Categories
প্রবন্ধ রিভিউ

বিশ্ব বায়ু দিবস কেন পালিত হয় এবং পালনের গুরুত্ব।

বিশ্ব বায়ু দিবস প্রতি বছর ১৫ জুন পালিত হয় বায়ু শক্তির তাৎপর্য এবং শক্তির একটি বিশুদ্ধতম রূপ হিসাবে এর গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করার জন্য।
বিশ্ব বায়ু দিবস উদযাপনের পিছনে অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হল বায়ু শক্তি সংগ্রহের সুবিধা সম্পর্কে মানুষকে শিক্ষিত করা।  ক্ষতিকারক গ্রিন হাউস গ্যাস নির্গমন কমানো থেকে শুরু করে জলবায়ু পরিস্থিতির উন্নতি।  বায়ু শক্তির ব্যবহার টেকসই ভবিষ্যত নিশ্চিত করার পাশাপাশি আমাদের অনেক উপায়ে সাহায্য করে।
বিশ্ব বায়ু দিবসে বায়ু শক্তির ইতিবাচক পরিবেশগত প্রভাব তুলে ধরতে বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন কার্যক্রম, কর্মশালা, সম্মেলন, সেমিনার এবং ইভেন্টের আয়োজন করা হয়।
বিশ্ব বায়ু দিবসের স্বীকৃতি শুধুমাত্র টেকসই শক্তি অনুশীলনকে উৎসাহিত করে না বরং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াই করতেও সাহায্য করে।

গ্লোবাল উইন্ড ডে বা বিশ্ব বায়ু দিবস হল একটি বিশ্বব্যাপী ইভেন্ট। এটি উইন্ডইউরোপ এবং GWEC (গ্লোবাল উইন্ড এনার্জি কাউন্সিল) দ্বারা আয়োজিত হয়।  এটি এমন একটি দিন যখন বায়ু শক্তি উদযাপন করা হয়, তথ্যের আদান-প্রদান করা হয় এবং প্রাপ্তবয়স্ক এবং শিশুরা বায়ু শক্তি, এর শক্তি এবং বিশ্বকে পরিবর্তন করার সম্ভাবনা সম্পর্কে জানতে পারে।  EWEA এবং GWEC এর সহযোগিতায়, জাতীয় বায়ু শক্তি সমিতি এবং বায়ু শক্তি উৎপাদনের সাথে জড়িত কোম্পানিগুলি বিশ্বের অনেক দেশে ইভেন্টের আয়োজন করে।  ২০১১ সালে, 4টি মহাদেশে 30টি দেশে ইভেন্ট সংগঠিত হয়েছিল।  ইভেন্টগুলির মধ্যে রয়েছে উপকূলীয় এবং উপকূলীয় বায়ু খামার পরিদর্শন, তথ্য প্রচার, শহরগুলিতে প্রদর্শনী টারবাইন স্থাপন, বায়ু কর্মশালা এবং একটি বায়ু কুচকাওয়াজ।  গ্লোবাল উইন্ড ডে (১৫ জুন) নিজেই অনেক ঘটনা ঘটেছে, তবে তার আগের দিন এবং সপ্তাহগুলিতেও ঘটনা ঘটেছে।  ২০১২ সালে বিশ্বজুড়ে ২৫০টি ইভেন্ট ছিল এবং একটি খুব জনপ্রিয় ফটো প্রতিযোগিতা ছিল।

বিশ্ব বায়ু দিবস পর্যবেক্ষণের ইতিহাস—

 

ইউরোপিয়ান উইন্ড এনার্জি অ্যাসোসিয়েশন (EWEA) দ্বারা 2007 সালে প্রথম বায়ু দিবসের আয়োজন করা হয়েছিল কিন্তু এটি শুধুমাত্র 2009 সালে ছিল যে EWEA গ্লোবাল উইন্ড এনার্জি কাউন্সিল (GWEC) এর সাথে মিলিত হয়েছিল এবং এটিকে একটি বিশ্বব্যাপী ইভেন্টে পরিণত করেছিল।  উদ্দেশ্য ছিল বিশ্বজুড়ে মানুষকে বায়ু শক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে উৎসাহিত করা।

 

বিশ্ব বায়ু দিবস পালন—

 

ইউরোপিয়ান উইন্ড এনার্জি অ্যাসোসিয়েশন এবং গ্লোবাল উইন্ড এনার্জি কাউন্সিল প্রতি বছর গ্লোবাল উইন্ড ডে উপলক্ষে বায়ু শক্তির প্রচারে বিভিন্ন ইভেন্টের আয়োজন করে।  অনেক জাতীয় বায়ু শক্তি সমিতি এবং বায়ু শক্তি উৎপাদনের সাথে জড়িত কোম্পানিগুলিও তাদের সমস্ত দেশে ইভেন্ট করে।  তথ্য প্রচার, উপকূলীয় এবং উপকূলীয় বায়ু খামার পরিদর্শন, শহরগুলিতে টারবাইন স্থাপনের প্রদর্শনী, বায়ু কর্মশালা এবং বায়ু প্যারেড এই দিনে বিভিন্ন দেশে অনুষ্ঠিত কিছু জনপ্রিয় অনুষ্ঠান।  অন্যান্য মজার ক্রিয়াকলাপ যেমন উইন্ড ফার্ম ওপেন ডে, ওয়ার্কশপ, রেগাটাস, ফটো প্রদর্শনী, অঙ্কন প্রতিযোগিতা, ঘুড়ি ওড়ানো প্রতিযোগিতা ইত্যাদিও বিশ্ব বায়ু দিবস উদযাপনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ গঠন করে।

বিশ্ব বায়ু দিবসের তাৎপর্য—

বিশ্ব বায়ু দিবস হল বায়ু শক্তি, এর শক্তি এবং এটি ধারণ করতে পারে এমন সমস্ত বর্তমান এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনা উদযাপন করার একটি দিন।  এটি মানুষকে, বিশেষ করে শিশুদের, বায়ু শক্তির গুরুত্ব সম্পর্কে শিক্ষিত করার একটি দিন।  বিশ্বব্যাপী জলবায়ু সংকট গভীর হওয়ার সাথে সাথে এবং জলবায়ুর প্রতি রাজনৈতিক মনোযোগ বৃদ্ধি পাওয়ার সাথে সাথে বৈশ্বিক বায়ু দিবস পালন করা আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে।  বায়ু শক্তির সঠিক ব্যবহার অর্থনীতিকে ডিকার্বনাইজ করতে সাহায্য করতে পারে এবং চাকরি ও প্রবৃদ্ধি বাড়াতে সাহায্য করতে পারে এবং তাই এই দিনে আরও বেশি সংখ্যক কোম্পানিকে তাদের ব্যবসায়কে শক্তি দিতে পরিষ্কার, নির্ভরযোগ্য এবং সাশ্রয়ী বায়ু শক্তির দিকে যেতে উৎসাহিত করা হয়।

বায়ু শক্তি সম্পর্কে আকর্ষণীয় তথ্য—

বিশ্ব বায়ু দিবস ২০২৩ উপলক্ষ্যে, আসুন বায়ু শক্তি সম্পর্কে কিছু আকর্ষণীয় তথ্য জেনে নিই:

বায়ু শক্তি সবচেয়ে কার্যকরী এবং পরিবেশ বান্ধব শক্তির উত্সগুলির মধ্যে একটি।

২০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে উইন্ডমিল ব্যবহার করা হচ্ছে।

এটি শুধুমাত্র ১৯৪০ এর দশকে প্রথম আধুনিক বায়ু টারবাইন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভার্মন্টে নির্মিত হয়েছিল।

বায়ু শক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ১১ টি রাজ্যে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ২০% এরও বেশি সরবরাহ করে।

সবচেয়ে বড় উইন্ড টারবাইন যা ২০ তলা লম্বা এবং একটি ফুটবল মাঠের দৈর্ঘ্যের ব্লেড যুক্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াইতে অবস্থিত।

 

বায়ু শক্তির সবচেয়ে ইনস্টল ক্ষমতা জার্মানিতে।

জার্মান পদার্থবিদ, আলবার্ট বেটজ, বায়ু টারবাইন প্রযুক্তির প্রবর্তক।

উইন্ড টারবাইনগুলি দেখতে সহজ হতে পারে তবে বাস্তবে প্রায় ৮০০০ বিভিন্ন অংশ রয়েছে। যদি বাতাস প্রতি ঘন্টায় ১৩০ কিমি বেগে প্রবাহিত হয়, তাহলে নিরাপত্তা সতর্কতা হিসাবে ব্লেডগুলি বাঁকানো বন্ধ করে দেয়।

বায়ু শক্তি বিদ্যুৎ উৎপাদনের দ্রুততম বর্ধনশীল মোড।

তাই, প্রতি বছরের মতো আজ ১৫ জুন সারা বিশ্বে পালিত হচ্ছে বিশ্ব বায়ু দিবস। বায়ু শক্তিকে ব্যবহারে সবাইকে উৎসাহিত করতেই বিশ্বব্যাপী এই দিবসটি পালিত হয়ে থাকে।

।।তথ্য : সংগৃহীত ইন্টারনেট।।

Share This
Categories
প্রবন্ধ রিভিউ

আজ বিশ্ব রক্তদাতা দিবস, জানুন কেন পালিত হয় এবং দিনটির গুরুত্ব।

স্বেচ্ছায় রক্তদান এক মহৎ কাজ। রক্তের অভাব একজন ব্যক্তির জীবনকে বিপদে ফেলতে পারে। রক্তের প্রয়োজনে সময়মতো রক্ত সরবরাহ করা না হলে একজনের জীবনও হারাতে পারে। রক্তের ঘাটতি পূরণ করে রক্তদানের মাধ্যমে জীবন বাঁচানো যায়।
এই কারণে মানুষকে রক্তদানের জন্য সচেতন করা হয়, যাতে একজন সুস্থ মানুষ প্রয়োজনে রক্ত দান করতে পারে এবং একটি জীবন বাঁচাতে পারে। হাসপাতালগুলোতে জীবন-মৃত্যুর যুদ্ধে লিপ্ত মানুষ যাতে নতুন জীবন পায় সেজন্য বেশি বেশি মানুষ রক্তদান করার জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানানো হয়। তাই বিশ্ব রক্তদাতা দিবসের বিশেষ উপলক্ষ্য জীবন বাঁচাতে রক্তদানের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা ছড়িয়ে দেওয়া। প্রতি বছর ১৪ জুন সারা বিশ্বে দিনটি উদযাপন করা হয়।এবার দিবসটির প্রতিপাদ্য নির্ধারিত হয়েছে- ‘রক্ত দান করুন, দান করুন প্লাজমা, যতবার সম্ভব গ্রহণ করুন জীবন বাঁচানোর এ অনন্য সুযোগ’।

 

আন্তর্জাতিকভাবে এবছর বিশ্ব রক্তদাতা দিবসের বিশ্বব্যাপী অনুষ্ঠানের আয়োজক দেশ আলজেরিয়া। ২০০৪ সালে দিবসটি প্রথম পালিত হয়। নিরাপদ রক্ত নিশ্চিতকরণ ও স্বেচ্ছা রক্তদাতাদের উৎসাহ দিতেই বিশ্বব্যাপী উদযাপিত হয়ে আসছে দিবসটি।

১৯৯৫ সাল থেকে আন্তর্জাতিক রক্তদান দিবস পালন এবং ২০০০ সালে ‘নিরাপদ রক্ত’-এই থিম নিয়ে পালিত বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবসের অভিজ্ঞতা নিয়ে ২০০৪ সালে প্রথম পালিত হয়েছিল বিশ্ব রক্তদান দিবস। ২০০৫ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য অধিবেশনের পর থেকে প্রতিবছর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও এ দিবস পালনের জন্য তাগিদ দিয়ে আসছে।
প্রতিবছর ৮ কোটি ইউনিট রক্ত স্বেচ্ছায় দান হয়, অথচ এর মাত্র ৩৮ শতাংশ সংগ্রহ হয় উন্নয়নশীল দেশগুলো থেকে, যেখানে বাস করে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ৮২ শতাংশ মানুষ। এ ছাড়া এখনো বিশ্বের অনেক দেশে মানুষের রক্তের চাহিদা হলে নির্ভর করতে হয় নিজের পরিবারের সদস্য বা নিজের বন্ধুদের রক্তদানের ওপর, আর অনেক দেশে পেশাদারি রক্তদাতা অর্থের বিনিময়ে রক্ত দান করে আসছে রোগীদের।

 

আমাদের দেশে রক্তের চাহিদার একটা বড় অংশ প্রয়োজন হয় থ্যালাসেমিয়া রোগীদের জন্যে।একজন থ্যালাসেমিয়া রোগীর প্রতি মাসে ১ থেকে ৩ ব্যাগ রক্তের প্রয়োজন হয়। থ্যালাসেমিয়া ছাড়াও রক্তস্বল্পতা, প্রসূতির রক্তক্ষরণ, অগ্নিদগ্ধ রোগী, বড় অপারেশন, দুর্ঘটনা, ইত্যাদি নানা কারণে রক্তের প্রয়োজন হয়। রক্তের এ চাহিদা পূরণে নতুন করে স্বেচ্ছায় রক্তদাতার কোনও বিকল্প নেই। সাধারণত ১৮ থেকে ৬০ বছর বয়সী যেকোনও শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ-সক্ষম ব্যক্তি প্রতি চার মাস পরপর রক্ত দিতে পারেন। তবে সব রক্ত ​​সবাইকে দেওয়া যায় না। যদি কারো A+ রক্তের গ্রুপ থাকে, তাহলে এই ধরনের রক্ত ​​A+ এবং AB+ কে দেওয়া যেতে পারে। A- ব্লাড গ্রুপের মানুষের রক্ত ​​AB-, A-, A+-তে স্থানান্তর করা যেতে পারে। B+ ব্যক্তি B+ এবং AB+ রক্ত ​​দিতে পারেন। যদি কারো রক্তের গ্রুপ O+ হয়, তাহলে সে তার রক্ত ​​A+, B+, AB+, O+ কে দিতে পারে। AB+ রক্তের গ্রুপের একজন ব্যক্তি AB+ কে রক্ত ​​দিতে পারেন।চিকিৎসকদের মতে, যে কোনো সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক, নারী-পুরুষ উভয়েই রক্ত ​​দিতে পারেন। পুরুষরা প্রতি তিন মাসে একবার নিরাপদে রক্ত ​​দান করতে পারে এবং মহিলারা প্রতি চার মাসে একবার রক্তদান করতে পারে। রক্তদাতার ন্যূনতম বয়স হতে হবে ১৮ বছর, ৬৫ বছরের বেশি বয়সীরা রক্ত ​​দিতে পারবেন। ওজন ৪৫ কেজির কম হওয়া উচিত নয়।

 

অথচ বিশ্বের নানা দেশ থেকে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে জানা যায়, ‘নিরাপদ রক্ত সরবরাহের’ মূল ভিত্তি হলো স্বেচ্ছায় ও বিনামূল্যে দান করা রক্ত। কারণ তাদের রক্ত তুলনামূলকভাবে নিরাপদ এবং এসব রক্তের মধ্য দিয়ে গ্রহীতার মধ্যে জীবনসংশয়ী সংক্রমণ, যেমন এইচআইভি ও হেপাটাইটিস সংক্রমণের আশঙ্কা খুবই কম।
স্বেচ্ছায় ও বিনামূল্যে রক্তদানকারী আড়ালে থাকা সেসব মানুষের উদ্দেশে, এসব অজানা বীরের উদ্দেশে, উৎসর্গীকৃত ১৪ জুনের বিশ্ব রক্তদান দিবস।

 

তবে ১৪ জুন এই দিনটি উদযাপনের একটি বিশেষ কারণ রয়েছে। বিজ্ঞানী কার্ল ল্যান্ডস্টেইনার রক্তের গ্রুপ পদ্ধতি আবিষ্কার করেন।এই নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী আবিষ্কার করেছিলেন রক্তের গ্রুপ ‘এ, বি, ও,এবি’। এই অবদানের জন্য, কার্ল ল্যান্ডস্টেইনার ১৯৩০ সালে নোবেল পুরস্কার পান । রক্তদাতা দিবসটি বিজ্ঞানী কার্ল ল্যান্ডস্টেইনারকে উৎসর্গ করা হয়েছে। তার জন্মদিন ১৪ জুন।

 

প্রতি বছর রক্তদাতা দিবসের একটি বিশেষ থিম থাকে। এ বছর বিশ্ব রক্তদাতা দিবস ২০২৩-এর থিম হল- (Give blood, give plasma, share life, share often.) যারা স্বেচ্ছায় ও বিনামূল্যে রক্তদান করে লাখ লাখ মানুষের প্রাণ বাঁচাচ্ছেন তাদেরসহ সাধারণ জনগণকে রক্তদানে উৎসাহিত করাই এ দিবসের উদ্দেশ্য।রক্তদানকে উৎসাহিত করা এবং রক্তদাতাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের লক্ষ্যে প্রতি বছর রক্তদাতা দিবস উদযাপিত হয়। এই উপলক্ষে সারা বিশ্বে মানুষকে অনুপ্রাণিত করা হয়, যেন রক্তের অভাবে কোনো রোগীর মৃত্যু না হয়।

 

।।তথ্য : সংগৃহীত উইকিপিডিয়া ও বিভিন্ন ওয়েবসাইট।।

Share This
Categories
প্রবন্ধ

জানুন , জগন্নাথের প্রসাদ আস্বাদন করার সময় মহাপ্রভুর কী হয়েছিল?——রাধাবিনোদিনী বিন্তি বণিক।।।।

একদিন মহাপ্রভু গেছেন শ্রীজগন্নাথ দর্শন করতে, সিংহদ্বারে দ্বারপাল তাঁকে দেখেই এগিয়ে এসে চরণবন্দনা করলেন । অমনই মহাপ্রভু , “কোথায় আমার কৃষ্ণ ? আমার প্রাণনাথ কোথায় গো? তুমি আমার সখা ; আমায় দেখাও সখা ,আমার প্রাণনাথকে ।”—-বলে অনুনয় করার মত দ্বারপালের হাতখানা জড়িয়ে ধরলেন। দ্বারপাল বললেন, “আমি দর্শন করাচ্ছি আপনাকে , চলুন ।” শ্রীমন্‌ মহাপ্রভুর হাত ধরে মন্দিরের জগমোহনে নিয়ে গেলেন দ্বারপাল। আর তারপর , শ্রীপুরুষোত্তমকে দেখিয়ে বললেন, “ঐ যে তিনি ! আপনার প্রাণনাথ।”

গরুর স্তম্ভের পাশে দাঁড়িয়ে জগন্নাথ দর্শন করতেন মহাপ্রভু । তিনি কখনোই গর্ভমন্দিরে প্রবেশ করে জগন্নাথ দর্শন করতেন না । প্রতিদিনের মত আজও দ্বারপাল নিয়ে তাঁকে গরুর স্তম্ভের পিছনে বাঁ দিকটায়(গরুড়ের বাম দিক) দাঁড় করালেন এবং সেখান থেকেই মহাপ্রভু দু’নয়ন মেলে জগন্নাথকে দর্শন করলেন । জগন্নাথ আজ এখন মুরলীবদন শ্রীকৃষ্ণ হয়ে ধরা দিলেন মহাপ্রভুর নেত্রে । —-এই লীলার কথা রঘুনাথ দাস গোস্বামী তাঁর ‘শ্রীচৈতন্যস্তবকল্পবৃক্ষ’ গ্রন্থের সপ্তম শ্লোকে প্রকাশ করেছেন।

“ক্ক মে কান্তঃ কৃষ্ণস্ত্বরিতমিহ তং লোকয়
সখে ! ত্বমবেতি দ্বারাধিপমভিবদন্নুন্মদ ইব।।
দ্রুতং গচ্ছ দ্রস্টুং প্রিয়মিতি তদুক্তেন
ধৃততদ্ভুতজান্তর্গৌরাঙ্গো হৃদয় উদয়ন্মাং মদয়তি ।।”

এমন সময় গোপালবল্লভ ভোগ লাগলো জগন্নাথের । ভোগের পর শঙ্খ , ঘন্টা আদি সহ আরতি হল । ভোগ সরলে জগন্নাথের সেবকগণ প্রসাদ নিয়ে মহাপ্রভুর কাছে এলেন। তাঁকে প্রসাদী মালা পরিয়ে প্রসাদ হাতে দিলেন। সেই প্রসাদের আঘ্রাণ নিলেন মহাপ্রভু আর বললেন, “বহুমূল্য প্রসাদ ! এ যে সর্বোত্তম বস্তু !” এর অল্প নিয়ে তিনি জিহ্বায় দিলেন আর বাকিটা সেবক গোবিন্দ দাস আঁচলে বেঁধে নিলেন। সেই কণিকা মাত্র প্রসাদের অমৃতাস্বাদ করে প্রভুর মনে যেন চমৎকার হলো, সর্বাঙ্গে পুলক তাঁর । আর নেত্র থেকে অশ্রুধারা বইতে থাকলো। তিনি আপন মনে বিস্মিত হয়ে বললেন , “এই দ্রব্যে এত স্বাদ কোথা থেকে এলো ! ওহ্‌, এতে তো কৃষ্ণের অধরামৃত সঞ্চারিত হয়েছে ! তাই বুঝি এই বস্তু এত মধুময় হয়েছে স্বাদে !”—- এ কথা ভাবতে ভাবতেই তাঁর মধ্যে প্রেমাবেশ হলো । কিন্তু পরক্ষণেই তিনি নিজেকে সম্বরণ করে নিলেন জগন্নাথের সেবকরা তাঁর সামনে আসায় ।

মহাপ্রভু বারবার ‘সুকৃতিলভ্য ফেলামৃত’ বলতে থাকলেন। জগন্নাথের সেবক মহাপ্রভুর মুখে এই শব্দ শুনে জিজ্ঞাসা করলেন “প্রভু , সুকৃতিলভ্য ফেলামৃত মানে কি? অর্থ কি এর ?” তখন মহাপ্রভু বললেন , “এই যে তুমি আমায় কৃষ্ণের অধরামৃত দিলে ,এই বস্তু ব্রহ্মা আদি দেবতাদেরও দুর্লভ এবং অমৃতের স্বাদকেও নিন্দনীয় হতে হয় এর কাছে। শ্রীকৃষ্ণের ভুক্তাবশেষের নামই হল ফেলা । তিনি ভাগ্যবান যিনি ফেলামৃত লব মাত্র পান । সামান্য ভাগ্য যার সে এই বস্তু প্রাপ্ত হতে পারে না। যাঁর প্রতি শ্রীকৃষ্ণের পূর্ণ কৃপা তিনি তা পান। আর, তিনিই সুকৃতীবান যাঁর প্রতি শ্রীকৃষ্ণের কৃপা থাকে । অর্থাৎ সুকৃতিলভ্য ফেলামৃত মানে হল যাঁর সুকৃতি লাভ হয় অর্থাৎ শ্রীকৃষ্ণের কৃপা লাভ হয় তিনিই ফেলা রূপ অমৃত লাভ করতে পারেন ; শ্রীকৃষ্ণের অধরামৃত আস্বাদনের অধিকারী হন।”— এই বলে মহাপ্রভু সকলকে বিদায় দিলেন । তারপর জগন্নাথের উপলভোগ দর্শন করে গম্ভীরায় ফিরে এলেন।

মধ্যাহ্নকালে ভিক্ষা নির্বাহণ করলেন মহাপ্রভু । কিন্তু অন্তরে কৃষ্ণ-অধরামৃতের স্বাদ সর্বদা স্মরণ হচ্ছে তাঁর। বাইরে কর্ম করছেন অথচ অন্তরে প্রেমে গরগর মন হয়ে আছে। সেই সঘন আবেশ অত্যন্ত কষ্ট করে সম্বরণ করছেন তিনি। সন্ধ্যা বেলায় যখন পুনরায় নিজের পার্ষদগণের সাথে বসে কৃষ্ণকথা রঙ্গে নিভৃতে কাল কাটাচ্ছেন , তখন সেবক গোবিন্দ দাসকে ইঙ্গিত দিলেন দুপুরের সেই আঁচলে বেঁধে রাখা প্রসাদ এখন আনার জন্য । পুরী-ভারতী তথা তাঁর গণের সন্ন্যাসীদের জন্য কিছুটা পাঠিয়ে দেওয়া হলো , আর সেখানে উপস্থিত রামানন্দ রায় , সার্বভৌম ভট্টাচার্য , স্বরূপ দামোদর ও অন্যান্যদের সেই প্রসাদ বিতরণ করা হলো। প্রসাদের সৌরভ-মাধুর্য আস্বাদন করেই সকলে বিস্মিত হলেন । যে প্রসাদ এমন দিব্য সৌরভ সম্পন্ন , সেই প্রসাদের স্বাদ না জানি কেমন অলৌকিক হবে ! তখন মহাপ্রভু বললেন , “দ্যাখো, প্রসাদে যা যা আছে যেমন ধরো আখের গুড় , কর্পূর, মরিচ, এলাচ , লবঙ্গ,কাবাবচিনি, দারুচিনি এইগুলো সব প্রাকৃত দ্রব্য। তোমরা সকলেই এই সব প্রাকৃত দ্রব্যগুলোর স্বাদ, সুগন্ধ কেমন জানো । কিন্তু এই প্রসাদে তাহলে এত আমোদ কোথা থেকে এলো? প্রসাদের এই সৌরভ —এতো লোকাতীত ! এর আস্বাদন তাহলে কত না দিব্য ! আস্বাদ করে দেখ সকলের মনে প্রতীত হবে তাহলে। আস্বাদন তো অনেক পরের কথা , কেবল গন্ধেই মন মাতিয়ে দেয়। তাই না ! প্রসাদের এমন মাধুর্য যে আস্বাদন সময়ে আস্বাদন ব্যতীত অন্য সকল কিছু বিস্মৃত করিয়ে দেয় । কেন? কারণ , শ্রীকৃষ্ণের অধর স্পর্শ করেছে এই প্রসাদ। তাঁর অধর রসের গুণ সব সঞ্চারিত হয়েছে প্রসাদে, তাইতো অলৌকিক সুগন্ধ মাধুর্য হয়েছে এমন ! মহাভক্তি করে সকলে প্রসাদ আস্বাদ করো।”
সকলে হরিধ্বনি দিয়ে প্রসাদ আস্বাদন করলেন এবং আস্বাদন মাত্রই সকলের মন প্রেমে মত্ত হল। মহাপ্রভুর মধ্যে প্রেমাবেশ সে সময় । তিনি আজ্ঞা দিলেন রামানন্দ রায় কে শ্লোক পাঠ করতে। রামানন্দ রায় শ্রীমদ্‌ ভাগবতের শ্লোক উচ্চারণ করলেন ।

“সুরতবর্দ্ধনং শোক নাশনং , স্বরিতবেণুনা সুষ্ঠচুম্বিতম্ ।
ইতররাগবিস্মারণং নৃণাং, বিতর বীর নস্তেহধরামৃতম্ ।।”
(শ্রীমদ্ ভাগবত, ১০, ৩১, ১৪ শ্লোক)

—– শ্রীকৃষ্ণ যখন রাসমন্ডল থেকে অকস্মাৎ অন্তর্ধান হয়ে যান, শোকাকুলা গোপীরা বিলাপ করে বলছেন তখন— হে বীর ! তোমার সেই সুরতবর্ধনকারী (সম্ভোগেচ্ছা ক্রমশঃ বর্ধনকারী) অধরের সুধা যা তোমার বিরহ জনিত শোক রাশিকে নাশ করে তা আমাদেরকে বিতরণ কর । তোমার অধরের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে বেণু পঞ্চম সুরে নাদিত হয়ে মানবের সকল আসক্তি ভুলিয়ে দেয় ; সেই অধরের অমৃত আমাদের দাও।

সেই শ্লোক শ্রবণ করে রসরাজ-মহাভাবের মিলিত স্বরূপ মহাপ্রভু তখন ভাবাবিষ্ট হয়ে রাধার উৎকণ্ঠা জনিত একটি শ্লোক উচ্চারণ করলেন ।

“ব্রজাতুলকুলাঙ্গনেতর রসালি তৃষ্ণাহরঃ ,
প্রদীব্যদধরামৃতঃ সুকৃতিলভ্য ফেললাবঃ।
সুধাজিদহিবল্লিকাসুদলবীটিকাচর্বিতঃ,
স মে মদনমোহনঃ সখি তনোতি জিহ্বাস্পৃহাম্।।”
(গোবিন্দলীলামৃত, ৮, ৮শ্লোক)

—- শ্রীমতী রাধিকা তাঁর সখী বিশাখাকে বলছেন, হে সখি ! অনন্যা ব্রজকুলবতী ললনাদের যিনি অধরামৃত দ্বারা আনন্দ দান করে তাঁদের অন্য সকল রস-তৃষ্ণাকে হরণ করেন , যাঁর চর্বিত তাম্বুলে অমৃতাপেক্ষা অধিক স্বাদ—-সেই শ্রীমদনমোহন আমার জিহ্বার স্পৃহাকে বিস্তৃতি দান করেছেন।

তারপর মহাপ্রভু নিজেই দুই শ্লোকের অর্থ প্রলাপের মত উচ্চারণ করে গেলেন । সকলে শ্রবণ করে ভাবের ভিয়ানে বিহ্বল হলেন। গ্রন্থ– মহাপ্রভুর মধুময় কথা , লেখিকা —- রাধাবিনোদিনী বিন্তি বণিক, প্রকাশক–তথাগত।

Share This
Categories
প্রবন্ধ

অতীন্দ্রনাথ বসু : ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনকারী বাঙালি বিপ্লবী।

ভূমিকা—-

ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন ছিল কিছু মানুষের অব্যর্থ পরিশ্রম যার ফলেই ব্রিটিশদের থেকে ভারত রাজনৈতিক দিক থেকে মুক্তি পেয়েছে। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে এমন ই এক বাঙালি বিপ্লবী ছিলেন অতীন্দ্রনাথ বসু।

পরিবার—

অতীন্দ্রনাথ বসু ১৮৭৩ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি কলকাতার জোড়াবাগানের বসু পরিবারে জন্ম গ্রহন করেন। তার পিতার নাম অপূর্বকৃষ্ণ বসু।অতীন্দ্রনাথের পুত্র উত্তর কলকাতার নেতৃস্থানীয় অমর বসু পিতার সকল কাজে যুক্ত ছিলেন।

কুস্তি প্রতিযোগিতার আয়োজন—-

অতীন্দ্রনাথ নিজে একজন কুস্তিগীর ছিলেন। ময়মনসিংহের রাজা জগৎকিশোর আচার্য চৌধুরী ছিলেন তার শিক্ষাগুরু। সিমলা ব্যায়াম সমিতির প্রাঙ্গনে ভারতীয় প্রথায় কুস্তি প্রতিযোগিতার আয়োজন তিনিই প্রথম করেছিলেন।

স্বদেশী মেলার আয়োজন—-

অতীন্দ্রনাথ বসু যুবকদের দেহে ও মনে শক্তিমান করে তোলার উদ্দেশ্যে সিমলা ব্যায়াম সমিতি।

বিপ্লবী কর্মকান্ড—-

যুগান্তর বিপ্লবী দলের অন্যতম নেতৃস্থানীয় ছিলেন অতীন্দ্রনাথ বসু । তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামে কয়েকবার কারাবরণ করেছিলেন, পাশাপাশি তাঁকে ১৯১৬ খ্রিষ্টাব্দ থেকে পরবর্তী পাঁচবছর ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী কেন্দ্র পরিচালনার অপরাধে নির্বাসনদণ্ড ভোগ করতে হয়।১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দে ইংরেজ সরকার সিমলা ব্যায়াম সমিতিকে শরীরচর্চার আড়ালে বিপ্লবী তৈরির আখড়া সন্দেহ করে এটিকে বেআইনি বলে ঘোষণা করে। নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু, দেশপ্রিয় যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত, ডাঃ জে. এম. দাশগুপ্ত প্রভৃতি নেতৃবর্গ সিমলা ব্যায়াম সমিতির কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

বিদ্যালয় স্থাপন—

তিনি রবীন্দ্রনাথের পরামর্শে ‘মহেশালয়’ নামের একটি বিদ্যালয় স্থাপনা করেছিলেন। ১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দে তিনি ‘ভারত ভান্ডার’ নামের একটি সংস্থা তৈরি করেন।

অতীন্দ্রনাথ যুবকদের দেহে ও মনে শক্তিমান করে তোলার উদ্দেশ্যে ১৯২৬ খ্রিষ্টাব্দের ২রা এপ্রিল সিমলা ব্যায়াম সমিতি প্রতিষ্ঠা করেন।

দুর্গা পূজা ও স্বদেশী মেলার আয়োজন—

১৯২৫ খ্রিষ্টাব্দে তিনি সার্বজনীন দুর্গা পূজার প্রচলন করেন যাতে দেশের মানুষ বিভেদ ভুলে একত্রে উৎসবে মেতে উঠতে পারে। এই পূজা প্রাঙ্গনে স্বদেশী মেলারও আয়োজন হত। অতীন্দ্রনাথ যুবকদের দেহে ও মনে শক্তিমান করে তোলার উদ্দেশ্যে ১৯২৬ খ্রিষ্টাব্দের ২রা এপ্রিল সিমলা ব্যায়াম সমিতি প্রতিষ্ঠা করেন।

মৃত্যু—

মহান এই বিপ্লবী ১৯৬৫ সালের ১০ জুন মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু আজও তিনি স্মরনীয় হয়ে রয়েছেন তাঁর কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে।

।।তথ্য : সংগৃহীত উইকিপিডিয়া ও ইন্টারনেট।।

 

 

 

 

Share This
Categories
প্রবন্ধ রিভিউ

আজ বিশ্ব শিশু শ্রমিক বিরোধী দিবস, জানুন পালনের গুরুত্ব ও তাৎপর্য।

শিশু শ্রমের বিরুদ্ধে বিশ্ব দিবস হল একটি আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO)-এর অনুমোদিত ছুটির দিন যা ২০০২ সালে প্রথম চালু হয়েছিল যার লক্ষ্য শিশুশ্রম প্রতিরোধে সচেতনতা ও সক্রিয়তা বৃদ্ধি করা।  এটি কর্মসংস্থানের জন্য ন্যূনতম বয়সের উপর আইএলও কনভেনশন নং ১৩৮ এবং শিশু শ্রমের সবচেয়ে খারাপ ফর্মগুলির উপর আইএলও কনভেনশন নং ১৮২ এর অনুমোদনের দ্বারা উত্সাহিত হয়েছিল৷

শিশু শ্রমের বিরুদ্ধে বিশ্ব দিবস, যা প্রতি বছর ১২ জুন অনুষ্ঠিত হয়, এর উদ্দেশ্য হল শিশুশ্রমের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী আন্দোলনকে উৎসাহিত করা। দিনটির লক্ষ্য শিশু শ্রমিকদের (child labourers) শোষণের বিরুদ্ধে সচেতনতা বৃদ্ধি করা।

এ বছর দিবসটির বৈশ্বিক প্রতিপাদ্য ‘সবার জন্য সামাজিক ন্যায়বিচার: শিশু শ্রমের অবসান ঘটান’। দিনটি সামনে রেখে বিশ্বব্যাপী শিশু ও শ্রমিকদের বিভিন্ন সংগঠন নানা কর্মসূচি পালন করছে।

পটভূমি–

 

বছরের পর বছর ধরে শিশু শ্রমিকের সংখ্যা ক্রমশ বেড়েই চলেছে। গোটা বিশ্বজুড়ে এটি একটা বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন অনেক শিশু রয়েছে যারা নিজের এবং পরিবারের জীবিকা নির্বাহের জন্য রেস্তোঁরা, ধাবা, বিভিন্ন দোকানে কাজ করে। অনেকে আবার কারুর বাড়িতেও কাজ করে। ফলে, কাজের লোভ দেখিয়ে কেউ কেউ তাদের মাদক চোরাচালান, পতিতাবৃত্তি ও পাচারের মতো কিছু অবৈধ কার্যকলাপে বাধ্য করে।

শিশু শ্রমের বিরুদ্ধে বিশ্ব দিবসটি প্রথম ২০০২ সালে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) দ্বারা শিশুশ্রমের ইস্যুতে ক্রমাগত মনোযোগ আকর্ষণ করার জন্য এবং শিশুশ্রম নির্মূল করার জন্য আমাদের কৌশলগুলিকে সংশোধন ও পুনর্বিবেচনা করার জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।  ২০০২ সাল থেকে এটি ১৯ বছর হয়ে গেছে, এবং প্রতি বছর ১২ জুন শিশু শ্রমের বিরুদ্ধে বিশ্ব দিবস পালন করা হয়।  জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ শিশুশ্রমের মাত্রা স্বীকার করে সর্বসম্মতিক্রমে ২০২১ সালকে শিশু শ্রম নির্মূলের আন্তর্জাতিক বছর হিসেবে ঘোষণা করে একটি প্রস্তাব গৃহীত করেছে এবং আইএলওকে এর বাস্তবায়নে নেতৃত্ব দিতে বলেছে।  এই দিনটি সরকার, স্থানীয় কর্তৃপক্ষ, সুশীল সমাজ এবং আন্তর্জাতিক, শ্রমিক এবং নিয়োগকর্তা সংস্থাগুলিকে একত্রিত করে শিশু শ্রম সমস্যাটি নির্দেশ করে এবং শিশু শ্রমিকদের সহায়তা করার জন্য নির্দেশিকা সংজ্ঞায়িত করে।
আইএলও-এর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী লক্ষ লক্ষ মেয়ে এবং ছেলেরা এমন কাজের সাথে জড়িত যা তাদের পর্যাপ্ত শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাশ এবং মৌলিক স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করে, এইভাবে তাদের অধিকার লঙ্ঘন করে।  এই শিশুদের মধ্যে, অর্ধেকেরও বেশি শিশু শ্রমের সবচেয়ে খারাপ রূপের সংস্পর্শে এসেছে।  শিশুশ্রমের এই নিকৃষ্টতম রূপগুলির মধ্যে রয়েছে বিপজ্জনক পরিবেশে কাজ করা, দাসত্ব, বা অন্যান্য ধরনের জোরপূর্বক শ্রম, মাদক পাচার ও পতিতাবৃত্তির মতো অবৈধ কার্যকলাপ, সেইসাথে সশস্ত্র সংঘাতে জড়িত থাকা।

তাৎপর্য—

 

কোনও শিশুকে শিশুশ্রমিকের পর্যায়ে তখনই ফেলা হয় যখন তাদের কাজ করার বয়স না হওয়া সত্ত্বেও কাজ করানো হয় বা কোনও অস্বাস্থ্যকর কাজে তাঁদের নিয়োগ করা হয় যা তাঁদের শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি করে এমনকী পড়াশোনা ও শিক্ষারও ক্ষতি করে। শিশুশ্রমের বিরুদ্ধে বিশ্ব দিবসের তাৎপর্য হল শিশুশ্রমের সমস্যার প্রতি মনোযোগ দেওয়া এবং এটি নির্মূলের উপায় খুঁজে বের করা। বিশ্বজুড়ে নানা মনুষ্যসৃষ্ট ও প্রাকৃতিক বিপর্যয় শিশুদের কায়িক শ্রমের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। পাশাপাশি শিশুশ্রমের কুফল সম্পর্কে অসচেতনতায় দিনদিন শিশুশ্রম বাড়ছে। তাই সারা বিশ্বে শিশুশ্রমে বাধ্য করা শিশুদের ক্ষতিকারক মানসিক এবং শারীরিক সমস্যা সম্পর্কে সচেতনতা ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য দিবসটি ব্যবহার করা হয়। তাই শিশুশ্রমের খারাপ প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে প্রতিবছর ১২ জুন ‘বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস’ পালন করা হয়।

।। তথ্য : সংগৃহীত উইকিপিডিয়া ও বিভিন্ন ওয়েবসাইট ।।

Share This
Categories
প্রবন্ধ রিভিউ

শিশু শ্রমিক স্বাধীন ভারতে এক কলঙ্ক : প্রশান্ত কুমার দাস।

আমরা সবাই জানি শিশুই হচ্ছে যেকোনো জাতির ভবিষ্যৎ। আজকের শিশু আগামী দিনের নাগরিক, যার হাতে থাকবে দেশগড়ার কাজ। তাই শিশু গাছকে যেমন উপযুক্ত করে গড়ে তুলতে হয়, তেমনি মানবশিশুকেও উপযুক্ত ভাবে গড়ে তোলাই আমাদের অন্যতম কর্তব্য। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে তার উল্টো। অত্যন্ত দুঃখ ও অনুতাপের বিষয় যে –“কাঁদে কোটি মার কোলে অন্নহীন ভগবান।“ ১৩৫ কোটি মানুষের বাস ভারতে। প্রতি মুহূর্তে ভারতে শিশু জন্মাচ্ছে। কিন্তু সব শিশু কী বাঁচবার মতো খাদ্য,বস্ত্র, বাসস্থান ও শিক্ষা পাচ্ছে?
স্বাধীনতা প্রাপ্তির ৭৪ বছর পরেও অনেক নবজাতকের চোখের সামনে কোনো আলো নেই, আছে শুধু জমাট অন্ধকার-তাদের জীবন দুঃস্বপ্নে ঘেরা ,দুঃখবেদনায় ভরা। নবজাতকেরা অসহায় দৃষ্টি নিয়ে দেশের মানুষের কাছে একটু স্নেহ ভালোবাসা,মমতা অকাঙ্খা করে। সেই সঙ্গে তাদের একটু খানি চাওয়া –শুধু দুবেলা দু-মুঠো অন্ন, থাকবার মতো একটু বাসস্থান,আর পরিধান করার মতো বস্ত্র।
কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি ,শিশু একটু বড় হতে না হতেই তাকে মায়ের কোল ছেড়ে যেতে হচ্ছে কাজের সন্ধানে। যে বয়সে শিশুদের হাতে খেলনা,বইপত্র,কাগজকলম থাকবার কথা,সেই বয়সে শিশুর হাতে থাকছে হাতুড়ি কাস্তে আর কাজের বোঝা।কারণ তারা যে শিশুশ্রমিক।শ্রম দান করেই তাদের অন্ন বস্ত্রের ব্যবস্থা করতে হবে-এর চেয়ে কলঙ্কের জিনিস কি হতে পারে! ঐ অতি অল্প বয়সে কঠোর কাজের চাপে ভগ্নপ্রায় শরীর নিয়ে অল্প দিনের মধ্যেই অনেক শিশুর জীবন দীপ নিভে যাচ্ছে। যার খবর আমরা কেউ জানতে পারি না ।
আমরা প্রতি বছর আড়ম্বর করে “শিশু শ্রমিক বিরোধী দিবস ” পালন করি 12ই জুন তারিখে। আন্তর্জাতিক হিসাবে প্রতি বছর আমরা ঐ 12ই জুন দিনটিকে পালন করে শিশুদের কল্যানের জন্য নানাপ্রকারের গালভরা বক্তৃতা দিয়ে থাকি ।সেই দিন হয়তো বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবক সংস্থা কিছু শিশুকে ভালো ভালো পোষাক ও খাবার দিয়ে সন্তুষ্ট করে। মনে হয় আমরা যেন শিশুদের কতই না ভালোবাসি!
শোনা যায়, বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থা (WHO) দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশের শিশুদের কল্যাণের জন্য প্রচুর টাকা বরাদ্দ করে। কিন্তু সেই টাকাগুলোই বা কোথায় যায়? সেই বরাদ্দ টাকা কতটুকু শিশুদের ভাগ্যে জোটে ? উত্তর হল না । দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে শিশু শ্রমিক নিয়োগের বিরুদ্ধে আইন তৈরী হয়েছে। আছে শিশু অধিকার সুরক্ষা আয়োগ, শ্রম দফতর । কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে লক্ষ লক্ষ শিশু স্কুলে না গিয়ে চলে যাচ্ছে চায়ের দোকানে ,রেস্তোরায়,পাথর খাদানে,বাজির দোকানে ,মুদির দোকানে হোটেলে, ইটের ভাটিতে ,সিমেন্ট কারখানা, দেশলাই কারখানায় সেখানে তারা অল্প বেতনে সারাদিন কাজ করে চলেছে। নিষ্ঠুর হৃদয় মালিকেরা তাদের অল্প বেতন দিয়ে সারাদিন পরিশ্রম করাচ্ছে । এই শিশু শ্রমিক ঠিক মতো কাজ না করলে তাদের কাজ থেকে ছাটাই করছে। এদের কর্মে নিয়োগের সময় মালিকের কোনো দায়-দায়িত্ব থাকে না। কোনো শর্ত নাই, তাই কোনো কারনে এদের মৃত্যু হলে বা হাত-পা ভাঙ্গলে তাদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কোনো দায়বদ্ধতা নেই । এমনকি তাদের কোনো কৈফিয়েৎ দিতেও হয় না । তাই যতক্ষণ হাত-পা চলবে, ততক্ষণ কাজ না চললেই বাদ , তাড়িয়ে দাও । শহর এমনকি গ্রামাঞ্চলে খুব স্বাভাবিক দৃশ্য অনেক ছোট ছোট ছেলে মেয়ে গৃহস্ত বাড়িতে চাকর বা চাকরানীর কাজ করে অল্প বেতনে। অভাবের সংসারে ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের মাঠে কাজ করতে যেতে হয়, গরু চড়াতে হয়। আরও বেদনা দায়ক ঘটনা হচ্ছে যে,এই সব ছেলে মেয়েরা দুটো পয়সা রোজগারের আশায় আস্তাকুঁড় বা আবর্জনা ঘেঁটে বেড়ায়-দুটো প্লাস্টিক জিনিস বা বোতল,ছেঁড়া জুতো,লোহার টুকরো,ভাঙ্গা বালতি সংগ্রহ করে এবং দিন শেষে অল্প কিছু টাকা পয়সা রোজগার করে। কী সৌভাগ্য এই সমস্ত অল্পবয়স্ক ছেলে মেয়ের ! বর্তমান ভারতবর্ষে বিভিন্ন সংগঠিত ও অসংগঠিত ক্ষেত্রে ৮/১০ কোটি শিশুশ্রমিক কর্মরত। শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গেই সরকারি হিসাবে ৮/৯ লক্ষ শিশুশ্রমিক কাজ করছে। এই সমস্ত শিশুশ্রমিক বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ কর্ম করে যাচ্ছে। বোমাবাজির কারখানায় কত শিশুর প্রাণ যাচ্ছে তার হিসাব নাই। কয়েক বছর আগে বাগনানে একটা বাজির কারখানায় বিস্ফোরন হয়েছিল এবং তাতে একাধিক শিশুশ্রমিকের প্রাণ যায়। এদের প্রাণের যেন কোনো মূল্য নাই।
ইতিপূর্বে ভারত সরকার ২০০০ সালের মধ্যে শিশুশ্রমিক প্রথা সম্পূর্ণ তুলে দেওয়া হবে বলে ঘোষণা করেছিল। কিন্তু আজ ২০২১ সালেও শিশুশ্রমিক প্রথা যথারীতি একই চলছে । দেশের সরকার শিশুশ্রমিক নিয়োগ করা বেআইনি বলে ঘোষণা করেছিল। সুপ্রিমকোর্টে ১৯৮৬ সালে আদেশ দিয়েছিল যে, শিশুশ্রমিক সম্পর্কিত আইন লঙ্ঘিত হলে প্রতি শিশুশ্রমিকের জন্য মালিককে ২০ হাজার টাকা দিতে হবে।সেই টাকা “শিশুশ্রমিক পুনর্বাসন ও কল্যান তহবিলে “ জমা দিতে হবে। তাছাড়া এই সব অসহায় শিশুশ্রমিকের সম্পূর্ণ দায়িত্ব নিতে হবে রাজ্য সরকারগুলিকেই । সরকার শিশুশ্রমিকদের জন্য একটা Action Plan গ্রহণ করছে । এতে শিশুশ্রমিকদের ২ ঘণ্টা লেখা পড়া শিখানোর জন্য সরকারকে অর্থ ব্যয় করতে হবে। কিন্তু এই সব আইন থাকা সত্ত্বেও মালিকপক্ষ আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে শিশুদের নানাপ্রকার বিপজ্জনক ও ঝুঁকিপূর্ণ কার্যে নিযুক্ত করছে। পুলিশ-প্রশাসন এর বিরুদ্ধে কোনো কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে বলে শোনা যায় না।
ইতিমধ্যে কেন্দ্রীয় সরকার শ্রমমন্ত্রির সভাপতিত্বে ‘The Nation Authority to the alimination of Child-labour’ নামে একটা সংস্থা গড়ে তুলেছে। এই সংস্থাটি হয়তো মহৎ উদ্দেশ্য নিয়েই গঠিত হয়েছে। এখানে বলা হয়েছে –কোনো ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় শিশুশ্রমিক নিয়োগ বন্ধ করার নীতি প্রণয়ন করা, শিশুশ্রমিকদের বৃত্তিমূলক ও অর্থকরী শিক্ষাদানের সঙ্গে উপযুক্ত আহারের সংস্থান করা ,শিশুদের দরিদ্র পিতা মাতাদের আর্থিক উপার্জনে সহায়তা দেওয়া ও নতুন করে শিশুশ্রমিক সৃষ্টির সম্ভাবনা দূর করা ইত্যাদি এই সংস্থার কাজ। এমনকি দেশের শিক্ষার অধিকার আইনে ৬ থেকে ১৪ বছর বয়সি শিশুদের বিনামূল্যে এবং আবশ্যিক ভাবে স্কুলে পাঠানোর ব্যবস্থাপনার কথা বলা আছে।
আবার এর সাথে নতুন আইন তৈরি হয়েছে যদি সেই সরকারি আদেশ না মানে বা অগ্রাহ্য করে তবে সেই মালিককে ১০ থেকে ২০হাজার টাকা জরিমানা এবং সেই সাথে তিন মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত কারাবাসের আইন করা হয়েছে।
এই সমস্ত সরকারি নির্দেশ ও কঠোর আইন কানুন থাকলেও মালিকশ্রেনী বুড়ো আঙুল দেখিয়ে শিশুশ্রমিক নিয়োগ করে চলেছে, কারন তারা জানে এই সব শ্রমিককে অল্প বেতন দিয়ে বেশি কাজ করিয়ে অনেক বেশি লাভ ।সকলেই জানে যে এটা একটা অমানবিক কাজ কিন্তু এখনও শিশুশ্রমিক নিয়োগ বন্ধ করা অলীক স্বপ্ন মাত্র।
আমার মনে হয় ,শিশুশ্রমিক প্রথা বন্ধ করতে হলে কয়েকটি বিষয়ের উপর নজর দিতে হবে। যে সব শিশু অর্থের জন্য চায়ের দোকানে বা কারখানায় যায় তাদের পিতামাতাকে আর্থিক সহায়তা দিতে হবে, যাতে তারা তাদের সংসার চালাবার জন্য নিজের ছেলেমেয়েদের পরের বাড়িতে বা কারখানায় না পাঠায় ।দ্বিতীয়ত,দরিদ্র পরিবারের ছেলেমেয়েরা যাতে বিদ্যালয়ে পড়তে যেতে আগ্রহী হয় তার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা সরকারকের সাথে সাথে সমস্ত শিক্ষিত সমাজকে এগিয়ে আসতে হবে। তৃতীয়তঃ শিশুশ্রমিক নিয়োগের বিরুদ্ধে যে সব আইন তৈরী হয়েছে সেগুলোকে কঠোর ভাবে প্রয়োগ করতে হবে। সর্বোপরি মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরী করতে হবে, মালিক শ্রেণীকে বোঝাতে হবে যে, এভাবে শিশুশ্রমিক নিয়োগ করে শিশুদের জীবন নষ্ট করবেন না। এটা একটা অমানবিক কাজ । আর ছেলে মেয়েদের পিতামাতাকে বুঝতে হবে যে, এভাবে অল্প কিছু টাকা আয় করার জন্য নিজেদের ছেলেমেয়েদের অন্য কোথাও কাজ করতে পাঠাবেন না। এই সমস্ত বিষয়ে নজর রাখলে আশা করা যায় ধীরে ধীরে শিশুশ্রম প্রথা দূর হবে এবং সমাজের একটা কলঙ্ক মোচন করা সম্ভব হবে।
একদা জাতির জনক মহাত্মাগান্ধী খুব দুঃখের সঙ্গে বলেছিলেন- “শিশুকে অর্থের বিনিময়ে শ্রম করানোর চেয়ে বড় আভিশাপ আর কিছুই হতে পারে না।“ চরম পরিতাপের বিষয় এটাই যে গান্ধীজীর জন্মের দেড়শত বছরে তাঁর জন্মজয়ন্তী আমরা সাড়ম্বরে গোটা দেশ জুড়ে পালন করছি, অথচ তার কথা মত কাজ করছি না।

Share This
Categories
প্রবন্ধ

জানুন, বজ্রবিদ্যুৎ মাথায় নিয়েও কেমন করে প্রাণকৃষ্ণ বাবা ভাগবত কথা বলতে থাকলেন : রাধাবিনোদিনী বিন্তি বণিক।

শ্রীপ্রাণকৃষ্ণ  দাস বাবাজী মহারাজ প্রভুপাদ প্রাণগোপাল গোস্বামীর শিষ্য। ত্রিপুরা জেলার ভবানীপুর গ্রামে দেবশর্মা বংশে জন্মগ্রহণ করেন প্রাণকৃষ্ণ দাস বাবাজী। পিতার নাম দীননাথ ও মাতা রেবতীদেবী। বৈশাখ মাসে শুভ পূর্ণিমা তিথিতে আবির্ভূত হন তিনি। বিদ‍্যাধ্যয়নেও গভীর মনোযোগী ছাত্র ছিলেন । অকস্মাৎ মাতৃবিয়োগ হয় কিশোর বয়সে। পিতার বাৎসল‍্যে বড় হতে থাকেন।
দৈবেচ্ছায় একদিন স্বপ্নে গিরীধারীর দর্শন পেলেন। আর তবে থেকেই মনের সুপ্ত ভজন সংস্কারের উদ্গম হল। মন সর্বক্ষণ উচাটন থাকে কতদিনে সাক্ষাৎভাবে সেই নয়নাভিরাম ব্রজেন্দ্রনন্দনের দর্শন পাবেন এই ভাবাবেগে। বিধি কৃপাময় হলেন। দর্শন পেলেন তিনি প্রভুপাদ প্রাণগোপাল গোস্বামীপাদের। দর্শন মাত্র আত্মসমর্পণ করে দিলেন প্রভুপাদের পদারবিন্দে। মনে হল এই তো সেই ঈপ্সিত ধন, যাঁর জন্য এত ব‍্যাকুলভাবে অপেক্ষা করছিলেন এতকাল। তাঁর অস্থির মন সুস্থির হল। মন বলতে থাকলো, এই তো সেই যোগ্য কান্ডারী, যিনি তাঁকে অনায়াসে ভবনদী পার করে গিরিধারীর নিত‍্যদেশে নিয়ে যাবেন।
সেসময় প্রভুপাদ প্রাণগোপাল গোস্বামী নদীতে স্নান করছিলেন। আর প্রাণকৃষ্ণ বাবা খেয়া-পারাপার করে এপারে আসছিলেন। তিনি নৌকা থেকেই দেখলেন স্নানরত প্রভুপাদকে। নৌকা থেকে নেমে অপেক্ষা করতে থাকলেন কতক্ষণে প্রভুপাদ স্নান করে নদী থেকে উঠে আসবেন। যে মুহুর্তে তিনি সিক্ত বদনে উঠে এসেছেন প্রাণকৃষ্ণ বাবা লুটিয়ে পড়লেন তাঁর চরণে। কিশোর প্রাণকৃষ্ণের লাবণ্যময় অঙ্গ, শান্ত ভাব, অপরূপ কান্তি, তেজোময় দীপ্তি দেখে মন ভরে গেল প্রভুপাদের। তিনি নাম, পরিচয়, দেশ, কী কারণে আগমন সব একে একে ধীরে ধীরে জানলেন। সঙ্গে করে নিয়ে এলেন নিজের আলয়ে। তাঁর মাতা তথা শ্রীগুরুদেবী সারদা সুন্দরী দেবীর কাছে অর্পণ করলেন। বড়মাতাও প্রাণকৃষ্ণের ভাব দেখে প্রসন্ন হলেন তাঁর প্রতি। প্রভুপাদের গৃহেতেই প্রাণকৃষ্ণ থাকতে লাগলেন। প্রাণকৃষ্ণ বাবা নিজের অভিলাষের কথা ইতিমধ্যেই ব্যক্ত করেছেন। অর্থাৎ, তিনি যে প্রাণগোপাল প্রভুর পদাশ্রয় করে ভজন পরায়ণ হতে চান তা জানিয়েছেন। নিবেদন করেছেন দীক্ষা প্রদানের জন্য। বড় মাতা সারদা সুন্দরী দেবীর সন্তান যেমন প্রভুপাদ, তেমন শিষ্যও আবার।তাই বড়মাতা সব শুনে হাসলেন।

 

বড় মাতা একদিন প্রাণগোপাল প্রভুপাদকে আদেশ করলেন দীক্ষা অর্পণ করতে প্রাণকৃষ্ণ বাবাকে। তিনি বললেন, “প্রাণগোপাল, তুমি প্রাণকৃষ্ণকে দীক্ষা দাও। আমি ওর মধ্যে মহাজনসুলভ চিহ্ন দেখতে পেরেছি। সদা অনুরাগী ভক্ত সে। সেবা অভিলাষী। ভোগে বিন্দুমাত্র আশা নেই। বৈরাগ্য ভাব ওর। আমার বিশ্বাস এ তোমার উপযুক্ত শিষ্য হবে। তোমার মুখোজ্জ্বল করবে একদিন। তুমি একে অঙ্গীকার করে নাও।”
মাতার আদেশ পেয়ে হৃষ্টমনে এক শুভদিনে যুগলমন্ত্রে দীক্ষা দিলেন প্রাণগোপাল প্রভু প্রাণকৃষ্ণ  বাবাকে। তিনি আত্মসাৎ করে নিলেন তাঁকে। আর প্রাণকৃষ্ণ বাবা তো প্রথম দিনই দর্শন মাত্র আত্মসমর্পণ করেছিলেন, এখন দীক্ষা মন্ত্র পাবার পর বাহ‍্যজ্ঞানশূন্য হয়ে কায়মনোবচনে সেবা শুরু করলেন সর্বভাবে দ্বিধাহীন চিত্তে। তাঁর নিষ্ঠাভক্তি দেখে বড় মাতা সারদা সুন্দরী দেবীও শক্তি সঞ্চার করে দিলেন আপন প্রশিষ্যকে। আর প্রভুপাদ প্রাণগোপালের তো কথাই নেই। তিনি সর্বশক্তি উজাড় করে দিলেন প্রিয় শিষ্য প্রাণকৃষ্ণকে। তাঁর কাছে থেকেই নিত্য, বাদ্য, গীত শিক্ষা করলেন প্রাণকৃষ্ণ বাবা। প্রভুপাদের কাছে ভক্তিগ্রন্থ অধ্যয়ন করে পাণ্ডিত্য অর্জন করলেন। মহানন্দে ভজন করতে থেকে ভজনানন্দী হলেন।
এমন করে বহুকাল কাটলো। তারপর একসময় প্রাণগোপাল প্রভুর থেকে আদেশ পেয়ে নবদ্বীপ ধাম ভ্রমণ করে তীর্থ পর্যটনে বের হলেন প্রাণকৃষ্ণ বাবা। নানা তীর্থ দর্শন করে, উপনীত হলেন বৃন্দাবনে রাধাকুণ্ডতটে। সেখানে তখন ভজন করতেন সিদ্ধ বাবা গৌরকিশোর মহারাজ। তিনি কোন শিষ্য করতেন না। সদা নিগূঢ় ভজনানন্দী মহাত্মা। তাঁর গুণগাথা ভক্ত মুখে শ্রবণ করে একদিন তাঁর চরণ দর্শন করতে এলেন প্রাণকৃষ্ণ বাবা। তাঁকে দর্শন করে, নিত্য সঙ্গ-সান্নিধ্য লাভ করে এত অনুপ্রাণিত হলেন যে, তিনি গৌরকিশোর বাবার কাছে বেশাশ্রয় ভিক্ষা করলেন। নিত্য তাঁর নিষ্ঠাভরা সেবায় গৌরকিশোর  বাবার চিত্ত ততদিনে করুণায় সম্পৃক্ত হয়ে গেছে তাঁর প্রতি। কিন্তু, তিনি যেহেতু শিষ্য করেন না তাই প্রথমে সম্মত হননি। অবশেষে প্রাণকৃষ্ণ বাবার নিষ্ঠা, কাকুতি-মিনতি, আর্তির কাছে বশীভূত হলেন।

 

প্রাণকৃষ্ণ বাবার দু’নয়ন দিয়ে অবিরাম প্রেমাশ্রু ঝড়তো। সুখ-দুঃখ বলে কোন ব্যাপার ছিল না। সদা-সর্বদা গৌরনাম নিতেন। অনন‍্য রতি তাঁর ছিল শ্রীগৌরাঙ্গের পদে। তাঁর অনুরাগ দেখে  ভেকপ্রদানে আর অরাজী থাকতে পারলেন না গৌরকিশোর বাবা। তিনি ভেকপ্রদান করলেন প্রাণকৃষ্ণ বাবাকে। ভেকাশ্রয়ী  হয়ে প্রাণকৃষ্ণ বাবার প্রেমানুরাগ আরও বহুলাংশে বৃদ্ধি পেল। গৌরকিশোর বাবার কৃপা শক্তিতে না জানি কী বল পেলেন ভজনে তিনি, কখনো হাসেন, কখনো কাঁদেন, অদ্ভুত প্রেম প্রকাশ পেল তাঁর মধ্যে। অনুক্ষণ বাবা মহারাজের সেবায় তিনি নিমজ্জিত থাকেন । বাবা মহারাজও মহা প্রসন্ন হন এহেন প্রেমানুরাগী, নিষ্ঠাবান, সেবাপরায়ণ শিষ্য পেয়ে।
অবশেষে একদিন গৌরকিশোর বাবার থেকে অনুমতি নিয়ে মহা উদাসীন প্রাণকৃষ্ণ বাবা তীর্থ পযর্টনে যাত্রা করলেন। করঙ্গ-কৌপীন, ছেড়া কাঁথা সঙ্গে নিয়ে, ছিন্নবাস পরিধান করে প্রাণকৃষ্ণ বাবা ভ্রমণ করতে থাকলেন। যেখানে সেখানে রাত কাটান, কখনো ভক্ষণ, কখনো উপবাসে থাকেন, কখনো নৃত‍্য-গীত করেন, কখনো বা হুঙ্কার পারেন, কভু দ্রুত পদচারণা,  তো কখনো অতি ধীরে যাত্রা। প্রেমেতে সদা তাঁর টলমল দশা, ভাবাবেশে বিহ্বল তিনি। এভাবে নানা তীর্থ ভ্রমণ করে এবার উদ্দেশ্য দ্বারকায় গমন। কত নদী, কত পাহাড় অতিক্রম করে, কত জনপদ পিছু রেখে অবশেষে শ্রীমতীর ইচ্ছায় তিনি পথভ্রষ্ট হলেন। দ্বারকার পরিবর্তে উপনীত হলেন মরুভূমির দেশে। তাঁর সঙ্গে আরও তিনজন ছিলেন। বহু পরিশ্রমে মরুভূমি অতিক্রম করে সিন্ধুর দর্শন পেলেন। দু’জন তো ক্লান্ত হয়ে ফিরে গেলেন। কিন্তু প্রাণকৃষ্ণ বাবা প্রেমাবেশে চলতে চলতে সেই দুর্লঙ্ঘ্য পথের যাত্রায় থেকে গেলেন। তৃষ্ণায় আকুল হয় প্রাণ। জলের দেখা কোথাও পাবার সম্ভাবনা নেই। কিন্তু, রাধারাণীর কৃপায়, অবশেষে জলের সন্ধান পেলেন সেই মহা মরুভূমিতেও। বাবা এক খেজুর বৃক্ষের যৎসামান্য ছায়ায় বসে যখন ক্লান্ত-অবসন্ন দেহে ভাবছেন যে এবার বুঝি প্রাণ চলে যাবে জলতেষ্টায়, তখন দেখেন অদূরে কিছু ভাটপত্র পড়ে আছে। তিনি সেই ভাটপত্রের কাছে কী মনে হতে গেলেন। আর ভাটপত্রের কাছে যেতেই দেখেন সেটি আসলে এক জলকুন্ড। সুশীতল  বারিতে পরিপূর্ণ সেই কুন্ড। কুন্ডের বারিতে স্নান-পান করে তখন তাঁর জীবনরক্ষা হল শ্রীমতীর কৃপায়। দেহের ক্লান্তি দূরীভূত হলে আবার যাত্রা শুরু করলেন শ্রীগৌরচরণ স্মরণ করে। গৌরনাম করেন, গৌরপদ ধ্যান করেন আর পদব্রজে চলতে থাকেন।
চলতে চলতে তিন দিন অতিক্রান্ত হল আরও। উপবাসে অনাহারে আছেন। পেলেন এক মহাবন পথে। সেই দুর্গম বনপথে চলে চলেছেন। হঠাৎ দেখলেন সুবিশাল বৃক্ষের তলায় এক মহাযোগী বসে আছেন। অতি দীর্ঘ জটা তাঁর, অপরূপ অঙ্গকান্তি, বিপিন ঝলক বপু থেকে, দর্শনেই মন-প্রাণ হরণ হয়ে যায়। আশ্চর্য হলেন প্রাণকৃষ্ণ বাবা তাঁকে দেখে। অমন দুর্গম বনে একাসনে বসে সাধনা করে চলেছেন দিবারাত্র ! তিনি প্রণত হলেন, স্তব-স্তুতি করে সেখানে করজোড়ে দাঁড়িয়ে থেকে যোগী বাবার ধ্যান ভাঙ্গার অপেক্ষা করতে থাকলেন। এক সময় চোখ খুললেন যোগী বাবা। তিনি বললেন, “এই গভীর বনে তো কোন মানুষ আসে না, ঢোকে না।  তুমি কী ভাবে এলে?” প্রাণকৃষ্ণ বাবা বললেন আমি তীর্থ দর্শন করতে বেরিয়ে ভ্রমণ করতে করতে এখানে এসে পড়েছি। জানি না এ স্থান কোথায়, কী নাম! যোগীবর বললেন, “আমি এখানেই বারো বছর ধরে সাধনা করছি। এই প্রথম কোন মানুষের দেখা পেলাম। আচ্ছা, তুমি ক্ষিদেতে কষ্ট পাচ্ছ তো! যাও, ওখানে এক কূপ আছে , স্নান করে আসো।”
প্রাণকৃষ্ণ বাবা যোগীবরের  কথা মতন স্নান করে এলেন। যোগীবর ধ্যান করে এক কামধেনু আনালেন। কামধেনুর বাটের তলায় পাত্র পেতে দিতে আপনা থেকে সে পাত্র দুগ্ধপূর্ণ হয়ে গেল।যোগীবর সে পাত্র অর্পণ করলেন প্রাণকৃষ্ণ বাবাকে। বাবা পান করতেই দেহের সব ক্লান্তি দূর  হয়ে গিয়ে মহাবল ফিরে পেলেন যেন । তবে পানের আগে যোগীবরকেও সেধেছিলেন তিনি।তখন যোগীবর জানান যে তিনি সন্ধ্যার সময় পান করবেন, তার আগে পান করেন না। সেদিন সারারাত কৃষ্ণকথা রসে মজলেন তাঁরা দু’জন। পরদিন প্রভাতে যোগীবর পথ বলে দিলেন। সেই পথে যাত্রা শুরু করলেন আবার প্রাণকৃষ্ণ বাবা। তিনি মহানন্দে গমন করতে করতে যখন পিছন ফিরে আবার একবার যোগীবরকে দর্শন করে নিতে গেলেন শেষবারের মতন, দেখেন কোথায় কী! সব উধাও! যোগীবর আর নেই সেই স্থানে। এমনকি সেই মহা বিশাল বটবৃক্ষও  নেই। ক্ষণিকের মধ্যে অন্তর্দ্ধান করেছে সব‌। অত্যন্ত আশ্চর্য হয়ে গেলেন প্রাণকৃষ্ণ বাবা  এ ঘটনায় ।
নানান ভাবনায় নিমজ্জিত হয়ে তিনি পথ দিয়ে যাচ্ছেন। যেতে যেতে হঠাৎ দেখেন বিশাল এক দীর্ঘ দেহের বাঘ বসে সামনে। হঠাৎ করে চোখে পড়ায় প্রথমে তিনি চমকে ওঠেন স্বাভাবিকভাবেই। কিন্তু পরমুহুর্তেই নিজেকে সামলে নিয়ে যেই না তিনি “জয় নিত্যানন্দ” বলে এক হুঙ্কার পেরেছেন, অমনি বাঘ লম্ফ দিয়ে সে স্থান ত‍্যাগ করে পালিয়েছে প্রাণভয়ে। নিতাই নামের ধ্বনির এমনই মাহাত্ম্য। নাম মহিমার প্রমাণ পেলেন প্রাণকৃষ্ণ বাবা। তিনি নামানন্দে মজে নিশ্চিন্তে আবার যাত্রা করতে থাকলেন। এবার নির্বিঘ্নে নিরাপদে এক লহমায় বনপথ অতিক্রম করে ফেললেন যেন তিনি। প্রেমভরে নাম নিতে নিতে কখন যে বনপথ পার করে ফেলেছেন বুঝতেই পারেন নি। দেখলেন অনতিদূরে এক জনবসতি।
গ্রামে পৌঁছে জানালেন, সেখানে নিকটে এক সাধু থাকেন। লোকমুখে প্রশংসা শুনে তাঁর কাছে গেলেন। তিনি সারাদিন গুহায় বসে ধ‍্যান করেন, আর সন্ধ‍্যের পর গুহা থেকে বেড়িয়ে এসে গভীর বনে প্রবেশ করে যান। সাধু কুটিয়া থেকে বেড়োতেই প্রাণকৃষ্ণ বাবা দন্ডবৎ প্রণাম করলেন। অনেক স্তব-স্তুতি করলেন। তারপর নিবেদন করলেন, “বাবা, আমাকে একটু কৃপা করুন, যাতে আমি ভজন পথে অগ্রসর হতে পারি।” সাধু বাবা বললেন, “কৃপা চাও! তবে যাও ঐ কুয়োতে ঝাঁপ দাও।” এই বলে অঙ্গুলি নির্দেশ করে পাশের একটি কুয়ো দেখিয়ে দিলেন। আর তার মুখের বাক্য শেষ হওয়া মাত্র প্রাণকৃষ্ণ বাবা গিয়ে কুয়োতে ঝাঁপ দিলেন। কুয়োর গভীর জলের মধ্যে পড়ে প্রভু যখন ছটফটাচ্ছেন, দেখলেন কুয়োর মধ্যে শূন‍্যপথে ভাসছেন সাধুবাবা। সাধুবাবা হাত বাড়িয়ে তুলে নিলেন প্রাণকৃষ্ণ বাবাকে। কুয়োর বাইরে এনে নিজের গুহার মধ্যে প্রবেশ করতে দিলেন বাবাকে। তারপর বন থেকে আনা কন্দ খেতে দিলেন। সে কন্দ খেয়ে এক অদ্ভুত ব‍্যাপার ঘটেছিল। টানা সাতদিন ক্ষুধা-তৃষ্ণা কিছু পেয়েছিল না প্রাণকৃষ্ণ বাবার। প্রেমে মত্ত ছিলেন। সেদিন সারারাত্রি কৃষ্ণকথা আলাপ করে কাটলো। প্রভাত হতে আবার বাবা যাত্রা শুরু করেন। সাধুবাবাই পথনির্দেশ করে দিয়েছিলেন এক মন্দিরের। সেই পথ ধরে যেতে যেতে একসময় দর্শন পেলেন এক বিপ্রের। প্রাণকৃষ্ণ বাবা তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন আর কতদূর গেলে মন্দির দর্শন হবে। বিপ্র বললেন, “আর বেশী দূরে নেই। আপনি ধৈর্য ধরে আর কিছু পথ গেলেই দর্শন পাবেন। আমি তো ওই মন্দিরেরই পূজারী। পূজা দিয়ে ফিরছি। নিন্ প্রসাদ খান।” এই বলে প্রাণকৃষ্ণ বাবার হাতে ধরিয়ে দিলেন একটি লাড্ডু। ভগবানের প্রসাদ পেয়ে মহানন্দিত হলেন বাবা। দিব‍্য সে প্রসাদের সুগন্ধ এমন যে মন-প্রাণ হরণ করে নেয়। নানা ভাবের স্ফূরণ হল তাঁর প্রসাদ পেতে পেতে। এরপরই তিনি পিছনে ফিরে দেখেন বিপ্র নেই আর। বিস্মিত হলেন তিনি, ভাবলেন তবে কী পেয়েও হারালাম আমার ইষ্টদেবকে!” তিনি সত্বর মন্দিরের পথে পা বাড়ালেন। কিন্তু অনেক খোঁজ করেও বিপ্রের কোন সংবাদ পেলেন না। শ্রীমন্দিরে বিগ্রহ দর্শন করে আবার যাত্রা শুরু করলেন। এভাবে তাঁর চলার পথে  নানাভাবে দয়াময় শ্রীকৃষ্ণ কৃপা করেছেন কখনো অলক্ষ্যে কখনো বা অন্য রূপ ধরে এসে।

 

চলতে চলতে প্রাণকৃষ্ণ বাবা পুনরায় ফিরে এলেন বৃন্দাবনের কুণ্ডতটে। শ্রীরাধাকুণ্ডতটে গভীর সাধনায় মগ্ন হলেন তিনি টানা পাঁচ বছর। কেবলমাত্র বৃক্ষের পত্র ভক্ষণ করে কাটিয়ে অষ্টকালীন লীলা স্মরণ করে ভজন করেছেন। পাঁচ বছর পর বৃন্দাবনের সকল মহিমাময় স্থানে কুঞ্জে-কুঞ্জে বিহার করেছেন। সকল লীলাস্থলী দর্শন করেছেন একে একে। প্রতিটি গ্রামে গেছেন যেখানে যেখানে যুগল লীলা করেছেন, আর দৈন্য ভরে প্রার্থনা করেছেন যাতে তাঁরা প্রকট হয়ে দর্শন দেন তাঁকে।
বৃন্দাবনের বন ভ্রমণ করতে করতে একসময় মিলন হল পরম রসিক কৃপাসিন্ধু মহারাজের সঙ্গে। রসিক রসিককে পেয়ে মহারসের পারাবার উথলিত হল। উভয়ে ইষ্টগোষ্ঠী করে দারুণ সুখে দিন কাটাতে থাকলেন। এদিকে প্রভুপাদ প্রাণগোপাল গোস্বামী জানতে পারলেন যে তাঁর প্রিয় শিষ্য বৃন্দাবনে ফিরে এসেছে। তিনি অবিলম্বে নিজে গিয়ে কৃপা করে দেখা দিলেন শিষ্যকে। বললেন, “প্রাণকৃষ্ণ, আর মনে দ্বিধা না রেখে আমার আজ্ঞা শিরে নিয়ে এবার তুমি বঙ্গদেশে গমন কর। জানোতো, ধন অনেক উপার্জন করার পর যদি ধনবান তাঁর ধন দীনজনকে না বিতরণ করে, তবে তা কৃপণের কর্ম হয়। তুমি প্রেমধনে ধনী হয়ে গেছো অনেক। এবার তো তোমার বিতরণ করার পালা। নিত‍্য একা একা প্রেমফল খাবে, অপরকে দেবে না, তা তো উচিৎ কর্ম হবে না ! সুধীজনেরা অন্যকে ভোজন করিয়ে নিজে সুখী হয়। কেউ আচার করে, কেউ বা প্রচার করে। তুমি আচার-প্রচার দুটোই কর এবার একসাথে। স্বয়ং শ্রীগৌরাঙ্গ আদেশ দিয়েছেন যে, নিজে খাও, অপরকে প্রেমফল বিলাও। এবার তো মহাপ্রভুর আদেশ পালন করতে হবে তোমায়।”
প্রাণকৃষ্ণ বাবা তখন বললেন, “আমি কী পারবো!”
প্রভু প্রাণগোপাল গোস্বামীপাদ বললেন, “কেন পারবে না! আমি তোমায় কৃপাশীষ করছি তুমি অতি সহজেই সকলকে প্রেমে ডোবাতে পারবে।”
শ্রীগুরুআজ্ঞা মেনে প্রাণকৃষ্ণ বাবা বঙ্গদেশে ফিরে এলেন। তিনি প্রভুপাদের সঙ্গেই নানা স্থানে বিহার করে নাম-প্রেম প্রচার করতে থাকলেন। কত পাষন্ডী, কত তার্কিক উদ্ধার হল। গৌরগুণগানে মত্ত হল লোকে। মায়া-মোহে আচ্ছন্ন কত লোক ভক্তিপথের সন্ধান পেল বাবার ভাগবত ব‍্যাখ‍্যা শ্রবণ করে, তাঁর সঙ্গে নামে মজে। বাবা নিজে কেঁদে অপরকে কাঁদালেন। নিজের শক্তিবলে বিশুদ্ধ ভক্তির সন্ধান দিয়ে ধন‍্য করলেন কত মানুষের ভজন জীবন।
অনেক বৎসর পর আবার এলেন বৃন্দাবন ধাম। শ্রীল লোকনাথ গোস্বামীর চরণ সমীপে থাকলেন। শ্রীরাধাবিনোদ দর্শন করে বশীভূত হলেন বিগ্রহের প্রেমে। এরপর গেলেন গোকুলানন্দ ঘেরায়। সেখানে ভেটনামায় ঘর নিয়ে নীলু ভক্ত ও অন‍্যান‍্য ভক্তদের সঙ্গে একসাথে বিহার করলেন। কিছুদিন কাটালেন সেখানে। এরপর এলেন গোপেশ্বর মহল্লায়। সেখানে ভক্তিকুঞ্জের প্রকাশ করলেন। সদা নাম-পাঠ-গানে ব‍্যস্ত থাকেন। অযাচিত ভাবে প্রেম প্রদান করেন স্ত্রী-পুরুষ, শূদ্র-ব্রাহ্মণ নির্বিশেষে সকলকে। তিনি পূর্ববঙ্গের যশোহর, খুলনা, নোয়াখালি, ত্রিপুরায়, পশ্চিমে নানা স্থানে প্রেমপ্রদান করেছেন। গৌরপ্রেম প্রচার করেছেন। শ্রীগুরু বলে বলীয়ান প্রাণকৃষ্ণ বাবা পুনরায় বৃন্দাবনে আসেন। পাথর পুরায় এসে ভক্তি মন্দির প্রকাশ করলেন। শ্রীমদনগোপাল বিগ্রহের সেবার প্রারম্ভ করলেন। প্রতিবছর সেখানে মহা মহোৎসব করতেন, ঝুলন যাত্রা ও অন‍্যান‍্য তিথি পালিত হত। চৌষট্টি মোহান্তের ভোগ লাগতো। কতশত বৈষ্ণবরা উপস্থিত হতেন সেসকল মহোৎসবে। পরম যত্নে বৈষ্ণব সেবা করে কৃতকৃতার্থ  হতেন প্রাণকৃষ্ণ বাবা।

 

অনেককাল পরে এলেন বঙ্গদেশের কুমারহট্টে শ্রীগৌরাঙ্গের শ্রীগুরুদেব শ্রীঈশ্বরপুরী পাদের জন্মভিটায়। সেই স্থানে তখন শ্রীমন্ মহাপ্রভুর শ্রীহস্তে খোদিত চৈতন‍্যডোবা। ‘মম জীবন প্রাণ’ বলে পুরীজীর জন্মভিটাকে স্তুতি করেছিলেন মহাপ্রভু —–একথা জেনে ব্যাকুল প্রাণে চৈতন্যডোবা দর্শন করতে এসেছিলেন প্রাণকৃষ্ণ বাবা। সেস্থানে এসে দেখেন অরণ্যে আবৃত্ত চারিপাশ, লুপ্ততীর্থ প্রায়। কীভাবে জন্মভিটার সন্ধান পাবেন! শুরু করলেন সংকীর্তন। যে স্থানে চৈতন্যডোবাটি ছিল সেই স্থানে কীর্তন কালে অন্তরে মহাপ্রভুর নির্দেশ পেলেন। প্রাণকৃষ্ণ বাবা অনুভব করলেন যে, ওই স্থানেই ছিল পুরীজীর জন্মভিটা। সেই স্থান তিনি ক্রয় করে নিলেন। আপ্রাণ চেষ্টা করে নিজ হাতে জঙ্গলাদি পরিষ্কার করে জমি সংস্কার করলেন। তারপর মন্দির স্থাপন করলেন। মন্দিরে শ্রীরাধাবিনোদসহ নিতাই-গৌর বিগ্রহ স্থাপন করলেন। প্রেম সেবার সূচনা করে শিষ্য-ভক্তদের নিয়ে উৎসব করলেন। সেবার পরিপাটি দেখে আঁখি জুড়িয়ে যায়। প্রতিবছর ফাল্গুন মাসের কৃষ্ণা তৃতীয়া দিবসে গৌর আগমন স্মরণোৎসবের আয়োজন করতেন। অত্যাদ্ভুত কীর্তন লীলা, নৃত্য-গীত যাঁরা দেখতেন, শুনতেন, অংশগ্রহণ করতেন ধন্য হয়ে যেতেন। সারা বৎসরের সকল ব্রত, তিথি মহোৎসব পালন হত শ্রীমন্দিরে নিষ্ঠা ও প্রেমসহ।
ইতিমধ্যে প্রভুপাদ প্রাণগোপাল গোস্বামী গুরুতর অসুস্থ হলেন। শিষ্য প্রাণকৃষ্ণ বাবা সবিনয়ে সে রোগ গ্রহণ করতে চাইলেন। তিনি বললেন, “প্রভু আপনি রোগে কষ্ট পাবেন, আর আমি এই রোগহীন হয়ে সুখে ঘুরে বেড়াব এ কখনোই হতে পারে না। আমি আপনার শিষ্য, তাই আপনার বোঝা বহন করার দায়িত্ব আমার। আপনি কৃপা করে অধিকার দিন।” এরপরই প্রাণগোপাল প্রভু সুস্থ হয়ে যান আর প্রাণকৃষ্ণ বাবা সেই রোগে অসুস্থ হন। তিনি সেই রোগচিহ্ন নিয়েই নাম-সংকীর্তন , পাঠ-প্রবচন, নর্তন করতেন। আর আশ্চর্যের বিষয়, যখন তিনি এসব করতেন, তখন সেই রোগের প্রকোপ তাঁর দেহে থাকতো না।
প্রাণগোপাল বাবা নোয়াখালিতে হাজিপুরের কাছে বিশ বিঘা জমিতে এক উৎসবের আয়োজন করেছিলেন। সেই মহা মহোৎসবে অগণিত লোক অংশ নিয়েছিলেন, অসংখ্য কীর্তনের দল এসেছিলেন। প্রায় ৬০০ জন লোক কেবল রন্ধনের কার্য‍্যেই ব‍্যস্ত ছিলেন। অতএব, কত জনসমাগম যে হয়েছিল তা সহজেই অনুভূত হয়। টানা সাত দিন বাবার ক্ষিদে-তেষ্টা বলে কিছু ছিল না। কখনো তিনি তদারকি করছেন সবের, কখনো বা নৃত‍্য-গীতে ব‍্যস্ত, আবার কখনো সমাধি মগ্ন। সে এক পরম অদ্ভুত আবেশ তাঁর ভিতর।
আর একবার তো এক অলৌকিক কান্ড ঘটালেন। ফেনীর উত্তর দিকে পাঠাঙ্গর গ্রামে, যখন তিনি ব‍্যাসাসনে বসে প্রবচন দিচ্ছেন তখন হঠাৎ করে বজ্রবিদ্যুৎ পতন শুরু হয় ভয়ানক ভাবে। ভক্তরা প্রাণভয়ে ভীত হচ্ছে দেখে তিনি সকলকে আশ্বস্ত করলেন এই বলে যে, “তোমরা চিন্তা করো না। যে ইন্দ্রদেব এই ঘটনা ঘটাচ্ছেন, তিনিও ভক্তদেরকে মান্য করেন। তোমরা স্থিরভাবে বসে পাঠে মন দাও। দেখবে সকল বিপদ দূরে সরে যাবে।” বাস্তবিক তাই হল। সেই স্থান বাদ দিয়ে সকল স্থানে ভারী বর্ষণ হল, কিন্তু, উৎসবের স্থানে এক ফোটাও বৃষ্টি হল না। বাবার নির্দেশমত সকলে স্থির চিত্তে গভীর মনোযোগ দিয়ে পাঠে মনোনিবেশ করে বসেছিলেন। পাঠাঙ্গর গ্রামের সেই মহোৎসব শেষে সকল গ্রামবাসী প্রেমপ্রাপ্ত হয়ে ধুলায় গড়াগড়ি দিয়েছিলেন। চতুর্দিক ধন্য ধন্য করেছিল তাঁর লীলা দেখে।
প্রাণকৃষ্ণ বাবার বৈরাগ্য ছিল অপরিসীম। তিনি ধাতুপাত্র বর্জন করে, মৃৎপাত্রে প্রসাদ পেতেন, ভূমিতলে শয়ন করতেন, দিবানিশি নামে মজে থাকতেন।
যেদিন বাবা লীলাসঙ্গোপন করলেন সেদিন মহোৎসব শেষে সকল ভক্তদের প্রসাদ পাবার পর তিনি শয়নে গেলেন। বললেন যে, তাঁর দেহ অবশ, আর তিনি উঠবেন না, সেই তাঁর শেষ শয‍্যা। তাই শেষ পূজা দিয়ে নিতে চান। তাঁর আজ্ঞামত তাঁর বক্ষের ওপর রেশমী আসন পাতা হল। তারপর, তাঁর গুরুদেবের চিত্রপট বসানো হল সেই আসনের ওপর। তিনি পূজা করলেন। তাঁর নির্দেশমত পঞ্চতত্ত্ব চিত্রপটও বসানো হল তাঁর বক্ষের ওপর। তিনি পূজা করলেন। এরপর, রাধাবিনোদ বিগ্রহ বসানো হল তিনি পূজা দিলেন। বিগ্রহ নামানো হল বক্ষ থেকে। তিনি ধ‍্যানমগ্ন হলেন শয়ন অবস্থাতেই। লীলা সম্বরণ করলেন বাবা। তখন ছিল আষাঢ় মাসের শেষে শুক্লা চতুর্দশীর রাত্রে চতুর্থ প্রহর। সকল  শিষ্য-ভক্তরা চতুর্দিক অন্ধকার দেখলেন তাঁর অদর্শনে।
প্রসঙ্গত, লিখছি, প্রাণকৃষ্ণ বাবা এ অধমার পরাৎপর গুরুদেব। আমার পরমগুরু শ্রীগুরুপদ দাস বাবা প্রাণকৃষ্ণ বাবার জীবনীকথা বলেছিলেন আমার গুরুদেব শ্রীকিশোরীদাস বাবাকে। গুরুপদ দাস বাবার আজ্ঞায় কিশোরীবাবা প্রকাশ করেছিলেন তাঁর লেখনীতে। আর এখন আমি কিশোরীদাস বাবার আজ্ঞায় লেখার ক্ষুদ্র প্রয়াস করলাম। দোষ-ত্রুটি তাঁদের ক্ষমাসুন্দর নয়নে দেখবেন এই প্রার্থনা জানালাম তাঁদের পদ-পঙ্কজে।

Share This
Categories
প্রবন্ধ

আর্ন্তজাতিক আর্কাইভস দিবস কি, কেন পালিত হয় জানুন।

আজ আন্তর্জাতিক আর্কাইভস দিবস। ইন্টারন্যাশনাল কাউন্সিল অন আর্কাইভস (আইসিএ) এর উদ্যোগে ২০০৮ সাল থেকে প্রতি বছরের ৯ জুন দিবসটি পালিত হচ্ছে। এ দিবসের মূল লক্ষ্য, সাধারণ মানুষ ও নীতিনির্ধারকদের মধ্যে আর্কাইভস ও নথি ব্যবস্থাপনা বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো। জাতীয় আর্কাইভসে জমা থাকে দেশের সব সরকারি সংস্থা, বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে বেসরকারি সংস্থা ও ব্যক্তির ঐতিহাসিক তথ্যের রেকর্ড বা নথি। এগুলোকে বলা যায় জাতির স্মৃতির আকর। একটি দেশ বা জাতির অস্তিত্বের বেড়ে ওঠার বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণ করে জাতীয় আর্কাইভস।
আন্তর্জাতিক আর্কাইভস দিবস। ১৯৪৮ সালের ৯ জুন ইউনেস্কোর অঙ্গ সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল কাউন্সিল অন আর্কাইভস (আইসিএ) এর যাত্রা শুরু হয়। আইসিএ’র উদ্যোগেই ২০০৮ সাল থেকে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক আর্কাইভ দিবস।

মূলত ইতিহাস-ঐতিহ্য সম্পর্কে জনসচেতনতা তৈরি আর প্রশাসনের নীতিনির্ধারকদের সামনে আর্কাইভসের গুরুত্ব তুলে ধরার জন্যই এ দিবসের সূচনা করে আইসিএ।
, ‘আর্কাইভস সিদ্ধান্ত, কাজ ও স্মৃতিকে ধারণ করে। আর্কাইভস একটি অনন্য ও অপ্রতিকল্পনীয় ঐতিহ্য, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে বহমান থাকে। আর্কাইভস তার মূল্যবোধ ও মান সংরক্ষণের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। আর্কাইভস তথ্যের বিশ্বাসযোগ্য উৎস, যা প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের জবাবদিহি ও স্বচ্ছতার ভিত্তি নির্মাণ করে। এটি ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর স্মৃতি সংরক্ষণের মাধ্যমে সমাজ উন্নয়নে প্রয়োজনীয় ভূমিকা রাখে। আর্কাইভসে প্রবেশাধিকার উন্মুক্ত রাখার মাধ্যমে মানবসমাজ সম্পর্কে আমাদের জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করে, গণতন্ত্রকে সচল রাখে, নাগরিকের অধিকার সুরক্ষা করে এবং জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি করে।’

উদ্দেশ্য—–

আর্কাইভস হলো ঐতিহাসিক গুরুত্বসম্পন্ন সরকারি ও বেসরকারি নথিপত্র, দলিলাদি, পুরনো বিরল পুস্তকাদি, পান্ডুলিপি ইত্যাদির সংগ্রহশালা। বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস চর্চা, শিক্ষা ও গবেষণা, রেফারেন্স ইত্যাদি ক্ষেত্রে জাতীয় আরকাইভসের গুরুত্ব অপরিসীম। সম্ভবত প্রাচীন গ্রিক সভ্যতায় আর্কাইভ জাতীয় প্রতিষ্ঠানসমূহের উদ্ভব হয় এবং মধ্যযুগেও এগুলির অস্তিত্ব বজায় থাকে। গ্রিক ‘আর্কিয়ন’ শব্দ থেকে আর্কাইভস এর উদ্ভব, যা দ্বারা বোঝায় কোনো দফতরের আয়ত্তাধীন কর্মপ্রণালী। আর্কিয়ন এসেছে ‘আর্ক’ শব্দ থেকে যা দ্বারা আবার প্রারম্ভ, উদ্ভব, সর্বময় কর্তৃত্ব, সাম্রাজ্য, ম্যাজিস্ট্রেসি, দফতর ইত্যাদি বোঝায়। ল্যাতিন ‘আর্কিভিয়াম’ এসেছে গ্রিক আর্কিয়ন শব্দ থেকে, আর ল্যাতিন থেকে এসেছে ফরাসি ল্যা-আর্কাইভ। বিভিন্ন বস্তুর সন্নিবেশ বোঝাতে ফরাসি থেকে ইংরেজি ‘আর্কাইভ’ শব্দটির উৎপত্তি। অক্সফোর্ড ইংরেজি অভিধান আর্কাইভসকে সজ্ঞায়িত করেছে এমন একটা স্থান হিসেবে যেখানে সংরক্ষণের নিমিত্ত সরকারি নথিপত্র বা ঐতিহাসিক দলিলাদি সংগৃহীত হয়। টি.আর. শ্যালেনবার্গ আর্কাইভস-এর আধুনিক সংজ্ঞা দিয়েছেন এভাবে, যে কোনো সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সেই সকল নথিপত্র যেগুলি কোনো গবেষণায় তথ্য-উপাত্ত হিসেবে প্রয়োগের উদ্দেশ্যে স্থায়ী সংরক্ষণের উপযুক্ত বলে বিবেচনা করে সেভাবে কোনো সংগ্রহশালায় রক্ষিত হয়েছে বা রক্ষণের জন্য বাছাই করা হয়েছে। আর্কাইভ এখন একটা দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সংরক্ষণাগার; একটা জাতির স্মৃতিময় তথ্যের ভান্ডার।

আরকাইভসের গুরুত্ব—

আরকাইভসের গুরুত্ব তুলে ধরতে ১৯৪৮ সালের এ দিনে ইউনেস্কোর অঙ্গ সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল কাউন্সিল অন আর্কাইভস (আইসিএ) যাত্রা শুরু করে। ২০০৪ সালে অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায় বিশ্বব্যাপী আর্কিভিস্টদের বা নথিরক্ষকদের একটি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনে বিভিন্ন দেশ থেকে দুই হাজার প্রতিনিধি যোগ দেন। সম্মেলন শেষে তাঁরা একটি সিদ্ধান্ত নেন যে তাঁরা জাতিপুঞ্জকে (ইউনাইটেড নেশন্স) অনুরোধ করবেন যেন বিশ্বব্যাপী একটি দিবস ‘আন্তর্জাতিক আর্কাইভস দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়। এরই মধ্যে বেশ কিছু দেশ তাদের দেশে ‘জাতীয় আর্কাইভস’ বা জাতীয় দলিলপত্র দিবস পালন করছে। দিবসটি পালন করার উদ্দেশ্য হচ্ছে জনগণের মধ্যে আর্কাইভস বা দলিলপত্র সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা এবং একই সঙ্গে দেশের নীতিনির্ধারকদের আর্কাইভসের গুরুত্ব সম্পর্কে ওয়াকিফহাল করানো। ইতিহাস-ঐতিহ্য সম্পর্কে জনসচেতনতা তৈরি আর প্রশাসনের নীতিনির্ধারকদের সামনে আর্কাইভসের গুরুত্ব তুলে ধরার জন্যই এ দিবসের সূচনা করে আইসিএ। মূলত ইন্টারন্যাশনাল কাউন্সিল অন আর্কাইভস (আইসিএ) এর উদ্যোগে ২০০৮ সাল থেকে প্রতি বছরের ৯ জুন দিবসটি পালিত হচ্ছে।

।।তথ্য : সংগৃহীত ইন্টারনেট।।

Share This
Categories
প্রবন্ধ রিভিউ

আজ ৮ জুন, বিশ্ব মহাসাগর দিবস, জানুন দিবসটি পালনের মূল উদ্দেশ্য ও গুরুত্ব।

বিশ্ব মহাসাগর দিবস হল একটি আন্তর্জাতিক দিন যা প্রতি বছর ৮ জুন অনুষ্ঠিত হয়।  ধারণাটি মূলত ১৯৯২ সালে কানাডার ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ওশান ডেভেলপমেন্ট (ICOD) এবং ওশান ইনস্টিটিউট অফ কানাডা (OIC) আর্থ সামিটে – ইউএন কনফারেন্স অন এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (UNCED) ব্রাজিলের রিও ডি জেনেরিওতে প্রস্তাব করেছিল।  মহাসাগর প্রকল্পটি ২০০২ সালে বিশ্ব মহাসাগর দিবসের বিশ্বব্যাপী সমন্বয় শুরু করে৷ “বিশ্ব মহাসাগর দিবস” আনুষ্ঠানিকভাবে ২০০৮ সালে জাতিসংঘ কর্তৃক স্বীকৃত হয়েছিল৷ আন্তর্জাতিক দিবসটি বিশ্বব্যাপী টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (SDGs) বাস্তবায়নকে সমর্থন করে এবং সুরক্ষায় জনস্বার্থকে উৎসাহিত করে৷  সমুদ্র এবং এর সম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনা।

 

বিশ্ব মহাসাগর দিবস মানুষকে সমুদ্রের গুরুত্ব এবং দৈনন্দিন জীবনে তারা যে প্রধান ভূমিকা পালন করে তা স্মরণ করিয়ে দেওয়ার জন্য স্মরণ করা হয়। জাতিসংঘের মতে, দিবসটি সমুদ্রের উপর মানুষের ক্রিয়াকলাপের প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সমুদ্রের প্রজাতির জন্য একটি ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তোলার উদ্দেশ্য। এছাড়াও, বিশ্বব্যাপী সমুদ্র এবং সম্পদের টেকসইতাকে উন্নীত করার জন্য সমুদ্র এবং এর সম্পদ সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়াতে দিবসটি পালন করা হয়। দিবসটি সমুদ্র থেকে মানবজাতির উৎসারিত বিভিন্ন সম্পদ, সেইসাথে সমুদ্র যে বিভিন্ন হুমকির সম্মুখীন হয় তা তুলে ধরার উদ্দেশ্য।

 

গোটা বিশ্বে সমুদ্র ও উপকূলবর্তী এলাকার উদ্ভিদ ও প্রাণিজগত আজ বিপন্ন প্রায়। অথচ পৃথিবীতে মানব জাতির টিকে থাকার অন্যতম চাবিকাঠি হল সাগর। খাদ্য, ওষুধসহ বিভিন্ন উপাদানের সঙ্গে আমাদের বেঁচে থাকার প্রয়োজনীয় অক্সিজেনের একটি বড় অংশ আসে মহাসাগর থেকে। তাছাড়া মহাসাগরগুলো বায়ুমণ্ডলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ দখল করে আছে। কিন্তু মানুষের নানাবিধ কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি জলবায়ুর বৈরী থাবায় মহাসাগরগুলোর প্রতিবেশ ব্যবস্থা প্রতিনিয়ত বদলে যাচ্ছে। ধ্বংস হচ্ছে এর জীববৈচিত্র্য।

 

আমাদের অক্সিজেনের সবচেয়ে বড় জোগানদাতা হলো সাগর-মহাসাগর। পৃথিবীর ফুসফুস বলা হয় এসব সাগর-মহাসাগরকে। সমুদ্রের এই অবদান, আবেদন, প্রয়োজনীয়তা আর উপকারিতাকে স্বতন্ত্রভাবে বিশ্বের সবার সামনে তুলে ধরতে প্রতি বছর ৮ জুন পালন করা হয় বিশ্ব সমুদ্র দিবস।দিবসটি পালনের মূল উদ্দেশ্য হলো, সাগর-মহাসাগর সম্পর্কে মানুষের সচেতনতা বাড়িয়ে তোলা। এবারের প্রতিপাদ্য বিষয় ‘জোয়ার পরিবর্তনে স্পন্দন হারাচ্ছে সমুদ্র’  -২০২৩।

 

ইতিহাস—

 ১৯৮৭-১৯৯২

Brundtland Commission (এছাড়াও বিশ্ব কমিশন অন এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট নামে পরিচিত) ১৯৮৭ Brundtland রিপোর্টে উল্লেখ করেছে যে অন্যান্য সেক্টরের তুলনায় সমুদ্র সেক্টরে একটি শক্তিশালী কণ্ঠস্বরের অভাব রয়েছে।
১৯৯২ সালে প্রথম বিশ্ব মহাসাগর দিবসে, উদ্দেশ্যগুলি ছিল সমুদ্রকে আন্তঃসরকারি এবং এনজিও আলোচনা এবং নীতির কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া এবং বিশ্বব্যাপী সমুদ্র এবং উপকূলীয় নির্বাচনী এলাকার কণ্ঠস্বরকে শক্তিশালী করা।

 

২০০২-২০০৮

 

বিশ্বব্যাপী সমন্বিত প্রচেষ্টাগুলি The Ocean Project এবং World Ocean Network সহযোগীতার মাধ্যমে শুরু হয়েছিল এবং ইভেন্টের সংখ্যা কয়েক ডজন।  এই সময়ের মধ্যে, www.WorldOceanDay.org চালু হয়েছে, সাগরের প্রোফাইল বাড়াতে এবং আমাদের নীল গ্রহের জন্য যুক্ত হওয়ার এবং একটি পার্থক্য করার সুযোগ দেওয়ার সুযোগের প্রচারে সহায়তা করতে।  ওয়েবসাইটটি ইভেন্ট সংগঠকদের তাদের সম্প্রদায়গুলিতে সাহায্য করার উপায়গুলি প্রদান করে এবং শিক্ষামূলক এবং কার্যকরী সংস্থান, ধারণা এবং সরঞ্জামগুলির প্রচারের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী সম্পৃক্ততা তৈরি করে, সর্বদা প্রত্যেকের জন্য তারা যে কোনও উপায়ে বিশ্ব মহাসাগর দিবস উদযাপন করতে ব্যবহার করার জন্য বিনামূল্যে।  ২০০৪ সালে, The Ocean Project এবং World Ocean Network চালু করেছে “আমাদের মহাসাগর গ্রহের জন্য একটি পার্থক্য করতে সাহায্য করুন!”  ৮ জুনকে বিশ্ব মহাসাগর দিবস হিসাবে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য জাতিসংঘের কাছে একটি পিটিশনে স্বাক্ষর করার জন্য অনলাইন এবং ব্যক্তিগত উভয় সুযোগের সাথে।  ডিসেম্বর ২০০৮ সালে, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ আনুষ্ঠানিকভাবে দিবসটিকে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য একটি ঘোষণা পাস করে।

 

বার্ষিক থিম—

 

জাতিসংঘ দিবসটির জন্য নিম্নলিখিত বার্ষিক থিমগুলি বেছে নিয়েছে:

২০০৯: “আমাদের মহাসাগর, আমাদের দায়িত্ব”

২০১০: “আমাদের মহাসাগর: সুযোগ এবং চ্যালেঞ্জ”

২০১১: “আমাদের মহাসাগর: সবুজ আমাদের ভবিষ্যত”

২০১২: “UNCLOS @ 30” — United Nations Convention on the Law of the Sea (UNCLOS)

২০১৩: “মহাসাগর এবং মানুষ”

২০১৪: “সমুদ্রের স্থায়িত্ব: আসুন একসাথে নিশ্চিত করি যে মহাসাগরগুলি ভবিষ্যতে আমাদের টিকিয়ে রাখতে পারে”

২০১৫: “স্বাস্থ্যকর মহাসাগর, স্বাস্থ্যকর গ্রহ”

২০১৬: “স্বাস্থ্যকর মহাসাগর, স্বাস্থ্যকর গ্রহ ⁠- একটি টেকসই গ্রহের জন্য ভ্রমণ: হোকুলে’র আগমন”

২০১৭: “আমাদের মহাসাগর, আমাদের ভবিষ্যত”

২০১৮: “আমাদের মহাসাগর পরিষ্কার করুন!”

২০১৯: “লিঙ্গ এবং মহাসাগর”

২০২০: “টেকসই মহাসাগরের জন্য উদ্ভাবন”

২০২১: “The Ocean: Life & Livelihoods”

২০২২: “পুনরুজ্জীবন: মহাসাগরের জন্য যৌথ কর্ম”

২০২৩: “প্ল্যানেট ওয়াসেন: জোয়ার পরিবর্তন হচ্ছে।

 

বিশ্বের খাদ্য ও ওষুধের অন্যতম ভাণ্ডার এই মহাসাগর। ফলে যেভাবেই হোক রক্ষা করতেই হবে সমুদ্রকে। পৃথিবীর মোট ৭০ শতাংশেরও বেশি অংশ জুড়ে রয়েছে মহাসাগর। পৃথিবীর প্রায় ৯৪ শতাংশ প্রাণী প্রজাতি বাস করে সমুদ্রের নীচে!মহাসাগরগুলি পৃথিবীর প্রায় ৭০ শতাংশ অক্সিজেন উৎপাদন করে। কারণ সমুদ্রের নীচে থাকা সামুদ্রিক প্রজাতিই এই অক্সিজেন উৎপাদন করে।

 

তাই বিশ্বের পরিবেশ সুরক্ষার কাজে মহাসাগরের অবদান খুবই গুরুত্বপূর্ণ ।প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে মহাসাগরের তুলনা নেই। আন্তর্জাতিক মহাসাগর দিবসে যাতে আমরা মহাসাগরের গুরুত্ব আরো বেশি করে উপলব্ধি করতে পারি সেজন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করার একটি বিশেষ দিন।

 

।।তথ্য : সংগৃহীত উইকিপিডিয়া ও বিভিন্ন ওয়েবসাইট।।

 

 

 

Share This
Categories
প্রবন্ধ রিভিউ

বিশ্ব নিরাপদ খাদ্য দিবস কেন পালিত হয় এবং পালনের গুরুত্ব, জানুন।

মানুষের মৌলিক চাহিদার মধ্যে প্রথমেই রয়েছে খাদ্য। সেই খাদ্যকে গুরুত্ব দিতেই ৭ জুনকে বিশ্ব নিরাপদ খাদ্য দিবস হিসেবে পালন করা হয়  যাতে খাদ্যজনিত ঝুঁকি প্রতিরোধ, সনাক্তকরণ ও ব্যবস্থাপনা এবং মানব স্বাস্থ্যের উন্নতির জন্য দৃষ্টি আকর্ষণ এবং পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়।এই বছরের বিশ্ব খাদ্য নিরাপত্তা দিবস ২০২৩-এর থিম হল “খাদ্য মান জীবন বাঁচায়।”  বেশির ভাগ মানুষই তাদের খাদ্য নিরাপদ কিনা তা জানার জন্য ভোগ্য সামগ্রীর প্যাকেজিংয়ের তথ্যের উপর নির্ভর করে। এই খাদ্য নিরাপত্তা মানগুলি কৃষক এবং যারা খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ করে তাদের গাইড করে।  সংযোজন, দূষক, কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ এবং পশুচিকিত্সা ওষুধের পরিমাণ যা আমাদের দ্বারা নিরাপদে সেবন করা যায়, পরিমাপ করা, প্যাকেজিং এবং পরিবহন করা যায়, সেগুলিও এই মানগুলির অধীনে নির্ধারিত হয়৷ পুষ্টি এবং অ্যালার্জেনের লেবেলগুলি গ্রাহকদের একটি জ্ঞাত সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করে৷

WHO প্রতি বছরের বিশ্ব খাদ্য নিরাপত্তা দিবসের থিম ঘোষণা করে বিশ্বব্যাপী অংশগ্রহণকে অনুপ্রাণিত করার জন্য সংগঠিত প্রচারাভিযান চালু করেছে। নিরাপদ খাদ্য সুস্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গ্যারান্টারগুলির মধ্যে একটি।  অনিরাপদ খাবার অনেক রোগের কারণ এবং অন্যান্য খারাপ স্বাস্থ্যের অবস্থার জন্য অবদান রাখে, যেমন প্রতিবন্ধী বৃদ্ধি এবং বিকাশ, মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টের ঘাটতি, অসংক্রামক বা সংক্রামক রোগ এবং মানসিক অসুস্থতা।  বিশ্বব্যাপী, প্রতি দশজনের মধ্যে একজন খাদ্যবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়।  ক্যাম্পেইনটি বেশিরভাগ খাদ্যবাহিত রোগ প্রতিরোধ করার জন্য একটি টেকসই পদ্ধতিতে উন্নত স্বাস্থ্য সরবরাহ করার জন্য খাদ্য ব্যবস্থার রূপান্তর করার প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দেয়।  খাদ্য ব্যবস্থার নীতি-নির্ধারক, অনুশীলনকারী এবং বিনিয়োগকারীদের স্বাস্থ্যের ফলাফলের উন্নতির জন্য নিরাপদ খাদ্যের টেকসই উৎপাদন এবং ব্যবহার বাড়ানোর জন্য তাদের কার্যক্রম পুনর্বিন্যাস করার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়।
বিশ্ব খাদ্য নিরাপত্তা দিবস এর ইতিহাস–

 

কোডেক্স অ্যালিমেন্টারিয়াস কমিশন (সিএসি), যা এফএও/ডব্লিউএইচও ফুড স্ট্যান্ডার্ড প্রোগ্রাম বাস্তবায়ন করে, ২০১৬ সালে বিশ্ব খাদ্য নিরাপত্তা দিবস উদযাপনের একটি প্রস্তাবকে সমর্থন করে। এক বছর পরে, জুলাই মাসে, খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) সম্মেলন।  এর ৪০ তম অধিবেশন ডব্লিউএইচও দ্বারা সমর্থিত একটি রেজোলিউশন গ্রহণ করে ধারণাটিকে সমর্থন করেছে।
অবশেষে, ২০ ডিসেম্বর, ২০১৮ তারিখে, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ তার রেজোলিউশন ৭৩/২৫০ দ্বারা বিশ্ব খাদ্য নিরাপত্তা দিবস প্রতিষ্ঠা করে।  আরও, বিশ্ব স্বাস্থ্য পরিষদ বিশ্বব্যাপী খাদ্য নিরাপত্তা, খাদ্যজনিত অসুস্থতা প্রতিরোধ এবং বিশ্বব্যাপী খাদ্য নিরাপত্তা সম্পর্কে সর্বাত্মক সচেতনতা সৃষ্টির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ হিসেবে বিশ্ব খাদ্য নিরাপত্তা দিবসের গুরুত্বকে স্বীকৃতি দিতে এবং তুলে ধরার জন্য 3 আগস্ট, ২০২০ তারিখে WHA73.5 রেজুলেশন পাস করে।  খাদ্য নিরাপত্তা বজায় রাখার জন্য বিশ্বব্যাপী প্রচেষ্টা জোরদার করা।

 

বিশ্ব খাদ্য নিরাপত্তা দিবস এর তাৎপর্য—

 

আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি খাদ্যে কীটনাশক, রাসায়নিক এবং সংযোজন বৃদ্ধির দিকে পরিচালিত করেছে যা নিয়ন্ত্রিত না হলে ভোক্তাদের ক্ষতি করবে।  পানি দূষণও একটি বড় সমস্যা।  বিশ্ব খাদ্য নিরাপত্তা দিবস নিশ্চিত করে যে সমস্ত ভোক্তাদের জন্য সর্বোত্তম স্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে খাদ্যের মান মেনে চলা হয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য মতে, প্রতিবছর প্রায় ৬০ কোটি মানুষ দূষিত খাবার খেয়ে অসুস্থ হয়। এ কারণে প্রতিবছর মারা যায় ৪ লাখ ৪২ হাজার মানুষ। এ ছাড়া পাঁচ বছরের চেয়ে কম বয়সী শিশুদের ৪৩ শতাংশই খাবারজনিত রোগে আক্রান্ত হয়। এর মধ্যে প্রতিবছর প্রাণ হারায় ১ লাখ ২৫ হাজার শিশু।
পরিবেশ দূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে কমে গেছে জীববৈচিত্র্য। অর্থাৎ, ফসলের জন্য উপকারী কীটপতঙ্গ কমে গেছে, বেড়েছে কিছু ক্ষতিকর পতঙ্গ। যার ফলে ব্যবহৃত হচ্ছে পতঙ্গনাশক ও রাসায়নিক সার। তাই প্রতি বছর খাদ্যজনিত সমস্যায় প্রায় ৬ কোটি মানুষ অসুস্থতায় ভোগেন। তাই নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতরকণ বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

খাদ্যজনিত অসুস্থতা সাধারণত সংক্রামক ও বিষাক্ত পদার্থের কারণে হয়ে থাকে। ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, পরজীবী ও নানা রাসায়নিক পদার্থের কারণে খাদ্য অনিরাপদ হয়ে পড়ে। আর, এই অনিরাপদ খাদ্য গ্রহণের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে রোগ জীবাণু ও দূষিত পদার্থ, যা অসুস্থতা এমনকি মৃত্যুরও কারণ হতে পারে।

পরিবেশ দূষণ দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে জমির মাটি ও ফসল। একই সাথে দূষিত পদার্থ প্রবেশ করছে শস্যের মাঝে।   পরিবেশ দূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে কমে গেছে জীববৈচিত্র্য। অর্থাৎ, ফসলের জন্য উপকারী কীটপতঙ্গ কমে গেছে, বেড়েছে কিছু ক্ষতিকর পতঙ্গ। যার ফলে ব্যবহৃত হচ্ছে পতঙ্গনাশক ও রাসায়নিক সার। যা পরোক্ষ ভাবে আমাদের ই শরীরে প্রবেশ করছে। এতে মানুষের শরীরে ক্ষতি ছাড়া লাভ কিছু হচ্ছে না।

 

তাই মানুষের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে নিরাপদ খাদ্যের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনিরাপদ খাদ্য সৃষ্টি করে নানা রকম রোগ-বালাই ও দুর্বল দেহ। যেমন, শিশুর দুর্বল বা অক্ষম হয়ে বেড়ে ওঠা, পুষ্টির অভাব, সংক্রামক কিংবা অসংক্রামক রোগের সৃষ্টি এবং মানসিক অসুস্থতা।

তাই প্রতি বছরের ন্যায় এ বছরও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) উদ্যোগে ৭ই জুন পৃথিবীব্যাপী দিবসটি পালন করা হচ্ছে। খাদ্যজনিত রোগের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ, চিহ্নিতকরণ, প্রতিরোধ ও তার ব্যবস্থা গ্রহণ এবং মানুষের স্বাস্থ্যের উন্নতির জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করতে এই দিনটি আয়োজিত হয়।

।।তথ্য : সংগৃহীত ইন্টারনেট ও বিভিন্ন ওয়েবসাইট।।

Share This