রাত তখন ১টা ১৭ মিনিট।
কলকাতার উত্তর শহরতলির পুরোনো বাড়িটায় সমস্ত আলো নিভে গিয়েছিল। শুধু দোতলার শেষ ঘরটায় জ্বলছিল একটি টেবিল ল্যাম্প। জানলার বাইরে বৃষ্টির শব্দ, মাঝে মাঝে বিদ্যুতের ঝলকানি, আর দেওয়ালে ঝোলানো পুরোনো ঘড়িটার একটানা টিকটিক শব্দ—সব মিলিয়ে বাড়িটাকে যেন পৃথিবীর বাকি অংশ থেকে আলাদা করে রেখেছিল।
ঘরের মাঝখানে বসে ছিল অরিত্র মজুমদার। বয়স ছত্রিশ। পেশায় পেশাদার ফটোগ্রাফার। পুরোনো বাড়ি, পরিত্যক্ত কারখানা, ভেঙে পড়া জমিদারবাড়ি—এইসব জায়গার ছবি তোলাই তার নেশা। মানুষের ভিড় থেকে দূরে থাকতে ভালোবাসত সে। কিন্তু গত কয়েক মাসে তার জীবনে এমন কিছু ঘটনা ঘটেছে, যার ব্যাখ্যা সে নিজেও খুঁজে পাচ্ছিল না।
তার সামনে রাখা ছিল একটি নীল রঙের খাম।
খামটা এসেছিল বিকেলে। কোনও ডাকটিকিট নেই, প্রেরকের নাম নেই, এমনকি খামের ওপর অরিত্রর ঠিকানাও লেখা ছিল না। তবু বাড়ির পুরোনো দারোয়ান নিতাই কাকা দাবি করেছিলেন, একজন অচেনা মহিলা এসে খামটা তাঁর হাতে দিয়ে বলেছিলেন, “অরিত্রবাবুকে দেবেন। উনি জানেন, এটা কীসের চিঠি।”
অরিত্র জানত না।
খাম খুলে ভেতর থেকে সে পেয়েছিল একটি সাদা কাগজ। কাগজে মাত্র তিনটি লাইন লেখা।
‘তুমি যাকে মৃত বলে জানো, সে মৃত নয়।
যে মানুষটি তোমার বাড়িতে থাকে, সে তোমার আত্মীয় নয়।
আগামী শুক্রবার রাত বারোটার আগে পুরোনো নীলকুঠিতে এসো। একা।’
নিচে কোনও নাম নেই। শুধু একটি তারিখ।
সতেরো বছর আগের তারিখ।
২০০৯ সালের ১৪ নভেম্বর।
অরিত্র কাগজটার দিকে তাকিয়ে রইল। তারিখটা দেখেই বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠেছিল। কারণ ওই দিনই তার জীবনের সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনাটি ঘটেছিল। তার মা, মধুমিতা মজুমদার, বাড়ি থেকে বেরিয়ে আর ফিরে আসেননি।
পুলিশ বলেছিল, নদীতে পড়ে মৃত্যু হয়েছে তাঁর। কয়েক দিন পর নদীর ধারে একটি শাড়ির ছেঁড়া অংশ পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু কোনও দেহ পাওয়া যায়নি।
অরিত্রর বাবা তখন বলেছিলেন, “তোর মা আর ফিরবে না।”
তারপর থেকে বাড়িতে মায়ের কথা বলা নিষিদ্ধ হয়ে গিয়েছিল।
কিন্তু চিঠিতে লেখা ছিল—যাকে মৃত বলে জানো, সে মৃত নয়।
তাহলে কি মা বেঁচে আছেন?
আর দ্বিতীয় লাইনটা?
‘যে মানুষটি তোমার বাড়িতে থাকে, সে তোমার আত্মীয় নয়।’
অরিত্রর বাড়িতে এখন মাত্র দুজন মানুষ থাকত—সে নিজে এবং তার বাবা, দেবব্রত মজুমদার। বাবা অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী। বয়স সত্তরের কাছাকাছি। শরীর দুর্বল, হাঁটাচলা ধীর, কিন্তু স্মৃতিশক্তি এখনও আশ্চর্য রকম ভালো।
তাহলে কি চিঠিটা তার বাবাকে নিয়ে?
অরিত্র মাথা নাড়ল। অসম্ভব।
তবু মনের ভেতরে একটা অস্বস্তি জমে উঠল। সে চিঠিটা আবার ভাঁজ করে খামের মধ্যে রাখল। ঠিক তখনই নিচের তলা থেকে একটা শব্দ ভেসে এল।
ঠক।
তারপর আবার—
ঠক। ঠক।
যেন কেউ সদর দরজায় ধীরে ধীরে আঘাত করছে।
অরিত্র ঘড়ির দিকে তাকাল। রাত একটা বেজে সতেরো মিনিট। এই সময়ে কে আসতে পারে?
সে টেবিল ল্যাম্প নিভিয়ে দরজার কাছে গেল। সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে তার মনে হলো, বাড়ির ভেতরে যেন অস্বাভাবিক ঠান্ডা। জানলা বন্ধ, দরজা বন্ধ, তবু কোথা থেকে একটা ভেজা মাটির গন্ধ আসছে।
সদর দরজার কাছে গিয়ে সে জিজ্ঞেস করল, “কে?”
কোনও উত্তর এল না।
আবার তিনটে আঘাত।
ঠক। ঠক। ঠক।
অরিত্র দরজার ছিটকিনি খুলে বাইরে তাকাল।
কেউ নেই।
শুধু বারান্দার মেঝেতে পড়ে রয়েছে আরেকটি নীল খাম।
এবার খামের ওপর কালো কালিতে লেখা—
‘প্রথম চিঠিটা পড়েছ। এবার সত্যিটা পড়ো।’
অরিত্র খামটা তুলে নিল। হাতের আঙুলগুলো ঠান্ডা হয়ে আসছিল। সে দরজা বন্ধ করে আলো জ্বালল। খামের ভেতর থেকে বেরিয়ে এল একটি পুরোনো সাদা-কালো ছবি।
ছবিতে একটি বাড়ি। বাড়িটার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন তিনজন মানুষ—একজন মহিলা, একজন পুরুষ এবং একটি ছোট ছেলে।
মহিলাটিকে চিনতে অরিত্রর এক মুহূর্তও লাগল না।
তার মা।
পুরুষটি তার বাবা দেবব্রত।
কিন্তু ছোট ছেলেটি কে?
ছবিতে ছেলেটির বয়স সাত-আট বছরের বেশি নয়। পরনে হাফপ্যান্ট, গায়ে সাদা জামা। চোখ দুটো অদ্ভুতভাবে পরিচিত। অরিত্র ছবিটা নিজের মুখের কাছে তুলে ধরল।
ছেলেটির মুখ তার নিজের ছোটবেলার ছবির সঙ্গে হুবহু মিলে যায়।
কিন্তু একটা সমস্যা ছিল।
অরিত্রর শৈশবের কোনও ছবিতেই তাকে ওই পোশাকে দেখা যায়নি। আর ছবির পেছনে লেখা তারিখ অনুযায়ী, ছবিটি তোলা হয়েছিল ২০০৯ সালের ১৪ নভেম্বর—যে দিন তার মা নিখোঁজ হয়েছিলেন।
ছবির পেছনে আরও একটি বাক্য লেখা ছিল।
‘তুমি সেদিন একা ছিলে না।’
পরদিন সকালে অরিত্র কোনও কাজ করতে পারল না।
সকালের চা ঠান্ডা হয়ে গেল, ক্যামেরার ব্যাটারি চার্জে বসানো রইল, অথচ তার সমস্ত মন পড়ে রইল ছবিটার ওপর। সে বারবার ছবিটা পরীক্ষা করল। কাগজের গুণমান, পুরোনো হয়ে যাওয়া প্রান্ত, ছবির পেছনের লেখা—সবই সত্যিকারের পুরোনো ছবির মতো। কোনও ডিজিটাল কারসাজির চিহ্ন সে খুঁজে পেল না।
কিন্তু সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয় ছিল বাড়িটা।
ছবির পেছনে একটি ছোট ফলক দেখা যাচ্ছিল। সেখানে অস্পষ্টভাবে লেখা—‘নীলকুঠি’।
এই নাম সে আগে শুনেছে।
শহর থেকে প্রায় পঁয়ত্রিশ কিলোমিটার দূরে, একসময় নীল চাষের জন্য বিখ্যাত একটি গ্রামে দাঁড়িয়ে আছে পরিত্যক্ত নীলকুঠি। বহু বছর ধরে বাড়িটা বন্ধ। স্থানীয় মানুষজনের দাবি, সেখানে কেউ থাকে না। সন্ধের পর বাড়িটার কাছাকাছি গেলেও নাকি অদ্ভুত শব্দ শোনা যায়।
অরিত্র একবার সেখানে ছবি তুলতে গিয়েছিল। প্রায় পাঁচ বছর আগে। বাড়ির ভাঙা দেওয়াল, শ্যাওলা ধরা সিঁড়ি আর লতাপাতায় ঢেকে যাওয়া জানলা তার ক্যামেরায় বন্দি হয়েছিল। কিন্তু একটি ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে সে ছবি তুলতে পারেনি।
কারণ সেই ঘরের দরজার গায়ে তার মায়ের নাম লেখা ছিল।
‘মধুমিতা।’
সেদিন সে ভেবেছিল, হয়তো কারও পুরোনো নামের ফলক। কিন্তু বাড়ি ফিরে ছবিগুলো দেখার সময় সে অবাক হয়ে দেখেছিল, ওই দরজার ছবি ক্যামেরায় আসেনি। যতবারই সে ছবি তুলেছে, ওই নির্দিষ্ট অংশটি ঝাপসা হয়ে গিয়েছে।
এরপর সে আর কখনও নীলকুঠিতে যায়নি।
সকাল দশটার দিকে অরিত্র বাবার ঘরে গেল।
দেবব্রতবাবু জানলার পাশে বসে খবরের কাগজ পড়ছিলেন। চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা, পাশে আধখাওয়া চায়ের কাপ।
অরিত্র বলল, “বাবা, একটা কথা জিজ্ঞেস করব?”
দেবব্রত কাগজ থেকে চোখ না তুলেই বললেন, “বল।”
“মা নিখোঁজ হওয়ার দিন আমি কোথায় ছিলাম?”
খবরের কাগজটা ধীরে ধীরে নামিয়ে রাখলেন দেবব্রত।
“কী প্রশ্ন করছিস?”
“সেদিন আমি বাড়িতে ছিলাম, না তোমার সঙ্গে কোথাও গিয়েছিলাম?”
“বাড়িতেই ছিলি। কেন?”
অরিত্র পকেট থেকে ছবিটা বের করে বাবার সামনে রাখল।
দেবব্রত ছবিটার দিকে তাকালেন।
মাত্র কয়েক সেকেন্ড।
তারপর তাঁর হাত থেকে চায়ের কাপটা পড়ে গেল। মেঝেতে কাপ ভেঙে ছড়িয়ে পড়ল চা।
অরিত্র ছুটে গিয়ে বাবাকে ধরল।
“কী হয়েছে? শরীর খারাপ লাগছে?”
দেবব্রত ছবিটার দিকে আঙুল তুলে বললেন, “এটা কোথায় পেলি?”
“একটা চিঠির সঙ্গে এসেছে।”
“কে দিয়েছে?”
“জানি না।”
দেবব্রত উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেন। তাঁর মুখের রং ফ্যাকাশে। তিনি ছবিটা হাতে নিয়ে উল্টেপাল্টে দেখলেন, তারপর হঠাৎ সেটাকে ছিঁড়ে ফেলতে গেলেন।

অরিত্র তাঁর হাত চেপে ধরল।
“ছিঁড়ছ কেন?”
“এটা মিথ্যে! সব মিথ্যে!”
“ছবিটা তো সত্যি। ওই ছেলেটা কে?”
দেবব্রত কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর নিচু গলায় বললেন, “তোর কোনও দরকার নেই এসব জানার।”
“কিন্তু আমার ছোটবেলার ছবি বলে মনে হচ্ছে। অথচ আমি এমন পোশাক কখনও পরেছি বলে মনে পড়ে না।”
“অনেক কিছুই মনে নেই তোর।”
“কী মনে নেই?”
দেবব্রত এবার অরিত্রর দিকে তাকালেন। তাঁর চোখে ভয়, রাগ আর এমন এক অসহায়তা, যা অরিত্র আগে কখনও দেখেনি।
“কিছু দরজা বন্ধ থাকাই ভালো, অরিত্র। সব দরজা খুলতে নেই।”
“আর যদি সেই দরজার ওপারে আমার মা থাকেন?”
প্রশ্নটা শুনে দেবব্রত যেন পাথর হয়ে গেলেন।
অনেকক্ষণ পর তিনি বললেন, “তোর মা মারা গেছেন।”
“তাহলে ছবিতে তিনি কেন আছেন?”
“ছবিটা পুরোনো।”
“সেদিনের তারিখ লেখা আছে পেছনে।”
দেবব্রত হঠাৎ ছেলের হাত ছেড়ে দিলেন। ধীরে ধীরে নিজের ঘরের দিকে এগিয়ে গেলেন। দরজার কাছে গিয়ে থেমে বললেন, “শুক্রবার রাতে কোথাও যাবি না।”
অরিত্র চমকে উঠল।
“শুক্রবার?”
দেবব্রত আর কোনও কথা বললেন না। দরজা বন্ধ করে দিলেন।
অরিত্র দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রইল। সে তো বাবাকে শুক্রবারের কথা এখনও বলেনি।
তাহলে বাবা জানলেন কীভাবে?
বিকেলের দিকে অরিত্র তার পুরোনো বন্ধু ঋতমকে ফোন করল। ঋতম পেশায় সাংবাদিক। রহস্য, অপরাধ এবং পুরোনো ঘটনা নিয়ে অনুসন্ধান করতে ভালোবাসে।
সব শুনে ঋতম প্রথমে হেসে উঠল।
“তোর সঙ্গে কেউ মজা করছে। পুরোনো বাড়ির ছবি, রহস্যময় চিঠি—এসব দিয়ে এখন অনেকেই মানুষকে বোকা বানায়।”
অরিত্র বলল, “আমার বাবার প্রতিক্রিয়াটা দেখলে তুই হাসতে পারতিস না।”
“ছবিটা পাঠা।”
অরিত্র ছবির দুটো দিকের ছবি তুলে পাঠিয়ে দিল।
কয়েক মিনিট পরে ঋতম ফোন করল।
এবার তার গলায় হাসি নেই।
“শোন, ছবির পেছনের তারিখটা ঠিক আছে?”
“হ্যাঁ।”
“নীলকুঠির ছবি তুই কবে তুলেছিলি?”
“পাঁচ বছর আগে।”
“তখন কি তুই একা গিয়েছিলি?”
“হ্যাঁ।”
“নিশ্চিত?”
অরিত্র বিরক্ত হয়ে বলল, “এই প্রশ্নটা সবাই করছে কেন?”
ঋতম একটু থেমে বলল, “কারণ পাঁচ বছর আগে নীলকুঠিতে একটা দুর্ঘটনা ঘটেছিল। এক স্থানীয় গাইড সেখানে গিয়ে নিখোঁজ হয়। পরে তার ক্যামেরা পাওয়া যায়, কিন্তু লোকটাকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। পুলিশ কেসটা বন্ধ করে দেয়।”
“তার সঙ্গে আমার কী সম্পর্ক?”
“সেটা জানি না। তবে তুই যে ছবিটা পাঠিয়েছিস, তার পেছনের বাড়িটা আমি চিনি। ওটা শুধু নীলকুঠি নয়। আগে ওখানে একটা অনাথ আশ্রম ছিল।”
অরিত্রর বুকের মধ্যে কেমন একটা শব্দ হলো।
“অনাথ আশ্রম?”
“হ্যাঁ। আশির দশকের শেষ দিকে। পরে আগুন লাগে। কয়েকজন শিশুর মৃত্যু হয়েছিল বলে খবর বেরিয়েছিল। কিন্তু আশ্রমের নথিপত্র আর শিশুদের তালিকা নিয়ে অনেক প্রশ্ন ছিল। কেউ বলত, আগুনের রাতে কয়েকজন শিশুকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। কেউ বলত, আসলে কোনও শিশুই মারা যায়নি।”
অরিত্র চুপ করে রইল।
ঋতম বলল, “আমি পুরোনো খবরের কাগজ ঘেঁটে দেখব। তুই ছবিটা যত্ন করে রাখিস। আর শুক্রবার সেখানে যাওয়ার আগে আমাকে জানাবি।”
“তুই আমার সঙ্গে যাবি?”
“অবশ্যই। তবে তার আগে একটা কাজ কর।”
“কী?”
“তোর জন্মের কাগজপত্র খুঁজে দেখ। জন্মের শংসাপত্র, হাসপাতালের নথি, পুরোনো ডায়েরি—যা আছে।”
ফোন কেটে যাওয়ার পর অরিত্র সোজা চলে গেল বাড়ির পুরোনো স্টোররুমে।
ঘরটা বহুদিন পরিষ্কার করা হয়নি। একদিকে ভাঙা চেয়ার, অন্যদিকে পুরোনো ট্রাঙ্ক, কাঠের বাক্স আর খবরের কাগজের স্তূপ। ধুলোয় নাক চুলকোতে লাগল। ঘণ্টাখানেক খোঁজাখুঁজির পর সে একটা লোহার ট্রাঙ্ক পেল। ট্রাঙ্কের গায়ে ছোট করে লেখা—‘মধুমিতা’।
চাবি ছিল না।
অরিত্র একটা পুরোনো স্ক্রু-ড্রাইভার দিয়ে তালাটা খোলার চেষ্টা করল। কিছুক্ষণ পর তালা ভেঙে গেল।
ভেতরে ছিল কয়েকটি শাড়ি, কিছু চিঠি, একটি ডায়েরি এবং কাপড়ে মোড়া ছোট্ট একটি কাঠের বাক্স।
ডায়েরিটা খুলতেই প্রথম পাতায় মায়ের হাতের লেখা চোখে পড়ল।
‘যদি কখনও আমার ছেলে এই ডায়েরি পড়ে, তবে তাকে বলো—আমি তাকে ফেলে যাইনি।’
অরিত্রর চোখ ঝাপসা হয়ে এল।
সে পরের পাতাগুলো উল্টাতে লাগল।
কিছু পাতা ছিল সাধারণ সংসারের কথা নিয়ে। বাজারের হিসেব, আত্মীয়দের নাম, স্কুলে অরিত্রর প্রথম দিনের বর্ণনা। কিন্তু ২০০৯ সালের নভেম্বর মাসের পাতাগুলোতে এসে লেখা বদলে গেল। অক্ষরগুলো তাড়াহুড়ো করে লেখা, কোথাও কোথাও কালি ছড়িয়ে গেছে।
১০ নভেম্বর—
‘আজ আবার ফোন এসেছিল। তারা বলেছে, আমি যদি চুপ না করি, তাহলে অরিত্রকে নিয়ে যাবে।’
১১ নভেম্বর—
‘দেবব্রত সব জানে। অথচ সে মুখ খুলছে না। আমি আর কাউকে বিশ্বাস করতে পারছি না।’
১২ নভেম্বর—
‘আজ ছেলেটাকে দেখলাম। অরিত্রর মতোই দেখতে। কিন্তু সে আমার ছেলে নয়। তা হলে কে?’
অরিত্রর হাত কেঁপে উঠল।
১৩ নভেম্বর—
‘আগামীকাল সব শেষ করব। সত্যিটা জানতেই হবে। ওরা বলছে, আমার স্মৃতি ভুল। কিন্তু আমি জানি, সেদিন রাতে দুটো শিশু ছিল।’
১৪ নভেম্বরের পাতাটা ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে।
তারপরের পাতায় মাত্র একটি বাক্য—
‘আমি ফিরে আসব। তবে যে আমাকে খুঁজবে, সে যেন নিজের মুখটাকেও চিনে নিতে পারে।’
অরিত্র ডায়েরিটা বন্ধ করল।
ঘরের বাইরে তখন সন্ধে নেমেছে।
সে কাঠের বাক্সটা খুলল। ভেতরে ছিল একটি রুপোর লকেট, একটি ছোট্ট শিশুর হাসপাতালের পরিচয়-ফিতা এবং একটি পুরোনো অডিও ক্যাসেট।
পরিচয়-ফিতায় লেখা—
‘শিশু: অরিত্র মজুমদার।
জন্মতারিখ: ১৪ নভেম্বর ১৯৯২।
অভিভাবক: মধুমিতা মজুমদার।’
অরিত্রর জন্মতারিখ ১৪ নভেম্বর ১৯৯২—এটা সে জানত। কিন্তু ফিতার পেছনে লাল কালিতে আরও একটি নাম লেখা ছিল।
‘শিশু নং ২—অরুণ।’
অরিত্রর যমজ ভাই ছিল?
কেউ কখনও তাকে এ কথা বলেনি।
ক্যাসেটটা হাতে নিয়ে সে বাক্সের তলায় আরও কিছু খুঁজল। সেখানে একটি ছোট কাগজ ভাঁজ করা ছিল। কাগজে হাসপাতালের নাম এবং একটি ঘরের নম্বর লেখা—
‘শিশু বিভাগ, ঘর ১৭।’
তার নিচে মায়ের হাতের লেখায়—
‘একজনকে বাড়ি নিয়ে গিয়েছিলাম। অন্যজনকে কোথায় নিয়ে গেল, কেউ বলতে চায় না।’
অরিত্রর মনে হলো, ঘরের মেঝে যেন হঠাৎ দুলে উঠেছে।
সে একা বড় হয়েছে। বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান হিসেবেই নিজেকে জেনেছে। কোনও ভাই নেই, বোন নেই—এই কথাই শুনে এসেছে সারা জীবন।
তাহলে অরুণ কে?
আর যদি সত্যিই তার যমজ ভাই থেকে থাকে, তবে সে কোথায়?
রাত ন’টার দিকে বাড়িতে ফিরে অরিত্র দেখল, বাবা নিজের ঘরে নেই। খাবার টেবিলে খাবার ঢাকা দেওয়া আছে, কিন্তু দেবব্রতবাবুর ওষুধের বাক্সটা খোলা পড়ে রয়েছে।
“বাবা?”
কোনও উত্তর নেই।
সে একতলা, দোতলা, ছাদ—সব জায়গায় খুঁজল। বাবাকে কোথাও পাওয়া গেল না।
সদর দরজার ছিটকিনি ভেতর থেকে বন্ধ ছিল। জানলাগুলোও বন্ধ। বাড়ির পেছনের ছোট দরজাটা অবশ্য আধখোলা।
অরিত্র দরজার বাইরে বেরিয়ে দেখল, ভেজা মাটির ওপর পায়ের ছাপ। পায়ের ছাপগুলো বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়েছে, কিন্তু ফিরে আসার কোনও চিহ্ন নেই।
মাটিতে পড়ে রয়েছে বাবার চশমা।
অরিত্র চশমাটা তুলে নিল। তার বুকের ভেতরে এবার সত্যিকারের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল।
সে ফোন বের করে বাবাকে কল করল।
ফোনের রিংটোন ভেসে এল বাড়ির ভেতর থেকেই।
দেবব্রতবাবুর মোবাইল ফোনটা পড়ে ছিল তাঁর বিছানার ওপর।
অরিত্র পুলিশে খবর দেওয়ার কথা ভাবছিল। ঠিক তখনই তার নিজের ফোনে একটি অজানা নম্বর থেকে বার্তা এল।
‘বাবাকে খুঁজতে চাইলে শুক্রবারের জন্য অপেক্ষা করো। নীলকুঠিতে আসবে। সঙ্গে ক্যাসেটটা আনবে।’
বার্তার নিচে আরও একটি লাইন—
‘কিন্তু সাবধান। তোমার বাবা তোমাকে যা বলেছেন, তার অর্ধেকও সত্যি নয়।’
অরিত্র সঙ্গে সঙ্গে নম্বরটিতে ফোন করল।
নম্বরটি বন্ধ।
সে বাবার ঘরে ঢুকে আলমারি, ড্রয়ার, টেবিল—সব খুঁজতে লাগল। কোনও চিরকুট, কোনও সূত্র পাওয়া গেল না। কিন্তু বিছানার পাশের ছোট ড্রয়ার খুলতেই একটা পুরোনো ছবি পেল।
ছবিতে তার বাবা দাঁড়িয়ে আছেন একটি হাসপাতালের সামনে। পাশে এক মহিলা—মধুমিতা। তাঁদের কোলে দুটি শিশু।
ছবির পেছনে লেখা—
‘১৪ নভেম্বর ১৯৯২। আমরা দুজনকে নিয়ে বাড়ি ফিরব।’
তার নিচে অন্য হাতের লেখায় একটি বাক্য—
‘কিন্তু বাড়ি ফিরেছিল একজন।’
রাত বাড়তে লাগল।
অরিত্র বুঝতে পারছিল, এতদিন যে জীবনকে সে নিজের বলে জেনেছে, তার ভিতটাই হয়তো মিথ্যে দিয়ে তৈরি। তার মা নিখোঁজ হওয়ার দিন কী ঘটেছিল? তার যমজ ভাই কোথায়? বাবা কেন ছবিটা দেখে ভয় পেয়েছিলেন? আর কে বা কারা তাকে নীলকুঠিতে ডেকে পাঠাচ্ছে?
সে ক্যাসেটটা হাতে নিয়ে বসে রইল। বাড়িতে পুরোনো ক্যাসেট চালানোর যন্ত্র ছিল না। কিন্তু তার স্টুডিওতে একটি পুরোনো টেপ রেকর্ডার রয়েছে। সে ঠিক করল, পরদিন সকালে স্টুডিওতে গিয়ে ক্যাসেটটা শুনবে।
হঠাৎ দোতলার করিডরে পায়ের শব্দ হলো।
ধীর, ভারী পায়ের শব্দ।
অরিত্র দরজার দিকে তাকাল।
“কে?”
কোনও উত্তর নেই।
তারপর দরজার নিচ দিয়ে একটা কাগজ ঘরের ভেতরে ঢুকে এল।
অরিত্র ধীরে ধীরে কাগজটা তুলে নিল।
সেখানে মাত্র একটি বাক্য লেখা—
‘তোমার ভাই এখনও বেঁচে আছে।’
তার নিচে একটি ছবি।
ছবিতে একজন যুবক দাঁড়িয়ে আছে অন্ধকার ঘরে। মুখের অর্ধেক আলোয়, অর্ধেক ছায়ায় ঢাকা। তার চোখ, নাক, ঠোঁট—সবকিছু অরিত্রর মুখের মতো।
শুধু যুবকটির ডান গালে একটি লম্বা কাটা দাগ।
ছবির পেছনে লেখা—
‘শুক্রবার রাত বারোটা। নীলকুঠি। দেরি করলে দ্বিতীয়বার কাউকে হারাবে।’
অরিত্র ছবিটা বুকের কাছে চেপে ধরল।
বাইরে আবার বৃষ্টি শুরু হয়েছে।
দূরে কোথাও একটা কুকুর একটানা ডেকে চলেছে। আর বাড়ির পুরোনো ঘড়িতে তখন রাত বারোটা বাজতে শুরু করেছে।
ঢং।
ঢং।
ঢং।
বারোটা বাজার শেষ শব্দটা মিলিয়ে যেতেই অরিত্রর ফোন বেজে উঠল।
স্ক্রিনে কোনও নম্বর নেই।
শুধু লেখা—
‘মা কলিং।’
অরিত্রর হাত অবশ হয়ে গেল।
সতেরো বছর ধরে মৃত বলে জেনে আসা মায়ের নাম ফোনের পর্দায় জ্বলছে।
সে কাঁপা হাতে কলটা ধরল।
ওপাশে প্রথমে কোনও শব্দ নেই। তারপর খুব ধীরে, কান্নাভেজা এক নারীকণ্ঠ বলল—
“অরিত্র… তুই কি এখনও আমাকে চিনতে পারিস?”
অরিত্রর চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।
“মা?”
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর মহিলা ফিসফিস করে বললেন—
“শুক্রবার নীলকুঠিতে যাস না। ওখানে তোর ভাই অপেক্ষা করছে ঠিকই, কিন্তু সে তোকে খুঁজছে না…”
“তাহলে কাকে খুঁজছে?”
ওপাশ থেকে উত্তর এল—
“সে খুঁজছে সেই মানুষটাকে, যে আমাদের দুজনের মধ্যে একজনকে মেরে ফেলেছিল।”
ঠিক সেই মুহূর্তে ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল।
অরিত্র স্থির হয়ে বসে রইল।
তার সামনে পড়ে রয়েছে তিনটি জিনিস—নীল খাম, যমজ ভাইয়ের ছবি এবং মায়ের ডায়েরি।
এবার তার আর কোনও সন্দেহ রইল না।
শুক্রবার তাকে নীলকুঠিতে যেতেই হবে।
কিন্তু তার আগে জানতে হবে, তার নিজের জন্মের রাতেই যদি একটি শিশু হারিয়ে গিয়ে থাকে, তবে সেই শিশুর পরিচয় নিয়ে এত বছর ধরে মিথ্যে বলেছে কে?
আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—
যদি ফোনের ওপাশে সত্যিই তার মা কথা বলে থাকেন, তবে এত বছর ধরে তিনি কোথায় ছিলেন?
চলবে…