শহরের এক পুরোনো পাড়ায় থাকতেন অবসরপ্রাপ্ত রেলকর্মী শশাঙ্কবাবু। স্ত্রী মারা যাওয়ার পর থেকে তাঁর দিনগুলো কেমন যেন নিঃশব্দ হয়ে গিয়েছিল। সকালে খবরের কাগজ পড়া, দুপুরে সামান্য খাওয়াদাওয়া, আর বিকেলে বাড়ির বারান্দায় বসে রাস্তার মানুষজনকে দেখা—এই ছিল তাঁর প্রতিদিনের জীবন।
একদিন বিকেলে পাশের বাড়িতে নতুন ভাড়াটে এল। বাড়িটিতে উঠল দশ বছরের মেয়ে তিতলি, তার মা এবং ছোট ভাই। তিতলি ছিল ভীষণ চঞ্চল। সারাদিন তার মুখে নানা প্রশ্ন, চোখে নতুন কিছু জানার কৌতূহল।
বাড়ির বারান্দায় শশাঙ্কবাবুকে একা বসে থাকতে দেখে তিতলি একদিন জিজ্ঞাসা করল, “দাদু, আপনি রোজ এখানে বসে কী দেখেন?”
শশাঙ্কবাবু একটু হেসে বললেন, “মানুষ দেখি, পাখি দেখি, আর বিকেলের আকাশ দেখি।”
“আকাশ দেখে কী হয়?”
“রং বদলাতে দেখি।”
তিতলি আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, “কিন্তু আকাশ তো রোজই নীল! আবার রং বদলায় কী করে?”
শশাঙ্কবাবু অবাক হলেন। বহুদিন পরে কেউ তাঁকে এমন সহজ অথচ গভীর একটি প্রশ্ন করেছিল। তিনি তিতলিকে বোঝালেন, সূর্য ডোবার সময় আলো ও মেঘের অবস্থার কারণে আকাশে নানা রং দেখা যায়। তিতলি মন দিয়ে শুনল। তারপর বলল, “কাল থেকে আমিও আপনার সঙ্গে আকাশ দেখব!”
পরদিন বিকেলে সে একটি ছোট খাতা ও রঙিন পেনসিল নিয়ে হাজির হল। আকাশে যে রং দেখল, খাতায় আঁকল। কোনও দিন কমলা, কোনও দিন গোলাপি, কোনও দিন ধূসর মেঘের ফাঁকে সোনালি আলো।
শশাঙ্কবাবু প্রথমে শুধু তিতলির আঁকা দেখতেন। পরে তিনিও খাতায় ছোট ছোট নোট লিখতে শুরু করলেন—কোন দিন আকাশ পরিষ্কার ছিল, কোন দিন বাতাসে মেঘ ভেসে এসেছিল, কোন দিন সূর্যাস্তের রং ছিল অন্য রকম।
এভাবেই তাঁদের মধ্যে বন্ধুত্ব গড়ে উঠল।
একদিন তিতলি স্কুল থেকে মন খারাপ করে ফিরল। ছবির প্রতিযোগিতায় সে পুরস্কার পায়নি। তার সহপাঠীর আঁকা ছবি নির্বাচিত হয়েছে। তিতলি নিজের খাতা বন্ধ করে বলল, “আমি আর ছবি আঁকব না। আমার ছবি ভালো নয়।”
শশাঙ্কবাবু কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর নিজের ঘর থেকে বহু পুরোনো একটি ছবি নিয়ে এলেন। ছবিতে দেখা যাচ্ছে, এক তরুণ রেলকর্মী পাহাড়ের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। ছবিটির রং অনেকটা ফিকে হয়ে গেছে।
“এটা কে?” তিতলি জানতে চাইল।
“আমি। চাকরির প্রথম দিকে একবার পাহাড়ে গিয়েছিলাম। তখন ছবি তুলতে খুব ভালোবাসতাম।”
“আপনি কি ছবি আঁকতেন?”
“চেষ্টা করতাম। কিন্তু আমার আঁকা কোনও ছবিই তখন খুব ভালো হত না। একবার এক বন্ধু বলেছিল, আমার হাতে নাকি শিল্পীর গুণ নেই। তারপর ধীরে ধীরে আঁকা ছেড়ে দিয়েছিলাম।”
তিতলি অবাক হয়ে বলল, “তাহলে আপনি আর আঁকেননি কেন? আপনার বন্ধুর কথা কি সত্যি ছিল?”
শশাঙ্কবাবু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। “সেটাই তো বুঝতে পারিনি। অন্যের একটি কথাকে নিজের জীবনের শেষ সিদ্ধান্ত বলে মেনে নিয়েছিলাম।”
তিনি তিতলির খাতা খুলে দেখলেন। সেখানে আঁকা সূর্যাস্তের ছবিগুলো নিখুঁত ছিল না। কোথাও রং ছড়িয়ে গেছে, কোথাও মেঘের আকার ঠিকমতো ফুটে ওঠেনি। কিন্তু প্রতিটি ছবিতে আলাদা একটি অনুভূতি ছিল।
তিনি বললেন, “একটি প্রতিযোগিতা ঠিক করে দিতে পারে না তুমি কতটা ভালো ছবি আঁকতে পারো। পুরস্কার একটি দিনের ফলাফল। শেখা আর চেষ্টা অনেক দিনের যাত্রা।”
তিতলি কিছুক্ষণ ছবিগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর নতুন একটি পাতা খুলে আবার আঁকতে শুরু করল।
এরপর থেকে শুধু তিতলি নয়, শশাঙ্কবাবুও ছবি আঁকার চেষ্টা করতে লাগলেন। তিনি বাজার থেকে নতুন রং কিনলেন। প্রথম কয়েক দিন তাঁর হাত কাঁপত, রেখা বেঁকে যেত। তবু তিনি থামলেন না।
কয়েক মাস পরে পাড়ার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে শিশুদের আঁকা ছবি প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা হল। তিতলি সেখানে নিজের সূর্যাস্তের ছবিটি জমা দিল। শশাঙ্কবাবুও জমা দিলেন তাঁর আঁকা একটি ছবি—পুরোনো বাড়ির বারান্দায় বসে থাকা এক বৃদ্ধের সামনে বিস্তৃত রঙিন আকাশ।
ছবিটি দেখে অনেকে থমকে দাঁড়ালেন। ছবিতে খুব নিখুঁত কারিগরি ছিল না, কিন্তু একাকিত্বের মধ্যে নতুন করে বাঁচার আনন্দ স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল।
তিতলি কোনও পুরস্কার পেল না, শশাঙ্কবাবুও পেলেন না। তবু অনুষ্ঠান শেষে দুজনের মুখেই হাসি ছিল।
সন্ধ্যায় বারান্দায় বসে তিতলি বলল, “দাদু, আজ পুরস্কার না পেয়েও আমার খুব ভালো লাগছে।”
শশাঙ্কবাবু আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন, “কারণ আজ তুমি অন্যের সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করোনি। নিজের আনন্দটাকে নিজেই চিনতে পেরেছ।”
সূর্য তখন দিগন্তের আড়ালে নেমে যাচ্ছিল। আকাশে ছড়িয়ে পড়ছিল কমলা আর বেগুনির মিশ্র আলো। তিতলি খাতা খুলে আঁকতে শুরু করল। পাশে বসে শশাঙ্কবাবুও রং মেলাতে লাগলেন।
সেদিন তাঁরা বুঝেছিলেন, জীবনের বিকেল মানেই সবকিছু শেষ হয়ে যাওয়া নয়। কখনও কখনও শেষ বিকেলের আলোতেই নতুন শুরুর সবচেয়ে সুন্দর রং ফুটে ওঠে।
শিক্ষা: অন্যের মতামত বা একটি ব্যর্থতার কারণে নিজের আগ্রহকে শেষ করে দেওয়া উচিত নয়। সাফল্যের আনন্দ শুধু পুরস্কার পাওয়ায় নয়, শেখার পথে এগিয়ে চলা এবং নিজের কাজের মধ্যে আনন্দ খুঁজে পাওয়ার মধ্যেও লুকিয়ে থাকে।