প্রথম পর্ব — অচেনা শহরের ডাক
ভোরের ঠিক পাঁচটা।
শহর তখনও পুরোপুরি জেগে ওঠেনি। রাস্তার বাতিগুলো একে একে নিভে যাচ্ছিল। ফুটপাথের চায়ের দোকানগুলোতে ধোঁয়া উঠতে শুরু করেছে। দূরে কোথাও একটা ট্রামের ঘণ্টা শোনা গেল।
অর্ক সেন জানলার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।
তার হাতে একটা পুরনো খাম।
খামের ওপর শুধু লেখা—
“অর্ক সেনের জন্য। নিজে হাতে দিতে হবে।”
প্রেরকের নাম নেই।
ঠিকানা নেই।
শুধু তার নিজের নাম।
গতকাল সন্ধ্যায় অফিস থেকে ফেরার সময় বাড়ির দরজার নিচে খামটা পড়ে থাকতে দেখেছিল অর্ক।
প্রথমে ভেবেছিল কোনো ভুল চিঠি।
কিন্তু খাম খুলতেই ভেতর থেকে বেরিয়ে এল একটি পুরনো সাদা-কালো ছবি।
ছবিতে চারজন মানুষ দাঁড়িয়ে।
তিনজনকে অর্ক চিনত না।
চতুর্থ মানুষটিকে চিনতে তার কয়েক সেকেন্ড সময় লেগেছিল।
তারপর বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেঁপে উঠেছিল।
লোকটি তার বাবা।
সুব্রত সেন।
অর্কের বাবা মারা গিয়েছিলেন আঠারো বছর আগে।
তখন অর্কের বয়স মাত্র ষোলো।
বাবার মৃত্যুর ঘটনাকে দুর্ঘটনা বলা হয়েছিল।
একটি পাহাড়ি রাস্তা।
ব্রেক ফেল করা গাড়ি।
খাদে পড়ে মৃত্যু।
সবকিছু শেষ হয়ে গিয়েছিল একদিনেই।
অন্তত সবাই তাই ভেবেছিল।
কিন্তু ছবিটার পেছনে লেখা ছিল—
“তোমার বাবা দুর্ঘটনায় মারা যাননি।”
অর্ক সারা রাত ঘুমোতে পারেনি।
আর ভোর হওয়ার আগেই খামের ভেতরের দ্বিতীয় কাগজটা পড়েছিল।
সেখানে মাত্র একটি বাক্য—
“কুয়াশা কাটার আগে শিলাবতীপুরে পৌঁছোও।”
তার নিচে একটা তারিখ।
আজকের তারিখ।
অর্ক জানত না শিলাবতীপুর কোথায়।
গুগলে খুঁজে দেখার চেষ্টা করেছিল।
ছোট্ট একটা পাহাড়ি শহর।
রাজ্যের একেবারে উত্তর প্রান্তে।
শহর থেকে প্রায় সাড়ে চারশো কিলোমিটার দূরে।
আর আশ্চর্যের বিষয়—
ছবিতে বাবার পেছনে যে পাহাড় দেখা যাচ্ছিল, সেটার সঙ্গে শিলাবতীপুরের পুরনো একটি পর্যটন ছবির অদ্ভুত মিল ছিল।
অর্ক আর দেরি করল না।
সকাল ছ’টার ট্রেন ধরল।
ট্রেন ছাড়ার পরেও তার মাথায় একই প্রশ্ন ঘুরছিল—
কে তাকে সেখানে ডাকছে?
বাবার মৃত্যুর সত্যিই কি কোনো সম্পর্ক আছে?
আর যদি থাকে, তাহলে এত বছর পর?
ট্রেনের জানলার বাইরে শহর পিছিয়ে যাচ্ছিল।
অর্ক ব্যাগ থেকে ছবিটা বের করল।
চারজন মানুষ।
বাবা।
একজন বৃদ্ধ।
একজন তরুণী।
আর একজন লোক, যার মুখ ছবিতে অস্বাভাবিকভাবে ছায়ায় ঢাকা।
অর্ক ছবিটা বড় করে দেখল।
লোকটির হাতে একটা ঘড়ি।
কালো ডায়াল।
রূপোর চেন।
অর্ক হঠাৎ থেমে গেল।
এই ঘড়িটা সে চেনে।
তার বাবা মারা যাওয়ার পর মায়ের কাছে একটি ঘড়ি পাওয়া গিয়েছিল।
মা বলেছিলেন—
“এটা তোমার বাবার।”
কিন্তু অর্ক কখনও বাবাকে ওই ঘড়ি পরতে দেখেনি।
মা ঘড়িটা কোথা থেকে পেয়েছিলেন, সেটাও বলেননি।
আর আজ ছবিতে একই ঘড়ি।
অর্কের বুকের ভেতর অস্বস্তি বাড়তে লাগল।
বিকেলের দিকে ট্রেন পাহাড়ি অঞ্চলে ঢুকল।
জানলার বাইরে কুয়াশা।
গাছের সারি।
দূরে পাহাড়।
অর্ক ফোন বের করে শিলাবতীপুরের ঠিকানা আবার দেখল।
কিন্তু নেটওয়ার্ক নেই।
স্টেশনে নামার পর সে অবাক হয়ে দেখল, প্ল্যাটফর্ম প্রায় ফাঁকা।
একটা পুরনো বোর্ডে লেখা—
শিলাবতীপুর।
স্টেশনের বাইরে মাত্র একটি চায়ের দোকান খোলা।
অর্ক এগিয়ে গিয়ে বলল,
— এখানে “নন্দন লজ” কোথায়?
চায়ের দোকানের বৃদ্ধ লোকটি তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর জিজ্ঞেস করল,
— আপনি অর্ক?
অর্কের শরীরের ভেতর যেন ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল।
— আপনি আমার নাম জানেন?
বৃদ্ধ কোনো উত্তর দিল না।
শুধু বলল,
— আপনাকে আসতেই বলেছিলাম।
অর্ক ধীরে ধীরে বলল,
— কে বলেছিল?
বৃদ্ধ চায়ের কাপটা নামিয়ে রাখল।
— আপনার বাবা।
অর্কের মুখ শুকিয়ে গেল।
— আমার বাবা তো আঠারো বছর আগে মারা গেছেন।
বৃদ্ধ মৃদু হাসল।
— আমি জানি।
তারপর দোকানের পেছনের দিকে তাকিয়ে বলল,
— কিন্তু কিছু কথা মানুষ মারা যাওয়ার পরও রেখে যায়।
অর্ক আর কিছু বলল না।
বৃদ্ধ একটা কাগজ এগিয়ে দিল।
কাগজে লেখা—
“পুরনো ডাকবাংলো। রাত ন’টা।”
অর্ক বলল,
— সেখানে কে থাকবে?
বৃদ্ধ এবার তার চোখের দিকে তাকাল।
— যে মানুষটা আঠারো বছর ধরে আপনার জন্য অপেক্ষা করছে।
রাত ন’টার কিছু আগে অর্ক পুরনো ডাকবাংলোয় পৌঁছল।
বাড়িটা পাহাড়ের ঢালে।
চারপাশে ঘন কুয়াশা।
দরজায় তালা ছিল না।
অর্ক ধীরে ধীরে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল।
ঘরের মধ্যে একটা টেবিল।
টেবিলের ওপর জ্বলছে কেরোসিনের বাতি।
আর তার পাশে রাখা একটি টেপ রেকর্ডার।
অর্ক এগিয়ে গেল।
রেকর্ডারের পাশে ছোট্ট কাগজ—
“অর্ক, যদি তুমি এখানে এসে থাকো, তাহলে বুঝব সত্যিটা জানার মতো বড় হয়েছ।”
অর্কের হাত কেঁপে উঠল।
এটা তার বাবার হাতের লেখা।
সে রেকর্ডারের প্লে বোতাম চাপল।
কিছুক্ষণ শুধু শোঁ শোঁ শব্দ।
তারপর—
একটি পরিচিত কণ্ঠ।
আঠারো বছর পর।
তার বাবা বলছেন—
“অর্ক, আমার মৃত্যু যদি দুর্ঘটনা বলে তোমাকে জানানো হয়ে থাকে, সেটা বিশ্বাস কোরো না।”
অর্কের চোখ ভিজে উঠল।
কণ্ঠটা আবার শোনা গেল—
“আমি এমন একটা জিনিস দেখেছি, যেটা আমার দেখা উচিত ছিল না।”
কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর—
“কিন্তু সবচেয়ে বড় ভুল আমি তখনই করেছি, যখন ভেবেছিলাম আমি যাকে বিশ্বাস করি, সে আমাকে কখনও বিশ্বাসঘাতকতা করবে না।”
হঠাৎ রেকর্ডিং বন্ধ হয়ে গেল।
অর্ক বারবার বোতাম চাপল।
কিছুই হল না।
ঠিক তখনই বাইরে একটা শব্দ হল।
কেউ যেন কাঠের বারান্দায় হাঁটছে।
অর্ক দরজার দিকে তাকাল।
কুয়াশার মধ্যে একটা ছায়া দাঁড়িয়ে।
অর্ক বলল,
— কে?
কোনো উত্তর নেই।
ছায়াটা ধীরে ধীরে এগিয়ে এল।
তারপর দরজার সামনে এসে থামল।
একজন মহিলা।
বয়স প্রায় চল্লিশ।
ভেজা চুল।
হাতে কালো ছাতা।
অর্ক দরজা খুলতে যাচ্ছিল।
মহিলাটি বলল,
— দরজা খুলবেন না।
অর্ক থেমে গেল।
— কেন?
মহিলা ফিসফিস করে বলল,
— কারণ বাইরে যে দাঁড়িয়ে আছে, সে আমি নই।
অর্কের শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।
সে পেছনে তাকাল।
তারপর আবার দরজার দিকে।
বাইরে দাঁড়ানো ছায়াটা এবার দরজায় তিনবার ধাক্কা দিল।
ঠক।
ঠক।
ঠক।
মহিলা অর্কের দিকে তাকিয়ে বলল,
— এবার আপনার বাবার মৃত্যুর আসল গল্প শুরু হবে।
কুয়াশার মধ্যে কোথাও একটা গাড়ির ইঞ্জিন স্টার্ট হল।
আর অর্ক বুঝল—
শিলাবতীপুরে তাকে শুধু সত্যি জানাতে ডাকা হয়নি।
কেউ চায় সে যেন সত্যিটা খুঁজে বের করে।
আর কেউ একজন চায়—
সে যেন কোনোভাবেই সেই সত্যির কাছে পৌঁছতে না পারে।
চলবে…