তৃতীয় পর্ব — কুয়াশা কেটে গেলে
দরজার হাতলটা ধীরে ধীরে নড়ছিল।
অর্ক নিঃশ্বাস বন্ধ করে দাঁড়িয়ে।
মেঘলা জানলার দিকে তাকিয়ে দেখল, বাইরে ঘন কুয়াশা।
তারপর সে ফিসফিস করে বলল,
— পিছনের জানলা দিয়ে বেরোতে হবে।
অর্ক মাথা নাড়ল।
কিন্তু দরজার ওপাশ থেকে আবার কণ্ঠ ভেসে এল—
— অর্কবাবু, আমি জানি আপনার কাছে সুব্রতবাবুর নোটবুক আছে।
অর্ক থমকে গেল।
লোকটা জানল কীভাবে?
মেঘলা তার হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল পিছনের ঘরে।
জানলার কাঠের পাল্লা খুলতেই ঠান্ডা বাতাস মুখে এসে লাগল।
দুজনেই বাইরে বেরিয়ে পড়ল।
কিন্তু মেঘলা নামার আগেই নিচ থেকে একটা হাত তার কবজি ধরে ফেলল।
সে চিৎকার করতে যাচ্ছিল।
অর্ক ঝাঁপিয়ে পড়ে লোকটাকে সরিয়ে দিল।
কুয়াশার মধ্যে লোকটা পিছিয়ে গেল।
তার মুখ দেখা গেল না।
অর্ক শুধু দেখল—
তার হাতে কালো ডায়ালের সেই ঘড়ি।
ঠিক ছবির মতো।
লোকটা দৌড়ে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।
মেঘলা হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
— এবার বুঝতে পারছ?
অর্ক বলল,
— রণজিৎ নয়।
— না।
— তাহলে কে?
মেঘলা বলল,
— যে মানুষটা এত বছর ধরে রণজিৎকে ব্যবহার করেছে।
১
পরদিন সকাল।
শিলাবতীপুর থানার সামনে অর্ক আর মেঘলা দাঁড়িয়ে।
তারা আগের রাতের ঘটনা জানাল।
থানার অফিসার অনিরুদ্ধ পাল প্রথমে সন্দেহের চোখে তাকালেন।
— আপনারা বলছেন রণজিৎ পাল মারা গেছে?
মেঘলা বলল,
— হ্যাঁ।
অনিরুদ্ধ একটা ফাইল খুললেন।
— মৃত্যুর রিপোর্ট অনুযায়ী, রণজিৎ পাল তিন দিন আগে পাহাড়ের নিচে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে।
অর্ক বলল,
— তাহলে গতরাতে আমাদের কাছে কে এসেছিল?
অফিসার কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর বললেন,
— সম্ভবত এমন কেউ, যে চায় আপনারা ভাবুন রণজিৎ এখনও বেঁচে আছে।
অর্ক নোটবুকটা টেবিলে রাখল।
— আমার বাবার মৃত্যুর তদন্ত নতুন করে শুরু করতে চাই।
অনিরুদ্ধ নোটবুকটা দেখেই চমকে উঠলেন।
— এটা কোথায় পেলেন?
— পুরনো রেলগুদামে।
অফিসার নোটবুকের মলাট ছুঁয়ে বললেন,
— আপনার বাবা এই খাতার কথা আমাকে একবার বলেছিলেন।
অর্ক অবাক।
— আপনি বাবাকে চিনতেন?
— খুব ভালোভাবে নয়। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর আগের সপ্তাহে তিনি আমার সঙ্গে দেখা করেছিলেন।
— তখন আপনি কী জানতেন?
অনিরুদ্ধ ধীরে বললেন,
— আমি জানতাম তিনি বড় একটা বিষয় নিয়ে তদন্ত করছেন।
— আর আপনি সাহায্য করেননি?
অফিসারের চোখ নিচু হয়ে গেল।
— আমি তখন নতুন অফিসার। আমার ওপরের লোকেরা আমাকে চুপ থাকতে বলেছিল।
— কারা?
অনিরুদ্ধ একটা নাম লিখে দিলেন।
অমল সরকার।
অর্কের বুক কেঁপে উঠল।
নোটবুকেও এই নাম ছিল।
২
অমল সরকারকে খুঁজে বের করতে বেশি সময় লাগল না।
তিনি এখন অবসরপ্রাপ্ত।
শিলাবতীপুরের কাছেই একটি ছোট বাড়িতে থাকেন।
অর্ক, মেঘলা ও অনিরুদ্ধ তাঁর বাড়িতে পৌঁছতেই বৃদ্ধ দরজা খুলে বললেন,
— অবশেষে তুমি এলে।
অর্ক থেমে গেল।
— আপনি আমাকে চিনতেন?
অমল মৃদু হাসলেন।
— তুমি ছোট ছিলে। তোমার বাবা তোমার ছবি দেখিয়েছিলেন।
— আমার বাবা কী জানতে পেরেছিলেন?
অমল দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
— অনেক কিছু।
— তারপর তাঁকে মেরে ফেলা হল?
বৃদ্ধ কোনো উত্তর দিলেন না।
অর্ক টেবিলের ওপর নোটবুকটা রাখল।
অমল সেটার দিকে তাকিয়ে বললেন,
— এই খাতা এখনও তোমার কাছে আছে?
— হ্যাঁ।
— তাহলে ওরা তোমাকে থামানোর চেষ্টা করবে।
মেঘলা বলল,
— “ওরা” কারা?
অমল জানলার দিকে তাকালেন।
— একজন মৃত মানুষের নাম দিয়ে শুরু হয়েছিল এই গল্প। কিন্তু আসল মানুষটি এখনও বেঁচে আছে।
অর্ক বলল,
— কে?
অমল বললেন,
— দেবাশিস মল্লিক।
অর্কের মুখ শক্ত হয়ে গেল।
— কিন্তু তিনি তো এখন কলকাতায়!
— থাকেন।
— তাহলে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়নি কেন?
— কারণ প্রমাণ সবসময় সত্যির সঙ্গে থাকে না।
অমল একটা পুরনো খাম বের করলেন।
— তোমার বাবা এটা আমাকে দিয়েছিলেন।
অর্ক খাম খুলল।
ভেতরে একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্টের বিবরণ।
অ্যাকাউন্টটি দেবাশিস মল্লিকের নামে নয়।
একটি ভুয়ো প্রতিষ্ঠানের নামে।
কিন্তু সেই প্রতিষ্ঠানে টাকা পাঠিয়েছিল সরকারি প্রকল্পের ঠিকাদারি সংস্থা।
সুশান্ত ধরের কোম্পানিও সেখানে ছিল।
অর্ক অবাক হয়ে বলল,
— তাহলে সুশান্তও জড়িত?
অমল বললেন,
— শুরুতে ছিল।
মেঘলা বলল,
— পরে?
— পরে তোমার বাবা ওকে রাজি করান সত্যিটা প্রকাশ করতে।
অর্কের মনে পড়ল সুশান্তের কথা—
“আমি কাপুরুষ ছিলাম।”
এবার কথাটার অর্থ পরিষ্কার হল।
৩
কলকাতায় ফিরে অর্ক সরাসরি দেবাশিস মল্লিকের বাড়িতে গেল।
বড় বাড়ি।
উঁচু গেট।
নিরাপত্তারক্ষী।
অর্ক নিজের পরিচয় দেওয়ার পর কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হল।
তারপর দেবাশিস নিজেই এসে দরজা খুললেন।
বয়স সত্তরের কাছাকাছি।
চোখে চশমা।
মুখে অদ্ভুত শান্ত ভাব।
তিনি অর্ককে দেখে বললেন,
— সুব্রতর ছেলে।
অর্ক অবাক হল।
— আপনি আমার বাবাকে চিনতেন?
— চিনতাম।
— তাহলে জানেন তিনি কীভাবে মারা গিয়েছিলেন?
দেবাশিস ধীরে বললেন,
— দুর্ঘটনা।
অর্ক ব্যাগ থেকে নোটবুক বের করল।
দেবাশিসের মুখের শান্ত ভাব মুহূর্তে বদলে গেল।
— এটা কোথায় পেলে?
অর্ক বুঝল।
এটাই ছিল আসল প্রমাণ।
সে বলল,
— আপনি ভয় পাচ্ছেন?
দেবাশিস চুপ।
অর্ক আরও কাছে এগিয়ে গেল।
— আমার বাবাকে কেন মরতে হল?
দেবাশিস বললেন,
— তোমার বাবা এমন একটা সত্যি জানতে পেরেছিলেন, যা প্রকাশ পেলে অনেক মানুষের জীবন নষ্ট হত।
অর্ক রাগে বলল,
— তাই তাঁকে মেরে ফেললেন?
— আমি মারিনি।
— তাহলে কে?
দেবাশিস উত্তর দিলেন না।
ঠিক তখনই বাইরে পুলিশের গাড়ির শব্দ।
অনিরুদ্ধ পাল নেমে এলেন।
তার হাতে গ্রেফতারি পরোয়ানা।
দেবাশিস মল্লিকের মুখের রং বদলে গেল।
৪
তদন্তের পর আসল সত্যি ধীরে ধীরে বেরিয়ে এল।
আঠারো বছর আগে পাহাড়ি অঞ্চলের জমি দখল করে একটি বড় রিয়েল-এস্টেট প্রকল্প করার পরিকল্পনা হয়েছিল।
সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পকে ব্যবহার করে জমির মালিকানা বদলানো হচ্ছিল।
অমল সরকার কাগজপত্রে অনিয়ম লক্ষ্য করেছিলেন।
সুব্রত সেন সেই অনিয়মের প্রমাণ সংগ্রহ করেছিলেন।
রণজিৎ পাল তখন পরিবহণ সংস্থায় কাজ করত।
সে দুর্ঘটনার রাতে ট্রাকটি দেখেছিল।
বিপ্লব রায় হিসাবের নথি জাল করেছিল।
নির্মাণ ব্যবসায়ী ও কয়েকজন সরকারি কর্মচারী মিলে পুরো চক্রটি চালাচ্ছিল।
কিন্তু মূল পরিকল্পনাকারী ছিল দেবাশিস মল্লিক।
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—
সুব্রতর মৃত্যুর রাতে গাড়ি চালানো ব্যক্তি ছিল দেবাশিসের ঘনিষ্ঠ সহযোগী।
পরে সেই ব্যক্তি বিদেশে পালিয়ে যায়।
তাকে বহু বছর পর খুঁজে বের করা হয়।
আদালতে পুরনো নথি, ব্যাংক লেনদেন, সাক্ষ্য এবং সুব্রতর নোটবুক একসঙ্গে প্রমাণ হিসেবে পেশ করা হল।
মামলা দীর্ঘদিন চলল।
কিন্তু এবার সত্যি আর চাপা পড়ল না।
৫
সবচেয়ে কঠিন ছিল অর্কের জন্য অন্য একটা সত্যি মেনে নেওয়া।
তার মা সব জানতেন।
পুরোটা নয়।
কিন্তু অনেকটাই।
বাবার মৃত্যুর পর মা তাকে ইচ্ছে করেই সবকিছু থেকে দূরে রেখেছিলেন।
কারণ তিনি জানতেন, অর্ক সত্যিটা জানতে চাইলে তার জীবন বিপন্ন হতে পারে।
মায়ের পুরনো আলমারি থেকে অর্ক একটি চিঠি পেল।
চিঠির শুরু—
“অর্ক, তুই যদি কোনোদিন এই সত্যিটা জানতে পারিস, আমাকে ক্ষমা করিস।”
চিঠিতে লেখা ছিল—
“আমি তোকে মিথ্যে বলেছি। কিন্তু সেই মিথ্যেটা ছিল তোকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য। তোর বাবা সত্যি খুঁজতে গিয়ে অনেক শত্রু তৈরি করেছিল। আমি চাইনি তুই তাঁর পথ অনুসরণ করিস। আমি শুধু চেয়েছিলাম তুই বেঁচে থাকিস।”
চিঠির শেষে—
“কখনও যদি ফিরে যাস, ভয় নিয়ে ফিরিস না।”
অর্ক চিঠিটা বুকে চেপে ধরল।
তার মনে হল—
বাবা তাকে সত্যির কাছে পৌঁছতে চেয়েছিলেন।
মা তাকে সত্যি থেকে দূরে রাখতে চেয়েছিলেন।
দুজনের উদ্দেশ্য আলাদা ছিল।
কিন্তু ভালোবাসা একই।
৬
কয়েক মাস পর শিলাবতীপুরে আবার কুয়াশা নামল।
অর্ক পাহাড়ের ধারে দাঁড়িয়ে।
মেঘলা পাশে।
মেঘলা বলল,
— এবার কি ফিরে যাবে?
অর্ক হাসল।
— হ্যাঁ।
— আবার আসবে?
— জানি না।
মেঘলা কিছু বলল না।
অর্ক বলল,
— তবে একটা কথা বুঝেছি।
— কী?
— মানুষ অনেক সময় সত্যির খোঁজে বাড়ি ছেড়ে যায়।
মেঘলা তাকাল।
— তারপর?
— সত্যি খুঁজে পাওয়ার পর বুঝতে পারে, সে আসলে নিজের কাছেই ফিরছিল।
মেঘলা মৃদু হাসল।
— তোমার বাবা এই কথাটা বলতেন।
অর্ক অবাক হয়ে তাকাল।
— বাবা?
— হ্যাঁ।
— কী বলতেন?
মেঘলা দূরের পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
— “কুয়াশা কখনও পথ হারায় না। কুয়াশা শুধু পথটাকে কিছুক্ষণের জন্য আড়াল করে রাখে।”
অর্ক চুপ করে রইল।
তারপর ধীরে ধীরে হাসল।
শহরের দিকে নামার রাস্তা কুয়াশায় ঢাকা।
কিন্তু এবার সে পথ চিনতে পারছিল।
৭
এক বছর পর সুব্রত সেনের নামে একটি ছোট গবেষণা ও নথি সংরক্ষণ কেন্দ্র তৈরি হল।
নাম—
“সুব্রত সেন স্মৃতি কেন্দ্র।”
উদ্বোধনের দিন অর্ক বাবার পুরনো ছবিটা দেয়ালে টাঙাল।
ছবিতে চারজন মানুষ ছিল।
কিন্তু এবার সেই ছবির ইতিহাস আর রহস্য নয়।
সবাই জানে, সেখানে কারা ছিল।
কেউ আর মুখ লুকিয়ে রাখতে পারে না।
সুশান্ত নিজের বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগের বিচার মেনে নিয়ে পরে তদন্তে সহযোগিতা করেছিল।
নির্মল সাক্ষ্য দিয়েছিল।
রণজিৎ মারা যাওয়ার আগে যে নথি রেখে গিয়েছিল, সেটিও মামলায় গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হয়েছিল।
আর মেঘলা?
সে শিলাবতীপুরেই থেকে গেল।
অর্ক কলকাতা থেকে মাঝেমধ্যে সেখানে যেত।
তাদের সম্পর্কের কোনো নাম দেওয়া হয়নি।
প্রয়োজনও হয়নি।
কিছু সম্পর্কের জন্য নামের চেয়ে বিশ্বাস বড়।
এক সন্ধ্যায় অর্ক মেঘলাকে বলল,
— জানো, আমি প্রথম দিন এখানে এসেছিলাম বাবার মৃত্যুর সত্যি জানতে।
— আর এখন?
অর্ক পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
— এখন মনে হয়, সত্যি জানার থেকেও বড় ছিল একটা জিনিস।
— কী?
— বাবাকে নতুন করে চিনতে শেখা।
মেঘলা হাসল।
— আর নিজেকে?
অর্কও হাসল।
— সেটাও।
সেদিন সন্ধ্যায় পাহাড়ের ওপর কুয়াশা নেমেছিল।
কিন্তু অর্ক আর ভয় পেল না।
কারণ সে জানত—
কুয়াশার ওপারে পথ আছে।
অতীতকে মুছে ফেলা যায় না।
মৃত মানুষকে ফিরিয়ে আনা যায় না।
হারানো বছরগুলোও ফিরে আসে না।
কিন্তু সত্যি কখনও পুরোপুরি হারিয়ে যায় না।
কখনও একটা পুরনো ছবি হয়ে ফিরে আসে।
কখনও একটা নোটবুক হয়ে।
কখনও কোনো অপরিচিত মানুষের কণ্ঠে।
আর কখনও—
একজন ছেলের কাছে তার মৃত বাবার অসমাপ্ত কথার মতো ফিরে আসে।
অর্ক শেষবারের মতো পাহাড়ের দিকে তাকাল।
তারপর মেঘলার পাশে হাঁটতে শুরু করল।
কুয়াশা ধীরে ধীরে ঘন হয়ে আসছিল।
কিন্তু এবার সামনে যাওয়ার জন্য আলো দরকার ছিল না।
কারণ পথটা সে চিনে ফেলেছে।
কুয়াশার ওপারে নয়—
পথটা আসলে তার নিজের ভেতরেই ছিল।