Categories
অনুগল্প বিবিধ

অনুগল্প: শেষ মাটির প্রদীপ।।।

শহর থেকে একটু দূরে ছোট্ট এক গ্রামে থাকতেন কুমোর গদাধর পাল। তাঁর সংসার বলতে একমাত্র নাতনি পিউ আর মাটির কাজের ছোট্ট ঘর।

সারা বছর তিনি মাটির হাঁড়ি, কলসি, প্রদীপ আর পুতুল বানাতেন। কিন্তু আগের মতো আর বিক্রি হতো না। বাজারে প্লাস্টিক আর বৈদ্যুতিক সাজসজ্জা এসে তাঁর মাটির জিনিসের কদর কমিয়ে দিয়েছিল।

তবু গদাধর প্রতিদিন চাকা ঘোরাতেন।

পিউ মাঝে মাঝে বলত,

—“ঠাকুরদা, এত কষ্ট করে মাটির জিনিস বানাও কেন?”

গদাধর হেসে বলতেন,

—“মাটি কখনও পুরনো হয় না রে। শুধু মানুষ তার দিকে তাকানো বন্ধ করে দেয়।”

সেবার শীতের শেষে গ্রামে বড় উৎসব হবে। গদাধর ঠিক করলেন, অনেকগুলো মাটির প্রদীপ বানাবেন।

দিনরাত পরিশ্রম করে তিনি প্রদীপ তৈরি করলেন।

কিন্তু উৎসবের দিন দেখা গেল, কেউ প্রদীপ কিনতে চাইছে না।

সবাই বৈদ্যুতিক আলো কিনছে।

দিনের শেষে গদাধরের ঝুড়িতে পড়ে রইল মাত্র একটি প্রদীপ।

পিউ বলল,

—“এটাও বিক্রি হল না।”

গদাধর প্রদীপটা হাতে নিয়ে মৃদু হাসলেন।

—“সব জিনিস বিক্রি হওয়ার জন্য তৈরি হয় না।”

সন্ধ্যা নামল।

উৎসবের মাঠের এক কোণে হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেল। চারদিকে অন্ধকার।

মানুষজন ছোটাছুটি শুরু করল।

কেউ পথ দেখতে পাচ্ছে না।

গদাধর তাঁর ঝুড়ির শেষ প্রদীপটা বের করলেন। তাতে একটু তেল ঢেলে সলতে জ্বালালেন।

ছোট্ট আলোটা অন্ধকারে জ্বলে উঠল।

একজন বৃদ্ধা সেই আলো দেখে রাস্তা খুঁজে পেলেন।

তারপর একজন শিশু।

তারপর আরও কয়েকজন।

কেউ প্রদীপটার আলো অনুসরণ করে বাড়ির পথে গেল, কেউ আবার সেই আলোয় পড়ে যাওয়া জিনিস খুঁজে পেল।

কিছুক্ষণ পর বিদ্যুৎ ফিরে এল।

সবাই আবার উৎসবে ব্যস্ত হয়ে গেল।

কিন্তু পরদিন সকালে গদাধরের দোকানের সামনে অদ্ভুত দৃশ্য।

অনেক মানুষ দাঁড়িয়ে।

একজন বললেন,

—“কাকু, কাল আপনার প্রদীপটা না থাকলে আমার মা বাড়ি ফিরতে পারতেন না।”

আরেকজন বললেন,

—“আমার মেয়েটা অন্ধকারে পড়ে গিয়েছিল। ওই আলো দেখে ওকে খুঁজে পেয়েছি।”

গদাধর কিছু বললেন না।

সেদিন তাঁর দোকান থেকে সব প্রদীপ বিক্রি হয়ে গেল।

কিন্তু গল্পটা সেখানেই শেষ নয়।

পরের বছর গ্রামের উৎসবের আগে পঞ্চায়েত থেকে গদাধরের কাছে এল কয়েকজন তরুণ।

তারা বলল,

—“কাকু, এবার আমরা আপনার সঙ্গে মাটির প্রদীপ বানাব।”

গদাধর অবাক হয়ে বললেন,

—“তোমরা?”

একজন হেসে বলল,

—“গত বছর আমরা বুঝেছি, আলো বড় হওয়াটাই গুরুত্বপূর্ণ নয়। আলো কারও কাজে লাগছে কি না, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ।”

গদাধরের চোখ ভিজে উঠল।

তিনি চাকার ওপর নতুন মাটি চাপালেন।

পিউ পাশে বসে বলল,

—“ঠাকুরদা, এবার অনেক প্রদীপ বানাব তো?”

গদাধর মাটির দলাটাকে আকার দিতে দিতে বললেন,

—“হ্যাঁ রে। তবে মনে রাখিস—”

তিনি একটু থামলেন।

—“একটা ছোট আলোও কখনও কখনও অনেক বড় অন্ধকারের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে।”

সেদিন থেকে গ্রামের উৎসবে বৈদ্যুতিক আলোর পাশাপাশি শত শত মাটির প্রদীপ জ্বলতে শুরু করল।

আর প্রতিটি প্রদীপের নিচে ছোট করে লেখা থাকত—

“আলো যতটুকুই হোক, কারও পথ যেন অন্ধকার না থাকে।”

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *