Categories
উপন্যাস বিবিধ

উপন্যাস : নীল দরজার ওপারে প্রথম পর্ব: যে বাড়িতে কেউ থাকে না)।

রাত তখন এগারোটা বেয়াল্লিশ।

শহরের শেষ বাসটা চলে যাওয়ার পর শালিখা গ্রামের রাস্তায় আর কোনও যানবাহন দেখা যায় না। দূরে কোথাও শেয়ালের ডাক, মাঝে মাঝে বাঁশবাগানের মাথায় বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ, আর আকাশজুড়ে জমে থাকা কালো মেঘ—সব মিলিয়ে রাতটা যেন অস্বাভাবিক রকমের ভারী।

এই অন্ধকারের মধ্যেই একটা পুরোনো বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল নীলাঞ্জনা।

বাড়িটার নাম ‘নীলকুঠি’।

গ্রামের লোকেরা বলে, গত বাইশ বছর ধরে বাড়িটায় কেউ থাকে না। বাড়ির মালিক অমরেশ মুখোপাধ্যায় এক বর্ষার রাতে নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর স্ত্রী মাধুরী দেবী তার কয়েক মাসের মধ্যেই মারা যান। তাঁদের একমাত্র মেয়ে ইরা কোথায় গিয়েছিল, তা কেউ জানে না। কেউ বলে তাকে কলকাতায় পাঠানো হয়েছিল, কেউ বলে সে নদীতে ঝাঁপ দিয়েছিল। কিন্তু কোনও কথারই প্রমাণ নেই।

তারপর থেকে বাড়িটা বন্ধ।

তবু প্রতি বছর বর্ষার প্রথম রাতে বাড়ির দোতলার একটি জানালায় নীল আলো জ্বলে ওঠে।

নীলাঞ্জনা এসব গল্প বিশ্বাস করত না।

সে কলকাতার একটি সংবাদপত্রে অপরাধ ও অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদন লেখে। রহস্যময় বাড়ি, নিখোঁজ মানুষ, পুরোনো মামলা—এসবের পিছনে তার আগ্রহ বহুদিনের। তিন সপ্তাহ আগে তার কাছে একটি বেনামি খাম এসেছিল। খামের ভিতরে ছিল একটি সাদা-কালো ছবি, একটি পুরোনো চাবি এবং মাত্র এক লাইনের চিঠি।

‘তোমার মায়ের মৃত্যুর সত্য জানতে চাইলে, আষাঢ়ের প্রথম রাতে নীলকুঠিতে এসো।’

চিঠির নীচে কোনও নাম ছিল না।

কিন্তু ছবিটা দেখার পর নীলাঞ্জনার বুকের ভিতরটা কেঁপে উঠেছিল।

ছবিতে দাঁড়িয়ে থাকা মহিলাটি তার মা—সুচরিতা সেন।

সুচরিতা মারা গিয়েছিলেন যখন নীলাঞ্জনার বয়স মাত্র আট বছর। সরকারি নথিতে মৃত্যুর কারণ লেখা ছিল, গাড়ি দুর্ঘটনা। কিন্তু নীলাঞ্জনার মনে আছে, মৃত্যুর আগের কয়েক মাস মা প্রায়ই রাতে ঘুম ভেঙে উঠে জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকতেন। কাউকে ফোনে খুব নিচু গলায় বলতেন, ‘ওরা আবার ফিরে এসেছে।’

কাদের কথা বলতেন মা?

কেন মৃত্যুর আগের রাতে মাকে এত আতঙ্কিত দেখাচ্ছিল?

আর বাইশ বছর আগে পরিত্যক্ত একটি বাড়ির সামনে তাঁর মা দাঁড়িয়ে ছিলেন কেন?

ছবির পিছনে লেখা তারিখটি ছিল মায়ের মৃত্যুর ঠিক সাত দিন আগের।

নীলাঞ্জনা ব্যাগ থেকে চাবিটা বের করল। মরচে পড়া লোহার গেটের তালায় চাবি ঢোকাতেই একটা খটাস শব্দ হল। তালাটা খুলে গেল আশ্চর্য সহজে।

গেট ঠেলে ভিতরে ঢুকতেই শুকনো পাতার ওপর পায়ের শব্দ উঠল।

বাড়ির সামনে আগাছায় ঢাকা বাগান। মাঝখানে পাথরের শুকনো ফোয়ারা। একপাশে ভাঙা দোলনা, অন্য পাশে একটি বিশাল কৃষ্ণচূড়া গাছ। গাছটির নীচে দাঁড়িয়ে থাকা পাথরের মূর্তির মুখ শ্যাওলায় ঢেকে গেছে।

নীলাঞ্জনা টর্চ জ্বালিয়ে বাড়িটার দিকে তাকাল।

দোতলার বাঁদিকের জানালায় নীল আলো জ্বলছে।

সে এক মুহূর্ত স্থির হয়ে গেল।

আকাশে বিদ্যুৎ চমকাল। আলোয় বাড়িটার দেয়ালে দেখা গেল লম্বা, কালচে দাগ—যেন বহু বছর আগে আগুন লেগেছিল। অথচ গ্রামের লোকেরা বলেছিল, বাড়িতে কখনও আগুন লাগেনি।

সদর দরজার সামনে পৌঁছে সে কলিং বেল খুঁজল। ভাঙা কাঠের দরজায় বেল নেই। শুধু পিতলের একটি হাতল।

নীলাঞ্জনা হাতলটি তুলতেই ভিতর থেকে তিনবার শব্দ হল।

ঠক। ঠক। ঠক।

সে থমকে দাঁড়াল।

দরজায় তো সে মাত্র একবার আঘাত করেছে।

ভিতর থেকে কে যেন তার আঘাতের জবাব দিল!

‘কে?’ নীলাঞ্জনা জোরে বলল।

কোনও উত্তর এল না।

সে দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকল।

একটা স্যাঁতসেঁতে গন্ধ নাকে এল। মেঝের ওপর ধুলোর পুরু আস্তরণ। দেয়ালে ঝুলছে পুরোনো ছবি, অধিকাংশের কাচ ভাঙা। এক কোণে কাঠের আলমারি, তার পাশে পড়ে আছে একটি ভাঙা ঘড়ি। ঘড়ির কাঁটা থেমে আছে এগারোটা বেয়াল্লিশে।

নীলাঞ্জনা নিজের হাতঘড়ির দিকে তাকাল।

এগারোটা বেয়াল্লিশ।

তার বুকের ভিতরটা ঠান্ডা হয়ে গেল।

ঠিক তখনই উপরতলা থেকে কারও পায়ের শব্দ ভেসে এল।

ধীরে ধীরে।

এক পা।

দুই পা।

তিন পা।

যেন কেউ সিঁড়ি বেয়ে নীচে নামছে।

নীলাঞ্জনা টর্চটা সিঁড়ির দিকে ধরল।

কেউ নেই।

কিন্তু সিঁড়ির শেষ ধাপে এসে একটা ছোট্ট লাল বল গড়িয়ে পড়ল। বলটা তার পায়ের কাছে এসে থামল।

নীলাঞ্জনা বলটা তুলে নিল।

তার মনে পড়ল, ছোটবেলায় তার মায়ের আলমারিতে ঠিক এমনই একটি লাল বল ছিল। মা বলতেন, বলটি তাঁর ছোটবেলার। একবার নীলাঞ্জনা খেলতে গিয়ে সেটি হারিয়ে ফেলেছিল। তারপর আর কখনও খুঁজে পায়নি।

বলটার গায়ে সাদা রঙে লেখা—‘ইরা’।

নীলাঞ্জনা ফিসফিস করে বলল, ‘ইরা কে?’

উপরতলা থেকে এবার একটি মেয়ের গলা ভেসে এল।

‘তুমি এত দেরি করলে কেন?’

গলাটা খুব পরিচিত।

এতটাই পরিচিত যে নীলাঞ্জনার চোখে জল চলে এল।

ওই গলায় তার মা তাকে ছোটবেলায় ঘুম পাড়াতেন।

‘মা?’

শব্দটা মুখ থেকে বেরিয়ে আসতেই বাড়ির ভিতরের সব দরজা একসঙ্গে বন্ধ হয়ে গেল।

ধড়াম!

ধড়াম!

ধড়াম!

টর্চের আলো কেঁপে উঠল। নীলাঞ্জনা নিজেকে সামলে সিঁড়ির দিকে এগোল। প্রতিটি ধাপের কাঠ চাপ পড়লেই কেঁদে উঠছে। দোতলায় পৌঁছে সে দেখতে পেল, করিডরের শেষ প্রান্তে একটি দরজা।

দরজাটি নীল রঙের।

বাড়ির অন্য সব দরজা কালচে বাদামি, শুধু এই দরজাটিই উজ্জ্বল নীল। দরজার মাঝখানে পিতলের ছোট্ট ফলকে খোদাই করা—

‘ইরার ঘর। অনুমতি ছাড়া প্রবেশ নিষেধ।’

দরজার নীচ দিয়ে নীল আলো বেরিয়ে আসছে।

নীলাঞ্জনা হাত বাড়িয়ে দরজায় ঠেলা দিল।

দরজাটি খুলল না।

সে হাতল ঘোরাল। তালা দেওয়া।

ব্যাগ থেকে চাবিটা বের করতেই বুঝল, চাবিটি এই দরজার তালার সঙ্গে মিলে যাচ্ছে।

চাবি ঢুকিয়ে ঘোরানোর সঙ্গে সঙ্গে ভিতর থেকে একটি মেয়ের হাসির শব্দ এল।

তারপর ফিসফিসানি—

‘মাকে তুমি চিনতে পেরেছ?’

নীলাঞ্জনার হাত কেঁপে উঠল।

‘তুমি কে?’

‘আমি ইরা।’

‘তুমি কোথায়?’

‘দরজার ওপারে।’

‘দরজা খোলো।’

ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা।

তারপর মেয়েটি বলল, ‘খুললে তুমি আর আগের মানুষ থাকবে না।’

নীলাঞ্জনা উত্তর দিল, ‘আমি সত্য জানতে এসেছি।’

‘সত্য?’ মেয়েটি হেসে উঠল। ‘সত্য তো তোমার বাড়িতেই ছিল। তুমি কোনও দিন খুঁজে দেখোনি।’

কথাটা শুনে নীলাঞ্জনার মাথার ভিতর যেন কিছু একটা ভেঙে পড়ল।

তার বাড়ি?

কলকাতার ফ্ল্যাটে তো মায়ের পুরোনো জিনিসপত্র ছাড়া আর কিছুই নেই। মায়ের মৃত্যুর পর বাবা সবকিছু গুছিয়ে রেখেছিলেন। তিনি কখনও নীলকুঠির কথা বলেননি। এমনকী গ্রামের নামও বলেননি।

তাহলে ইরা তার বাড়ির কথা জানে কী করে?

নীলাঞ্জনা আবার চাবি ঘোরাল।

ক্লিক করে তালা খুলে গেল।

দরজাটা সামান্য ফাঁক হতেই ভিতর থেকে বরফশীতল বাতাস বেরিয়ে এল। নীল আলো আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠল।

ঘরটা আশ্চর্য পরিষ্কার।

একটি ছোট বিছানা, কাঠের পড়ার টেবিল, দেয়ালে ঝোলানো ক্যালেন্ডার, জানালার পাশে নীল পর্দা। টেবিলের ওপর কয়েকটি বই এবং একটি খোলা ডায়েরি। ঘরের কোণে দাঁড়িয়ে রয়েছে একটি বড় আয়না, যার ওপর সাদা কাপড় ঢাকা।

কিন্তু ঘরে কেউ নেই।

নীলাঞ্জনা ভিতরে ঢুকল।

দরজাটি পিছনে বন্ধ হয়ে গেল।

সে দ্রুত ঘুরে হাতল টানল। দরজা নড়ল না।

‘ইরা!’

কোনও উত্তর নেই।

টেবিলের ওপর ডায়েরিটা খুলে সে প্রথম পাতায় তারিখ দেখতে পেল—১৯৯৮ সালের ১৭ জুলাই।

নীলাঞ্জনার জন্ম ১৯৯৮ সালের ১৭ জুলাই।

তার শ্বাস আটকে এল।

ডায়েরির প্রথম পাতায় লেখা—

‘আজ আমার মেয়ে পৃথিবীতে এসেছে। ওর নাম রাখব নীলাঞ্জনা। কিন্তু ওকে কেউ যেন জানতে না দেয়, ও আসলে কার মেয়ে।’

নীলাঞ্জনা চেয়ারটা ধরে দাঁড়াল।

‘না… এটা হতে পারে না।’

সে পরের পাতাটা উল্টাল।

‘অমরেশ বলেছে, মেয়েটিকে বাঁচাতে হলে ওকে দূরে পাঠাতেই হবে। সুচরিতা রাজি নয়। সে বলছে, মেয়েকে ছাড়া সে বাঁচবে না। কিন্তু আমরা যদি সত্যিটা বলে দিই, তাহলে ওরা নীলাঞ্জনাকেও নিয়ে যাবে।’

পরের পাতাগুলো ছেঁড়া।

শেষ পাতায় শুধু একটি বাক্য—

‘আজ রাত এগারোটা বেয়াল্লিশে দরজাটা খুলবে। যদি নীলাঞ্জনা ফিরে আসে, তাকে বলবে—তার মা কখনও মারা যায়নি।’

নীলাঞ্জনা ডায়েরিটা হাত থেকে ফেলে দিল।

তার মা মারা যাননি?

তাহলে যে দেহটি সে দেখেছিল, যে শেষকৃত্যে সে কেঁদেছিল, যে ছবির সামনে প্রতি বছর ফুল দিয়েছে—সবই কি মিথ্যে?

তার মাথার মধ্যে একের পর এক স্মৃতি ফিরে আসতে লাগল। বাবার মুখ, হাসপাতালের করিডর, সাদা চাদরে ঢাকা একটি দেহ, আর মায়ের ঠান্ডা হাত ধরে থাকা ছোট্ট নীলাঞ্জনা।

কিন্তু সেই স্মৃতির মধ্যে একটা অদ্ভুত ফাঁক ছিল।

সে কখনও মায়ের মুখটা স্পষ্ট মনে করতে পারে না।

শুধু কণ্ঠস্বর মনে আছে।

শুধু একটি কথা মনে আছে—

‘কখনও নীল দরজার ওপারে যাস না।’

ঘরের কোণে ঢাকা আয়নাটির দিক থেকে একটা শব্দ এল।

খসখস।

যেন কেউ কাপড়ের নীচে নখ দিয়ে আঁচড় কাটছে।

নীলাঞ্জনা ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল। কাপড়টা টেনে সরিয়ে দিল।

আয়নায় তার নিজের প্রতিবিম্ব দেখা গেল না।

দেখা গেল একটি হাসপাতালের ঘর।

সাদা দেয়াল, জানালার পাশে একটি বিছানা। বিছানায় শুয়ে আছে এক মহিলা। মুখে অক্সিজেনের নল। চুলের পাশে পাক ধরেছে, চোখ বন্ধ।

নীলাঞ্জনা মহিলাটিকে চিনতে পারল।

ছবিতে দেখা সেই মুখ।

তার মা—সুচরিতা সেন।

মহিলার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন একজন বৃদ্ধ। হাতে একটি ফাইল। তাঁর মুখটা স্পষ্ট নয়। তিনি ঝুঁকে মহিলার কানে কিছু বললেন।

সুচরিতা চোখ খুললেন।

আয়নার ওপার থেকে তাঁর ঠোঁট নড়ল।

‘নীলু… পালিয়ে যা।’

ঠিক সেই মুহূর্তে পিছন থেকে একটি হাত নীলাঞ্জনার কাঁধ চেপে ধরল।

সে চিৎকার করে ঘুরে দাঁড়াল।

একজন বৃদ্ধ দাঁড়িয়ে আছেন তার পিছনে। ধূসর চুল, কুঁচকে যাওয়া মুখ, চোখে মোটা কাচের চশমা। পরনে পুরোনো ধাঁচের সাদা পাঞ্জাবি।

নীলাঞ্জনা তাঁকে কোনও দিন দেখেনি।

কিন্তু বৃদ্ধের মুখে এমন এক পরিচিত বিষণ্ণতা ছিল, যেন বহু বছর ধরে তিনি তার জন্য অপেক্ষা করছেন।

বৃদ্ধ বললেন, ‘তুমি অবশেষে এসেছ।’

‘আপনি কে?’

‘যে মানুষটাকে তোমার বাবা মৃত বলে চালিয়ে দিয়েছিলেন।’

নীলাঞ্জনা পিছিয়ে গেল।

বৃদ্ধ পকেট থেকে একটি পুরোনো ছবি বের করলেন। ছবিতে তিনজন মানুষ—একজন তরুণী, একজন পুরুষ এবং কোলে একটি শিশু। তরুণীটি সুচরিতা। পুরুষটির মুখ বৃদ্ধের সঙ্গে মিলে যায়।

আর শিশুটি—

নীলাঞ্জনার নিজের মুখের মতো।

কিন্তু ছবির পিছনে লেখা ছিল অন্য একটি নাম।

‘ইরা মুখোপাধ্যায়।’

বৃদ্ধ বললেন, ‘তোমাকে নীলাঞ্জনা নামে বড় করা হয়েছে। কিন্তু তোমার জন্মের সময় তোমার নাম রাখা হয়েছিল ইরা। আর যে মেয়েটিকে তুমি এতক্ষণ খুঁজছ, সে তোমার বোন।’

নীলাঞ্জনা কোনও কথা বলতে পারল না।

‘আমার বোন কোথায়?’

বৃদ্ধ উত্তর দেওয়ার আগেই নীল দরজায় প্রচণ্ড আঘাত পড়ল।

ধাম!

ধাম!

ধাম!

দরজার ওপাশ থেকে একটি মেয়ের গলা চিৎকার করে উঠল—

‘দাদু, ওকে কিছু বলো না! ও এখনও জানে না, ওর ভিতরে কী আছে!’

বৃদ্ধের মুখ মুহূর্তে ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

তিনি নীলাঞ্জনার হাত শক্ত করে ধরলেন।

‘শোনো, যা-ই ঘটুক, দরজাটা আবার খুলবে না। তোমার বোন ওখানে নেই।’

‘তাহলে কে কথা বলছে?’

বৃদ্ধ উত্তর দিলেন না।

দরজার ওপাশের কণ্ঠস্বর এবার বদলে গেল। মেয়েলি গলা মিলিয়ে গেল এক পুরুষের কর্কশ হাসিতে।

তারপর শোনা গেল নীলাঞ্জনার বাবার কণ্ঠস্বর—

‘নীলু, দরজাটা খোলো। বাবা এসেছে।’

নীলাঞ্জনা জমে গেল।

তার বাবা মারা গিয়েছেন পাঁচ বছর আগে।

আয়নার ভিতরে হাসপাতালের দৃশ্যটা আবার ফিরে এল। বিছানায় শুয়ে থাকা সুচরিতা এবার চোখ মেলে সরাসরি নীলাঞ্জনার দিকে তাকালেন।

আয়নার কাচে ধীরে ধীরে ফুটে উঠল কয়েকটি শব্দ—

‘তোমার জন্মের দিন একজন মারা গিয়েছিল। কিন্তু সে তোমার মা নয়।’

তারপর আলো নিভে গেল।

পুরো ঘর অন্ধকার।

বৃদ্ধের হাত নীলাঞ্জনার হাত থেকে সরে গেল।

সে চিৎকার করে উঠল, ‘আপনি কোথায়?’

কোনও উত্তর এল না।

শুধু অন্ধকারের মধ্যে কারও নিঃশ্বাসের শব্দ।

তারপর একেবারে কানের কাছে কেউ ফিসফিস করে বলল—

‘ইরা, এবার তোমার পালা।’

দরজার বাইরে আবার তিনবার আঘাত পড়ল।

ঠক।

ঠক।

ঠক।

এবার নীলাঞ্জনা বুঝতে পারল, শব্দটা দরজার ওপার থেকে আসছে না।

আসছে তার নিজের বুকের ভিতর থেকে।

আর ঠিক সেই মুহূর্তে তার মনে পড়ে গেল এমন একটি স্মৃতি, যা তার মনে থাকার কথা নয়।

একটি হাসপাতালের ঘর।

দুটি নবজাতক শিশু।

একটি শিশুকে কোলে তুলে নিচ্ছেন সুচরিতা।

অন্য শিশুটিকে নিয়ে অন্ধকার করিডরে চলে যাচ্ছেন এক অচেনা মানুষ।

আর দরজার সামনে দাঁড়িয়ে তার বাবা বলছেন—

‘একটাকে বাঁচাতে হলে অন্যটাকে হারাতেই হবে।’

নীলাঞ্জনা হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল।

তারপর অন্ধকারের ভিতর থেকে একটি শিশুর কান্না ভেসে এল।

সেই কান্না যেন বহু বছর ধরে বন্ধ থাকা কোনও দরজার ওপার থেকে আসছে।

আর বাড়ির নীচতলায়, যেখানে ভাঙা ঘড়িটা এগারোটা বেয়াল্লিশে থেমে ছিল, সেখানে ঘড়ির কাঁটা ধীরে ধীরে এগোতে শুরু করল।

এগারোটা তেতাল্লিশ।

বাইশ বছর পর প্রথমবার।

নীলকুঠির সব জানালায় একসঙ্গে নীল আলো জ্বলে উঠল।

বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা কৃষ্ণচূড়া গাছের নীচে তখন একটি মেয়ে এসে দাঁড়িয়েছে। তার পরনে সাদা পোশাক, হাতে লাল বল। মুখটা নীলাঞ্জনার মতোই।

সে বাড়ির দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল—

‘দিদি, এবার সত্যিটা জানার সময় হয়েছে।’

তারপর সে গেটের দিকে এগিয়ে এল।

কিন্তু গেটের তালা বাইরে থেকে বন্ধ ছিল না।

ভিতর থেকে কেউ সেটি আটকে রেখেছিল।

চলবে…

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *