Categories
নারী কথা প্রবন্ধ

হংসাবেন মেহতা : ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের এক অবিস্মরণীয় নারী।।

ভূমিকা— ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে বহু নারীই তাঁদের সাহস, ত্যাগ, এবং অনন্য নেতৃত্বের মাধ্যমে চিরস্মরণীয় হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন হংসাবেন মেহতা — যিনি কেবলমাত্র স্বাধীনতার জন্য সংগ্রামই করেননি, বরং স্বাধীনতার পর ভারতের সংবিধান প্রণয়ন, নারী অধিকার রক্ষা, এবং শিক্ষার প্রসারে অসামান্য ভূমিকা রেখেছেন।
তিনি ছিলেন একজন শিক্ষক, সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ, নারীবাদী, এবং সামাজিক সংস্কারক — এককথায়, এক বহুমুখী ব্যক্তিত্ব।

শৈশব ও পারিবারিক পটভূমি

হংসাবেন মেহতার জন্ম ৪ জুলাই ১৮৯৭ সালে গুজরাটের সুরাট শহরে। তাঁর পিতার নাম ছিল হারিপ্রসাদ দেসাই, যিনি ছিলেন শিক্ষিত, উদারচিন্তাধারার মানুষ। পরিবারটি ছিল মধ্যবিত্ত কিন্তু সাংস্কৃতিকভাবে সমৃদ্ধ। ছোটবেলা থেকেই হংসাবেনের মধ্যে সামাজিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলার প্রবণতা দেখা যায়।
তিনি প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন সুরাটে এবং পরে বোম্বে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। শিক্ষা জীবনের শুরু থেকেই তাঁর মধ্যে নেতৃত্বগুণের বিকাশ ঘটে, এবং নারী শিক্ষার প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ জন্ম নেয়।

প্রথম জীবনে নারীবাদী চেতনা–

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করার সময় হংসাবেন পাশ্চাত্য চিন্তাধারার সঙ্গে পরিচিত হন — বিশেষত জন স্টুয়ার্ট মিল এবং এমেলিন প্যাঙ্কহার্স্টের নারী অধিকারের দর্শন তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
১৯২০-এর দশকের গোড়ার দিকে তিনি ইংল্যান্ড ভ্রমণ করেন এবং সেখানকার নারী ভোটাধিকার আন্দোলন প্রত্যক্ষ করেন। এই অভিজ্ঞতা তাঁর রাজনৈতিক এবং সামাজিক চেতনার ভিত্তি দৃঢ় করে।

রাজনীতিতে প্রবেশ–

ভারতে ফিরে এসে হংসাবেন সাংবাদিকতা শুরু করেন এবং নারীদের সমস্যা, শিশুদের শিক্ষা, ও সামাজিক সংস্কারের বিষয়ে ধারালো প্রবন্ধ লিখতে থাকেন। তাঁর লেখনী ছিল স্পষ্ট, যুক্তিপূর্ণ, এবং সাহসী।
তিনি গুজরাট মহিলা পরিষদ প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন, যা নারীদের রাজনৈতিক ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য কাজ করত।
হংসাবেন ১৯৩৭ সালে বম্বে প্রাদেশিক বিধানসভা-র সদস্য নির্বাচিত হন। সেখানেও তিনি নারীর অধিকার রক্ষার জন্য একাধিক বিল প্রস্তাব করেন, যেমন — বাল্যবিবাহ রোধ, বিধবা পুনর্বিবাহের প্রচার, এবং নারীদের কর্মক্ষেত্রে সমান মজুরি।

স্বাধীনতা সংগ্রামে ভূমিকা–

হংসাবেন মেহতা ছিলেন মহাত্মা গান্ধী-র আদর্শে অনুপ্রাণিত।
তিনি অসহযোগ আন্দোলন ও ভারত ছাড়ো আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। ১৯৪২ সালে ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময় তাঁকে গ্রেফতার করে জেলে পাঠানো হয়, যেখানে তিনি প্রায় তিন বছর বন্দি ছিলেন।
কারাবাসের সময়ও তিনি নারী বন্দিদের শিক্ষার ব্যবস্থা করেন এবং তাঁদের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা ছড়িয়ে দেন।

সংবিধান সভায় ভূমিকা–

ভারত স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৪৬ সালে হংসাবেন মেহতা সংবিধান সভা-র সদস্য নির্বাচিত হন।
সংবিধান রচনার সময় তিনি নারী অধিকার সংক্রান্ত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব পেশ করেন।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, তাঁর প্রচেষ্টাতেই ভারতের সংবিধানের প্রস্তাবনা-তে “Equality” বা সমতা শব্দটি যুক্ত হয় এবং নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সমান অধিকার নিশ্চিত করা হয়।
তিনি মানবাধিকার সনদ (Universal Declaration of Human Rights)-এর প্রণয়নেও অবদান রাখেন। জাতিসংঘে ভারতের প্রতিনিধি হিসেবে তিনি সক্রিয়ভাবে নারী অধিকার এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের পক্ষে বক্তব্য রাখেন।

নারী শিক্ষার প্রসারে অবদান–

হংসাবেন বিশ্বাস করতেন যে স্বাধীনতা অর্থবহ হবে কেবল তখনই, যখন নারীরা শিক্ষিত ও আত্মনির্ভর হবে।
তিনি গুজরাটের গ্রামীণ অঞ্চলে একাধিক বিদ্যালয় ও নারী প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করেন।
তাঁর প্রচেষ্টায় বহু মেয়েরা প্রথমবার স্কুলে যাওয়ার সুযোগ পায়।
তিনি মেয়েদের জন্য বিজ্ঞান, কলা, এবং পেশাগত শিক্ষার প্রসারে জোর দেন, যাতে তারা অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে পারে।

লেখনী ও সাহিত্যকর্ম–

হংসাবেন একজন দক্ষ লেখিকাও ছিলেন। তিনি “Indian Woman” এবং “The Awakening of Indian Women” নামে দুটি প্রভাবশালী বই লেখেন, যেখানে ভারতীয় নারীর ইতিহাস, সংগ্রাম, এবং ভবিষ্যতের পথনির্দেশ তুলে ধরা হয়েছে।
এছাড়াও তিনি অসংখ্য প্রবন্ধ, বক্তৃতা, এবং রিপোর্ট লিখেছেন, যা নারী আন্দোলনের ইতিহাসে অমূল্য দলিল।

পুরস্কার ও স্বীকৃতি–

হংসাবেন মেহতার অবদানকে স্বীকৃতি জানিয়ে ভারত সরকার তাঁকে একাধিক সম্মানে ভূষিত করে।
১৯৮৮ সালে তিনি পদ্মভূষণ লাভ করেন।
এছাড়াও নারী আন্দোলন ও সামাজিক সংস্কারে অবদানের জন্য দেশ-বিদেশের বিভিন্ন সংস্থা তাঁকে সম্মানিত করে।

ব্যক্তিগত জীবন–

হংসাবেনের বিবাহ হয়েছিল ঝাবেরচন্দ মেহতা-র সঙ্গে, যিনি নিজেও সামাজিক সংস্কারক ও শিক্ষাবিদ ছিলেন। তাঁদের দাম্পত্য জীবন ছিল আদর্শ সহযোগিতামূলক — স্বামী-স্ত্রী মিলে সমাজ সংস্কারের কাজে নিয়োজিত ছিলেন।

মৃত্যু ও উত্তরাধিকার–

হংসাবেন মেহতার মৃত্যু হয় ১৯৯৫ সালে। তবে তাঁর কর্ম, আদর্শ, এবং সংগ্রামের উত্তরাধিকার আজও ভারতীয় নারী আন্দোলনের ইতিহাসে উজ্জ্বল।
তিনি প্রমাণ করে গেছেন যে একজন নারী কেবল ঘরের চার দেওয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় — বরং জাতি, সমাজ, এবং রাষ্ট্র গঠনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

উপসংহার

হংসাবেন মেহতা ছিলেন এক বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী, যিনি স্বাধীনতা সংগ্রাম, সংবিধান রচনা, নারী অধিকার রক্ষা, এবং শিক্ষা প্রসারে সমানতালে অবদান রেখেছেন।
তাঁর জীবন আমাদের শেখায় যে স্বাধীনতার সংগ্রাম কেবল বিদেশি শাসকের বিরুদ্ধে নয় — বরং সামাজিক অন্যায়, লিঙ্গ বৈষম্য, এবং অশিক্ষার বিরুদ্ধেও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
তাঁর সংগ্রাম ও আদর্শ আগামী প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে — স্বাধীনতার মূল্য, সমতার গুরুত্ব, এবং শিক্ষার শক্তি উপলব্ধি করতে।

Share This
Categories
নারী কথা প্রবন্ধ

ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের অগ্নিকন্যা, মোহিনী দেবী।

সূচনা—
ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন ছিল কিছু মানুষের অব্যর্থ পরিশ্রম যার ফলেই ব্রিটিশদের থেকে ভারত রাজনৈতিক দিক থেকে মুক্তি পেয়েছে। ভারত উপমহাদেশের বিংশ শতাব্দীতে ব্রিটিশ সম্রাজ্যবাদ বিরোধী যে সশস্ত্র বিপ্লববাদী লড়াই-সংগ্রাম সংগঠিত হয় এবং যার ধারাবাহিকতায় ভারত স্বাধীন হয়, তার মূলে যে সকল বিপ্লবীর নাম সর্বজন স্বীকৃত তাঁদের মধ্যে মোহিনী দেবী  প্রথমসারির একজন অন্যতম বিপ্লবী ছিলেন।ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম শুধু শহীদ ভগৎ সিং-এর মতই নয় বরং শক্তিশালী নারীদের দ্বারা প্রশস্ত হয়েছিল যারা তাদের মাটিতে দাঁড়িয়েছিল এবং দেশের স্বাধীনতা অর্জনের জন্য ব্রিটিশদের সাথে লড়াই করেছিল। মোহিনী দেবী  ভারতীয় উপমহাদেশের ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনে এক উল্লেখযোগ্য নাম, যিনি দেশমতৃকার শৃঙ্খল মুক্তির জন্য নিজেকে সঁপে দিয়েছিলেন সম্পূর্ণ রূপে।
ভারতীয় উপমহাদেশের ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের একজন ব্যক্তিত্ব ও অগ্নিকন্যা ছিলেন তিনি।
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক স্মরণীয় নাম
মোহিনী দেবী। তিনি ছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশের ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের একজন ব্যক্তিত্ব ও অগ্নিকন্যা। এছাড়া তার পরিবার বাংলাদেশের প্রগতিমুলক শিক্ষা ও সংস্কৃতির সাথে জড়িত ছিল। ইতিহাসে তাঁর নাম আজও স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে। জেনে নেবো তাঁর সংগ্রামী জীবনের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস।
জন্ম ও পরিবার—-
মোহিনী দেবী ১৮৬৩ সালে ঢাকা জেলার মানিকগঞ্জে এক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম রামশঙ্কর সেন ও মাতার নাম উমাসুন্দরী দেবী। ১২ বছর বয়সে তারকচন্দ্ৰ দাশগুপ্তের সঙ্গে বিবাহ হয়। শ্রমিক আন্দোলনের নেত্রী প্রভাবতী দাশগুপ্ত।
শিক্ষাজীবন—-
মোহিনী দেবী ভিক্টোরিয়া স্কুলের প্রথম হিন্দু ছাত্রী, কলকাতার অভিজাত অ্যাংলিকান প্রতিষ্ঠান, মোহিনী দেবী (১৮৬৩ – ১৯৫৫) তার মূলে একজন জাতীয়তাবাদী ছিলেন।  ঢাকার বেউথার রামশঙ্কর সেনের কন্যা, বারো বছর বয়সে তারকচন্দ্র দাশগুপ্তের সাথে তার বিয়ে হয়।  তা সত্ত্বেও, তিনি পন্ডিত শিবনাথ শাস্ত্রী এবং রামতনু লাহিড়ীর অধীনে অধ্যয়নের সুযোগ পেয়েছিলেন, ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগের কলকাতার অধ্যবসায়ী।  তিনি ইউনাইটেড মিশনের একজন মহিলা শিক্ষকের কাছে ইংরেজি শিখেছিলেন।  এইভাবে তিনি ভারতের সমসাময়িক উন্নয়ন সম্পর্কে সচেতন হন এবং শুরু থেকেই বিভিন্ন সামাজিক কল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত হন।
রাজনৈতিক জীবন—-
১৯২১-২২ সালে তিনি গান্ধীজীর অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দেওয়ার কারণে কারাবরণ করেন। ১৯৩০-৩১ সালে আইন অমান্য আন্দোলনে নেতৃত দেন। এজন্য তাকে ছয় মাসের জেল খাটতে হয়েছিল। ‘নিখিল ভারত মহিলা সমিতির’ সভানেত্রী হিসেবে তার ভাষন উচ্চ প্রশংসিত হয়। ১৯৪৬ সালের দাঙ্গায় মুসলিম প্রধান অঞ্চল এন্টালি বাগানে নিজের বাড়িতে থেকে হিন্দু মুসলিম ঐক্যের প্রচার চালিয়েছিলেন। সে সময় তার বন্ধু-বান্ধব আত্নীয় পরিজন তাকে তিরস্কার করে কিন্তু তাতে তিনি সংকল্প হারান নি। মোহিনী দেবী একদিকে স্বাধীনতা আন্দোলন এর পক্ষে কাজ করেছিলেন অন্যদিকে নারী শিক্ষা, নারী স্বাধীনতা, সমাজসংস্কারমূলক কাজ।
স্বাধীনতা আন্দোলনে—
১৯২০-১৯২২ সালে, ব্রিটিশদের সাথে অসহযোগের জন্য গান্ধীর আহ্বানের উচ্চতায়, তিনি নিজেকে আন্দোলনে উত্সর্গ করেছিলেন।  ১৯৩০-১৯৩১ সালের আইন অমান্য আন্দোলনের সময়, তিনি আইন ও পুলিশি বিধিনিষেধ লঙ্ঘন করে এবং পথে কারাভোগ করে একজন উল্লেখযোগ্য নেতা আন্দোলন হিসাবে আবির্ভূত হন।  গান্ধীবাদী আদর্শে তার সম্পূর্ণ সাবস্ক্রিপশন এবং তার আন্দোলন কৌশলের প্রতি অটল জমা দেওয়ার কারণে, তিনি দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে সর্বভারতীয় মহিলা কংগ্রেসের সভাপতি হন;  তার বাকপটু বক্তৃতা গান্ধী সহ সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল।  নিজের এবং তার পরিবারের নিরাপত্তা উপেক্ষা করে, তিনি কলকাতার রাস্তায় নেমে আসেন এবং ১৯৪৬ সালের ভয়াবহ কলকাতা দাঙ্গার অন্ধকার দিনগুলিতে হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করেন।
গান্ধীজীর আদর্শে অবিচলিত নিষ্ঠা ছিল। ১৯৪৬ খ্রী. কলিকাতায় দাঙ্গার সময় দাঙ্গা-আধুষিত মুসলমান-প্রধান অঞ্চল এন্টনিবাগানে নিজের বাড়িতে থেকে হিন্দু-মুসলমানের ঐক্যের বাণী প্রচার করেন। ‘দি স্কাভেঞ্জার্স ইউনিয়ন অব বেঙ্গল’ এবং ‘জুটি ওয়ার্কার্স ইউনিয়নে’র প্রেসিডেন্ট তাঁর কন্যা প্ৰভাবতী দাশগুপ্ত ১৯২৭-২৮ থেকে ১৯৩০ – ৩১ খ্রী. পর্যন্ত শ্রমিক আন্দোলনের ক্ষেত্রে এক বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব।
মৃত্যু—-
মহান এই  সংগ্রামী মোহিনী দেবী ২৫ মার্চ ১৯৫৫ সালে মৃত্যুবরণ করেন।
।।তথ্য : সংগৃহীত ইন্টারনেট ও উইকিপিডিয়া।।

Share This
Categories
নারী কথা প্রবন্ধ

বিজয়া সেন: এক অনন্য নারী স্বাধীনতা সংগ্রামী

ভূমিকা

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে অসংখ্য নারী তাঁদের জীবন, স্বপ্ন, পরিবার ও নিরাপত্তা বিসর্জন দিয়েছেন। তাঁদের অনেকের নাম ইতিহাসের পাতায় উজ্জ্বল অক্ষরে লেখা থাকলেও, অনেকের অবদান অজানা রয়ে গেছে। বিজয়া সেন তেমনই একজন সংগ্রামী, যিনি বাংলার স্বাধীনতা আন্দোলনের এক উজ্জ্বল কিন্তু তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত নাম। তাঁর রাজনৈতিক সচেতনতা, সামাজিক কর্মকাণ্ড, নারীর অধিকার রক্ষায় অবদান এবং বিপ্লবী কর্মকাণ্ড তাঁকে স্বাধীনতার ইতিহাসে এক বিশেষ স্থান দিয়েছে।

শৈশব ও শিক্ষাজীবন

বিজয়া সেন ১৯১০ সালের দিকে পূর্ববঙ্গের (বর্তমান বাংলাদেশ) এক সাংস্কৃতিক ও শিক্ষিত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা ছিলেন স্কুলশিক্ষক এবং মা ছিলেন গৃহবধূ হলেও সাহিত্য ও সংগীতপ্রেমী। ছোটবেলা থেকেই বিজয়ার মনে দেশপ্রেমের বীজ রোপিত হয়েছিল, কারণ তাঁর পরিবার ব্রিটিশ বিরোধী মনোভাবাপন্ন ছিল এবং বাড়িতে প্রায়ই স্বদেশী নেতাদের আলোচনা হত।
শিক্ষাজীবনে বিজয়া ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। তিনি কলকাতার বেথুন কলেজে ভর্তি হন, যা তখন নারীদের জন্য উচ্চশিক্ষার অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠান ছিল। এখানেই তিনি রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠেন এবং ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে ব্রিটিশ বিরোধী সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ শুরু করেন।

রাজনৈতিক প্রেরণা

১৯২৮ সালের সাইমন কমিশন বয়কট আন্দোলন এবং লালা লাজপত রায়ের মৃত্যুর ঘটনায় বিজয়া গভীরভাবে প্রভাবিত হন। বেথুন কলেজে পড়াকালীন তিনি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস এবং ছাত্র সংঘের সভায় অংশ নিতে শুরু করেন।
তবে কেবল কংগ্রেসের অহিংস আন্দোলনে সীমাবদ্ধ না থেকে, তিনি বিপ্লবী সংগঠন যুগান্তর এবং বঙ্গীয় যুব সংঘ-এর সঙ্গেও গোপনে যুক্ত হন। তাঁর রাজনৈতিক আদর্শ ছিল একদিকে গান্ধীবাদের অহিংস প্রতিরোধ, অন্যদিকে সশস্ত্র বিপ্লবের প্রস্তুতি—পরিস্থিতি অনুযায়ী কোন পথ গ্রহণ করা হবে, তা তিনি বাস্তবতার ভিত্তিতে বিবেচনা করতেন।

বিপ্লবী কর্মকাণ্ড

বিজয়া সেন কলকাতা ও চট্টগ্রামে বিপ্লবীদের সংবাদ ও অস্ত্র সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বিশেষ করে ১৯৩০ সালের চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন-এর সময় তিনি সূর্য সেনের বিপ্লবী দলের সঙ্গে সমন্বয় রক্ষার জন্য মহিলা কুরিয়ার হিসেবে কাজ করেছিলেন।
তিনি একাধিকবার বিপ্লবীদের আশ্রয় দিয়েছেন, পুলিশের চোখ এড়িয়ে অস্ত্র পরিবহন করেছেন, এবং নারীর পরিচয়ের আড়ালে গোপন বার্তা বহন করেছেন। তাঁর সাহসিকতার কারণে তাঁকে সমসাময়িকরা “বেঙ্গল’স ব্রেভহার্ট” বলে ডাকতেন।

কারাবাস ও নির্যাতন

১৯৩২ সালে ব্রিটিশ পুলিশ তাঁকে গ্রেফতার করে, অভিযোগ ছিল রাষ্ট্রদ্রোহ, অবৈধ অস্ত্র রাখা এবং বিপ্লবী সংগঠনের সদস্য হওয়া। কারাগারে বিজয়া সেনকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়।
কারাগারে থেকেও তিনি অন্য বন্দিনী নারীদের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা ছড়িয়ে দেন। তিনি কারাগারে গান্ধীজীর বই পড়াতেন, নারীদের সংগঠিত করতেন এবং ব্রিটিশ শাসনের অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ চালিয়ে যেতেন।

স্বাধীনতা-পরবর্তী সমাজসেবা

১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হওয়ার পর বিজয়া সেন সক্রিয় রাজনীতিতে অংশ নেননি, তবে সামাজিক কাজে নিজেকে সম্পূর্ণ উৎসর্গ করেন। তিনি কলকাতায় বস্তিবাসী শিশুদের জন্য একটি বিনামূল্যের স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন এবং নারীদের স্বনির্ভর করতে হস্তশিল্প প্রশিক্ষণ কেন্দ্র চালু করেন।
তিনি নারী শিক্ষার প্রসারে একাধিক প্রচারাভিযান চালান এবং একাধিক নারী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁর কাছে স্বাধীনতা কেবল রাজনৈতিক স্বাধীনতা নয়—সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমতা ছিল প্রকৃত স্বাধীনতা।

ব্যক্তিত্ব ও আদর্শ

বিজয়া সেনের ব্যক্তিত্ব ছিল দৃঢ়, স্নেহশীল এবং ন্যায়পরায়ণ। তিনি নারীর ক্ষমতায়ন, ধর্মীয় সহিষ্ণুতা এবং সামাজিক ন্যায়বিচারে বিশ্বাস করতেন। তাঁর জীবনদর্শন ছিল—

“স্বাধীনতা কেবল মাটির নয়, মন ও মনের স্বপ্নেরও স্বাধীনতা।”

সমসাময়িকদের প্রশংসা

বিজয়া সেনের জীবদ্দশায় অনেক স্বাধীনতা সংগ্রামী তাঁর অবদান স্বীকার করেছেন। প্রখ্যাত বিপ্লবী অনন্ত সিং একবার বলেছিলেন—

“বিজয়া আমাদের জন্য শুধু অস্ত্র বহন করতেন না, সাহসও বহন করতেন।”

উত্তরাধিকার

আজকের দিনে বিজয়া সেনের নাম ইতিহাসের মূলধারায় খুব বেশি উচ্চারিত হয় না, কিন্তু তাঁর জীবন সংগ্রাম ও আত্মত্যাগ নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করতে পারে। তাঁর কর্মকাণ্ড প্রমাণ করে যে, স্বাধীনতার আন্দোলনে নারী কেবল সহযাত্রী নয়, বরং নেতা ও পথপ্রদর্শকও হতে পারে।

উপসংহার

বিজয়া সেনের জীবন কাহিনী ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক অবিচ্ছেদ্য অধ্যায়। তিনি ছিলেন সাহসী, আদর্শবাদী, এবং মানবিক চেতনার প্রতীক। তাঁর জীবন আমাদের শেখায়—সত্যিকারের স্বাধীনতা অর্জনের জন্য কেবল শাসক বদল নয়, সমাজ বদল জরুরি।
ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে নারীর অবদান নিয়ে যখনই কথা হবে, বিজয়া সেনের নাম সেখানে উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো জ্বলজ্বল করবে।

Share This
Categories
নারী কথা প্রবন্ধ

গার্গী দেবী: বাংলার সাহসী কন্যা ও স্বাধীনতা সংগ্রামের অগ্রদূত।

ভূমিকা:-  ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে পুরুষদের পাশাপাশি অসংখ্য নারীর নাম রয়েছে, যারা নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন দেশের মুক্তির জন্য। তাঁদের মধ্যে অনেকেই ইতিহাসের পাতায় হারিয়ে গেছেন, আবার অনেকের নাম কিছুটা হলেও মানুষের মনে রয়ে গেছে। গার্গী দেবী সেইসব সাহসী নারীদের একজন, যিনি জীবনের স্বাচ্ছন্দ্য, নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন।
তাঁর সংগ্রাম কেবল রাজনৈতিক স্বাধীনতার জন্যই ছিল না, বরং নারীশিক্ষা, নারীর স্বাবলম্বন ও সামাজিক সমতার জন্যও তিনি কাজ করে গেছেন। এই প্রবন্ধে আমরা গার্গী দেবীর জীবন ও কর্মযাত্রার বিস্তারিত আলোচনায় যাব।

শৈশব ও পারিবারিক প্রেক্ষাপট

গার্গী দেবীর জন্ম ১৯১২ সালে অবিভক্ত বাংলার নদীয়া জেলার কৃষ্ণনগরে, এক শিক্ষিত ও সাংস্কৃতিক পরিবেশে সমৃদ্ধ পরিবারে। তাঁর বাবা ছিলেন স্কুল শিক্ষক এবং মা ছিলেন গৃহবধূ, যিনি ধর্মীয় হলেও প্রগতিশীল চিন্তাধারায় বিশ্বাস করতেন। ছোটবেলা থেকেই গার্গী দেবী সাহিত্য, সংগীত ও দেশপ্রেমমূলক আলোচনায় বড় হয়েছেন।
বাড়িতে স্বামী বিবেকানন্দ, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রচনার বই ছিল সর্বদা। এগুলোর প্রভাবেই তাঁর মনে দেশপ্রেম ও মানবতার বীজ অঙ্কুরিত হয়।

শিক্ষাজীবন

গার্গী দেবী প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন কৃষ্ণনগর গার্লস স্কুলে। এরপর উচ্চশিক্ষার জন্য কলকাতার বেথুন কলেজে ভর্তি হন। বেথুন কলেজ সে সময় নারীদের উচ্চশিক্ষার একমাত্র বড় কেন্দ্র ছিল এবং এখানেই তিনি রাজনৈতিক সচেতনতার প্রথম পাঠ পান।
কলেজ জীবনে তিনি ছাত্র রাজনীতিতে সক্রিয় হন এবং ব্রিটিশবিরোধী বক্তৃতা, সভা এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতে থাকেন। এখানেই তাঁর পরিচয় হয় সমসাময়িক নারী সংগ্রামী যেমন প্রীতি লতা ও বিনোদিনী দাসের সঙ্গে।

রাজনৈতিক জীবনের সূচনা

গার্গী দেবীর রাজনৈতিক জীবনের শুরু হয় ১৯২৮ সালে সাইমন কমিশন বয়কট আন্দোলনের মাধ্যমে। বেথুন কলেজের ছাত্রীরা তখন বিক্ষোভ মিছিল ও সভা সংগঠিত করেছিল, এবং গার্গী দেবী তার অন্যতম মুখ্য সংগঠক ছিলেন।
১৯৩০ সালের অসহযোগ আন্দোলনের সময় তিনি গান্ধীবাদী কর্মসূচিতে অংশ নেন, পাশাপাশি গোপনে বিপ্লবী সংগঠন যুগান্তর ও বঙ্গীয় যুব সংঘ-এর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেন।

বিপ্লবী কর্মকাণ্ড

গার্গী দেবী চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের সময় সূর্য সেনের বিপ্লবী দলের সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ রাখতেন। তিনি নারীর পোশাকের আড়ালে বিপ্লবীদের কাছে গোপন বার্তা পৌঁছে দিতেন, অস্ত্র লুকিয়ে রাখতেন, এমনকি আহত বিপ্লবীদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করতেন।
১৯৩২ সালে কলকাতায় এক ব্রিটিশ পুলিশের গোপন নথি চুরি করার অভিযানে তিনি সরাসরি অংশগ্রহণ করেন। এই নথি বিপ্লবীদের হাতে পৌঁছালে বহু গুরুত্বপূর্ণ ব্রিটিশ পরিকল্পনা ফাঁস হয়ে যায়।

গ্রেফতার ও কারাবাস

১৯৩৩ সালে ব্রিটিশ পুলিশ তাঁকে গ্রেফতার করে রাষ্ট্রদ্রোহ, ষড়যন্ত্র এবং অবৈধ অস্ত্র রাখার অভিযোগে। তাঁর বিরুদ্ধে প্রমাণ না থাকলেও, তাঁকে ১৮ মাস কারাদণ্ড দেওয়া হয়। কারাগারে গার্গী দেবী নারীবন্দীদের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা ছড়িয়ে দেন।
তিনি কারাগারে গান্ধীজীর “হিন্দ স্বরাজ” পড়াতেন, বিপ্লবীদের গান গাইতেন এবং কারা কর্তৃপক্ষের অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতেন। এই সময় তিনি অনশনও করেন, যা ব্যাপক আলোড়ন তোলে।

স্বাধীনতার পর সমাজসেবা

১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হওয়ার পর গার্গী দেবী রাজনীতিতে সক্রিয় না থেকে সামাজিক কাজে নিজেকে উৎসর্গ করেন। তিনি নারীদের জন্য শিক্ষা ও কর্মসংস্থানমূলক প্রকল্প চালু করেন। কলকাতার কালীঘাটে তিনি একটি মেয়েদের বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে অবহেলিত পরিবারের শিশুদের বিনামূল্যে পড়াশোনার সুযোগ দেওয়া হত।
তিনি একাধিক নারী সংগঠনের সভাপতি ছিলেন এবং নারী অধিকার রক্ষায় আইনি লড়াই চালিয়েছেন।

ব্যক্তিত্ব ও আদর্শ

গার্গী দেবী ছিলেন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, সৎ ও সাহসী। তিনি বিশ্বাস করতেন—

“স্বাধীনতা শুধু রাজনৈতিক নয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিকও হতে হবে।”

তিনি সর্বদা সরল জীবনযাপন করতেন এবং ব্যক্তিগত স্বার্থের চেয়ে জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতেন।

সমসাময়িকদের স্মৃতিচারণ

বিপ্লবী অনন্ত সিং একবার বলেছিলেন—

“গার্গী শুধু একজন নারী সংগ্রামী ছিলেন না, তিনি ছিলেন পুরুষদের সাহস জোগানো এক অদম্য প্রেরণা।”

উত্তরাধিকার

গার্গী দেবীর নাম আজ মূলধারার ইতিহাসে খুব বেশি উচ্চারিত হয় না, কিন্তু তাঁর অবদান অমূল্য। তিনি প্রমাণ করেছেন যে নারীর সাহস, বুদ্ধি ও দৃঢ়তা জাতির মুক্তি সংগ্রামে অপরিহার্য।
তাঁর জীবনী আজকের তরুণ প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করতে পারে—বিশেষ করে সেইসব মেয়েদের, যারা বড় স্বপ্ন দেখে এবং দেশের জন্য কিছু করতে চায়।

উপসংহার

গার্গী দেবীর জীবন কাহিনী কেবল স্বাধীনতার আন্দোলনের অংশ নয়, বরং নারীর মুক্তি ও সমাজ পরিবর্তনের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাঁর সংগ্রাম, ত্যাগ ও কর্মযজ্ঞ আমাদের শেখায় যে—সত্যিকারের দেশপ্রেম কেবল কথায় নয়, কাজে প্রকাশ পায়।

Share This
Categories
নারী কথা প্রবন্ধ

মাতঙ্গিনী হাজরা: ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক অমর নারী যোদ্ধা

প্রস্তাবনা

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে অসংখ্য পুরুষ বিপ্লবীর নাম আমরা জানি, কিন্তু নারীদের অবদানও ততটাই অনন্য ও অনুপ্রেরণামূলক। মাতঙ্গিনী হাজরা সেইসব নারীদের একজন, যিনি জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছেন। তিনি শুধুমাত্র বীরাঙ্গনা নন, বরং তাঁর জীবন আমাদের শেখায় যে দেশপ্রেম বয়সের সীমা মানে না। ব্রিটিশ শাসকের গুলি বুকে নিয়েও তিনি শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত “বন্দে মাতরম” ধ্বনি তুলেছিলেন।


শৈশব ও পারিবারিক জীবন

মাতঙ্গিনী হাজরার জন্ম ১৯ শতকের শেষভাগে, ১৯ শতকের ৬০-এর দশকে (আনুমানিক ১৮৬৯ সালে) তামলুক মহকুমার এক ছোট গ্রামে। গ্রামের সাধারণ এক কৃষক পরিবারে জন্মানো মাতঙ্গিনী ছোটবেলা থেকেই ছিলেন শান্ত, কিন্তু দৃঢ়চেতা। আর্থিক কষ্টের কারণে তিনি বিদ্যালয়ে যেতে পারেননি, তাই আনুষ্ঠানিক শিক্ষা তাঁর হয়নি। তবে গ্রামীণ পরিবেশ, লোকসংস্কৃতি এবং চারপাশের মানুষের জীবনযুদ্ধ তাঁকে জীবনের প্রথম পাঠ শিখিয়েছে— অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো ও অন্যের জন্য ত্যাগ স্বীকার করা।

মাত্র ১২ বছর বয়সে তাঁর বিয়ে হয় তমলুকেরই এক মধ্যবয়সী ব্যক্তির সঙ্গে। কিন্তু বিবাহিত জীবন বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। স্বামী মারা যাওয়ার পর মাতঙ্গিনী তরুণ বয়সেই বিধবা হয়ে পড়েন। সমাজ তখন বিধবাদের জন্য কঠোর নিয়ম বেঁধে দিয়েছিল, কিন্তু মাতঙ্গিনী সেই শৃঙ্খলকে নিজের ইচ্ছাশক্তি দিয়ে ভাঙতে শুরু করেন।


স্বাধীনতা আন্দোলনে যোগদানের প্রেরণা

তৎকালীন তমলুক মহকুমা ছিল স্বাধীনতা আন্দোলনের এক উর্বর ক্ষেত্র। গান্ধীজির অসহযোগ আন্দোলন, স্বদেশী ভাবধারা ও বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের ঢেউ গ্রামে গ্রামে ছড়িয়ে পড়ছিল। মাতঙ্গিনী ক্রমশ এই আন্দোলনের প্রতি আকৃষ্ট হন। তিনি বুঝতে পারেন, ব্রিটিশ শাসনের শোষণ থেকে মুক্ত না হলে দেশের মানুষের দুঃখ-দুর্দশা ঘুচবে না।

১৯৩২ সালে অসহযোগ আন্দোলনের সময় তিনি প্রথমবার সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। স্থানীয় কংগ্রেস কর্মীদের সঙ্গে মিলিত হয়ে তিনি মিছিল, সভা ও সচেতনতামূলক কর্মসূচিতে যোগ দেন। পুলিশের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মিছিল করার জন্য তাঁকে প্রথমবার গ্রেপ্তার করা হয়।


কারাবরণ ও সংগ্রামী জীবন

মাতঙ্গিনী হাজরার জীবনে কারাবাস ছিল একাধিকবারের ঘটনা। প্রথমবার গ্রেপ্তারের সময় তাঁর বয়স প্রায় ৬৩ বছর। তমলুক শহরে ব্রিটিশ বিরোধী মিছিলে যোগ দেওয়ার অপরাধে তাঁকে গ্রেপ্তার করে কোর্টে আনা হয়। কিন্তু বয়স ও স্বাস্থ্যের কারণে তাঁকে সতর্ক করে ছেড়ে দেওয়া হয়।

তবে সতর্কবার্তা তাঁর মনোবল ভাঙাতে পারেনি। তিনি গান্ধীজির ‘সত্যাগ্রহ’ নীতিকে জীবনের আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেন। খদ্দরের পোশাক পরা, চুল সাদা, মুখে শান্ত হাসি— এমন চেহারার এক বৃদ্ধা হলেও তাঁর অন্তরে ছিল অদম্য সাহস।


১৯৪২ সালের ভারত ছাড়ো আন্দোলন

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে ১৯৪২ সালের “ভারত ছাড়ো আন্দোলন” (Quit India Movement) ছিল এক ঐতিহাসিক অধ্যায়। মাতঙ্গিনী হাজরা তখন প্রায় ৭৩ বছরের বৃদ্ধা, কিন্তু তাঁর উদ্যম ও দেশপ্রেম তখনও অটুট।

৬ সেপ্টেম্বর ১৯৪২ সালে তমলুক মহকুমার কটালীপাড়ায় কংগ্রেসের আহ্বানে একটি বিশাল মিছিলের আয়োজন করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল— তমলুক থানা দখল করে জাতীয় সরকারের পতাকা ওড়ানো। মাতঙ্গিনী সেই মিছিলে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন হাতে জাতীয় পতাকা নিয়ে।


শেষ লড়াই ও শহিদি বরণ

ব্রিটিশ পুলিশ মিছিলে বাধা দেয় এবং ছত্রভঙ্গ করার জন্য গুলি চালায়। কিন্তু মাতঙ্গিনী পিছু হটেননি। তিনি সামনে এগিয়ে গিয়ে পুলিশদের উদ্দেশে বলেছিলেন—
“আপনারা গুলি চালান, আমি এগোবই।”

গুলি তাঁর শরীর ভেদ করলেও তিনি পতাকা উঁচিয়ে “বন্দে মাতরম” ধ্বনি তুলতে থাকেন। একে একে তিনটি গুলি তাঁর শরীরে লাগে— একটি হাতে, একটি বুকে, একটি কপালে। তবুও পতাকা মাটিতে ফেলেননি। পতাকা হাতে নিয়েই তিনি মৃত্যুবরণ করেন।


মৃত্যুর পর প্রতিক্রিয়া ও সম্মাননা

মাতঙ্গিনী হাজরার আত্মবলিদান সমগ্র তমলুক তথা বাংলায় গভীর প্রভাব ফেলে। তাঁর মৃত্যু সংবাদ মানুষের মনে ক্ষোভ ও প্রতিবাদের আগুন জ্বালিয়ে দেয়। তমলুক জাতীয় সরকার গঠনের ক্ষেত্রে তাঁর আত্মত্যাগ বিশেষ প্রেরণা হয়ে ওঠে।

স্বাধীনতার পরে মাতঙ্গিনী হাজরাকে নানা ভাবে স্মরণ করা হয়—

  • কলকাতার রেড রোডে তাঁর একটি মূর্তি স্থাপন করা হয়েছে, যা আজও শহিদ স্মৃতিস্তম্ভ হিসেবে পরিচিত।
  • তমলুক ও তার আশপাশে বহু রাস্তা, বিদ্যালয় ও প্রতিষ্ঠান তাঁর নামে নামকরণ করা হয়েছে।
  • পশ্চিমবঙ্গ সরকার প্রতি বছর তাঁর শহিদ দিবস পালন করে।

ব্যক্তিত্ব ও আদর্শ

মাতঙ্গিনী হাজরার জীবনদর্শনের মূল ভিত্তি ছিল—

  1. ত্যাগ — ব্যক্তিগত কষ্ট ও সামাজিক অপমানকে উপেক্ষা করে দেশের জন্য আত্মদান।
  2. অহিংসা — গান্ধীজির নীতি অনুসরণ করে শান্তিপূর্ণ উপায়ে আন্দোলন করা।
  3. অদম্য সাহস — বারবার পুলিশের গুলি ও গ্রেপ্তারি সত্ত্বেও পিছিয়ে না যাওয়া।

উত্তরাধিকার

আজকের প্রজন্মের কাছে মাতঙ্গিনী হাজরা কেবল ইতিহাসের একটি নাম নন, বরং সাহস ও দেশপ্রেমের জীবন্ত প্রতীক। তাঁর জীবন শেখায়—

  • স্বাধীনতা কখনো বিনা মূল্যে আসে না।
  • বয়স বা শারীরিক সীমাবদ্ধতা দেশসেবার পথে বাধা নয়।
  • সত্য ও ন্যায়ের পথে চললে মৃত্যু পর্যন্তও ভয় পাওয়া উচিত নয়।

উপসংহার

মাতঙ্গিনী হাজরা ছিলেন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের এক অদম্য সৈনিক, যিনি বৃদ্ধ বয়সেও নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন মাতৃভূমির জন্য। তাঁর আত্মত্যাগ আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয়— স্বাধীনতা রক্ষার জন্য দেশের প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব আছে।

আজ আমরা স্বাধীনতার সুফল ভোগ করছি, কিন্তু এই স্বাধীনতার পিছনে থাকা শহিদদের কথা স্মরণ রাখা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। মাতঙ্গিনী হাজরার জীবন আমাদের অনুপ্রেরণা দেয়— যে কোনো যুগে, যে কোনো পরিস্থিতিতে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোই প্রকৃত দেশপ্রেম।

 

Share This
Categories
নারী কথা প্রবন্ধ

ফুলন দেবী (১৯৬৩–২০০১): দস্যু রানী থেকে সংসদ সদস্য হয়ে রাষ্ট্রীয় প্রতীক।

ভারতের আধুনিক ইতিহাসে কয়েকজন ব্যক্তি এমনভাবে আলোচিত হয়েছেন যেভাবে ফুলন দেবীর নামে পরিচয় পেয়েছিলেন—‘দস্যু রানী’। তিনি ছিলেন মানুষের নীচু বর্ণ থেকে উঠে আসা এক নারীবাদী প্রতীক। নিঃস্ব, নির্যাতিত এক কন্যা থেকে দস্যু-নেত্রী, কারাগারে বন্দী, সংসদ সদস্য, এবং শেষপর্যন্ত রাজনৈতিক হত্যার শিকার—ফুলন দেবীর জীবন ছিল এক প্রেম, প্রতিশোধ, রাজনীতি ও সামাজিক পরিবর্তনের জটিল ছায়ালিপি।


1. প্রারম্ভিক জীবন ও পটভূমি

  • ফুলন দেবী জন্মেছিলেন ১৯৬৩ সালের ১০ আগস্ট উত্তরপ্রদেশের জালৌন জেলার ঘোড়া কা পুরওয়া গ্রামে, একটি ‘মাল্লা’ সম্প্রদায়ে—যা সমাজে ‘নিম্নবর্ণ’ হিসেবে গণ্য।
  • তার গ্রাম ও পরিবারের অভাব-দারিদ্র্য ও বৈষম্যের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে।

2. নির্যাতন, স্বামীর অত্যাচার ও বাধ্যতামূলক বিবাহ

  • মাত্র ১১ বছর বয়সে তাকে বিয়ে দেওয়া হয়, এবং পরবর্তীতে তিনি শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হন।
  • শারীরে ও মানসিকভাবে ভোজ্য তিনি পরিবারের ভয় ও সামাজিক অবজ্ঞার ঝাঁঝ వరারে বন্দী হলেন।

3. নির্যাতন ও প্রতিশোধের পথ: ডাকাত দলের আত্মগঠন

  • চিন্তিত ও ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি ডাকাত দলের সঙ্গে যুক্ত হন। পরবর্তীতে দলনেতা বিক্রম মাল্লা হয়ে ওঠেন, যিনি তাকে সম্মান ও ক্ষমতা প্রদান করেন।
  • ১৯৮১ সালে, বেহমাই গ্রামে গণধর্ষণ এবং তার পরবর্তী প্রতিশোধ ঘটায় নেতৃত্ব দেন—এতে ঠাকুর সম্প্রদায়ের ২২ জন পুরুষকে দাঁড়িয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়।
  • এই ঘটনা ভারতের রাজনীতিতে উত্তালতার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে এবং প্রায় মুখ্যমন্ত্রী ওয়াল্টার পদত্যাগের কারণও হয়ে দাঁড়ায়।

4. আত্মসমর্পণ, কারাগার জীবন ও মুক্তি

  • ১৯৮৩ সালে, নির্দিষ্ট শর্তসহ তিনি মধ্যপ্রদেশে আত্মসমর্পণ করেন।
  • তাঁকে কারাভোগ শেষে ১৯৯৪ সালে মুক্তি দেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন।

5. রাজনিতিতে ফেরা এবং সংসদ সদস্য নির্বাচন

  • মুক্তির পর তিনি সমাজবাদী পার্টিতে যোগ দেন এবং ১৯৯৬ সালে মির্জাপুর থেকে লোকসভা নির্বাচনে জয়লাভ করেন, সংসদ সদস্য হন।
  • পরবর্তীতে ১৯৯৯ সালে পুনরায় সংসদ সদস্য হন।
  • রাজনীতি ও কর্মী হিসেবে তিনি জনসাধারণের উন্নয়ন, নারী ও দলিত অধিকার নিয়ে কাজ করতে উদ্যত ছিলেন।

6. গণমাধ্যম ও আত্মজীবনী: বহুমাত্রিক বর্ণনা

  • ১৯৯৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘Bandit Queen’ (ব্যাণ্ডিট কুইন) চলচ্চিত্র তাঁর জীবনকে রহস্যময়ভাবে তুলে ধরে, যা নিয়ে তিনি আপত্তি জানিয়ে আদালতে মামলা করেন, পরে £৪০,০০০ ক্ষতিপূরণ পান।
  • তাঁর আত্মজীবনী ‘I, Phoolan Devi’ লেখেন ফরাসিতে, পরে ইংরেজি সহ বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়।
  • এই গ্রন্থ ও ছবি তাঁকে দারিদ্র্য ও অবহেলিত নারীদের জন্য বিশেষ প্রতীকী করে তোলে।

7. হত্যাকাণ্ড এবং পরিণতি

  • ২৫ জুলাই ২০০১, দিল্লির নিজের বাড়ির বাইরে তিনি গুলিবিদ্ধ হন এবং মৃত্যুবরণ করেন।
  • হত্যাকারী ছিলেন শের সিং রানা, যিনি প্রতিশোধমূলকভাবে এই অপরাধ করে—বেহমাই হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করেই এই ঘটনা ঘটায়।

8. স্মৃতযজ্ঞ ও ধারা

  • ফুলন দেবী হয়ে উঠেছেন দলিত, নিপীড়িত, নারী ও নিম্নবর্গীয় শ্রেণির মানুষদের এক প্রতীকী প্রতিভূ।
  • তাঁর উপর লেখা বই, চলচ্চিত্র, অনলাইন প্রচার ও আলেপ আলোচনা তাঁকে ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য চরিত্রে পরিণত করেছে।
  • কিছু রাজনীতিক তাঁর উপর ভাস্কর্য স্থাপনের প্রস্তাব করেছেন—তার ক্ষমতা ও জনপ্রিয়তা আজও সমানভাবে আলোচিত।

উপসংহার

ফুলন দেবীর জীবনের কাহিনি জাতিগত, লিঙ্গ ও শ্রেণি নির্ভর বৈষম্যের বিরুদ্ধে এক মানবিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক লড়াই। নির্যাতনের পর প্রতিশোধের মাধ্যমে দুঃখের মানচিত্র রচনা করে, তিনি একটি প্রতিবাদের পুরুষোচিত প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন। তার জীবন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় এক নারী কীভাবে অত্যাচার থেকে উঠে আসতে পারে—রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর হয়ে—তখনকার সমাজে অভ্যুত্থানের এক অনন্য নমুনা।


বিস্তারিত রেফারেন্স সমূহ:

  • ফুলন দেবীর জীবন ও রাজনৈতিক কর্মজীবন: উইকিপিডিয়া
  • বেহমাই হত্যাকাণ্ড ও প্রতিশোধের প্রতিচ্ছবি: বাংলা উইকিপিডিয়া ও গণমাধ্যম
  • চলচ্চিত্র ‘Bandit Queen’ ও আত্মজীবনী:
Share This
Categories
নারী কথা প্রবন্ধ

পুষ্পলতা দাশ: অসমের সাহসী কন্যা ও ভারতের নারী স্বাধীনতা সংগ্রামের অগ্রদূত।

✦ ভূমিকা

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে নারীদের অবদান যতখানি গুরুত্বপূর্ণ, ততখানি প্রেরণাদায়কও বটে। অসংখ্য নারী তাঁদের জীবন উৎসর্গ করেছেন জাতীয় মুক্তির স্বপ্ন পূরণের জন্য। এই মহান নারীদের মধ্যে অন্যতম হলেন পুষ্পলতা দাশ। অসমের এই সাহসিনী শুধু স্বাধীনতা সংগ্রামেই অংশ নেননি, বরং সমাজ সংস্কার, নারী শিক্ষা, সাংস্কৃতিক উন্নয়ন এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বেও ছিলেন অনন্য। তিনি আজও অসমবাসীর কাছে এক প্রেরণার প্রতীক।
এই প্রবন্ধে আমরা পুষ্পলতা দাশের জন্ম, শৈশব, স্বাধীনতা সংগ্রামে ভূমিকা, কারাবাস, সামাজিক অবদান এবং তাঁর উত্তরাধিকার নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।

✦ জন্ম ও শৈশবকাল

পুষ্পলতা দাশ জন্মগ্রহণ করেন ১৯১৫ সালের ২৭ মার্চ, আসামের উত্তর লখিমপুর জেলায়। তাঁর পিতা ছিলেন আইনজীবী এবং মাতা ছিলেন একজন গৃহিণী, যিনি পরিবারে জাতীয়তাবাদী ভাবধারা লালন করতেন। শৈশব থেকেই পুষ্পলতা রাজনৈতিক আলোচনা ও জাতীয় আন্দোলনের গল্প শুনে বড় হয়েছিলেন।
তাঁর পরিবারে দেশপ্রেমের যে পরিবেশ ছিল, তা তাঁর চিন্তা ও জীবনদর্শন গঠনে গভীর প্রভাব ফেলে। ছোটবেলা থেকেই তিনি দৃঢ়চেতা, স্পষ্টভাষী এবং অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন।

✦ শিক্ষাজীবন

পুষ্পলতা দাশের প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় আসামের স্থানীয় স্কুলে। পরে তিনি গৌহাটি এবং শিলংয়ে পড়াশোনা করেন। উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি কলকাতায় যান এবং ক্যালকাটা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। কলেজ জীবনে তিনি ছাত্র আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন এবং ‘স্বদেশী’ ও ‘অসহযোগ’ আন্দোলনের প্রভাব তাঁর মনে গভীরভাবে পড়ে।
ছাত্রাবস্থায়ই তিনি লালন করতেন নারী জাগরণ ও শিক্ষার স্বপ্ন। পরে এই স্বপ্নই তাঁকে নারী অধিকার আন্দোলনের পথিকৃৎ করে তোলে।

✦ স্বাধীনতা আন্দোলনে যোগদান

পুষ্পলতা দাশের রাজনৈতিক জীবনের সূচনা ঘটে ১৯৩০ সালের দিকে, যখন মহাত্মা গান্ধীর ডাকে সাড়া দিয়ে দেশজুড়ে সিভিল অবিডিয়েন্স মুভমেন্ট শুরু হয়। অল্প বয়সেই তিনি কংগ্রেসে যোগ দেন এবং অসম প্রদেশ কংগ্রেস কমিটির সক্রিয় কর্মী হয়ে ওঠেন।
১৯৩১ সালে, অখিল অসম ছাত্রী সম্মেলন-এর সভাপতি নির্বাচিত হন তিনি। এই প্ল্যাটফর্ম থেকে তিনি নারী শিক্ষার প্রসার, সামাজিক কুসংস্কারের বিরুদ্ধে আন্দোলন, এবং স্বাধীনতার বার্তা প্রচার করতে থাকেন।

✦ সল্ট সত্যাগ্রহ ও কারাবাস

গান্ধীজীর লবণ সত্যাগ্রহ আন্দোলনে পুষ্পলতা দাশ সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। অসমে মহিলাদের লবণ উৎপাদনে উদ্বুদ্ধ করা, বিদেশি পণ্যের বয়কট, ব্রিটিশবিরোধী মিছিল—এসব কর্মকাণ্ডে তাঁর নেতৃত্ব ছিল দৃশ্যমান।
১৯৩২ সালে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে তাঁকে গ্রেফতার করা হয় এবং কয়েক মাসের জন্য কারারুদ্ধ করা হয়। কারাগারে থাকাকালীন তিনি অন্য মহিলা বন্দিদের স্বশিক্ষা ও রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধির কাজ চালিয়ে যান।

✦ ১৯৪২-এর ভারত ছাড়ো আন্দোলন

১৯৪২ সালে কংগ্রেস ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনের ডাক দিলে পুষ্পলতা দাশ অসমে আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মুখ হয়ে ওঠেন। এই সময় তিনি অসমের বিভিন্ন গ্রামে গিয়ে মানুষকে ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে আহ্বান জানান।
পুলিশ একাধিকবার তাঁকে গ্রেফতার করে। তিনি দীর্ঘ কারাবাস ভোগ করেন, কিন্তু তাঁর মনোবল ভাঙেনি। বরং কারাগার থেকে বেরিয়ে আবারও আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন।

✦ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কাজ

স্বাধীনতার পরে পুষ্পলতা দাশ নিজেকে কেবল রাজনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি। তিনি নারী শিক্ষা ও ক্ষমতায়নের জন্য বহু উদ্যোগ নেন। অসম মহিলা সমিতি-এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে তিনি নারীদের স্বাস্থ্য, স্বনির্ভরতা এবং অধিকার নিয়ে কাজ করেন।
তাছাড়া, তিনি আসামের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষা এবং প্রচারে বড় ভূমিকা রাখেন। সাহিত্য, নাটক, সঙ্গীত এবং লোকসংস্কৃতির প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ ছিল।

✦ রাজনৈতিক জীবন

পুষ্পলতা দাশ স্বাধীনতার পরে কংগ্রেসের রাজনীতিতে সক্রিয় থাকেন। তিনি অসম বিধানসভায় নির্বাচিত হন এবং পরবর্তীতে রাজ্যসভার সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। সংসদে তিনি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নারী অধিকার এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের উন্নয়ন সংক্রান্ত বিষয়ে সোচ্চার ছিলেন।

✦ ব্যক্তিগত জীবন

পুষ্পলতা দাশ বিয়ে করেছিলেন ওমিও কুমার দাস-কে, যিনি ছিলেন অসমের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ এবং সমাজকর্মী। তাঁদের দাম্পত্য জীবন ছিল দেশ ও সমাজসেবার কাজে নিবেদিত। দুজন মিলে শিক্ষার প্রসারে বহু প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন।

✦ সম্মান ও স্বীকৃতি

পুষ্পলতা দাশ তাঁর আজীবন সংগ্রাম ও অবদানের জন্য একাধিক পুরস্কার ও সম্মান লাভ করেন। ভারত সরকার তাঁকে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত করে। এছাড়াও বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংস্থা তাঁর কাজের স্বীকৃতি দিয়েছে।

✦ শেষ জীবন

পুষ্পলতা দাশ জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সমাজসেবায় নিয়োজিত ছিলেন। তিনি ২০০৩ সালের ৯ নভেম্বর মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যু অসম ও সমগ্র দেশের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি ছিল।

✦ উত্তরাধিকার

পুষ্পলতা দাশ শুধু একজন স্বাধীনতা সংগ্রামী নন; তিনি নারী মুক্তি, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক জাগরণের এক প্রতীক। তাঁর জীবন আজও তরুণ প্রজন্মকে শেখায়—সাহস, দৃঢ়তা, ত্যাগ ও নিষ্ঠা থাকলে কোনো লক্ষ্যই অসম্ভব নয়।

✦ উপসংহার

অসমের এক ছোট্ট শহরে জন্ম নেওয়া এই নারী ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে লড়াই করে, সমাজ সংস্কারের নেতৃত্ব দিয়ে এবং রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা রেখে প্রমাণ করেছিলেন যে নারীর ক্ষমতা অসীম। পুষ্পলতা দাশের জীবন কেবল ইতিহাসের একটি অধ্যায় নয়, বরং আজও নারীর ক্ষমতায়ন ও জাতীয়তাবাদের এক জীবন্ত অনুপ্রেরণা।

Share This
Categories
নারী কথা প্রবন্ধ

কল্পনা দত্ত: ভারতের বিপ্লবী সংগ্রামের এক সাহসিনী কন্যা।

🔰 ভূমিকা

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে বহু নারী বীরাঙ্গনার নাম আমরা জানি, কিন্তু কল্পনা দত্ত (পরে কল্পনা যোশী) তাঁদের মধ্যে বিশেষভাবে স্মরণীয়—কারণ তিনি ছিলেন যুগান্তর বিপ্লবী দলের এক সক্রিয় সদস্যা, যিনি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সশস্ত্র সংগ্রামে অংশ নিয়েছিলেন।
যে সময় নারীদের মূলত ঘরের চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার প্রচলন ছিল, সে সময় কল্পনা দত্ত নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন দেশের মুক্তির জন্য।


👶 শৈশব ও শিক্ষাজীবন

কল্পনা দত্ত জন্মগ্রহণ করেন ২৭ জুলাই ১৯১৩ সালে, চট্টগ্রামের (বর্তমান বাংলাদেশ) একটি সম্ভ্রান্ত পরিবারে। তাঁর পিতা ছিলন তিলক দত্ত, যিনি ব্রিটিশ সরকারের এক কর্মচারী। পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভালো থাকলেও কল্পনা ছোট থেকেই স্বাধীনচেতা এবং দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ ছিলেন।

তিনি প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন চট্টগ্রামেই। পরে উচ্চশিক্ষার জন্য কলকাতায় আসেন এবং বেথুন কলেজে ভর্তি হন। এখানেই তিনি প্রথম রাজনৈতিক চেতনার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত হন। কলেজ জীবনে তিনি ছাত্র আন্দোলন, স্বদেশী প্রচার এবং দেশীয় পণ্যের ব্যবহার নিয়ে সচেতনতা তৈরিতে যুক্ত হন।


🚩 স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে যোগদান

কলকাতায় পড়াশোনার সময় কল্পনা দত্তের সঙ্গে পরিচয় হয় সুভাষচন্দ্র বসুর আদর্শে প্রভাবিত ছাত্রছাত্রীদের একদল সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মীর। এই সময় তিনি যুগান্তর বিপ্লবী দল-এর সঙ্গে যুক্ত হন।

১৯৩০ সালে মাস্টারদা সূর্য সেন চট্টগ্রামে সশস্ত্র আন্দোলন সংগঠিত করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এই খবর কল্পনা দত্তকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। তিনি কলেজ ছেড়ে চট্টগ্রামে ফিরে আসেন এবং সরাসরি মাস্টারদার নেতৃত্বাধীন বিপ্লবী দলে যোগ দেন।


⚔ চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুঠ অভিযানে ভূমিকা

১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল মাস্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্বে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুঠ অভিযান চালানো হয়। যদিও কল্পনা দত্ত সরাসরি মূল আক্রমণে অংশ নেননি, তিনি অভিযান-পরবর্তী পরিকল্পনা, বার্তা আদানপ্রদান, এবং বিপ্লবীদের নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করার কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

চট্টগ্রামের গ্রামাঞ্চলে তিনি কৃষক পরিবারগুলির মধ্যে দেশপ্রেমের বার্তা ছড়িয়ে দেন এবং বিপ্লবীদের সঙ্গে জনসাধারণের সংযোগ স্থাপন করেন।


🛡 গোপন কার্যকলাপ ও নারীর ভূমিকা

ব্রিটিশ পুলিশ তখন বিপ্লবীদের ধরতে সর্বাত্মক চেষ্টা চালাচ্ছিল। কল্পনা দত্ত, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, এবং অন্যান্য নারী কর্মীরা পুরুষ বিপ্লবীদের নিরাপদে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পৌঁছে দেওয়ার কাজ করতেন।

তিনি নারীদের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা তৈরিতে বিশেষভাবে কাজ করেন। গ্রামের মেয়েদের আত্মরক্ষার কৌশল শেখানো, বিপ্লবীদের জন্য খাদ্য ও তথ্য সরবরাহ করা—এসব কাজে তাঁর সাহস ছিল অসাধারণ।


🎯 প্রীতিলতার শহিদ হওয়ার পর

১৯৩২ সালে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণ করে শহিদ হন। এই ঘটনার পর কল্পনা দত্তকে মাস্টারদা সূর্য সেনের সরাসরি সঙ্গিনী হিসেবে কাজ করার দায়িত্ব দেওয়া হয়।

তাঁরা দু’জনে চট্টগ্রামের গ্রামীণ অঞ্চলে গোপন আস্তানা বদলে বদলে পুলিশের চোখ এড়িয়ে চলছিলেন। কিন্তু ব্রিটিশ গুপ্তচরদের খবরের ভিত্তিতে ১৯৩৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে পুলিশ তাঁদের ঘিরে ফেলে।


⛓ গ্রেপ্তার ও বিচার

১৯৩৩ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি কল্পনা দত্ত ব্রিটিশ পুলিশের হাতে ধরা পড়েন। মাস্টারদা সূর্য সেন একই সময়ে ধরা পড়েন এবং পরে তাঁকে নৃশংসভাবে ফাঁসি দেওয়া হয়।

কল্পনা দত্তের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ, হত্যাচেষ্টা এবং ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহের অভিযোগ আনা হয়। তাঁকে আজীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

কারাগারে তিনি অমানবিক নির্যাতনের শিকার হন। দীর্ঘদিন একাকী সেলে বন্দি থাকতে হয়। কিন্তু তাঁর মনোবল ভাঙেনি।


🕊 মুক্তি ও পরবর্তী জীবন

১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরুর পর রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় ব্রিটিশ সরকার। এর ফলে কল্পনা দত্তও মুক্তি পান।

মুক্তির পর তিনি ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সক্রিয় সদস্য হন এবং শ্রমিক আন্দোলন, নারী অধিকার আন্দোলন ও কৃষক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থাকেন।


💍 ব্যক্তিগত জীবন

মুক্তির কিছু বছর পর কল্পনা দত্ত বিয়ে করেন কমিউনিস্ট নেতা পিসি যোশী-কে। বিয়ের পর তাঁর নাম হয় কল্পনা যোশী। যদিও রাজনৈতিক মতপার্থক্য ও ব্যক্তিগত কারণবশত তাঁদের সম্পর্ক পরবর্তীতে বিচ্ছিন্ন হয়, তবুও কল্পনা সারাজীবন সামাজিক ও রাজনৈতিক কাজে নিবেদিত ছিলেন।


📖 সাহিত্যকর্ম ও স্মৃতিকথা

কল্পনা দত্ত তাঁর জীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বই লেখেন—
“Chittagong Armoury Raiders: Reminiscences”
এতে তিনি চট্টগ্রাম বিপ্লব, মাস্টারদা সূর্য সেন, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, এবং নিজের সংগ্রামের বিবরণ লিপিবদ্ধ করেছেন।

এই বই আজও স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক অমূল্য দলিল হিসেবে বিবেচিত হয়।


🏅 সম্মান ও স্বীকৃতি

যদিও কল্পনা দত্তের নাম আজ সাধারণ মানুষের মধ্যে খুব বেশি প্রচলিত নয়, ইতিহাসবিদরা তাঁকে ভারতের নারী বিপ্লবীদের মধ্যে অন্যতম অগ্রণী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন।

পশ্চিমবঙ্গ সরকার এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন তাঁর স্মরণে অনুষ্ঠান আয়োজন করে। তাঁর জীবন নিয়ে তথ্যচিত্রও নির্মিত হয়েছে।


✊ কল্পনা দত্তের আদর্শ

কল্পনা দত্ত আমাদের শিখিয়ে গেছেন—

  1. নারী যদি সংকল্পবদ্ধ হয়, তবে দেশমাতৃকার জন্য যেকোনও ত্যাগ স্বীকার করতে পারে।
  2. বিপ্লব কেবল পুরুষের কাজ নয়; নারীরাও এর সমান অংশীদার।
  3. অন্যায় শাসনের বিরুদ্ধে গোপন ও প্রকাশ্য—দুই ধরনের লড়াই সমান গুরুত্বপূর্ণ।

🔚 উপসংহার

কল্পনা দত্ত ছিলেন এমন এক সংগ্রামী যিনি নিজের পড়াশোনা, আরাম-আয়েশ, এমনকি জীবন পর্যন্ত উৎসর্গ করেছিলেন দেশের স্বাধীনতার জন্য। চট্টগ্রামের বিপ্লবী আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা ছিল অমূল্য।

যতদিন ভারতের স্বাধীনতার ইতিহাস লেখা হবে, ততদিন কল্পনা দত্তের নাম স্মরণে থাকবে একজন অগ্নিকন্যা হিসেবে—যিনি নির্ভীকভাবে বলেছিলেন:

“দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন দিতেও প্রস্তুত আছি।”


 

Share This
Categories
নারী কথা প্রবন্ধ

বাংলা চলচ্চিত্র, থিয়েটার এবং বাঙালি লোকনাট্যের কিংবদন্তি অভিনেত্রী গীতা দে – জন্ম দিবসে শ্রদ্ধাঞ্জলি।।।।।

গীতা দে ৫ আগস্ট ১৯৩১ সালে জন্ম গ্রহন করেন তিনি ছিলেন বাংলা চলচ্চিত্র, থিয়েটার এবং বাংলা লোক নাটকের একজন ভারতীয় অভিনেত্রী। ছয় বছর বয়সে তিনি মঞ্চ শিল্পী হিসেবে আবির্ভূত হন। ১৯৩৮ সালে, তিনি কলকাতার টালিগঞ্জে বাংলা চলচ্চিত্র জগতে একজন অভিনেত্রী হিসেবে শুরু করেন। ধীরেন গাঙ্গুলি-পরিচালিত আহুতিতে ছয় বছর বয়সে শিশু শিল্পী হিসেবে তার অভিনয়ে আত্মপ্রকাশ করেন।

বাবা অনাদিবন্ধু মিত্র মেয়ের গান ও অভিনয়ে প্রবল ঝোঁক দেখে তাকে প্রতিবেশী গায়িকা রাধারানী দেবীর কাছে তালিম নেওয়ার ব্যবস্থা করে দেন। তাঁর কাছেই গীতা দের প্রথম জীবনের নাচ, গান, অভিনয় শিক্ষা।
১৯৩৭ সালে মাত্র ছ’বছর বয়সে তিনি ‘আহুতি’ নামে একটি বাংলা ছবিতে অভিনয়ের সুযোগ পান। ছবিটির পরিচালক ছিলেন ধীরেন গাঙ্গুলি। এরপরের ছবি ‘দম্পতি’ এবং ‘নন্দিতা’। পরিচালকরা যথাক্রমে ছিলেন নীরেন লাহিড়ী এবং সুকুমার দাশগুপ্ত।
তিনি চলচ্চিত্র জগতে প্রবেশ করেন ১৯৪৪ সালে। তিনি দুই শতাধিক বাংলা ভাষার চলচ্চিত্র এবং দুই হাজারের বেশি মঞ্চ নাটকে অভিনয় করেছেন। গ্রুপ থিয়েটারে তিনি অভিনয় করেছেন বেশ কিছু বিখ্যাত পরিচালকের সঙ্গে। যেমন তুলসী লাহিড়ী, শম্ভু মিত্র, তুলসী চক্রবর্তী, জ্ঞানেশ মুখার্জি, কালী সরকার, কানু ব্যানার্জি, দিলীপ রায় প্রমুখের সঙ্গে।
তিনি সত্যজিৎ রায় এবং ঋত্বিক ঘটকের মেঘে ঢাকা তারা, সুবর্ণরেখা, কোমল গান্ধার, কত আজনারে, তিন কন্যার মতো ছবিতে অভিনয় করেছেন।১৯৫৬ ছিল তাঁর কাছে একটি যুগান্তকারী বছর। সে বছর প্রখ্যাত পরিচালক ঋত্বিক ঘটকের স‍‌ঙ্গে তাঁর আলাপ করিয়ে দেন অভিনেতা কালী ব্যানার্জি। ঋত্বিক ঘটক সম্পর্কে তিনি বলেছেন- ‘ক্যামেরার ব্যবহার এবং শট গ্রহণের ব্যাপারে এত বড় মাপের পরিচালক তিনি আর দেখেননি। তিনি আমার জন্য বেশ কিছু ফিল্মের কথা ভেবেছিলেন। কিন্তু শেষপর্যন্ত ‍‌সেগুলি আর বাস্তবায়িত হয়নি।’৬০ বছরের অভিনয় জীবনে উল্লেখ করার মত তাঁর অভিনীত অজয় করের সাত পাকে বাঁধা, নৌকাডুবি, মাল্যদান, অরবিন্দ মুখার্জির নিশিপদ্ম, দুই ভাই, বর্ণচোরা, মৌচাক ইত্যাদি ছবির নাম। বিভিন্ন ছবিতে বিভিন্ন চরিত্রে তিনি অভিনয় করেছেন সাবলীলভাবে। চরিত্রগুলির মধ্যে সহজে ঢুকে যেতে পারতেন বলে দর্শকরা আনন্দ পেতেন।
তিনি ১৯৫৪ সাল থেকে অল ইন্ডিয়া রেডিওর সাথে যুক্ত ছিলেন এবং রেডিও নাটকে বেশ কয়েকটি সহায়ক ভূমিকা পালন করেছিলেন। তবে তার শেষ নাটক ছিল বাদশাহী চল।১৯৯৬ সালে উত্তর কলকাতার রঙ্গনা মঞ্চে এই নাটকটি পরিচালনা করেছিলেন গণেশ মুখোপাধ্যায়। তিনি বিভিন্ন চলচ্চিত্রে বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন। তিনি এই চলচ্চিত্রগুলিতে তার বহুমুখী পদ্ধতির জন্য সর্বাধিক পরিচিত। তার অভিনয় এমনকি কিংবদন্তি লরেন্স অলিভিয়ারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। তিনি নেতিবাচক এবং কৌতুক উভয় ভূমিকাতেই পারদর্শী ছিলেন।

তিনি বেশ কয়েকটি হিন্দি চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেছিলেন; যার মধ্যে ২০০৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত বিদ্যা বালান এবং সঞ্জয় দত্ত অভিনীতপরিণীতা উল্লেখযোগ্য।
তাঁর অভিনীত চলচ্চিত্রের তালিকা———–
ইন্দ্রাণী, মেঘে ঢাকা তারা, কোমল গান্ধার, ডাইনী, কাঠিন মায়া, কাঞ্চন মূল্য, সাথী হারা, দুই ভাই, তিন কন্যা, কাঁচের স্বর্গ, শুভ দৃষ্টি, বন্ধন, বর্ণচোরা, সাত পাকে বাঁধা, দুই বাড়ী, ছায়া সূর্য, অভয়া ও শ্রীকান্ত, শেষ পর্যন্ত, পিতা পুত্র, নিশিপদ্মা, ময়দান, মৌচাক, বাঘ বন্দী খেলা, দম্পতি, দত্তা, সূর্য সখি, হিরের শিকল, মহাপৃথিবী, সন্তান, কথবশেশান, পরিণীতা, টলি লাইটস, চিরদিনি তুমি যে আমার, নৌকা ডুবি, আহবান (চলচ্চিত্র)।

পুরস্কার ও সম্মাননা—

তিনি বাংলা চলচ্চিত্র জগতে আজীবন অবদানের জন্য কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন গভর্নর সৈয়দ নুরুল হাসানের কাছ থেকে একটি তারকা পদক পেয়েছিলেন (১৯৮৮)। রাষ্ট্রপতি পুরস্কারও (বাংলা চলচ্চিত্র ও নাট্যশালায় আজীবন অবদানের জন্য)।

মৃত্যু——-

গীতা দে ১৭ জানুয়ারি ২০১১ তারিখে ৭৯ বছর বয়সে কলকাতায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

।।তথ্য : সংগৃহীত উইকিপিডিয়া ও বিভিন্ন ওয়েবসাইট।।

Share This
Categories
নারী কথা প্রবন্ধ

বাংলাদেশের প্রথম নারী পাইলট : সৈয়দা কানিজ ফাতেমা রোকসানা।।।।।

বাংলাদেশের প্রথম নারী পাইলট : সৈয়দা কানিজ ফাতেমা রোকসানাআজকের দিনেই বিমান দুর্ঘটনায় প্রয়াত হন।১৯৭৯ সালের ২৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের প্রথম নারী পাইলট হিসেবে নিয়োগপত্র পান রোকসানা। তবে আকাশে উড়ে বেড়ানোর স্বপ্ন খুব বেশি দিন স্থায়ী হয়নি তাঁর। নিয়োগের পাঁচ বছরের মাথায় ১৯৮৪ সালের ৫ আগস্ট বিমান দুর্ঘটনায় মারা যান রোকসানা।

বাংলাদেশের ইতিহাসে যে কয়টি ভয়ংকর বিমান দুর্ঘটনা রয়েছে, সেগুলোর মধ্যে এটি ছিল অন্যতম।
পুরো নাম সৈয়দা কানিজ ফাতেমা রোকসানা। ডাক নাম তিতলী আর প্রিয়জনদের কাছে ‘লিটল আপা’। বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত্ব বিমান সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স-এর প্রথম নারী বৈমানিক। তিনি ক্যাপ্টেন পদাধিকারী ছিলেন। ১৯৭৭ সালে তিনি বাণিজ্যিক বিমান পরিচালনার সনদ লাভ করেন।
তার জন্ম ১৯৫৬ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি একটি সাধারণ মধ্যবিত্ত ঘরে। তার ডাক নাম ছিলো ‘তিতলী’, যার অর্থ ‘প্রজাপতি’। নামের প্রভাব যেন তার উপর ষোলো আনা পড়েছিল। তখনকার সমাজব্যবস্থা নারীর জন্য ছিল খুবই রক্ষণশীল। কিন্তু সেই রক্ষণশীল সমাজে থেকেও প্রজাপতির মতো ডানা মেলে ওড়ার স্বপ্ন দেখেছেন তিনি। শুধু স্বপ্ন দেখেই থেমে থাকেননি, স্বপ্ন সত্যি করে নাম লিখিয়েছেন ইতিহাসের পাতায়। হয়েছেন দেশের প্রথম নারী পাইলট। তবে চিরাচরিত নিয়ম ভেঙে হুঁট করেই ইতিহাসের পাতায় নাম লেখাতে পারেননি তিনি। এর জন্য সমাজ ও নিয়মের বিরুদ্ধে গিয়ে লড়াই চালাতে হয়েছে তাকে।
রোকসানা ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী এবং নানান গুণে পারদর্শী একজন নারী। ছিলেন রেডিও-টেলিভিশনের নামকরা একজন সংগীতশিল্পীও। তৎকালীন সময়ে জার্মান ভাষার ডিপ্লোমাধারী। যা মোটেই সহজ ব্যাপার নয়। হাতের সামনে ছিল জার্মানির মেডিক্যালের স্কলারশিপ। চোখের সামনে উঁকি দিচ্ছিল উজ্জ্বল এক ভবিষ্যৎ। তবে তিনি অন্য দশজন সাধারণ মানুষের মতো নিচে থেকে নয়, জীবনকে উপভোগ করতে চেয়েছেন নীল আকাশে উড়তে উড়তে। তাইতো অনায়াসে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন জার্মানির মেডিক্যালের স্কলারশিপ। তারপর বিএসসিতে ভর্তি হন ঢাকার অন্যতম প্রসিদ্ধ উচ্চ শিক্ষালয় ইডেন কলেজে। কিন্তু অন্তরে তার অন্য বাসনা।
পাইলট হওয়ার স্বপ্ন কখনোই তার পিছু ছাড়েনি। ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ ফ্লাইং ক্লাব খুঁজে বের করে সেখানে যোগ দেন। এর ঠিক দুই বছরের মাথায় ১৯৭৮ সালে পেয়ে যান কমার্শিয়াল বিমান চালানোর লাইসেন্স। শুধু তাই নয়, সঙ্গে পেয়ে যান সহ-প্রশিক্ষকের লাইসেন্স। যার মাধ্যমে বহু শিক্ষানবীশকে ‘সেসনা’ ও ‘উইজিয়ন’ প্লেন চালানো শেখালেন। আর এভাবেই সমাজকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে স্বপ্ন-পূরণের লক্ষ্যে তার এগিয়ে চলা শুরু।
তাকে দমিয়ে দেয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হয় সব মহল থেকে। কিন্তু কোনোভাবেই থেমে থাকেননি এই নারী। সমস্ত বাধা পেরিয়ে এরপর ১৯৭৯ সালের ২৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ও মুসলিম বিশ্বের প্রথম মহিলা পাইলট হিসেবে নিয়োগপত্র পান এই নারী। দেশের সামরিক ইতিহাসে প্রশিক্ষণকালে সার্বিক বিষয়ে শ্রেষ্ঠ কৃতিত্বের জন্য ‘সোর্ড অব অনার’ লাভ করা তিনিই প্রথম নারী পাইলট। এরপরের ইতিহাস কেবলই গৌরবের। পরবর্তী বছরগুলোতে প্রায় ৬ হাজার ঘণ্টা বিমান পরিচালনার কৃতিত্ব অর্জন করেন তিনি।
তবে তার আকাশে ডানা মেলে ওড়ার পালা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। নিয়োগের পাঁচ বছরের মাথায় ১৯৮৪ সালের ৪ আগস্ট এক মর্মান্তিক বিমান দুর্ঘটনায় অকাল মৃত্যু বরণ করেন তিনি। বাংলাদেশের ইতিহাসে যে কয়টা ভয়ঙ্কর বিমান দুর্ঘটনা রয়েছে, তার মধ্যে এটি অন্যতম। বন্দরনগরী চট্টগ্রাম থেকে ফকার এফ-২৭ বিমানে করে ঢাকা বিমানবন্দরে অবতরণের সময় বৃষ্টিবিঘ্নিত আবহাওয়ার দরুন বিমান দুর্ঘটনার শিকার হয়ে নিহত হন। প্রচণ্ড বৃষ্টি ছিল সেদিন। একই বিমান দুর্ঘটনায় ৪৫ জন যাত্রীসহ ৪জন ক্রু সদস্য নিহত হন। নিহতদের মধ্যে একজন ব্রিটিশ নাগরিক, একজন জাপানী এবং ৩৩জন মধ্যপ্রাচ্য থেকে আগত বাংলাদেশী ছিলেন।কেউ বাঁচেনি অভিশপ্ত বিমানের।চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় আগত অভ্যন্তরীণ এই ফ্লাইটটি অত্যধিক বৃষ্টিপাতের কারণে দুইবার অবতরণের চেষ্টা করেও রানওয়ে খুজে পেতে ব্যার্থ হয়, তৃতীয়বার অবতরণের চেষ্টার সময় বিমানটি রানওয়ে থেকে ৫০০ মিটার আগেই এক জলাভূমিতে পতিত হয়ে বিধ্বস্ত হয়।
পরে তদন্তে প্রমাণ মেলে ওই বিমানে যান্ত্রিক ত্রুটি ছিল।
সৈয়দা কানিজ ফাতেমার আয়ূষ্কাল মাত্র সাড়ে আটাশ বছরের হলেও তিনি সেই অল্প সময়টাতেই রচনা করেছেন নতুন ইতিহাস, যা তাকে বাঁচিয়ে রাখবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে। ‘লিটল আপা’ উড়তে শিখিয়ে গেছেন পরের প্রজন্মের নারীদের। তার স্মৃতি রক্ষার্থে ‘রোকসানা ফাউন্ডেশন’ এর উদ্যোগে ১৯৮৫ সালের জুলাই থেকে ‘মাসিক রোকসানা’ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশিত হতে শুরু করে।

।। তথ্য : সংগৃহীত উইকিপিডিয়া ও বিভিন্ন ওয়েবসাইট।।

Share This