Categories
গল্প

কুয়োর ধারে রাখা চাবি।

শালবনের শেষ প্রান্তে ছোট্ট একটা গ্রাম—নবগ্রাম। গ্রামের মাঝখানে ছিল একটা পুরোনো কুয়ো। একসময় সেই কুয়োর জলেই গ্রামের অর্ধেক মানুষের সংসার চলত। ভোর হলেই মেয়েরা কলসি নিয়ে আসত, কৃষকেরা গরুকে জল খাওয়াত, ছেলেমেয়েরা স্কুলে যাওয়ার আগে মুখ ধুয়ে নিত।

কিন্তু বছর কয়েক ধরে গ্রামের মানুষ কুয়োটাকে প্রায় ভুলেই গিয়েছিল।

পাশের পাকা রাস্তার ধারে একটা গভীর নলকূপ বসেছিল। সবাই সেখান থেকেই জল নিত। পুরোনো কুয়োটার চারপাশে আগাছা জন্মেছিল। ইটের দেওয়ালে শ্যাওলা, পাশে শুকনো পাতা আর ভাঙা ডাল জমে ছিল।

কুয়োটার পাশে একটা ছোট্ট টিনের ঘর ছিল।

সেই ঘরে থাকতেন গ্রামের বৃদ্ধা কমলা বউদি।

স্বামী বহু বছর আগে মারা গিয়েছিলেন। একমাত্র ছেলে কাজের সন্ধানে শহরে গিয়ে আর ফিরেনি। কমলা বউদি একাই থাকতেন। গ্রামের লোকজন তাঁকে ভালোবাসত, কিন্তু তাঁর এক অদ্ভুত অভ্যাস ছিল।

প্রতিদিন সন্ধ্যায় তিনি কুয়োটার চারপাশ ঝাড়ু দিতেন।

একদিন গ্রামের স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্রী মেঘলা তাঁকে জিজ্ঞেস করল,

—“বউদি, এই কুয়োটা তো কেউ ব্যবহারই করে না। আপনি রোজ পরিষ্কার করেন কেন?”

কমলা বউদি ঝাড়ু থামিয়ে মেঘলার দিকে তাকালেন।

হেসে বললেন,

—“সবকিছু ব্যবহার করার জন্যই বাঁচিয়ে রাখতে হয় না রে। কিছু জিনিস ভবিষ্যতের জন্য রেখে দিতে হয়।”

মেঘলা কথাটার মানে বুঝতে পারল না।

—“কিন্তু ভবিষ্যতে এটা কে ব্যবহার করবে?”

কমলা বউদি কুয়োটার দিকে তাকিয়ে বললেন,

—“যার দরকার হবে।”

তারপর আর কিছু বললেন না।


কয়েক মাস পর নবগ্রামে ভয়াবহ গরম পড়ল।

পুকুর শুকিয়ে গেল। নলকূপে ভিড় বাড়তে লাগল। সকালে জল নিতে এসে মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছিল।

একদিন দুপুরে নলকূপটাও হঠাৎ খারাপ হয়ে গেল।

গ্রামের মানুষ দিশেহারা।

কেউ বলল,

—“মিস্ত্রি না এলে আজ জল পাওয়া যাবে না।”

কেউ বলল,

—“আর একটা নলকূপ বসাতে হবে।”

মেঘলার মনে হঠাৎ কমলা বউদির কথা এল।

সে দৌড়ে কুয়োর কাছে গেল।

কুয়োর চারপাশে আগাছা পরিষ্কার করা। পুরোনো দড়ি একপাশে রাখা। একটা লোহার বালতি ঝুলছে।

কিন্তু কুয়োর মুখে একটা তালা।

মেঘলা অবাক হয়ে গেল।

ঠিক তখন কমলা বউদি এসে দাঁড়ালেন।

—“কী হয়েছে?”

—“বউদি, কুয়োতে তালা কেন?”

কমলা বউদি আঁচলের ভাঁজ থেকে একটা ছোট্ট চাবি বের করলেন।

বললেন,

—“কারণ কুয়ো শুধু জল নয়, দায়িত্বও।”

মেঘলা চাবিটার দিকে তাকিয়ে রইল।

কমলা বউদি তালা খুলে দিলেন।

কুয়োর ভিতরে পরিষ্কার জল দেখা গেল।

মেঘলা অবাক।

—“এত জল!”

কমলা বউদি মৃদু হেসে বললেন,

—“আমি জানতাম একদিন দরকার হবে।”


খবর ছড়িয়ে পড়তেই গ্রামের মানুষ কুয়োর কাছে জড়ো হল।

প্রথমে সবাই অবাক। তারপর আনন্দ।

কিন্তু কমলা বউদি একটা শর্ত দিলেন।

—“এই জল সবাই নেবে। কিন্তু কুয়ো নোংরা করা যাবে না। আর প্রতিদিন দুজন করে পাহারা দেবে।”

গ্রামের কয়েকজন যুবক বলল,

—“এত নিয়মের দরকার কী?”

কমলা বউদি শান্ত গলায় বললেন,

—“যে জিনিসের মূল্য বোঝা যায় না, সেটা বেশিদিন টেকে না।”

সেদিন থেকেই গ্রামের মানুষ পালা করে কুয়ো দেখাশোনা শুরু করল।

মেঘলা প্রতিদিন স্কুল থেকে ফিরে কুয়োর পাশে এসে দাঁড়াত। সে খাতায় হিসাব লিখতে শুরু করল—কত পরিবার জল নিল, কতবার কুয়ো পরিষ্কার করা হল, কোথায় মেরামতি দরকার।

কয়েকদিনের মধ্যেই মেঘলার মাথায় একটা পরিকল্পনা এল।

সে স্কুলের বিজ্ঞান শিক্ষকের কাছে গিয়ে বলল,

—“স্যার, আমরা কি কুয়োর জল সংরক্ষণ করতে পারি?”

শিক্ষক বললেন,

—“অবশ্যই। শুধু কুয়ো থাকলেই হবে না, তার চারপাশের জলও মাটিতে ঢোকাতে হবে।”

স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা মিলে কুয়োর পাশে ছোট ছোট জলধারণের গর্ত তৈরি করল। বর্ষার জল যাতে নষ্ট না হয়ে মাটির নিচে ঢুকে যায়, তার ব্যবস্থা করা হল।

গ্রামের লোকজনও সাহায্য করল।

কেউ মাটি কাটল, কেউ ইট আনল, কেউ গাছ লাগাল।

কমলা বউদি দূরে বসে সব দেখতেন।

একদিন মেঘলা তাঁর কাছে গিয়ে বলল,

—“বউদি, আপনি আগে থেকেই এসব জানতেন?”

কমলা বউদি হেসে বললেন,

—“সব জানতাম না। শুধু জানতাম, আজকের সুবিধার জন্য আগামীকালকে নষ্ট করা উচিত নয়।”


বর্ষা এল।

প্রথম বৃষ্টির দিন মেঘলা ছুটে গেল কুয়োর কাছে।

চারপাশের ছোট ছোট গর্তে জল জমছে। ধীরে ধীরে সেই জল মাটির ভিতরে ঢুকে যাচ্ছে।

কয়েক সপ্তাহ পর কুয়োর জল আরও বেড়ে গেল।

গ্রামের মানুষ বুঝতে পারল, পুরোনো কুয়ো শুধু অতীতের স্মৃতি নয়—ভবিষ্যতের নিরাপত্তাও।

পঞ্চায়েতের পক্ষ থেকে কুয়োটার চারপাশে পাকা ঘাট তৈরি করার উদ্যোগ নেওয়া হল।

কিন্তু কমলা বউদি বললেন,

—“ঘাট বানাও, ভালো কথা। কিন্তু আমার একটা কথা রাখবে?”

সবাই জানতে চাইল,

—“কী কথা?”

তিনি বললেন,

—“কুয়োটার চাবি একজনের হাতে থাকবে না। গ্রামের স্কুলের একটা চাবি থাকবে, মহিলাদের দলের একটা থাকবে, আর পঞ্চায়েতের কাছেও একটা থাকবে।”

সবাই রাজি হল।

মেঘলা তখন হেসে বলল,

—“তাহলে আপনার চাবিটা?”

কমলা বউদি নিজের পুরোনো চাবিটা মেঘলার হাতে দিয়ে বললেন,

—“এটা তুই রাখ।”

মেঘলা অবাক হয়ে বলল,

—“আমি?”

—“হ্যাঁ। কারণ তুই প্রশ্ন করেছিলি—‘ভবিষ্যতে এটা কে ব্যবহার করবে?’ এখন তার উত্তরও তুই জানিস।”

মেঘলার চোখে জল এসে গেল।

সে চাবিটা শক্ত করে মুঠোয় ধরে বলল,

—“আমি এটা হারাব না।”

কমলা বউদি বললেন,

—“চাবি হারালে তালা খোলে না। কিন্তু মনে রাখিস, শুধু চাবি সামলালেই হবে না—যে জিনিসের তালা খোলার দায়িত্ব পেয়েছিস, সেটাও সামলাতে হয়।”


বছর কেটে গেল।

মেঘলা বড় হয়ে জলসম্পদ নিয়ে পড়াশোনা করল। পরে সে অন্য গ্রামেও জল সংরক্ষণের কাজ শুরু করল।

নবগ্রামের সেই পুরোনো কুয়ো তখন গ্রামের পরিচয়ের অংশ।

কুয়োর পাশে একটা ছোট ফলক লাগানো হয়েছিল—

“যে জল আজ বাঁচে, সে জলই আগামীকাল জীবন বাঁচায়।”

কমলা বউদি তখন আর ছিলেন না।

তাঁর টিনের ঘরটিও একদিন ভেঙে গিয়েছিল।

কিন্তু কুয়োর পাশের একটা ছোট কাঠের বাক্সে আজও রাখা আছে সেই পুরোনো চাবি।

মেঘলা যখনই গ্রামে আসে, বাক্সটা খুলে চাবিটা হাতে নেয়।

চাবিটা এখন আর কোনো তালা খোলে না।

তবু তার মূল্য কমেনি।

কারণ সেটি তাকে মনে করিয়ে দেয়—

ভবিষ্যৎ কখনও হঠাৎ তৈরি হয় না।

আজ আমরা যে ছোট্ট ভালো কাজটা করি, যত্ন করে যে সামান্য সম্পদটুকু বাঁচিয়ে রাখি, একদিন সেটাই হয়তো বহু মানুষের জীবন রক্ষা করবে।

আর কখনও কখনও—

একটা ছোট্ট চাবির মধ্যেই লুকিয়ে থাকে একটা গ্রামের ভবিষ্যৎ।

সমাপ্ত।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *