Categories
উপন্যাস

উপন্যাস :: নীরব সাক্ষী।

প্রথম পর্ব — যে মানুষটি কথা বলত না

শহরটা খুব বড় নয়।

তবু সন্ধ্যার পর শহরের অলিগলিগুলো এমনভাবে নিঃশব্দ হয়ে যায়, যেন প্রত্যেকটি বাড়ির জানলার আড়ালে মানুষ নয়—কোনও অদৃশ্য অপেক্ষা বসে আছে।

শহরের নাম শালুকপুর।

একসময় এখানে নদী ছিল শহরের প্রাণ। এখন নদীটা অনেক দূরে সরে গেছে। পুরনো ঘাটে নৌকা আসে না। কচুরিপানায় ঢেকে থাকা জলের ওপর মাঝে মাঝে কেবল বাতাসের ঢেউ খেলে যায়।

শালুকপুরের পুরনো আদালত ভবনটি শহরের একেবারে মাঝখানে।

লাল ইটের দোতলা বাড়ি।

ব্রিটিশ আমলের তৈরি।

সামনের বিশাল বটগাছের নিচে এখনও কয়েকজন পুরনো টাইপিস্ট বসেন। কাঠের বাক্সে টাইপরাইটার নিয়ে তাঁরা মানুষের মামলা, হলফনামা, দরখাস্ত লিখে দেন।

সেই আদালতেই নতুন করে কাজ শুরু করেছিল ঈশানী সেন।

বয়স ছাব্বিশ।

কলকাতায় আইন পড়ে কয়েক বছর একটি বড় আইনজীবীর চেম্বারে কাজ করার পর সে ইচ্ছা করেই শালুকপুরে ফিরে এসেছিল।

কারণটা কেউ জানত না।

অনেকে বলত—

“মেয়েটা শহরের চাকরি ছেড়ে এখানে এসেছে কেন?”

কেউ বলত—

“নিশ্চয়ই কোনও পারিবারিক ব্যাপার আছে।”

ঈশানী কাউকে কিছু বলত না।

তার নিজের কাছেও অবশ্য কারণটা খুব পরিষ্কার ছিল না।

শুধু একটা কথা সে জানত—

কিছু সত্যি আছে, যেগুলো বড় শহরের কোলাহলে হারিয়ে যায়।

আর সেই সত্যিগুলো খুঁজে বের করতে হলে কখনও কখনও ছোট শহরে ফিরে আসতে হয়।

সেদিনও আদালতে কাজ শেষ করে সন্ধ্যা সাড়ে ছটার সময় ঈশানী বেরোচ্ছিল।

বৃষ্টি পড়েছিল দুপুরে।

আদালতের সিঁড়িতে এখনও জল জমে।

সে ছাতা খুলতে গিয়েও থেমে গেল।

সামনের বটগাছটার নিচে একজন বৃদ্ধ বসে আছে।

প্রতিদিনই লোকটাকে দেখা যায়।

কখনও বসে থাকে।

কখনও দাঁড়িয়ে থাকে।

কখনও আদালতের দিকে তাকিয়ে থাকে।

কিন্তু কাউকে কোনওদিন কথা বলতে দেখা যায়নি।

লোকটির বয়স সত্তরের কাছাকাছি।

মলিন সাদা পাঞ্জাবি।

ধূসর পাজামা।

চোখে মোটা কাঁচের চশমা।

সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয়—

লোকটি সবসময় হাতে একটা কালো খাতা ধরে রাখে।

ঈশানী প্রথম দিন থেকেই তাকে লক্ষ্য করেছিল।

আজ হঠাৎ বৃদ্ধটি তার দিকে তাকাল।

দুজনের চোখাচোখি হলো।

ঈশানী হালকা হাসল।

“কাকু, বাড়ি যাবেন না?”

লোকটি কোনও উত্তর দিল না।

শুধু কালো খাতাটা বন্ধ করল।

তারপর উঠে দাঁড়াল।

ঈশানী ছাতা খুলে রাস্তার দিকে হাঁটতে শুরু করল।

দু-তিন পা যাওয়ার পর পিছনে তাকিয়ে দেখল—

বৃদ্ধটি এখনও দাঁড়িয়ে আছে।

তার চোখ ঈশানীর দিকে।

সেই দৃষ্টিতে অদ্ভুত কিছু ছিল।

ভয় নয়।

অনুরোধও নয়।

বরং এমন একটা অনুভূতি—

যেন লোকটি তাকে চিনত।


পরদিন সকালে আদালতে পৌঁছে ঈশানী দেখল তার টেবিলের ওপর একটি বাদামি খাম রাখা।

কোনও নাম নেই।

কোনও ঠিকানা নেই।

শুধু সামনের দিকে কালো কালিতে লেখা—

“যে মামলাটা সবাই ভুলে গেছে, সেটা আপনি খুঁজুন।”

ঈশানীর বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।

সে খামটা খুলল।

ভেতরে মাত্র তিনটি জিনিস।

একটি পুরনো সংবাদপত্রের কাটিং।

একটি আদালতের নথির ফটোকপি।

আর একটি সাদা কাগজ।

সাদা কাগজে মাত্র একটি বাক্য—

“সাক্ষী বেঁচে আছে।”

ঈশানী কয়েক সেকেন্ড কাগজটার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর সংবাদপত্রের কাটিংটা হাতে নিল।

তারিখ—

১৭ জুন, ২০১১।

শিরোনাম—

“শালুকপুরে ব্যবসায়ীর রহস্যমৃত্যু—আত্মহত্যা নাকি খুন?”

নিচে লেখা—

শহরের পরিচিত ব্যবসায়ী দেবাশিস রায় নিজের বাড়ির স্টাডি রুমে মৃত অবস্থায় উদ্ধার হন।

পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে আত্মহত্যা বলা হলেও পরিবারের পক্ষ থেকে খুনের অভিযোগ করা হয়।

মামলা আদালতে ওঠে।

দুই বছর পর আদালত আত্মহত্যার পক্ষেই রায় দেয়।

মামলা শেষ।

সব শেষ।

কিন্তু সংবাদপত্রের শেষ লাইনে লেখা—

“ঘটনার একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে যে ব্যক্তির নাম উঠেছিল, তিনি আদালতে সাক্ষ্য দেওয়ার আগেই নিখোঁজ হয়ে যান।”

ঈশানী থমকে গেল।

প্রত্যক্ষদর্শী?

নিখোঁজ?

সে ফটোকপিটা খুলল।

পুরনো আদালতের নথি।

মামলার নম্বর—

৪২/২০১১।

অভিযোগকারী—

মাধুরী রায়।

মৃত—

দেবাশিস রায়।

সাক্ষী—

হরিপদ পাল।

ঈশানীর চোখ আটকে গেল নামটার ওপর।

হরিপদ পাল।

সে নামটা কোথায় যেন শুনেছে।

হঠাৎ তার মনে পড়ল।

গতকাল আদালতের বটগাছের নিচে বসে থাকা বৃদ্ধ মানুষটি।

তার নাম কি হরিপদ?

ঈশানী সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়াল।


দুপুরে সে পুরনো রেকর্ডরুমে গেল।

আদালতের রেকর্ডরুম যেন আরেক পৃথিবী।

ধুলোমাখা তাক।

পুরনো ফাইল।

ছেঁড়া কাগজ।

ইঁদুরে কাটা নথি।

একজন বৃদ্ধ কর্মচারী তাকে দেখে বললেন,

“কী ফাইল চাই?”

“৪২/২০১১।”

লোকটি চশমার ওপর দিয়ে তাকাল।

“অনেক পুরনো মামলা।”

“জানি।”

“কী করবেন?”

“পড়ব।”

বৃদ্ধ কর্মচারী কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন,

“সব পুরনো জিনিস খুঁজতে নেই, ম্যাডাম।”

ঈশানী মৃদু হাসল।

“আমি আইনজীবী। পুরনো জিনিসই তো খুঁজি।”

ফাইলটা বের করতে প্রায় আধঘণ্টা লাগল।

অবশেষে ধুলোমাখা একটা ফাইল তার সামনে এল।

ঈশানী ফাইল খুলল।

প্রথম কয়েকটি পৃষ্ঠা সাধারণ।

ময়নাতদন্ত।

পুলিশ রিপোর্ট।

পরিবারের বক্তব্য।

পাশের বাড়ির লোকজনের বিবৃতি।

তারপর সাক্ষীদের তালিকা।

সেখানে লেখা—

হরিপদ পাল — প্রত্যক্ষদর্শী।

কিন্তু পরের পাতায় লাল কালিতে একটি মন্তব্য—

“সাক্ষী অনুপস্থিত। ঠিকানা যাচাই করে পাওয়া যায়নি।”

ঈশানীর কপালে ভাঁজ পড়ল।

সে আরও পড়তে লাগল।

হরিপদ পাল ছিলেন দেবাশিস রায়ের বাড়ির রাত্রিকালীন নিরাপত্তারক্ষী।

ঘটনার রাতে তিনি নাকি বাড়ির পেছনের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছিলেন।

পুলিশকে প্রথম বিবৃতিতে তিনি বলেছিলেন—

“আমি একজন মানুষকে বেরিয়ে যেতে দেখেছি।”

শুধু একজন মানুষ।

তারপর?

কোনও নাম নেই।

কোনও বর্ণনা নেই।

কারণ দ্বিতীয়বার জিজ্ঞাসাবাদের আগেই হরিপদ নিখোঁজ।

ঈশানী ফাইল বন্ধ করল।

তার মনে হল—

এই মামলায় কোথাও একটা বড় ফাঁক রয়েছে।

আর সেই ফাঁকের মধ্যে হয়তো এমন কোনও সত্যি লুকিয়ে আছে, যা কেউ প্রকাশ করতে চায়নি।


সন্ধ্যায় আদালত থেকে বেরিয়ে ঈশানী সরাসরি বটগাছটার দিকে গেল।

বৃদ্ধটি আজও সেখানে।

আগের মতোই।

কালো খাতা হাতে।

ঈশানী তার সামনে দাঁড়াল।

“আপনার নাম হরিপদ পাল?”

লোকটি নড়ল না।

কয়েক সেকেন্ড পর ধীরে ধীরে তার চোখ উঠল।

ঈশানী বলল,

“২০১১ সালের দেবাশিস রায়ের মামলায় আপনি সাক্ষী ছিলেন?”

বৃদ্ধের মুখে কোনও পরিবর্তন নেই।

ঈশানী এবার আরও কাছে গেল।

“আপনি কি হরিপদ পাল?”

বৃদ্ধটি কালো খাতা খুলল।

একটি পৃষ্ঠা ছিঁড়ে ঈশানীর হাতে দিল।

তারপর উঠে হাঁটতে শুরু করল।

ঈশানী কাগজটার দিকে তাকাল।

কাঁপা হাতে লেখা—

“হ্যাঁ।”

তার নিচে আরও একটি লাইন—

“কিন্তু আমি একমাত্র সাক্ষী নই।”

ঈশানী দৌড়ে বৃদ্ধটির দিকে তাকাল।

“আর কে?”

বৃদ্ধ থামল।

পেছন ফিরে তাকাল না।

শুধু হাত তুলে আদালতের দোতলার দিকে ইশারা করল।

ঈশানী দোতলার জানলার দিকে তাকাল।

একটি জানলা অন্ধকার।

কিন্তু পর্দার আড়ালে যেন কারও ছায়া দাঁড়িয়ে আছে।

ঈশানীর বুকের ভেতরটা হঠাৎ ঠান্ডা হয়ে গেল।

সে আবার বৃদ্ধটির দিকে তাকাল।

লোকটি নেই।


সেই রাতে ঈশানী ঘুমাতে পারল না।

বারবার একই প্রশ্ন মাথায় ঘুরছিল—

“একমাত্র সাক্ষী নই”—মানে কী?

দেবাশিস রায়ের মামলায় কি আরও কেউ ছিল?

যদি থাকে, তাকে কেন নথিতে রাখা হয়নি?

আর হরিপদ এত বছর কোথায় ছিলেন?

কেন এখন ফিরে এসেছেন?

রাত দুটো নাগাদ ঈশানীর ফোন বেজে উঠল।

অচেনা নম্বর।

সে ফোন ধরল।

ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।

তারপর একটি পুরুষকণ্ঠ—

“আপনি ফাইলটা দেখেছেন?”

ঈশানী চুপ।

“কে বলছেন?”

“যেটা খুঁজছেন, সেটা খুঁজবেন না।”

“আপনি কে?”

“দেবাশিস রায় আত্মহত্যা করেননি।”

ঈশানীর শরীর শক্ত হয়ে গেল।

“তাহলে কে খুন করেছিল?”

ওপাশ থেকে উত্তর এল—

“আপনি খুব ভুল প্রশ্ন করছেন।”

“কেন?”

“কারণ প্রশ্নটা হওয়া উচিত—দেবাশিস রায়কে কেন মরতে হয়েছিল?”

লাইন কেটে গেল।

ঈশানী কিছুক্ষণ ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর জানলার বাইরে তাকাল।

রাস্তা নিঃশব্দ।

দূরে কুকুর ডাকছে।

হঠাৎ তার চোখ আটকে গেল রাস্তার ওপারে।

একজন মানুষ দাঁড়িয়ে।

কালো ছাতা হাতে।

মুখ দেখা যাচ্ছে না।

ঈশানী জানলার কাছে এগিয়ে গেল।

লোকটি ধীরে ধীরে ছাতাটা নামাল।

তার মুখ দেখা গেল।

ঈশানীর বুক ধক করে উঠল।

লোকটি—

হরিপদ পাল।

কিন্তু পরের মুহূর্তেই বৃদ্ধটি রাস্তার অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।

ঈশানী দরজা খুলে বাইরে বেরোতে গেল।

ঠিক তখনই তার ফোনে একটি মেসেজ এল।

একটি ছবি।

ছবিটা দেখে তার হাত কেঁপে উঠল।

দেবাশিস রায়ের বাড়ির পুরনো স্টাডি রুম।

ছবিটি তোলা হয়েছিল মৃত্যুর রাতেই।

আর ছবির কোণে দাঁড়িয়ে থাকা একজন মানুষ—

ঈশানীর নিজের বাবা।

নীচে লেখা—

“আপনার বাবাও এই মামলার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।”

ঈশানী স্তব্ধ হয়ে গেল।

কারণ তার বাবা মারা গেছেন মাত্র ছয় মাস আগে।

আর জীবিত অবস্থায় তিনি কোনওদিন তাকে এই মামলার কথা বলেননি।

চলবে…

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *