Categories
প্রবন্ধ রিভিউ

আজ বিশ্ব নারিকেল দিবস, জানুন দিনটি কেন পালিত হয় এবং দিনটি পালনের গুরুত্ব।

নারকেল একটি অর্থকারী ফসল। এর উপকার, গুণাগুণ হিসেবের বাহিরে। জীবন জীবিকায় এর ভূমিকা আনস্বীকার্য। যে কোন দেশের অর্থনীতিটে নারকেল এক গুরুত্বপূর্ণ আবদান রাখে। এ এমন এক গাছ যার শুরু থেকে শেষ প্রতিটি অঙ্গই কাজেলগে কোনোনা কোনো ক্ষেত্রে। তাই এর গুরুত্ব বোঝাতে প্রতি বছর ২ সেপ্টেম্বর বিশ্ব জুড়ে পালিত হয় বিশ্ব নারকেল দিবস। এই দিনটা পালন করার মূল উদ্দেশ্য হল নারকেলের গুরুত্ব সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা এবং এর উপকারিতা বোঝানো।

 

নারকেল নামটি পর্তুগিজ শব্দ কোকো থেকে এসেছে। যার অর্থ মাথা বা মাথার খুলি এবং বলা বয় যে এটি ইন্দো-মালয় অঞ্চলের কোথও উদ্ভুত হয়েছে। নারকেল গাছের বৈজ্ঞানিক নাম Cocos Nucifera। ৮২ ফুট বা ২৫ মিটার উচ্চতা হয়ে থাকে এই গাছের। বিশ্বব্যাপী নারকেল সবচেয়ে বেশি উৎপাদিত হয় তিনটি দেশে। যথা ভারত, ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপিন। সংস্কৃত ভাষায় নারকেল গাছটিকে কল্পবৃক্ষ বা স্বর্গের গাছ হিসেবেও উল্লেখ করা হয়।

 

নারকেল হচ্ছে পৃথিবীর অন্যতম ভার্সেটাইল ফল, এর একাধিক উপকারিতা আছে। এটা যেমন খাওয়া যায়, তেমনই আবার এর তেল রান্না থেকে ত্বক পরিচর্চায় ব্যবহার করা যায়। এই দিনটি সাধারণত এশীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় রাষ্ট্রগুলিতে বিশেষ ভাবে পালিত হয়। কারণ এই অঞ্চলগুলিতে অধিক পরিমাণে নারকেল উৎপাদন হয়ে থাকে। নারকেলের স্বাস্থ্যোপযোগিতা ও বাণিজ্যিক লাভ সম্পর্কে জন সচেতনতা গড়ে তোলার জন্য বিশ্ব নারকেল দিবস পালিত হয়। ২০০৯ সালে এই দিনটি প্রথম পালিত হয়। তার পর থেকে প্রতিবছর ২ সেপ্টেম্বর বিশ্ব নারকেল দিবস পালিত হয়ে আসছে।

এশিয়া প্যাসিফিক কোকোনাট কমিউনিটি (APCC) ২০০৯ সালে এই দিবসটি প্রথম উদযাপন করে। তারপর থেকে, প্রতি বছর UN-ESCAP (United nations economic and social commission for Asia Pacific) এবং APCC একত্রে এই দিবসটি উদযাপন করে। দিবসটি পালনের লক্ষ্য হল, এই ফলের প্রচার এবং এর স্বাস্থ্য উপকারিতা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা।

আমরা জানি,  বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ফলগুলির মধ্যে একটি হল নারকেল, পাশপাশি এই ফলের বহুমুখী প্রকৃতি এটিকে বাকি ফলের থেকে আলাদা করে তোলে। নারকেল বা ডাব আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য কতটা উপকারি, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। নারকেলের জল, দুধ এবং তেল আমাদের স্বাস্থ্য, ত্বক, চুলের জন্য অত্যন্ত উপকারি। ডাব বা নারকেল দিয়ে বিভিন্ন সুস্বাদু খাবারও তৈরি করা যায়। নারকেল দিবসে, নারকেল থেকে তৈরি বিভিন্ন প্রকার মিষ্টান্ন, নারকেল গাছ থেকে তৈরি বিভিন্ন সামগ্রী এই প্রদর্শনী তে রাখা হয়।

সারা বিশ্বে প্রায় অনেকগুলো দেশেই নারকেলের চাষ হয়। তার মধ্যে, মইক্রোনেসিয়া, ফিজি,ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া,থাইল্যান্ড,ভারত,ব্রাজিল, শ্রীলঙ্কা, ফিলিপিন্স অন্যতম। এর মধ্যে সর্বাধিক নারকেল উৎপাদন হয়, ইন্দোনেশিয়া, ভারত, ফিলিপিন্স, শ্রীলঙ্কা, ও ব্রিজেলে।
এটা বিশ্বের একটি অন্যতম দরকারি গাছ এবং এটিকে প্রায়ই “জীবনের গাছ” হিসাবে উল্লেখ করা হয়। এটি মানুষ খাদ্য, জ্বালানী, প্রসাধনী, ভেষজ ঔষধ সরবরাহ, দালান নির্মান সামগ্রী হিসেবে ব্যবহার করে এবং এর রয়েছে আরও নানাবিধ ব্যবহার।

নারকেল চাষের উপর ভারতের প্রায় কোটি মানুষের জীবিকা নির্ভর করে।  ভারতের কেরল,অন্ধ্রপ্রদেশ, কর্ণাটক এবং তামিলনাড়ু তে সর্বাধিক নারকেলের চাষ দেখা যায়। দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ নারকেল এখানেই চাষ হয়। সমুদ্রের পার্শবর্তী স্থানে,লবনাক্ত মাটিতেই নারকেলের চাষ ভালোভাবে হয়।
নারকেল এমন একটি ফল, যা পৃথিবীর সব প্রান্তের মানুষের কাছে খুবই জনপ্রিয়। এই গাছের কাঠ থেকে শুরু করে, পাতা, নারিকেলের ছোবড়া, জল, দুধ, মালা, সবটাই ব্যবহৃত হয় কোনও না কোনও কাজে। তাই অর্থনীতিতে নারিকেলের ভূমিকা যে অসীম তা কিন্তু অস্বীকার করা যায় না।

একটি নারকেল গাছে প্রত্যেক বছর ৭০-১০০ টি নারকেল উৎপন্ন হয়। ভারতবর্ষে প্রায় দেড় কোটি গাছ শুধুমাত্র কেরলেই আছে ,যার কারণে কেরল কে কোকোনাট ল্যান্ডও বলা হয়।

 

ডাব বা নারকেলের জল কয়েকটি উপকারিতা সম্পর্কে আলোচনা করা যাক—

 

নারকেল একটি সুস্বাদু পুষ্টিকর ফল। এই ফল কাঁচাও খাওয়া যায়, এবং এর থেকে বিভিন্ন ধরনের খাবার ও তৈরি হয়,যেমন কেক, লাড্ডু, বরফি ইত্যাদি। তাছাড়া বিভিন্ন অনুষ্ঠানে, পুজো তে, এবং রান্নাতেও ব্যাবহার করা হয়।

নারকেলের পাতা জ্বালানির কাজে ব্যবহার করা হয়,নারকেলের পাতা থেকে তৈরি হয় ঝাঁটা যা সর্বত্রই ব্যবহার করা হয়।
নারকেলের ছোবা থেকে তৈরি হয় দড়ি,সোফা, পাদানি এবং বিভিন্ন ব্যাবহারিক জিনিস।

নারকেল গাছ ও জ্বালানির কাজে ব্যবহার করা হয় এবং নারকেল গাছ চেরাই করে ছোটখাটো আসবাবপত্র ও তৈরি করা হয়।

নারকেল থেকে তৈরি হয় নারকেল তেল যা আমাদের চুলের জন্য উপযোগী।  যার ব্যবহার ভারতে এবং অন্যান্য দেশেও রয়েছে।
নারকেলের জল আমাদের শরীরের পক্ষে প্রচুর মাত্রায় উপযোগী।

নারকেলের জলে রয়েছে গ্লুকোজ, ভিটামিন সি,পটাসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম যা আমাদের শরীরের ব্লাড প্রেসার কে নিয়ন্ত্রণে সহায়তা প্রদান করে।

কোলেস্টল এবং ফ্যাট ফ্রী হবার দরুন এটি হৃদয়ের পক্ষেও লাভদায়ক। এর মধ্যে থাকা আন্টি-অক্সিডেন্টের গুন শরীরের রক্ত সঞ্চালন কে সক্রিয় রাখে। এবং এটি শরীরের ওজন কমানোর ক্ষেত্রেও কার্যকর।

নারকেলের জল আমাদের শরীরের থাইরয়েড হরমোন কে নিয়ন্ত্রণে রাখে।

নারকেলের জল আমাদের কিডনির পক্ষেও উপযোগী, যদি প্রতিদিন নারকেলের জল খাওয়া যায় তাহলে কিডনিতে পাথর হবার সম্ভাবনা থাকে না।

তাছাড়া নারকেলের জল রূপচর্চার ক্ষেত্রেও ব্যবহার করা হয়।

 

নারকেল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়—

 

নিয়মিত নারকেল খাওয়া ওজন কমাতে সাহায্য করে। কারণ এতে অনেক ফাইবার থাকে।
ত্বকের প্রাকৃতিক ঔজ্জ্বল্য বজায় রাখে- নারকেল বা ডাবের জল এই জল পান করলে বলিরেখা ও ফাইন লাইন কমানো যায় এবং ত্বকের টানটান ভাব বজায় থাকে। ত্বকের আর্দ্রতা ধরে রাখতে সাহায্য করে নারকেল। নিয়মিত নারিকেল খেলে ত্বক কোমল ও সুন্দর হয়। এছাড়াও নারকেল খেলে ত্বকে বলিরেখা পড়ে না।

হাড় মজবুত করে- ডাবের জল হাড় মজবুত এবং ঘনত্ব বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে। এর ফলে অল্প বয়সে অস্টিওপোরোসিস, আর্থ্রাইটিস, অস্টিওপেনিয়া ইত্যাদি হাড়ের রোগের সমস্যা রোধ করা যায়।
অ্যাসিডিটি প্রতিরোধ করে- ডাবের জল শরীরের পিএইচ স্তরে ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। এটি অ্যাসিডিটি ও বুক জ্বালার হাত থেকে স্বস্তি দেয়।
চুলের টনিকের কাজ করে- চুল ঝরার সমস্যা থাকলে ডাবের জল পান করা শুরু করে দিন।
হজম শক্তি উন্নত করে- ডাবের জল প্রাকৃতিক উপায়ে সতেজতা প্রদান করে। পাশাপাশি শরীরে ব্লটিং ও গ্যাসের জন্য দায়ী সোডিয়ামের পরিমাণও কম করে। ফাইবার সমৃদ্ধ হওয়ায় এটি পাচনতন্ত্রকেও মজবুত করে।
ডিহাইড্রেশন প্রতিরোধ করে, হজম শক্তি উন্নত করার পাশাপাশি ডাবের জল শরীররে হাইড্রেট রাখে। এটি শরীরের হারিয়ে যাওয়া পুষ্টি উপাদানগুলিকে পুনঃস্থাপিত করে।
নিয়মিত নারকেল খেলে স্তন ক্যানসার, কোলন ক্যানসারসহ অন্যান্য ক্যানসারেরও ঝুঁকি কমে।
ডাবের জল পান করলে শরীরে রক্ত জমাট বাঁধার প্রবণতা কমে ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে।
হজম প্রক্রিয়ায় সহায়তা করে নারকেল।
নারকেলের দুধ  হেপাটাইটিস সি, জন্ডিস ও লিভারের বিভিন্ন অসুখ সারাতে নারকেল দুধ কার্যকরী।
নিয়মিত নারকেল খেলে মাথায় খুশকি ও শুষ্কতা দূর হয়। এছাড়াও নারকেল তেল ব্যবহারে চুল পড়া বন্ধ হয়।
নারকেলে বেশি ক্যালোরি থাকায় তা দ্রুত শরীরে শক্তি যোগায়। তাই কাজের মাঝে ক্লান্তি আসলে বা হালকা খিদে পেলে নারকেল খেলে তাৎক্ষণিক অ্যানার্জি বাড়বে।
নারকেলে থাকে স্বাস্থ্যকর ফ্যাট। যা কোলেস্টেরল বাড়ায় না বরং আথেরোসক্লেরোসিসের ঝুঁকি কমিয়ে হার্ট ভালো রাখতে সহায়তা করে।হৃদযন্ত্র ভালো রাখে নারকেল। এটি রক্তে কোলেস্টেরলের পরিমাণ কমিয়ে হৃদরোগের সমস্যা দূর করে।
নারকেল রক্তের ইনসুলিনের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখে। এ কারণে ডায়াবেটিস রোগীরাও পরিমিত নারকেল খেতে পারেন। এতে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে থাকবে।

নারকেল সম্পর্কে তথ্য—

(ক) ‘coconut’ শব্দটি ‘nut’ এবং পর্তুগিজ শব্দ ‘coco’ এর সমন্বয়ে উদ্ভূত।
(খ) বিশ্বে নারকেল উৎপাদনের ৯০ শতাংশই আসে এশিয়া থেকে।
(গ) ইন্দোনেশিয়া, Philippines, ব্রাজিল এবং শ্রীলঙ্কার পাশাপাশি ভারত বিশ্বের অন্যতম বড় রপ্তানিকারক দেশ।

(ঘ) নারকেল পুরোপুরি পরিপক্ক হতে এক বছর সময় লাগে।

(ঙ) একটি নারকেল গাছ প্রতি বছর কমকরে প্রায় ১০০টি নারকেল দেয়।
তাই বর্তমানে স্বাস্থ্য সচেতন ব্যক্তিরা ডাবের জলকে অধিক গুরুত্ব দিচ্ছেন। এই জল ত্বক, হৃদয়, চুল, রক্তচাপ এবং হজমের পক্ষে বিশেষ উপকারী। সমীক্ষায় জানা গিয়েছে যে, স্পোর্টস ড্রিঙ্কসের তুলনায় এটি অনেক বেশি স্বাস্থ্যকর, কম ক্যালরি সম্পন্ন। তাই আজ এই বিশেষ দিনটিতে ডাব বা নারকেলের জল কয়েকটি উপকারিতা সম্পর্কে আলোচনা করা হলো ।
ভারতসহ মোট ১৮টি দেশ নিয়ে এপিসিসি সংস্থাটি গঠিত। এ দিবসের মূল লক্ষ্য হচ্ছে নারকেল শিল্পের উন্নতির মাধ্যমে একটি দেশের অর্থ ব্যবস্থাকে মজবুত করা। নারকেলের মূল্য ও উপকারিতা সম্পর্কে জনসাধারণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধিতে পালিত হয় দিনটি। খাদ্য, জ্বালানি, ওষুধ, প্রসাধনী, নির্মাণ সামগ্রী ও অন্যান্য নানা কারণে ব্যবহৃত হয় নারকেল। এই নারকেল গাছকে প্রায়শই ‘Tree Of Life’ নামে উল্লেখ করা হয়ে থাকে। এশিয়া প্যাসিফিক কোকোনাট কমিউনিটি (এপিসিসি) নারকেলের মূল্য ও সমাজে তাদের প্রভাবের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করতে এই দিনটির প্রচার শুরু করে।

 

।। তথ্য : সংগৃহীত উইকিপিডিয়া ও  বিভিন্ন ওয়েবসাইট।।

Share This
Categories
প্রবন্ধ রিভিউ

লে-লাদাখ্‌ : ভ্রমণ পিপাসু মানুষের কছে এক স্বর্গ ভূমি।

ঘুরতে কে না ভালোবাসে। বিশেষ করে বাঙালিরা সুযোগ পেলেই বেরিয়ে পড়ে ভ্রমনের নেশায়। কেউ পাহাড়, কেউ সমুদ্র আবার কেউ প্রাচীন ঐতিহাসিক স্থান ভালোবাসে ভ্রমণ করতে। প্রকৃতি কত কিছুই না আমাদের জন্য সাজিয়ে রেখেছে। কতটুকুই বা আমরা দেখেছি। এ বিশাল পৃথিবীতে আমরা অনেক কিছুই দেখিনি। তবে সোশ্যাল মিডিয়ার দুনিয়ায় আজ গোটা পৃথিবীটা হাতের মুঠোয়় এলেও প্রকৃতিকে চাক্ষুষ প্রত্যক্ষ করা এ এক আলাদা রোমাঞ্চ, আলাদা অনুভূতি যার রেষ হৃদয়ের মনিকোঠায় থেকে যায় চিরকাল।। তাইতো আজও মানুষ বেরিয়ে পড়়ে প্রকৃতির কে গায়ে মেখে  রোমাঞ্চিত হওয়ার নেশায়। কেউ চায় বিদেশে ভ্রমণে, আবার কেউ চায় দেশের বিভিন্ন স্থান ভ্রমণে। এমনি এক ভ্রমণ এর জায়গা হলো  লে-লাদাখ্‌ ।

 

জন্মু ও কাশ্মীরকে আমরা ভারতের ভূস্বর্গ হিসাবে জানি । ভূস্বর্গ দর্শনের স্পৃহা অনেক দিনের । লে-লাদাখ্‌ ভ্রমণ ঐ স্পৃহারই  অন্যতম অঙ্গ ।
রাজ্যের একটি জেলা ছিল লে-লাদাখ্‌ ।  এখন লে-লাদাখ্‌ কেন্দ্রিয়শাসিত অঞ্চল । বর্গায়তনে হিসাব করলে লে-লাদাখ্‌ অনেক বড় । কিন্তু লোকসংখ্যার বসবাস খুব কম । সর্বসাকুল্যে আনুমানিক তিন-লক্ষ মানুষের বসবাস । স্থানীয় বাসিন্দা ছাড়া প্রচুর সামরিক ও আধা-সামরিক বাহিনী কর্মরত । এছাড়া রয়েছে দেশী ও বিদেশী ভ্রমণ-পিপাসু মানুষের অহরহ আনাগোনা ।
লে-লাদাখের মানুষ ভীষণ গরীব । তাঁদের উপায়ের জায়গাটাও খুব নড়বড়ে । বলা চলে সীমিত । লে-লাদাখের জনবসতির ত্রিশ শতাংশ মানুষ ক্ষেতি জমির উপর নির্ভরশীল ।  ক্ষেতি জমি বলতে যব, জোয়ার, বাজরা, গম, চাষ । পাহাড়ি কোল ঘেঁষা  জমিতে চাষের দৃশ্য সর্বত্র । ঋতু অনুযায়ী বিভিন্ন চাষবাস । চাষের দৃশ্য নিঃসন্দেহে হৃদয়কাড়া । পয়ত্রিশ শতাংশ মানুষ রুটিরোজগারের জন্য পশুপালনের উপর নির্ভরশীল । পশুপালন বলতে লোমে ভরা ছাগল, গরু, ভেড়া, ইত্যাদি । আর অবশিষ্ট পয়ত্রিশ শতাংশ পর্যটকদের উপর নির্ভরশীল ।
বছরের প্রায় অর্ধেক সময় লে-লাদাখ্‌ বরফে ঢাকা থাকে । মে মাসের শেষে বরফ গলতে শুরু করে এবং সেই সময় থেকে বরফ সরিয়ে যাতায়াতের রাস্তা তৈরী করা শুরু  হয় । টুরিষ্টদের তখন মূলত লে-লাদাখের বিভিন্ন স্থানে ভ্রণের সুযোগ ঘটে । নভেম্বরের প্রথম  সপ্তাহ পর্যন্ত লে-লাদাখ্‌ ভ্রমণ চালু থাকে  !
স্থানীয় বাসিন্দারা প্রায় ছ-মাসের মতো জ্বালানী, খাবার এবং অন্যান্য নিত্য আবশ্যকীয় সামগ্রী মজুত রাখে । কেননা বরফ পড়ার সময় কোনো যানবাহন জোটে না । চুপচাপ নিজেদের এলাকার মধ্যে কাটাতে হয় । যারজন্য লে-লাদাখ্‌বাসীদের আগেভাগেই প্রয়োজনীয় খাবার, জ্বালানী, কাপড়-চোপড় ইত্যাদির ব্যবস্থা করাটা প্রত্যেকের কাছে একরকম বাধ্যতামূলক । জ্বালানী বলতে কাঠের টুকরো, ঘুটে (গোবর থেকে তৈরী), ইত্যাদি ।
সবচেয়ে দুঃখজনক, পুরো লে-লাদাখ্‌ এলাকা বাদ দিলে কোথাও বিশ্ববিদ্যালয় চোখে পড়েনি । বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে হলে ছাত্র-ছাত্রীদের শ্রীনগর বা দেশের অন্যত্র শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে  যেতে হয় ।
দিল্লী থেকে খুব সকালের ফ্লাইটে লে । লে এয়ারপোর্ট খুব ছোট । পাশেই সামরিক ছাউনী । ফ্লাইট থেকে নামার সাথে সাথে ভীষণ দমকা হাওয়া ও কন্‌কনে ঠাণ্ডা । ফলে ঠাণ্ডা দমকা হাওয়া থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য আশ্রয় নিতে হয়েছিল এয়ারপোর্টে পাশের অফিস ঘরে । একটা কথা প্রথমেই বলে রাখি, লে-লাদাখের চারিদিকে পাহাড় । তবে পাহাড়ের একটিই বৈশিষ্ট্য, পাহাড় গুলিতে কোনো সবুজ ঘাস নেই । ন্যাড়া । আর দিনের বেশীর ভাগ সময় পাহাড়ের মাথায় সাদা বরফের আনাগোনা । যদিও ভোরবেলায় সাদা বরফের পরিমাণ বেশী ।
তারপর লে এয়ারপোর্ট থেকে হোটেল । হোটেলের নাম “গাওয়া লিঙ ইন্টারন্যাশনাল” । হোটেলে যাওয়ার পথে প্রচণ্ড ঠাণ্ডা হাওয়া । ফলে চারিদিকে কন্‌কনে শীতল ঠাণ্ডা । হোটেলে ঢুকেও ঠাণ্ডার হাত থেকে রেহাই নেই । সময়টা মে মাসের শেষদিক । নিজের রাজ্যের জেলায় প্রচণ্ড গরম । আর “লে”তে  সম্পূর্ণটাই উল্টো । হাড় হিম করা ঠাণ্ডা । বাইরে তাপমাত্রা মাইনাস ছয় । মাথার উপরে সূর্য আসার পর অল্প খানিকক্ষণের জন্য রৌদ্র । আকাশে রৌদ্র ওঠার পর লে’র অপরূপ প্রাকৃতিক দৃশ্য, মনকে খুশীর জোয়ারে ভরিয়ে দেয় ! তারপর দুপুরে মধ্যাহ্ন ভোজের পর “লে” মার্কেটে ঘরাঘুরি । উল্লেখ থাকে যে, ভ্রমণের উদ্দেশে পাহাড়ে ঘোরাঘুরির আগে একদিন বিশ্রাম নেওয়ার তাগিদে “লে”তে ঘুরে বেড়ানো । হোটেল থেকে হাঁটা পথে মার্কেট । তাই দুপুরে খাওয়ার পর “লে” মার্কেটে এবং আশপাশ অঞ্চলে ঘোরাঘুরি । সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে মানুষের আনাগোনা  কমে যায় । রাস্তাঘাট জনশূন্য হতে থাকে । হোটেলের পাশে কয়েকটি  ঝাউগাছ । ঝাউগাছ ভেদ করে দেখা যাচ্ছে ন্যাড়া পাহাড় ! পাহাড়ের মাথায় বরফ । রাত্রিতে দুটো লেপেও ঠাণ্ডা দমন করা কঠিন । এত ঠাণ্ডা,যাকে বলে হাড় কাঁপানো ঠাণ্ডা  !
পরেরদিন কারুতে  (Karu) এলাম । কাছেই মিলিটারি স্টেশন । সেখানকার জওয়ানরা ভীষণ উপকাস্রী । কারুর কাছে পাহাড় ঘেঁষে জলাশয় । সেখান দিয়ে জল ছুটে চলেছে নীচের দিকে । তারপর এলাম ভগবান বুদ্ধের মন্দির “”হেমিস গোম্পা (HEMIS  GOMPA) । এখানে অনেক বৌদ্ধরা থাকেন । ভগবান বুদ্ধের সেবায় তাঁরা ব্রত । এখানে উল্লেখযোগ্য, লে-লাদাখে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী মানুষের সংখ্যা বেশী । “হেমিস গোম্পা”  লে-লাদাখে অন্যতম বৌদ্ধ-মন্দির । অল্প বয়সের বৌদ্ধরা মন্দিরে শাস্ত্র পাঠে তৎপর । বৌদ্ধ-ভিক্ষুরা পর্যটকদের সাথে মেলামেশায় যথেষ্ট আন্তরিক ! টুরিষ্টদের সমস্তরকম সহযোগিতায় তাঁরা যত্নবান ।
এবার আসছি তাংসি  (Tangtse) গাঁওয়ের কথায় । চতুর্দিকে পাহাড় । মধ্যেখানে জলাশয় । চারিদিকে অনেক গাঁও । তার পাশেই ক্ষেতি জমি । জলাশয়ের ধার ঘেঁষা রাস্তা । ঐ রাস্তা দিয়েই পৌঁছালাম তাংসি’তে । তাংসিতে একটা মজার ব্যাপার, কোনো টুরিষ্ট  রাত্রিযাপন করতে চাইলে জলাশইয়ের পাশে “তাঁবু”  খাটানোতে থাকতে পারে । তাঁবুতে থাকাটা একটা আলাদা অনুভূতির অভিজ্ঞতা । প্রচুর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরা তাংসি অঞ্চল । অন্যদিকে ঠাণ্ডা ততোধিক ! ।
বরফ কেটে রাস্তা । আমাদের সঙ্গে স্করপিয়ো গাড়ি । স্থানীয় ড্রাইভার । খুব গম্ভীর । ড্রাইভারের মুখে হাসি অধরা । আসলে তার ধাতে “হাসি” নেই । কিন্তু গাড়ি চালানোতে প্রচণ্ড শৃঙ্খলাপরায়ন । কোনো কথায় তার মনোযোগ নেই কোনোকথার উত্তর নেই । তার একটাই স্থির লক্ষ্য, বরফের পাশ দিয়ে খুব ধীরগতিতে অথচ সন্তর্পণে গাড়ি চালিয়ে খরদুংলা (khardung La) পৌঁছানো ।  যতদুর চোখ যায় শুধু সাদা বরফ । কোথায় নদী-নালা, কোথায় গাছ-পালা কিছুই বোঝার উপায় নেই । বরফাচ্ছন্ন খরদুংলা । পৃথিবীর সর্বোচ্চ মোটরগাড়ির রোড  (Highest Motorable Road) । ১৮৩৮০ ফুট উচ্চতা । খরদুংলা পৌঁছানোর সাথে সাথে প্রচণ্ড শ্বাসকষ্ট । অত উঁচুতে শ্বাসকষ্টের সমস্যা । খরদুংলায় কোনো বসতি নেই । শুধুমাত্র ভারতীয় জওয়ানেরা কর্মরত । সেখানকার মিলিটারি ব্যারাকে কয়েকজন জওয়ান কর্তব্যরত । তাঁদের কাছে রয়েছে শ্বাস প্রশ্বাসের সমস্যার ক্ষেত্রে জরুরি গ্যাসের ব্যবস্থা । আমাদের সাথে একই লাইনে আরও কয়েকটা পর্যটকদের গাড়ি  খরদুংলা পৌঁছেছে । তাঁদের মধ্যে কয়েকজন পর্যটককে অক্সিজেন সাপোর্ট দেওয়ার জন্য গ্যাসের প্রয়োজন । মিলিটারিরা দেখলাম হন্তদন্ত হয়ে গ্যাসের সিলিণ্ডার নিয়ে সেইসব পর্যটকদের সেবা শুশ্রূষা করছেন । অন্যদিকে  আমি গাড়ি থেকে নেমে হাঁটাহাঁটি করার দরুন অনেকটা আরামবোধ করলাম । সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার, একজন পরম হিতাকাক্ষ্মী মিলিটারি জওয়ান আমার অবস্থাটা অনুধাবন করে এক কাপ লিকার চা এগিয়ে ধরে  বিনীত স্বরে বললেন, “স্যার, এক কাপ লিকার চা খান । স্বাভাবিক সুস্থ বোধ করবেন ।“ খোঁজ নিয়ে জানলাম, জওয়ানের ঘর নদীয়া জেলার তেহট্টে ।  মিলিটারি ভদ্রলোকের দেওয়া চা খেয়ে সত্যিই অনেকটা হাল্কা বোধ করলাম । তারপর সমস্ত মিলিটারিদের উদ্দেশে স্যালুট জানালাম । এরপর খরদুংলা নিয়ে লেখা ( যেমন কত  মিটার উঁচু, জেলার নাম,  ইত্যাদি) পোস্টারের সামনে দাঁড়িয়ে ফটো তুললাম । সেখানেই লেখা রয়েছে খরদুংলা হচ্ছে পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে উঁচু মোটর যানের রোড, ১৮৩৮০ ফুট উচ্চতা ।
এরপর স্করপিয়ো গাড়ি ছুটলো নুব্রা (Nubra)  ভ্যালির দিকে । নুব্রা ভ্যালিতে যখন আমরা পৌঁছালাম, তখন সূর্য ডুবে গেছে । এখানে উল্লেখ করা প্রনিধানযোগ্য যে, নুব্রা একটা তহসিল  (Tehsil) । সেখানেই দিকসিত (Diksit)  গ্রাম । গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে শায়ক (Shayok) নদী ।  দিকসিত গ্রামে সর্বসাকুল্যে এক হাজার মানুষের বসবাস এবং গোটা নুব্রা ভ্যালিতে বাইশ হাজার মানুষের বসবাস । নুব্রা ভ্যালিতে আরও একট জায়গা জনপ্রিয় গাঁও, তুরতুক । তুরতুকের কাছে টেগোর গ্রামে জামসখ্যাং নামে একট প্রাসাদ রয়েছে । তা ছাড়া নুব্রা ভ্যালি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর । তবে  এখানকার মানুষ খুব গরীব । নুব্রা ভ্যালিতে কৃষি ফসল বলতে গম আর বার্লি । নুব্রা ভ্যালির মানুষ মোমো খেতে ভালবাসেন । শিক্ষিত হওয়ার ক্ষেত্রে  কলেজ পর্যন্ত । নুব্রা ভ্যালিতে একমাত্র বালির দর্শন মেলে । চারিদিকে পাহাড় । মধ্যখানে মরুভূমি । মরুভূমি শুরু হওয়ার  মুখে জলের স্রোতে পা ভেজানোর মজাই আলাদা । মরুভূমির পাশেই শায়ক নদী । শায়ক নদী দিসকিত গ্রাম থেকে ১২ কিমি দূরে । ঐখানে “শায়ক” ও  “সিয়াচেন”  নদীর সংযোগস্থল । জায়গাটা আবার সিয়াচেন ও পাকিস্থানের কাছাকাছি । আগেই বলেছি নুব্রা ভ্যালির প্রাকৃতিক দৃশ্য মনোমুগ্ধকর । আবার অন্যদিকে রাত্রির দিকসিত ভারী সুন্দর । বিজলী বাতি রয়েছে । বিজলী বাতি থাকলে কীহবে, একটু বাদে বাদেই লোডশেডিং । বিদ্যুতের টালবাহানায় স্থানীয় মানুষ নাজেহাল । অধিকাংশ  মানুষ বৌদ্ধ ধর্মালম্বী । এলাকার সর্বত্র মিলিটারিদের আনাগোনা । নুব্রা ভ্যালীর মানুষজন খুব পরিশ্রমী । আবার ততোধিক তাঁদের সরল জীবনযাপন । পরিবারের স্বামী-স্ত্রী উভয়েই উপার্জনের প্রতি ভীষণভাবে যত্নশীল ।
তারপর………?
তারপর  প্যাংগং লেক (Pangong Tso) । প্যাংগং লেক হিমালয়ের একটি এন্ডোরহেইক লেক বা হ্রদ (endorheic lake) ।  পৃথিবী বিখ্যাত এই  প্যাংগং লেক ।  লাদাখ্‌ ও চীনের রুতোগ প্রদেশের সীমান্তে ৪৩৫০ মি (১৪২৭০ ফুট) উচ্চতায় প্যাংগং লেক অবস্থিত । এই হ্রদ ১৩৪ কিমি লম্বা যার মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশ তিব্বতে অবস্থিত । এই লেকের পূর্ব দিকটা তিব্বতের অন্তর্গত ও পশ্চিম দিকটি ভারতের । লেকে যাওয়ার উদ্দেশে কিছু শুকনো খাবার এবং যথেষ্ট পরিমাণে খাবারের জল সঙ্গে নিলাম । নুব্রার হোটেল থেকে বলেই দিয়েছিল, রাস্তাঘাটে খাবারের দোকান নেই বললেই চলে । তবে ইদানীং কোথাও কোথাও দোকান চালু হয়েছে । যাই হোক এবার আসছি লেকের জল সম্বন্ধে । লেকের দিকে আমরা ধাবিত হওয়ার সময় গম্ভীর ড্রাইভার বলল, “চুপচাপ বসে থাকুন ।  রাস্তা ভীষণ ঝুঁকিবহুল । যেকোনো সময় ধস নামতে পারে ।  গাড়ির জানালা বন্ধ রাখা বাঞ্ছনীয় । কেননা ধস নামলে পাহাড়ের পাথরগুলি জানালা ভেদ করে শরীরে আঘাত করতে পারে । সুতরাং লেকে যাওয়ার  সফর খুব ঝুঁকিবহুল । গাড়ি চলাকালীন কেউ বেশী নড়াচড়া করবেন না ।“
অবশেষে আমাদের লক্ষ্য অনুযায়ী ঠিক সময়ে পৌঁছালাম প্যাংগং লেক । অনেক দূর প্যাংগং লেক । নুব্রা থেকে খালসার হয়ে প্যাংগং লেকের দূরত্ব প্রায় ৮৫ কিমি । পৌঁছানোর পর আমাদের মধ্যে সীমাহীন আনন্দ । আনন্দোচ্ছ্বাসে মাতোয়ারা । প্রকৃতির অপূর্ব ভাণ্ডার ।  চারিদিকে পাহাড় । পাহাড়ে সবুজের লেশমাত্র নেই । উপরে রৌদ্রোজ্জ্বল  নীল আকাশ । ঝকঝকে নীল আকাশে খণ্ড খণ্ড,  টুকরো টুকরো সাদা মেঘ ।  নীচে লেক । লেকের জলও তেমনি । সমুদ্র-নীল জল ।  জলের রঙ একেক সময় বা একেক জায়গায় একেক রকম ! সারা লেকে আছে শুধু রঙের বৈচিত্র !  রঙিন জল দেখতে ভীষণ সুন্দর । লেকের জল দেখে প্রাণ জুড়ে যায় । শোনা যায়, অনেক সিনেমার স্যুটিং নাকি লেকের ধারে হয়েছে । তার মধ্যে থ্রি-ইডিয়েট অন্যতম । তাঁবুতে থাকার ব্যবস্থা অভিনব । রাত্রিতে আমাদের থাকার কোনো পরিকল্পনা না থাকায় আমরা ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে চিন্তাভাবনা শুরু করলাম ।  সন্ধ্যার আগে ফেরার তাগাদা । যদিও সন্ধ্যার সময় লেকের ভিউ অন্যরকম । তাঁবুতে যারা রাত্রিযাপন করবেন, তাঁদের পক্ষে লেকের রাত্রির শোভা দর্শন যথেষ্ট আনন্দের । কিন্তু আমাদের সন্ধ্যা নামার আগে লেক থেকে বিদায় নিতে হবে । সূর্য অস্ত যাওয়ার মনোরম দৃশ্য দেখে আমরা অভিভূত । তারপর মন না চাইলেও বিপদের সম্ভাবনাকে দূরে রাখার জন্য আমরা সূর্য অস্ত যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ফেরার উদ্দেশে রওনা দিলাম ।
ফেরবার পথে পৌঁছালাম চ্যাংলা Chang La)  । চ্যাংলার উচ্চতা ১৭৬৮৮ ফুট । পৃথিবীতে দ্বিতীয় মোটর যানের রোড হিসাবে চ্যাংলা’কে দাবি করা হয় । সেখানে একমাত্র কয়েকটি মিলিটারি ক্যাম্প ছাড়া মানুষজন, দোকানপাট  চোখে পড়ল না  ।  আছে শুধু পাগল করা মন-মাতানো সাদা বরফ । আর সর্বক্ষণ মনে হচ্ছে মাথার উপরের আকাশটা অনেক কাছে ।  সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ব্যাপার, সেটা হচ্ছে পর্যটকদের নির্বিঘ্নে ভ্রমণে মিলিটারিদের তৎপরতা !
এই প্রসঙ্গে আরও উল্লেখযোগ্য,  কারু (Karu) মিলিটারি জওয়ানদের ব্যবহার !  এক কথায়, অতি উত্তম । নিঃসন্দেহে অতুলনীয় । কারু শহরে পুরোটাই গরীব মানুষের এলাকা । কারু শহরে এছাড়া শান্তি স্তুপো বৌদ্ধ মন্দিরে ও থিক্সে  (Thiksay) মোনাস্টারিতে ভ্রমণ অবর্ণনীয় ।
ফিরে এলাম “লে” মার্কেটে । স্থানীয় মোমো খাবার ভীষণ জনপ্রিয় । যব, বাজরা, গম, ইত্যাদি দিয়ে স্থানীয় খাবার তৈরীর প্রক্রিয়াটা অন্যরকম । তাঁরা বাঙালীদের মতো ভেতো বাঙালী নয় । তাঁদের খুব সাদাসিধে জীবন । শিক্ষার হার খুব কম । স্বাস্থ্য ব্যবস্থা  তথৈবচ । পুরো “লে”-“লাদাখে” সরকারি স্তরের দৃষ্টিভঙ্গি আশু প্রয়োজন ।

সংক্ষেপে লে-লাদাখ্‌ এই  পর্যন্ত ।

 

কলমে : দিলীপ রায়
—————-০—————–

Share This
Categories
প্রবন্ধ

নচিকেতা চক্রবর্তী, এক আগুন পাখির নাম।

নচিকেতা চক্রবর্তী,  একজন ভারতীয় গায়ক, গীতিকার, সুরকার,  এবং প্লেব্যাক গায়ক যিনি তাঁর আধুনিক বাংলা গানের জন্য পরিচিত।  তিনি ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন, তার প্রথম অ্যালবাম Ei Besh Bhalo Achi-এর প্রকাশের মাধ্যমে। যুবসমাজে যা আলোড়ন ফেলেছিল। প্রতিটি তরুণ তরুণীর মুখে তখন নচিকেতার গান। এক অন্য সাদের কথা ও সুর নিয়ে গোটা সমাজে সঙ্গীতের জগতে আলোড়ন ফেলে দিয়েছিলেন তিনি। গান বলি কেন, জেনো আগুনের গোলা। যেমন কথা, যেমন সুর, তেমন গায়কি। নচিকেতা তখন যেনো স্বপনের ফেরিওয়ালা।

 

১৯৬৪ সালের ১ সেপ্টেম্বর কলকাতার মুক্তারাম বাবু স্ট্রিটের বাড়িতে তাঁর জন্ম হয়। তাঁর পৈতৃক নিবাস ছিল বাংলাদেশের বড়িশালের ঝালকাঠি জেলার কাঠালিয়া উপজেলার চেচরীরামপুর গ্রামে। তাঁর পিতা ছিলেন সখা রঞ্জন চক্রবর্তী।  তার পৈতৃক শিকড় বাংলাদেশের ঝালকাঠি জেলার কাঠালিয়া উপজেলার চেচরি রামপুর গ্রামে।  তাঁর দাদা ললিত মোহন চক্রবর্তী ১৯৪৬ সালের আগে ভারতে এসেছিলেন।

 

তিনি উত্তর কলকাতার মণীন্দ্র কলেজে পড়াশোনা করেন। বিএ পাশ করেই পড়াশোনা ছেড়ে দিতে হয়। কারণ হঠাৎই বাবা মারা যান। তাই সংসারের হাল ধরতে জীবিকা হিসেবে বেছে নিলেন গান কে।

ছোটো থেকেই গান লিখতেন, গানের চর্চা করেছেন। তিনি অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন মহাভারতের কৃষ্ণ চরিত্রের দ্বারা  । এছাড়াও জ্যাক লন্ডন এর লেখা পড়ে অনুপ্রাণিত হয়েছেন।  উত্তর কলকাতার শ্যামবাজারের মহারাজা মণীন্দ্র চন্দ্র কলেজের ছাত্র হিসেবে তিনি গান রচনা এবং লাইভ পরিবেশন শুরু করেছিলেন।  ১৯৯৩ সালে তার প্রথম অ্যালবাম এই আশা ভাল আছি মুক্তি পায়;  এটি একটি তাত্ক্ষণিক আঘাত ছিল.  প্রাথমিকভাবে তার একটি বিশাল যুব ভক্ত অনুগামী ছিল;  কিন্তু ধীরে ধীরে, তিনি সমস্ত বয়সের শ্রোতাদের আকর্ষণ করেছিলেন।  তাঁর কথোপকথন ভাষা অবিলম্বে ৯০ এর দশকের গোড়ার দিকে বাংলা সঙ্গীতের স্থবিরতাকে আঘাত করে।  কবির সুমন (তখন সুমন চট্টোপাধ্যায়) এর পথ অনুসরণ করে, নচিকেতা বাংলা গানের বহু পুরনো ধারণা বদলে দিয়েছিলেন।  আজ, তিনি কলকাতার একজন প্রখ্যাত গায়ক-গীতিকার এবং সুরকার। তাঁর সুপার ডুপার হিট গান গুলো এখনো সমানভাবে জনপ্রিয়। যার মধ্যে রয়েছে, ‘ বৃদ্ধাশ্রম ‘, ‘একদিন ঝড় থেমে যাবে’,  যখন আমার ক্লান্ত চরণ’, যখন সময় থমকে দাঁড়ায়’, উল্টো রাজার দেশে,সে প্রথম প্রেম আমার নীলাঞ্জনা’, সে প্রথম প্রেম আমার নীলাঞ্জনা’ ইত্যাদি।

নীলাঞ্জনা সিরিজ আর রাজর্ষি তাঁকে জনপ্রিয়তার শিখরে পৌঁছে দেয়।

 

নচিকেতার একক অ্যালবাম গুলি হলো–

এই বেশ ভালো আছি (১৯৯৩), কি হবে? (১৯৯৫), চল যাবো তকে নিয়ে (১৯৯৬), কুয়াশা যখন (১৯৯৭), আমি পারি (১৯৯৮), দলছুট (১৯৯৯), দায়ভার (২০০০), একলা চলতে হয় (২০০২), এই আগুনে হাত রাখো (২০০৪), আমার কথা আমার গান (২০০৫), এবার নীলাঞ্জন (২০০৮), হাওয়া বদল (২০১০), সব কথা বলতে নেই (২০১২), দৃষ্টিকোণ (২০১৪), আয় ডেকে যায় (২০১৫)।

 

তাঁর যৌথ অ্যালবামে এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য- দুয়ে দুয়ে চার (১৯৯৬), ছোটো বড় মিলে (১৯৯৬), স্বপ্নের ফেরিওয়ালা (১৯৯৯)।

 

লেখক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় ও নৃসিংহ প্রসাদ ভাদুড়ির দ্বারাও অনুপ্রাণিত হন। তিনি লিখেছেন গল্প । তিনি দুটি উপন্যাস রচনা করেছেন ‘জন্মদিন রাত’ ও ‘ক্যাকটাস’। শুধু উপন্যাস নয়, তিনি লিখেছেন গল্প শর্টকাট, পণ্ডশ্রম, আগুনপাখির আকাশ, সাপলুডো ইত্যাদি।

 

পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘কুয়াশা যখন ‘(১৯৯৭),  ‘এই বেশ ভালো আছি’ (১৯৯৩) ইত্যাদি।

 

তিনি বিভিন্ন চলচ্চিত্রে গান গেয়েছেন। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘ হঠাৎ বৃষ্টি’ (১৯৯৮), সমুদ্র সাক্ষী (২০০৪), কাটাকুটি( ২০১২)।

 

তিনি বঙ্গভূষণ, সঙ্গীতভূষণ সম্মানে সম্মানিত হয়েছেন। এছাড়াও পেয়েছেন আরো পুরষ্কার।  ‘হঠাৎ বৃষ্টি’ তে গান করার জন্য ১৯৯৯ এ পান আনন্দলোক পুরস্কার। এছাড়া হাওড়ার আমতায় একটি অডিটোরিয়াম রয়েছে, যার নাম নচিকেতা মঞ্চ। দর্শকরা তাঁকে এতটাই ভালোবাসেন যে তাঁর নামে এই মঞ্চ করেছেন। এই মঞ্চ টি তৈরি ৮০০ টি সিটের।

।।তথ্য : সংগৃহীত উইকিপিডিয়া ও বিভিন্ন ওয়েবসাইট।।

Share This
Categories
প্রবন্ধ রিভিউ

মূল্যবান মনুষ্য জীবন ও আমাদের সুন্দর সমাজ : স্বামী আত্মভোলানন্দ।

ওঁ নমঃ শ্রী ভগবতে প্রণবায় ….।

***আমাদের ভারতীয় সত্য সনাতন হিন্দু ধর্মের মধ্যে যখন কোন মানুষকে ঐশ্বর্য, বীর্য, যশ, শ্রী, জ্ঞান ও বৈরাগ্য এই ছয়টি গুনের অধীশ্বর রূপে  আরাধনা করা হয়  তখন তাকে ভগবান বলা হয়। যেমন ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘের প্রতিষ্ঠাতা স্বামী প্রণবানন্দ। আমাদের ভারতীয় সত্য সনাতন  হিন্দু ধর্ম হল সেই বিজ্ঞান যেটা বহু বছর ধরে সাধু, সন্ন্যাসী, জ্ঞানী, মহাত্মাদের সঠিক মার্গ দর্শনে আমাদের দেশে ক্রমশ বেড়ে উঠেছে। তাই হিন্দুধর্ম হল একটা বিজ্ঞান সম্মত ধর্ম যার নাম সনাতন ধর্ম , শাশ্বত চিরন্তন ধর্ম। তাই, আমাদের হিন্দু ধর্মের কোন প্রবর্তক নেই।  আমাদের সত্য সনাতন  হিন্দু ধর্মে সামাজিক জীবনে ধর্মীয় প্রভাব অপরিসীম।আমাদের সমাজে আমরা মহিলা,পুরুষ,শিশু,বৃদ্ধ, উচ্চ,নিচ, ধনী,দরিদ্র সকল, পেশার মানুষ  জাতি, ধর্ম,বর্ণ নির্বিশেষে আবহমান কাল ধরে  সামাজিক বন্ধনে আবদ্ধ
হয়ে বসবাস করে আসছি। আমাদের এই সত্য সনাতন হিন্দু ধর্ম হল যার ভিত্তি।এই সত্য সনাতন হিন্দু ধর্ম হল অনন্ত,অসীম,সীমাহীন,অন্যগুলো অনেকপরে এবং এক একজন বিশেষ ব্যক্তির / প্রবর্তক এর সৃষ্টি।

আমাদের সমাজে বর্ণাশ্রম প্রথা হল বৈদিকযুগের শ্রমবিভাগ।(Division of labour)
স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণ শ্রীমদ্ভগবতগীতায় বলেছেন
চার্তুবর্নাং ময়া সৃষ্টং গুনকর্মবিভাগশঃ……..
অর্থাৎ:- গুন ও কর্মের ভিত্তিতে আমি চার বর্নের সৃষ্টি করেছি।স্বভাবজাত গুন অনুসারে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ‍্য, শূদ্র  এর কাজকর্ম পৃথক করা হয়েছে । অর্থাৎ সমাজে সবলোকের স্বভাবজাত প্রবনতা,দক্ষতা এক নয় তাদের স্বভাবজাত প্রবনতা এবং  দক্ষতা ভিন্নধর্মী, এর ফলেই শ্রমবিভাজন বা বর্ণাশ্রম। যিনি জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চায় প্রবল ও সাত্বিকী শ্রদ্ধা বিদ‍্যমান তিনিই ব্রাহ্মণ।পরাক্রম, তেজ, ধৈর্য্য, কলাকুশলতা, যুদ্ধে পরান্মুখতা ইত্যাদি গুন যার মধ‍্যে আছে এবং যিনি দানে আগ্রহী এবং নেতৃত্বদানের ক্ষমতা সম্পন্ন তিনিই ক্ষত্রিয়। কৃষি গোপালন, ব‍্যাবসা বানিজ‍্যে যার মন তিনিই বৈশ‍্য এবং যার নিজশ্ব প্রচেষ্টা উদ্দ‍্যম নেই পরের সেবা বা কাজ  দ্বারা জীবিকা নির্বাহ করতে হয় তিনিই শূদ্র।

আমাদের সমাজে এবং পৃথিবীর সবদেশেই অজ্ঞাতসারে বা অলিখিত ভাবে বর্নাশ্রম প্রথা বিদ‍্যমান। ব্রাহ্মণ গুনসম্পন্ন ব‍্যাক্তিরা গবেষণা শিক্ষকতা/অধ‍্যাপনায় নিযুক্ত। ক্ষত্রিয় গুনসম্পন্ন ব‍্যাক্তিরা সামরিক বা পুলিশ ও আধিকারিক পেশায় নিযুক্ত হচ্ছেন। বৈশ‍্য গুনসম্পন্ন ব‍্যাক্তিরা ব‍্যাবসা বানিজ‍্যে নিযুক্ত হচ্ছেন। এবং  শূদ্র গুনসম্পন্ন ব‍্যাক্তিরা সেবামূলক বা শ্রমশীল কাজে নিযুক্ত হচ্ছেন। বর্নাশ্রম প্রথা শুধুমাত্র হিন্দু শাস্ত্রাদি দ্বারাই নির্দিষ্ট, কিন্তু জাতি বা অশ্পৃশতা হিন্দু শাস্ত্রে অনুপস্থিত। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ  শ্রীমদ্ভগবতগীতায় বলেছেন কর্মের ভিত্তিতে আমি চার বর্নের সৃষ্টি করেছি । বর্তমানে ও আমাদের সমাজে  যোগ্যতা, দক্ষতা, কর্ম কুশলতা, কর্ম নৈপুণ্যতার ভিত্তিতে সামাজিক ভারসাম্য  আছে, জাতির ভিত্তিতে নয়l

মানুষ আমরা সামাজিক জীব। আমাদের সত্য সনাতন হিন্দু ধর্মে সামাজিক জীবনে পরিবারের সাথে ধৈর্য্য ধরা হল ভালবাসা, অন্যের সাথে ধৈর্য্য ধরা হল সম্মান।নিজের সাথে ধৈর্য্য ধরা হলো আত্মবিশ্বাস আর ভগবান সাথে ধৈর্য ধরা হলো বিশ্বাস। আমাদের সমাজে কখনো কোন মানুষ কিন্তু একা থাকে না, তার সাথে জড়িয়ে থাকে তার প্রতি একান্ত নির্ভরশীল মানুষ গুলো ও। তাই যদি আপনি কারো ক্ষতি করার চিন্তা করেন, তার সাথে যারা জড়িত এবং তার প্রতি যারা একান্ত নির্ভরশীল আপনি তাদেরও ক্ষতি  করছেন। তাই, কখনো কারো জীবনের ব্যাথার কারন হবেন না।যদি পারেন তাকে উৎসাহিত করেন। নিজের স্বার্থ রক্ষার্থে  কখনো অন্যকে ব্যবহার করবেন না।কারো স্বপ্নকে ভাঙ্গবেন না,যদি পারেন কারো জীবনের অনুপ্রেরনা হবেন কখনো নিরাশার আঁধার হয়ে আসবেন না। তাই কাউকে দেবার মতন যদি আপনার কিছু না থাকে তবে অবশ্যই নিজের ভালো ব্যবহার উপহার দিন।

কারন,আমাদের হিন্দু ধর্মে সামাজিক জীবনে পাপ এর বোঝা আপনার জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত বয়ে বেড়াতে হবে। মানুষের মুখের কথার মাঝে এমন শক্তি আছে, যে মুখের কথায়  কোন মানুষ জীবন ফিরে পায়। আবার সেই মুখের এই কথার কারনেই  কোন মানুষ মৃত্যুর দ্বার অব্দি পৌঁছায়। তাই কথা বলার সময় অবশ্যই বুঝে বলবেন। জীবনে কিছু ভালো কাজ না করতে পারলেও কোনও দরিদ্র মানুষকে একবারের জন্যও কিছু সহায়তা করুন, কোনও তৃষ্ণার্তকে এক গ্লাস জল প্রদান করুন,  কোনও ক্ষুধার্তকে একটু ফল প্রদান করুন, হয়তো কখনও  হঠাৎ অসুস্থ হওয়া কারো একটু সেবা করতে পারেন, হয়তো বর্ষায় ভিজে যাওয়া  কারো মাথায় একটু ছাতা ধরতে পারেন,এমনভাবে কিছু কিছু সহায়তা করুন
আমাদের চারপাশের মানুষকে। সর্বদা মনে রাখবেন, আমাদের চারপাশে যা যায় তাই ফিরে আসে আমাদের জীবনে।

তাই, সামাজিক জীবনে দয়ালু হন, ন্যায্য হন, সৎ হন, এবং তবেই এই সমস্ত জিনিস আপনার জীবনে আপনার কাছে ফিরে আসবে। আমাদের সমাজে জীবনে খারাপ সময় আসলেই পুরো পৃৃথিবীকে চেনা যায়। বন্ধু- বান্ধুব, আপন মানুষ, প্রিয় মানুষ সবার আসল রুপটা বেড়িয়ে আসে। দেখা যায় কে আমাদের জন্য কতটুকু  করতে পারে, আর কে আমাদের জন্য কি করে। যাদের বিপদে আপদে আপনি সবসময় পাশে ছিলেন দেখবেন আপনার খারাপ সময়ে বেশিরভাগ সময়ই আপনি তাদেরকে পাশে পাবেন না। কেউ ব্যস্ততা দেখাবে, কেউ বিভিন্ন সমস্যা দেখাবে, কেউ যোগাযোগ রাখাই বন্ধ করে দিবে। তখন নিজের উপর খুব রাগ হবে, নিজেকে খুব অসহায় মনে হবে।আবার খারাপ সময়ে এমন কিছু মানুষকে খুঁজে পাই যারা আমাদের আপন না হয়েও আমাদের আপন মানুষ গুলোর চেয়ে ও অনেক বেশি কিছু করে।জীবনে খারাপ সময় আর খারাপ মুহূর্তগুলো আমাদেরকে দিয়ে যায় মানুষ চেনার সবচাইতে বড় শিক্ষা। যে শিক্ষা জীবনে খারাপ সময় না আসলে আমরা হয়ত কোনদিনও অর্জন করতে পারতাম না। সত্যিকারের বন্ধু বা সত্যিকারের আপন মানুষ খুঁজে পাওয়ার জন্য  আমাদের জীবনে খারাপ সময় আসাটা খুব দরকার।

সামাজিক জীবনে আমাদের অনেক সময় অহঙ্কারে গর্বে আমাদের অনেকের মানসিকতা একেবারে হীন হয়ে পড়ে ! ধরা কে সরা জ্ঞান করি আমরা ! আমাদের নিজেদের স্থায়িত্ব ই বা কতটুকু আমরা কি কিছু জানি ! অন্যকে সন্মান দিন সন্মান পাবেন ! সংসার ভরে উঠবে সুখে শান্তিতে আনন্দে  ! এই বিশ্ব সংসারে আমি কি ? আমি কে ? আমার উদ্ভব কোথা থেকে? আর আমার বিনাশই বা কোথায় কি ভাবে? আমরা কি কেউ জানি ?
তাই, আমাদের সামাজিক জীবনে আমরা যদি অত্যধিক চাওয়া পাওয়ার বাসনা থেকে নিজেকে  দুরে রাখতে
পারি, মনে রাখবেন তাহলে তিনি সমাজে আসল সুখের জগতে প্রবেশর পথ খুঁজে পেলেন। তাই, সদ গুরুদেব এর কাছে, ভগবান এর কাছে সকলের মঙ্গল কামনা করি আমাদের সকলের শুভ বুদ্ধির উদয় হোক এই প্রার্থনা করি ! জগৎগুরু ভগবান স্বামী প্রণবানন্দজী মহারাজের শুভ ও মঙ্গলময় আশির্বাদ সকলের শিরে বর্ষিত হোক! এই প্রার্থনা করি…***
ওঁ গুরু কৃপা হি কেবলম্ ….!
স্বামী আত্মভোলানন্দ

Share This
Categories
প্রবন্ধ

বাংলা চলচ্চিত্র জগতে পরিচালক ঋতুপর্ণ ঘোষ(Rituparno Ghosh) একজন স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব।

ঋতুপর্ণ ঘোষ ১৯৬৩ সালের ৩১ আগস্ট কলকাতায় একটি বাঙালি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।  তার বাবা সুনীল ঘোষ ছিলেন একজন তথ্যচিত্র নির্মাতা এবং চিত্রকর।  তিনি সাউথ পয়েন্ট স্কুলে স্কুলের পড়াশোনা শেষ করেন এবং কলকাতার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে ডিগ্রি অর্জন করেন।  একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিও লাভ করেন।  তিনি ভারতীয় সিনেমায় প্রকাশ্যে এলজিবিটি ব্যক্তিদের মধ্যে একজন ছিলেন এবং ভারতের কুইয়ার সম্প্রদায়ের আইকন হিসেবে বিবেচিত হন।

 

ঋতুপর্ণ ঘোষ ছিলেন একজন ভারতীয় চলচ্চিত্র পরিচালক, অভিনেতা, লেখক এবং গীতিকার।  অর্থনীতিতে ডিগ্রী অর্জনের পর, তিনি একটি বিজ্ঞাপন সংস্থায় সৃজনশীল শিল্পী হিসাবে তার কর্মজীবন শুরু করেন।  তিনি তার দ্বিতীয় ফিচার ফিল্ম ইউনিশে এপ্রিলের জন্য স্বীকৃতি পেয়েছিলেন যেটি সেরা ফিচার ফিল্মের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার জিতেছিল।  তাঁর সমসাময়িক অপর্ণা সেন এবং গৌতম ঘোষের সাথে ১৯টি জাতীয় পুরস্কার জিতে, ঋতুপর্ণ সমসাময়িক বাংলা সিনেমাকে আরও উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছেন।  ঘোষ   ৩০ ​​মে ২০১৩ কলকাতায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।  ঘোষ ভারতীয় সিনেমায় প্রকাশ্যে সমকামী ব্যক্তিত্বদের একজন ছিলেন।  ঘোষ সত্যজিৎ রায়ের রচনা দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একজন আগ্রহী পাঠক ছিলেন।  ঠাকুরের কাজ প্রায়শই তার চলচ্চিত্রে উল্লেখ করা হয়।  তিনি ঠাকুরের জীবনের উপর জীবনস্মৃতি নামে একটি তথ্যচিত্রও তৈরি করেন।  প্রায় দুই দশকের কর্মজীবনে তিনি ১২টি জাতীয় এবং অসংখ্য আন্তর্জাতিক পুরস্কার জিতেছেন।  তাঁর অপ্রকাশিত বাংলা চলচ্চিত্র সানগ্লাস (তাক ঝাঁক নামেও পরিচিত) ১৯তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে সম্মানিত এবং মুক্তি পায়।  তার চলচ্চিত্র নির্মাণ অপর্ণা সেন, তপন সিনহা, সত্যজিৎ রায়, সঞ্জয় লীলা বনসালি দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল।

 

১৯৯৪ থেকে ২০১৩, মাত্র ১৯ বছর। এর মধ্যেই ঋতুপর্ণ ঘোষের মেধা এবং প্রতিভার ফসল মোট ১৯টি ছবি। প্রত্যেকটি ছবিই সতন্ত্র,অনবদ্য। ১৯টি ছবির মধ্যে ১২টি জাতীয় পুরষ্কার জয় করেছিল। সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন, ঋত্বিক ঘটক পরবর্তী বাংলা সিনেমার নতুন এক ধারা তৈরি করেছিলেন ঋতুপর্ণ। ‘হীরের আংটি”-র হাত ধরে পথ চলা শুরু। শেষ হয়ে গেল ”চিত্রাঙ্গদায়”-য় এসে।তিনি মারা যাওয়ার ঠিক আগে, তিনি বাঙালি গোয়েন্দা ব্যোমকেশ বক্সীর উপর ভিত্তি করে তার শেষ চলচ্চিত্র সত্যান্বেষীর নির্মাণ কাজ শেষ করেছিলেন।

 

অভিনেতা ঋতুপর্ণ—

 

২০১১- আর একটি প্রেমের গল্প

২০১১- মেমরিস ইন মার্চ

২০১২- চিত্রাঙ্গদা

 

পরিচালক ঋতুপর্ণ—

 

১৯৯৪- হীরের আংটি, উনিশে এপ্রিল (জাতীয় পুরস্কার শ্রেষ্ঠ পরিচালক, জাতীয় পুরস্কার শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী- দেবশ্রী রায়), ১৯৯৭- দহন (জাতীয় পুরস্কার শ্রেষ্ঠ স্ক্রিন প্লে, জাতীয় পুরস্কার শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী- ইন্দ্রাণী হালদার, ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত), ১৯৯৯- বাড়িওয়ালি (জাতীয় পুরস্কার শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী-কিরণ খের, শ্রেষ্ঠ সহঅভিনেত্রী- সুদীপ্তা চক্রবর্তী),  অসুখ (জাতীয় পুরস্কার – বাংলা ভাষায় শ্রেষ্ঠ সিনেমা), ২০০০- উৎসব (শ্রেষ্ঠ পরিচালকের জাতীয় পুরস্কার), ২০০২- তিতলি, ২০০৩- শুভ মহরত (জাতীয় পুরস্কার – বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠ সিনেমা, শ্রেষ্ঠ সহঅভিনেত্রী- রাখী), চোখের বালি (জাতীয় পুরস্কার – শ্রেষ্ঠ বাংলা সিনেমা), ২০০৪- রেনকোট (হিন্দি ভাষায় শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রের জাতীয় পুরস্কার), ২০০৫- অন্তরমহল, ২০০৬- দোসর (জাতীয় পুরস্কার, বিশেষ জুরি পুরস্কার – প্রসেনজিৎ চক্রবর্তী), ২০০৭- দ্য লাস্ট লিয়র (ইংরেজি ভাষায় শ্রেষ্ঠ ছবির জাতীয় পুরস্কার), ২০০৮- খেলা, সব চরিত্র কাল্পনিক (জাতীয় পুরস্কার শ্রেষ্ঠ বাংলা সিনেমা), ২০১০- আবহমান (জাতীয় পুরস্কার শ্রেষ্ঠ পরিচালক, বাংলা ভাষায় শ্রেষ্ঠ ছবির জাতীয় পুরস্কার, শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর জাতীয় পুরস্কার), নৌকাডুবি, ২০১২- সানগ্লাস, চিত্রাঙ্গদা (বিশেষ জুরি পুরস্কার, অভিনেতা ঋতুপর্ণ ঘোষ), জীবনস্মৃতি (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আত্মজীবনী অবলম্বনে নির্মিত তথ্যচিত্র)।

 

ঋতুপর্ণ ঘোষ ৩০ ​​মে ২০১৩ তারিখে তার কলকাতার বাসভবনে মারা যান, হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে।  তার পরিচারক দিলীপ এবং বিষ্ণু তাকে বিছানায় অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন।  মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিলো ৪৯ বছর।

।।তথ্য : সংগৃহীত উইকিপিডিয়া।।

Share This
Categories
প্রবন্ধ রিভিউ

ইতিহাস গর্ভে ফিরে দেখা! : তন্ময় সিংহ রায়।।।

”ভাইয়ের কপালে দিলাম ফোঁটা, যমের দুয়ারে পড়ল কাঁটা।
যমুনা দেয় যমকে ফোঁটা, আমি দিই আমার ভাইকে ফোঁটা!”

 

এই রাখি’র বন্ধনে কিভাবে মানুষ বাঁধা পড়ল? পুরাণ থেকে ইতিহাস গর্ভে এ নিয়ে
রয়ে গেছে বেশ কিছু রহস্যময় ও উল্লেখযোগ্য ঘটনাসমূহ!
এবারে উঁকি মারা যাক পৌরাণিক সেই কাহিনীগুলি’র দরজায়!
প্রথমত, হিন্দু ধর্মের মহাকাব্যদ্বয়ের মধ্যে মহাভারতে লুকিয়ে থাকা রাখি বন্ধনের যে ঘটনা আমরা দেখতে পাই তা হল,
কথিত আছে রাজসূয় যজ্ঞের সময় শিশুপালকে হত্যার পরে স্বয়ং শ্রী-কৃষ্ণের একটি আঙুল কেটে ঝরতে থাকে রক্ত!
এমতবস্থায়, পঞ্চপান্ডবের স্ত্রী দ্রৌপদী
তখন তাঁর শাড়ির আঁচল খানিকটা ছিঁড়ে কৃষ্ণের আঙুলে বেঁধে দেন ও অভিভূত কৃষ্ণ তাঁর অনাত্মীয়া, কিন্তু বোন হিসাবে মেনে নেওয়া দ্রৌপদীকে পরিবর্তে
প্রতিশ্রুতি দেন যে, ভবিষ্যতে সর্বরকম বিপদে তিনি রক্ষা করবেন তাঁকে।
এই ঘটনার বহু বছর পর, পাশাখেলায় হারের মাধ্যমে কৌরবরা যখন দ্রৌপদীকে অপমান করে তাঁর বস্ত্রহরণ করতে উদ্যত হন, সে মুহুর্তে  কৃষ্ণ অসমাপ্ত বস্ত্র সরবরাহের দ্বারা দ্রৌপদীর সম্মান রক্ষা করে বজায় রাখেন সেই প্রতিদান।

দ্বিতীয়ত, যমুনা তাঁর ভাই স্বয়ং যমের হাতে  বেঁধে দিয়েছিলেন রাখি।

তৃতিয়ত, শুভ ও লাভ নামে গণেশের পুত্রদ্বয়
এক সময় বায়না ধরে যে, নিজেদের বোনের হাতে তারা পরাতে চায় রাখি!
এ পরিস্থিতিতে উপায়ান্তর না দেখে গণেশ তাঁর দুই স্ত্রী ঋদ্ধি ও সিদ্ধি’র অন্তর থেকে নির্গত অগ্নি থেকে সৃষ্টি করেন বোনরূপি সন্তোষী মা-কে, যিনি সন্তোষের অধিষ্ঠাত্রী দেবী নামে অভিহিত হিন্দুধর্মের একজন অ-শাস্ত্রীয় ও লৌকিক নবীন দেবী।

এবারে আলোকপাত করা যাক কিংবদন্তী’র ইতিহাস কি বলছে সে বিষয়ে,
প্রথমত, শত্রুর হাত থেকে নিজের রাজ্যের মান-মর্যাদা রক্ষা করার একান্ত উদ্দ্যেশ্যে,
মুঘল সম্রাট বাবর পুত্র সম্রাট হুমায়ুনের কাছে একবার সাহায্যপ্রার্থী হন চিতোরের বিধবা রানি কর্ণবতী এবং সেই সময়ে তিনি একটি রাখিও পাঠান হুমায়ুনকে। এ বিষয়কে কেন্দ্র করেই পরবর্তীতে এই ঘটনা পরিনত হয় উৎসবে এবং এর জনপ্রিয়তা হতে থাকে ক্রমবর্ধমান!

দ্বিতীয়ত, গ্রীক বীর আলেকজান্ডারের ভারত আক্রমণ ভারতের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় বিশেষত এই কারণে বলে আমার মনে হয় যে, এর ফলে গ্রিকদের সভ্যতা, সংস্কৃতি ও চিন্তাধারার সাথে পরিচিত হয়ে ওঠার একটি সুযোগ আমরা পাই।
যাইহোক, বর্তমান ভারত এবং পাকিস্তানের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হওয়া ঝিলাম নদী (ঋগ্বেদে বিতস্তা নদী) সংলগ্ন উপকূলে গ্রিকদের বশ্যতা স্বীকার না করা ঝিলাম রাজ পুরুর সাথে ৩২৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দে আলেকজান্ডারের তুমুল যুদ্ধের ফলে সেই যুদ্ধে পরাজিত হয়েছিলেন পুরু।
কিন্তু ইতিহাস বলছে, তাঁর স্বামীর প্রাণ সংশয় হতে পারে, এই আশঙ্কা করে আলেকজান্ডারের স্ত্রী রোক্সানা পুরুর কাছে যান এবং তাঁর হাতে বেঁধে দেন একটি পবিত্র সুতো ও পরিবর্তে পুরু
আলেকজান্ডারের কোনও ক্ষতি করবেন না বলে কথাও দেন।

এদিকে আধুনিক ইতিহাসে চোখ রাখলে আমরা দেখতে পাই,
১৯ শতকে বাংলায় জাতীয়তাবাদী আন্দোলন চরম পর্যায়ে থাকাটা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের কাছে হয়ে উঠেছিল অপরিমিত ভয়ের একটি বিশেষ কারণ, আর যে কোনো উপায়ে এই  আন্দোলনকে দমন করার বিভিন্ন পথ খুঁজতে গিয়েই ব্রিটিশ সরকার সিদ্ধান্ত নেয়, তারা বাংলাকে দুই ভাগে ভাগ করে ঐক্য শক্তিকে হ্রাস করবে। এ হেন জটিল ও মর্মান্তিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে রবীন্দ্রনাথ সহ গোটা ভারতের বিভিন্ন বিশিষ্টজন ও নেতৃবৃন্দ এই সিদ্ধান্তের তীব্র নিন্দা ও সমালোচনা করেছিলেন এবং শুরু করেছিলেন বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে এক সংঘবদ্ধ প্রতিবাদী আন্দোলন!
অতএব ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ প্রতিরোধের উদ্দ্যেশ্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কোলকাতা, সিলেট
ও ঢাকা ইত্যাদি থেকে হাজার হাজার হিন্দু ও মুসলিম ভাই-বোনকে আহ্বান করেছিলেন ঐক্যতার প্রতীক হিসাবে রাখি বন্ধন উৎসব পালন করার জন্যে!
বলাবাহুল্য সে সময় দেশে ধর্মীয় অসহিষ্ণুতাও যেন পৌঁছেছিল একেবারে চরম পর্যায়ে!
বলার আর কোনো অপেক্ষা রাখে না যে,
ধর্মীয় অরাজকতা সে সময়েও ছিল, আজও বজায় আছে তা বহাল তবিয়তে!

ক্রমবিবর্তনের মধ্যে দিয়ে একবিংশের ঠিক যে জায়গায় এসে পৌঁছেছে এই উৎসব তা এরূপ,
শ্রাবণ মাসের পূর্ণিমা তিথিতে হিন্দু ভাই-বোনদের মধ্যে অত্যন্ত নিষ্ঠাভরে পালন করা হয় এই রাখী বন্ধন নামক উৎসবটি!
উৎসবের ধরণ হিসাবে উল্লেখ্য, সেই বিশেষ দিনে দিদি বা বোনেরা তাঁদের ভাই বা দাদা’র আ-জীবন মঙ্গল কামনা’র উদ্দ্যেশ্যে হাতের কব্জিতে বেঁধে দেয় রাখী নামক একটি পবিত্র সুতোর বন্ধন! পরিবর্তে ভাই বোনকে দেয় কিছু উপহার ও শপথগ্রহণ করে বা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয় সারাজীবন বোনকে রক্ষা করায়!
এখানে একটি বিষয় জানানো ভালো, সেই ভাই-বোন যে একই মায়ের গর্ভের হতে হবে এমন কোনো কথা নেই।
হিন্দু ছাড়াও জৈন ও শিখ প্রভৃতিরা পালন করে থাকেন এই উৎসব!
সর্বশেষ এই যুক্তি পরিলক্ষিত যে, রাখিকে ভাই-বোনের উত্‍সব হিসাবে মনে করা হলেও ইতিহাসে কিন্তু, পুরুষকে সব বিপদ থেকে রক্ষা করার শুভ প্রতীক হিসাবে তাঁদের কব্জিতে মহিলাদের সুতো বেঁধে দেওয়ার একটি যোগসূত্র থেকেই যাচ্ছে।
আর হয়তো এগুলিই পরে রূপ নেয় রাখি বন্ধন উত্‍সবের!!

Share This
Categories
প্রবন্ধ

রবীন্দ্রনাথের রাখিবন্ধন ছিল বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে এক ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদ।

আজ যখন “হিংসায় উন্মত্ত পৃথ্বী” ‘নিত্য নিঠুর দ্বন্দ্বে’ লিপ্ত, সম্প্রদায়ে  সম্প্রদায়ে,ধর্মে ধর্মে বিভেদের বিষ সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে তখন আমরা স্মরণ করবো কবিগুরু  রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উদ্যোগে সৃষ্ট রাখিবন্ধন উৎসব –যা একদিন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অন্যায়ের বিরুদ্ধে ছিল এক ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদ। যখন সাম্রাজ্যবাদী লর্ড কার্জন বাংলার জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে স্তব্ধ করার জন্য, বাঙালিকে দূর্বল করার জন্য ও হিন্দু –মুসলমানের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করার জন্য ঘোষণা করলেন ১৯০৫ খ্রিঃ ১৬ই অক্টোবর বঙ্গভঙ্গ হবে, তখন স্বদেশ প্রেমিক কবিগুরু  রবীন্দ্রনাথ আর চুপ করে থাকতে পারলেন না। তিনি সন্ত্রাসবাদী ছিলেন না,ছিলেন স্বদেশপ্রেমিক। তাই স্বদেশের প্রয়োজনে সেদিন তিনি সাহিত্যজগৎ থেকে নেমে এলেন রাজীতির অঙ্গনে। তিনি ব্রিটিশ সরকারের এই হীন চক্রান্তের বিরুদ্ধে নতুন কৌশল গ্রহণ করলেন।কার্জনের এই হীন চক্রান্তের কথা পূর্বেই জানতে পেরে রবীন্দ্রনাথ একটা বিশেষ দিনে জাতি-ধর্ম-বর্ণ-সম্প্রদায় নির্বিশেষে সকল শ্রেণীর মানুষকে নিয়ে প্রতিবাদে সামিল হলেন এবং রাখিবন্ধন উৎসবের সূচনা করলেন।সেদিন এই উৎসবে পরস্পরের হাতে রাখি পড়িয়ে তিনি ব্রিটিশদের জানিয়ে দিতে চাইলেন বাঙালির এক প্রাণ একতার কথা । তখনকার বিখ্যাত পত্রিকা বঙ্গদর্শনে রবীন্দ্রনাথ লিখলেন – “ঈশ্বর যে  বাঙালিকে বিচ্ছিন্ন করে নাই, তাহাই বিশেষ রূপে স্মরণ ও প্রচার করার জন্য আমরা রাখিপূর্ণিমার দিনে পরস্পরের হাতে হরিদ্রাবর্নের সুত্র বাঁধিয়া দিব।” ১৬ই অক্টোবর,১৯০৫ খ্রিঃ কোলকাতার রাজপথে এক অপূর্ব দৃশ্য দেখা গেল।রবীন্দ্রনাথের নির্দেশে শত শত নর নারী গঙ্গানদীর গঙ্গার জলে স্নান করে হাতে কালো ব্যজ পড়ে মিলিত ভাবে গান গেয়ে চললেন – “বাংলার মাটি,বাংলার জল,বাংলার বায়ু,বাংলার ফল,
পুন্য হউক,পুণ্য হউক,হে ভগবান।”
বাংলা মাকে দ্বিখণ্ডিত করেছে বলে মনের দুঃখে সেদিন সকলে অরন্ধন ও অনশন পালন করে তাঁদের মনের শোক প্রকাশ করেছিলেন।   সমকালের পরিপ্রেক্ষিতে এই রাখিবন্ধন উৎসবকে শুধু এক  অভিনব কৌশল না বলে আধুনিক রাষ্ট্রতাত্বিক দৃষ্টিকোন থেকে দেখলে রাখিবন্ধনকে রাজনৈতিক আন্দোলনের একটা নতুন  উদ্যোগ বলা যেতে পারে। তিনি রাখিবন্ধন উৎসবকে শুধুমাত্র পুরুষদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে নারীজাতিকে এই আন্দোলনে সামিল হতে অনুরোধ করেন।ফলে সেদিন দেখা গেল শত শত নরনারী মহা উৎসাহে শঙ্খ বাজিয়ে এই উৎসবে যোগদান করলেন। তাছাড়া তাঁর উদ্দেশ্য ছিল এই উৎসবের মধ্য দিয়ে হিন্দু-মুসলিমের মধ্যে সমস্ত বিভেদ দুর করে ঐক্য স্থাপন করা। এই লক্ষ্য সামনে রেখে হিন্দু-মুসলিম ঐক্যকে সুদৃঢ় করার জন্য তিনি জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল সম্প্রদায়ের মানুষের হাতে রাখি পড়িয়ে দিতে বলেছিলেন। এই প্রসঙ্গে কবিগুরুর একটি লেখা উদ্ধৃত করছি। তিনি লিখেছিলেন- “সামনে যাকে পেতাম তার হাতে বাঁধিতাম রাখি।…………মনে পড়ে একবার এক মুসলমান কনেষ্টবল হাত জোর করে বলেছিলেন-মাফ করুন হুজুর আমি মুসলমান।” মুসলমান হলেও তিনি তার হাতে রাখি পড়াতে ইচ্ছুক ছিলেন।এমনকি শোনা যায় তিনি একটা মসজিদে ঢুকে কিছু মুসলমানকে রাখি পড়িয়েছিলেন। এছাড়া তিনি অনেক বিখ্যাত ব্যক্তি ও স্বাধীনতা সংগ্রামীর কাছে ডাকযোগে রাখি পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। সেদিন বৈকালে ফেডারেশন হলের সভায় রবীন্দ্রনাথ ‘বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন’ বিষয়ক এক প্রবন্ধ পাঠ করেন। কিন্তু এ বছর COVID-19 বা করোনা ভাইরাসের অতিমারীর আবহে আর সেদিনের মতো পথে নেমে দল বেঁধে রাখিবন্ধন উৎসব করা সম্ভব হবে না এবং সেটা বাঞ্ছিতও নয়। তাই এবারে রাখি বন্ধন উৎসব করতে হবে নিভৃতে ঘরের চারি দেওয়ালের মধ্যে নিজ নিজ পরিবারকে সঙ্গে নিয়ে, প্রতিটি পাড়ায় পাড়ায়  কিংবা ক্লাবের মধ্যে পাঁচ-দশজন সদস্য নিয়ে কিংবা কোনো সংস্থায় ৪০-৫০ জন সদস্য নিয়ে সামাজিক দূরত্ব ও অন্যান্য স্বাস্থ্য বিধি মেনে। আর উন্নত প্রযুক্তিকে সাহায্য নিয়ে ভার্চুয়াল পদ্ধতিতে প্রতিটি ক্লাব, সমস্ত সম্প্রদায়ের ধর্মীয় স্থান – মন্দির- মসজিদ- গির্জা সবত্র  এই রাখিপূর্ণিমায়  রাখিবন্ধন উৎসব উৎযাপন করতে হবে ।
তবে এবছর এই রাখিবন্ধন উৎসব করতে হবে সকল মানুষের মধ্যে একতা জাগ্রত করার উদ্দেশ্য নিয়ে। কারন  সেদিনের ব্রিটিশ শক্তির মতো বর্তমানে দেশে এক সাম্প্রদায়িক শক্তি মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। এই শক্তিও চাইছে মানুষে মানুষে বিভেদ সৃষ্টি করতে এবং বাংলা তথা সমগ্র ভারতকে  আবার দ্বিখন্ডিত করতে। আবার যেন হিন্দু- মুসলমানের মধ্যে  দ্বিতীয় বঙ্গভঙ্গ হওয়ার উদ্যোগ চলছে গোপনে গোপনে । তাই এই দ্বিতীয় বঙ্গভঙ্গ রোধের জন্য সকলকে হিন্দু-মুসলমানের  বিভেদ ভুলে মনপ্রান দিয়ে রাখিবন্ধন উৎসব করতে হবে। সেদিন যেমন বাংলার নারীপুরুষ, হিন্দু-মুসলমান একযোগে ব্রিটিশের হীন চক্রান্তকে পরাভূত করেছিল এবং ১৯১১ খ্রিঃ আবার দ্বিখণ্ডিত বাংলাকে একত্র করেছিল আজও তেমনি ভাবে বর্তমানের সাম্প্রদায়িক শক্তির হীন চক্রান্তকে স্তব্ধ করে দিতে হবে । তাই অন্য বছরের মতো রাজপথে নেমে হাজার হাজার যুবক-যুবতী, নারী-পুরুষ একসাথে না করতে পারলেও সামাজিক দুরত্ব মেনে এবং অন্য সকল নিয়মকানুন রক্ষা করে নতুন উৎসাহে রাখিবন্ধন উৎসব করবো। এবারে প্রত্যেকে মুখে মাক্স পড়ে হাত সানিটাইজার করে হাতে তুলে দিতে হবে সৌভ্রাতৃত্বের প্রতীক  রাখি । রবীন্দ্রনাথের আদর্শকে সামনে রেখে সকলে এ বছর ৩রা আগষ্ট রাখিপূর্নিমার দিনে সকাল থেকে বিভিন্ন ক্লাবে, বিভিন্ন সংঘে কিংবা বাড়ির পরিজনকে সঙ্গে নিয়ে অনলাইনে গান গাইবো – “বাঙালির প্রাণ,বাঙালির মন,বাঙালির ঘরে যত ভাই বোন
এক হউক,এক হউক,এক হউক,হে ভগবান।”
রবীন্দ্রনাথ সেদিন শুধু এই প্রার্থনাতেই থেমে থাকেন নি সেদিন তাঁর সংগীত বেজে উঠেছিল দৃঢ় সংকল্পের অমোঘ বাণী। সেই বাণীই হবে আমাদের আজকের মন্ত্র –
“ওদের বাঁধন যতই শক্ত হবে
ততই বাঁধন টুটবে
মোদের ততই বাঁধন টুটবে।
ওদের যতই আঁখি রক্ত হবে
মোদের আঁখি টুটবে
ততই মোদের আঁখি টুটবে।”
এই সব গানের মধ্যে জানিয়ে দেওয়া হবে বাঙালিরা বাংলার বুকে আবার নতুন করে বঙ্গভঙ্গ হতে দেবে না, বাংলার বুকে হিন্দু-মুসলমান-শিখ-জৈন-নেপালি-গুর্খা-সকলকে এক সুত্রে গেঁথে রাখবে। তাই এ বছরের রাখিবন্ধন উৎসব হোক সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে  নতুনভাবে  প্রতিবাদ।

।।কলমে : প্রশান্ত কুমার দাস।।

Share This
Categories
প্রবন্ধ

আজ আন্তর্জাতিক ভিকটিমস অব এনফোর্সড ডিজঅ্যাপেয়ারেন্স দিবস, জানুন দিনটি পালনের গুরুত্ব ও তাৎপর্য।

বলপ্রয়োগকৃত নিখোঁজের শিকারদের আন্তর্জাতিক দিবসটি প্রতি বছর ৩০ আগস্ট পালিত হয়। এই উদযাপনটি বিশ্বব্যাপী জোরপূর্বক অন্তর্ধানের গুরুতর সমস্যা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য নিবেদিত।  জোরপূর্বক অন্তর্ধান বলতে বোঝায় গ্রেপ্তার, আটক, অপহরণ, বা রাষ্ট্রের এজেন্ট বা ব্যক্তি/গোষ্ঠী কর্তৃক অনুমোদিত, সমর্থিত বা সহ্য করা ব্যক্তিদের স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করা।  এটি প্রায়শই একজন ব্যক্তির আটকের বিষয়টি স্বীকার করতে বা তাদের ভাগ্য বা অবস্থান সম্পর্কে তথ্য প্রদান করতে ইচ্ছাকৃতভাবে প্রত্যাখ্যানের দ্বারা অনুসরণ করা হয়, যাতে তাকে আইনি সুরক্ষা এবং সুরক্ষা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।

 

১৮ ডিসেম্বর, ১৯৯২-এ সাধারণ পরিষদের রেজোলিউশন ৪৭/১৩৩ এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত বলপূর্বক নিখোঁজ থেকে সমস্ত ব্যক্তির সুরক্ষা সম্পর্কিত ঘোষণাপত্রে বর্ণিত হিসাবে, বলপূর্বক অন্তর্ধান নিম্নলিখিত উপাদানগুলির দ্বারা চিহ্নিত করা হয়েছে:
“ব্যক্তিদের তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গ্রেফতার করা হয়, আটক করা হয় বা অপহরণ করা হয় বা অন্যথায় সরকারের বিভিন্ন স্তর বা শাখার কর্মকর্তাদের দ্বারা, বা সংগঠিত গোষ্ঠী বা ব্যক্তিগত ব্যক্তিদের পক্ষে কাজ করে বা সরাসরি সমর্থন দিয়ে তাদের স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করা হয়।  বা পরোক্ষ, সরকারের সম্মতি বা সম্মতি।  এর পরে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাগ্য বা অবস্থান প্রকাশ করতে ইচ্ছাকৃতভাবে অস্বীকার করা বা তাদের স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে তা স্বীকার করতে অস্বীকার করা।  ফলস্বরূপ, এই ব্যক্তিরা আইনের সুরক্ষা থেকে বাদ পড়েছেন।”

 

 

 

বলপূর্বক নিখোঁজের শিকারদের আন্তর্জাতিক দিবসের ইতিহাস—-

 

২১শে ডিসেম্বর, ২০১০-এ জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ, রেজোলিউশন ৬৫/২০৯ এর মাধ্যমে, বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন অঞ্চলে বলপূর্বক বা অনিচ্ছাকৃত অন্তর্ধানের ক্রমবর্ধমান ঘটনা সম্পর্কে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

এর মধ্যে গ্রেপ্তার, আটক এবং অপহরণের সাথে জড়িত পরিস্থিতি অন্তর্ভুক্ত ছিল, যেগুলিকে একত্রিত করা হলে বা বলপূর্বক অন্তর্ধানের পরিমাণ, একটি গুরুতর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

রেজোলিউশনটি নিখোঁজ হওয়ার প্রত্যক্ষদর্শী বা নিখোঁজ ব্যক্তিদের স্বজনদের দ্বারা হয়রানি, দুর্ব্যবহার এবং ভয় দেখানোর ক্রমবর্ধমান প্রতিবেদনগুলিও তুলে ধরে।

তদুপরি, সাধারণ পরিষদ জোরপূর্বক অন্তর্ধান থেকে সকল ব্যক্তির সুরক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক কনভেনশন গ্রহণকে আন্তরিকভাবে স্বাগত জানিয়েছে।  এই জটিল সমস্যা মোকাবেলার প্রতিশ্রুতি অনুসারে, অ্যাসেম্বলি 30 আগস্টকে বলপ্রয়োগকৃত নিখোঁজের শিকারদের আন্তর্জাতিক দিবস হিসাবে মনোনীত করেছে।  এই বার্ষিক পালনটি 2011 সালে শুরু হয়েছিল এবং এর উদ্দেশ্য হল বলপূর্বক গুমের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্তদের দুর্দশার উপর আলোকপাত করা এবং মানবাধিকারের এই গুরুতর লঙ্ঘন সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা।

 

বলপূর্বক গুম হওয়া ভিকটিমদের আন্তর্জাতিক দিবসের তাৎপর্য–

 

এনফোর্সড ডিসপিয়ারেন্সের শিকারদের আন্তর্জাতিক দিবস একটি আন্তর্জাতিক পালন যা প্রতি বছর ৩০ আগস্ট অনুষ্ঠিত হয়।  এটি জাতিসংঘ কর্তৃক স্থাপিত হয়েছিল বলপূর্বক গুমের অপরাধ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য এবং ভিকটিম ও তাদের পরিবারকে সম্মান জানানোর জন্য।
জোরপূর্বক অন্তর্ধান হল রাষ্ট্রের এজেন্টদের দ্বারা বা রাষ্ট্রের অনুমোদন, সমর্থন বা সম্মতি নিয়ে কাজ করে এমন ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের গোষ্ঠী দ্বারা গ্রেফতার, আটক, অপহরণ বা স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করার অন্য কোন প্রকার, এবং তারপরে স্বীকার করতে অস্বীকার করা।  স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করা বা নিখোঁজ ব্যক্তির ভাগ্য বা অবস্থান সম্পর্কে তথ্য দেওয়া, দীর্ঘ সময়ের জন্য আইনের সুরক্ষা থেকে তাদের অপসারণের অভিপ্রায়ে।
বলপ্রয়োগকৃত নিখোঁজের শিকারদের আন্তর্জাতিক দিবস এই অপরাধের শিকারদের স্মরণ করার এবং তাদের এবং তাদের পরিবারের জন্য ন্যায়বিচারের আহ্বান জানানোর একটি দিন।  এটি বলপূর্বক গুমের অপরাধ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে এবং এটি প্রতিরোধে পদক্ষেপ নিতে সরকারকে আহ্বান জানানোরও একটি দিন।

।। তথ্য : সংগৃহীত উইকিপিডিয়া ও বিভিন্ন ওয়েবসাইট।।

Share This
Categories
প্রবন্ধ রিভিউ

আজ জাতীয় ক্রীড়া দিবস, জানুন দিনটি কেন পালিত হয় এবং দিনটির গুরুত্ব।

হকি খেলোয়াড় ধ্যান চাঁদের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে প্রতিবছর ২৯ আগস্ট ভারতে জাতীয় ক্রীড়া দিবস উৎযাপিত হয়।খেলার জগতের প্রতিটি খেলোয়াড় দের জীবনে এই দিনটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ দিন হিসেবে বিবেচিত হয়। এই বিশেষ দিন টিতেই অর্জুন, দ্রোনাচার্জ, রাজীব খেলরত্ন, ধ্যান চাঁদ পুরস্কার বিতরণ করা হয়। প্রতিটি ব্যক্তির জীবনে খেলাধুলা এবং খেলাধুলার গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য প্রতি বছর এই দিবসটি উদযাপিত হয়। আসলে দিনটি কিংবদন্তি হকি খেলোয়াড় মেজর ধ্যান চাঁদের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে অনুষ্ঠিত হয়।

 

উত্তরপ্রদেশের প্রয়াগরাজে (এলাহাবাদ) ১৯০৫ সালের ২৯ অগাস্ট জন্ম হয়  ধ্যানচাঁদের। ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান আর্মির হয়ে হকি খেলেছিলেন ধ্যানচাঁদের পরিবারের সদস্যরা। বাবা সোমেশ্বর সিংহ সেনাবাহিনীতে চাকরি করতেন।  মাত্র ১৬ বছর বয়সে ১৯২২ সালে ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান আর্মিতে যোগ দিয়েছিলেন ধ্যানচাঁদ। সময়ের অভাবে রাতের দিকে অনুশীলনে মগ্ন থাকতেন কিংবদন্তি এই হকি তারকা। রাতের দিকে অনুশীলন করতেন বলে তাঁর সতীর্থরা ‘চাঁদ’ নামে সম্বোধন করতেন ধ্যানচাঁদকে। তিনি পঞ্জাব রেজিমেন্টের মেজর পদে উন্নিত হয়েছিলেন।  ১৯৩২ সালে গোয়ালিয়রের ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে স্নাতক পাশ করেন ধ্যানচাঁদ। একদম ছোটবেলায় কুস্তিতে মূলত আগ্রহ ছিল ধ্যানচাঁদের। যদিও পরে হকিতে মনোনিবেশ করেন।

 

ইংরেজদের অধীনস্ত ভারতীয় হকি দলের হয়ে ১৯২৮, ১৯৩২ ও ১৯৩৬ অলিম্পিক খেলেন।  প্রতিবারই দেশকে সোনা এনে দিয়েছিলেন তিনি। ১৯২৬—১৯৪৯ পর্যন্ত তার ক্যারিয়ার জীবনে তিনি মোট ৫৭০টি গোল করেন।
আন্তর্জাতিক হকি অঙ্গনে ভূমিকা রাখার পাশাপাশি তিনি একাধিকবার তার দেশকে সাফল্যের শীর্ষে নিতে অবদান রেখেছেন। তিনি ভারতীয় এবং বিশ্ব হকির এক কিংবদন্তিতুল্য ব্যক্তিত্ব। তার স্মরণে ভারতের ক্রীড়াঙ্গনে আজীবন কৃতিত্বের জন্য সর্বোচ্চ পুরস্কার— মেজর ধ্যানচাঁদ পুরষ্কারের প্রবর্তন করা হয়েছে এবং তার জন্মদিনেই দেশটিতে জাতীয় ক্রীড়া দিবস উৎযাপন করা হয়।  শোনা যায়, হিটলার ধ্যানচাঁদের খেলা দেখে এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে তাঁকে জার্মান নাগরিকত্ব দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তা নিতে অস্বীকার করেন ধ্যানচাঁদ। তাকে মেডেল পরিয়ে পুরষ্কৃত করেন রাষ্ট্র নায়ক হিটলার । তার পর স্টেডিয়ামে থেকে জিজ্ঞাসা করেন হিটলার, ভারতে কি করেন তিনি ? ধ্যান চাঁদ বলেন ভারতের সেনাবাহিনী তে যুক্ত তিনি । তারপর হিটলার তাকে জার্মানির সেনাবাহিনী তে উচ্চ পদের জন্য আমন্ত্রণ জানান । তবে ধ্যান চাঁদ তার আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেন । তার আত্মজীবনী ” গোল ” বই টিতে এই ঘটনার কথা লিপিবদ্ধ আছে ।

 

কিংবদন্তি এই হকি তারকার নামে অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায় মূর্তি গড়া হয়েছে।

১৯৫৬ সালে তিনি ভারত সরকারের পক্ষ থেকে পদ্মভূষণ সম্মানে ভূষিত হন।

১৯২৮ সালের আমস্টারডাম অলিম্পিক্সে সর্বোচ্চ গোলদাতা ছিলেন ধ্যানচাঁদ। সেবারই হকির জাদুকর হিসেবে নামকরণ হয় ধ্যানচাঁদের।

নয়া দিল্লিতে তার নামে একটি জাতীয় হকি স্টেডিয়াম প্রতিষ্ঠা করা হয়। ঝাঁসি তে তার নামেই রয়েছে জাতীয় হকি একাডেমি।

 

আজকের দিনেই রাষ্ট্রপতি অর্জুন ও রাজীব খেলরত্ন পুরস্কার, দ্রোণাচার্য পুরস্কার তুলে দেন ক্রীড়াজগতে দেশের কৃতিদের হাতে। ক্রীড়া সচেতনতা বৃদ্ধি এবং দেশের ক্রীড়া সংস্কৃতি ও জাতীয় ক্রীড়া দলগুলোর প্রতি শ্রদ্ধাবোধ বাড়াতে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে , স্কুলে এই দিন টি পালন করা হয়। তবে ভারতের মতন জাতীয় ক্রীড়া দিবস বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন সময়ে উৎযাপিত হয়ে থাকে।

 

।।তথ্য : সংগৃহীত উইকিপিডিয়া ও বিভিন্ন ওয়েবসাইট।।

Share This
Categories
প্রবন্ধ

আজ আন্তর্জাতিক পারমাণবিক পরীক্ষা বিরোধী দিবস , জানুন দিনটি কেন পালিত হয় এবং গুরুত্ব।

সারা বিশ্বে ২৯ আগস্ট পারমাণবিক পরীক্ষা বিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস হিসেবে পালন করা হয় বিশ্ববাসীর মধ্যে পরমাণু অস্ত্র বিরোধী সচেতনতা গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে। ২০০৯ সালের ২ ডিসেম্বর রাষ্ট্রসঙ্ঘের সাধারণ সভার ৬৪তম অধিবেশনে ২৯ আগস্ট দিনটিকে পারমাণবিক পরীক্ষা বিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

 

পারমাণবিক পরীক্ষা শুধু মানব সমাজেরই নয়, পরিবেশ, উদ্ভিদ ও প্রাণীজগতেরও ব্যাপক ক্ষতি করে।  পারমাণবিক পরীক্ষার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক দিবস আমাদের এই বিষয়ে সতর্ক হয়ে একটি নিরাপদ পারমাণবিক অস্ত্র-মুক্ত ভবিষ্যত নিশ্চিত করতে হবে। পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষার বিধ্বংসী প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে ২৯শে আগস্ট আন্তর্জাতিক পরমাণু পরীক্ষার বিরুদ্ধে দিবস পালন করা হয়।  এই বছর ইভেন্টের ত্রয়োদশ বার্ষিকী চিহ্নিত করে।  এই দিনে, জাতিসংঘ একটি ইভেন্টের আয়োজন করে যা পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষা এবং বিস্ফোরণের প্রভাব সম্পর্কে জনসচেতনতা তৈরি করে এবং এই ধরনের পারমাণবিক পরীক্ষা বন্ধ করার প্রয়োজনীয়তাকে আরও হাইলাইট করে।

 

বেশিরভাগ দেশ যারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করে তারা তাদের পারমাণবিক অস্ত্রের কার্যকারিতা এবং বিস্ফোরক ক্ষমতা পরীক্ষা করার জন্য পরমাণু পরীক্ষা চালায়।  পারমাণবিক পরীক্ষা একটি দেশের পারমাণবিক শক্তির লক্ষণ।  মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রথম ১৯৪৫ সালের জুলাই মাসে এবং ১৯৪৯ সালে প্রাক্তন সোভিয়েত ইউনিয়ন দ্বারা পরীক্ষা করে। এটি ১৯৫২ সালে যুক্তরাজ্য, ১৯৬০ সালে ফ্রান্স এবং ১৯৬৪ সালে চীন দ্বারা অনুসরণ করা হয়েছিল। ভারত ১৯৯৮ সালে পোখরান-২ পরীক্ষা করেছিল যা ছিল  দ্বিতীয়টি  ভারত প্রথমবার পরীক্ষা করেছিল ১৯৭৪ সালে।

 

পরমাণু পরীক্ষার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক দিবসটি জাতিসংঘ কর্তৃক মনোনীত প্রতি বছর ২৯শে আগস্ট পালন করা হয়।  রেজোলিউশনে “পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষার বিস্ফোরণ বা অন্য কোনো পারমাণবিক বিস্ফোরণের প্রভাব এবং পারমাণবিক অস্ত্র-মুক্ত বিশ্বের লক্ষ্য অর্জনের অন্যতম উপায় হিসাবে তাদের বন্ধ করার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সচেতনতা এবং শিক্ষা বৃদ্ধির আহ্বান জানানো হয়েছে।”  দিবসটি জাতিসংঘ, সদস্য রাষ্ট্র, আন্তঃসরকারি ও বেসরকারী সংস্থা, একাডেমিক প্রতিষ্ঠান, যুব নেটওয়ার্ক এবং মিডিয়াকে একটি নিরাপদ বিশ্ব অর্জনের জন্য একটি মূল্যবান পদক্ষেপ হিসাবে পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষা নিষিদ্ধ করার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে অবহিত, শিক্ষিত এবং সমর্থন করার জন্য উদ্বুদ্ধ করা।  .

 

পারমাণবিক পরীক্ষার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক দিবস: ইতিহাস

২ ডিসেম্বর ২০০৯-এ, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৬৪তম অধিবেশন ২৯ আগস্টকে তার রেজুলেশন ৬৪/৩৫ সর্বসম্মতভাবে গৃহীত করার মাধ্যমে পারমাণবিক পরীক্ষার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক দিবস ঘোষণা করে।  প্রস্তাবের প্রস্তাবনায় জোর দেওয়া হয়েছে যে “মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্যের উপর ধ্বংসাত্মক এবং ক্ষতিকারক প্রভাব এড়াতে পারমাণবিক পরীক্ষা বন্ধ করার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা করা উচিত” এবং “পরমাণু পরীক্ষার সমাপ্তি হল পারমাণবিক পরীক্ষাগুলি অর্জনের অন্যতম প্রধান উপায়।  একটি পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত বিশ্বের লক্ষ্য।”
ট্রিনিটি নামক প্রথম পারমাণবিক পরীক্ষাটি ১৬ জুলাই, ১৯৪৫ সালে নিউ মেক্সিকোতে একটি মরুভূমিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী দ্বারা পরিচালিত হয়েছিল।  ম্যানহাটন প্রকল্পের জে. রবার্ট ওপেনহেইমারের অধীনে পারমাণবিক প্রযুক্তি তৈরি করা হয়েছিল।  প্রথম পারমাণবিক পরীক্ষার পর, ১৯৪৫ সালের ৬ এবং ৯ আগস্ট যথাক্রমে হিরোশিমা এবং নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা হামলা হয়, যা কয়েক লক্ষ মানুষের জীবন দাবি করে।  জাপানের সেই শহরগুলির পরের প্রজন্মগুলি বিকিরণ-প্ররোচিত ক্যান্সার এবং জন্মগত ত্রুটিতে ভুগছিল।
পরবর্তীতে, তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৪৯ সালে, যুক্তরাজ্য ১৯৫২ সালে, ফ্রান্স ১৯৬০ সালে এবং চীন 1964 সালে পারমাণবিক পরীক্ষা চালায়। শীতল যুদ্ধের পর্বে (১৯৪৭-১৯৯১) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে পারমাণবিক অস্ত্রের প্রতিযোগিতা দেখা যায়।

 

নিউক্লিয়ার টেস্টিং এর বিপদ–

 

পারমাণবিক পরীক্ষা স্বাস্থ্যের জন্য বিপদ ডেকে আনে কারণ এটি তেজস্ক্রিয় পদার্থ নির্গত করে যা সাধারণত বাতাসে এবং পৃথিবীর পৃষ্ঠে ছড়িয়ে পড়ে।  ১৯৪৫ সাল থেকে বায়ুমণ্ডলে, ভূগর্ভস্থ বা জলের নীচে সমস্ত পরিবেশে পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষা করা হয়েছে।  এই পরীক্ষার অবশিষ্ট বর্জ্য অনেক বছর ধরে থাকে। বিকিরণের এক্সপোজার অঙ্গ, হাড়, ত্বক এবং চোখের ক্ষতি করতে পারে।  বিকিরণ বিশেষ করে লিউকেমিয়া, থাইরয়েড, ফুসফুস এবং স্তন ক্যান্সারের মতো ক্যান্সারের প্রকোপ বৃদ্ধির সাথে যুক্ত। বিকিরণ একজন ব্যক্তির জিনেও মিউটেশন ঘটাতে পারে।  এই জিনগুলি তাদের সন্তানদের কাছে প্রেরণ করা যেতে পারে, যার ফলে জেনেটিক ব্যাধি হওয়ার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়।  পৃষ্ঠের তেজস্ক্রিয় পদার্থ উদ্ভিদের শিকড়ে প্রবেশ করতে পারে এবং ফলস্বরূপ প্রাণীদের দ্বারা গ্রাস করতে পারে।  দূষিত গাছপালা এবং প্রাণীজ খাদ্যের উৎস খাওয়া পরোক্ষভাবে মানুষের স্বাস্থ্যেরও ক্ষতি করতে পারে।

।।তথ্য : সংগৃহীত ইন্টারনেট।।

Share This