শেষ পর্ব
অন্ধকারের মধ্যে নিজের কণ্ঠস্বর শুনে নন্দিতার মনে হলো, তার বুকের ভেতর থেকে কেউ যেন হৃৎপিণ্ডটা টেনে বের করে নিতে চাইছে।
“নীলু, দরজাটা খোল। আমি ফিরে এসেছি।”
কথাটা বলেছিল নন্দিতা—অন্তত কণ্ঠস্বরটা তারই। অথচ তার ঠোঁট বন্ধ। সে নিঃশ্বাসটুকু পর্যন্ত আটকে রেখেছিল।
সিঁড়ির দিক থেকে পায়ের শব্দ এগিয়ে আসছিল।
একটা পা।
তারপর আরেকটা।
ধীরে, মেপে মেপে।
অনন্যা সেন টর্চ জ্বালানোর চেষ্টা করল। আলো জ্বলে উঠেই নিভে গেল। যেন বাড়ির সমস্ত বিদ্যুৎ কেউ বাইরে থেকে নয়, ভেতর থেকেই নিয়ন্ত্রণ করছে।
নীলাঞ্জনা নন্দিতার হাত শক্ত করে ধরে ফিসফিসিয়ে বলল, “ও এসে গেছে।”
“কে?”
“যে তোমার গলা ধার করে কথা বলে।”
“তুমি আগে বলো, তুমি কে! তোমার কথা একবারও একরকম নয়। কখনও বলছ তুমি আমার বোন, কখনও বলছ তুমি মাধবীর দ্বিতীয় সন্তান। আর এখন বলছ আমার কণ্ঠস্বর অন্য কেউ ব্যবহার করছে। কী হচ্ছে এখানে?”
নীলাঞ্জনা উত্তর দিল না। অন্ধকারে নন্দিতা অনুভব করল, মেয়েটি তার হাত ছেড়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে।
নন্দিতা ছাড়ল না।
“এবার আর কাউকে পালাতে দেব না।”
ঠিক তখনই অন্ধকারের মধ্যে একটি দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ হলো।
তারপর নন্দিতার কণ্ঠস্বর আবার ভেসে এল।
“নীলু, ওকে ছেড়ে দাও। ও এখনও জানে না ও কে।”
কণ্ঠস্বরটি এবার একেবারে কাছে।
অনন্যা কোমর থেকে রিভলভার বের করল। “যেই হও, সামনে এসো!”
একটা ক্ষীণ হাসি শোনা গেল।
“পুলিশের মেয়ে! তোমার বাবাও একদিন এই কথাটাই বলেছিল।”
অনন্যার মুখ শক্ত হয়ে গেল। “আমার বাবাকে তুমি চিনতে?”
“চিনতাম? ও তো আমার জন্যই মরেছিল।”
এরপর হঠাৎ একটা ধাক্কায় পাশের আলমারি খুলে গেল। ভেতর থেকে গড়িয়ে পড়ল একটি পুরোনো টেপ রেকর্ডার। যন্ত্রটি মেঝেতে পড়েও চালু হয়ে গেল।
খসখসে শব্দের পর এক মহিলার কণ্ঠ শোনা গেল।
“নন্দিতা, যদি তুমি এই রেকর্ডিং শুনে থাকো, তাহলে বুঝবে আমি তোমাকে আর সত্যিটা থেকে দূরে রাখতে পারিনি।”
মাধবী।
নন্দিতার মা।
“তোমার জন্মের রাতে এই বাড়িতে দুটি শিশু ছিল না। ছিল একটি শিশু, একটি মৃতদেহ, আর দুজন মানুষ যারা নিজেদের অপরাধ ঢাকতে চেয়েছিল। আমি যা করেছিলাম, তা তোমাকে রক্ষা করার জন্য করেছিলাম—কিন্তু রক্ষা করতে গিয়ে তোমার জীবনটাকেই মিথ্যে বানিয়ে দিয়েছি।”
রেকর্ডিং থেমে গেল।
কয়েক সেকেন্ডের নিস্তব্ধতা।
তারপর যন্ত্রটি আবার চলল।
“নন্দিতা, তুমি যাকে তোমার বাবা বলে চিনেছ, সে তোমার বাবা নয়। আর যাকে এতদিন মৃত বলে জানানো হয়েছে, সেও তোমার বাবার পরিচয় নিয়ে বেঁচে নেই। তোমার আসল পরিচয় লুকিয়ে আছে সেই রাতের মধ্যে, যে রাতের কথা তোমার মনে থাকার কথা নয়।”
টেপের শেষ শব্দটি শোনা গেল—
“আয়নাটা ভেঙো না।”
তারপর রেকর্ডার বন্ধ হয়ে গেল।
নন্দিতা ধীরে ধীরে মাথা তুলল।
করিডরের শেষ প্রান্তে একটা বিশাল আয়না ছিল। ছোটবেলা থেকে বাড়িতে সেই আয়নাটা দেখে এসেছে সে। কাঠের ফ্রেমে খোদাই করা ছিল দুটি মুখ—একটি পুরুষের, অন্যটি নারীর। অথচ এত বছরেও সে কখনও খেয়াল করেনি, আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বের পেছনে একটা দরজা দেখা যায়।
বাস্তবে সেখানে কোনও দরজা নেই।
নন্দিতা আয়নার দিকে এগিয়ে গেল।
“থামো!” অনন্যা চিৎকার করল। “ওটাই হয়তো ওদের ফাঁদ!”
কিন্তু নন্দিতা থামল না।
আয়নার কাছে পৌঁছে সে দেখল, তার প্রতিবিম্ব এক মুহূর্ত দেরিতে নড়ছে।
সে ডান হাত তুলল।
প্রতিবিম্ব হাত তুলল একটু পরে।
তারপর প্রতিবিম্বটি হাসল।
নন্দিতা হাসেনি।
প্রতিবিম্বের ঠোঁট নড়ল।
“অবশেষে দেখা হলো।”
নন্দিতা পিছিয়ে এল। “তুমি কে?”
আয়নার ওপারের মুখটি বলল, “তুমি যে নামটা ভুলে গেছ, আমি সেই নাম।”
“তুমি কি আমার যমজ বোন?”
“না।”
“তাহলে?”
“আমি তোমার মুছে দেওয়া স্মৃতি।”
পরক্ষণেই আয়নাটা কেঁপে উঠল। কাঠের ফ্রেমের ভেতর থেকে যেন কেউ ধাক্কা মারছে। অনন্যা নন্দিতাকে সরিয়ে নিয়ে গিয়ে আয়নার দিকে রিভলভার তাক করল।
“পিছিয়ে যাও!”
আয়নার ওপারের মুখটি এবার গম্ভীর হয়ে গেল।
“অনন্যা, তোমার বাবাকে যারা মেরেছিল, তারা এখনও বেঁচে আছে। তোমার হাতে বন্দুক আছে, কিন্তু তুমি জানো না কাকে গুলি করতে হবে।”
ঠিক তখনই আয়নার পেছন থেকে একটি যান্ত্রিক শব্দ হলো। ফ্রেমের ডান দিকটা সামান্য সরে গেল। তার ভেতরে দেখা গেল সরু একটি ফাঁক।
নীলাঞ্জনা ছুটে এসে ফ্রেমের নিচে চাপ দিল।
আয়নাটি একদিকে সরে গেল।
পেছনে ছোট্ট একটি ঘর।
ঘরের মধ্যে একটি টেবিল, কয়েকটি পুরোনো ফাইল, রক্তের দাগযুক্ত একটি সাদা পোশাক এবং দেয়ালে ঝোলানো তিনটি ছবি।
প্রথম ছবিতে মাধবী।
দ্বিতীয় ছবিতে শশাঙ্কশেখর রায়।
তৃতীয় ছবিতে এক ব্যক্তি, যার মুখ অবিকল ঋত্বিকের মতো।
ছবির নিচে লেখা—
ড. অমিয় সেন।
অনন্যা ছবিটি হাতে নিয়ে জমে গেল।
“এই লোকটাকে আমি দেখেছি।”
“কোথায়?” নন্দিতা প্রশ্ন করল।
“বাবার পুরোনো ডায়েরিতে। বাবা লিখেছিলেন, অমিয় সেন নামের একজন চিকিৎসককে বহু বছর আগে মৃত ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু মৃত্যুর শংসাপত্রটি জাল ছিল।”
নীলাঞ্জনা টেবিলের ওপর রাখা ফাইল খুলল। ভেতরে হাসপাতালের কাগজপত্র, পুরোনো ছবি, হাতের লেখা নোট এবং কয়েকটি জন্মের শংসাপত্র।
একটি কাগজে নন্দিতার চোখ আটকে গেল।
নাম: নন্দিতা রায়।
জন্মতারিখ: ১৮ অক্টোবর, ২০০১।
জন্মের পর অবস্থা: মৃত ঘোষণা।
পরবর্তী নথি: সংশোধিত।
নন্দিতা কাগজটা দুহাতে ধরে রইল।
“আমি মৃত ঘোষণা হয়েছিলাম?”
নীলাঞ্জনা ধীরে মাথা নাড়ল।
“তোমার জন্মের পর শ্বাস বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। চিকিৎসকেরা তোমাকে মৃত ভেবেছিলেন। কিন্তু কয়েক মিনিট পর তুমি আবার শ্বাস নিতে শুরু করো। সেই সময় তোমার পাশে ছিল অমিয় সেন। সে বুঝেছিল, এই ঘটনাকে ব্যবহার করে সে একটা নতুন পরীক্ষা চালাতে পারবে।”
“কী পরীক্ষা?”
“মানুষের পরিচয় বদলে দেওয়ার পরীক্ষা। স্মৃতি মুছে ফেলা, অন্যের স্মৃতি ঢুকিয়ে দেওয়া, একই মুখের দুটি মানুষকে একে অন্যের জায়গায় দাঁড় করানো। অমিয় বিশ্বাস করত, মানুষের পরিচয় শরীরে নয়—পরিচয়ের গল্পে। যে গল্প মানুষকে বিশ্বাস করানো যায়, সে-ই তার সত্যি হয়ে ওঠে।”
নন্দিতার মাথার ভেতর ঝড় উঠল।
“কিন্তু আমার বাবার কী হয়েছিল?”
নীলাঞ্জনা একটি পুরোনো ছবি বের করল। ছবিতে ঋত্বিক দাঁড়িয়ে আছে মাধবীর পাশে। তাদের পেছনে শশাঙ্কশেখর। ছবির এক কোণে আরেকটি ছোট্ট মেয়ে—নীলাঞ্জনা।
“এই ছবিটা তোলা হয়েছিল তোমার জন্মের কয়েক বছর পর। আমি মাধবীর মেয়ে। তোমার যমজ বোন নই। তোমার জন্মের সময় আমার বয়স ছিল না—আমি তখনও জন্মাইনি। কিন্তু তোমাকে নিয়ে যে গল্পটা তৈরি করা হয়েছিল, সেই গল্পে আমাকে কখনও তোমার বোন, কখনও তোমার ছায়া হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।”
“তাহলে আমার যমজ বোন ছিল না?”
“না। তোমাকে বিভ্রান্ত করার জন্যই সেই কথা বলা হয়েছিল। তোমার স্মৃতি নিয়ে পরীক্ষা চালাতে গিয়ে অমিয় বারবার তোমার পরিচয় বদলেছে। কখনও তুমি মৃত শিশু, কখনও নিখোঁজ মেয়ে, কখনও এমন একজন, যে নিজের বাবাকে হত্যা করেছে।”
অনন্যা টেবিলের ফাইলগুলো দ্রুত উল্টে দেখছিল।
“এখানে একটা রিপোর্ট আছে। ১৮ অক্টোবর, ২০০১। একজন পুরুষ রোগীকে মৃত ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু মৃতদেহের পরিচয় নিশ্চিত করা যায়নি।”
নন্দিতা ফিসফিস করে বলল, “ঋত্বিক?”
“সম্ভবত।”
নীলাঞ্জনা মাথা নাড়ল।
“ঋত্বিক সত্যিই নিখোঁজ হয়েছিল। কিন্তু তাকে কে সরিয়েছিল, তা এখনও পুরোপুরি জানি না। অমিয় তার মুখের ছাঁচ, কণ্ঠস্বরের রেকর্ডিং আর ব্যক্তিগত নথি ব্যবহার করে এমন একজন মানুষ তৈরি করেছিল, যে ঋত্বিকের মতো দেখতে। সে কোনও অলৌকিক সৃষ্টি নয়। একজন জীবিত মানুষ, যার পরিচয়কে পরিকল্পিতভাবে বদলে দেওয়া হয়েছিল। বছরের পর বছর তাকে বিশ্বাস করানো হয়েছিল, সে-ই ঋত্বিক।”
“তাহলে বারান্দায় যে দাঁড়াত?”
“সে সেই মানুষ। তাকে প্রতি বছর এই রাতেই এখানে আসতে বাধ্য করা হয়েছে। অমিয় তাকে বলেছিল, তার স্মৃতি ফিরিয়ে আনতে হলে তাকে এই বাড়িতে আসতে হবে। আর তাকে বলা হয়েছিল, তুমি তার মেয়ে—যে একদিন তাকে মেরেছিল।”
নন্দিতার গলা শুকিয়ে গেল।
“আমি কাউকে মারিনি।”
“আমি জানি।”
“কিন্তু ছাদের ঘরে যে মৃতদেহটা পড়ে আছে?”
নীলাঞ্জনা উত্তর দেওয়ার আগেই ঘরের বাইরে ভারী পায়ের শব্দ শোনা গেল।
তারপর পরিচিত কণ্ঠ—
“তোমরা খুব বেশি জেনে ফেলেছ।”
দরজায় দাঁড়িয়ে ছিল সেই মানুষটি, যাকে এতক্ষণ ঋত্বিক বলে মনে হচ্ছিল।
তার হাতে একটি ছোট পিস্তল।
“ফাইলগুলো আমার হাতে দাও,” সে বলল।
অনন্যা বন্দুক তাক করল। “অস্ত্রটা ফেলে দাও!”
লোকটি হাসল।
“তুমি আমাকে গুলি করতে পারবে না। কারণ তুমি জানো না, আমি কে।”
অনন্যা উত্তর দিল, “তুমি যে-ই হও, আমার বাবার মৃত্যুর কথা তুমি জানো। তোমার কাছে তার উত্তর আছে।”
লোকটির মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
“তোমার বাবা সত্যের কাছে পৌঁছে গিয়েছিল। সে বুঝেছিল, অমিয় সেনের পরীক্ষা শুধু অন্যের স্মৃতি বদলানো নয়—সাক্ষীর স্মৃতিকেও অবিশ্বাস্য করে তোলা। কিন্তু সে ভুল করেছিল একটা জায়গায়। সে ভেবেছিল, সত্যি লিখে রাখলেই সত্যি বেঁচে থাকবে।”
সে পিস্তল তুলে ফাইলের দিকে তাক করল।
“কাগজ পুড়ে গেলে ইতিহাসও পুড়ে যায়।”
নন্দিতা আচমকা টেবিলের ওপর রাখা ধাতব বাতিটা তুলে তার দিকে ছুড়ে মারল। লোকটির হাত থেকে পিস্তল ছিটকে পড়ল। অনন্যা ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে মেঝেতে ফেলে দিল।
ধস্তাধস্তির মধ্যে লোকটির মুখে আঁচড় লাগল। গালের চামড়ার এক অংশ উঠে গেল।
তার নিচে দেখা গেল পুরোনো অস্ত্রোপচারের দাগ।
আর সেই দাগের পাশে ছোট্ট একটি তিল।
নন্দিতা থমকে গেল।
ছবিতে ঋত্বিকের গালের ঠিক সেই জায়গায় তিল ছিল।
কিন্তু এই মানুষটির চোখে অন্য এক আতঙ্ক।
“তুমি ঋত্বিক নও,” নন্দিতা বলল।
লোকটি নিঃশ্বাস নিতে নিতে উত্তর দিল, “আমাকে ঋত্বিক হতে বলা হয়েছিল।”
“তোমার নিজের নাম কী?”
সে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “অরিন্দম।”
“অরিন্দম, তুমি আমার বাবাকে কোথায় রেখেছ?”
লোকটি চোখ বন্ধ করল।
“আমি জানি না তোমার বাবা কোথায়। আমি শুধু জানি, যে মানুষটাকে তোমরা এতক্ষণ বাবা ভেবেছ, সে-ও নিজের স্মৃতি বিশ্বাস করতে পারে না। অমিয় আমাদের সবাইকে এমনভাবে তৈরি করেছে, যাতে প্রত্যেকে অন্যের অপরাধ নিজের বলে মনে করে।”
অনন্যা তার হাত পিছমোড়া করে বেঁধে ফেলল।
“তাহলে ছাদের ঘরে কে মৃত অবস্থায় পড়ে আছে?”
অরিন্দমের চোখে আতঙ্ক ফিরে এল।
“ওটা কোনও মানুষ নয়।”
“কী বললে?”
“ওটা একটা পুরোনো পরিচয়ের অবশেষ। অমিয় বহু বছর আগে যে মানুষটাকে ঋত্বিক বানিয়েছিল, তার শরীরের ওপরই পরীক্ষাগুলো চালানো হয়েছিল। সেই মানুষটি মারা যাওয়ার পর তার দেহকে ঋত্বিকের পোশাক, আংটি আর পরিচয় দিয়ে সাজানো হয়েছে। কিন্তু আজ রাতে ওই ঘরে আমি কোনও দেহ রাখিনি।”
“তাহলে কে রেখেছে?”
অরিন্দম উত্তর দেওয়ার আগেই বাড়ির ভেতর থেকে একটি বিকট শব্দ হলো।
সবাই ছুটে বেরিয়ে এল।
ছাদের ঘরের দরজা খোলা। মেঝেতে সাদা চাদর পড়ে আছে। তার ওপর রক্তের দাগ। কিন্তু দেহটি নেই।
শুধু দেয়ালে নতুন করে লেখা হয়েছে—
“যে মৃত, সে-ই সাক্ষী।”
অনন্যা সঙ্গে সঙ্গে ওয়্যারলেসে খবর পাঠাল। কিন্তু বাড়ির ভেতরে মোবাইল নেটওয়ার্ক নেই, ওয়্যারলেসেও শুধু শোঁ শোঁ শব্দ।
নন্দিতা জানালার দিকে তাকাল।
বারান্দায় একজন দাঁড়িয়ে আছে।
সাদা পাঞ্জাবি, ধূসর চুল, ডান হাতে পুরোনো আংটি।
লোকটি মুখ ঘুরিয়ে তাকাল।
এই মুখ নন্দিতা বহুবার ছবিতে দেখেছে।
তার বাবা, ঋত্বিক রায়।
কিন্তু ছবির ঋত্বিকের বয়স ছিল আটাশ। বারান্দার মানুষটির বয়স অন্তত পঞ্চাশ।
নন্দিতা ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল।
“বাবা?”
লোকটি কোনও উত্তর দিল না।
“তুমি কি সত্যিই আমার বাবা?”
লোকটি বলল, “এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার অধিকার আমি বহু বছর আগে হারিয়েছি।”
নন্দিতার চোখ ভিজে উঠল।
“তাহলে তুমি কে?”
লোকটি বারান্দা থেকে ঘরে এল। তার হাঁটার ভঙ্গিতে অদ্ভুত ক্লান্তি। মুখে কোনও নাটকীয়তা নেই। সে নন্দিতার সামনে দাঁড়িয়ে বলল, “আমার নাম ঋত্বিক। অন্তত জন্মের সময় আমাকে এই নামই দেওয়া হয়েছিল।”
“তুমি কোথায় ছিলে এত বছর?”
“এই বাড়ির মধ্যেই। কখনও দেওয়ালের পেছনে, কখনও হাসপাতালের ঘরে, কখনও এমন একটি কক্ষে, যেখানে দিনের আলো ঢুকত না। অমিয় আমাকে বিশ্বাস করিয়েছিল, আমার মেয়ে আমাকে হত্যা করতে চেয়েছিল। আবার কখনও বলত, আমার মেয়ে আদৌ বেঁচে নেই।”
“তুমি কি জানতাম আমি বেঁচে আছি?”
ঋত্বিকের চোখে জল জমল।
“শেষ পর্যন্ত জেনেছিলাম। কিন্তু তখন আমার নিজের স্মৃতিই আর আমার ছিল না।”
নন্দিতা তার দিকে তাকিয়ে রইল। সে বাবাকে ছুঁতে চাইল, কিন্তু হাত বাড়াতে পারল না।
ঋত্বিক নিজেই তার সামনে হাঁটু গেড়ে বসল।
“আমি তোমাকে বাঁচাতে পারিনি, নন্দিতা। তোমার মা তোমাকে নিয়ে পালাতে চেয়েছিল। আমি তাকে সাহায্য করতে পারিনি। অমিয় আমাকে বলেছিল, তোমাকে বাঁচাতে হলে তোমার স্মৃতি নষ্ট করতে হবে। আমি সেই মিথ্যেটা বিশ্বাস করেছিলাম।”
“মা কি তোমাকে গুলি করেছিল?”
ঋত্বিক মাথা নাড়ল।
“না। তোমার মা কাউকে গুলি করেনি। সেই রাতে অমিয়ের একজন সহকারী মারা গিয়েছিল। তার দেহ ব্যবহার করে অমিয় একটা হত্যার গল্প তৈরি করেছিল। সে চেয়েছিল, মাধবী অপরাধবোধে ভুগুক, আমি নিজের স্মৃতিকে সন্দেহ করি, আর তুমি বিশ্বাস করো যে তোমার ছোট্ট হাতেই একজন মানুষের মৃত্যু হয়েছে।”
নন্দিতা কাঁদতে শুরু করল।
“মা কেন আমাকে সত্যিটা বলেনি?”
“কারণ অমিয় তাকে শর্ত দিয়েছিল—সে যদি মুখ খোলে, তোমাকে আবার সেই পরীক্ষাগারে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে। তোমার মা তোমাকে দূরে সরিয়ে রাখার জন্য নিজের জীবনটাকেও মিথ্যে বানিয়েছিল।”
নীলাঞ্জনা এগিয়ে এসে বলল, “তাহলে যে লোকটা এতদিন দেওয়ালের পেছনে ছিল, সে কে?”
ঋত্বিক তার দিকে তাকাল।
“শশাঙ্কশেখর রায়।”
“কিন্তু তিনি তো তোমার বাবা!”
“হ্যাঁ। আর তিনি অমিয়ের প্রথম শিকারদের একজন। অমিয় তাঁর স্মৃতি নিয়ে পরীক্ষা চালিয়েছিল, যাতে তিনি নিজের ছেলেকেই চিনতে না পারেন। তারপর তাঁকে বাড়ির গোপন ঘরে আটকে রেখে সবাইকে বিশ্বাস করানো হয়েছিল, তিনি মারা গেছেন।”
“তাহলে অমিয় সেন এখন কোথায়?”
ঋত্বিক উত্তর দেওয়ার আগেই নিচের তলা থেকে হাততালির শব্দ শোনা গেল।
একবার।
দুবার।
তারপর একটি কণ্ঠ ভেসে এল।
“অসাধারণ! এত বছর পর আমার সব পরীক্ষার ফলাফল এক জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে।”
সিঁড়ি দিয়ে উঠে এলেন এক বৃদ্ধ।
সাদা চুল, মোটা চশমা, হাতে লাঠি। মুখে শান্ত হাসি।
নন্দিতা ছবির দিকে তাকাল।
ড. অমিয় সেন।
ছবির মানুষটির সঙ্গে এই বৃদ্ধের কোনও অমিল নেই।
“আপনি তো মৃত!” অনন্যা চিৎকার করল।
অমিয় মৃদু হাসলেন।
“মৃত্যুর শংসাপত্রও মানুষের পরিচয়ের মতোই। সঠিক মানুষ যদি সঠিক কাগজ তৈরি করে, পৃথিবী তাকে মৃত বলে মেনে নেয়।”
অনন্যা বন্দুক তুলল।
“আপনি গ্রেপ্তার হচ্ছেন।”
অমিয় নির্বিকারভাবে বললেন, “কোন অপরাধে? মৃত মানুষকে বন্দি রাখার অপরাধে? নাকি জীবিত মানুষকে তার নিজের নাম ভুলিয়ে দেওয়ার অপরাধে? আদালতে তোমার সাক্ষীরা নিজেদের কথাই বিশ্বাস করবে না।”
তিনি নন্দিতার দিকে তাকালেন।
“তুমি কেমন আছ, নন্দিতা? অনেক বছর পর তোমার চোখে আবার সেই প্রশ্ন দেখছি।”
নন্দিতা এবার পিছিয়ে গেল না।
“আপনি আমার স্মৃতি বদলে দিয়েছেন।”
“আমি তোমাকে বাঁচিয়েছিলাম।”
“আপনি আমাকে আমার জীবন থেকে চুরি করেছিলেন।”
অমিয়ের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
“তুমি বুঝতে পারছ না। মানুষের স্মৃতি খুব দুর্বল। তুমি যা মনে করো, তার অর্ধেকই অন্যের শেখানো। আমি শুধু তোমাকে একটা নতুন জীবন দিয়েছিলাম।”
“যে জীবন আমার ছিল না।”
“তোমার বাবার কী হয়েছে, মনে আছে? তুমি তো দেখেছিলে—”
“না,” নন্দিতা বাধা দিল। “আমি কিছুই দেখিনি। আপনি আমাকে একটা গল্প বিশ্বাস করিয়েছিলেন। আর আমি এত বছর সেই গল্পের ভেতরে বেঁচে ছিলাম।”
অমিয় ধীরে ধীরে হাততালি দিলেন।
“এটাই তো আমি দেখতে চেয়েছিলাম। স্মৃতি ছাড়া মানুষ কীভাবে নিজের পরিচয় পুনর্গঠন করে। তুমি আমার সবচেয়ে সফল পরীক্ষা।”
“আমি আপনার পরীক্ষা নই।”
“তুমি তাই বলছ, কারণ আমি তোমাকে তাই বলতে শিখিয়েছি।”
নন্দিতা টেবিলের ওপর রাখা ফাইলগুলো তুলে ধরল।
“এই নথিগুলো আপনার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে।”
অমিয় মাথা নাড়লেন।
“নথি? ওই কাগজে যার নাম আছে, সে-ই কি সত্যি? ওই ছবিতে যে মুখ আছে, সে-ই কি সেই মানুষ? তুমি কি প্রমাণ করতে পারবে যে তোমার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটি তোমার বাবা?”
ঋত্বিক এগিয়ে এলেন।
“আমি আমার মেয়েকে প্রমাণ দিতে আসিনি। আমি শুধু তার কাছে ক্ষমা চাইতে এসেছি।”
অমিয়ের চোখে হঠাৎ ক্রোধ দেখা দিল।
“তোমার ক্ষমা চাওয়ার অধিকার নেই!”
তিনি লাঠির হাতল ঘুরিয়ে দিলেন। তার ভেতর থেকে বেরিয়ে এল ছোট্ট একটি যন্ত্র। ঘরের দেয়ালে লুকোনো স্পিকারগুলো একসঙ্গে চালু হয়ে গেল।
প্রথমে শোনা গেল মাধবীর কণ্ঠ।
তারপর নন্দিতার শৈশবের কান্না।
তারপর একটি শিশুর কণ্ঠ—
“বাবা, আমি তোমাকে মেরে ফেলেছি।”
নন্দিতা দুহাতে কান চেপে ধরল।
“বন্ধ করুন!”
অমিয় বললেন, “তোমার মস্তিষ্ক এখনও সেই সংকেত চিনতে পারে। তুমি আবার সেই রাতের ভেতরে ফিরে যাচ্ছ।”
নন্দিতার চোখের সামনে দৃশ্য বদলে যেতে লাগল। সে যেন আবার ছোট্ট হয়ে গেছে। সাদা আলোয় ভরা একটি ঘর। মাধবী কাঁদছেন। একজন মানুষ মেঝেতে পড়ে আছেন। তার হাতে রক্ত। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে অমিয়।
“তুমি করেছ, নন্দিতা,” অমিয়ের কণ্ঠ প্রতিধ্বনিত হলো। “তুমিই করেছ।”
নন্দিতা মেঝেতে বসে পড়ল।
ঋত্বিক তার দিকে এগোতেই অমিয় চিৎকার করলেন, “এক পা এগোবে না!”
কিন্তু এবার নীলাঞ্জনা সামনে দাঁড়াল।
“আপনি একটা কথা ভুলে গেছেন, ডাক্তারবাবু।”
অমিয় তার দিকে তাকালেন।
“কী কথা?”
“স্মৃতি বদলানো যায়। কিন্তু স্মৃতির সব প্রমাণ মুছে ফেলা যায় না।”
নীলাঞ্জনা নিজের জামার ভেতর থেকে ছোট্ট একটি রেকর্ডিং যন্ত্র বের করল।
“আমি এই বাড়িতে বছরের পর বছর আপনার কথোপকথন রেকর্ড করেছি। আপনি যখন নিজেকে মৃত বলে লুকিয়ে রেখেছিলেন, তখনও আপনি কথা বলতেন। আপনি যখন ঋত্বিককে অন্য পরিচয় দিয়েছিলেন, তখনও কথা বলতেন। আর আজ রাতে যা বলেছেন, তার সবটাই রেকর্ড হয়েছে।”
অমিয় প্রথমবারের মতো বিচলিত হলেন।
“যন্ত্রটা দাও!”
নীলাঞ্জনা পিছিয়ে গেল।
অনন্যা সুযোগ বুঝে অমিয়ের হাত থেকে যন্ত্রটি কেড়ে নিল। দেয়ালের স্পিকারগুলো বন্ধ হয়ে গেল।
ঘর নিস্তব্ধ।
অমিয় এবার অনন্যার দিকে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। কিন্তু অনন্যা তাঁকে ঠেলে মেঝেতে ফেলে দিল। রিভলভার তাঁর কপালের কাছে ধরে বলল, “এবার আপনার স্মৃতি আদালতে পরীক্ষা হবে।”
দূরে সাইরেনের শব্দ শোনা গেল।
বাড়ির বাইরে পুলিশের গাড়ি এসে থামল।
অনন্যা তার সহকর্মীদের দরজা খুলে দেওয়ার নির্দেশ দিল। কয়েক মিনিটের মধ্যে বাড়িটি পুলিশে ভরে গেল। অমিয় সেনকে হাতকড়া পরানো হলো। তার গোপন কক্ষ থেকে উদ্ধার হলো অসংখ্য ফাইল, রেকর্ডিং, ভুয়ো মৃত্যুর শংসাপত্র এবং পরিচয় বদলের নথি।
কিন্তু নন্দিতা তখনও মেঝেতে বসে ছিল।
ঋত্বিক তার পাশে এসে বসলেন।
“আমাকে চিনতে পারছ?”
নন্দিতা অনেকক্ষণ চুপ করে রইল।
“আমি জানি না,” সে বলল। “আপনার মুখটা আমার ছবিতে দেখা মুখের মতো। আপনার কণ্ঠস্বরও সেই রকম। কিন্তু আমার ভেতরে যে স্মৃতিগুলো আছে, সেগুলো বিশ্বাস করতে পারছি না।”
ঋত্বিক মাথা নত করলেন।
“তোমাকে আজই আমাকে বিশ্বাস করতে হবে না। আমি তোমার বাবা কি না, সেটা সময় বলবে। আমি তোমার পাশে থাকতে চাই—কোনও দাবি নিয়ে নয়।”
নন্দিতা প্রথমবার তাঁর হাত ধরল।
“আমার শুধু একটা প্রশ্ন আছে।”
“করো।”
“আপনি কি আমাকে কখনও সত্যিই ভালোবেসেছিলেন?”
ঋত্বিকের চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।
“তুমি যখন জন্মেছিলে, তোমার হাতের আঙুল আমার একটা আঙুল আঁকড়ে ধরেছিল। সেই মুহূর্তটা কেউ আমার কাছ থেকে নিতে পারেনি। আমার স্মৃতি নষ্ট হয়েছে, আমার পরিচয় বদলেছে, কিন্তু সেই স্পর্শটা আমি ভুলিনি।”
নন্দিতা ধীরে তাঁর কাঁধে মাথা রাখল।
সেদিন রাতেই শশাঙ্কশেখরকে গোপন ঘর থেকে উদ্ধার করা হলো। বৃদ্ধের শরীর ভেঙে পড়েছিল, কিন্তু তিনি জীবিত ছিলেন। তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার আগে তিনি নন্দিতাকে ডেকে বললেন, “তোমার মা আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছিল। আমি সব সত্যি বলতে পারিনি। অমিয় আমাকে বোঝাত, সত্যি বললে তোমার ক্ষতি হবে। আমি ভয়ে চুপ করে ছিলাম।”
নন্দিতা বলল, “আপনি চুপ ছিলেন বলে আমার জীবন থেকে পঁচিশ বছর হারিয়ে গেছে।”
বৃদ্ধের চোখ ভিজে উঠল।
“আমি জানি। ক্ষমা চাইবার অধিকারও হয়তো আমার নেই।”
“ক্ষমা আজ দিতে পারব না,” নন্দিতা বলল। “কিন্তু সত্যিটা আর চাপা দেব না।”
পরদিন সকালে খবরের কাগজে বড় শিরোনাম হলো—
“পঁচিশ বছরের রহস্যের পর্দাফাঁস: পরিচয় ও স্মৃতি নিয়ে বেআইনি পরীক্ষার অভিযোগে চিকিৎসক গ্রেপ্তার।”
কিন্তু সংবাদমাধ্যমের কাছে সব নথি পৌঁছলেও নন্দিতা কোনও সাক্ষাৎকার দিল না। সে জানত, সত্যি প্রকাশ করা আর সত্যিকে বোঝা এক জিনিস নয়।
পরবর্তী কয়েক মাসে তদন্তে উঠে এল আরও অনেক তথ্য। অমিয় সেন দীর্ঘদিন ধরে কয়েকজন মানুষের স্মৃতি ও পরিচয় নিয়ে বেআইনি পরীক্ষা চালিয়েছিলেন। রোগীদের সম্মতি ছাড়াই তাদের পুরোনো নথি বদলে দেওয়া হয়েছিল। একাধিক ব্যক্তিকে ভুয়ো পরিচয়ে বাঁচতে বাধ্য করা হয়েছিল। ঋত্বিকের নিখোঁজ হওয়া, শশাঙ্কশেখরের মৃত্যুর মিথ্যা খবর এবং নন্দিতার শৈশবের স্মৃতি—সবকিছুর পেছনেই ছিল সেই পরিকল্পনা।
অরিন্দমকে চিকিৎসা ও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিরাপদ হেফাজতে রাখা হলো। সে স্বীকার করল, তাকে ছোটবেলা থেকে ঋত্বিকের পরিচয় অনুকরণ করতে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল। তাকে বলা হয়েছিল, তার নিজের কোনও অতীত নেই; তার কাজই তার পরিচয়। সে বহু বছর ধরে এই মিথ্যেটাকে সত্যি বলে বিশ্বাস করেছিল।
অনন্যা তার বাবার পুরোনো ডায়েরি নতুন করে পড়ল। শেষ পাতায় লেখা ছিল—
“মানুষের স্মৃতি মুছে ফেলা সম্ভব হতে পারে। কিন্তু স্মৃতির জন্য মানুষের আকাঙ্ক্ষাকে মুছে ফেলা যায় না। কেউ না কেউ একদিন প্রশ্ন করবে—আমি আসলে কে?”
অনন্যা ডায়েরিটি নন্দিতার হাতে তুলে দিল।
“আমার বাবা এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই মারা গিয়েছিলেন,” সে বলল। “আমি চাই না তাঁর মৃত্যু আরেকটা অজানা গল্প হয়ে থাকুক।”
নন্দিতা ডায়েরিটি বুকে চেপে ধরল।
“এবার থেকে আমরা গল্প নয়, প্রমাণ নিয়ে কথা বলব।”
এক বছর কেটে গেল।
১৭ অক্টোবর।
শান্তিনিকেতন বাড়ির ওপরের বারান্দায় আর কোনও আলো জ্বলত না। বাড়ির একাংশ সংস্কার করা হয়েছে। গোপন ঘরটি সিল করে দেওয়া হয়নি; বরং তদন্তের প্রমাণ হিসেবে সংরক্ষিত হয়েছে। আয়নার পেছনের ঘরটিতে এখন তালা ঝুলছে।
নন্দিতা সাংবাদিকতার কাজে ফিরে গেছে। সে একটি দীর্ঘ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন লিখেছে—স্মৃতি, পরিচয় এবং মানুষের ওপর ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে। প্রতিবেদনে কারও সম্পর্কে প্রমাণহীন দাবি নেই। আছে নথি, সাক্ষ্য, চিকিৎসা-রিপোর্ট এবং আদালতে জমা দেওয়া রেকর্ডিং।
নীলাঞ্জনা এখন নন্দিতার সঙ্গেই থাকে। তাদের সম্পর্কের নাম বোনত্ব নয়, রক্তের পরিচয়ও নয়। তারা একে অন্যকে বেছে নিয়েছে—একটি দীর্ঘ অন্ধকারের পর।
শশাঙ্কশেখর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। ঋত্বিকও চিকিৎসা নিচ্ছেন। নন্দিতা তাঁকে এখনও প্রতিদিন বাবা বলে ডাকে না। কখনও ডাকে, কখনও শুধু নাম ধরে। কিন্তু তাদের মধ্যে আর কোনও বাধ্যতামূলক স্মৃতি নেই, কোনও নির্দেশ দেওয়া কণ্ঠস্বর নেই।
সেদিন সন্ধ্যায় নন্দিতা একা বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়েছিল। আকাশে মেঘ। দূরে ট্রামের ঘণ্টা শোনা যাচ্ছে।
ঘড়িতে ১১টা ৩৯।
তার বুকের ভেতর পুরোনো ভয় ফিরে এল। পঁচিশ বছর ধরে এই সময়ে বাড়ির আলো জ্বলত। দরজার বাইরে কেউ দাঁড়িয়ে বলত—
“বাবা, দরজাটা খোলো। আমি ফিরে এসেছি।”
ঘড়িতে ১১টা ৪০ বাজল।
কোনও আলো জ্বলল না।
কেউ দরজায় কড়া নাড়ল না।
শুধু বাড়ির ভেতরে কোথাও একটা কাঠের শব্দ হলো।
নন্দিতা ঘুরে দাঁড়াল।
করিডরের শেষ প্রান্তে সেই পুরোনো আয়নাটি রাখা। সেটি এখন দেয়ালে আটকানো নয়, মেঝের ওপর ঠেস দিয়ে রাখা। নন্দিতা ধীরে ধীরে তার সামনে গেল।
আয়নায় নিজের মুখ দেখল।
এই প্রথম সে নিজের প্রতিবিম্বকে দেখে ভয় পেল না।
সে হাত তুলল।
প্রতিবিম্বও হাত তুলল।
একই সঙ্গে।
তারপর নন্দিতা মৃদু হাসল।
ঠিক সেই মুহূর্তে আয়নার কাচের ওপর কুয়াশার মতো একটি দাগ জমল। যেন ভেতর থেকে কেউ নিঃশ্বাস ফেলেছে।
দাগের ওপর ধীরে ধীরে ফুটে উঠল কয়েকটি শব্দ—
“তুমি কি নিশ্চিত, সব সত্যি জেনে গেছ?”
নন্দিতা স্থির হয়ে গেল।
সে হাত বাড়িয়ে কাচ ছুঁল।
শব্দগুলো মিলিয়ে গেল।
তারপর নিজের ফোনে একটি বার্তা এল। অজানা নম্বর থেকে।
“অমিয় সেন একা ছিল না।”
নন্দিতার আঙুল ঠান্ডা হয়ে গেল। সে সঙ্গে সঙ্গে অনন্যাকে ফোন করল। কিন্তু কল ধরার আগেই আরেকটি বার্তা এল।
“এইবার তোমার স্মৃতি নয়, তোমার বিশ্বাস পরীক্ষা হবে।”
নন্দিতা জানালার বাইরে তাকাল।
বারান্দার রেলিংয়ের ওপারে অন্ধকারে একজন দাঁড়িয়ে আছে।
মানুষটির মুখ দেখা যাচ্ছে না। শুধু ডান হাতটা দেখা যাচ্ছে—আঙুলে একটি পুরোনো আংটি।
ঋত্বিকের আংটির মতো।
নন্দিতা দরজার দিকে এগোল। তারপর থেমে গেল।
তার মনে পড়ল মায়ের শেষ সতর্কবাণী—
“তাকে দেখবে না।”
কিন্তু এবার সে পালাল না।
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে নন্দিতা জোরে বলল, “তুমি কে?”
অন্ধকারের মানুষটি উত্তর দিল না।
নন্দিতা আবার বলল, “তোমার নাম বলো।”
দূর থেকে তার নিজের কণ্ঠস্বর ভেসে এল—
“আমি ফিরে এসেছি।”
নন্দিতা দরজার হাতল ছেড়ে দিল।
তারপর ধীরে ধীরে পেছনে ফিরে ঘরের সব আলো জ্বালিয়ে দিল।
কারণ সে বুঝে গিয়েছিল—অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকা প্রতিটি মানুষকে সত্যি ভেবে নেওয়ার দিন শেষ। আর কোনও মুখ, কোনও কণ্ঠস্বর, কোনও স্মৃতিই প্রমাণ ছাড়া তার জীবন নিয়ন্ত্রণ করবে না।
বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি অন্ধকারের মধ্যে মিলিয়ে গেল।
নন্দিতা ফোনটা হাতে তুলে অনন্যাকে বলল, “আরেকটা তদন্ত শুরু করতে হবে।”
“কী হয়েছে?”
নন্দিতা আয়নার দিকে তাকাল।
“আমরা অমিয় সেনকে ধরেছি। কিন্তু হয়তো আমরা এখনও জানি না, এই গল্পের প্রথম অধ্যায় কে লিখেছিল।”
ফোনের ওপারে অনন্যা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল, “তাহলে এবার প্রথম অধ্যায় থেকেই শুরু করব।”
নন্দিতা ফোন নামিয়ে রাখল।
বাইরে ভোরের প্রথম আলো ফুটতে শুরু করেছে।
বারান্দায় আর কেউ দাঁড়িয়ে নেই।
কিন্তু নন্দিতা জানত, কোনও রহস্যের শেষ মানে সব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া নয়। কখনও কখনও শেষ মানে—ভয়কে আর নিজের পরিচয় নির্ধারণ করতে না দেওয়া।
সে জানালাটা খুলে দিল।
দীর্ঘ পঁচিশ বছর পর শান্তিনিকেতন বাড়িতে সকালের বাতাস ঢুকল।
আর আয়নায় তার প্রতিবিম্ব এবার একটুও দেরি করে নড়ল না।
— সমাপ্ত —