ধর্মীয় সম্প্রদায় । এই সম্প্রদায়ের মূল গুরু আউল চাঁদ ।
প্রথমেই বলি, আউল চাঁদ হলেন একজন বাঙালি ধর্ম প্রচারক ও কর্তাভজা সম্প্রদায়ের আদিগুরু । কিংবদন্তি বা লোকবিশ্বাস যে, গোরাচাঁদ অর্থাৎ শ্রীচৈতন্যদেব আউল চাঁদ রূপে পুনরায় আবির্ভূত হয়েছেন । গৃহী মানুষকে বৈরাগ্য ধর্ম শেখাতে শ্রীচৈতন্য আবির্ভূত হন আউল চাঁদ ফকির হয়ে । এখানে তাই কোনো জাতিভেদ নেই ।
আউল চাঁদের জন্ম খ্রিষ্টাব্দ নিয়ে অনেক মতভেদ রয়েছে । শোনা যায়, তিনি হিন্দু না মুসলমান সেটা স্পষ্টভাবে জানা যায়নি । তবে প্রচলিত লোক কাহিনী অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গের ২৪ পরগনা জেলার উলা গ্রামের ( অনেকের মতে, নদীয়া জেলার প্রাচীন জনপদ উলা বীরনগর ) পান ক্ষেত থেকে একটি নবজাতক শিশু পাওয়া যায় । ক্ষেতের মালিক মহাদের বারুই ভগবানের আশীর্বাদ ভেবে তাঁকে লালন-পালন শুরু করেন । বড় হয়ে তিনি গৃহত্যাগ করেন । আউল চাঁদের পুরানো নাম পূর্ণচন্দ্র । সংস্কৃত ভাষা শেখানোর জন্য তাঁকে পাঠানো হয় সে সময়কার বিখ্যাত বৈষ্ণবাচার্য হরিহরের কাছে । বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পূর্ণচন্দ্র নানা জায়গায় ঘুরে বেড়ান এবং নানাভাবে শিক্ষালাভ করেন । শেষ পর্যন্ত তিনি সিদ্ধিলাভ করেন । তাঁর নতুন নাম হয় ফকিরচাঁদ বা আউল চাঁদ । বহু দেশ ঘোরার পর নদীয়া জেলার ঘোষপাড়ায় রামশরণ পাল নামে এক ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি তাঁকে আশ্রয় দেন । আউল চাঁদের ২২জন শিষ্যের মধ্যে অন্যতম শিষ্য রামশরণ পাল । ২২জনের মধ্যে রামশরণ পাল আউল চাঁদের মৃত্যর পর গুরুপদ প্রাপ্ত হন । যারজন্য তাঁর নেতৃত্বে পশ্চিম বঙ্গের নদীয়া জেলার ঘোষপাড়ায় প্রতিষ্ঠা করেন কর্তাভজা ধর্মের অন্যতম পীঠস্থান, যা পরবর্তী সময়ে সতী মায়ের মন্দির নামে সবার কাছে পরিচিত । রামশরণ পালের স্ত্রীর নাম সরস্বতী, যার নামেই এই মন্দির—-সতী মায়ের মন্দির । কথিত আছে, সরস্বতীর প্রথম অক্ষর “স” আর শেষ অক্ষর “তী” অনুসারে সতী । আউল চাঁদের শিষ্য রামশরণ পাল গুরুর ভাবাদর্শকে ভিত্তি করে কর্তাভজা সম্প্রদায় গড়ে তোলেন । এইজন্য ভক্তের নিকট তিনি “কর্তা” এবং তাঁর স্ত্রী সরস্বতী দেবী “কর্তামা” নামে অভিহিত । রামশরণ পালের পর সরস্বতী দেবী এই সম্প্রদায়কে নেতৃত্ব দেন । রামশরণ পালের স্ত্রী কর্তাভজা সম্প্রদায়কে দিশা দেখান । রামশরণের স্ত্রী সরস্বতী দেবী ছিলেন অতীব ধর্মপরায়ণা । শোনা যায়, আউল চাঁদ হিম সাগরের জল ও ডালিম গাছের তলার মাটির সাহয্যে সরস্বতী দেবীকে অলৌকিক উপায়ে মৃত্যের হাত থেকে বাঁচিয়েছিলেন । আরও শোনা যায়, আউল চাঁদই রামশরণ পাল ও সরস্বতী দেবীর সন্তান হয়ে পরবর্তীতে জন্ম নেন দুলাল চাঁদ নামে । দুলাল চাঁদ (১৭৭৬-১৮৩৩) কর্তাভজা সম্প্রদায়কে সাংগঠনিক রূপ দেন । তিনি বহু পদ রচনা করে কর্তাভজা ধর্মমতকে একটা তাত্ত্বিক কাঠামোর উপর প্রতিষ্ঠিত করেন । পদগুলি ভাব-গীত-রূপে ভক্তদের নিকট সমাদৃত । কর্তাভজারা কোনো জাতিভেদ মানেন না । তাঁরা লোভ-মোহ-কাম-ক্রোধকে নৈতিক পাপ বলে মনে করেন । সৎ পথে থেকে এবং মিথ্যা কথা পরিহার করে নৈতিকভাবে ধর্মকর্ম করা তাঁদের প্রধান লক্ষ্য । তাঁর সময়ে কর্তাভজা সম্প্রদায়ের খ্যাতি বহুদূর পর্যন্ত গড়ায় । মাত্র ৪৮ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয় । এরপর তাঁর মা অর্থাৎ সরস্বতী দেবী কর্তা মা বা সতীমা নামে খ্যাতিলাভ করেন ।
নদীয়া জেলার ঘোষপাড়ার রামশরণ পালের আদি ভিটেটুকু ভক্তদের কাছে অতি পবিত্র । ভিটের পাশেই ডালিম গাছ । এই গাছের নীচেই যেহেতু সতীমা সিদ্ধিলাভ করেছিলেন সেই হেতু ভক্তরা ডালিম গাছের ডালে ঢিল বেঁধে মানত করেন । বাতাসা, কদমা, চিড়ে, মুড়কি দিয়ে নৈবেদ্য সাজিয়ে ভক্তদের সতীমাকে পুজো দেওয়ার রীতি ।


জনশ্রুতি, শেষ বয়সে সরস্বতী দেবী সন্তানহারা হলে দোলপূর্ণিমার দিন গুরু পুজার আয়োজন করেন । সেই থেকে দোল পূর্ণিমার সূচনা । হাজার হাজার মানুষের সঙ্গেও বাউলেরা আসেন । তাই সতী মায়ের মেলাটা আউল-বাউলের মেলা বা আখড়া নামে পরিচিত ।
কর্তাভজা সম্প্রদায় মূর্তিপুজা এবং সকল প্রকার আনুষ্ঠানিক যাগযজ্ঞের বিরোধী । কর্তাভজা প্রচারক দুলাল চাঁদ রচিত ভাবের গীতে বলা হয়েছে—– “আছে মানুষে মানুষে যার ভেদাভেদ জ্ঞান, সে রাজ্য গমনে তার মিলবে না সন্ধান ।“ উক্ত ভাবের গীত থেকে বোঝা যায় কর্তাভজা সম্প্রদায়ের সাধন ভজনে মানব সেবার প্রসঙ্গটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ । এই প্রসঙ্গে ভাবের গীতে বলা হয়েছে—– “মানুষ ভজ, মানুষ চিন্ত, মানুষ কর সার, সকলি মানুষের খেলা মানুষ বই নাই আর” ।
কর্তাভজা সম্প্রদায়ের উল্লেখযোগ্য দিক হলো এখানে হিন্দু গুরুর মুসলমান শিষ্য যেমন আছেন, তেমনি আছেন মুসলমান গুরুর হিন্দু শিষ্য । এই সম্প্রদায়ে নারী পুরুষ নেতৃত্ব নিয়ে কোন প্রশ্ন তোলা হয় না । এই কারণে গুরুদেবের ভূমিকায় নারী পুরুষ উভয়কেই দেখা যায় । একই ভাবে তাঁরা বাউল সম্প্রদায়ের মতো জাতিভেদ প্রথা মানেন না । দুলাল চাঁদের ভাবের গীতে তাই বলা হচ্ছে—- “ভেদ নাই মানুষে মানুষে, খেদ কেন ভাই এদেশে ।”
সম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল দর্শনের সন্ধান পাওয়া যায় কর্তাভজা সম্প্রদায়ে । এ বিষয়ে কবি নবীন চন্দ্র সেনের বক্তব্য অত্যন্ত প্রনিধানযোগ্য । তাঁর মতে, “কর্তাভজা সম্প্রদায়ে কোন জাতিভেদ নেই । সকলেই এক রন্ধনশালার পাক গ্রহণ করে । ছোঁয়াছুয়ির দোষ এদের কাছে মুখ্য নয় । মানুষ সেবা তাঁদের মুখ্য বিবেচ্য বিষয় ।“
কর্তাভজাদের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো গুরুদেবের পুত্র অযোগ্য হলে তাঁরা তাকে গুরু নির্বাচন করতে চান না । তাঁদের নিয়মাবলী নামক ভাবের গীতে এই প্রসঙ্গে অভিমত ব্যক্ত করে বলা হয়েছে কর্তাভজা সম্প্রদায়ের সাধন ভজন সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান রাখেন এমন ব্যক্তিই গুরুদেব হবার অধিকারী । এই জায়গায় কর্তাভজা সম্প্রদায় বর্ণবাদ এবং ব্রাহ্মণ্যবাদের কবল থেকে বেরিয়ে আসতে সমর্থ হয়েছেন ।
আজও কর্তাভজা সম্প্রদায়ের মধ্যে সতীমায়ের কৃপা পাওয়ার নিরিখে যথেষ্ট উন্মাদনা । তাঁদের মধ্যে সরল বিশ্বাস ও ভক্তি আজও উজ্জীবিত । যার জন্য দোল পূর্ণিমার দিন সতী মায়ের মেলায় হাজার হাজার ভক্তের সমাগম ঘটে । এদেশ ছাড়াও বাংলাদেশ থেকেও মেলাপ্রাঙ্গনে অনেক মানুষের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো । বাউলদের সমারোহ আলাদা মাধুর্যে ভরপুর থাকে ঘোষপাড়ার এই মেলা । (তথ্যঃ সংগৃহীত) ।
—————-০———–
লেখক কথা সাহিত্যিক (ভারত) / +৯১ ৯৪৩৩৪৬২৮৫৪
এ১০এক্স/৩৪, কল্যাণী-৭৪১২৩৫

Share This
Categories
কবিতা

কথামাত্র : শীলা পাল।

ভুলবো না কোনও দিন
চতুর্দশী কন্যাটি লজ্জায় লাল হয়
এই কথা টি বহুজন বহুবার বলে গেছে
ভোরের বেলায় চাঁপার গন্ধে মিশিয়ে দিয়ে
দ্বিপ্রহরের ব্যস্ত সময় চোখে চোখ রেখে
মুগ্ধতার ঝিলিক মৃদু হাসি মৃদু ভাষে কত
কথার বন্দনা রচনা হয়ে যেত
বৈকালের নিবিড় বাঁধনে কত মধুর কাব্যকথা
শুনতে শুনতে চুপিচুপি সন্ধ্যা এসে আড়াল
হয়ে দাঁড়াত
তখন জানা হয়ে গেছে স্তুতি আর বাস্তবের
গতিপথ দুটো ভিন্ন
না বলা কথা টাই অবশেষে জানাল
সবাই ভুলে যায় কিন্তু ভুলব না বলে।

Share This
Categories
কবিতা

আহা এসো এই বসন্তবাতাসে : শীলা পাল।

এযে আমার প্রাণের সখার মতো
মধু বাতাস এসে জড়িয়ে ধরে কি আহ্লাদে
আমার রঙের খেলা যায় নি এখনও ফুরিয়ে
সে কথাটি বলে যায় বারে বারে
পলাশগুলি ফুটেছে কত আহ্লাদে
শিমূল বনের উদাস হাওয়া বলে যায় কানে কানে
সব ছেড়ে দিয়ে এসো আমার কাছে
আমার রঙে করব তোমায় রঙীন
আমার চোখ দুটি বুজে যায় আবেশে
কে যে ডাকে এমন করে বুঝতে পারিনা
লাল রঙে যেন ঢেকে গেছে চারিদিক
শরীরে আমার টুপটুপ
করে ঝরে হলুদে মাখানো পলাশের ডাল থেকে থোকা থোকা হলুদ ফুল
এত রঙ আমি রাখি কোথায়
আমি দুহাত দিয়ে জড়িয়ে ধরি বুকে
এমন ভালো আর কি কেউ বাসতে পারে
বসন্ত যে এসেছে ভুবন জুড়ে
এসো আমার প্রাণে– –বলি মনে মনে বলি হৃদয় দিয়ে।

Share This
Categories
গল্প প্রবন্ধ

জানুন , জগন্নাথের প্রসাদ আস্বাদন করার সময় মহাপ্রভুর কী হয়েছিল? : রাধাবিনোদিনী বিন্তি বণিক।

একদিন মহাপ্রভু গেছেন শ্রীজগন্নাথ দর্শন করতে, সিংহদ্বারে দ্বারপাল তাঁকে দেখেই এগিয়ে এসে চরণবন্দনা করলেন । অমনই মহাপ্রভু , “কোথায় আমার কৃষ্ণ ? আমার প্রাণনাথ কোথায় গো? তুমি আমার সখা ; আমায় দেখাও সখা ,আমার প্রাণনাথকে ।”—-বলে অনুনয় করার মত দ্বারপালের হাতখানা জড়িয়ে ধরলেন। দ্বারপাল বললেন, “আমি দর্শন করাচ্ছি আপনাকে , চলুন ।” শ্রীমন্‌ মহাপ্রভুর হাত ধরে মন্দিরের জগমোহনে নিয়ে গেলেন দ্বারপাল। আর তারপর , শ্রীপুরুষোত্তমকে দেখিয়ে বললেন, “ঐ যে তিনি ! আপনার প্রাণনাথ।”

গরুর স্তম্ভের পাশে দাঁড়িয়ে জগন্নাথ দর্শন করতেন মহাপ্রভু । তিনি কখনোই গর্ভমন্দিরে প্রবেশ করে জগন্নাথ দর্শন করতেন না । প্রতিদিনের মত আজও দ্বারপাল নিয়ে তাঁকে গরুর স্তম্ভের পিছনে বাঁ দিকটায়(গরুড়ের বাম দিক) দাঁড় করালেন এবং সেখান থেকেই মহাপ্রভু দু’নয়ন মেলে জগন্নাথকে দর্শন করলেন । জগন্নাথ আজ এখন মুরলীবদন শ্রীকৃষ্ণ হয়ে ধরা দিলেন মহাপ্রভুর নেত্রে । —-এই লীলার কথা রঘুনাথ দাস গোস্বামী তাঁর ‘শ্রীচৈতন্যস্তবকল্পবৃক্ষ’ গ্রন্থের সপ্তম শ্লোকে প্রকাশ করেছেন।

“ক্ক মে কান্তঃ কৃষ্ণস্ত্বরিতমিহ তং লোকয়
সখে ! ত্বমবেতি দ্বারাধিপমভিবদন্নুন্মদ ইব।।
দ্রুতং গচ্ছ দ্রস্টুং প্রিয়মিতি তদুক্তেন
ধৃততদ্ভুতজান্তর্গৌরাঙ্গো হৃদয় উদয়ন্মাং মদয়তি ।।”

এমন সময় গোপালবল্লভ ভোগ লাগলো জগন্নাথের । ভোগের পর শঙ্খ , ঘন্টা আদি সহ আরতি হল । ভোগ সরলে জগন্নাথের সেবকগণ প্রসাদ নিয়ে মহাপ্রভুর কাছে এলেন। তাঁকে প্রসাদী মালা পরিয়ে প্রসাদ হাতে দিলেন। সেই প্রসাদের আঘ্রাণ নিলেন মহাপ্রভু আর বললেন, “বহুমূল্য প্রসাদ ! এ যে সর্বোত্তম বস্তু !” এর অল্প নিয়ে তিনি জিহ্বায় দিলেন আর বাকিটা সেবক গোবিন্দ দাস আঁচলে বেঁধে নিলেন। সেই কণিকা মাত্র প্রসাদের অমৃতাস্বাদ করে প্রভুর মনে যেন চমৎকার হলো, সর্বাঙ্গে পুলক তাঁর । আর নেত্র থেকে অশ্রুধারা বইতে থাকলো। তিনি আপন মনে বিস্মিত হয়ে বললেন , “এই দ্রব্যে এত স্বাদ কোথা থেকে এলো ! ওহ্‌, এতে তো কৃষ্ণের অধরামৃত সঞ্চারিত হয়েছে ! তাই বুঝি এই বস্তু এত মধুময় হয়েছে স্বাদে !”—- এ কথা ভাবতে ভাবতেই তাঁর মধ্যে প্রেমাবেশ হলো । কিন্তু পরক্ষণেই তিনি নিজেকে সম্বরণ করে নিলেন জগন্নাথের সেবকরা তাঁর সামনে আসায় ।

মহাপ্রভু বারবার ‘সুকৃতিলভ্য ফেলামৃত’ বলতে থাকলেন। জগন্নাথের সেবক মহাপ্রভুর মুখে এই শব্দ শুনে জিজ্ঞাসা করলেন “প্রভু , সুকৃতিলভ্য ফেলামৃত মানে কি? অর্থ কি এর ?” তখন মহাপ্রভু বললেন , “এই যে তুমি আমায় কৃষ্ণের অধরামৃত দিলে ,এই বস্তু ব্রহ্মা আদি দেবতাদেরও দুর্লভ এবং অমৃতের স্বাদকেও নিন্দনীয় হতে হয় এর কাছে। শ্রীকৃষ্ণের ভুক্তাবশেষের নামই হল ফেলা । তিনি ভাগ্যবান যিনি ফেলামৃত লব মাত্র পান । সামান্য ভাগ্য যার সে এই বস্তু প্রাপ্ত হতে পারে না। যাঁর প্রতি শ্রীকৃষ্ণের পূর্ণ কৃপা তিনি তা পান। আর, তিনিই সুকৃতীবান যাঁর প্রতি শ্রীকৃষ্ণের কৃপা থাকে । অর্থাৎ সুকৃতিলভ্য ফেলামৃত মানে হল যাঁর সুকৃতি লাভ হয় অর্থাৎ শ্রীকৃষ্ণের কৃপা লাভ হয় তিনিই ফেলা রূপ অমৃত লাভ করতে পারেন ; শ্রীকৃষ্ণের অধরামৃত আস্বাদনের অধিকারী হন।”— এই বলে মহাপ্রভু সকলকে বিদায় দিলেন । তারপর জগন্নাথের উপলভোগ দর্শন করে গম্ভীরায় ফিরে এলেন।

মধ্যাহ্নকালে ভিক্ষা নির্বাহণ করলেন মহাপ্রভু । কিন্তু অন্তরে কৃষ্ণ-অধরামৃতের স্বাদ সর্বদা স্মরণ হচ্ছে তাঁর। বাইরে কর্ম করছেন অথচ অন্তরে প্রেমে গরগর মন হয়ে আছে। সেই সঘন আবেশ অত্যন্ত কষ্ট করে সম্বরণ করছেন তিনি। সন্ধ্যা বেলায় যখন পুনরায় নিজের পার্ষদগণের সাথে বসে কৃষ্ণকথা রঙ্গে নিভৃতে কাল কাটাচ্ছেন , তখন সেবক গোবিন্দ দাসকে ইঙ্গিত দিলেন দুপুরের সেই আঁচলে বেঁধে রাখা প্রসাদ এখন আনার জন্য । পুরী-ভারতী তথা তাঁর গণের সন্ন্যাসীদের জন্য কিছুটা পাঠিয়ে দেওয়া হলো , আর সেখানে উপস্থিত রামানন্দ রায় , সার্বভৌম ভট্টাচার্য , স্বরূপ দামোদর ও অন্যান্যদের সেই প্রসাদ বিতরণ করা হলো। প্রসাদের সৌরভ-মাধুর্য আস্বাদন করেই সকলে বিস্মিত হলেন । যে প্রসাদ এমন দিব্য সৌরভ সম্পন্ন , সেই প্রসাদের স্বাদ না জানি কেমন অলৌকিক হবে ! তখন মহাপ্রভু বললেন , “দ্যাখো, প্রসাদে যা যা আছে যেমন ধরো আখের গুড় , কর্পূর, মরিচ, এলাচ , লবঙ্গ,কাবাবচিনি, দারুচিনি এইগুলো সব প্রাকৃত দ্রব্য। তোমরা সকলেই এই সব প্রাকৃত দ্রব্যগুলোর স্বাদ, সুগন্ধ কেমন জানো । কিন্তু এই প্রসাদে তাহলে এত আমোদ কোথা থেকে এলো? প্রসাদের এই সৌরভ —এতো লোকাতীত ! এর আস্বাদন তাহলে কত না দিব্য ! আস্বাদ করে দেখ সকলের মনে প্রতীত হবে তাহলে। আস্বাদন তো অনেক পরের কথা , কেবল গন্ধেই মন মাতিয়ে দেয়। তাই না ! প্রসাদের এমন মাধুর্য যে আস্বাদন সময়ে আস্বাদন ব্যতীত অন্য সকল কিছু বিস্মৃত করিয়ে দেয় । কেন? কারণ , শ্রীকৃষ্ণের অধর স্পর্শ করেছে এই প্রসাদ। তাঁর অধর রসের গুণ সব সঞ্চারিত হয়েছে প্রসাদে, তাইতো অলৌকিক সুগন্ধ মাধুর্য হয়েছে এমন ! মহাভক্তি করে সকলে প্রসাদ আস্বাদ করো।”
সকলে হরিধ্বনি দিয়ে প্রসাদ আস্বাদন করলেন এবং আস্বাদন মাত্রই সকলের মন প্রেমে মত্ত হল। মহাপ্রভুর মধ্যে প্রেমাবেশ সে সময় । তিনি আজ্ঞা দিলেন রামানন্দ রায় কে শ্লোক পাঠ করতে। রামানন্দ রায় শ্রীমদ্‌ ভাগবতের শ্লোক উচ্চারণ করলেন ।

“সুরতবর্দ্ধনং শোক নাশনং , স্বরিতবেণুনা সুষ্ঠচুম্বিতম্ ।
ইতররাগবিস্মারণং নৃণাং, বিতর বীর নস্তেহধরামৃতম্ ।।”
(শ্রীমদ্ ভাগবত, ১০, ৩১, ১৪ শ্লোক)

—– শ্রীকৃষ্ণ যখন রাসমন্ডল থেকে অকস্মাৎ অন্তর্ধান হয়ে যান, শোকাকুলা গোপীরা বিলাপ করে বলছেন তখন— হে বীর ! তোমার সেই সুরতবর্ধনকারী (সম্ভোগেচ্ছা ক্রমশঃ বর্ধনকারী) অধরের সুধা যা তোমার বিরহ জনিত শোক রাশিকে নাশ করে তা আমাদেরকে বিতরণ কর । তোমার অধরের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে বেণু পঞ্চম সুরে নাদিত হয়ে মানবের সকল আসক্তি ভুলিয়ে দেয় ; সেই অধরের অমৃত আমাদের দাও।

সেই শ্লোক শ্রবণ করে রসরাজ-মহাভাবের মিলিত স্বরূপ মহাপ্রভু তখন ভাবাবিষ্ট হয়ে রাধার উৎকণ্ঠা জনিত একটি শ্লোক উচ্চারণ করলেন ।

“ব্রজাতুলকুলাঙ্গনেতর রসালি তৃষ্ণাহরঃ ,
প্রদীব্যদধরামৃতঃ সুকৃতিলভ্য ফেললাবঃ।
সুধাজিদহিবল্লিকাসুদলবীটিকাচর্বিতঃ,
স মে মদনমোহনঃ সখি তনোতি জিহ্বাস্পৃহাম্।।”
(গোবিন্দলীলামৃত, ৮, ৮শ্লোক)

—- শ্রীমতী রাধিকা তাঁর সখী বিশাখাকে বলছেন, হে সখি ! অনন্যা ব্রজকুলবতী ললনাদের যিনি অধরামৃত দ্বারা আনন্দ দান করে তাঁদের অন্য সকল রস-তৃষ্ণাকে হরণ করেন , যাঁর চর্বিত তাম্বুলে অমৃতাপেক্ষা অধিক স্বাদ—-সেই শ্রীমদনমোহন আমার জিহ্বার স্পৃহাকে বিস্তৃতি দান করেছেন।

তারপর মহাপ্রভু নিজেই দুই শ্লোকের অর্থ প্রলাপের মত উচ্চারণ করে গেলেন । সকলে শ্রবণ করে ভাবের ভিয়ানে বিহ্বল হলেন। গ্রন্থ– মহাপ্রভুর মধুময় কথা , লেখিকা —- রাধাবিনোদিনী বিন্তি বণিক, প্রকাশক–তথাগত।

Share This
Categories
গল্প প্রবন্ধ

জানুন পীলু ফল নিয়ে মহাপ্রভুর আনন্দময় কাহিনী : রাধাবিনোদিনী বিন্তি বণিক।

শ্রীজগদানন্দ পন্ডিত বৃন্দাবন ভ্রমণ করে নীলাচলে মহাপ্রভুর কাছে ফিরে যাচ্ছেন । শ্রীসনাতন গোস্বামী তাই তাঁর হাত দিয়ে মহাপ্রভুর জন্য কিছু ভেট বস্তু অর্থাৎ উপহার সামগ্রী পাঠালেন । কী কী সেই উপহার ? — রাসস্থলীর বালু , গোবর্দ্ধনের শিলা , শুষ্ক পাকা পীলু ফল আর গুঞ্জামালা । জগদানন্দ পন্ডিত ফিরে যেতেই সনাতনের মন ব্যাকুল হয়ে উঠলো মহাপ্রভুর জন্য। এতদিন তো মহাপ্রভুর অতি কাছের একজন মানুষ, প্রিয় পরিকর বা দূত যাই বলি না কেন তিনি ছিলেন সনাতনের কাছে। জগদানন্দের সঙ্গ পেয়ে সনাতনের মনে হতো যেন মহাপ্রভুর আবেশ উপলব্ধি করছেন । যেমনটা হয় আর কী ! প্রিয়জনের কাছের কাউকে পেলেও মনে এক অদ্ভুত প্রেম ভাব জাগে , ভালো লাগে—তেমন আর কী ! আজ জগদানন্দ চলে যেতে সনাতনের মন তাই কেঁদে উঠলো মহাপ্রভুর জন্য। দ্বাদশ আদিত্য টিলার উপর একটি মঠ পেয়ে , সে স্থান সংস্কার করে চালা বেঁধে রেখে দিলেন তিনি, যাতে ব্রজে এসে মহাপ্রভু সেখানে বাস করতে পারেন নিরালায় ।

ওদিকে জগদানন্দ পথে একটুও দেরী না করে খুব শীঘ্র চলে এলেন নীলাচলে । তাঁর যে আর তর সইছে না মহাপ্রভুকে দু’চোখ ভরে দেখার জন্য। নীলাচলে মহাপ্রভু সহ আর সব ভক্তদের পেয়ে তাঁর মনে পরম আনন্দ হল । প্রভুর চরণ বন্দনা করে সকলের সাথে আলিঙ্গন করলেন। মহাপ্রভুও তাঁকে দৃঢ় আলিঙ্গন দিলেন । ব্রজ থেকে ফেরত এসেছে যে প্রাণপ্রিয় বাল্যবান্ধব জগদানন্দ ! তাই। এরপর জগদানন্দ সেই সমস্ত ভেট তথা উপহার সামগ্রী মহাপ্রভুর শ্রীহস্তে তুলে দিলেন, যা-যা সনাতন প্রেরণ করেছিলেন মহাপ্রভুর জন্য ।

রাসস্থলীর বালু , গোবর্দ্ধনের শিলা আর গুঞ্জামালা নিজের কাছে রেখে মহাপ্রভু পীলু ফলগুলি তখনই সকলের মধ্যে বণ্টন করে দিতে বললেন । ভক্তরা বিশেষতঃ গৌড়ীয়ারা পীলু ফল দেখেননি। গৌড়দেশে পীলুফল হয়ও না। বৃন্দাবন থেকে এসেছে যে ফল সে ফল না জানি কত ভালো , কত সুস্বাদু, কত অমৃতসম মিষ্টি হয়তো বা ! তাই তো সনাতন পাঠিয়েছেন পীলু ফল ! তাই না ! একারণে সকলের মধ্যেই মহা আগ্রহ পীলু ফল খাবার । সকলে মহা আনন্দের সাথে পীলু ফল হাতে নিলেন খাবেন বলে।

যাঁরা জানেন তাঁরা পীলু ফল নিয়ে চুষতে থাকলেন আর যাঁরা জানেন না বিশেষতঃ গৌড়ীয়ারা পীলু ফলে কামড় বসিয়ে চিবোতে শুরু করে দিলেন। আর যে মুহূর্তে চিবোলেন অমনি তাঁদের মুখের ছাল উঠে গেল, জিহ্বা প্রচন্ড জ্বালা করতে থাকলো । আসলে পিলু ফল এমনই হয় ,চিবিয়ে খেতে নেই ,চুষে খেতে হয় । চিবোলেই মুখ জ্বলে যায় । স্বাভাবিক ভাবেই পীলু ফলকে কেন্দ্র করে তখন সেখানে এক মহা রগড় হলো মহাপ্রভু ও ভক্তদের মধ্যে।

“সনাতন প্রভুকে কিছু ভেট বস্তু দিলা ।।
রাসস্থলীর বালু আর গোবর্ধনের শিলা ।
শুষ্ক পক্ক পীলু ফল আর গুঞ্জামালা ।।
জগদানন্দ পণ্ডিত চলিলা সব লইয়া।
*************************************
*************************************
*************************************
সনাতনের নামে পন্ডিত দণ্ডবৎ কৈল।
রাসস্থলীর বালু আদি সব ভেট দিল ।।
সব দ্রব্য রাখি পীলু দিলেন বাঁটিয়া ।
বৃন্দাবনের ফল বলি খাইল হৃষ্ট হইয়া।।
যে কেহ জানে সে আঁটি চুষিতে লাগিল ।
যে না জানে গৌড়ীয়া পীলু চিবাইয়া খাইল।।
মুখে তার ছাল গেল জিহবা করে জ্বালা ।
বৃন্দাবনের পীলু খাইতে এই এক লীলা।।”
(চৈ।চ। অন্ত্য,১৩)

Share This
Categories
গল্প প্রবন্ধ

এক বিতর্কিত-বিগ্রহ কাহিনী : রাধাবিনোদিনী বিন্তি বণিক।

উত্তর ভারত থেকে পুরী যাওয়ার পথে প্রধান সড়কের ধারেই বিষ্ণুপুর অবস্থিত।ব্রিটিশ শাসনের গোড়ার দিকে এখানে মন্দিরের সংখ্যা ছিল ৩৬০টি।ফলে পুরী যাওয়ার পথে পুণ্যার্থীরা এখানে আসতেন আর দেববিগ্রহের পূজা দিয়ে দক্ষিণা-প্রণামীও দিতেন। স্বভাবতঃই মন্দির গুলো থেকে আয় হত প্রচুর।বিষ্ণুপুরের আয়ের এক অন্যতম উৎস ছিল মন্দির। আর, দেববিগ্রহদের মধ্যে সবথেকে বেশী আকর্ষনীয় বিগ্রহ ছিল   শ্রীমদনমোহনদেব। মদনমোহন মন্দিরের  আয় ছিল বিষ্ণুপুরের সম্পদ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। এ তথ্য পাওয়া যায় ১৭৮৯সালের ১০ই সেপ্টেম্বর তারিখে লেখা একটি চিঠিতে। চিঠিটি লিখেছিলেন  বীরভূমের সেইসময়ের কালেক্টর জী. কীটিংসয়ে’র এ্যাসিস্ট্যান্ট অন ডেপুটেশন–  এ. হেসিলরীজ। সেসময় বিষ্ণুপুরে অর্থাভাব চলছিল আর মদনমোহনদেব কলকাতার বাগবাজারে ছিলেন। হেসিলরীজ লিখেছিলেন–‘এই বিগ্রহকে যদি বিষ্ণুপুরে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয় , তবেই  সেখানকার সম্পদবৃদ্ধির সম্ভবনা আছে।’  অতএব, মদনমোহনদেবের নাম প্রাচীন বিষ্ণুপুরের অর্থনৈতিক  ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভীষণভাবে। আবার,  এক দেববিগ্রহকে নিয়ে রাজপরিবারে মামলা , বন্ধকী, ডিক্রী— এ ঘটনা ইতিহাসে আর নেই। তাই মদনমোহন বিগ্রহ বিষ্ণুপুরের রাজপ্রেক্ষাপটে এক ঐতিহাসিক দলিল স্বরূপ। বাগবাজারে নাকি বিষ্ণুপুরে(?)—তাঁর বর্তমান অবস্থানকে কেন্দ্র করে বিতর্ক বা ধোঁয়াশা এখনও পর্যন্ত  মেটেনি বললেই চলে। সেইসাথে তাঁর নানান অবিশ্বাস্য অলৌকিক লীলা— সমস্তটা নিয়ে ইতিহাসের পাতায় শ্রীমদনমোহনদেবের কাহিনী ভীষণ আকর্ষণীয় ও রোমাঞ্চকর। আসুন, মদনমোহনকে নিয়ে ইতিহাসের সেই টানা-পোড়েন দৃশ্য একটু দেখার চেষ্টা করি।
ষোড়শ শতকে  বাঁকুড়া জেলার বনবিষ্ণুপুরের ৪৯তম রাজা ছিলেন বীর হাম্বীর বা হাম্বীর মল্ল । ১৫৬৫ খ্রিষ্টাব্দে তিনি রাজত্ব শুরু করেন।তাঁর অধীনে ডাকাত বাহিনী থাকতো।পথচারীরা বিষ্ণুপুরের জঙ্গল পার করতে গেলেই এই সব ডাকাতরা দস্যুতা করে সব ছিনিয়ে নিত। তারপর সব সম্পদ বীর হাম্বীরকে দিয়ে দিত ।বদলে এদের ভরণপোষণের  ভার রাজা বহন করতেন। সেসময় এই ডাকাতদের জন্য পথচারীদের পক্ষে বনবিষ্ণুপুর পেরোনো রীতিমত ত্রাসের ব্যাপার ছিল।
“ঐছে দুষ্ট রাজা নাই ভারতভূমিতে ।
কেহ না পারয়ে এ পাপীরে দন্ড দিতে।।”
(ভক্তিরত্নাকর,৭/৭১)
বৃন্দাবন থেকে শ্রীরূপ-সনাতন,কবিরাজ গোস্বামী ও অন্যান্য গোস্বামীদের লিখিত গ্রন্থ নিয়ে গৌড় দেশের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন শ্রীনিবাস , নরোত্তম ও শ্যামানন্দ প্রভু। উদ্দেশ্য গৌড়দেশে ভক্তি গ্রন্থ প্রচার করবেন। সকল গ্রন্থ পেটিকায়(বাক্স বা সিন্দুক) ভরে গরুর গাড়িতে করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে ;সাথে দুজন পাহারাদারও রয়েছে।  জঙ্গলপথে বিষ্ণুপুরের ডাকাতদের নজরে পড়লো গো-শকট  আর তাতে যত্ন করে রাখা  পেটিকা। তারা পিছু নিল। রাতের বেলায় বিশ্রাম নিতে গাড়ি থামিয়ে যখন সকলে ঘুমোচ্ছে তখন  পেটিকা ডাকাতি করে পালিয়ে গেল ডাকাতরা। জমা দিল রাজকোষাগারে।পরদিন সকালে ডাকাতির দ্রব্য দেখতে রাজা এলেন।পেটিকা খোলা হল। সে কি !সোনা, রূপা, হীরে , জহরত কিছুই তো নেই ভেতরে। কেবল পুঁথি আর পুঁথি!  কিন্তু সোনা-রূপো না থাকলেও যা ছিল তা সোনার থেকেও মহিমায় অমূল্য রতন। রাধা-কৃষ্ণতত্ত্ব ,ভক্তিতত্ত্ব ,ভক্তিসিদ্ধান্ত সমৃদ্ধ মহাজন লিখিত গ্রন্থগুলো স্পর্শ  করা মাত্র লেখনীর দিব্য প্রভাবে যেন পরিবর্তিত হয়ে গেল দস্যুরাজা বীর হাম্বীরের হৃদয় ।
এদিকে সকালে শ্রীনিবাস আচার্যদের মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ল।সংবাদ গেল বৃন্দাবনে। দীর্ঘ ১২ বছর ধরে লেখা মহাগ্রন্থ শ্রীচৈতন্যচরিতামৃতে’র পান্ডুলিপিও ছিল পেটিকায়। লেখক অশীতিপর বৃদ্ধ শ্রীকৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী এতটাই ভেঙ্গে পড়লেন যে তিনি জলে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করতে চেষ্টা করলেন । বিষ্ণুপুরে অনেক অন্বেষণ করেও যখন গ্রন্থপেটিকা পাওয়া গেল না তখন শ্রীনিবাস হতাশ শ্যামানন্দ ঠাকুর ও নরোত্তম ঠাকুরকে‌ তাঁদের নিজেদের গ্রামে পাঠিয়ে দিলেন আর নিজে রয়ে গেলেন বিষ্ণুপুরে । মনে মনে ভাবলেন এক না একদিন কোন না কোনভাবে গ্রন্থের সুলুক সন্ধান তিনি পাবেনই পাবেন ।
দশ দিন কেটে গেল , অনেক অনুসন্ধান করেও কোন কিনারা করতে পারলেন না শ্রীনিবাস।  একটি গাছের তলায় ক্লান্ত,শ্রান্ত  হয়ে মলিন মনে বসে আছেন আর দুঃশ্চিন্তা করছেন। এমন সময় কৃষ্ণবল্লভ নামে এক ব্রাক্ষ্মণ কিশোর হাজির হল সেখানে। তার সঙ্গে আলাপ করে কথা প্রসঙ্গে বনবিষ্ণুপুরের রাজার আচরণ জানতে পারলেন শ্রীনিবাস। রাজা  রাতে দস্যুবৃত্তি করান আর দিনের বেলায় রাজসভায় শাস্ত্র আলোচনা করান — একথা জেনেই সেই কিশোরকে  তিনি বললেন, ” আমায় একদিন নিয়ে যেতে পারবে সেই সভায়?” কিশোর সানন্দে রাজী হয়ে মাথা নাড়ল। শ্রীনিবাস এলেন রাজসভায় শাস্ত্র ব্যাখ্যা শুনতে। ব্যাস চক্রবর্তী পুরাণ ব্যাখ্যা করে শোনাচ্ছিলেন।মনে মনে শ্রীনিবাস যা ভেবেছিলেন তাই হল। পন্ডিত এর ব্যাখ্যায় ভুল ছিল। শ্রীনিবাস ভুল ধরলেন  ।রাজা বীর হাম্বীর বলে বসলেন , “এত যখন সাহস দেখালেন , তাহলে এবার আপনিই ব্যাখ্যা করুন। শুনি সকলে।”  শ্রীনিবাস এটাই চাইছিলেন ,কারণ ,তিনি জানতেন কোনভাবে যদি রাজার অনুগ্রহ লাভ করতে পারেন তবে রাজার হস্তক্ষেপে  গ্রন্থপেটিকা প্রাপ্তিতে সুবিধা হতে পারে। হলও তাই ।তিনি ভ্রমর গীতা শ্রবণ করালেন। তাঁর প্রেমভক্তি সমন্বিত অসাধারণ শাস্ত্র ব্যাখ্যায় , নিখুঁত বিশ্লেষণে সভায় উপস্থিত সকলে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে গেলেন। প্রত্যেকের চোখে জল এল আবেগে, ভক্তিতে ।খুশি হয়ে পুরষ্কার ঘোষণা করতে চাইলেন রাজা, বললেন, ” আপনার যা চাই আমি তাই দেব , আর এবার থেকে আপনাকে  রোজ ভাগবত প্রবচন করতে হবে সভায়।” শ্রীনিবাস বললেন,” রাজামশাই আমার কোনো অর্থের প্রয়োজন নেই। আপনি যদি পারেন আমার অপহৃত  ধনের প্রাপ্তিতে একটু সাহায্য করুন ।” এই বলে সমস্ত ঘটনা জানালেন। রাজা  বললেন ,”আপনি আসুন আমার সঙ্গে।” রাজকোষাগারে নিয়ে গেলেন  তাঁকে। বিস্মিত শ্রীনিবাস দেখলেন, যে গ্রন্থপেটিকার জন্য তিনি এতো অনুসন্ধান চালিয়ে চলেছেন হন্যে হয়ে,  তা সব রাজার কাছেই গচ্ছিত রয়েছে।  শ্রীনিবাস আচার্যকে গ্রন্থপেটিকা ফিরিয়ে  তো দিলেনই রাজা ,পরবর্তীতে শিষ্যত্ব গ্রহণ করলেন তাঁর থেকে। বীর হাম্বীরের পত্নীর নাম  ‘সুলক্ষণা’  ও পুত্রের  নাম ছিল ‘ধাড়ীহাম্বীর’ ।পরম বৈষ্ণব হলেন সপরিবারে তাঁরা। বীর হাম্বীরের  সময় থেকেই বংশপরম্পরায় মল্ল রাজারা  বৈষ্ণব ভক্ত হলেন । তার আগে তো তাঁরা শাক্ত ছিলেন।বিষ্ণুপুরের অধিষ্ঠাত্রী দেবী  মৃন্ময়ীর যে মন্দির আমরা দেখতে পাই তা   ৯৯৭ খ্রিষ্টাব্দে মল্লরাজা জগৎমল্লই  নির্মাণ করে  দিয়েছিলেন ।  বীর হাম্বীর সমস্ত অসাধু কর্ম ত্যাগ করলেন । তিনি শ্রীকালাচাঁদ বিগ্রহ  প্রতিষ্ঠা করালেন শ্রীনিবাস আচার্যের দ্বারা।
“হৈল বীর হাম্বীরের পরম উল্লাস।
শ্রীকালাচাঁদের সেবা করিলা প্রকাশ।।
রাজা বীর হাম্বিরের রাণী সুলক্ষণা।
আচার্য্য প্রভুরে কত করিলা প্রার্থনা।।
আচার্য্য প্রসন্ন হইয়া দীক্ষামন্ত্র দিলা।
পাইয়া যুগল মন্ত্র রাণী হর্ষ হৈলা।।”
(ভক্তিরত্নাকর, ৯/২৭০)
পরবর্তীতে রাজা বীর হাম্বীর বৈষ্ণব ধর্মের একজন পরম পৃষ্ঠপোষক হলেন। তিনি কালাচাঁদকে নিয়ে অপূর্ব পদ রচনা করেন, যেগুলি পদকল্পতরু’তে স্থান পেয়েছে। যখন নিত্যানন্দ প্রভুর পত্নী শ্রীমতী জাহ্নবা ঠাকুরাণী বৃন্দাবনে কাম্যবনের গোপীনাথের জন্য রাধিকা মূর্তি নির্মাণ করিয়ে গৌড়দেশ থেকে বৃন্দাবনে পাঠান ,তখন সেই বিগ্রহের জন্য মূল্যবান অলংকার সামগ্রী, বস্ত্র, বাসনপত্র ও যাবতীয় উপঢৌকন সব এই বৈষ্ণব রাজা বীর হাম্বীরই  প্রদান করেছিলেন। বৃন্দাবনের আচার্য শ্রীল জীব গোস্বামীজী প্রসন্ন হয়ে তাঁর উপাধি দিয়েছিলেন ‘চৈতন্য দাস’ ।
“শ্রীজীব গোস্বামী হইলা প্রসন্ন তোমারে ।
শ্রীচৈতন্য দাস নাম থুইল তোমার ।।”
( ভক্তিরত্নাকর, ৯,২০৫)
এই  বীর হাম্বীর রাজা একবার বৃষভানুপুরের বনে পথ হারিয়ে  ক্লান্ত ,অবসন্ন হয়ে সন্ধ্যাবেলায়  উপস্থিত হলেন এক কুটীরে। সে কুটীরে সাধনা করতেন এক তান্ত্রিক। তান্ত্রিকের কাছে পূজিত হতেন অপূর্ব দর্শন শ্রীমদনমোহন বিগ্রহ। বিগ্রহের   রূপমাধুরী দর্শন করা মাত্র রাজার  ইচ্ছা হলো সে বিগ্রহ নিজের কাছে রাখার । তিনি জিজ্ঞাসা করলেন তান্ত্রিক ওই বিগ্রহ কোথায় পেয়েছেন। তান্ত্রিক জানালেন যে  ,বনবিষ্ণুপুরের বিল থেকে এক জেলেনীর জালে উঠেছিলেন বিগ্রহ । জেলেনী নিজে পূজার্চনার কিছু জানতেন না বলে তান্ত্রিককে সেটি দিয়ে দিয়েছিলেন পূজা করার জন্য।
বৃষভানুপুর থেকে কোন উপায়ে বীর হাম্বীর  সে বিগ্রহ রাজপ্রাসাদে উঠিয়ে আনলেন ।  এদিকে বিগ্রহ-হারা  তান্ত্রিক  লোক মারফৎ জানতে পারলেন যে, মদনমোহন রাজার কাছে আছে। তিনি বিগ্রহ ফেরত চাইতে রাজদরবারে আসলেন। কিন্তু, রাজা বললেন, “তোমার যত ধন সম্পত্তি  লাগে নিয়ে যাও,  ওই বিগ্রহ আমাকে দিয়ে দাও তুমি।” তান্ত্রিক রাজী  নন। তাঁর অন্য কিছু নয় , বিগ্রহই  লাগবে। কয়েকদিন পর ফেরৎ দেবেন এই বলে শেষে রাজা সময় চাইলেন। এক নকল বিগ্রহ গড়ালেন আর তা দেখিয়ে নিয়ে যেতে বললেন তান্ত্রিককে।কিন্তু বিগ্রহকে বুকে লাগিয়ে তাঁর অঙ্গগন্ধ নিতেই তান্ত্রিক বুঝতে পারলেন যে, সেই বিগ্রহ তাঁর নয়, নকল বিগ্রহ সেটি।  তিনি নিজের বিগ্রহ চাইলেন। রাজা বললেন, নিতে হলে ওই বিগ্রহই নিতে হবে, ওটিই আসল । শেষে অশ্রুপাত করতে করতে তান্ত্রিক বললেন ,”আজ আপনার দিন ভালো যাচ্ছে তাই আমায় এমন করে ফেরাতে পারলেন। একদিন এমন আসবে যখন আপনাদেরও এই বিগ্রহের জন্য কাঁদতে হবে, বলে গেলাম আমি।”
“মল্ল রাজাদের সময় ভালো হইতে সদয় ।
সময় গেলে কবে তারে দেখ কাঁদিতে হয়।।”
(মদনমোহন বন্দনা, অভয়পদ মল্লিক)
মদনমোহন রয়ে গেলেন রাজার কাছে। ভালোই থাকেন। ভক্ত রাজা  যত্ন করেন ,মন প্রাণ ঢেলে সেবার ব্যবস্থা করেছেন। রাজপুরোহিত  ধরণী মহাপাত্রকে   নিযুক্ত করলেন সেবার্চনার জন্য। মদনমোহনের জন্য  রাসমঞ্চ  নির্মাণ করিয়ে দিলেন । সেটা তখন ১৬০০খ্রিষ্টাব্দ।রাসমঞ্চের বিশাল বেদী।বেদীর ওপর মঞ্চ, চূড়া ধাপে ধাপে উঠে গিয়েছে। চূড়ার শৈলী পিরামিডের মত।  ৩৫ফুট উঁচু ও ৮০ফুট চওড়া টেরাকোটার কারুকার্যে খোদিত এই অসামান্য রাসমঞ্চ পর্যটকদের কাছে এক বিশেষ আকর্ষণ। মূলতঃ বিষ্ণুপুরের টেরাকোটার স্থাপত্য  বীর হাম্বীরের আমল থেকেই প্রসার লাভ করে । তাঁর অপর এক কীর্তি হল দলমাদল কামান স্থাপন।এই কামানও অতীব আশ্চর্য  দর্শণীয় বস্তু। কারণ, মাকড়া বা ল্যাটেরাইট পাথর গলানো ,লোহা দিয়ে তৈরী  ২৯৬মণ ওজনের এই কামানে এখনো একবিন্দুও মরচে ধরেনি। কামানের নাম সম্ভবতঃ প্রথমে ছিল দোলমর্দন ( মর্দন অর্থাৎ দলন, শত্রু পীড়ন)  ।কালের অপভ্রংশে নাম হয় দলমাদল। তবে জনশ্রুতি বলে যে ,বীর হাম্বীর দল ও মাদল নামে দুটি কামান বসিয়েছিলেন। মাদল কামনটি বর্তমানে লালবাঁধে  জলের মধ্যে পড়ে আছে ,দেখতে পাওয়া যায় না। আর ,  যে কামানটি দেখা যায় সেটি হল  ‘দল’ কামান। যদিও সম্প্রতি কালে লালবাঁধ সংস্কার হলেও কোন কামান কিন্তু সেখানে দেখা যায় নি। এখন, এত বছরে জলকাদায় মাটির তলায় চাপা পড়ে গেছে কিনা সেটাই বা কে বলতে পারে। বিষ্ণুপুর মিউজিয়ামের  তত্ত্বাবধায়ক ঐতিহাসিক শ্রী তুষার সরকার জানালেন যে, ট্রেজারি বিল্ডিং-এ একটি কামান ছিল এতদিন ধরে , বর্তমানে বিষ্ণুপুর প্রশাসনিক ভবনের সামনে সেটি স্থাপন করা হয়েছে। এই কামানটির কোন ইতিহাস জানা যায় না । এই কামানটি ‘মাদল’ কামান হলেও হতে পারতো। কিন্তু, এটি আকারে অন্য কামানটির থেকে এতটাই ছোট যে সেটিও নিশ্চিত রূপে বলা সম্ভব নয়। অতএব, আলাদা করে মাদল কামান ছিল কিনা তা প্রশ্নবোধক।এই দলমাদল কামানের সঙ্গে মদনমোহনের এক অবিশ্বাস্য অলৌকিক ইতিহাস জড়িয়ে আছে। সে প্রসঙ্গে পরে আসছি।

১৫৬৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৬২০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করেছিলেন বীরহাম্বীর। বীর হাম্বীরের পরবর্তীতে পর্যায়ক্রমে  রাজা হন  ধাড়ী হাম্বীর, রঘুনাথ মল্লদেব,বীর সিংহদেবের পর দুর্জন সিংহদেব। এই রাজা দুর্জন সিংহদেব মদনমোহনদেবের জন্য  নির্মাণ করে দেন মন্দির। বিষ্ণুপুরের টেরাকোটার   শ্রেষ্ঠ মন্দির এটিই। দৈর্ঘ্য ১২.২মিটার ও প্রস্থ ১০.৭মিটার।  মন্দিরের টেরাকোটার সূক্ষ্ম কারুকার্যময় খিলান, দেওয়াল আজও বিস্ময়ান্বিত করে  দেশ-বিদেশের পর্যটক ও গবেষকদের। Archeological Survey of India (Kolkata circle)মন্দিরের বাইরে প্রশস্তিতে লিখেছে –‘এই মন্দিরটি ১৬৯৪ খ্রিস্টাব্দে মল্লরাজ দুর্জন সিংহ তৈরি করেন। বাংলা চালার ছাদে একটি শিখর বিশিষ্ট ইটের একরত্ন মন্দিরগুলির মধ্যে এটিই শ্রেষ্ঠ। মন্দির দেওয়ালের পোড়ামাটির অলঙ্করণও দেখার মত।’
প্রসঙ্গত, বীর হাম্বীরের পৌত্র রঘুনাথ মল্লদেবের  সময়  মল্লরাজারা মুর্শিদাবাদের নবাবদের থেকে ‘সিংহ’ উপাধি পেয়েছিলেন।আর তাই, রঘুনাথের  পরবর্তী রাজাদের নামের পরে মল্লের পরিবর্তে ‘সিংহদেব’ যুক্ত হয়।

দুর্জন সিংহের পর দ্বিতীয় রঘুনাথ সিংহদেব , আর তারপর গোপাল সিংহদেব রাজা হন। গোপাল সিংহ ছিলেন কট্টর বৈষ্ণব। বাধ্যতামূলকভাবে প্রত্যেক রাজ্যবাসীকে সন্ধ্যেবেলায় হরি নামের মালা জপ করার আদেশ দিয়েছিলেন তিনি।এমনকি প্রজারা ঠিকঠাক মালা জপ করছে  কিনা ,তা পরীক্ষার জন্য গুপ্তচরও নিয়োগ করেছিলেন।  এদিকে বর্ধমানের বর্গী রাজা ভাস্কর রাও আক্রমণ চালাবার প্রস্তুতি শুরু করে দেন বৈষ্ণবরাজা গোপাল সিংহের নিরীহতার সুযোগ নিয়ে।
একদিন আচমকাই মধ্যরাতে মারাঠা বর্গীরা অতর্কিত হামলা করল বিষ্ণুপুরের ওপর। খবর আগে থাকতেই পেয়েছিলেন গোপাল সিংহ ।কিন্তু মদনমোহনের চরণে একান্ত শরণাগত ,আত্মনিবেদিত রাজা একটুও বিচলিত হলেন না‌। তিনি রাজ্যবাসীদের আদেশ দিলেন সকলে যেন সারা রাত ধরে হরিনাম করতে থাকে। কোন অস্ত্র কেউ ধরল না । প্রত্যেক সৈনিক পর্যন্ত হরিনাম নিতে থাকলেন আর রাজার নিজের কথা তো বলার অপেক্ষা রাখে না। অথচ , সারা রাত ধরে রাজ্যবাসী কামানের  গোলাবর্ষণের গুড়ুম গুড়ুম শব্দ শুনলেন। অনেকে তো ভয়ে মূর্ছিত হলেন কামানের ভীষণ শব্দে। পরে দেখা গেল যে  ৫২ হাজার বর্গী সেনার একজনও আর নেই । তাহলে গোলা বর্ষণ করল কে? কামান চালাল কে?
সকালে পুরোহিত গর্ভগৃহের দ্বার খুলে দেখেন বিগ্রহের  সারা গায়ে বারুদের দাগ আর পোড়া বারুদের গন্ধে ভরে মন্দির। এদিকে এক গোয়ালা এসে ধরলো রাজাকে ;নিবেদন করলো, ” রাজামশাই ,আপনার ছেলে দই খাওয়ার টাকা শোধ করুন ।সে বলেছে আপনার থেকে চেয়ে নিতে।” রাজা বললেন–“আমার ছেলে আবার কখন দই খেল, তা আবার তোমার থেকে?”  গোয়ালা বললো–‘আপনারই ছেলে তো! সিপাহির বেশ পরা, সারা গায়ে-মুখে কালি ঝুলি মাখা ।বারুদপোড়া গন্ধ কী তাঁর শরীর থেকে! নাম বলল বোধহয় মদনমোহন।” রাজার মূর্ছা যাবার উপক্রম হল শুনতেই।বললেন , “গোয়ালা তোমার যে কত সৌভাগ্য কী বলবো। তুমি সাক্ষাৎ বিষ্ণুপুরের ভগবানকে দর্শন করেছ আজ। তাঁকে দই খাইয়েছ! তুমি ধন্য।” আনন্দের আতিশয্যে পাগলপ্রায় দশা  তখন গোয়ালার।  ভগবানকে দেখেছে সে —- এ সৌভাগ্যের কথা  কাকে বলবে, কোথায় রাখবে বুঝতে পারছে না। হঠাৎ দেখা গেল তার দইয়ের হাঁড়িগুলো চকচক করে উঠলো , সোনার হয়ে গেল।রাজা গোপাল সিংহ আর ঠিক থাকতে পারলেন না ।তাঁর মদনমোহনের এতসব অলৌকিক কীর্তিকলাপ দেখে তিনি সংজ্ঞাহারা হয়ে গেলেন। আসলে, যাঁর চরণে সব সঁপে দিয়ে নিশ্চিন্ত থাকা , দায় তো সব, তাঁর ওপরই বর্তায় তখন ।তাই মদনমোহন নিজেই কামাল দেগে বর্গী তাড়িয়েছেন সারারাত ধরে। আর তখনই নাকি  যুদ্ধ শেষে মাদল কামানটি  জলে ছুঁড়ে ফেলে দেন।
” লালবাঁধে দল-মাদল  দুটি কামান ছিল।
তার মধ্যে ৮০মণ বারুদ ভরিল।।
দুইটি কামান প্রভু লইলো দুই বগলে।
দুই হাতে দু-কামানে দিল পলতে জ্বেলে।।
এক কোপে বহু বর্গী  হইল নিধন‌।
কামানের শব্দে মূর্চ্ছা  গেল বহুজন।।”
(মদনমোহনের আদি মাহাত্ম্য, গাইড বুক)

ভক্তের বিপদের সময় ভগবান যে বিপদভঞ্জন হন, সে প্রমাণ দিলেন মদনমোহন। আর , তা জানাবার জন্যই মদনমোহন করেছিলেন দই খেয়ে পয়সা না দেবার লীলা। সেই গোয়ালার নাম ছিলো গোপাম মূরতি।
এখন, সময়টা ১৭৪৮ সাল। বিষ্ণুপুরের রাজসিংহাসনে রাজা গোপাল সিংহদেবের পর রাজা  চৈতন্য সিংহদেব বসেছেন। তিনিও ভক্তিমান  রাজা । এদিকে রাজপরিবারের অপর  সদস্য দামোদর সিংহদেব  সিংহাসন দখল করার  জন্য মুর্শিদাবাদের নবাব সিরাজউদ্দৌলার সঙ্গে হাত মেলালেন ।নবাব সাহায্য করলেন ।বিশাল সৈন্যবাহিনী নিয়ে আক্রমণ করলেন বাঁকুড়া ।কিন্তু ,লক্ষ্য পূরণ হলো না। জিততে পারলেন না ।  এরপর নবাব সিরাজউদ্দৌল্লা ১৭৫৬ সালে  পলাশীর যুদ্ধে হেরে প্রাণ হারান  ইংরেজদের হাতে। তিনিই ছিলেন   বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব।  সেসময় বাংলার প্রত্যেকটি রাজ্য ইংরেজের করদ্ রাজ্যে পরিণত হল। অর্থাৎ , রাজাদের সকলকেই ইংরেজদেরকে  খাজনা বা কর  দিতে হত। সামন্তরা ইংরেজের তোষামোদকারী  জমিদারে পরিণত হয়েছেন। আবার ইংরেজদের ছত্রছায়ায় সেসময়  উত্থান ঘটলো আরেক  নতুন গোষ্ঠীর….. তাঁরা ব্যবসায়ী গোষ্ঠী ।

হাওড়া জেলার কোন্নগরে  বাস করতেন শ্রী সীতারাম মিত্র মহাশয়।  বর্গীদের প্রচণ্ড উৎপাত ,অত্যাচার মাঝেমধ্যেই হয় সেখানে । তাই সেখান থেকে মিত্র মহাশয়  চলে এলেন সুতানটি গ্রামে বা এখনকার কলকাতার বাগবাজারে । এখানে তখন ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আধিপত্য। রবার্ট ক্লাইভ ছিলেন বাংলার শাসনকর্তা।ফলে বর্গীদের উৎপাত ছিল না বললেই চলে । সীতারাম মিত্রের পুত্র  শ্রী গোকুলচন্দ্র মিত্রের ছিল লবণের ব্যবসা। বড় ব্যবসায়ী তিনি ,সেইসাথে অত্যন্ত দয়ালুও ছিলেন । তাঁর আমলে প্রত্যেকদিন হাজার জন অনাথ-আতুড় খাবার পেত। ব্যবসার সূত্রে গোকুল মিত্র কোন ভাবে পরিচিত ছিলেন রাজা চৈতন্য সিংহের সঙ্গে‌। চৈতন্য সিংহদেবের আমন্ত্রণে তিনি বেশ কয়েকবার বিষ্ণুপুর এসেছিলেন। যেবার তিনি  প্রথম দর্শন করেন মদনমোহনদেবকে , সেবারই দর্শন মাত্র মদনমোহনের প্রতি এক অপার্থিব টান অনুভব করেন। মন যেন চাইতে থাকল  মদনমোহনের সান্নিধ্য, তাঁকে সেবা করার সৌভাগ্য। হয়তো বা সে কারণেই গোকুল মিত্র একাধিকবার বিষ্ণুপুরে এসেছিলেন ।
এক সময় চৈতন্য সিংহদেবের কিছু অর্থাভাব হয় ।গোকুলচন্দ্র বাড়িয়ে দেন  চৈতন্য সিংহদেবের দিকে সাহায্যের হাত। তিনি তিন লক্ষ টাকা দিয়ে সাহায্য করেন চৈতন্য সিংহকে‌। তবে গোকুল মিত্র শর্ত একটা রাখলেন যে যতদিন না টাকা ফেরৎ দিতে পারবেন চৈতন্য সিংহ ,ততদিন মদনমোহনদেবকে তাঁর কাছে গচ্ছিত রাখতে হবে। অর্থাৎ কিনা বন্ধক রাখতে হবে । আসলে সেই যে মিত্র মহাশয়ের  মন বিকিয়ে গেছে  মদনমোহনের পদপঙ্কজে ,এখন এসুযোগে তিনি  নিজের কাছে মদনমোহনকে রেখে দিতে চান ,প্রাণভরে সেবা করতে চান কিছুদিন । আবার,ভক্তবৎসল ভগবান তো প্রেমের কাঙ্গাল চিরকালই। তাঁরও মন হয়েছিল  গোকুল মিত্রের প্রেমসেবা গ্রহণ করে তাঁকে সুখী করতে। ভক্ত যেমন  ভগবানকে সুখ দিতে চায় , ভগবানও তো তেমন তাঁর ভক্তকে সুখী দেখতে ভালোবাসেন। তাই হয়তো বা এমন পরিস্থিতি তৈরী হল।মন  একবিন্দুও না চাইলেও ভাগ্যের পরিহাসে চৈতন্য সিংহদেবকে  বাধ্য হয়ে কুলদেবতা মদনমোহনকে বন্ধক রাখতে হল গোকুল মিত্রের কাছে। রাজা আকুল হয়ে অশ্রু বিসর্জন করছেন দেখে ,  মদনমোহনদেব  সান্ত্বনার পরশ  দিলেন তাঁর প্রিয় চৈতন্য সিংহকে । তিনি পূর্ণ সায় জানালেন  তাঁকে বন্ধক রাখার জন্য।তিন লক্ষ টাকার বিনিময়ে  বন্ধক হয়ে গেলেন বাগবাজারে মদনমোহনদেব ।বাগবাজারে গোকুলধামের মন্দিরের ফলকে লেখা ১৭৬১ সালে শ্রীমদনমোহন জীউ স্থাপিত হয়েছেন। সম্ভবত, ঐ বছরেই বিষ্ণুপুর থেকে এখানে মদনমোহনদেবকে আনা হয়েছিল।
এদিকে এসময় থেকে মল্লরাজাদের সম্পদ ক্ষয় হতে শুরু করে দেয়, পতনের সূচনা হয় রাজত্বের।অভয়পদ মল্লিকের লেখা ‘History of Bishnupur Raj’-এ পাওয়া যায়– ‘ Thus  according to Babu Balindra Nath Singha of Indus , a scion of immediate cause of the decay and downfall were :–1) The Mahratta raids,
2) The famine of 1770,
3) The imposition of crusing land Tax by the     British Government and
4) Family dissensions
He also enumerated some indirect causes such as 5) the adoption of the Vaishnavas and 6) its corollary the construction of costly temples etc.অর্থাৎ, বর্গী বা  মারাঠাদের ক্রমাগত হানা, ১৭৭০-এর দুর্ভিক্ষ, ব্রিটিশদের খাজনা আদায়, রাজবংশের অন্দরে কোন্দল, বৈষ্ণব ধর্মমত গ্রহণ করায় রাজার আচরণে নীরিহতা আর মন্দির নির্মাণে বহুব্যায় —- এসব কারণের দরুণ মল্ল রাজত্ব ক্ষয় এবং পতনের দিকে যেতে থাকে।
সেসময়  বর্গীরা যে অঞ্চলের ওপর দিয়ে যেত সেখানকার সব শস্য তছনছ করে দিয়ে , ধানক্ষেত পুড়িয়ে দিয়ে প্রায় ধ্বংস করে দিয়ে যেত নগর-গ্রাম।  ওদিকে চৈতন্য সিংহদেব আর দামোদর সিংহের মধ্যে অভ্যন্তরীণ
কোন্দল,যুদ্ধ।আবার দুর্ভিক্ষের সময়  অনাহারে ক্লীষ্ট প্রজাদের বাঁচাতে ধর্মপ্রাণ চৈতন্য সিংহদেব দু’হাতে শস্য ,সম্পদ বিলোতে থাকেন। ফলে রাজকোষাগার আকস্মিক ভাবে প্রায় খালি হয়ে যায়। ইংরেজদের কাছে খাজনা বাকী পড়তে থাকে। রাজ্য নিলামে ওঠার পরিস্থিতি তৈরী হয়।এই ভীষণ সংকট কালে অর্থ জোগাড় করে  মদনমোহন বিগ্রহ ফিরিয়ে আনা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে চৈতন্য সিংহদেবের পক্ষে।

বাগবাজারে গোকুল মিত্র  প্রাণঢালা সেবাপূজা করেন বিগ্রহের।  আদরে-সোহাগে সুখেই আছেন মদনমোহন। গোকুলের বাল্যবিধবা কন্যা লক্ষ্মীপ্রিয়া নিজের পতিরূপে ভজনা করেন মদনমোহনকে।আর মদনমোহনও তাঁর প্রেমে বাঁধা পড়লেন ।একদিন রাত্রে লক্ষ্মীপ্রিয়ার কাছে মদনমোহন নিজের চূড়া, বাঁশী খুলে রেখে গেলেন শয্যায় । পরদিন প্রভাতে পুজারীজী মদনমোহনের চূড়া -বাঁশী খুঁজে পাচ্ছেন না। চারদিকে খোঁজ খোঁজ রব। কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। শেষে লক্ষ্মীপ্রিয়া দেখেন তাঁর শয্যায় তাঁর মাথার বালিশের ওপরে রাখা ওগুলো । এ লীলা দ্বারা মদনমোহন যেন বার্তা দিলেন যে তিনিও লক্ষ্মীপ্রিয়াকে নিজের পত্নীরূপে দেখেন , আর তাই রাত্রে শয়ণে যান লক্ষ্মীপ্রিয়ার কাছে।
আর একবার তো ভগবান নিজে সেবক ভৃত্য সেজে তাঁর ভক্তের সেবা করলেন ।গোকুল মিত্র  ভৃত্য মদনাকে ডেকে তামাক সাজিয়ে দিতে বললেন ।ঘটনাক্রমে মদনা সে সময় বাইরে গিয়েছিলেন কোন কাজে। আর গোকুল মিত্রের তামাক সেবনের সময় পেরিয়ে যেতে থাকলো। মদনমোহন করলেন কী, নিজে তামাক সাজিয়ে নিয়ে এসে গড়গড়ার নল এগিয়ে দিলেন গোকুল মিত্রের কাছে। গোকুল মিত্র মনের সুখে তামাক টানলেন। পরে মন্দিরের পূজারী দেখলেন মদনমোহন বিগ্রহের হাতে তামাক ও টীকার দাগ। আশ্চর্য হয়ে জানাতে গেলেন মিত্র মহাশয়কে। গোকুল মিত্র নিজে ছুটে এলেন সত্য কিনা পরীক্ষা করতে। সত্যিই তো! পরক্ষণেই মনে পড়লো তিনি তো তামাক দিতে বলেছিলেন ভৃত্য মদনা কে। খোঁজ নিয়ে জানলেন , মদনা তো তখন ভবনে ছিলেনই না, বাড়ির বাইরে গিয়েছিলেন কোন কাজে। বুঝে নিতে অসুবিধা হল না যে , সে তামাক কে সেজে এনেছিল আর কেনই বা ঠাকুরের হাতে অমন দাগ।মিত্র মহাশয় আদেশ দিলেন , আর কেউ যেন ভবনে তামাক সেবন না করে এবার থেকে।ভগবানকে ভৃত্য হতে হয়েছে যে কারণের জন্য, সেই কারণটাই তিনি নির্মূল করে দিতে চাইলেন।এভাবে  একের পর এক মধুর লীলা করতে থাকলেন মদনমোহনদেব বাগবাজারে গোকুল ভবনে।

এরপর একদিন চৈতন্য সিংহদেব এলেন তাঁর প্রাণের  বিগ্রহ ফেরৎ নিতে।  তখন সম্ভবত ১৭৯০ খ্রিষ্টাব্দ । তিনি পরিবারের সকলের অলংকারের বদলে  টাকা জোগাড় করে বিগ্রহ নিতে এলেন। এদিকে গোকুল মিত্র এতদিনে ভীষণ ভাবে  মদনমোহনের প্রেমে পড়ে গেছেন। বিগ্রহ ছাড়া থাকতে পারবেন না তিনি। তাই ,তিনি টাকার বদলে বিগ্রহ দান করে দিতে  অনেক অনুরোধ-উপরোধ করলেন রাজাকে। কিন্তু, রাজী নন রাজা। শেষে গোকুল  ,ছলে-বলে-কৌশলে বিগ্রহ পাবার জন্য   ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর হেস্টিংস সাহেবের কাছে চৈতন্য সিংহের বিরুদ্ধে সময়মত টাকা ফেরৎ না দেবার নালিশ জানিয়ে আরও অনেক টাকা দাবী করে বিগ্রহের নামে  ডিক্রী আদায় করলেন । অত  টাকা দিতে  অসমর্থ রাজা । আলিপুর  আদালতের একতরফা রায় গেল গোকুল মিত্রের দিকে। ব্যাস,  ডিক্রী হয়ে গেলেন বিগ্রহ । তবে থেকে গোকুল মিত্রের বরাবরের সম্পদ হলেন মদনমোহনদেব। তখন মদনমোহনদেব  রাজাকে আশ্বাস  দেন যে প্রতিদিন আরতি ও ভোগের সময় তিনি বিষ্ণুপুরে প্রকট থাকবেন। প্রথম বিষ্ণুপুরের ইতিহাস লেখক শ্রী  ফকির নারায়ণ কর্মকার  তাঁর ‘বিষ্ণুপুরের অমরকাহিনী’ গ্রন্থে লিখেছেন , ‘ তাই নিজের ভাগ্যকে নিজে ধিক্কার দিয়ে সেই অপকৌশলের কাছে নতি স্বীকার করে তাঁর প্রাণের ঠাকুরকে কলকাতার বাগবাজারে রেখে আসতে বাধ্য হন তিনি। শেষ হয়ে যায় চৈতন্য সিংহদেবের সব আশা ভরসা।বিবাদ বিসম্বাদের মধ্যেই তিনি যে মদনমহনকে ওখানে রেখে এসেছিলেন সেই কথাই সত্য।’  শ্রীমতী বন্দনা বিশ্বাস তাঁর ‘কথা ও কাহিনীতে বিষ্ণুপুর ‘- বইয়ে লিখেছেন—‘বিগ্রহ ফেরতের ব্যাপারে গোকুল মিত্র মোটা টাকা দাবী করলে রাজা অপারগ হন—ব্যাপারটি আদালত পর্যন্ত গড়ায়, অবশেষে আদালতে গোকুল মিত্রের এক তরফা ডিক্রীলাভ হয়। খ্রিষ্টীয় সপ্তম শতক থেকে ঊনিশ শতক পর্যন্ত প্রায় ৬০জন রাজা বিষ্ণুপুরে রাজত্ব করেছেন, কিন্তু এমন পরিস্থিতির উদ্ভব হয়নি কখনো।’ ‘সাধু গোকুল মিত্রের জীবনী’-তেও  বলা হয়েছে মামলায় জিতেছিলেন গোকুল আর তাই আসল মদনমোহনদেব তাঁর কাছে থেকে যায় কোর্টের আদেশে ডিক্রি হয়ে। “বিচার মতে রাজার ঠাকুর গোকুল ডঙ্কা মেরে নিলা।” আবার এই জীবনী বইয়ে  বলা হয়েছে যে, গোকুল মিত্রই নাকি পূর্ব জন্মে ছিলেন সেই দইওয়ালা,যিনি সিপাহী মদনমোহনকে দই খাইয়েছিলেন। মদনমোহন যখন দইয়ের হাঁড়ি সোনার করে দিয়েছিলেন তখন দইওয়ালা বলেছিলেন, সেসবে তিনি ভুলবেন না, মরণকালে তাঁর মদনমোহনের অভয়চরণ প্রাপ্তি চাই।

“রাজা বলে ভয় নাই জমি দিব আমি।
কোনখানে খেলেন দৈ দেখাও দেখি তুমি।।
বকুলতলায় দৈ খেলেন গোয়ালা দেখাইলো।
গোয়ালার হাড়ি যত সোনা হয়ে গেল।
পায়ে ধরে গোয়ালা কান্দিতে লাগিল।
ধ্বজ বজ্রাঙ্কুশ চিহ্ন দেখিতে পাইল।।
গোয়ালা বলে ভুলাও কি হে মদনমোহন ।
মরণকালে দিও প্রভু অভয়চরণ।।”

তবে কোন কোন বইয়ে কিন্তু গোকুল মিত্রের জিতে যাবার কথা লেখা নেই। হেরে যাবার কথা লেখা আছে।মদনমোহন বিগ্রহ  বাগবাজারে রয়েছেন এ কথা  বিষ্ণুপুরবাসীরা অনেকেই মানতে নারাজ। বিষ্ণুপুরে পাঁচালীর আকারে লেখা যেসব ভ্রমণ গাইড পুস্তিকা গুলো বিক্রী হয় , সেগুলোতে ঘটনা অন্য রকম লেখা।’মদনমোহন মাহাত্ম্য’ বইতে লেখা চৈতন্য সিংহ যখন তিন লক্ষ টাকার বিনিময়ে  কুলদেবতা মদনমোহনকে বাগবাজার থেকে আবার  বিষ্ণুপুরে ফিরিয়ে আনতে যান, তখন গোকুল মিত্র  বিগ্রহ ছাড়তে নারাজ। তিনি মিথ্যা দলিল দেখিয়ে জানালেন যে, মদনমোহন তো রাজা বিক্রি করে দিয়েছেন তাঁর কাছে আগেই ।  রাজা মনের দুঃখে চোখের জল ফেলে ফিরে যাচ্ছিলেন , সেসময় তাঁকে স্বয়ং মদনমোহন আদেশ দেন ,”হতাশ না হয়ে বরং আলিপুর কোর্টে গোকুল মিত্রের বিরুদ্ধে মামলা করো। তোমার হয়ে আমি পাগড়ী পরা উকিল সেজে সওয়াল-জবাব করবো।”  মদনমোহনের পরামর্শ মতো রাজা আপিল করলেন আদালতে ।বিচারের দিন মদনমোহন এসে দাঁড়ালেন উকিলের বেশে ।ম্যাজিস্ট্রেট নাম জিজ্ঞাসা করলে উকিল বলেন যে , তাঁর নাম মদন আর বিষ্ণুপুরের রাজার অধীনে তিনি বেতনভুক কর্মচারী। উকিল মদনের ক্ষুরধার প্রশ্নের সামনে অপ্রস্তুত , অপারগ গোকুল মিত্র হেরে গেলেন। কোর্ট আদেশ দিল বিগ্রহ ফিরিয়ে দিতে ।
গোকুল মিত্র একই রকম দেখতে একটি নকল বিগ্রহ তুলে দিলেন রাজার হাতে। চিনতে না পেরে নকল বিগ্রহ নিয়েই ফিরলেন রাজা। কিন্তু নদীর ধার থেকে এক বালক জোরে হেঁকে বলে যে , ” রাজা , তুমি তো নকল বিগ্রহ নিয়ে ফিরে যাচ্ছো।” সে বালক নাকি  স্বয়ং মদনমোহনই ছিলেন। রাজার টনক নড়লো। আসল মদনমোহন ফেরত নিতে আবার এলেন বাগবাজার।অভিযোগ জানালেন । গোকুল মিত্র বললেন,” আপনি বরং এক কাজ করুন। পাশাপাশি তিনটি বিগ্রহ রাখা হবে। চিনে নিয়ে আপনারটি আপনি নিয়ে যান।  আমার কোন আপত্তি নেই ,সবেতেই রাজী।” তিনটিই এক রকম দেখতে।’মদনমোহন মাহাত্ম্য কথা’-য় বলা হয়েছে এসময় মদনমোহনই নাকি  উপদেশ করেন, “যে বিগ্রহের বামাঙ্গ ভিজে থাকবে ও নাকের ওপর সাদা মাছি বসে থাকবে সেটি আমি ।” ঘটলও তাই। রাজা আসল বিগ্রহকে তুলে নিলেন। মদনমোহনদেব  ফিরে এলেন বিষ্ণুপুর। বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করে সেবাপূজা শুরু হল মদনমোহনের আবার‌। বিষ্ণুপুরের মত অনুযায়ী, যখন মদনমোহন চলে আসেন কলকাতা ছেড়ে, তখন তিনি গোকুল মিত্রকে  কথা দিয়েছিলেন এই বলে ,”ওহে গোকুল,  তুমি কেঁদো না। প্রতিবছর অন্নকূট উৎসবের সময় আমি তোমার কাছে বারো দন্ড থাকবো কথা দিচ্ছি ।”
কুলদেবতাকে কেন্দ্র করে বিষ্ণুপুরে মহোৎসাহে শুরু হল দোলযাত্রা, ঝুলন উৎসব ,রাসউৎসব ইত্যাদি।বিষ্ণুপুর পূর্ণ হল হর্ষে-আনন্দে।  ১৮০২খ্রিষ্টাব্দে চৈতন্য সিংহদেবের মৃত্যু হয় ।  তার আগের বছর অর্থাৎ ১৮০১-এ তিনি পৌত্র মাধব সিংহকে সিংহাসনে অভিষিক্ত করেন।বিষ্ণুপুরের বাসিন্দা তথা  মল্লরাজাদের রাজপুরোহিত বংশের বিশিষ্টজন শ্রী মৃত্যুঞ্জয় মহাপাত্র জানালেন, বিতর্ক এড়াতে অনেক লেখকই আসল ঘটনা না জেনে , অনুমান ভিত্তিক লিখেছেন। ইতিহাস বিকৃত হয়েছে। তিনি বলেন , তাঁদের পূর্বপুরুষরা বলতেন যে আসল মদনমোহন বিষ্ণুপুরে ফেরৎ আসেন। বিষ্ণুপুরেই নাকি  বিরাজ করছেন তিনি। (এ প্রবন্ধ লেখায়  অনেক তথ্য ও  ছবি দিয়ে সাহায্য করেছেন  মৃত্যুঞ্জয় মহাশয়। )

বাগবাজারে গোকুল মিত্র  মদনমোহনদেবের পাশে রাধিকার এবং ললিতা-বিশাখার বিগ্রহদের স্থাপন করলেন রাস উৎসবের সময় । সেরাত্রে আশ্চর্যজনক ভাবে তাঁর কন্যা লক্ষ্মীপ্রিয়ার  জীবনাবসান হল। বলা হয় যে , শ্রীরাধা বিগ্রহের মধ্যেই নাকি গোকুল মিত্রের কন্যার আত্মা বিরাজিত রয়েছে।
মদনমোহনদেবের  জন্য বড় মন্দির ,  রাসমঞ্চ,ঝুলনমঞ্চ ইত্যাদি নির্মাণ করে দিয়েছিলেন গোকুল মিত্র।  সমস্ত সম্পত্তি তিনি  তাঁর জামাই শ্রীমদনমোহনদেবের নামে করে দিয়েছেন ,যাতে তাঁর অবর্তমানে মদনমোহনের সেবা পূজায় কোন বিঘ্ন না ঘটে। এখনও পর্যন্ত উত্তর কলকাতা চিৎপুর রোডে রাজবল্লভ পাড়ায় গোকুল মিত্র লেনে মদনমোহন তলা নামে সুপ্রসিদ্ধ মদনমোহন মন্দির এলাকা ।গোকুলধাম নামে বিখ্যাত সেই সুবিশাল মন্দির। রাজবল্লভ পাড়ার মোড়ে সিদ্ধেশ্বরী কালী বাড়ি ছাড়িয়ে একটু এগোলেই ডানদিকে মন্দির পরে ।মূল প্রবেশদ্বার দিয়ে প্রবেশ করতেই বাঁ দিকে বিশাল চওড়া শ্বেত পাথরের সিঁড়ি দিয়ে ওপরে  দোতলায় উঠে যেতে হয়। সেটি দর্শনার্থীদের ব্যবহারের জন্য সিঁড়ি। উপরে দোতালাতে অবস্থান করেন শ্রীশ্রীরাধামদনমোহনদেব। আর যদি সিঁড়িতে  না উঠে প্রবেশদ্বার দিয়ে সোজা এগিয়ে আসা হয় , তবে নাটমন্দির চোখে পড়ে। এখানে মদনমোহনদেবের জন্য নাচ-গানের আয়োজন করা হয়। এই  চত্বরেই প্রতিদিন আগে অনাথ-আতুরদের প্রসাদ ভোজন করানো হত।নাটমন্দিরকে ঘিরে আঙ্গিনার ওপারে তিনদিকে ঠাকুর বাড়ীর দালান।একদিকে ভোগের রন্ধনশালা ,আর একদিকে মন্দিরের অফিসঘর ,এসব । আর নাটমন্দিরের ডানদিকটার পুরোটা জুড়ে বিশাল  ঝুলনমন্দির। মার্বেল বাঁধানো ঝুলন মঞ্চ।  মঞ্চের মধ্যে  দোলনা সিংহাসন।ঝুলনের সময় এখানেই ঝুলন উৎসব হয় বড় করে।
উপরে  দোতলায় মদনমোহনদেবের রাজত্ব । সিঁড়ি দিয়ে উঠেই  ডানদিকে দরবার হল তাঁর। দরবার হলের শেষপ্রান্তে সিংহাসনে শ্রীশ্রীরাধামদনমোহন বিরাজ করছেন । সাথে আছেন ললিতা-বিশাখা সখীর বিগ্রহ, শালগ্রাম শিলা আর ছোট্ট গোপালসোনা। নিরাপত্তার কারণে  ব্যবধান দেওয়া লোহার গ্রিলের । সব মন্দিরে যেখানে বিগ্রহ অবস্থান করেন সেখানে সামনেই ভোগ লাগানো হয় , মদনমোহনের ক্ষেত্রে কিন্তু তা নয় । তাঁর ভোগের ঘর আলাদা, বিশ্রামের ঘরও আলাদা।ভোগের সময় সিংহাসন থেকে নেমে যান ভোগমন্দিরে। সেখানে ভোজন করে আসেন বিশ্রাম কক্ষে। বারান্দা পার করে বিশ্রাম ঘর। বিশ্রাম করার পর এখানেই তাঁকে শৃঙ্গার করানো হয় ।নতুন সাজে সজ্জিত  হলে আবার প্রবেশ করেন দরবার হলে। সিংহাসনে আরোহন করেন এরপর।আর, তিনি কখনও ফেরৎ যাত্রা করেন না অর্থাৎ একমুখী হয়ে গমন করেন সবসময়,একই পথে উল্টো দিকে হাঁটেন  না।
দোতালায় অপরদিকে  ভাঁড়ার-ঘর(স্টোর রুম)। এত বড়  ভাঁড়ার ঘর সমগ্র কলকাতায় আর নাকি নেই। তারপাশে অতিথিদের  থাকার ঘর । এরপরে আবার সিঁড়ি বেয়ে নীচে নামা। সেই সিঁড়ি দিয়ে মদনমোহন নামেন ঝুলনের সময় , রাসের সময়।  মন্দির থেকে  বেড়িয়ে বাঁ দিকে আরো একটু এগিয়ে গেলেই রাস্তার ওপরে পাকা রাসমঞ্চ তৈরী আছে। ।রাসের সময় উৎসব হয় । বিগ্রহদের নিয়ে যাওয়া হয় তখন সেখানে। এছাড়া  সারা বছরই উৎসব হয় গোকুলধামে। বড় করে পালিত হয়  অন্নকূট উৎসব। অন্নকূটে নীচে একতলায় ভক্তরা কাপড় পেতে ধরেন আর ওপরের দোতলার বারান্দা থেকে মদনমোহনদেবের অমৃতপ্রসাদ ফেলা হয় ।ভক্তরা আকুলতাসহ হুড়োহুড়ি করে সংগ্রহ করেন প্রতিটি কণা প্রসাদের।
বর্তমানে বাগবাজারে মদনমোহনদেবের পালাদার সেবাইত হলেন শ্রী মাধবমিত্র। ১৫ই এপ্রিল ,২০১৯ থেকে ১৩ই এপ্রিল, ২০২০ পর্যন্ত মদনমোহনের সেবার ভার তাঁর। আর , বিগ্রহ অর্চন-বন্দন-পূজার ভার শ্রী সুব্রত পূজারী মহাশয়ের ওপর। তিনি হলেন ধরণী মহাপাত্রের সপ্তম অধস্তন পুরুষ। মল্লরাজারা ‘পূজারী’ উপাধি দিয়েছিলেন তাঁদের।  পূজারী মহাশয়  জানালেন , যখন মদনমোহন বাগবাজারে চলে আসেন, তখন তাঁর পূর্বপুরুষরাও  বিষ্ণুপুর ছেড়ে কলকাতায় চলে আসেন মদনমোহনদেবের সেবা করবেন বলে। সেই প্রথম দিন থেকে তাঁদের বংশের পূজারীরাই মদনমোহনদেবের পূজার্চনার দায়িত্বে। মদনমোহনই নাকি স্বয়ং গোকুল  মিত্র কে আদেশ দিয়েছিলেন কেবল এই বংশের হাতেই তিনি পূজা নেবেন। ফকির নারায়ণের লেখাতেও একই কথা পেলাম–‘ মিত্র মহাশয়ের প্রতি স্বপ্নাদেশ হয়। স্বপ্নে  মদনমোহন তাঁকে বলেন ,”আমার সেবাইত, পুরোহিত ব্যতীত অপরের হাতে সেবা-পূজা নিয়ে আমার তৃপ্তি হয় না ।তাদের অভাবে আমি উপবাসী আছি। আমার স্বপ্নাদেশের কথা রাজাকে জানিয়ে তাদের এখানে নিয়ে আয়‌। নইলে এইরকম উপবাসী অবস্থাতেই আমাকে দিন কাটাতে হবে।”…. সবকিছু শুনে রাজা কাঁদতে থাকেন। দ্বিরুক্তি করেন না ।সেবাইত, পুরোহিতকে পাঠিয়ে দেন তাঁদের সঙ্গে‌।’
সুব্রত পূজারী মহাশয় জানালেন, বাগবাজারের বিগ্রহই আসল মদনমোহন। তিনটি বিগ্রহের অবশিষ্ট বিগ্রহটি বর্তমানে তাঁদের ব়ংশে রয়েছেন। এখনও নানান অলৌকিক লীলা করেন মদনমোহন। দিনে-দুপুরে-রাত্রে মদনমোহনের  চলার নূপুরের ধ্বনি শোনা যায় , হঠাৎ  ম-ম করে ওঠে তাঁর অঙ্গগন্ধ  নির্জন বারান্দায়।
শ্রীমদনমোহনের অলৌকিক লীলা নিয়ে প্রচুর বই প্রকাশ হয়েছে । সেগুলির কোন কোনটি বিষ্ণুপুরের বাসিন্দা বা বিষ্ণুপুর রাজবংশের ঘনিষ্ঠ কবিরা লিখেছেন , আবার কোনটা রচনা করেছেন গোকুল মিত্রের দিকের কবিরা। তাই সেসব লেখাতে পক্ষপাতিত্বের একটা ব্যাপার  লক্ষ্য করা যায় । মূল বিগ্রহ যে প্রকৃত কোথায় অবস্থিত, বাগবাজারে নাকি বিষ্ণুপুরে এটা নিয়ে একটা চোরা দ্বন্দ এখনও পর্যন্ত রয়ে গেছে।বিষ্ণুপুর থেকে বলা হয় মদনমোহনদেব বিরাজ করছেন বিষ্ণুপুরেই। আর,বাগবাজার থেকে বলা হয় মূলবিগ্রহ রয়েছেন বাগবাজারে। তবে হ্যাঁ , বর্তমানে মদনমোহন যেখানেই অবস্থান করুন না কেন, তিনি যে দল-মাদল কামান দেগেছেন আর গোকুল মিত্রের কাছে তিন লক্ষ টাকার বিনিময়ে বন্ধক ছিলেন এ কথা কিন্তু সত্য—–প্রতিটি গ্রন্থেই স্বীকৃত হয়েছে । ‘বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস’গ্রন্থে ড. সুকুমার সেন লিখেছেন –“অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীতে স্থানীয় দেবদেবী ,ব্যক্তি বা ঘটনা বিশেষ ও দৈব-দুর্বিপাক লইয়া ছড়া গান রচিত হয়েছিল। কিন্তু সেগুলি আমাদের হস্তগত হইবার পূর্বেই লুপ্ত হইয়াগিয়াছে ।…..একাধিক কবি রচিত মদনমোহন বন্দনা  পাওয়া গিয়াছে। ইহার বর্ণনীয় বিষয় হইতেছে  মদনমোহন কর্তৃক দল-মাদল কামান দাগিয়া বিষ্ণুপুর হইতে বর্গী বিতরণ এবং চৈতন্য সিংহ কর্তৃক কলিকাতায় গোকুল মিত্রের  নিকট মদনমোহন বিগ্রহ বন্ধক রাখা।”
মদনমোহন সর্বদা তাঁর ভক্তের সঙ্গে থেকেছেন সেবক রূপে, ভৃত্য রূপে, বন্ধু রূপে ।তা সে বিষ্ণুপুরের ভক্তিমান রাজা গোপাল সিংহ ,চৈতন্য সিংহই হন বা বাগবাজারের ধনাঢ্য ,দানবীর ,ভক্তমহাজন গোকুল মিত্রই হন না কেন। ভগবান যে তাঁর ভক্তের পরম সুহৃদ, পরম বান্ধব, পরম হিতৈষীজন এই সত্য সংস্থাপিত হয়েছে বারে বারে ,নিত্য জাগ্রত বিগ্রহ মদনমোহনদেবের নানান অলৌকিক লীলায়।
ঠাকুর রামকৃষ্ণদেব বলতেন , কিছু চাইতে হলে তিন জনার কাছে চাইতে হয়–দক্ষিণেশ্বরের মা ভবতারিণী, খড়দহের শ্যামসুন্দর আর বিষ্ণুপুরের মদনমোহনের কাছে।
মদনমোহনদেবের অলৌকিক কাহিনী শুনে, তাঁর মনোলোভা চিতচোর সৌন্দর্যের কথা জেনে এখনও পর্যন্ত ভক্তরা তাঁকে দর্শন করতে ছুটে যান কলকাতার বাগবাজারে আর  বিষ্ণুপুরের মন্দিরে। আসল বিগ্রহ যেখানেই থাকুন না কেন , উভয় স্থানে গিয়েই ভক্তরা অনুভব করতে পারেন শ্রীশ্রীমদনমোহনদেবের উপস্থিতির  আবেশ ও  তাঁর লীলার দিব্য অনুভূতি। আসলে, ভক্তের ডাকে সাড়া দিয়ে ভগবান যে সকল স্থানেই প্রকট হতে একান্ত ভাবে ভালোবাসেন….. তাঁর অবস্থিতি তো সর্বস্থানে!
জয় শ্রীশ্রীরাধামদনমোহনদেব।

সমাপ্ত

Share This
Categories
কবিতা

চন্দনকাঠের চাঁদ, চিতা ও চমৎকার :: শুভঙ্কর দাস।।।

১
অনশ্বর গুহার ভেতর ছুটন্ত স্পন্দন
সময়রাক্ষসের চোখে তুচ্ছ, অতি সামান্য অথচ ব্রহ্ম-উদ্যম
তাতেই অলীক নির্মিত গোটা ভুবনের সম্রাট ও সিংহাসন!

২
মাঘী সংক্রান্তীর কোনো তারাখসা রাত
রক্তমাংসের পুষ্পবৃষ্টি, ঘড়ির কাঁটার উল্লম্ফনসম
ভয়ার্ত জন্ম-আঙুল,চেপে ধরে অনিদ্রিত,অগাধ সফেন স্তন!

৩
কোনো অঙ্কে বিভাজিত নয় অঙ্ক অথচ দৃশ্য শুরু
দিগন্তে মিশে যাওয়া সাদা বলাকার পাখা,সবুজ শীষের শরীর বেয়ে নামা শিশির, ধানসিদ্ধ উনুনের লালাভমুখ
অরব আয়োজনের সাক্ষী
পথচলা গুহার চিত্রের শিকারের পর অবিরাম শান্তি।

৪
অভিযানে অ্যামিবার আলস্যমাখা চিহ্ন বুকের মধ্যে
এনেছে বক্বল বিশুদ্ধতা, গতি তো দুর্বোধ্য, বৃক্ষের পাশে
মাথায় ময়ূরপালক বেঁধে চোখ দেখানো অসূর্যকে
রূপকথার চেয়েও অসীম,অবধারিত..

৫
অরণ্যের সকল পোশাক ফেলে আলোর স্বভাবসত্য
স্নায়ুকিরণ চলাচল সেই মহাশূন্য থেকে পিঁপড়ের পায়ের নূপুরের ধ্বনির মাঝে, যেখানেই আর্তনাদ
প্রার্থনা শিশুহাতের,শুভ্রতার মেঠো অনুবাদ

৬
জলজ পরিবার,শ্বাস ভরে নিয়ে সপরিবারে বাঁশি
হয়ে ওঠার নিরলস নিমগ্নতা,বসুন্ধরা বিজয়ের হাসি
কোনো জীবাস্মস্মৃতির ভেতর গোপন রেখে
এই উপলব্ধি, হৃদয়ের সুউচ্চতা ও স্থাপত্য কল্পনাতীত!

৭
ক্ষমা শব্দের ভেতর রক্ত,শূল,কাঁটা আর বহনকারী মিথ্যের দোষারোপ, আশেপাশে সবই শব,শুধু শিরের
মাঝখানে জাগ্রত তৃতীয় নয়ন
জ্বলছে, জ্বলছে নারীত্ব,পুরুত্বের কাঠে ও কাঠামোয়..

৮
তুষারক্ষেত্রে অযুত পায়ের চিহ্ন পাবে না,শিবরেখা
বরাবর পড়ে আছে পৃথিবীজন্মের কথা,কোথায় ছিল সেই মহাজাগতিক ছিদ্র, মাতৃযোনী,বিস্ফোরণ!
সকল প্রাণ,আসলে ধ্বংসাবশেষ…

৯
স্বপ্নের ভেতর সারাৎসার সিঁড়ি, অথচ কতক্ষণ স্থায়ীত্ব!
হৃদয়ের সক্রিয় শব্দের মূর্তি, সে দৈব হোক বা অদৈব
অঘোষিত সিদ্ধান্ত এই,নিজের সৃষ্টিকে প্রশ্ন না করে
নিজেই উত্তরলিপি পাঠ করো নিজের আয়নায়…

১০
পর্যায়ে রেখা মাত্র দুটি, আদম ও ইভ, সত্যি কোনো
গল্পের নটেগাছ না হলেও প্রতিটি মাটির নিচে শিকড়
যাচ্ছে, কোন টানে? চেতনার অধিকৃত প্রাণে
অস্ত্রগুলি পরীক্ষিত, শুধু আহত ও পরবর্তী শুশ্রূষার
কাহিনি শিশু শুনতে থাকতে মাতৃগর্ভে

১১
অন্তহীন সন্তরণে জল পেতেও পারো আবার নাও পেতে পরো,সাঁতার অশেষ,অমোঘ এবং অপরিবর্তনীয়
নদীর কাছে নৌকা মিলনপ্রত্যাশী,অথচ স্থিরতা নেই
পিতা-মাতার চক্ষু-চমাড়া,সেই ধ্বনিত প্রকাশ

১২
খাঁচা নির্মাণই দেবত্ব,এই দিলাম চাঁদ,এই দিলাম জোছনা
এই দিলাম জোনাকি,এবার আর্ষপ্রয়োগের আবেগে
বিদ্যুৎ, বিনত প্রস্তাব, বৃষ্টি ও মুখর-মেঘে
সব কাঁচাপাকা সন্তানই জয়ের স্মারক…

১৩
আঁচলের হলুদ শস্য, আলপনা সেই স্বর্গাবোধি
অনিপুণ হাতের সোহাগ মাখানো সহবাস
লক্ষ্মীবিদ্যা শেখানোর যুগান্তর শাঁস, যেভাবে নতুন ফসলের গান,মনকণিকার অভিভাবক,অযান্ত্রিক!

১৪
জ্ঞানের কাছে থেমে আছে যা,ক্ষুধার সৈকতস্বাদ
রোদপোহানোর মতো পুঁথিপাঠ,ধর্ম-মোক্ষ-মহৎমঠ
সবই শিশুপালনের মতো আবর্তন
শুধু দীর্ঘরাত পেরিয়ে একটাই লড়াই,মৃত্যু প্রতিদ্বন্দ্বী

১৫
বনমানুষের স্বভাব ঢেলে দিয়েছে ঈশ্বরের অবয়বে
নিজেকে পোশাকের মুখোশে,কাপড়ের সৌজন্যে ঢেকে
নিজেই আবার দায়মুক্ত হয়ে নগ্ন হয় রাতে ও দিনে
কে অন্তরাল? নীলকন্ঠের রেখেছো মোহিত আড়াল!

১৬
অকস্মাৎ জানতে পারল,অনুভব ছাড়া কোনো দরজা
বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে নেই,প্রজ্ঞা, প্রেরণা, প্রদীপ এবং প্রীতি
ফুরিয়েও সঠিক সন্ধি বা সহবাস হয়নি
নিহত চোখের নিচে মুঠো মুঠো বলিরেখা

১৭
সেই মরুপথে যাত্রা, নাভিসরোবরে স্নান,স্বরূপের
সাহসসমগ্র ইতিহাসের অক্ষম পাতা,তার ওপর
মৃতচিতাবাঘের ওপর ছবি তোলার মতো কারুকার্য
অবাক পানীয়,পিপাসার কীরকম সযত্ন সঞ্চারণ!

১৮
জড় ও জমির অধিকাংশ চর্চা ও চেষ্টা, অন্বেষণ
সেইসঙ্গে নরম,তুলতুলে,পদ্মপ্রথম শরীর,খনন
বাদবাকি শুধু শ্রদ্ধাবান হাহুতাশ আর পড়ে থাকে
কিছু জরাসন্ধ ইন্দ্রিয়, যাদের নগ্ন দ্রৌপদীদহন ছাড়া
কিছু বিদ্ধ মহাভারতীয় তীর

১৯
সহসা প্রেমের সারি সারি সঙ্কল্প কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারিকার তলদেশ পর্যন্ত একে-অপরকে
প্রতিষ্ঠিত করতে,দৃশ্য, দৃশ্যের পালিশ,গান,গানের গভীরতা,প্রস্তাব, প্রস্তাবের সংস্কৃতি, সেই সরলতা প্রথম কদম ফুল

২০
অতি কষ্টে শ্মশান সন্ধিতে আসে,আশির কাছে
বা তারও ঢেলা-ভাঙা আগে দেখিয়ে রাখে চতুষ্পদ
বা আয়তক্ষেত্রের মাপ,স্বয়ং পৃথিবী ছেড়ে যাওয়ার
ছায়াছবি,তবুও সরাসরি মুহুর্ত, চুম্বন

২১
উজ্জ্বল নীলগ্রহ একাই বুকে প্রান ভরে নিয়েছে
যেভাবে ডুবসাঁতার দেওয়ার আগে ভরে নেয় দম
মেঘের আসবাব, মাঠের মাধুকরী, পুষ্পের প্রস্তাব
সব স্বয়ংচালিত ক্ষুদ্রকে করে সুবৃহৎ

২২
কেবল কি কাঠামো? যাবতীয় খড়,মাটি,অস্ত্র
যে গড়ে,তার ফুসফুস, পেট,চরিত্রসংশোধন বিন্যাস
কোনো নক্ষত্র মৃত ছাড়া মাটি ছোঁয় না
ঈশ্বরও ধাতবস্বর, আঘাত হলে আকৃতি পায়

২৩
সরলতা ন্যাংটাশিশুর মতো সকলের গৃহের সামনে ধুলোর গড়াগড়ি দেয়,হাসে,দুর্ঘটনায় কাঁদে
পুনর্বাসন সচেষ্টায় সর্বস্ব বিলিয়ে দেয়,শুধু অশান্ত কিছু ছাঁচ দরজা-জানালা বন্ধ করে

২৪
শব্দহীন বেদনার বাতাসে এগিয়ে চলে মহাশূন্যকারিগর
নিজের নিঃশ্বাসের সঙ্গে কথোপকথন, নিজেকে স্পর্শ
করে প্রাণময় করে তোলে পরবর্তী পর্যায়
সেখানেও প্রবাহিত সম্পর্কের সুজনিশাক, তরতাজা

২৫
উৎসমুখে আগ্নেয়ঘর, একটি মাত্র শিল্পী বেঁচে আছে
তাঁকে করুণা করে কেউ সর্বশক্তিমান বলে বাঁচতে চেয়েছে,স্বর্গের কল্পনার চেয়ে মহৎগুণ এই
পিতৃপুরুষের শেষযাত্রায় মাথায় হাত রেখে,নিরাময়ের
নতুন গল্প শোনানো,সত্যি হলেও হতে পারে…

২৬
চাঁদের সংগীত যেকোনো শরীরকে হরিতকীমন্দির করে তুলতে পারে,জীবাণুর সকল পরিচয়, দৃষ্টি, সহবাস
অথবা পরাক্রমী উৎপাদন ভুলিয়ে রাখে নন্দনতত্ত্ব
শুধু লড়াই নেমেছে সমুদ্রের মতো,পুতুল হতে পারবে না!

২৭
শেষপাতে ঈশ্বর এসে খাবেন বলে,পা-ধোয়ার জল, তুলানরম বক্বল,পরমাসুন্দরী সম্ভাষণ সাজিয়ে রেখে
অনুসরণীয় কোনো নৃত্য-গীত এবং স্তব প্রদর্শিত
শুধু ঈশ্বর পশু-পাখি-গিরিগিটি-কেঁচো অথবা গৃহপালিত
প্রীতিময় পুরাণপাতা,সেটাই রহস্য!

২৮
নদী যেদিকে বহমান,পাহাড় যতটা আকাশভেদী
বৃক্ষের শিকড়কৌশল, সব ভাস্কর্য ও স্থাপত্য শেষে
যা রক্ত-ক্লেদ-কফকে রূপময়-শ্রেয়শ্রেষ্ঠ করেছে
প্রণয়,অশ্বিনীকুমারের রথচক্র ঘষটে গেছে মাটিতে

২৯
পাথরে খোদিতরূপ, অবিশ্বাসের আলোড়নে যদি
সকল মূর্তি ভেঙে যায়,জড়ো করা প্রসাধন, প্রভাব
প্রতিশোধ আগুনে পুড়ে,ছাই
সেই ছাইয়ের ওপর অবতার ঘুমায়,ত্রিশূল শর্ত হয়ে

৩০
চাঁদের দুপিঠেই চাবুক,কুমিরের রোদ পোহানোর মতো
বিস্ময় শুয়ে আছে প্রকাশ্যে,নিজেকে এই যজ্ঞের আগুনে উৎসর্গ করেছে,অষ্টধাতুর সঙ্গে মিশিয়ে
চাঁদের চেয়েও অপরূপ অপরাধ করবে বলে…

৩১
নির্মাণ মাইলের পর মাইল হেঁটে আসে,সেখানে সৌখিন পরীক্ষায় অভিষেক, মুকুট বানানো হয়নি বুকের মাংস কেটে,ক্রিয়াধর্মের সূত্র ধরে অপেক্ষা ফিরে আসবে
যা কিছু অন্তর্গত ভালো,ভালোর মহিমা

৩২
হৃদয় সশস্ত্র ডুবোজাহাজ, নিজের শরীরে সামুদ্রিক
তা নয়, যার দর্শনে শ্বাসকার্য চলে,সেখানে যুদ্ধ, যুদ্ধবিরতি,কেন এই মহাকর্ষীয় আন্দোলন, মুখ,মুখর
কোলাহল,মধ্যমণি,সেই মুদ্রা ও মুগ্ধতা

৩৩
হৃদয়ের পান্ডুলিপি কেউ না কেউ সংবিধান ও সম্রাটের
পায়ের কাছে রেখে,মুক্তি ও মধুরিমা
এই যে অবাধ আবেগ,তার শাসিত কেন্দ্রীয় নিউক্লিয়াস
সবই দাগ রেখে,শুধু উষ্ণতাকে তপসিলি তাম্রযুগ!

৩৪
পদাবলির পাতা ইঁদুরের মুখে,খুদের আকাল
মাঠে মাঠে সবুজের লাশ,হাঁড়ি,কলসি,বাটি,চাল,ডাল
আর বৈষ্ণবী রাত,কন্ঠিবদল করে রৌদ্রবিক্রয়
অপরাহ্নে চক্ষুস্থির, এতো পাঠ বাকি নারীর…

৩৫
একটি পরিচ্ছন্ন কাল,তাই কম্পিত হাতের ওপর রাখা
জয়ের সকল চিহ্ন দিয়ে জলেডোবা রাস্তাটুকু চলাচলের
যোগ্য করে,বিশ্বরূপদর্শন। অতীত,ভবিষ্যৎ ও বর্তমানকে
জানার এই প্রক্রিয়া, সৃষ্টির নিয়ামকের দাঁড়িপাল্লা

৩৬
আত্মা কোথা থেকে নিয়ে এসেছে আনাজ,মাছ,মাংস
স্নানের পর ত্রিপিটক খুলে সাদাবস্ত্র নামিয়েছে শির
সেই শিরে চুম্বন করছে সশরীরে নূর, পরমহংসের কাতর
কান্না মিশে আছে অস্তিত্বে,এবার পোড়ায় মায়া,গাছের ছাল

৩৭
আমলকি করতলে রেখে বলছে, মানুষ নয়,মানুষী নয়
লিঙ্গভেদে শুধু মাতা, নিত্যসিদ্ধ,শুধু উচ্চারণ, পিতা,
মুমুক্ষুবৃক্ষ,মাঝখানে সাধনবর্গ সেই যোনিপথে চক্রাকারে
চমৎকার

৩৮
অরণ্য থেকে বেরানো শ্বাস,শূদ্রের হাতে তৈরি মারণাস্ত্র
বালক চলেছে সাধু-দর্শনে,বালিকা ধরেছে,বালকের
শরীরী পটবস্ত্র, যা নিজের শরীর দিয়ে তৈরি
ক্ষত্রিয় অবাক,বৈশ্য বিগলিত,শুধু একটি জ্যোতিরেখায় ব্রাহ্মণ শূদ্রের পায়ের ধুলোয় মন্ত্র লিখছে

৩৯
বেদান্ত-আয়াত এবং বাইবেলের ধ্বনিত চমৎকার ধ্বনি
একশো শতাংশ আন্তরিক জেনে,বদ্ধজীব, আরও আরও
বদ্ধ হয়ে হাসে,সেই হাসিতে বিদ্যুৎ চিরে যায়
কৃষক শুধু গলায় হাড়ের মালা দেখিয়ে বলে
ক্ষিদের পাতা খুলে খুলে নোঙর বানাব…

৪০
সহসা শেষ কথা,শেষ কথাই,মৃত্যুর মতো সংবাদ
মৃত শোনে না,কোনোদিন, অথচ দশ সহস্র গোধন ও সমপরিমাণ স্বর্ণমুদ্রার আশায় সন্ন্যাসী ও সংসারী
সেই সংবাদের সুষ্ঠু আশায় মৃত্যুকে ভেট দেয়…

৪১
সকল ভিক্ষুক হাত জড়ো করে নদীর ওপর,যাদের শরীরে এখনও রাজসভা লেগে,কষ্ট বেশি তাদের
আর যাদের গায়ে লেগে আছে পথের ধুলোয়
তারা স্নানমাত্র সারস

৪২
শ্বাসকার্যে ঈশ্বরের সন্ধ্যা ও সকাল।গোলাকার একটি বলীয় প্রক্রিয়া, তার ওপর মাটি-পাথর-মাংসের নামকরণ ও বুক চিতিয়ে ওঠার নমুনা,সুনিপুণ বিবরণী হিসেবের
ঐ পর্যন্ত কি আকাশ? হলুদ হ্রদের হাহাকার,শুধু সূর্যপ্রতিম সবুজ সবুজ মদের মতো ঘাস!

৪৩
অমরত্বের ভুল বোঝাবুঝি, উপাস্য তাকেই করেছে যে সবচেয়ে ক্ষুরধার অস্ত্র ধরতে পারে,সেই হত্যার সারাৎসার লীলা,এখন আহ্নিক গতির পৃষ্ঠা ছিঁড়ে
ভুবন গড়ার খেলা,খেলার অধিক অভ্যাস,এমন কি ঈশ্বরীয় বিশ্বাস!

৪৪
ঝুলন্ত মাটির বারান্দা, ধনুকহাতে বীরশ্রেষ্ঠ,স্বর্গামাধুরীর মতো মোহময়ী নারীর কোমরে হাত ক্রেডিটকার্ড ধরে থাকা কুবের,তার অনেক নিচে সিনেমার পোস্টারের নিচে খালি পেটে,না,অভুক্ত নয়, অশ্রু চেটে চেয়ে আছে
নবযুগের নায়ক

৪৫
যেকোনো বৃহৎ রাক্ষসের চেয়ে শক্তিশালী কাম,নিসর্গ, দেব-দেবী,পক্ষীরাজঘোড়া,রূপকথা,সমৃদ্ধনগরের জলপথ,আবিষ্কার, আরামপ্রিয় নিদ্রা,নত হয়ে থাকা মুনি-ঋষির শির
তার চেয়েও জন্মগ্রহণ,মানুষের, মানুষের বাচ্চার..

৪৬
মানুষের বসবাসযোগ্য ভূমি,লেখো,অশ্রু, অশ্রু, অশ্রু

৪৭
অনুতাপ চেতনার শেষ তলে ঢেউ তোলে একা
যেন নিঃসঙ্গ সৈনিক
মহাভারতের কোনো অধ্যায়কে ক্ষমা করবে না

৪৮
এখনও প্রেম সমর্থন পায়নি,জিততে কোনোদিন পারেনি!শুধু অপেক্ষার পাথুরে রেখা অথবা জীবাশ্ম হয়ে
স্থির,কোনো এক জীবন্ত হৃদয়ের

৪৯
মৃতদেহের ওপর জন্মান্তরের গাছ,সেই গাছে ধুলো…

৫০
আবার চোখের পাতায় লেখো, অপেক্ষা,অপেক্ষা, অপেক্ষা…

উৎসর্গ। কবি শম্ভু রক্ষিত
চিত্রঋণ।ফেসবুক

 

————————//———————-
২৫শে ডিসেম্বর, ২০২১.©Suvankar Das, Haldia

Share This
Categories
উপন্যাস

কঙ্কাবতীর দুঃসাহস (ধারাবাহিক উপন্যাস, ষষ্ঠদশ পর্ব) : দিলীপ রায়।

কঙ্কাবতী কিছুতেই বুঝতে পারছে না, এত তাড়াতাড়ি কী করে রসুলপুরের মেয়ে লতাকে ঘোতন পছন্দ করলো ! খবরাখবর নিয়ে কঙ্কাবতী জানতে পেরেছে লতা খুব ডানপিটে । আরও জানতে পেরেছে, মাসীর বাড়িতে থেকে সালার কলেজে লতার পড়াশুনা । ব্রজেশ্বরবাবু মেয়ের চালচলনের ঠাটবাট দেখে কোনো ঝুঁকি নেননি । তাই লতাকে মাসী বাড়ি রেখে পড়ানো । সালার কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি নেওয়ার পর বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার ডিগ্রি করার লতার খুব ইচ্ছা ছিল । কিন্তু বাড়ি থেকে সেভাবে সাড়া পায়নি । তাই তার উচ্চশিক্ষার ইচ্ছা থেমে গেছে । লতা মেয়ে হিসাবে ঘোতনের উপযুক্ত । কিন্তু কঙ্কাবতীর খটকা অন্য জায়গায় । নাদনঘাট থেকে ভাল একটা সম্বন্ধ এসেছিল । সেই মেয়েটা যেমন শিক্ষিত, তেমনি মার্জিত । মেয়ের বাবা হাই স্কুলের শিক্ষক । ভদ্র পরিবার । মেয়েটি ফর্সা না হলেও তাকে পুরোপুরি শ্যামলা বলা যাবে না । কঙ্কাবতী যতটুকু জেনেছিল, মেয়েটির স্বভাব-চরিত্র যেমন ভাল তেমনি মেয়েটি কর্মঠ । পড়াশুনার পাশাপাশি নাচ শিখত । মেয়েটির প্রতি কঙ্কাবতীর যথেষ্ট আগ্রহ ছিল । কিন্তু ঘোতন এককথায় নাকচ করে দিয়ে বলেছিল, “মেয়েটি কালো ।“ অথচ মেয়েটির বাবা নাদনঘাটের বিশিষ্ট মানুষ । সেখানকার মানুষ তাঁকে সমীহ করে চলে । কঙ্কাবতীর দৃষ্টিতে লতার চেয়ে নাদনঘাটের মেয়েটি ঘোতনের জীবনসঙ্গিনী হিসাবে বেশী উপযুক্ত ।
যাই হোক ঘোতনের ইচ্ছা অনুসারে লতার সঙ্গে বিয়ের প্রস্তুতি শুরু হলো । কিন্তু গোঁ ধরলো ঘোতন । তার ইচ্ছা, দোকানটা আরও সাজিয়ে বিয়ের পিঁড়িতে বসবে । অন্যদিকে বিয়ে দেরীতে হোক, লতা তার ঘোরতর বিরোধী । তাই ঘোতনের মতলব জানার পর লতা সরাসরি ঘোতনের দোকানে এসে হাজির । বর্ধমানের রসুলপুর থেকে মিঁয়া স্টেশন পৌঁছানো ভীষণ ঝকমারী । তবুও বর্ধমান, কাটোয়া হয়ে দুপুরের আগে সোজা ঘোতনের দোকানে । লতাকে দেখে ঘোতন অবাক ! কৌতুহলি দৃষ্টিতে খানিকক্ষণ লতার দিকে তাকিয়ে রইলো ।
ফ্যালফ্যাল করে তাকানো দেখে লতার ঝটিকা প্রশ্ন, “আপনি জীবনে কোনোদিন মেয়ে দেখেননি ? ঐভাবে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রয়েছেন ? অনেক দূর থেকে এসেছি । কোথায় আমাকে বসতে বলবেন কিংবা খাবার এনে খাওয়াবেন, সেসব না করে হাঁদার মতো আমার দিকে তাকিয়ে রয়েছেন !”
প্রশ্নের জেরবারে থতোমতো খেয়ে ঘোতন কিংকর্তব্যবিমূঢ় ! ভ্যাবাচেকা খেয়ে তড়িঘড়ি করে চেয়ারটা এগিয়ে দিয়ে বলল, “বসুন ম্যাডাম ।“
উঁহু, ম্যাডাম নয় । আমি আপনার বৌ হতে যাচ্ছি, সুতরাং শুধুমাত্র লতা । তবে শুনুন, আমি বসতে আসিনি ?
“তবে ?” প্রশ্ন করেই আবার লতার দিকে হাবলার মতো তাকিয়ে রইলো ।
এবার কিছুটা ধমকের শুরে লতা ঘোতনকে বলল, “মশাই, আর তাকাতে হবে না । কিছুদিনের মধ্যে আপনার সঙ্গে ঘর বাঁধতে স্থায়ীভাবে আসছি । কিন্তু …?”
আবার কিন্তু কেন ?
আমাদের বিয়ের পিঁড়িতে বসাটা দেরী করলে চলবে না । পুজোর পরে অগ্রহায়ণ মাসেই আমাদের বিয়ে হবে এবং সেটা অগ্রহায়ণ মাসের প্রথম সপ্তাহেই । আমি পঞ্জিকা দেখে এসেছি । ৪ঠা অগ্রহায়ণ বুধবার, বিয়ের ভাল দিন । ঐদিন আমাদের বিয়ের তারিখ ঠিক করতে বলুন । অন্যথা হলে, আমার দিকে ফ্যালফ্যাল তাকানোর আর সুযোগ পাবেন না । কথাটা মনে রাখবেন । তারপর দোকান ঘরের দিকে তাকিয়ে লতা বলল, “ঘরটা এত নোংরা কেন ? একটু গায়ে-গতরে খেটে পরিষ্কার রাখতে পারেন তো ?”
কী যেনো বলতে যাচ্ছিলো ঘোতন । তাকে থামিয়ে দিয়ে লতা বলল, “আমার দরকারি কথা বলা শেষ ! এবার আমি বাড়ি চললাম ।“
ঘোতন এতক্ষণ লতার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে তার চোখা-চোখা কথাগুলি শুনছিলো আর ভাবছিলো মেয়ে তো নয়, পুরোমাত্রায় থানার দারোগা ! রাখঢাক নেই । সোজাসাপ্টা কথা সোজাসাপ্টাভাবে বলার অভ্যাস । সুতরাং এই মেয়ে নিয়ে তার কপালে কী আছে, কে জানে ? ঘোতনের মতো ঠাটবাট ছেলেকেও ঘোল খাওয়াতে লতা একাই একশ ! তারপর লতার মুখে চলে যাওয়ার কথা শুনে ঘোতন আরও ঘাবড়ে গেলো । কী মেয়েরে বাবা ! রসুলপুর থেকে বয়স্থা মেয়ে একা সোজা মিঁয়া স্টেশন পৌঁছানো, প্রচণ্ড ধকলের ব্যাপার । তার উপর দিনের দিন ফিরে যাওয়ার চিন্তা ! অতোটা পথ ফিরে যাওয়া খুবই কষ্টকর । যাতায়াতের ঝক্কি-ঝামেলা ভীষণ সাংঘাতিক ! লতার ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে ঘোতন এবার বেঁকে বসলো এবং বলল, “বাড়ি ফিরে যাওয়া হবে না । আজ এখানে থাকতে হবে । তার আগে আপনার খাওয়া-দাওয়া ।“
বিরবির করে লতা বলল, “ক্যাবলাকান্তের মুখে বোল ফুঁটেছে ।“
কী বলছেন বিরবির করে ?
বলছি, থাকার জন্য আসিনি । আর থাকলে লোকে আপনাকে দুষবে এবং বলবে, “বিয়ের আগে মেয়েটাকে বাড়ি ডেকে এনে ঘনিষ্টভাবে মেলামেশা করছেন ! তাতে আপনার সম্মানহানি ঘটবে । সুতরাং মশাই, এবার আমার বাড়ি ফেরার পালা !”
উঁহু আপনাকে আমি একা ছাড়ছি না ।
তাহলে কী আপনি আমার সঙ্গে যাবেন ?
দরকার হলে যাবো ।
রসুলপুর, অনেক দূর । কথাটা ভেবে বলছেন তো ?
ঘোতন পড়েছে ফ্যাসাদে । অতো সাতপাঁচ ভেবে কথাটা বলেনি । এখন সত্যিই যেতে হলে রাতে বাড়ি ফেরা অসম্ভব । তবুও ঢোক গিলে বলল, “ম্যাডাম, আমি আপনার সঙ্গে যাবো ।“
বেশ ! রেডি হয়ে নিন ।
মিঁয়া স্টেশন থেকে তিনটে কুড়ির ট্রেন ধরে প্রথমে কাটোয়া । সেখানে নেমে বর্ধমানের বাস ধরার আগে বাস স্ট্যান্ডে দুজনে দুটো কেক্‌ কিনে গরম চা খেলো । বর্ধমান থেকে সন্ধ্যা ৭টায় বাস পেলো । বর্ধমান – বিষ্ণুপুর বাস । সোনামুখী হয়ে যাচ্ছে । সেই বাসে রসুলপুর ।
ঘোতন বাড়ি ফিরতে চাইলে লতা নাছোড়বান্দা, তার বাড়ি ফেরা হবে না । এতক্ষণ দুজনে খুব কাছাকাছি একসঙ্গে সফর করার জন্য তাদের কথাবার্তায় “আপনি” উঠে গিয়ে এখন শুধু “তুমি” । তাই একরকম জোর দিয়ে লতা বলল,”তোমাকে আমি ছাড়ছি না । ভয় নেই, আমরা এক ঘরের ভিতর শুয়ে তার কাটাবো না । তার গ্যারান্টি থাকলো ।“
অগত্যা ঘোতন লতাদের বাড়ি থাকার সিদ্ধান্ত নিলো ।
রাত্রিবেলায় খাওয়া-দাওয়ার এলাহি আয়োজন ! দেশী চিকেন, পুকুরের কাতলা মাছ ! রসুলপুরের বাস স্ট্যান্ডের ঘনাদার মিষ্টির দোকানের গরম গরম রসগোল্লা । আরও কতো কী !
তারপর…………?
তারপর পরেরদিন ভোরবেলায় পূর্ব আকাশে কেবল সূর্য উঠেছে । ঘোতন বাড়ি ফেরার জন্য জামা-কাপড় পরে রেডি । ঘোতনকে জামা-কাপড় পরা অবস্থায় দেখে ব্রজেশ্বরবাবু বললেন, “রেডি হলে চলবে না বাবা । দুটো ভাত খেয়ে রওনা দেবে ! কেননা অনেকটা পথ । বাড়ি ফিরতে বেলা গড়িয়ে যেতে পারে ।“ ব্রজেশ্বরবাবুর কথা শেষ হতেই কোথা থেকে লতা ছুটে এসে একেবারে ঘোতনের সামনে । হাঁপিয়ে গেছে বেচারা ! হাতে ছোট একটা পুটুলি । তার মধ্যে গোটা পাঁচ-ছয় কাঁচা পেয়ারা । দুটো পেয়ারা ঘোতনের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, “আজ তোমার বাড়ি যাওয়া বন্ধ । আমি চা বানিয়ে আনছি । চুপচাপ চা খাও । তারপর বাজারে যাওয়া । বাজার থেকে ফিরে দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে ধরে তোমাকে শক্তিগড়ের ল্যাংচা খাওয়াতে নিয়ে যাবো । তারপর দুপুরের খাওয়ার পর কালী মন্দির । সেখানে গ্রামীন মেলা বসেছে । মেলায় তোমার সঙ্গে নাগরদোলায় উঠবো । আপাতত এই কয়েকটা প্রোগ্রাম । সুতরাং বাড়ি ফেরার একদম নাম করা চলবে না । তারপর ঘোতনকে লতা হাত ধরে বারান্দায় রাখা চেয়ারে বসিয়ে বলল, “এখানে চুপচাপ বসো । আমি এক্ষণি চা বানিয়ে আনছি ।“ ইত্যবসরে লতার মা দুটো প্লেটে দু-কাপ চা এনে হাজির ।
চা খাওয়ার পর লতা বাবাকে বলল, “আজ তোমাকে বাজারে যেতে হবে না । আমি বাজারে যাবো ।“ বাবাকে কথাটা বলেই ঘর থেকে বাজারের ব্যাগ এনে ঘোতনের দিকে তাকিয়ে বলল, “এবার দয়া করে আমার সঙ্গে বাজারে চলো ।“
বাজারটা লতাদের বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে । লতার বাবা ব্রজেশ্বরবাবু সাধারণত সাইকেলে বাজারে যান । লতার একটা লেডিস্‌ সাইকেল রয়েছে । তা সত্ত্বেও লতা ঠিক করলো, “পায়ে হেঁটে বাজারে যাবে । তাতে ঘোতনের সাথে অনেক কথা বলা যাবে ।“
রাস্তায় রতন কাকার সাথে দেখা । রতন কাকা জিজ্ঞাসা করলে, “হনহন করে কোথায় চললি লতা ?”
বাজারে যাচ্ছি ।
কেন, তোর বাবা কোথায় গেলো ?
বাবার শরীরটা ভাল না । তাই আমি বাজারে যাচ্ছি ।
তোর সঙ্গের ছেলেটিকে তো চিনতে পারলাম না !
ইনি আমাদের বাড়ির কুটুম ।
কেমন কুটুম ? ইতিপূর্বে তাকে কখনও তো দেখিনি !
আমার বান্ধবীর দাদা । কাকা, আমার তাড়া আছে । আমি বাজারে চল্লুম ।
এক ঝলক মুচকী হাসি দিয়ে রতন কাকা লতাকে বললেন, “ছেলেটির সাথে তোর ভীষণ মানিয়েছে ।“
লতা রতন কাকার সঙ্গে আর কথা না বাড়িয়ে সোজা বাজারে ।
হঠাৎ রাস্তার বা-পাশের অর্জুন গাছ তলা থেকে প্রথমে একটা শিস দেওয়ার আওয়াজ । ঘোতন তাকিয়ে দেখে গাছের নীচে কতকগুলি ছেলের জটলা । ছেলেগুলোর চেহারার ধরন দেখে ঘোতন বুঝতে পারলো, উটকো ছেলে-পেলেদের জটলা । তারা আড্ডায় মত্ত । তারপর জটলার মধ্যে থেকে একজন উটকো ছেলে সম্ভবত তাদের মধ্যের অন্যজনকে চিৎকার করে লতাকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলল, চেয়ে দ্যাখ । তোর ভালবাসার লতার সাথে অন্য আর একজন নাগর ঘুরছে !”
ঘোতন দাঁড়িয়ে পড়লো । ঘোতনের শারীরিক কায়দা দেখে লতা ঘাবড়ে গিয়ে কোনোকিছু না ভেবে ঘোতনের হাত টেনে ধরে আরও জোরে হাঁটতে লাগল । বাজারে ঢুকে প্রথমে মাছ বাজারে ঢুকলো । সোনালী রঙের লোকাল ট্যাংরা মাছ । দামটা একটু বেশী । তারপর বড় সাইজের বোয়াল মাছ । মাটন কিনতে ঘোতন বারণ করেছিল । কিন্তু কে শোনে কার কথা ! লতা বেশ খানিকটা মাটন কিনলো । তারপর সবজির বাজার । আলু, পিঁয়াজ, আদা, রসুন, কাঁচা লঙ্কা, টমেটো, পটল, গরমমশলা, ইত্যাদি কিনে এবার রিক্সায় উঠলো । লতার ভয়, গাছ তলার ছেলেগুলি আবার বিরক্ত করলে ঘোতনকে সামলানো দায় হয়ে দাঁড়াবে !
রিক্সা মৃদুমন্দ গতিতে এগোচ্ছে । অর্জুন গাছের কাছাকাছি আসা মাত্র লতা লক্ষ্য করলো, সবগুলি উটকো ছেলে লাঠি নিয়ে রাস্তার উপরে দাঁড়িয়েছে । লতা পরিষ্কার বুঝতে পারলো ছেলেগুলির ধান্দা খারাপ ! মারপিট করার ধান্দা !
হঠাৎ উটকো ছেলেগুলির মধ্যে পল্লবকে দেখে ঘোতনের চোখ ছানাবড়া ! নিজের অজান্তেই বলে ফেলল, ঘাটের মরাটা এখানে কেন ? তারপর কোনোকিছু বোঝবার আগেই উটকো ছেলেগুলি ঘোতনের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লো ……?
 (চলবে)

Share This
Categories
নারী কথা

আয়ালাসোমায়াজুলা ললিতা ::: সৌরভকুমার ভূঞ্যা।।।

বয়স মাত্র আঠারো। কোলে চার মাসের শিশু সন্তান। সদ্য বিধবা মেয়েটির চারপাশে একরাশ অন্ধকার। নিজ ঘরে অনেকটা পরগাছার মতো জীবন। উঠতে বসতে গঞ্জনা, আপবাদ। একে তো স্বামী হারানোর বেদনা, অন্যদিকে চারপাশের অসহনীয় পরিবেশ। তিলে তিলে দগ্ধ হওয়া মেয়েটি তখন আকুল ভাবে খুঁজছে মুক্তির পথ। আর মৃত্যুর থেকে মুক্তির সহজ উপায় আর কী হতে পারে! কিন্তু মৃত্যুতেই কি মুক্তি নাকি হেরে যাওয়া? মেয়েটি ভাবে কেন সে হেরে যাবে জীবনের কাছে? তার দোষ কোথায়? ওই ছোট্ট শিশুটিরও দোষ কোথায়? তাহলে মুক্তি কোথায়? মেয়েটি ভাবে। বুঝতে পারে পরাধীনতার জীবন মুক্ত হয়ে যদি সে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে, তাহলে মুক্তি সমম্ভ। আর তার জন্য চাই লেখাপড়া। কিন্তু মেয়েদের লেখাপড়া করার পথটাও সুগম নয়। তারপরে সে বিধবা। কিন্তু পিছিয়ে গেলে চলবে না। মেয়েটি নিজেকে বোঝায় হেরে যাওয়া চলবে না। পড়াশোনা করে নিজের পায়ে দাঁড়াবেই। নিজের জন্য বাঁচবে। বাঁচবে তার মেয়ের জন্য। শুরু হয় তার জীবনের নতুন লড়াই, নতুন অধ্যায়। সাফল্যের বরমাল্য গলায় পরে নতুন নজির সৃষ্টি করে হয়েছিলেন দেশের প্রথম মহিলা ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। অসামান্যা এই নারী হলেন আয়ালাসোমায়াজুলা ললিতা।
১৯১৯ খ্রিস্টাব্দের ২৭ আগস্ট চেন্নাইয়ের এক মধ্যবিত্ত তেলেগু পরিবারে ললিতার জন্ম। সাত ভাই-বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন পঞ্চম। বাবা পাপ্পু সুব্বারাও ছিলেন গুইন্ডির কলেজ অব ইঞ্জিনিয়ারিং-এর অধ্যাপক। ছেলেমেয়ে উভয়ের শিক্ষার ব্যাপারে তিনি ছিলেন সচেতন। তার সব ছেলেই ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করেছেন।
সেকেন্ডারি স্কুল লিভিং সার্টিফিকেট পাওয়ার পর পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায় ললিতার। তৎকালীন সামাজিক নিয়ম মেনে মাত্র পনেরো বছর বয়সে বিয়ে যায় ললিতার। ১৯৩৭-এ তাঁর মেয়ের জন্ম হয়। মেয়ের বয়স যখন মাত্র চার মাস তখন তার স্বামী মারা যায়। অষ্টাদশী বিধবা ললিতার জীবনে নেমে আসে চরম বিপর্যয়। ছেলের অকাল মৃত্যুর জন্য শাশুড়ি ললিতাকে নানারকম কথা শোনাতেন। তাঁকে অপয়া বলে গালিগালাজ করতেন। জীবনটা দুর্বিসহ হয়ে ওঠে। দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া ললিতা ঘুরে দাঁড়ানোর সংকল্প নেন।
শুরু হয় ললিতার জীবনের নতুন অধ্যায়। কুইন মেরি কলেজ থেকে তিনি ইন্টার মিডিয়েট পাশ করেন প্রথম বিভাগে। সিদ্ধান্ত নেন বাবা-ভাইদের মতো ইঞ্জিনিয়ার হবেন। সেই সময় একজন মেয়ের ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সিদ্ধান্তটি বেশ অভিনব ও সাহসের। তবে বাবা তাঁর সিদ্ধান্তকে সমর্থন জানালেন।
যাই হোক, ইঞ্জিনিয়ারিং তো পড়বেন কিন্তু কোথায়? তখন গুইন্ডির কলেজ অব ইঞ্জিনিয়ারিং-এ মেয়েদের পড়ার সুযোগ ছিল না। পরিত্রাতা হয়ে এগিয়ে এলেন বাবা। তিনি কলেজের প্রিন্সিপ্যাল এবং পাবলিক ইনস্ট্রাকশান ডিরেক্টরকে মেয়ের ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার ব্যাপারটা বলেন এবং বুঝিয়ে তাদের মত আদায় করেন। কলেজের ইতিহাসে তৈরি হয় এক নতুন অধ্যায়। ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তি হন ললিতা।
কলেজের অসংখ্য ছেলের মধ্যে একমাত্র মেয়ে হয়ে প্রথম প্রথম বেশ অস্বস্তি ও অসুবিধার মধ্যে পড়েন ললিতা। ধীরে ধীরে তিনি সব অসুবিধা কাটিয়ে ওঠেন। কলেজ কর্তৃপক্ষ তাঁর জন্য আলাদা হোস্টেলের ব্যবস্থা করেন। ললিতার একাকীত্বের ব্যাপারটা কলেজ কর্তৃপক্ষ বুঝতে পেরেছিলেন। তাঁরা ভাবেন যদি আরও মেয়েকে পড়ার সুযোগ দেওয়া হয় তাহলে এই সমস্যা দূর হবে। সেই মতো পরের বছর তাঁরা মেয়েদের ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার ব্যাপারে বিজ্ঞাপন দেন। সেই বিজ্ঞাপন দেখে দুজন মহিলা ভর্তি হন, পি-কে থ্রেশিয়া ও লীলাম্মা কোশি জর্জ। তাদের বিষয় ছিল সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং।
১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করেন ললিতা। স্থাপন করেন এক নতুন নজির। তিনি হলেন ভারতের প্রথম মহিলা ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করার পর তিনি জামালপুর রেলওয়ে ওয়ার্কশপে এক বছর শিক্ষানবিশীর কাজ করেন প্রাকটিক্যাল ট্রেনিং-এর জন্য। ১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দে তিনি সেন্ট্রাল স্টান্ডার্ড অর্গানাইজেশনে সহকারী ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে যোগ দেন। পোস্টিং হয় সিমলাতে। এখানে তিনি দু-বছরের কিছু বেশি সময় কাজ করেন। ১৯৪৬-এর ডিসেম্বর মাসে তিনি এই কাজ ছেড়ে দেন।
ললিতার বাবা পাপ্পু সুব্বারাও কিছু গবেষণার কাজ করছিলেন। বাবার অনুরোধে চাকরি ছেড়ে ললিতা সেই গবেষণার কাজে যোগ দেন। কিন্তু ন-মাস পর তিনি এই কাজও ছেড়ে দেন। এরপর তিনি কলকাতায় অ্যাসোসিয়েটেড ইলেকট্রিক্যাল ইনডাস্ট্রিজে যোগ দেন। ইঞ্জিনিয়ারিং ও সেলস ডিপার্টমেন্টে কাজ করতেন তিনি। এখানে তিনি বেশকিছু উল্লেখযোগ্য কাজ করেছেন। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ভারতের বৃহত্তম ভাকরা নাঙ্গাল বাঁধের বৈদ্যুতিক জেনারেটর নিয়ে কাজ। তিরিশ বছরের বেশি এখানে কাজ করেছেন তিনি।
১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দে লন্ডনের কাউন্সিল অব দ্য ইনস্টিটিউশন অহ ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারস তাকে অ্যাসোশিয়েট সদস্য হিসেবে নিযুক্ত করেন। ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি এখানকার পূর্ণ সময়ের সদস্য হয়েছিলেন। ১৯৬৪-এর জুন মাসে নিউইয়র্কে আয়োজিত প্রথম ইন্টারন্যাশন্যাল কনফারেন্স অব ওমেন ইঞ্জিনিয়ারস অ্যান্ড সাইন্টিস্টস-এ তিনি আমন্ত্রণ পান। নিজের ব্যবস্থাপনায় তিনি এই কনফারেন্সে যোগ দেন। এখান থেকে ফিরে আসার পর বেশ কিছু পত্রপত্রিকায় তাঁর সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়। নিজের বক্তব্যে তিনি মেয়েদের পড়াশোনা ও কাজে যোগাদানের ব্যাপারে উৎসাহিত করেন। মেয়েদের ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াশোনা কতখানি গুরুত্বপূর্ণ সে ব্যাপারে নিজের মন্তব্য প্রকাশ করেন। ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দে তিনি লন্ডনের ওমেন ইঞ্জিনিয়ারিং সোসাইটির স্থায়ী সদস্য হন।
১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দের ১২ অক্টোবর ব্রেন অ্যানিউরিজমে আক্রান্ত হয়ে মাত্র ষাট বছর বয়সে মারা যান ললিতা।
পরাধীন ভারতবর্ষে মেয়েদের পড়াশোনার ব্যাপারে তেমন উৎসাহ দেওয়া হত না, তাদের পড়াশোনা করার বিশেষ করে উচ্চশিক্ষা করার নানা রকম প্রতিবন্ধকতা ছিল। সেই সময়ে দাঁড়িয়ে এক বিধবা মেয়ের হয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে তিনি কেবল অনন্য নজির স্থাপনই করেননি, আগামী প্রজন্মের মহিলাদের কাছে নিজেকে দৃষ্টান্ত হিসেবে স্থাপন করেছিলেন।

Share This