রাত এগারোটা তেতাল্লিশ।
নীলকুঠির সমস্ত জানালায় তখনও নীল আলো জ্বলছে। বাইরে কৃষ্ণচূড়া গাছের নীচে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটি গেটের দিকে তাকিয়ে আছে। তার হাতে একটি লাল বল। মুখে অদ্ভুত শান্ত হাসি, অথচ চোখের গভীরে জমে রয়েছে বহু বছরের অভিমান।
মেয়েটি একবার গেটের তালায় হাত রাখল।
সঙ্গে সঙ্গে তালাটি খুলে মাটিতে পড়ে গেল।
সে ভিতরে ঢুকে দরজা বন্ধ করল না। বরং বাড়ির সদর দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়ে খুব নিচু গলায় বলল, ‘দিদি, আমি এসেছি।’
বাড়ির ভিতর থেকে কোনও উত্তর এল না।
মেয়েটি মাথা তুলে দোতলার দিকে তাকাল। নীল আলোয় ভেসে থাকা জানালার ওপারে যেন একটা ছায়া নড়ে উঠল।
‘দিদি, তুমি কি এখনও আমাকে ভয় পাও?’
তারপর সে বাড়ির ভিতরে ঢুকে পড়ল।
১. বন্ধ ঘরের ভিতর
নীলাঞ্জনা তখনও নীল ঘরের মেঝেতে বসে। অন্ধকারের মধ্যে তার হাত দুটো কাঁপছে। বৃদ্ধ কোথায় গেলেন, সে বুঝতে পারছে না। কিছুক্ষণ আগে যাঁকে সে নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় রহস্যের সাক্ষী বলে মনে করেছিল, তিনি যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেছেন।
আয়নাটা আবার দৃশ্যমান হয়েছে।
কিন্তু এবার তাতে হাসপাতালের ঘর নেই। দেখা যাচ্ছে নীলকুঠির দোতলার করিডর। করিডরের এক প্রান্ত থেকে সাদা পোশাক পরা একটি মেয়ে এগিয়ে আসছে।
নীলাঞ্জনা চোখ মুছল।
মেয়েটি তারই মতো দেখতে। একই চোখ, একই নাক, একই ঠোঁট। এমনকী বাঁ ভ্রুর পাশে ছোট্ট তিলটিও রয়েছে।
মেয়েটি আয়নার সামনে এসে দাঁড়াল।
তার ঠোঁট নড়ল।
‘তুমি কি আমাকে চিনতে পারছ?’
নীলাঞ্জনা কোনও উত্তর দিল না।
‘ছোটবেলায় তুমি আমাকে একটা নাম দিয়েছিলে। মনে আছে?’
‘আমি তোমাকে কখনও দেখিনি।’
‘দেখেছ। শুধু তোমাকে ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে।’
নীলাঞ্জনা মাথা নাড়ল। ‘এসব মিথ্যে। আমার কোনও বোন নেই।’
মেয়েটি মৃদু হাসল।
‘তাহলে তোমার জন্মদিনে প্রতি বছর কেন দুটি মোমবাতি জ্বালানো হত?’
প্রশ্নটা শুনে নীলাঞ্জনার বুকের ভিতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।
ছোটবেলায় জন্মদিনের কেক কাটার আগে তার মা দুটি মোমবাতি জ্বালাতেন। একটি নীলাঞ্জনার জন্য, অন্যটি কার জন্য—সে কোনও দিন জানতে পারেনি। একবার জিজ্ঞাসা করায় মা কেঁদে ফেলেছিলেন। তারপর থেকে সে আর প্রশ্ন করেনি।
মেয়েটি আবার বলল, ‘আমার নাম ইরা। তোমার যমজ বোন।’
নীলাঞ্জনা চোখ বন্ধ করল।
তারপর হঠাৎ মনে পড়ল, ছোটবেলায় একটা স্বপ্ন সে প্রায়ই দেখত। একটি মেয়ে তার পাশে শুয়ে আছে। দুজনেরই পরনে একই রঙের পোশাক। মেয়েটি তার হাত ধরে বলছে, ‘তুই আমাকে ছেড়ে যাবি না তো?’
প্রতিবার ঘুম ভাঙলে নীলাঞ্জনা মায়ের কাছে ছুটে যেত। মা তাকে বুকে টেনে নিতেন, কিন্তু কিছু জিজ্ঞাসা করতেন না।
এত বছর ধরে সেই স্বপ্নকে সে শিশুমনের কল্পনা ভেবেছে।
নীলাঞ্জনা চোখ খুলে বলল, ‘তুমি যদি আমার বোন হও, এত বছর কোথায় ছিলে?’
ইরার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
‘যেখানে আমাকে রেখে গিয়েছিল তোমাদের বাবা।’
‘আমার বাবা তোমাকে কোথায় রেখে গিয়েছিলেন?’
‘এই বাড়িতেই।’
নীলাঞ্জনা অবিশ্বাসের চোখে তাকাল।
ইরা বলল, ‘তুমি চলে যাওয়ার পর আমি অনেক দিন এখানে ছিলাম। তারপর একদিন আমাকে বলা হল, তুমি আর বেঁচে নেই। মা-ও নেই। বাবা-ও নেই। আমার পৃথিবীতে কেউ নেই।’
‘কিন্তু আমি তো বেঁচে আছি!’
‘হ্যাঁ। তুমি বেঁচে আছ। আর আমি এত বছর ধরে তোমার জন্য অপেক্ষা করেছি।’
‘তুমি কোথায় ছিলে?’
ইরা উত্তর দেওয়ার আগেই আয়নার কাচে ফাটল ধরল।
একটি সরু রেখা মাঝখান থেকে নীচের দিকে নেমে এল। তারপর আরেকটি। মুহূর্তের মধ্যে পুরো আয়নাটা জালের মতো ফাটলে ভরে গেল।
ইরা চিৎকার করে উঠল, ‘দিদি, ঘর থেকে বেরিয়ে যাও!’
‘কেন?’
‘ও জেগে উঠেছে!’
‘কে?’
আয়নার ভিতর থেকে এবার একটি পুরুষের কণ্ঠস্বর ভেসে এল।
‘যে সত্যকে কবর দিয়েছিল।’
নীলাঞ্জনা পিছিয়ে গেল।
ফাটল ধরা আয়নার ভিতরে এবার তার বাবাকে দেখা যাচ্ছে।
অরুণাভ সেন—যাঁর মৃত্যু হয়েছিল পাঁচ বছর আগে। তাঁর মুখে সেই পরিচিত হাসি, কিন্তু চোখে এমন এক কঠোরতা যা নীলাঞ্জনা কোনও দিন দেখেনি।
তিনি বললেন, ‘নীলু, আমি তোমাকে বাঁচানোর জন্যই সব করেছি।’
নীলাঞ্জনা চিৎকার করে উঠল, ‘আপনি আমার বোনকে কোথায় রেখেছিলেন?’
‘ওকে বাঁচিয়ে রেখেছিলাম।’
‘কার থেকে?’
অরুণাভের মুখ বদলে গেল।
‘তোমার মায়ের কাছ থেকে।’
এক মুহূর্তের জন্য ঘরটা সম্পূর্ণ নীরব হয়ে গেল।
নীলাঞ্জনা ফিসফিস করে বলল, ‘মায়ের কাছ থেকে?’
‘তোমার মা যা জানত, তা পৃথিবীর কেউ জানতে পারত না। তাই ওকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল।’
‘কে সরিয়ে দিয়েছিল?’
অরুণাভ কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, ঠিক তখনই আয়নাটা ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।
কাচের টুকরোগুলো মেঝেতে ছড়িয়ে পড়ল।
প্রতিটি টুকরোয় দেখা যাচ্ছে নীলাঞ্জনার আলাদা আলাদা প্রতিবিম্ব। কিন্তু কোনও প্রতিবিম্বেই তার মুখ এক নয়। কোথাও সে শিশু, কোথাও কিশোরী, কোথাও বৃদ্ধা। আর একটি টুকরোয় সে দাঁড়িয়ে আছে একটি হাসপাতালের বিছানার পাশে।
বিছানায় শুয়ে আছে ইরা।
তার চোখ বন্ধ।
মনিটরে সোজা একটি রেখা।
নীলাঞ্জনা সেই টুকরোটা তুলতেই তার হাত কেটে গেল। রক্তের ফোঁটা কাচের ওপর পড়ল।
মুহূর্তের মধ্যে ঘরের নীল আলো নিভে গেল।
দরজার বাইরে থেকে শোনা গেল পায়ের শব্দ।
কেউ সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠছে।
এবার আর কোনও রহস্যময় শব্দ নয়।
এটি একজন জীবিত মানুষের পায়ের শব্দ।
২. ডাক্তারের স্বীকারোক্তি
দরজাটা খুলে গেল।
সাদা পাঞ্জাবি পরা বৃদ্ধ আবার ফিরে এসেছেন। তাঁর মুখে উদ্বেগ। হাতে একটি ছোট টর্চ এবং বাদামি রঙের ফাইল।
‘তোমাকে এখানে আনা আমার ভুল হয়েছে,’ তিনি বললেন।
নীলাঞ্জনা উঠে দাঁড়াল। ‘আপনি কে? আমার পরিবারের সব কথা জানেন কীভাবে?’
বৃদ্ধ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
‘আমার নাম ডা. শৈলেন বসু। বাইশ বছর আগে আমি এই অঞ্চলের একটি নার্সিংহোমে কাজ করতাম। তোমার জন্মের সময় তোমার মায়ের চিকিৎসা আমিই করেছিলাম।’
‘আমার মা কি সত্যিই মারা গিয়েছিলেন?’
বৃদ্ধ চুপ করে রইলেন।
‘আমাকে উত্তর দিন!’
‘না,’ তিনি বললেন। ‘তোমার মা সেদিন মারা যাননি।’
নীলাঞ্জনার চোখে জল চলে এল। ‘তাহলে তাঁকে মৃত বলে জানানো হল কেন?’
ডাক্তার ফাইল খুললেন।
‘তোমার জন্মের সময় পরিস্থিতি খুব জটিল ছিল। তোমার মা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। একই সময়ে তোমাদের পরিবারে এমন একটি ঘটনা ঘটেছিল, যা বাইরে প্রকাশ পেলে অনেক মানুষের জীবন বদলে যেত।’
‘কী ঘটনা?’
‘তোমার যমজ বোন ইরার জন্মের কয়েক মিনিট পর থেকেই শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। চিকিৎসার জন্য তাকে কলকাতায় নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা হয়েছিল। কিন্তু যাওয়ার আগেই হাসপাতাল থেকে তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়।’
‘কে সরিয়েছিল?’
‘তোমার বাবা।’
নীলাঞ্জনা স্তব্ধ হয়ে গেল।
ডাক্তার বললেন, ‘তোমার বাবা বলেছিলেন, ইরাকে অন্য হাসপাতালে পাঠানো হচ্ছে। কিন্তু পরে জানা যায়, তাকে এই নীলকুঠিতে নিয়ে আসা হয়েছিল। কেন, সেটা আমি তখন বুঝতে পারিনি।’
‘আর মা?’
‘তোমার মা সুস্থ হওয়ার পর ইরার খোঁজ করেন। তাঁকে বলা হয়, মেয়েটি মারা গেছে। তোমার মা বিশ্বাস করেননি। তিনি বারবার খোঁজ নিতে থাকেন। তারপর একদিন হঠাৎ তাঁকে অন্যত্র নিয়ে যাওয়া হয়।’
‘কোথায়?’
‘সেই উত্তর আমার কাছে নেই।’
নীলাঞ্জনা ফাইলটা ছিনিয়ে নিল। ভিতরে হাসপাতালের নথি, কয়েকটি ছবি এবং পুরোনো চিঠি রয়েছে। একটি কাগজে তারিখ লেখা—১৭ জুলাই, ১৯৯৮। তার নীচে দুটি শিশুর নাম।
প্রথমটি: নীলাঞ্জনা সেন।
দ্বিতীয়টি: ইরা সেন।
দুটি নামের পাশে একই জন্মসময়।
নীলাঞ্জনার হাত কাঁপতে লাগল।
‘আপনি এত বছর চুপ করে ছিলেন কেন?’
ডাক্তার চোখ নামিয়ে বললেন, ‘আমি ভয় পেয়েছিলাম।’
‘কাকে?’
‘তোমার বাবাকে নয়। যে মানুষটা তোমার বাবাকে নির্দেশ দিত, তাকে।’
‘কে সে?’
ডাক্তার উত্তর দেওয়ার আগে নীচতলা থেকে দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ এল।
তারপর কেউ জোরে বলল, ‘ডাক্তারবাবু! আপনি ভিতরে আছেন?’
শৈলেন বসুর মুখের রং বদলে গেল।
তিনি ফিসফিস করে বললেন, ‘সে এসে গেছে।’
‘কে?’
‘যার কথা এতক্ষণ বলছিলাম।’
দরজার বাইরে পায়ের শব্দ থামল।
একজন পুরুষ বলল, ‘নীলাঞ্জনা, তোমার মায়ের কথা জানতে চাও? তাহলে আমার সঙ্গে এসো।’
নীলাঞ্জনা দরজার দিকে এগিয়ে গেল।
ডাক্তার তার হাত ধরে থামালেন।
‘না। ওর কথা শুনবে না।’
বাইরে থেকে আবার সেই কণ্ঠস্বর—
‘তোমার মা বেঁচে আছেন। আর তুমি যদি আজ রাতেই আমার সঙ্গে না যাও, কাল সকালে তাঁর মৃতদেহ পাবে।’
নীলাঞ্জনা ডাক্তারকে সরিয়ে দরজা খুলে দিল।
করিডরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটিকে দেখে সে চিনতে পারল।
তার নাম অদ্বৈত রায়। কলকাতার বিখ্যাত চিকিৎসক, বহু হাসপাতালের উপদেষ্টা এবং তার বাবার পুরোনো বন্ধু। বাবার মৃত্যুর পর তিনিই নীলাঞ্জনার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। পড়াশোনার খরচ থেকে শুরু করে চাকরির প্রথম সুযোগ—সব ক্ষেত্রেই তিনি সাহায্য করেছিলেন।
নীলাঞ্জনা তাঁকে প্রায় পরিবারের সদস্য বলেই মনে করত।
অদ্বৈত মৃদু হাসলেন।
‘অবশেষে দেখা হল, নীলু।’
নীলাঞ্জনা বলল, ‘আপনি আমার মাকে কোথায় রেখেছেন?’
অদ্বৈতের হাসি মিলিয়ে গেল।
‘তোমার মা কোথায় আছেন, সেটা জানার অধিকার তোমার নেই।’
‘কেন?’
‘কারণ তুমি এখনও সত্যের জন্য প্রস্তুত নও।’
‘আমার বোনকে কোথায় রেখেছিলেন?’
অদ্বৈত এবার শৈলেন বসুর দিকে তাকালেন।
‘ডাক্তারবাবু, আপনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, এই বিষয় নিয়ে আর মুখ খুলবেন না।’
শৈলেন বললেন, ‘আমি অনেক দিন চুপ থেকেছি। আর নয়।’
অদ্বৈত ধীরে ধীরে কোটের পকেটে হাত ঢোকালেন।
নীলাঞ্জনা ভাবল, তিনি হয়তো ফোন বের করবেন।
কিন্তু তিনি একটি পুরোনো ছবি বের করলেন।
ছবিতে নীলকুঠির সামনে দাঁড়িয়ে আছে তিনজন মানুষ—অরুণাভ সেন, সুচরিতা এবং অদ্বৈত। তাঁদের মাঝখানে দুটি ছোট মেয়ে।
ছবির নীচে লেখা—
‘পরিবার, ১৯৯৯।’
নীলাঞ্জনা ছবির দিকে তাকিয়ে দেখল, মেয়েদের মধ্যে একজন সে নিজে। অন্যজন ইরা।
কিন্তু ছবির পিছনে লাল কালিতে লেখা ছিল আরও একটি বাক্য—
‘দ্বিতীয় মেয়েটি আসল নয়।’
৩. ইরা কি সত্যিই ফিরে এসেছে?
অদ্বৈত ছবিটা আবার পকেটে রেখে দিলেন।
‘চলো, তোমাকে এখান থেকে নিয়ে যাই।’
নীলাঞ্জনা নড়ল না।
‘আমি কোথাও যাব না। আগে বলুন, ছবির পিছনে ওই কথাটা কে লিখেছে?’
অদ্বৈত ঠান্ডা গলায় বললেন, ‘তোমার মা।’
‘কেন?’
‘কারণ তোমার মা শেষ পর্যন্ত বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলেন, তাঁর দুই মেয়ের মধ্যে একজন মানুষ নয়।’
শৈলেন বসু চিৎকার করে উঠলেন, ‘মিথ্যে!’
অদ্বৈত তাঁর দিকে তাকালেন। ‘আপনি এখনও সবটা জানেন না, ডাক্তারবাবু।’
‘আমি জানি, আপনি কী করেছিলেন।’
‘আপনি শুধু অর্ধেকটা জানেন।’
নীলাঞ্জনা দুজনের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কেউ কি আমাকে সত্যিটা বলবেন?’
অদ্বৈত কিছুক্ষণ নীরব থেকে বললেন, ‘তোমার জন্মের আগেই এই পরিবারের একটা ইতিহাস ছিল। তোমার মা ছোটবেলায় একটি দুর্ঘটনায় তাঁর যমজ বোনকে হারিয়েছিলেন। সেই ঘটনার পর থেকে তিনি বিশ্বাস করতেন, হারিয়ে যাওয়া মানুষ কখনও কখনও অন্য কারও জীবনে ফিরে আসে।’
‘এটা তো কুসংস্কার!’
‘হতে পারে। কিন্তু তোমার জন্মের পর তোমার মা এমন কিছু ঘটনা দেখেছিলেন, যেগুলো তিনি ব্যাখ্যা করতে পারেননি।’
‘যেমন?’
‘তোমার মা দাবি করেছিলেন, একই সময়ে তোমাদের দুজনকে আলাদা ঘরে রেখে গেলেও তোমরা একই কথা বলতে। একজন কাঁদলে অন্যজনও কাঁদত। একজনের শরীরে আঘাত লাগলে অন্যজনের শরীরেও একই জায়গায় দাগ দেখা যেত।’
নীলাঞ্জনা কাঁপা গলায় বলল, ‘এগুলো কি সত্যি?’
শৈলেন বললেন, ‘কিছু ঘটনা সত্যি ছিল। কিন্তু সেগুলোর কোনও অলৌকিক ব্যাখ্যা আমরা পাইনি। শিশুদের মধ্যে এমন কাকতালীয় ঘটনা ঘটতে পারে। আর তোমার মা তখন মানসিকভাবে খুব দুর্বল ছিলেন।’
অদ্বৈত মাথা নাড়লেন।
‘কিন্তু একটি ঘটনা কাকতালীয় ছিল না। তোমার জন্মের ছয় মাস পর ইরা নিখোঁজ হয়ে যায়। আর ঠিক সেই রাতেই তোমার মা একটি ডায়েরিতে লেখেন—“আমার মেয়েটি ফিরে এসেছে। কিন্তু সে আমার মেয়ে নয়।”’
নীলাঞ্জনা চোখ বন্ধ করল।
তার মাথার ভিতর শব্দগুলো ঘুরতে লাগল।
‘আমার মেয়ে নয়…’
‘এর মানে কী?’ সে জিজ্ঞাসা করল।
অদ্বৈত বললেন, ‘সেটাই জানতে তোমাকে এখানে নিয়ে আসা হয়েছে।’
নীলাঞ্জনা অবাক হয়ে বলল, ‘আপনি আমাকে এখানে নিয়ে আসেননি। আমি নিজেই এসেছি।’
অদ্বৈত মৃদু হাসলেন।
‘তুমি কি নিশ্চিত?’
তিনি কোটের পকেট থেকে আরেকটি কাগজ বের করলেন। সেটি একটি পুরোনো চিঠি। নীলাঞ্জনার নিজের হাতের লেখার মতো দেখতে অক্ষরে লেখা—
‘আমি নীলকুঠিতে আসছি। আমার বোনকে ফিরিয়ে আনব।’
তারিখ—তিন মাস আগের।
নীলাঞ্জনা চিঠিটা দেখে শিউরে উঠল।
‘আমি এই চিঠি লিখিনি।’
‘তোমার হাতের লেখা নয়?’ অদ্বৈত জিজ্ঞাসা করলেন।
‘না।’
‘তাহলে তুমি কীভাবে ব্যাখ্যা করবে যে, চিঠিতে তোমার ব্যক্তিগত ডায়েরির একটি বাক্য হুবহু লেখা আছে?’
নীলাঞ্জনা কোনও উত্তর দিতে পারল না।
সে বুঝতে পারছিল, কেউ তাকে বহুদিন ধরে এই বাড়ির দিকে ঠেলে নিয়ে এসেছে। কিন্তু কে? আর কেন?
হঠাৎ করিডরের শেষ প্রান্ত থেকে ইরার গলা ভেসে এল।
‘দিদি!’
নীলাঞ্জনা ঘুরে তাকাল।
সাদা পোশাক পরা মেয়েটি দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতে লাল বল। চোখে জল।
‘ওদের কথা শুনো না। ওরা তোমাকে আবার নিয়ে যাবে।’
অদ্বৈত মেয়েটিকে দেখে এক পা পিছিয়ে গেলেন।
শৈলেন বসু ঠোঁট কামড়ে ধরলেন।
নীলাঞ্জনা ইরার দিকে এগিয়ে গেল।
‘তুমি কোথায় ছিলে?’
ইরা বলল, ‘আমি সব সময় তোমার কাছেই ছিলাম।’
‘কিন্তু আমি তোমাকে দেখিনি কেন?’
‘কারণ তোমাকে দেখানো হয়নি।’
অদ্বৈত হঠাৎ চিৎকার করে উঠলেন, ‘ওর কাছে যেও না!’
নীলাঞ্জনা থেমে গেল।
‘কেন?’
অদ্বৈত বললেন, ‘ও ইরা নয়।’
ইরা কেঁদে উঠল।
‘দিদি, তুমি কি ওদের কথা বিশ্বাস করবে?’
নীলাঞ্জনা এক পা এগোল।
ইরা হাত বাড়িয়ে দিল।
তাদের আঙুল ছুঁয়ে গেল।
সেই মুহূর্তে নীলাঞ্জনার চোখের সামনে সবকিছু বদলে গেল।
সে আর নীলকুঠিতে নেই।
সে দাঁড়িয়ে আছে একটি অন্ধকার হাসপাতালের করিডরে। দেয়ালে লাল আলো জ্বলছে। দূরে একটি শিশুর কান্না। দরজার পাশে তার মা দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর হাতে একটি শিশুকে জড়িয়ে রাখা সাদা কাপড়।
মা কাঁদতে কাঁদতে বলছেন, ‘একজনকে বাঁচাতে হলে অন্যজনকে হারাতে হবে।’
তারপর অদ্বৈতকে দেখা গেল। তিনি মায়ের হাত থেকে শিশুটিকে নিয়ে অন্ধকার ঘরে ঢুকে গেলেন।
নীলাঞ্জনা চিৎকার করে উঠল।
দৃশ্যটা মিলিয়ে গেল।
সে আবার নীলকুঠির করিডরে দাঁড়িয়ে। ইরা তার সামনে নেই।
তার বদলে মেঝেতে পড়ে আছে একটি পুরোনো হাসপাতালের পরিচয়পত্র।
কার্ডে লেখা—
রোগীর নাম: সুচরিতা সেন।
অবস্থা: জীবিত।
স্থানান্তরের তারিখ: ১৭ জুলাই, ১৯৯৮।
গন্তব্য: কক্ষ ১৩।
নীলাঞ্জনা কার্ডটা হাতে তুলে নিল।
‘কক্ষ ১৩ কোথায়?’
অদ্বৈত এবার আর হাসলেন না।
তিনি ধীরে ধীরে বললেন, ‘নীলকুঠির নীচে।’
৪. বাড়ির নীচে আরেকটি বাড়ি
বাড়ির নীচতলার পেছনের অংশে একটি সরু করিডর ছিল। এতক্ষণ কেউ সেখানে যাওয়ার কথা বলেনি। অদ্বৈত দরজাটা খুলতেই ভেজা মাটির গন্ধ বেরিয়ে এল।
সিঁড়ি নীচের দিকে নেমে গেছে।
শৈলেন বসু বললেন, ‘এখানে যাওয়া ঠিক হবে না।’
নীলাঞ্জনা জিজ্ঞাসা করল, ‘আপনি আগে এসেছেন?’
বৃদ্ধ মাথা নাড়লেন।
‘একবার। বাইশ বছর আগে। তখন এখানে একটি ছোট চিকিৎসাকেন্দ্র ছিল। অমরেশবাবু গ্রামের দরিদ্র মানুষের চিকিৎসার জন্য এটি তৈরি করেছিলেন। কিন্তু এক রাতে সব বন্ধ হয়ে যায়।’
‘কেন?’
‘সেই রাতে একজন রোগী নিখোঁজ হয়েছিলেন।’
‘কে?’
শৈলেন উত্তর দেওয়ার আগেই অদ্বৈত বললেন, ‘সুচরিতা সেন।’
নীলাঞ্জনা সিঁড়ি দিয়ে নীচে নামতে শুরু করল।
প্রতিটি ধাপের পাশে মরচে ধরা লোহার রেলিং। দেয়ালে পুরোনো বৈদ্যুতিক তার। কয়েকটি বাল্ব এখনও জ্বলছে, যদিও বাড়িতে বিদ্যুতের সংযোগ থাকার কথা নয়।
নীচে পৌঁছে দেখা গেল, সামনে তিনটি দরজা।
প্রথম দরজায় লেখা—কক্ষ ১১।
দ্বিতীয় দরজায়—কক্ষ ১২।
তৃতীয় দরজায় কোনও নম্বর নেই। শুধু নীল রঙের একটি হাতের ছাপ।
নীলাঞ্জনা হাতের ছাপটার দিকে তাকিয়ে রইল।
তার মনে হল, এই হাতের ছাপ সে আগে কোথাও দেখেছে।
মায়ের পুরোনো ডায়েরিতে।
ডায়েরির শেষ পাতায় নীল কালিতে আঁকা ছিল ঠিক এই চিহ্নটি।
অদ্বৈত বললেন, ‘এই দরজার ওপারে যা আছে, তা দেখার পর তোমার জীবন আর আগের মতো থাকবে না।’
নীলাঞ্জনা বলল, ‘আমার জীবন তো অনেক আগেই বদলে গেছে।’
সে হাতের ছাপের ওপর হাত রাখল।
দরজাটি নিজে থেকেই খুলে গেল।
ভিতরে একটি ছোট ঘর। মাঝখানে হাসপাতালের বিছানা। পাশে অক্সিজেন সিলিন্ডার, কয়েকটি পুরোনো যন্ত্র এবং দেয়ালে ঝোলানো একটি ঘড়ি। ঘড়ির কাঁটা এগারোটা বেয়াল্লিশে থেমে আছে।
বিছানায় কেউ নেই।
কিন্তু বিছানার পাশে একটি চেয়ারে বসে আছেন একজন মহিলা।
চুল সাদা হয়ে গেছে। মুখে বয়সের ছাপ। হাতে একটি বই। তিনি জানালার দিকে তাকিয়ে আছেন, যেন কারও আসার অপেক্ষা করছেন।
নীলাঞ্জনা ধীরে ধীরে বলল, ‘মা?’
মহিলাটি মাথা ঘোরালেন।
দুটি চোখে জল জমে উঠল।
‘নীলু?’
নীলাঞ্জনা দৌড়ে তাঁর কাছে গেল। মাকে জড়িয়ে ধরল। বহু বছরের জমে থাকা কান্না একসঙ্গে বেরিয়ে এল।
‘তুমি বেঁচে আছ! তুমি এত বছর কোথায় ছিলে?’
সুচরিতা মেয়ের মুখে হাত বুলিয়ে দিলেন।
‘আমি তোকে খুঁজেছি, মা। প্রতিদিন খুঁজেছি।’
‘তাহলে ফিরে এলে না কেন?’
সুচরিতা চোখ বন্ধ করলেন।
‘কারণ আমি জানতাম না, তুই সত্যিই আমার মেয়ে কি না।’
নীলাঞ্জনা মায়ের হাত ছেড়ে পিছিয়ে গেল।
‘তুমি কী বলছ?’
সুচরিতা কাঁপা গলায় বললেন, ‘যেদিন তোর জন্ম হয়েছিল, সেদিন আমার দুটি মেয়ে জন্মেছিল। কিন্তু হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফেরার সময় আমার কোলে ছিল একটি শিশু। অন্য শিশুটিকে মৃত বলে জানানো হয়েছিল।’
‘ইরা?’
‘হ্যাঁ।’
‘কিন্তু ইরা তো বেঁচে আছে!’
সুচরিতা মাথা নাড়লেন।
‘আমি জানি না, মা। আমি জানি না ও বেঁচে আছে কি না। আমি শুধু জানি, তোর বাবার মৃত্যুর আগে সে আমাকে একটি চিঠি দিয়েছিল। তাতে লেখা ছিল—যদি কখনও নীলাঞ্জনা নীলকুঠিতে ফিরে আসে, তাকে কক্ষ ১৩-তে নিয়ে যেও না।’
নীলাঞ্জনা হতবাক হয়ে গেল।
‘কিন্তু তুমি তো এখানেই আছ!’
সুচরিতা চারদিকে তাকালেন।
‘আমি এখানে আসিনি। আমাকে এখানে রাখা হয়েছে।’
‘কে রেখেছে?’
মা উত্তর দেওয়ার আগেই দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল।
অদ্বৈত রায় বাইরে থেকে বললেন, ‘দুঃখিত, সুচরিতা। কিন্তু এবার সত্যিটা শেষ করতে হবে।’
নীলাঞ্জনা দরজার দিকে ছুটে গেল। দরজাটা বাইরে থেকে আটকে দেওয়া হয়েছে।
শৈলেন বসুর গলা শোনা গেল, ‘অদ্বৈতবাবু, আপনি কী করছেন?’
‘যা বাইশ বছর আগে করা উচিত ছিল।’
তারপর ভারী কোনও যন্ত্র চালু হওয়ার শব্দ এল।
ঘরের এক কোণে লাল আলো জ্বলে উঠল।
সুচরিতা আতঙ্কিত হয়ে নীলাঞ্জনার হাত ধরলেন।
‘নীলু, তুই এখানে আসতে পারিস না। তোর এখানে থাকার কথা নয়।’
‘মা, আমাকে বলো, কী হচ্ছে!’
সুচরিতা মেয়েকে নিজের কাছে টেনে নিলেন।
‘তুই আমার মেয়ে। তোর জন্মের সময় কোনও অলৌকিক ঘটনা ঘটেনি। কেউ মৃত থেকে ফিরে আসেনি। কিন্তু তোর বাবার একটি অপরাধ ছিল—সে একটি শিশুকে অন্য পরিবারের হাতে তুলে দিয়েছিল, আর সেই শিশুর পরিচয় বদলে দিয়েছিল।’
‘কেন?’
‘কারণ সেই শিশুর বাবা ছিল এমন একজন মানুষ, যার অপরাধ প্রকাশ পেলে অনেক বড় বড় মানুষ ধ্বংস হয়ে যেত।’
নীলাঞ্জনা বলল, ‘শিশুটি কে?’
সুচরিতা তার চোখের দিকে তাকালেন।
‘তুই।’
কথাটা শুনে নীলাঞ্জনার মনে হল, মাটিটা তার পায়ের নীচ থেকে সরে যাচ্ছে।
‘আমি?’
‘হ্যাঁ। তুই যে পরিবারে বড় হয়েছিস, তারা তোকে ভালোবেসেছে। কিন্তু তোর জন্মের সত্যিটা লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। তোর আসল বাবা অরুণাভ সেন নয়।’
নীলাঞ্জনা ফিসফিস করে বলল, ‘তাহলে আমার বাবা কে?’
সুচরিতা উত্তর দেওয়ার আগেই ঘরের দেয়ালে একটি পর্দা জ্বলে উঠল। সেখানে একটি পুরোনো ভিডিও দেখা যাচ্ছে।
ভিডিওতে অল্পবয়সি অরুণাভ সেন একটি শিশুকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর পাশে অদ্বৈত রায়। আর তাঁদের পিছনে দাঁড়িয়ে আছেন এক অচেনা মানুষ।
লোকটির মুখ ক্যামেরার দিকে ফিরতেই নীলাঞ্জনা শিউরে উঠল।
এ মুখ সে দেখেছে।
ছোটবেলার একটি ছবিতে।
মায়ের আলমারির ভিতরে লুকিয়ে রাখা সেই ছবিতে।
লোকটি আর কেউ নয়—তার নিজের বর্তমান বস, সংবাদপত্রের মালিক, প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ঋত্বিক চৌধুরী।
ভিডিওতে ঋত্বিক বলছেন, ‘মেয়েটিকে বাঁচিয়ে রাখো। বড় হলে ও নিজেই আমাদের কাছে ফিরে আসবে।’
তারপর পর্দা কালো হয়ে গেল।
নীলাঞ্জনা মায়ের দিকে তাকাল।
‘ঋত্বিক চৌধুরী আমার বাবা?’
সুচরিতা চোখ নামিয়ে বললেন, ‘হ্যাঁ।’
ঠিক তখনই দরজার বাইরে থেকে অদ্বৈতের কণ্ঠস্বর এল।
‘সত্যিটা জানলে ভালোই হল, নীলাঞ্জনা। এবার আর তোমাকে কিছু লুকোতে হবে না।’
দরজা খুলে গেল।
কিন্তু অদ্বৈত একা ছিলেন না।
তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে আছে সাদা পোশাক পরা সেই মেয়েটি—ইরা।
ইরার হাতে একটি পিস্তল।
সে নীলাঞ্জনার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘দিদি, মাকে নিয়ে বেরিয়ে এসো।’
নীলাঞ্জনা অবিশ্বাসের চোখে তাকাল।
‘তুমি তো বলেছিলে, তুমি আমার বোন!’
ইরা মৃদু হাসল।
‘আমি তোর বোনই।’
‘তাহলে তোমার হাতে পিস্তল কেন?’
ইরার চোখে জল এসে গেল।
‘কারণ যে মানুষটা আমাদের দুজনকে আলাদা করেছিল, সে এখনও বেঁচে আছে।’
সে পিস্তলটা ঘুরিয়ে অদ্বৈতের দিকে তাক করল।
‘ডাক্তারবাবু, এবার বলুন—আমার জন্মের সময় দ্বিতীয় শিশুটিকে কোথায় নিয়ে গিয়েছিলেন?’
অদ্বৈত চুপ করে রইলেন।
ইরা আবার বলল, ‘আপনি যদি আজও মিথ্যে বলেন, আমি গুলি চালাব।’
সুচরিতা বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ালেন।
‘ইরা, না!’
ইরা মায়ের দিকে তাকাল।
‘তুমি এত বছর আমাকে খুঁজলে না কেন, মা?’
সুচরিতা কেঁদে ফেললেন।
‘আমি তোকে খুঁজেছি, ইরা। কিন্তু যে মেয়েটাকে আমি খুঁজছিলাম, সে আমার কাছে ফিরতে চায়নি।’
ইরার মুখে যন্ত্রণার ছাপ ফুটে উঠল।
‘কারণ আমাকে বলা হয়েছিল, তুমি আমাকে মেরে ফেলতে চেয়েছিলে।’
‘না!’
‘আমাকে বলা হয়েছিল, দিদি আমার জায়গা নিয়ে নিয়েছে। আমার নাম, আমার পরিবার, আমার জীবন—সব কেড়ে নিয়েছে।’
নীলাঞ্জনা ইরার কাছে এগিয়ে গেল।
‘আমি কিছুই জানতাম না, ইরা। বিশ্বাস করো।’
ইরা তার দিকে তাকাল। কিছুক্ষণ পিস্তলটা নীচু করে রাখল।
তারপর বলল, ‘আমি জানি।’
‘তাহলে আমরা একসঙ্গে এখান থেকে বেরিয়ে যাব।’
ইরা মাথা নাড়ল।
‘না, দিদি। এখনও একটা সত্যি বাকি।’
সে পকেট থেকে একটি পুরোনো চাবি বের করল। চাবির গায়ে খোদাই করা—১৩।
‘কক্ষ ১৩-এর দরজা খুলতে এই চাবি লাগে। কিন্তু এই ঘরটা কক্ষ ১৩ নয়।’
নীলাঞ্জনা স্তব্ধ হয়ে গেল।
‘তাহলে কক্ষ ১৩ কোথায়?’
ইরা মেঝের দিকে তাকাল।
‘আমাদের পায়ের নীচে।’
তারপর সে চাবিটা মেঝের একটি ছোট ছিদ্রে ঢুকিয়ে ঘোরাল।
ঘরের মেঝে কেঁপে উঠল।
বিছানার নীচে একটি গোপন দরজা খুলে গেল। ভিতর থেকে ভেসে এল শিশুর কান্না।
একটি নয়।
দুটি শিশুর কান্না।
সুচরিতা চিৎকার করে উঠলেন, ‘না! এই দরজাটা খোলার কথা ছিল না!’
নীলাঞ্জনা নীচের দিকে তাকাল।
অন্ধকার সিঁড়ির শেষে একটি কাচের ঘর দেখা যাচ্ছে। কাচের ভিতরে পাশাপাশি রাখা দুটি ছোট হাসপাতালের বিছানা।
একটি বিছানায় শুয়ে আছে নবজাতক শিশু।
অন্য বিছানাটিও খালি নয়।
সেখানে শুয়ে আছে আরেকটি শিশু।
দুটি শিশুর মুখ অবিকল এক।
আর কাচের ঘরের দেয়ালে বড় বড় অক্ষরে লেখা—
‘প্রকল্প নীল: প্রথম পর্যায় সম্পূর্ণ। দ্বিতীয় পর্যায় শুরু হবে ১৭ জুলাই, ২০২৬।’
নীলাঞ্জনা তার হাতঘড়ির দিকে তাকাল।
আজ ১৭ জুলাই, ২০২৬।
ঠিক সেই মুহূর্তে কাচের ঘরের ভিতর থেকে একটি যান্ত্রিক কণ্ঠস্বর ঘোষণা করল—
‘দ্বিতীয় পর্যায় শুরু হচ্ছে। বিষয়বস্তু নং ২৭, জেগে উঠুন।’
একটি শিশুর চোখ খুলে গেল।
তারপর অন্য শিশুটিরও।
আর দুজনেই একই সঙ্গে নীলাঞ্জনার দিকে তাকিয়ে হাসল।
চলবে…