Categories
উপন্যাস বিবিধ

উপন্যাস : আয়নার ওপারে যে মেয়েটি- (তৃতীয় পর্ব: যে মুখটি আয়নার ছিল না)।

রাত তখন দুটো সতেরো।

আয়নার ওপারের অন্ধকার করিডরে দাঁড়িয়ে তিয়াসা বুঝতে পারছিল, এই জায়গাটা কোনও সাধারণ ঘর নয়। চারদিকে দেয়াল থাকলেও সেগুলোর গায়ে লেগে আছে অসংখ্য স্মৃতি—কোথাও দুর্গাপুজোর আলো, কোথাও মায়ের শাড়ির আঁচল, কোথাও বাবার সাইকেলের ঘণ্টা, আবার কোথাও ছোট্ট তারার হাসি। স্মৃতিগুলো যেন পুরোনো সিনেমার দৃশ্যের মতো ভেসে উঠছে, মিলিয়ে যাচ্ছে।

তারার হাত শক্ত করে ধরে ছিল তিয়াসা।

বারো বছর আগে যে বোনকে সে মৃত বলে মেনে নিয়েছিল, সেই বোন আজ তার সামনে। অথচ তারার চেহারায় বারো বছরের কোনও পরিবর্তন নেই। সেই একই ছোট্ট মুখ, একই চোখ, একই লাল ফিতের স্মৃতি জাগানো চুল। যেন সময় তারাকে ছুঁতেই পারেনি।

করিডরের শেষ প্রান্তে বিশাল একটা আয়না।

তার মধ্যে দেখা যাচ্ছে তাদের পুরোনো বাড়ির সেই ঘর। জানলার বাইরে পুজোর আলো, ঘরের এক কোণে কাঠের আলমারি, আর মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে ষোলো বছরের তিয়াসা।

কিন্তু সেই তিয়াসার মুখে এমন এক অভিব্যক্তি, যা দেখে বর্তমানের তিয়াসার বুক ঠান্ডা হয়ে গেল।

সে হাসছে।

ঠিক সেই হাসি, যা আয়নায় প্রথম দেখেছিল তিয়াসা—যখন তার নিজের মুখে কোনও হাসি ছিল না।

তার পাশে দাঁড়িয়ে ছোট্ট তারা। সে কাঁদছে, আর বারবার আয়নার দিকে তাকিয়ে বলছে, “দিদি, ওটা তুই নোস!”

বর্তমানের তিয়াসা কাচের দিকে এগিয়ে গেল।

“এটা কী দেখছি আমরা?”

তারা মাথা নাড়ল।

“সেই রাত। যে রাতটার কথা আমরা কেউ ঠিক করে মনে রাখতে পারিনি।”

“কিন্তু আমি তো মনে করতে পারি! আগুন লেগেছিল। আমি তোকে খুঁজতে গিয়েছিলাম। তারপর—”

“তারপর কী হয়েছিল, দিদি?”

তিয়াসা উত্তর দিতে পারল না।

তার মনে পড়ল ধোঁয়া, গরম বাতাস, কারও চিৎকার, আর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা নিজের মতো দেখতে একটা মুখ। কিন্তু এরপরের স্মৃতিগুলো যেন কেউ ধারালো ছুরি দিয়ে কেটে ফেলেছে।

আয়নার ভেতরের দৃশ্য বদলে গেল।

এবার দেখা গেল, ছোট্ট তারা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে। তার হাতে একটা কাগজের নৌকা। সে নৌকাটা আয়নার সামনে রেখে ফিসফিস করে বলছে, “তুমি যদি সত্যিই আমার দিদি হও, তা হলে আমাকে একটা কথা বলো।”

আয়নার ভেতরের মুখটা হাসল।

“কী কথা?”

“দিদি আমাকে ছোটবেলায় কী বলত, যখন আমি অন্ধকারে ভয় পেতাম?”

প্রতিচ্ছবিটা কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তারপর বলল, “ভয় পাস না। আমি আছি।”

তারা মাথা নাড়ল।

“না। দিদি কখনও এ কথা বলত না।”

প্রতিচ্ছবির হাসি মিলিয়ে গেল।

তারা এবার আয়নার খুব কাছে গিয়ে বলল, “দিদি বলত, ‘অন্ধকার যত বড়ই হোক, দরজায় তিনবার টোকা দিলেই আমি তোকে খুঁজে নেব।’”

এই কথা শুনে আয়নার ভেতরের মুখটা কেঁপে উঠল।

তারপর সেই মুখের চোখ, নাক, ঠোঁট—সব যেন গলে যেতে শুরু করল।

মুখের জায়গায় রইল এক অন্ধকার শূন্যতা।

তিয়াসা শিউরে উঠল।

“ওটা কে?”

তারার চোখে জল এসে গেল।

“ও জানে না আমাদের সব কথা। ও মানুষের মুখ নিতে পারে, স্মৃতি চুরি করতে পারে, কিন্তু আমাদের ভালোবাসার আসল মানে বুঝতে পারে না।”

ঠিক তখনই করিডরের চারদিকে একটা গম্ভীর হাসি ছড়িয়ে পড়ল।

“ভালোবাসা?”

অন্ধকারের মধ্য থেকে সেই মুখহীন সত্তা বেরিয়ে এল।

কখনও তার মুখ বাবার মতো, কখনও মায়ের মতো, কখনও তিয়াসার নিজের মুখ। এক মুহূর্তের জন্য তার মুখে মৃত তারার চেহারাও ফুটে উঠল।

“তোমরা মানুষরা ভালোবাসাকে খুব বড় করে দেখো,” সে বলল। “কিন্তু তোমাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতাও তো সেটাই। কাউকে হারানোর ভয় দেখালেই তোমরা নিজেরাই আমার কাছে দরজা খুলে দাও।”

তিয়াসা তারার সামনে দাঁড়াল।

“তুই আমাদের কী চাস?”

“তোমার জীবন।”

“আমার জীবন?”

“তুমি বারো বছর ধরে যে জীবন কাটিয়েছ, সেটা আমারই তৈরি করা পথের ওপর দাঁড়িয়ে। তোমার অপরাধবোধ, তোমার দুঃস্বপ্ন, তোমার বোনকে হারানোর যন্ত্রণা—সব আমি যত্ন করে বাঁচিয়ে রেখেছি। তুমি যতবার নিজেকে দোষ দিয়েছ, ততবার আমি শক্তিশালী হয়েছি।”

তিয়াসার মনে হল, কেউ যেন তার বুকের ভেতর হাত ঢুকিয়ে পুরোনো ক্ষতগুলো আবার খুলে দিয়েছে।

“তাহলে আগুনের রাতটা?”

সত্তাটি হাসল।

“সেই রাতে তোমরা দুজনেই আমার দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়েছিলে। তোমার বোন আমাকে বিশ্বাস করেছিল, কারণ সে তার মৃত দিদিকে ফিরে পেতে চেয়েছিল। আর তুমি আমাকে ভয় পেয়েছিলে। তুমি আয়নাটা ভেঙে দিতে চেয়েছিলে। কিন্তু তার আগে আমি তোমার মুখ নিয়ে নিয়েছিলাম।”

আয়নার ভেতরের দৃশ্য আবার বদলে গেল।


বারো বছর আগের সেই রাত।

দুর্গাপুজোর অষ্টমী। বাইরে ঢাক বাজছে। বাড়ির অন্য ঘরে মা অতিথিদের সঙ্গে কথা বলছেন। বাবা তখনও কাজে থেকে ফেরেননি।

ছোট্ট তারা একা দাঁড়িয়ে আছে আয়নার সামনে।

আয়নার ওপারে তার দিদি।

“তারা, এদিকে আয়,” প্রতিচ্ছবি বলছে। “আমি তোকে একটা গোপন জায়গা দেখাব।”

“কিন্তু দিদি তো বাড়িতে নেই।”

“আমি তোর দিদি। ওটা যে বাইরে ঘুরে বেড়াচ্ছে, ওটা আসল তিয়াসা নয়।”

তারা পিছিয়ে গিয়েছিল।

“তুমি মিথ্যে বলছ।”

প্রতিচ্ছবির চোখ দুটো হঠাৎ কালো হয়ে উঠেছিল।

“তুই কি তোর দিদিকে ফিরে পেতে চাস না?”

“আমার দিদি তো বেঁচে আছে!”

“তাহলে আমাকে দরজা খুলে দে। আমি তোকে এমন জায়গায় নিয়ে যাব, যেখানে কেউ কাউকে হারায় না।”

তারা কাঁদতে কাঁদতে দৌড়ে বেরিয়ে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু ঘরের দরজা খুলছিল না।

ঠিক তখনই সত্যিকারের তিয়াসা বাড়িতে ফিরে আসে।

সে সেদিন বন্ধুদের সঙ্গে পাড়ার পুজো দেখতে গিয়েছিল। ঘরে ঢুকেই বোনের কান্না শুনে ছুটে এসেছিল।

“তারা!”

ছোট্ট তারা দিদির দিকে ছুটে এসেছিল।

“দিদি, ওটা কে?”

তিয়াসা আয়নার দিকে তাকিয়েছিল।

সেখানে তার নিজের মুখ। অথচ সেই মুখ তার নড়াচড়ার সঙ্গে মিলছে না। বাস্তবের তিয়াসা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেও প্রতিচ্ছবিটি ধীরে ধীরে হাত তুলেছিল।

তারপর ঠোঁট না নাড়িয়েই ঘরের মধ্যে একটা কণ্ঠস্বর শোনা গিয়েছিল।

“তিয়াসা, তুই অনেক দেরি করে ফেলেছিস।”

তিয়াসা ভয়ে তারাকে পিছনে সরিয়ে দিয়েছিল।

“তুই কে?”

“আমি সেই মুখ, যাকে তুই প্রতিদিন আয়নায় দেখিস। তোর হাসি, তোর কান্না, তোর রাগ—সব আমার। তুই যদি না থাকিস, তবেই আমি সম্পূর্ণ হব।”

তিয়াসা তারাকে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে চেয়েছিল।

কিন্তু আয়নার কাচের ওপর হঠাৎ একটা কালো ফাটল দেখা দিয়েছিল। ফাটলটা ক্রমশ বড় হতে হতে দরজার মতো হয়ে গিয়েছিল। সেই দরজার ভেতর থেকে বরফের মতো ঠান্ডা বাতাস বেরিয়ে আসছিল।

তারা দিদির হাত আঁকড়ে ধরেছিল।

“দিদি, আমাকে ছেড়ে যাস না!”

“কখনও না!”

তিয়াসা তাকে জড়িয়ে ধরেছিল।

ঠিক তখনই আয়নার ভেতর থেকে আরেকটি হাত বেরিয়ে এসেছিল। সেই হাত তিয়াসার কবজি ধরে টেনে নিয়েছিল ভেতরে।

তিয়াসা চিৎকার করে উঠেছিল।

তারা দিদিকে বাঁচাতে গিয়ে আয়নার সামনে পড়ে গিয়েছিল। পরের মুহূর্তে ঘরের আলো নিভে গিয়েছিল। জানলার পর্দায় আগুনের মতো লাল আলো ছড়িয়ে পড়েছিল।

কিন্তু সেই আগুন ছিল না সাধারণ আগুন।

সেটা ছিল আয়নার তৈরি করা এক মিথ্যা দৃশ্য—যার উদ্দেশ্য ছিল বাইরের পৃথিবীকে বিশ্বাস করানো যে বাড়িতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে।

আসল আগুন পরে লেগেছিল। ঘরের বৈদ্যুতিক তার পুড়ে গিয়েছিল, কাঠের আসবাব জ্বলে উঠেছিল। কিন্তু তার আগেই আয়নার দরজা তারাকে নিজের ভেতরের এক অন্ধকার কক্ষে আটকে ফেলেছিল।

তিয়াসা আটকে গিয়েছিল স্মৃতির জগতে।

আর সত্তাটি তৈরি করেছিল তার মুখের একটি নকল প্রতিরূপ।

সেই প্রতিরূপই বাইরে বেরিয়ে এসেছিল—তিয়াসার জীবন দখল করার জন্য।

কিন্তু তার পরিকল্পনা পুরোপুরি সফল হয়নি। তিয়াসার স্মৃতির গভীরে আটকে থাকা ভালোবাসা তাকে সম্পূর্ণ মুছে যেতে দেয়নি। সত্তাটি তিয়াসার শরীর বা পরিচয় পুরোপুরি দখল করতে পারেনি। সে কেবল তার মনে অপরাধবোধ ঢুকিয়ে, বাস্তব আর স্মৃতির সীমারেখা মুছে দিয়ে, ধীরে ধীরে শক্তি বাড়িয়েছিল।

আর যে দেহটিকে আগুনের পর তারার দেহ বলে ধরে নেওয়া হয়েছিল, সেটি ছিল সেই রাতের ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার হওয়া এক অজ্ঞাত শিশুর দেহ। লাল ফিতেটি সেখানে রেখেছিল সত্তাটি—পরিবারকে ভুল পথে চালিত করার জন্য।

সবাই ভেবেছিল তারা মারা গেছে।

কেউ জানত না, সে আয়নার পাশের এক বন্ধ কক্ষে আটকে আছে, যেখানে সময়ের প্রবাহ বাইরের পৃথিবীর মতো নয়।


বর্তমানের করিডরে ফিরে এসে তিয়াসা বুঝতে পারল, তার জীবনের বারো বছরের যন্ত্রণা কোনও দুর্ঘটনার ফল ছিল না। কেউ তার অপরাধবোধকে বাঁচিয়ে রেখেছিল, কারণ সেই যন্ত্রণাই ছিল তার শিকল।

মুখহীন সত্তাটি এবার তিয়াসার সামনে এসে দাঁড়াল।

“এখন সব জেনে গেছিস। এবার সিদ্ধান্ত নে। আমার সঙ্গে থাকলে তুই তোর বোনকে নিয়ে এখানেই থাকতে পারবি। কোনও মৃত্যু নেই, কোনও বিচ্ছেদ নেই, কোনও বার্ধক্য নেই। তোর মা-ও এখানে আছে। তোর বাবা-ও আছে। তুই যাদের হারিয়েছিস, সবাইকে ফিরিয়ে দেব।”

অন্ধকারের মধ্যে একের পর এক মুখ ভেসে উঠল।

বাবা হাসছেন।

মা তিয়াসাকে ডাকছেন।

শৈশবের বন্ধুরা হাত নাড়ছে।

এমনকি সেই ছোট্ট বাড়িটাও দেখা গেল, যেখানে একসময় পুজোর সময় সারা রাত আলো জ্বলত।

তিয়াসার চোখ ভিজে উঠল।

সে বাবাকে খুব মিস করত। বাবার মৃত্যুর পর মায়ের সঙ্গে তার সম্পর্কও দূরে সরে গিয়েছিল। বহুবার সে ভেবেছিল, যদি সেই রাতটা অন্যরকম হত, যদি সে একটু আগে বাড়ি ফিরত, যদি সে তারাকে বাঁচাতে পারত!

সত্তাটি তার মনের কথাগুলো পড়তে পারছিল।

“তুই তো সব সময় নিজেকে দোষ দিয়েছিস। তুই ভাবিস, তুই যদি সেদিন বাড়িতে থাকতিস, তা হলে কিছুই হত না। আমি তোকে সেই অপরাধবোধ থেকে মুক্তি দিতে পারি।”

তিয়াসা ধীরে ধীরে মাথা তুলল।

“না। তুই আমাকে মুক্তি দিতে চাস না। তুই চাস আমি যেন সারাজীবন বিশ্বাস করি, সব দোষ আমার।”

সত্তাটির মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।

“তুই বুঝতে পারছিস না।”

“আমি বুঝতে পারছি। আমি আমার বোনকে হারিয়েছিলাম বলে তোকে বিশ্বাস করতে চেয়েছিলাম। আমি চেয়েছিলাম, কোনওভাবে সে ফিরে আসুক। কিন্তু তুই আমার বোন নোস। তুই শুধু আমার শোকের মুখোশ।”

সত্তাটি গর্জে উঠল।

করিডরের দেয়াল কেঁপে উঠল। আয়নাগুলোর মধ্যে ফাটল ধরতে শুরু করল।

“তুই যদি আমার সঙ্গে না থাকিস, তা হলে তোর বোনও বাঁচবে না!”

তিয়াসা তারার দিকে তাকাল।

“তুই কী চাস, তারা?”

তারা এতক্ষণ চুপ করে ছিল। এবার সে দিদির হাত আরও শক্ত করে ধরল।

“আমি বাড়ি যেতে চাই।”

“সেখানে তোকে আবার বড় হতে হবে। অনেক কিছু নতুন করে শিখতে হবে। এত বছর যা হারিয়েছিস, সব একদিনে ফিরে পাবি না।”

তারা চোখ মুছে বলল, “তবু বাড়ি যেতে চাই। আমি বড় হব, দিদি। আমি আবার স্কুলে যাব। আমি মায়ের কাছে ঘুমোব। আমি জানালার পাশে বসে বৃষ্টি দেখব। আমি সত্যিকারের পৃথিবীতে বাঁচতে চাই।”

তিয়াসা তাকে জড়িয়ে ধরল।

“আমিও তোকে বাড়ি নিয়ে যাব।”

মুখহীন সত্তাটি এবার তারার রূপ নিল।

“দিদি, আমি তো তোর সেই ছোট্ট তারা! আমাকে ছেড়ে যাবি?”

তিয়াসা তাকিয়ে রইল।

সত্তাটি তারার চোখ, তার কণ্ঠস্বর, তার কাঁপতে থাকা ঠোঁট—সব নিখুঁতভাবে নকল করছিল।

“দিদি, মনে আছে? তুই বলেছিলি, আমাকে কখনও ছেড়ে যাবি না।”

তিয়াসার বুকের মধ্যে যেন কিছু একটা ভেঙে গেল। এত নিখুঁত অভিনয়, এত পরিচিত মুখ—এক মুহূর্তের জন্য তার হাত শিথিল হয়ে এল।

কিন্তু তার পাশের সত্যিকারের তারা ধীরে ধীরে তিনবার তিয়াসার হাতের ওপর টোকা দিল।

টোক।

টোক।

টোক।

তিয়াসার চোখে আলো জ্বলে উঠল।

এটাই তাদের শৈশবের সংকেত। অন্ধকার ঘরে তারা হারিয়ে গেলে দিদিকে খুঁজে পেতে দরজায় তিনবার টোকা দিত। আর তিয়াসা তিনবার উত্তর দিত।

কথাটা সত্তাটি জানত না—কারণ কথাটার অর্থ কোনও স্মৃতিতে নয়, বেঁচে থাকা দুই বোনের সম্পর্কের মধ্যে লুকিয়ে ছিল।

তিয়াসা তারার হাত চেপে ধরল।

“আমি তোকে চিনেছি।”

তারপর মুখহীন সত্তাটির দিকে তাকিয়ে বলল, “আর তোকে চিনে গেছি।”

সত্তাটি ভয়ংকর চিৎকার করে উঠল।

তারার মুখটা ভেঙে পড়ল। তার জায়গায় ফুটে উঠল তিয়াসার মুখ, তারপর মায়ের মুখ, বাবার মুখ, তারপর এমন এক মুখ—যার কোনও চোখ নেই, নাক নেই, ঠোঁট নেই। কেবল গভীর অন্ধকার।

“তুই আমার কাছ থেকে পালাতে পারবি না!”

“আমি পালাচ্ছি না,” তিয়াসা বলল। “আমি তোকে আর আমার জীবনের অংশ হতে দিচ্ছি না।”

সে করিডরের শেষ প্রান্তের আয়নার দিকে দৌড়ে গেল।

আয়নার মধ্যে এখনও তাদের পুরোনো ঘর দেখা যাচ্ছে। কিন্তু দরজাটা ক্রমশ বন্ধ হয়ে আসছে। তার ওপারে বাস্তব পৃথিবী। তাদের বাড়ি। তাদের মা। তাদের জীবনের বাকি অংশ।

তিয়াসা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দুই হাত দিয়ে কাচে আঘাত করল।

কিছু হল না।

সত্তাটি পিছন থেকে ছুটে আসছে।

তারা চিৎকার করল, “দিদি, দরজায় তিনবার টোকা দে!”

তিয়াসা বুঝতে পারল।

সে আয়নার ওপর তিনবার টোকা দিল।

টোক।

টোক।

টোক।

তারপর বলল, “তারা, আমি তোকে খুঁজে পেয়েছি।”

আয়নার কাচের ওপর সোনালি আলোর রেখা ছড়িয়ে পড়ল। রেখাগুলো একত্র হয়ে দরজার মতো একটা আকৃতি তৈরি করল।

সত্তাটি থমকে দাঁড়াল।

“না! এটা সম্ভব নয়!”

“কেন?” তিয়াসা বলল। “কারণ তুই ভেবেছিলি, আমরা শুধু আমাদের স্মৃতির মধ্যে বেঁচে আছি। কিন্তু স্মৃতি তো শুধু অতীত নয়। স্মৃতি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আমরা কারা। আর আমরা যদি নিজেদের চিনতে পারি, তা হলে তুই আমাদের মুখ চুরি করতে পারবি না।”

সে তারাকে নিয়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেল।

সত্তাটি শেষ চেষ্টা করল। সে এবার তিয়াসার মৃত বাবার রূপ নিল।

“তিয়াসা, মা, দাঁড়া। আমাকে ছেড়ে যাস না।”

তিয়াসার পা এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল।

বাবার কণ্ঠস্বর।

ঠিক সেই স্নেহমাখা ডাক, যা সে বহু বছর শোনেনি।

তার চোখে জল এসে গেল।

“বাবা…”

সত্তাটি হাত বাড়াল।

“একবার আমার কাছে আয়। আমি তোকে সব বুঝিয়ে দেব।”

তিয়াসা চোখ বন্ধ করল। বাবার শেষ চিঠির কথা মনে পড়ল—ভালোবাসার নামে কেউ যদি তোকে নিজের জীবন থেকে সরিয়ে নিতে চায়, তবে তাকে বিশ্বাস করিস না।

সে চোখ খুলে বলল, “আমার বাবা আমাকে কখনও নিজের কাছে আটকে রাখতেন না। তিনি চাইতেন আমি বাঁচি।”

সত্তাটির মুখে আবার ফাটল ধরল।

তিয়াসা আর একবারও পিছনে তাকাল না।

দুই বোন আলোর দরজা পেরিয়ে গেল।


বাস্তব পৃথিবীতে তখন রাত দুটো সতেরো।

পুরোনো বাড়ির সেই ঘরে মেঝেতে পড়ে ছিল তিয়াসা। তার পাশে নিথর হয়ে শুয়ে ছিল ছোট্ট তারা। ঘরের কোণে রাখা পুরোনো আয়নাটির কাচে ক্রমশ ফাটল ছড়িয়ে পড়ছিল।

হঠাৎ তিয়াসার আঙুল নড়ল।

তারপর সে হাঁপাতে হাঁপাতে চোখ খুলল।

প্রথমেই সে তারার দিকে তাকাল।

“তারা!”

মেয়েটি নড়ল না।

তিয়াসা তাকে বুকের মধ্যে টেনে নিল।

“তারা, চোখ খোল! আমরা বাড়ি ফিরে এসেছি। তুই শুনতে পাচ্ছিস?”

কয়েক মুহূর্ত পর তারার চোখের পাতা কেঁপে উঠল।

সে ধীরে ধীরে চোখ খুলল।

“দিদি?”

“হ্যাঁ, আমি।”

তারা কাঁদতে কাঁদতে দিদির গলা জড়িয়ে ধরল।

“আমরা কি সত্যিই বাড়ি এসেছি?”

তিয়াসা তার কপালে চুমু খেল।

“হ্যাঁ। এবার সত্যিই।”

ঠিক তখনই ঘরের কোণে একটা প্রচণ্ড শব্দ হল।

পুরোনো আয়নাটা মাঝখান থেকে ফেটে গেল। তার কাচের প্রতিটি টুকরোয় এক মুহূর্তের জন্য মুখহীন সত্তাটিকে দেখা গেল। সে কখনও চিৎকার করছে, কখনও কাঁদছে, কখনও তিয়াসার মুখ নিয়ে বাইরে বেরোনোর চেষ্টা করছে।

কিন্তু প্রতিটি টুকরোর মধ্যে তার মুখ আরও ছোট হয়ে আসছিল।

শেষে একটি ক্ষুদ্র কাচের টুকরোয় শুধু কালো একটা ছায়া দেখা গেল।

তারপর সেটিও নিভে গেল।

ঘরের বাতাস হঠাৎ স্বাভাবিক হয়ে উঠল।

বহু বছরের জমে থাকা স্যাঁতসেঁতে গন্ধ মিলিয়ে গেল। জানলার বাইরে ভোরের প্রথম পাখি ডাকল।

তিয়াসা বুঝল, সত্তাটি আর তাদের পিছু নিতে পারবে না।


তিয়াসা প্রথমে মাকে ফোন করেছিল।

ফোনের অন্য প্রান্তে ঘুমজড়ানো কণ্ঠস্বর।

“তিয়াসা? এত রাতে কী হয়েছে?”

কথা বলতে গিয়ে তিয়াসার গলা আটকে গেল।

“মা…”

“কী হয়েছে, মা? তুই কাঁদছিস কেন?”

তিয়াসা তারার দিকে তাকাল। মেয়েটি তার কাঁধে মাথা রেখে বসে আছে। এতক্ষণে তার শরীর কাঁপতে শুরু করেছে। বারো বছরের বন্দিদশা, ভয়, ক্ষুধা আর অন্ধকারের পর সে বাস্তব পৃথিবীতে ফিরে এসেছে। কিন্তু তার কাছে পৃথিবীটা এখনও অচেনা।

তিয়াসা ধীরে ধীরে বলল, “মা, আমি তোকে একটা কথা বলব। তুই ভয় পাবি না।”

“বল।”

“তারা বেঁচে আছে।”

ওপাশে দীর্ঘ নীরবতা।

তারপর মায়ের কণ্ঠস্বর কেঁপে উঠল।

“কী বললি?”

“তারা বেঁচে আছে, মা। আমার কাছে আছে।”

“না… না, তিয়াসা, এ হতে পারে না। আমরা তো—”

মায়ের কথা শেষ হল না। ফোনের ওপাশে কান্নার শব্দ শোনা গেল।

“মা, তুই একবার এখানে আয়। নিজের চোখে দেখ।”

প্রায় এক ঘণ্টা পর মা এসে পৌঁছলেন। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে তিনি প্রথমে তিয়াসাকে দেখলেন, তারপর তার পাশে বসে থাকা ছোট্ট মেয়েটিকে।

মেয়েটির মুখে বারো বছর আগের তারার ছায়া।

মা কাঁপতে কাঁপতে এগিয়ে গেলেন।

“তারা?”

মেয়েটি মাথা তুলল।

“মা?”

একটি শব্দেই যেন বারো বছরের জমাট অন্ধকার ভেঙে গেল।

মা মেয়েকে জড়িয়ে ধরে হাউহাউ করে কেঁদে উঠলেন। তিয়াসাও তাদের সঙ্গে কাঁদতে লাগল।

কেউ কোনও কথা বলতে পারছিল না।

এত বছর ধরে যে শোককে তারা সত্যি বলে মেনে নিয়েছিল, তার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল জীবন্ত এক অলৌকিকতা।

কিন্তু আনন্দের সঙ্গে সঙ্গে এল এক কঠিন বাস্তবতা।

তারা শারীরিকভাবে এখনও এগারো-বারো বছরের মেয়ে। তার স্মৃতির মধ্যে আটকে আছে সেই রাত, সেই আয়না, সেই ভয়ংকর অন্ধকার। বাইরে পৃথিবীতে বারো বছর কেটে গেছে। তার বন্ধুরা বড় হয়েছে, স্কুলের বই বদলেছে, শহরের রাস্তাঘাট বদলেছে, বাবা আর বেঁচে নেই।

তাকে সব নতুন করে শিখতে হবে।

তিয়াসা জানত, বোনকে ফিরে পাওয়া মানেই তার সমস্ত কষ্ট মুহূর্তে মুছে যাওয়া নয়। তাদের সামনে দীর্ঘ পথ পড়ে আছে—চিকিৎসা, নিরাপত্তা, স্মৃতির ক্ষত সারানো এবং নতুন করে জীবন গড়ার পথ।

কিন্তু এবার তারা একা নয়।


পরবর্তী কয়েক সপ্তাহে পুরোনো বাড়ির ঘটনার তদন্ত শুরু হয়।

অবসরপ্রাপ্ত দমকলকর্মী প্রদীপ মণ্ডল নিজের পুরোনো নথি খুঁজে বের করেন। আগুনের রাতের রিপোর্টে সত্যিই অসংগতি ছিল। উদ্ধার হওয়া শিশুর পরিচয় নিশ্চিত করা যায়নি। লাল ফিতেটি ছাড়া এমন কোনও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ ছিল না, যা দেহটিকে তারার বলে শনাক্ত করতে পারত।

বছরের পর বছর ধরে পরিবারটি অনুমানের ওপর দাঁড়িয়ে একটি মৃত্যুকে সত্যি বলে মেনে নিয়েছিল।

তিয়াসা সব কথা প্রকাশ্যে বলতে পারেনি। আয়নার ওপারের জগতের গল্প শুনলে কেউ হয়তো বিশ্বাস করত না। কিন্তু সে আর নিজের স্মৃতিকে ভয় পেত না। যা ঘটেছিল, তার সব ব্যাখ্যা সে জানে না। তবু সে জানে, সেই সত্তা তাদের জীবনের ওপর যে মিথ্যা চাপিয়ে দিয়েছিল, সেটাই ছিল তার সবচেয়ে বড় অস্ত্র।

মায়ের ঘরে এখন তারার জন্য একটা ছোট্ট বিছানা পাতা হয়েছে। জানলার পাশে রাখা আছে রঙিন পেন্সিল, খাতা আর গল্পের বই। প্রথম কয়েক দিন তারা ঘুমোতে পারত না। মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেলে সে দিদিকে ডাকত।

তিয়াসা সঙ্গে সঙ্গে তার ঘরে যেত।

“দিদি, তুই আছিস?”

“আছি।”

“তুই চলে যাবি না তো?”

তিয়াসা তার পাশে বসে হাত ধরত।

“আমি কোথাও যাচ্ছি না।”

এক রাতে তারা বলল, “দিদি, তুই কি আমাকে আবার স্কুলে ভর্তি করাবি?”

তিয়াসা হেসে ফেলল। বহু বছর পর তার হাসিটা একেবারে নিজের মতো লাগল।

“অবশ্যই। তবে আগে তোর শরীরটা ভালো হতে হবে।”

“আমি বড় হয়ে কী হব জানিস?”

“কী?”

“আমি এমন একটা বই লিখব, যেখানে কেউ কাউকে হারিয়ে ফেললেও আবার খুঁজে পাবে।”

তিয়াসা তার চুলে হাত বুলিয়ে দিল।

“তাহলে বইটা আমাকেই প্রথম পড়তে দিবি।”

“দেব। তবে একটা শর্ত আছে।”

“কী শর্ত?”

“বইয়ের শেষটা যেন সুখের হয়।”

তিয়াসা বোনকে বুকে টেনে নিল।

“হবে। কারণ এবার আমরা নিজেরাই আমাদের গল্পের শেষটা লিখব।”


এক মাস পর তিয়াসা আবার সেই পুরোনো বাড়িতে গেল।

বাড়ির ঘরগুলো পরিষ্কার করা হয়েছে। আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত দেওয়াল মেরামত করা হচ্ছে। যে ঘরে আয়নাটি ছিল, সেখানে এখন জানলা দিয়ে সকালের রোদ ঢোকে।

মেঝেতে পড়ে থাকা আয়নার কাচের টুকরোগুলো সে আগেই সরিয়ে ফেলেছিল। তবু দেওয়ালের এক কোণে ছোট্ট একটি কাচের টুকরো রয়ে গিয়েছিল। সেটি সরাতে গিয়ে তিয়াসা এক মুহূর্ত থেমে গেল।

কাচে তার নিজের মুখ দেখা যাচ্ছিল।

স্বাভাবিক মুখ। ক্লান্ত, কিন্তু শান্ত।

সে ডান হাত তুলল।

প্রতিচ্ছবিও হাত তুলল।

সে চোখ বন্ধ করল।

প্রতিচ্ছবিও চোখ বন্ধ করল।

সবকিছু স্বাভাবিক।

তিয়াসা কাচের টুকরোটি তুলে কাপড়ে মুড়ে ফেলল। তারপর বাড়ির বাইরে এসে দাঁড়াল।

সূর্য তখন উঠছে। রাস্তায় মানুষজন কাজে বেরোচ্ছে। দূরে কোনও বাড়ি থেকে শঙ্খধ্বনি ভেসে আসছে।

তিয়াসা আকাশের দিকে তাকাল।

তার মনে পড়ল বাবা, যিনি সত্যিটা পুরোপুরি বুঝতে না পারলেও মেয়েদের বাঁচানোর চেষ্টা করেছিলেন। মনে পড়ল মা, যিনি অপরাধবোধের ভার নিয়ে এতগুলো বছর কাটিয়েছেন। আর মনে পড়ল ছোট্ট তারা—যে অন্ধকারের মধ্যেও বিশ্বাস করতে ভোলেনি যে তার দিদি একদিন তাকে খুঁজে নেবে।

তিয়াসা জানত, তাদের জীবনে আর কোনওদিন সবকিছু আগের মতো হবে না।

কিন্তু আগের মতো হওয়ার প্রয়োজনও নেই।

কারণ কিছু হারানো জিনিস ফিরে এলে মানুষ অতীতের কাছে ফিরে যায় না; বরং নতুন করে বাঁচার সাহস খুঁজে পায়।

সেদিন সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে তিয়াসা তার ডায়েরি খুলল। অনেক দিন ধরে সে সেখানে নিজের দুঃস্বপ্ন লিখে রাখত। আজ প্রথমবার সে লিখল—

“আমি আর আয়নার ভেতরে কাউকে খুঁজি না। কারণ যে মানুষকে ভালোবাসি, তাকে খুঁজে পাওয়ার জন্য সব সময় কোনও অলৌকিক দরজার দরকার হয় না। কখনও কখনও দরকার হয় শুধু অপেক্ষা, বিশ্বাস আর ফিরে আসার সাহস।”

লেখা শেষ করে সে ডায়েরি বন্ধ করল।

অন্য ঘর থেকে তারার ডাক এল।

“দিদি! তাড়াতাড়ি আয়। মা পায়েস করেছে!”

তিয়াসা উঠে দাঁড়াল।

“আসছি!”

সে দরজার দিকে এগিয়ে গেল।

তার পিছনে কোনও আয়না ছিল না। কোনও অচেনা প্রতিচ্ছবি ছিল না। ছিল শুধু সকালের মতো উজ্জ্বল হয়ে ওঠা একটি বাড়ি, যেখানে বারো বছর পর আবার দুই বোনের হাসি শোনা যাচ্ছে।

আর কোথাও, কোনও অন্ধকার কাচের গভীরে, যে মুখটি কখনও মানুষের ছিল না—সে আর কোনও মুখ ধার করতে পারল না।

কারণ তিয়াসা ও তারা অবশেষে নিজেদের মুখ চিনে নিয়েছিল।

— সমাপ্ত —

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *