Categories
অনুগল্প বিবিধ

অনুগল্প: শূন্য মাঠের গোলপোস্ট।।।

গ্রামের প্রান্তে একটা বড় মাঠ ছিল। একসময় সেখানে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ছেলেমেয়েদের ভিড় লেগে থাকত। ফুটবল, ক্রিকেট, দৌড়—সবই চলত।

কিন্তু কয়েক বছর ধরে মাঠটা প্রায় ফাঁকা।

শুধু দুটো পুরনো লোহার গোলপোস্ট দাঁড়িয়ে ছিল।

একদিন বিকেলে তেরো বছরের নীলয় স্কুল থেকে ফেরার পথে মাঠের ধারে দাঁড়াল। তার হাতে ফুটবল।

সে অনেকক্ষণ গোলপোস্ট দুটির দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর একা একাই বল নিয়ে খেলতে শুরু করল।

কিছুক্ষণ পর পাশের বাড়ির রোহন এসে বলল,

—“একা খেলছিস?”

নীলয় বলল,

—“দল নেই তো।”

রোহন হাসল,

—“দল বানাতে হয়।”

পরদিন তারা আরও দুজনকে নিয়ে এল।

তারপর পাঁচজন।

তারপর দশজন।

কিন্তু সমস্যা হল—কারও কাছে ভালো বল নেই, কারও জুতো নেই, কারও আবার জার্সি নেই।

তবুও খেলা থামল না।

একদিন গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত ক্রীড়াশিক্ষক অরুণবাবু মাঠের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ছেলেদের খেলা দেখলেন।

তারপর বললেন,

—“কে কোচ হবে?”

সবাই একসঙ্গে বলল,

—“আপনি!”

অরুণবাবু হেসে ফেললেন।

সেই দিন থেকে প্রতিদিন বিকেলে তিনি মাঠে আসতে শুরু করলেন।

শুধু ফুটবল শেখাতেন না—শৃঙ্খলা, পরিশ্রম আর একে অন্যকে সম্মান করাও শেখাতেন।

একদিন নীলয় বলল,

—“স্যার, আমরা কি কখনও বড় দলের সঙ্গে খেলতে পারব?”

অরুণবাবু বললেন,

—“আগে নিজেদের মধ্যে বড় হও।”

কয়েক মাস পর গ্রামের দলটি ব্লক পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় নামল।

তারা প্রথম ম্যাচেই হেরে গেল।

ছেলেরা মন খারাপ করে মাঠের এক পাশে বসে ছিল।

অরুণবাবু বললেন,

—“হেরেছিস বলে এত চুপ কেন?”

রোহন বলল,

—“আমরা পারিনি।”

অরুণবাবু বললেন,

—“আজ হারিসনি। আজ শিখেছিস কোথায় আরও ভালো হতে হবে।”

পরের বছর তারা আবার প্রতিযোগিতায় গেল।

এবার ফাইনাল পর্যন্ত উঠল।

শেষ ম্যাচে এক গোলে পিছিয়ে ছিল তারা।

খেলা শেষ হতে মাত্র কয়েক মিনিট।

নীলয় বল পেল।

সামনে শুধু গোলপোস্ট।

সে শট নিল।

বল পোস্টে লেগে বাইরে চলে গেল।

খেলা শেষ।

তারা দ্বিতীয়।

সবাই হতাশ।

কিন্তু অরুণবাবু হাততালি দিতে শুরু করলেন।

একজন বলল,

—“স্যার, আমরা তো হেরে গেলাম!”

অরুণবাবু বললেন,

—“এই মাঠটা মনে আছে?”

সবাই চুপ।

—“এক বছর আগে এই মাঠে কেউ খেলত না। ওই দুইটা গোলপোস্ট শুধু দাঁড়িয়ে থাকত। আজ তোমরা একটা দল হয়ে এখানে দাঁড়িয়ে আছিস। বল তো, সত্যিই হেরেছিস?”

নীলয় মাথা তুলল।

তার চোখে জল, কিন্তু মুখে হাসি।

বছর কয়েক পরে সেই গ্রামের মাঠে একটি ছোট্ট প্রশিক্ষণ কেন্দ্র তৈরি হল।

নীলয় বড় হয়ে ফুটবল কোচ হল।

একদিন নতুন এক ছোট ছেলে মাঠে এসে জিজ্ঞেস করল,

—“দাদা, এখানে কি ফুটবল শেখানো হয়?”

নীলয় বলল,

—“হ্যাঁ।”

ছেলেটি বলল,

—“আমার জুতো নেই।”

নীলয় নিজের পুরনো জুতোর জোড়া খুলে তার হাতে দিল।

—“জুতো পরে খেলতে হয় না। আগে মাঠে নামতে হয়।”

ছেলেটি জুতো হাতে নিয়ে অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

দূরে তখন সেই পুরনো গোলপোস্ট দুটো এখনও দাঁড়িয়ে।

একসময় যে মাঠ ছিল শূন্য, সেখানে এখন প্রতিদিন অসংখ্য শিশুর স্বপ্ন ছুটে বেড়ায়।

কিছু জায়গা নিজে থেকে বদলে যায় না। একজন মানুষ প্রথম পা বাড়ালে, তার পেছনে অনেকগুলো পা এগিয়ে আসে।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *