Categories
উপন্যাস বিবিধ

উপন্যাস : শেষ ট্রেনের শেষ যাত্রী (দ্বিতীয় পর্ব: বারো বছর আগের সেই প্রতিশ্রুতি)।

অর্কের মনে হল, কেউ যেন তার মাথার ভেতর থেকে একে একে সব দরজা খুলে দিচ্ছে।

প্রথমে ফিরে এল একটা শব্দ—ট্রেনের চাকার সঙ্গে রেললাইনের ধাতব সংঘর্ষ।

তারপর একটা গন্ধ—ভেজা মাটি, কয়লার ধোঁয়া আর পুরোনো কাঠের গন্ধ।

তারপর একটা দৃশ্য।

রাতের অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছে একটি ছোট্ট স্টেশন। প্ল্যাটফর্মের অর্ধেক আলো জ্বলছে, অর্ধেক নিভে গেছে। স্টেশনের নামফলকে লেখা—স্মৃতিপুর।

বারো বছরের অর্ক একটা বেঞ্চে বসে কাঁদছে।

তার পাশে বসে আছে একটি মেয়ে। পরনে নীল স্কুলের পোশাক, কাঁধে ছেঁড়া ব্যাগ। মেয়েটির কপালে রক্তের দাগ।

সেই মেয়েটিই পিউ।

অর্ক দুহাতে মাথা চেপে ধরল।

“না… না, এটা সত্যি নয়!”

তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা অদ্ভুত মুখের লোকটি হেসে উঠল। তার মুখের চামড়া অর্ধেক ঝুলে আছে, কিন্তু সেই বিকৃত মুখের মধ্যেও অর্ক চিনতে পারল—এ লোকটিই সেই রেলকর্মী, যাকে সে বারো বছর বয়সে অনুসরণ করেছিল।

“মনে পড়ছে, অর্ক?”

অর্ক পিছিয়ে গেল।

“তুমি কে?”

লোকটি উত্তর দিল না। তার মুখের চামড়া আবার বদলে গেল। এবার সেখানে ফুটে উঠল অর্কের বাবার মুখ।

“আমাকে চিনতে পারছিস না, বাবা?”

অর্কের বুকের মধ্যে হাহাকার উঠল। তার বাবা মারা যাওয়ার আগে ঠিক এইভাবেই তাকে ডাকতেন।

কিন্তু পিউ তার হাত টেনে ধরল।

“ওর দিকে তাকাবেন না, কাকু। ও আপনার বাবা নয়।”

লোকটির মুখে বিরক্তি ফুটে উঠল।

“তুই এখনও বেঁচে আছিস, পিউ? এত বছর ধরে তোকে খুঁজে বেড়াচ্ছি। এবারও কি আমার পথ আটকাবি?”

পিউ ভয়ে কাঁপছিল। তবু সে অর্কের সামনে দাঁড়িয়ে বলল, “ওকে ছেড়ে দাও।”

লোকটি হেসে উঠল।

“ছেড়ে দেব? এই ছেলেটা নিজেই তো আমাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। ওর নিজের মুখে বলা কথা আমি কী করে ভুলে যাই?”

অর্ক চিৎকার করে উঠল, “কী প্রতিশ্রুতি?”

লোকটি তার দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে বলল, “তুই বলেছিলি, তুই ফিরে আসবি। তুই বলেছিলি, তুই পিউকে বাড়ি পৌঁছে দিবি। আর তুই ফিরে আসিসনি।”

অর্কের চোখের সামনে আবার সেই রাতের দৃশ্য ভেসে উঠল।


বারো বছর আগে, ১৭ অক্টোবর, ২০০৪।

অর্ক তখন বারাসতের একটি স্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে। দুর্গাপুজোর ছুটি কাটাতে সে বাবার সঙ্গে কলকাতায় গিয়েছিল। ফেরার সময় রাত হয়ে গিয়েছিল বলে তারা শেষ লোকাল ধরেছিল।

ট্রেন মাঝপথে হঠাৎ থেমে যায়।

বাবা জানলার পাশে বসে ছিলেন। অর্ক ঘুমিয়ে পড়েছিল। কিছুক্ষণ পরে তার ঘুম ভাঙতেই সে দেখতে পায়, বাবা কামরায় নেই।

অর্ক ভেবেছিল বাবা হয়তো দরজার কাছে গেছেন।

ঠিক তখনই একজন রেলকর্মী এসে বলেছিল, “তোমার বাবা পরের স্টেশনে নেমেছেন। তোমার মা ওখানে অপেক্ষা করছেন। আমার সঙ্গে এসো।”

বারো বছরের অর্ক ভয় পেয়েছিল। কিন্তু লোকটির পোশাক দেখে বিশ্বাস করেছিল।

সে লোকটির সঙ্গে নেমে পড়ে।

স্টেশনটি ছিল অদ্ভুত। চারদিকে কুয়াশা, কোনও দোকান খোলা নেই, ঘড়ির কাঁটা এগোচ্ছে না। প্ল্যাটফর্মের এক প্রান্তে বসে কাঁদছিল পিউ।

পিউ জানিয়েছিল, সে তার মায়ের সঙ্গে ট্রেনে উঠেছিল। কিন্তু হঠাৎ ভিড়ের মধ্যে মাকে হারিয়ে ফেলেছে। সে অনেকক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছে, কেউ তাকে বাড়ি পৌঁছে দিচ্ছে না।

অর্ক তাকে সান্ত্বনা দিয়েছিল।

“কাঁদিস না। আমি তোকে বাড়ি পৌঁছে দেব।”

পিউ জিজ্ঞেস করেছিল, “সত্যি?”

“সত্যি। আমার বাবাও এখানে কোথাও আছেন। আমরা সবাই মিলে তোকে বাড়ি পৌঁছে দেব।”

কিন্তু তখনই স্টেশনের অন্ধকার থেকে সেই রেলকর্মী বেরিয়ে এসেছিল।

“বাড়ি যেতে চাস?”

পিউ মাথা নেড়েছিল।

“তাহলে টিকিট দেখাও।”

পিউ নিজের পকেট হাতড়ে কিছুই পায়নি।

লোকটি বলেছিল, “টিকিট নেই? তা হলে এই স্টেশন থেকে কেউ বেরোতে পারে না।”

অর্ক প্রতিবাদ করেছিল, “কিন্তু ও তো ছোট মেয়ে! ওর মা ওকে খুঁজছে!”

লোকটি অর্কের দিকে তাকিয়ে বলেছিল, “তুই ওকে বাড়ি পৌঁছে দিতে চাস? তা হলে একটা কাজ কর। তুই ট্রেনে ফিরে যা। তোর বাবা তোকে খুঁজছেন। আর আমি এই মেয়েটাকে তার মায়ের কাছে পৌঁছে দেব।”

অর্ক দ্বিধায় পড়ে গিয়েছিল।

পিউ তার হাত ধরে বলেছিল, “আমাকে একা রেখে যেও না।”

অর্ক প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, “আমি ফিরে আসব। কথা দিচ্ছি।”

তারপর সে ট্রেনে উঠে পড়েছিল।

কিন্তু ট্রেন ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জানলার বাইরে দেখতে পেয়েছিল—পিউ প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে কাঁদছে। আর সেই রেলকর্মী ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

অর্ক চিৎকার করে উঠেছিল।

কিন্তু ট্রেনের গতি বেড়ে গিয়েছিল।

পরের মুহূর্তে সব অন্ধকার।


বর্তমানে ফিরে এসে অর্কের চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।

“আমি তোকে ফেলে চলে গিয়েছিলাম…”

পিউ মাথা নাড়ল।

“আপনি তখন ছোট ছিলেন, কাকু। আপনাকে ওরা ভুল বুঝিয়েছিল।”

“কিন্তু আমি কথা দিয়েছিলাম!”

“আপনি ফিরে আসতে চেয়েছিলেন। ট্রেন আপনাকে আর নামতে দেয়নি।”

অর্ক নিজের হাতের পুরোনো টিকিটটার দিকে তাকাল। টিকিটে লেখা তারিখটি ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছিল। ১৭ অক্টোবর, ২০০৪-এর বদলে সেখানে ফুটে উঠল আজকের তারিখ।

তারপর নতুন একটি লাইন দেখা গেল—

ফেরার টিকিট: নেই।

অর্কের বুকের ভেতরটা ঠান্ডা হয়ে গেল।

“আমি কি এখানেই আটকে যাব?”

পিউ উত্তর দেওয়ার আগেই লোকটি গর্জে উঠল।

“অবশ্যই! এই ট্রেন থেকে কেউ নিজের ইচ্ছায় নেমে যেতে পারে না। যারা নিজেদের কথা রাখতে পারে না, তাদের জন্য এই যাত্রা শেষ হয় না।”

অর্ক দাঁত চেপে বলল, “তুমি আমাদের আটকে রেখেছ কেন?”

লোকটি ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে এল।

“কারণ আমি হারিয়ে যাওয়া মানুষদের পথ দেখাই। যারা কাউকে হারিয়েছে, যারা কোনও প্রতিশ্রুতি রাখতে পারেনি, যারা নিজেদের অতীত থেকে পালাতে চায়—তাদের সবাইকে আমি এই ট্রেনে তুলে নিই। তারা তাদের স্মৃতি ভুলে যায়। তারপর আমার হয়ে অন্যদের নিয়ে আসে।”

“তুমি কে?”

লোকটি থেমে গেল।

কয়েক মুহূর্ত তার মুখে কোনও অভিব্যক্তি রইল না।

তারপর সে বলল, “আমি সেই মানুষ, যাকে কেউ কোনওদিন খুঁজতে ফিরে আসেনি।”

তার কণ্ঠে এবার রাগের চেয়ে গভীর বিষাদ শোনা গেল।

“বহু বছর আগে আমিও এই লাইনের এক যাত্রী ছিলাম। এক রাতে আমার মেয়ে হারিয়ে যায়। আমি তাকে খুঁজতে খুঁজতে এই স্টেশনে এসে পৌঁছই। স্টেশনের লোকেরা আমাকে বলেছিল, আমার মেয়েকে ফিরে পেতে হলে অন্য একজনকে এখানে রেখে যেতে হবে। আমি রাজি হইনি। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। আমার মেয়ে আর ফিরে আসেনি। আমিও আর বাড়ি ফিরতে পারিনি।”

অর্ক তার দিকে তাকিয়ে রইল।

“তাই বলে তুমি অন্যদের জীবন নষ্ট করবে?”

লোকটির মুখ শক্ত হয়ে উঠল।

“মানুষ আমাকে ভুলে গেছে। তাই আমিও চাই, কেউ যেন নিজের জীবনে ফিরে যেতে না পারে। সবাই যদি হারিয়ে যায়, তবে কেউ কাউকে ভুলতে পারবে না।”

পিউ কেঁদে ফেলল।

“তুমি আমার মাকেও আটকে রেখেছ।”

লোকটি কোনও উত্তর দিল না।

পিউ এবার অর্কের হাত ধরে বলল, “কাকু, আমার মা এখনও বেঁচে আছেন। আমি জানি। এই ট্রেন আমাকে বারবার তাঁর কাছে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে, কিন্তু কখনও পৌঁছে দেয় না।”

অর্ক জিজ্ঞেস করল, “তুই কী করে জানিস তোর মা বেঁচে আছেন?”

পিউ তার ব্যাগ থেকে একটা ছোট্ট লাল কাপড়ের পুঁটলি বের করল। পুঁটলির মধ্যে ছিল একটি পুরোনো ফটোগ্রাফ। ছবিতে এক মহিলা পিউকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন।

ছবির পিছনে লেখা—

“পিউ, যেখানেই থাকিস, মা তোকে খুঁজবে।”

অর্ক ছবিটা হাতে নিয়ে দেখল, ছবির কোণে একটা ঠিকানা লেখা রয়েছে। ঠিকানাটা বারাসতের একটি পুরোনো বাড়ির।

“এটা তোর বাড়ি?”

পিউ মাথা নাড়ল।

“হ্যাঁ। কিন্তু আমি ঠিকানাটা পড়তে পারি না। শুধু জানি, মা আমাকে একটা নীল দরজার বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিলেন। তারপর আমরা ট্রেনে উঠেছিলাম।”

অর্কের মনে হল, এই ঠিকানাটাই হয়তো তাদের মুক্তির পথ।

কিন্তু তার আগেই ট্রেনের আলো নিভে গেল।

একটা দীর্ঘ শিস শোনা গেল।

তারপর স্পিকারে ঘোষণা এল—

“যাত্রীদের জানানো যাচ্ছে, পরবর্তী স্টেশন—ভুলে যাওয়া মানুষের শেষ ঠিকানা। যাঁদের স্মৃতি অসম্পূর্ণ, তাঁরা অনুগ্রহ করে নিজ নিজ আসনে বসে থাকুন। কোনও যাত্রী ট্রেন থেকে নামার চেষ্টা করবেন না।”

কামরার অন্য যাত্রীরা একসঙ্গে উঠে দাঁড়ালেন।

বৃদ্ধ তাঁর ভাঙা ঘড়িটা বুকে চেপে ধরলেন।

যুবতী সাদা কাপড়ে মোড়া জিনিসটাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন।

অর্ক দেখল, সবার চোখে একই আতঙ্ক।

পিউ ফিসফিস করে বলল, “এই স্টেশনে নামলে মানুষ তার জীবনের সবচেয়ে কষ্টের স্মৃতিটা আবার দেখতে পায়। কেউ যদি সেই স্মৃতি সহ্য করতে না পারে, সে চিরদিনের মতো এই ট্রেনের যাত্রী হয়ে যায়।”

অর্ক জিজ্ঞেস করল, “আর যদি সহ্য করতে পারে?”

পিউ তার দিকে তাকাল।

“তাহলে হয়তো সে বাড়ি ফেরার রাস্তা দেখতে পায়।”

“হয়তো?”

পিউ চোখ নামিয়ে বলল, “এত বছর ধরে কাউকে ফিরতে দেখিনি।”


ট্রেন থামতেই দরজা খুলে গেল।

প্ল্যাটফর্মে নামার সঙ্গে সঙ্গে অর্ক বুঝতে পারল, জায়গাটা কোনও সাধারণ স্টেশন নয়। সেখানে কোনও আলো নেই, তবু চারপাশ পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। অসংখ্য দরজা সারি দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। প্রতিটি দরজার ওপর লেখা একেকটি নাম।

একটি দরজায় লেখা—“বাবার শেষ দিন।”

অন্যটিতে—“যে চিঠি কখনও পাঠানো হয়নি।”

আরেকটিতে—“শেষ দেখা।”

অর্কের পা থমকে গেল।

একটি দরজার ওপর লেখা—

“অর্ক মুখোপাধ্যায়—১৭ অক্টোবর, ২০০৪।”

দরজার ওপার থেকে বাবার কণ্ঠস্বর ভেসে এল।

“অর্ক, তুই কোথায় গেলি?”

অর্কের চোখে জল এসে গেল।

বাবা সেই রাতের পর তাকে কখনও বকেননি। কিন্তু অর্ক বহুবার ভেবেছে, বাবা হয়তো তাকে হারিয়ে ফেলেছিলেন বলে নিজের ওপর রাগ করেছিলেন। বাবার মৃত্যুর আগেও সে কখনও জানতে পারেনি, সেই রাতে ঠিক কী ঘটেছিল।

দরজাটা নিজে থেকেই খুলে গেল।

ভেতরে দেখা গেল সেই পুরোনো ট্রেনের কামরা। বাবা জানলার পাশে বসে আছেন। তাঁর মুখে উদ্বেগ।

বারো বছরের অর্ক দরজার পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদছে।

বাবা তাকে দেখে ছুটে এলেন।

“কোথায় ছিলি তুই? আমি তোকে কত খুঁজেছি!”

ছোট্ট অর্ক বাবাকে জড়িয়ে ধরল।

বর্তমানের অর্ক নিঃশব্দে দৃশ্যটা দেখতে লাগল।

তারপর বাবা ছেলেকে নিয়ে বসে পড়লেন।

“শোন, অর্ক। কাউকে সাহায্য করতে চাইলে তাকে একা ফেলে আসবি না। কথা দিলে সেই কথা রাখার চেষ্টা করবি। কিন্তু কেউ তোকে ভুল পথে নিয়ে যেতে চাইলে, তার কথায় বিশ্বাস করবি না।”

অর্কের চোখের জল থামছিল না।

সে বাবাকে বলতে চাইল, “আমি চেষ্টা করেছিলাম। আমি ফিরে আসতে চেয়েছিলাম।”

কিন্তু দৃশ্যের বাবা তার কথা শুনতে পেলেন না।

হঠাৎ কামরার জানলার বাইরে সেই মুখোশধারী রেলকর্মী দেখা দিল। সে কাচে হাত রাখল।

দৃশ্যের বাবা ঘুরে তাকালেন।

“কে আপনি?”

লোকটি হাসল।

“আপনার ছেলেকে বাড়ি পৌঁছে দিতে এসেছি।”

বাবা সঙ্গে সঙ্গে অর্ককে নিজের পিছনে সরিয়ে দিলেন।

“আমার ছেলেকে আপনার দরকার নেই।”

তারপর তিনি দরজা বন্ধ করতে গেলেন।

কিন্তু লোকটি কাচের ভেতর দিয়ে হাত বাড়িয়ে দিল। বাবার হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল অন্ধকারের দিকে।

ছোট্ট অর্ক চিৎকার করে উঠল।

বর্তমানের অর্কও আর নিজেকে সামলাতে পারল না।

“বাবা!”

সে দরজার ভেতরে ঢুকতে গেল।

পিউ তাকে শক্ত করে ধরে ফেলল।

“না, কাকু! ওটা স্মৃতি। আপনি বদলাতে পারবেন না!”

“কিন্তু বাবা—”

“ও আপনাকে ফিরে যেতে বলছেন। দেখুন!”

দৃশ্যের বাবা অন্ধকারের দিকে টেনে নিয়ে যাওয়ার আগে একবার পিছনে তাকালেন।

তিনি বললেন, “অর্ক, বেঁচে থাকিস। নিজের জীবনটা বাঁচিস।”

তারপর দরজা বন্ধ হয়ে গেল।

অর্ক হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল।

এত বছর ধরে সে যে অপরাধবোধ বয়ে বেড়িয়েছে, তার মধ্যে একটা সত্যি ছিল—সে পিউকে ফিরিয়ে আনতে পারেনি। কিন্তু তার মানে এই নয় যে সে ইচ্ছা করে পিউকে ফেলে গিয়েছিল। সে ছিল একটা শিশু, যে একজন অপরিচিত লোকের মিথ্যে কথায় বিশ্বাস করেছিল।

বাবার শেষ কথাটা যেন তার বুকের মধ্যে নতুন করে জায়গা করে নিল।

নিজের জীবনটা বাঁচিস।

অর্ক ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।

“চল, পিউ।”

পিউ অবাক হয়ে তাকাল।

“কোথায়?”

“তোর মাকে খুঁজতে। আর এই ট্রেনের শেষ যাত্রাটাও আজ শেষ করতে হবে।”


স্টেশনের শেষ প্রান্তে একটা ছোট্ট ঘর ছিল। ঘরের দরজায় কোনও নাম লেখা নেই। দরজার নিচ দিয়ে হলুদ আলো বেরিয়ে আসছে।

পিউ বলল, “ওই ঘরটা কখনও খোলে না।”

অর্ক দরজার কাছে যেতেই ভেতর থেকে একটা শিশুর কান্না শোনা গেল।

তারপর একজন মহিলার কণ্ঠস্বর—

“পিউ, মা কোথায় তুই?”

পিউ স্থির হয়ে গেল।

“মা?”

সে দরজায় ঝাঁপিয়ে পড়ল।

“মা! আমি এখানে!”

ভেতরের কান্না থেমে গেল।

তারপর দরজার ওপাশ থেকে মহিলাটি বললেন, “পিউ? আমার পিউ?”

পিউ কাঁদতে কাঁদতে দরজায় ধাক্কা দিতে লাগল।

অর্ক হাতল ঘোরানোর চেষ্টা করল। দরজা নড়ল না।

দরজার ওপর হঠাৎ অক্ষর ফুটে উঠল—

“দরজা খুলবে সেই ব্যক্তি, যে নিজের সবচেয়ে প্রিয় স্মৃতি ছেড়ে দিতে পারবে।”

অর্কের বুক কেঁপে উঠল।

“সবচেয়ে প্রিয় স্মৃতি?”

পিউ তার দিকে তাকাল।

“কাকু, আপনার কী এমন স্মৃতি আছে, যা আপনি ছেড়ে দিতে পারবেন?”

অর্ক চোখ বন্ধ করল।

তার সবচেয়ে প্রিয় স্মৃতি ছিল বাবার সঙ্গে কাটানো ছোটবেলার দিনগুলো। বাবা তাকে সাইকেল চালানো শিখিয়েছিলেন, প্রথম বই কিনে দিয়েছিলেন, পরীক্ষায় ভালো ফল করলে কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। সেই স্মৃতিগুলোই বাবার মৃত্যুর পর তাকে বাঁচিয়ে রেখেছিল।

সেগুলো ছেড়ে দেওয়া মানে বাবাকে দ্বিতীয়বার হারানো।

কিন্তু দরজার ওপাশে পিউয়ের মা অপেক্ষা করছেন।

অর্ক ধীরে ধীরে দরজায় হাত রাখল।

“আমি আমার বাবার স্মৃতি ছেড়ে দিতে পারব না,” সে বলল। “কিন্তু আমি এই স্মৃতিগুলোকে আমার শাস্তি হিসেবেও বাঁচিয়ে রাখব না। আমি বাবাকে ভালোবেসেছি। তিনি আমাকে ভালোবেসেছেন। সেই ভালোবাসা আমাকে এগিয়ে যেতে শেখাবে।”

দরজার অক্ষরগুলো কেঁপে উঠল।

অর্ক আবার বলল, “আমি আমার অতীত ভুলতে চাই না। আমি শুধু অতীতের বন্দি হয়ে থাকতে চাই না।”

হঠাৎ দরজার তালা খুলে গেল।

ভেতরে দাঁড়িয়ে ছিলেন এক মধ্যবয়স্ক মহিলা। তাঁর চোখে জল, চুলে পাক ধরেছে, মুখে দীর্ঘ অপেক্ষার ক্লান্তি।

পিউ এক মুহূর্ত তাকিয়ে রইল।

তারপর ছুটে গিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরল।

“মা!”

মহিলা মেয়েকে বুকে টেনে নিয়ে কাঁদতে লাগলেন।

“তুই কোথায় ছিলি, মা? আমি তোকে কত খুঁজেছি!”

অর্ক দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্য দেখছিল। তার মনে হল, এই প্রথম সে সত্যিকারের কোনও স্মৃতির সামনে দাঁড়িয়ে আছে—যেখানে ভালোবাসা কাউকে আটকে রাখে না, বরং ফিরে আসার জন্য অপেক্ষা করে।

কিন্তু তাদের আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হল না।

স্টেশনের সমস্ত আলো একসঙ্গে নিভে গেল।

দূরে সেই মুখোশধারী লোকটির কণ্ঠস্বর গর্জে উঠল—

“কেউ এই স্টেশন ছেড়ে যেতে পারবে না!”

প্ল্যাটফর্মের মেঝে কেঁপে উঠল। দরজাগুলো একে একে বন্ধ হতে লাগল।

পিউয়ের মা মেয়েকে আঁকড়ে ধরলেন।

অর্ক বুঝতে পারল, লোকটি তাদের মুক্তি দিতে রাজি নয়।

সে পিউয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, “তোর মাকে নিয়ে ট্রেনে ফিরে যা।”

পিউ মাথা নাড়ল।

“আপনাকে ছেড়ে যাব না।”

“আমাকে যেতে হবে।”

“কিন্তু আপনি তো আমাকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার কথা দিয়েছিলেন!”

অর্ক তার হাত ধরল।

“হ্যাঁ। আর এবার আমি কথা রাখব। তবে তার আগে আমাদের সবাইকে এই ট্রেন থেকে বেরোতে হবে।”

ঠিক তখনই দূরে ট্রেনের হুইসেল বেজে উঠল।

স্টেশনের শেষ প্রান্তে একটি দরজা খুলে গেল। দরজার ওপারে দেখা যাচ্ছে অন্ধকার রেললাইন, আর সেই লাইনে দাঁড়িয়ে আছে ট্রেনের শেষ কামরা।

কামরার জানলায় অর্ক নিজের মুখ দেখতে পেল।

প্রতিচ্ছবিটি এবার হাসছিল না।

সে কেবল ঠোঁট নেড়ে বলল—

“তুমি যদি বাড়ি ফিরতে চাও, তবে জানতে হবে—সেই রাতে তোমার বাবা আসলে কোথায় হারিয়ে গিয়েছিলেন।”

অর্কের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

কারণ তার বাবা তো আট বছর আগে মারা গেছেন।

তাহলে সেই রাতের পর বাবার সঙ্গে কী ঘটেছিল?

আর কেনই বা ট্রেনের প্রতিচ্ছবি এখনও তাঁর কথা বলছে?

অর্ক পিউয়ের হাত ধরে শেষ কামরার দিকে এগিয়ে গেল।

তাদের পিছনে স্টেশনটা ধীরে ধীরে অন্ধকারে ডুবে গেল।

আর ট্রেনের ভেতর থেকে আবার সেই ঘোষণা ভেসে এল—

“পরবর্তী স্টেশন—ফেরার অসম্ভব ঠিকানা। যাত্রী অর্ক মুখোপাধ্যায়, অনুগ্রহ করে প্রস্তুত হোন। আপনার যাত্রার শেষ সিদ্ধান্ত বাকি।”

চলবে…

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *